Wednesday, June 24, 2020

মনে পড়ে, মনে পড়ে যায়..

সকালেবেলায় মিষ্টি জিজ্ঞেস করল,অনলাইন ক্লাসে নিটিং শিখবে? সঙ্গে সঙ্গে বললাম, হ্যাঁ, শিখব। আসলে বলতে চেয়েছিলাম, নতুন করে শিখব। শিখে তো ছিলাম সেই ছোট বয়সে। বাচ্চারা যখন আঁকা শেখে বা গান বা নাচ। বা অন্য কিছু। আমার তো সেসবের বালাই ছিল না। আমি বোনা শিখেছিলাম। আমার পাশে বাসার খালাম্মার কাছ থেকে। দরগাহ মহল্লা কলোনির পাঁচ নম্বর বাসার খালাম্মা। নাম জানি না খালাম্মার। তখনও জানতাম কিনা জানি না, এখন আর মনে নেই।

খালাম্মা সারাদিন উল বুনতেন। প্রতি বছর বুনতেন। আগের বছরের বোনা সোয়েটার খুলে দিতেন পরের বছর আর ডিম্বাকৃতি গোলা বানাতেন সেই খুলে নেওয়া সোয়েটারের উলের। হাতে পেচিয়ে পেচিয়ে। আমি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতাম সেই উলের গোলার দিকে, জানতাম, আবার নতুন কোনও ডিজাইন বুনবেন খালাম্মা। সাপ প্যাটার্ন খুলে হয়তো সোয়েটারে তুলবেন বকুল ফুল বা কদম ফুল। বা অন্য কোনও অচেনা ফুলের ডিজাইন। বা এমনি সাদামাটা সোজা উল্টো ঘর বুনবেন জোড়া কাঁটায়।

তখন আমার বোন মণি সদ্য জন্মেছে। আমি খালাম্মাকে বলেছি, মণির জন্যে ফ্রক বুনব। কত বড় আমি? বছর সাত বয়েস আমার। উল কে এনে দিয়েছিল আজ আর মনে নেই। কমলা রঙের ছিল সেই উল। উজ্জ্বল কমলা। কমলা আর সবুজ। আমি ফ্রক বুনি। কমলা রঙের ফ্রক সবুজ তার বর্ডার। গোটা গোটা বকুল ফুল ফুটে ওঠে সেই ফ্রকে, খালাম্মার নির্দেশনায়। মাঝে মধ্যেই ঘর ছুটে যায়, আমি ধরতে পারি না। খালাম্মা সেফটিপিন দিয়ে সেই ঘর তুলে দেন। মণি অনেকদিন পরেছিল সেই ফ্রক।

আমি একটা মাফলারও বুনেছিলাম। লাল রঙের উল দিয়ে।  গোটা মাফলারটাই বুনেছিলাম উল্টো বোনায়। কে পরেছিল সেই মাফলার আজ আর আমার মনে নেই। বছর বারো বয়েসে সেই শহর ছেড়ে অন্য শহরে চলে যাই আর তারও বছর দুই বা তিন আগে সে দরগাহ মহল্লা কলোনি ছাড়ি আমরা। তারপর আর কখনও সেই খালাম্মার সঙ্গে দেখা হয়নি। আমি দীর্ঘকাল স্বপ্নে দেখেছি তাঁকে। ভেবেছি তাঁকে। কিন্তু আর দেখা হয়নি কখনও।  আমারও আর কোনও সোয়েটার বোনা হয়নি কখনও। এখনও আমার স্বপ্নে আসেন তিনি..

আজকে মিষ্টি যখন বলল, অনলাইন নিটিং ক্লাসের কথা, আমি সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁ বললাম। তারপর ভাবলাম, কোথায় এই জুম ক্লাস আর কোথায় আমার খালাম্মার সেই দরগাহ মহল্লা কলোনির পাঁচ নম্বর বাড়ির সেই ঘর। কোথায় আমার সেই খালাম্মা যিনি সাত বছরের এক মেয়েকে দিয়ে ফ্রক বুনিয়েছিলেন আর কোথায় আজকের এই জুম ক্লাস, যিনি কিনা এক মাসে শেখাবেন এক স্কার্ফ বোনা। তার জন্যে আমি এই লকডাউনের বাজারে কোথায় গিয়ে উল-কাঁটা খুঁজব। যা কিনা আ্যমাজনেও আ্যভেলেবল নয়। মেয়েকে বললাম, থাক। পরে কখনও হবে হয়তো। যদি হয়। এখন থাক..

মনে পড়ে। মনে পড়ে যায়..

Wednesday, June 17, 2020

এইসব সেরে গেলে আমি বাড়ি যাব


এই সব সেরে গেলে আমি বাড়ি যাব। আম্মার কাছে। অসুস্থ, বিছানায় শুয়ে থাকা মাকে আমি এক বচ্ছর দেখিনি। আমাকে দেখে আম্মা হাচড়-পাচড় করে ওঠার চেষ্টা করবে আর উঠতে না পেরে পান্নাকে ডেকে বলবে, শরবত বানাইয়া দ্যাও গ। আমাকে ডাকতে হলে আম্মা  তার তিন মেয়ের নাম আগে নেবে আর তারপর আমার নাম নেবে।

আগে আগে, আম্মা যখন সুস্থ ছিল, আমি অভিমান করতাম এই আমাকে ডাকতে গিয়ে আম্মা তার অন্য মেয়েদের নাম নেয় বলে। এখন আর অভিমান করি না। এখন আম্মা নিজেই অভিমান করে আর সারাদিন মেয়েদেরকে ডাকে। অ মণি। অ বাবলি। অই নান্নি। আমার নাম অবধি আসতে আসতে আম্মা ভুলে যায়, কাকে ডাকছিল, কেন ডাকছিল। আবার অন্য কিছুর জন্যে অন্য কাউকে ডাকে। কাউকেই না পেয়ে অভিমানে পাশ ফিরে শোয়।

এই সব সেরে গেলে আমি যখন বাড়ি যাব, আব্বা গাছ থেকে বাতাবী লেবু পাড়িয়ে আনাবে আর পান্নাকে বলবে ভর্তা বানিয়ে দিতে। টক খেতে পারি না বলে আমি খেতে না চাইলে আব্বা বলবে, খাও খাও,জাম্বুরা খুব উপকারি ফল, আর ভিটামিন সি খাইলে করোনা হইত না। আব্বা আর আমি বারান্দায় টুলের উপর বসে পোড়া লাল মরিচ গুঁড়ো করে বানানো জাম্বুরার ভর্তা খাব।

এই সব সেরে গেলে আমি যখন বাড়ি যাব, তখন আব্বা আমাকে বলবে, তুমার লাগি কুরবানির গরুর গোশত রাখসি ফ্রিজে, একদিন সরিষার তেল দিয়া  ভুনা কইরা খাওয়াইও। বাড়ি গেলে আব্বার বায়না থাকে একবেলা রেঁধে খাওয়ানোর এবং সেই একবেলাটা একবেলাই। তার পরে আর আমার রান্নাঘরে যাওয়ার অনুমতি থাকে না। আমি আব্বার জন্যে সর্ষের তেল দিয়ে মেখে-জুখে ঝাল ঝাল করে সেই কবে থেকে তুলে রাখা মাংস রান্না করব। আর খেতে বসে আব্বা বলবে, খুবই মজা হইসে। সরিষার তেল দিয়া গোশতো রানলে তার মজাই আলাদা।

এইসব সেরে গেলে আমি যখন বাড়ি যাব, তখন বাবলির সঙ্গে একদিন টুকটুকে করে গ্রামের ভেতর ঘুরতে যাব। ডাকবাংলোর সামনে নদীর ধারে গিয়ে চানাচুর আর চিপস কিনে খাব। নৌকা করে আম্মার বাপের বাড়ি যাব। গ্রামের কোনও চায়ের দোকানে বসে সিঙাড়া আর চা খাব। কোনও এক ফসলের মাঠের ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখব। রাতে বাবলি আমার জন্য বাইম মাছের ভুনা আর রাজহাঁসের মাংস রাঁধবে।

এই সব সেরে গেলে আমি বাড়ি যাব...