Monday, April 27, 2020

করোনার কালে- ০২

জিরের গুঁড়ো শেষ হয়েছে বলে আজকে চিকেনের ঝোল হয়েছে জিরের গুঁড়ো ছাড়াই। গোটা জিরে রয়েছে, কাল গুঁড়ো করে নেব। বলার বিষয় হচ্ছে, জিরে ছাড়াও চিকেনটা খারাপ হয়নি। পাতলা ঝোল। দিব্য। সুমেরু করেছে।

ফ্রোজেন চিকেন এবং লাস্ট প্যাকেট।

টিভিতে অত লোকের বাজার যাওয়ার ছবি দেখে ভাবছি, কাল পরশু আমিও যাব একবার। আর কিছু না, দুধ ছাড়া চা খেতেই যা কিছু অসুবিধে। পাড়ার দুধের দোকান বন্ধ। বিগ বাস্কেট যে আবার কবে চাইলু হবে আর তাতে সব আবার কবে আ্য্যভেলেবল হবে, খোদা মালুম।

সিনেমা। কাল দুপুর থেকে প্রথমে চলল, গার্লফ্রেন্ড, তারপরে হইচইতে ব্যোমকেশের অগ্নিশলাকা আর তারপরে পিয়া রে। তিনদিন ধরে ব্রেক নিয়ে নিয়ে চলছে আলিনগরের গোলকধাঁধা। আজকে চলল পাঙ্গা আর সোয়েটার। মন্টু পাইলট ওয়েটিং এ আছে। আর ফাঁকে ফাঁকে এবিপি বাংলা।

একটু আগেই নন্দিতাকে ফোনে জিজ্ঞেস করছিলাম, এই লকডাউন শেষ হওয়া অবধি যদি বেঁচেও যাই, তবে মাথা ঠিক থাকবে তো আমার?

নন্দিতা খুবই আশাবাদী। বলল, সব ঠিক থাকবে, সব ঠিক হবে।

আপাতত এই।





২৭.০৩.২০২০

করোনার কালে

গত পরশু সুমেরু দুধ কিনতে গিয়ে ফিরে এসেছে, এমনি দোকানে দুধ তো নেইই, মাদার ডেয়ারির বুথেও নেই। মাদার ডেয়ারি থেকে অবশ্য বলে দিল, দুধ চাইলে বিকেল ৫টায় আসবেন, তখন দুধের গাড়ি আসে, তবে দেরি হলে আর পাবেন না, ফুরিয়ে যাবে। তো বিকেল পাঁচটায় আর যাওয়া হয়নি, আমি কালো চা-ই খেতে লাগলাম।

আজকে দুধের কথা সুমেরুকে বলতে সে আর নীচে নেমে দোকানে যেতে রাজি হল না, তবে ওই মাদার ডেয়ারির দোকানে ফোন করল, এবং জানা গেল,  সব দুধ ফুরিয়ে গেছে! দোকানি ভদ্রলোক বলে দিলেন, বেলা একটায় গাড়ি আসবে, এসে নিয়ে যাবেন। সেই মতো আমি সোয়া একটা নাগাদ দোকানে গেলাম। পাড়ার দুটো দোকানের একটা বন্ধ, আর একটায় দুধ নেই বলে জানালেন দোকানি। রাস্তায় খুব একটা লোকজন নেই।

দোকানে গিয়ে দেখা গেল, দুধের গাড়ি এখনো আসেনি। যে ভদ্রমহিলা দোকান সামলান, তিনি বললেন, একটায় আসার  কথা, কিন্তু দুটোর আগে একদিনও আসে না। আমি সেখানেই অপেক্ষা করে দুধ নিয়েই আসব বলে ছায়া দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ইতোমধ্যে দোকানে এক ভদ্রলোক এলেন, তিনি ফ্রোজেন চিকেনের জন্যে আগে থেকে বলে রেখেছিলেন, নিতে এসেছেন। দেড় কিলো চিকেন (ওটুকুই ছিল দোকানে) নিলেন আর ডিম নিলেন দেড় ক্রেট। হ্যাঁ, দেড় ক্রেট মানে ৪৫টা ডিম। দু ক্রেট ডিমই ছিল দোকানে, বাকি পনেরোটা থেকে ১২টা আমি নিলাম, দোকানে রইল বাকি ৩টে।

দুধের গাড়ি যখন এল, তখন সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে যেন কয়েকটা মোটর বাইক এসে হাজির হল, সবাই দুধ নেবে। মনে হল, দুধের গাড়ির জন্যে সবাই যেন অপেক্ষা করছিল এদিক সেদিক, গাড়ি আসতে দেখে সকলেই এসে হাজির হয়েছে একযোগে।  ৮ক্রেট দুধের জায়গায় দুধ এল ২ক্রেট এবং সঙ্গে সঙ্গে খালিও হয়ে গেল।

বাবুলালের দোকান থেকে এক প্যাকেট  গুঁড়ো দুধ কিনে বাড়ি ফিরলাম।

এই হল গিয়ে অবস্থা।।

সবাই ভাল থাকুন

চার বছর পর আজ দু দিন খবরের কাগজ পড়ছি করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত খবরের জন্যে। টিভিতেও খবর দেখছি।

 পুরুলিয়া গেছিলাম নন্দিতার বাড়িতে, ছুটি কাটাতে। নন্দিতা এখন কাটোয়া থেকে পুরুলিয়ায়। সিধো কানহো ইউনিতে। দোলের ছুটিতে আমরা গেছিলাম সেখানে। অযোধ্যা পাহাড় আর হাস (আবার ভুলে গেছি চন্দ্রবিন্দু কি করে দেয়) আমার কাছে সমার্থক। যদিও মাঝপথে একটি দিশি মুরগি ছিল। কিন্তু একটি লেডিস টয়লেট খুজে  (আবার চন্দ্রবিন্দু) না পাওয়ার ফলে সে দিশি মুরগা বড়ই বিস্বাদ ঠেকেছিল। তো ফেরার পথে এক হাট।যদিও দু'দিন ধরে আমার চোখের সমুখে আর মাথায় নাচছিল চার কিলোর  আড়াই হাজারি  দিশি ষাড়া (আবার চন্দ্রবিন্দু)। কিন্তু রেস্ত না থাকায় সে শুধু গল্পেই থেকে গেল। মান রাখল সেই হাট। একটা হাস (চন্দ্রবিন্দু সহ পড়ুন), যা কিনা চিমসে আর আদ্ধেক পালক সমেত।

একবার ভাবলাম কিলো দুয়েক (ড্রেসড) কিনে নিয়ে ফ্রোজেন করে কলকাতায় নিয়ে আসি। (৪০০ পার কিলো)।  আবার ভাবলাম,থাক, যেখানকার যা। তো সবদিক বিবেচনা করে এক কিলো ব্যগস্থ হল(পরদিন ফেরার ট্রেন)। রাতে আর রান্না করতে ইচ্ছে করল না। কাঈফের দোকানের চিকেন বাটার মসালা, যা কিনা আদতে শুধুই মসালা, সেই দিয়েই আমার রাতের ক্ষুণ্ণিবৃত্তি। বাকিদের জন্যে অবশ্য অন্য ব্যবস্থা ছিল। সে যাই হোক।

পরদিন সেই হাস (আবার চন্দ্রবিন্দু) রান্না করতে গিয়ে আমার যাকে(উইথ চব্দ্রবিন্দু) মনে পড়ছিল, তিনি শরবত আলি (অতঃপর অন্তঃপুরে দ্রষ্টব্য)। আমি একটু নুন চাখতে গিয়েই বুঝতে পারলাম, এ যে সে হাস(হায় চন্দ্রবিন্দু) নয়, এ তো সেই শরবত আলির হাস (উইথ চন্দ্রবিন্দু)!

অনিবার্য কারণবশত বোকাকে ফিরে আসতে হয়েছিল ট্যুরের শুরুতেই, ফলে তার জন্যে কৌটোবন্দি হয়ে কলকাতা এল সেই হাস ( হায় চন্দ্রবিন্দু)। প্যাকেটবন্দি জিঞ্জার গার্লিক পেস্ট আর নো গরম মশলা দিয়ে রান্না। আমি অন্তত দু যুগ পর খেলাম এই স্বাদু হাস। স্যরি টু হরিণঘাটা

একদিন পর বাড়ি থেকে বেরোলাম। কলেজ স্ট্রিট। দিব্য লোকজন রয়েছে। দে'জে যথারীতি ভীড়। এবং ভীড় আমার যোগা ক্লাসেও। করোনা আতঙ্ককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেখানে সবাই ব্যায়াম করছেন। যোগা ক্লাস থেকে ফেরার পথে আমি সাধারণত একবার তালতলা বাজারে যাই। সবজি কিনি, মুরগি কিনি।  আজ গেলাম না। ইচ্ছে করল না।

ছেলেটা ব্যঙ্গালোরে প্রায় গৃহবন্দি। ইউনিভার্সিটি বন্ধ অনির্দিষ্ট কালের জন্যে। খানিকটা স্বস্তি যে মেয়ে পুণেতে আছে, তার এই সপ্তাহটা ওয়ার্ক ফ্রম হোম (অফিস বম্বেতে)।      আমি বহুকাল বাদে খবর পড়ছি, টেলিভিশনেও দেখছি।

 দুপুরে পুইশাক (আবার চন্দ্রবিব্দু!) করেছি চিংড়ি আর মিষ্টি কুমড়ো দিয়ে। যদিও ফ্রিজে অনেক কিছু আছে কিন্তু একা বলে খেতে ইচ্ছে করল না।

 হটস্টারে তানাজি। ভাল লাগছে না। বিকেল থেকে পরপর হাচি ( আবার চন্দ্রবিব্দু!)।

সবাই ভাল থাকুন...





16.03.2020

খবর আমার পিছু ছাড়ে না

আমার আজকাল খুব ভয় করে। সাধারণত আমি কোলাপসিবল গেট বন্ধ করি না। দরজায় ছিটকিনি। বরাবর ওটুকুই যথেষ্ট বলে মনে হয় আমার। কিন্তু এই দু/তিন দিন, আমার খুব টেনশন হয় রাতে।৷ মনে হয়, কোলাপসিবল বন্ধ করি, তালা দিই। কাল অব্দি দিইনি। কিন্তু আজ দিলাম।৷ ভয় করে বড্ড। যদিও আমার বাড়ির সামনের ঘরটিতেই একজন পৈতেধারী বৃদ্ধ আছেন, কিন্তু ভরসা পাওয়ার জন্যে সেটুকু যথেষ্ট বলে মনে হচ্ছে না আমার। যদিও দিল্লি অনেক দূর কিন্তু তবুও আমার ভয় করে খুব।

গত সাড়ে তিন বছর আমি খবরের কাগজ পড়ি না। আমার ডিপ্রেশন হয়। আমার বাড়ির কেবল টিভির কানেকশন আমি কাটিয়ে দিয়েছি। খবর আমি সহ্য করতে পারি না। কারণটা যদিও ব্যক্তিগত। ব্যক্তিগত একটি কারণে আমি যবতীয় দুঃসংবাদ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি। রাখি। খারাপ খবর আমি সহ্য করতে পারি না। আমার বুক ধড়ফড় করে। আমি ঘুমের মধ্যে চিতকার করে উঠি। আমার প্যানিক আ্যটাক হয়। আমি ভয় পাই। আমার ডিপ্রেশন হয়। আমাকে ওষুধ খেতে হয় ডিপ্রেশনের। আমি তাই মুখ ফিরিয়ে থাকি যাবতীয় দুঃসংবাদ থেকে।

কিন্তু খবর আমার পিছু ছাড়ে না। ফেসবুক জুড়ে শুধু খবর আর খবর। দিল্লির খবর। রায়টের খবর। গণহত্যার খবর। আগুন জ্বলার খবর। ছবি। ভিডিও। খবর। আমি কত মুখ ফিরিয়ে থাকব! চারিদিকে শুধু খবর আর খবর। টিভি চলে না। রেডিয়ো নেই। তবু খবর। তবু দুঃসংবাদ। আগুন জ্বলার খবর। মানুষ মারার খবর। মসজিদ ভাঙার খবর। মুসলমান নিধনের খবর। লোকের প্যান্ট খুলে তার ধর্ম দেখার খবর। আমি দুই চোখ বন্ধ করে রাখি। দুই হাতে কান বন্ধ করে রাখি। তবু খবর আমার পিছু ছাড়ে না। আমার খুব ভয় করে। ভীষণ ভয়। হাড় হিম করা ভয়। কারণ আমি ধর্মে মুসলমান।

আমি কোথায় যাব???


26.01.2020