Monday, October 01, 2012

'হে রাম এ যে কুচো চিংড়ি গো!'


Photo: প্রাতঃভ্রমণের সঙ্গী শিখাদি এন্ড মি, প্রায় প্রত্যহ বোটানিকাল গার্ডেন একনম্বর লঞ্চঘাটের বাঁধানো সোপানে বসিয়া  চা পান করি। শিখাদি মাছের নৌকা দেখিলেই উচাটন হয়, প্রায় রোজই। সুবর্ণরেখাকে মনে করে, সেই নদীর মৎসকূলকে স্মরণ করিয়া দুঃখী হয়। আজ এক পাইকার ঘাটে দাড়াইয়া ওদূরে নোঙর ফেলিয়া দাঁড়াইয়া থাকা একখানি ছোট্ট  জেলে নৌকার সমুখে দাঁড়ানো শাট-পেন্টুলুন পরিহিত এক সজ্জনের সহিত মোবাইল করিতেছিলেন। শিখাদি সেই মোবাইল-কথার মর্ম উদ্ধার করিল, অই নৌকায় বড় বড় গলদা আছে। এবং তাহা গঙ্গার জলের চাইতেও সস্তায় নৌকামালিক বিক্রি করিতেছে। শিখাদি এবং মৎস্য পাইকার খানিক বার্তালাপ করিল, পাইকার ভরসা দিল, এখনি নৌকা তীরে আসিবে এবং পাইকার আমাদিগকে গলদা ক্রয় করিয়া দিবে। ইহাতে কোন গলদ নাই। আমি এন্ড শিখাদি দুইজনাই প্রাতঃভ্রমণের ছোট্ট ছোট্ট বটুয়াগুলি খুলিয়ে পয়সা গুনিয়া লইলাম। পাইকার যা মূল্য শুনাইয়াছে তাহাতে শিখাদি এক সের পরিমান এবং আমি আধাসের পরিমান ক্রয় করিয়াই ফেলিব! চায়ের মূল্য আগামীকল্য মিটাইলেই হইবে এমন ভরসা চা-দিদি দিলেন।

ইতিমধ্যে নৌকার সমুখে দাঁড়িয়ে থাকা সজ্জন ঘাটে য়াসিলেন এবং আমাদিগকে হস্ত-পদ-শুঁড় সঞ্চালনকারী গলদার দর্শন করাইয়া ঘাটে  অবস্থানকারী  পাইকার মহাশয়ের কর্ণে কোন এক মন্ত্র দিলেন এবং দুইজনাই একখানি দ্বিচক্রযানে চড়িয়া নিমেষেই অন্তর্হিত হইলেন। 

শিখাদি প্রবল ব্যস্ত হইয়া পাইকার মহাশয়ের খোঁজ করিতে লাগিল কিন্তু তাঁহার টিকির দর্শনও আর পাওয়া গেল না। এতক্ষণ ধরিয়া পাইকার মহাশয় আমাদিগকে যে আশ্বাসবাণী শুনাইতেছিল  নির্দ্বিধায় সেই বাণীতে বিশ্বাস করিয়া শিখাদি তাহার পাদুকা এবং আমি আমার গাম্বুটজোড়া খুলিয়া তীরে রাখিয়া প্রায় হাঁটুসমপরিমান কর্দমায় পদযুগল রাখিলাম। মনে আশা অন্য কোন সজ্জন পৌঁছাইয়া ঐ গলদা ঝোলাগত করিবার পূর্বেই আমরা ক্রয় করিয়া ফেলিব। তীর হইতে বিহারি চা-দিদিমণি চেঁচাইতে লাগিলেন, ও দিদি, পড়ে গেলে যে হাত-পা ভাবগিয়া যাইবে যে গো! সেদিকে কর্নপাতমাত্র না করিয়া আমরা নৌকার সন্নিকটে পৌঁছাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম এবং এক সময় পৌঁছাইয়াও গেলাম! এমন সময় বেশ ছোট্টমতন একখানা হড়কা বান আসিল এবং জলের অল্প দূরে অবস্থানকারী আমরা এই বান দেখিয়া বেশ পুলকিত বোধ করিলাম। শিখাদি প্রায় দিনই আসসোস করিয়া থাকে, একদিনের তরেও জোয়ার দেখিতে পায় না বলিয়া। আজ জোয়ার না হউক, বান দেখিয়া সে যারপরনাই প্রীত হই্ল। 

নৌকা হইতে মৎসশিকারী আমাদিগকে যে চিংড়ির দর্শন করাইল, তাহাকে গলদা বলিবার মত গলদ কর্ম এমনকি শিখাদিও করিয়া উঠিতে পারিল না, আকুলকন্ঠে অস্ফুটে কহিতে পারিল শুধু, 'হে রাম এ যে কুচো চিংড়ি গো!'

এই প্রকার সেই প্রকার কোন প্রকারে আমরা কাদা ঠেলিয়া একটিও আছাড় না খাইয়া ঘাটে ফিরিয়া আসিলাম এবং গঙ্গাস্নানে নিমগ্ন পিতা-পুত্রের যৎপ্রোনাস্তি বিরক্তির উদ্রেক করিলাম বাঁধানো সোপানে পদযুগল হইতে কাদা ধুইবার অভিলাষ প্রকাশ করায়। অই স্থানে তাহাদের দ্রব্যাদি রহিয়াছে, জল-কাদায় যাহা নোংরা হইবার প্রব সম্ভাবনা!  চা দিদির আগাইয়া দেওয়া বালতির জলে যতটুকু সম্ভব কাদা পরিস্কার হইল। সহৃদয় বৃদ্ধের আগাইয়া দেওয়া গামছাখানিতে পা মুছিয়া গাম্বুট পরিয়া যৎপরোনাস্তি আমোদ প্রাপ্তি করিয়া অদ্যকার প্রাতঃভ্রমণ সম্পন্ন হইল!প্রাতঃভ্রমণের সঙ্গী শিখাদি এন্ড মি, প্রায় প্রত্যহ বোটানিকাল গার্ডেন একনম্বর লঞ্চঘাটের বাঁধানো সোপানে বসিয়া চা পান করি। শিখাদি মাছের নৌকা দেখিলেই উচাটন হয়, প্রায় রোজই। সুবর্ণরেখাকে মনে করিয়া, সেই নদীর মৎসকূলকে স্মরণ করিয়া দুঃখী হয়। আজ এক পাইকার ঘাটে দাড়াইয়া  অদূরে নোঙর ফেলিয়া দাঁড়াইয়া থাকা একখানি ছোট্ট জেলে নৌকার সমুখে দাঁড়াইয়া থাকা  শাট-পেন্টুলুন পরিহিত এক সজ্জনের সহিত মোবাইল করিতেছিলেন। শিখাদি সেই মোবাইল-কথার মর্ম উদ্ধার করিল, অই নৌকায় বড় বড় গলদা আছে। এবং তাহা গঙ্গার জলের চাইতেও সস্তায় নৌকামালিক বিক্রি করিতেছে। শিখাদি এবং মৎস্য পাইকার খানিক বার্তালাপ করিল, পাইকার ভরসা দিল, এখনি নৌকা তীরে আসিবে এবং পাইকার আমাদিগকে গলদা ক্রয় করিয়া দিবে, ইহাতে কোন গলদ নাই। আমি এন্ড শিখাদি দুইজনাই প্রাতঃভ্রমণের ছোট্ট ছোট্ট বটুয়াগুলি খুলিয়া পয়সা গুনিয়া লইলাম। পাইকার যা মূল্য শুনাইয়াছে তাহাতে শিখাদি এক সের পরিমান এবং আমি আধাসের পরিমান ক্রয় করিয়াই ফেলিব! চায়ের মূল্য আগামীকল্য মিটাইলেই হইবে এমন ভরসা চা-দিদি দিলেন।

ইতিমধ্যে নৌকার সমুখে অবস্থানকারী  সজ্জন ঘাটে  আসিলেন এবং পরম হর্ষে আমাদিগকে হস্ত-পদ-শুঁড় সঞ্চালনকারী গলদার দর্শন করাইয়া ঘাটে অবস্থানকারী পাইকার মহাশয়ের কর্ণে কোন এক মন্ত্র দিলেন এবং দুইজনাই একখানি দ্বিচক্রযানে চড়িয়া নিমেষেই অন্তর্হিত হইলেন।

শিখাদি প্রবল ব্যস্ত হইয়া পাইকার মহাশয়ের খোঁজ করিতে লাগিল কিন্তু তাঁহার টিকির দর্শনও আর পাওয়া গেল না। এতক্ষণ ধরিয়া পাইকার মহাশয় আমাদিগকে যে আশ্বাসবাণী শুনাইতেছিলেন নির্দ্বিধায় সেই বাণীতে বিশ্বাস করিয়া শিখাদি তাহার পাদুকা এবং আমি আমার গাম্বুটজোড়া খুলিয়া তীরে রাখিয়া প্রায় হাঁটুসমপরিমান কর্দমায় পদযুগল রাখিলাম। মনে আশা অন্য কোন সজ্জন পৌঁছাইয়া ঐ গলদা ঝোলাগত করিবার পূর্বেই আমরা ক্রয় করিয়া ফেলিব। তীর হইতে বিহারি চা-দিদিমণি চেঁচাইতে লাগিলেন, ও দিদি, পড়ে গেলে যে হাত-পা ভাঙ্গিয়া যাইবে যে গো! সেদিকে কর্নপাতমাত্র না করিয়া আমরা নৌকার সন্নিকটে পৌঁছাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম এবং এক সময় পৌঁছাইয়াও গেলাম! 

এমন সময় বেশ ছোট্টমতন একখানা হড়কা বান আসিল এবং জল হইতে অল্প দূরত্বে অবস্থানকারী আমরা এই বান দেখিয়া বেশ পুলকিত বোধ করিলাম। শিখাদি প্রায় দিনই আসসোস করিয়া থাকে, একদিনের তরেও জোয়ার দেখিতে পায় না বলিয়া। আজ জোয়ার না হউক, বান দেখিয়া সে যারপরনাই প্রীত হই্ল।

নৌকা হইতে মৎসশিকারী আমাদিগকে যে চিংড়ির দর্শন করাইল, তাহাকে গলদা বলিবার মত গলদ কর্ম এমনকি শিখাদিও করিয়া উঠিতে পারিল না, আকুলকন্ঠে অস্ফুটে কহিতে পারিল শুধু, 'হে রাম এ যে কুচো চিংড়ি গো!'

এই প্রকার সেই প্রকার কোন প্রকারে আমরা কাদা ঠেলিয়া একটিও আছাড় না খাইয়া ঘাটে ফিরিয়া আসিলাম এবং গঙ্গাস্নানে নিমগ্ন পিতা-পুত্রের যৎপরোনাস্তি বিরক্তির উদ্রেক করিলাম বাঁধানো সোপানে পদযুগল হইতে কাদা ধুইবার অভিলাষ প্রকাশ করায়। অই স্থানে তাহাদের পরিধেয় দ্রব্যাদি রহিয়াছে, জল-কাদায় যাহা নোংরা হইবার প্রবল সম্ভাবনা! চা দিদির আগাইয়া দেওয়া বালতির জলে যতটুকু সম্ভব কাদা পরিস্কার হইল। সহৃদয় বৃদ্ধের আগাইয়া দেওয়া গামছাখানিতে পা মুছিয়া গাম্বুট পরিয়া যারপরনাই আমোদ প্রাপ্তি করিয়া অদ্যকার প্রাতঃভ্রমণ সম্পন্ন হইল!

Sunday, September 23, 2012

জ্বরবেলা এখন ও তখন

দিনকাল কত বদলে গেছে কিন্তু কিছু জিনিস এখনও বদলায়নি। বদলায়নি আমার ঠকঠকিয়ে কাঁপুনি দিয়ে ভালুকজ্বর আসা। ছেলেবেলার মত মনে হওয়া যে -দাঁতকপাটি লাগছে, ভেতরে ভেতরে অসম্ভব কাঁপুনি, অথচ শরীর কাঁপে না একটুও। জ্বরের ঘোরে মুহূর্তে মুহূর্তে চমকে ওঠা, ভয় পাওয়া, মনে হওয়া যে কারা যেন ঘরের মধ্যে হেঁটে-চলে বেড়াচ্ছে। ঘোরের মধ্যে চোখের সামনে নানান রঙের আলোর বলয়দের ঘুরে বেড়ানো, গোল গোল ঝিলিমিলি আলো, এঁকে-বেঁকে যাওয়া সব রামধনু আলো, খুব কান্না পাওয়া, আব্বার সঙ্গে কথা বলতে চাওয়া, আম্মার মশলার গন্ধওয়ালা হাত আর আঁচল খোঁজা –যা ভিজিয়ে আম্মা জ্বরতপ্ত মুখ-গলা, হাত-পা মুছিয়ে দিত, তপ্ত দুই চোখের উপর রেখে দিত সেই আঁচল, প্রিয় মানুষের হাতের স্পর্শ পাওয়ার ইচ্ছেগুলো বদলায়নি একটুও...

যা বদলেছে -এখন জ্বর এলে ইন্দোদাদা-কে একটা ফোন করি, ইন্দোদাদা ওষুধ বলে দেয়, কখনও কিছু পরীক্ষা করতে বলে, কখনও শুধু ওষুধ বলে দেয়,বাবু সেগুলো লিখে নেয়। সেই ওষুধ একবার মাত্র খেলেই জ্বর ‘নরম' হয়ে যায়। -এই ‘জ্বর নরম’ কথাটা আমার দাদি বলত।  ওষুধ খেয়ে দু'দিনের মাথায় আমি হেঁটে-চলে বেড়াই, ঘরের কাজ-কম্ম করি, ফেসবুকে নোট লিখতে বসি। ইন্দোদাদার ফোনে বাৎলানো বিধান অনুযায়ী প্রচুর পরিমানে ওআরএস খাওয়ার ফলে দুর্বলতাও থাকে না। আমার ছেলে বলে –ইন্দো ডাক্তার জিন্দাবাদ!

ডাক্তার প্রসঙ্গে গতকাল রাত থেকেই মনে পড়ছে আমাদের গাঁয়ের এক ডাক্তারবাবুর কথা। এক বর্ষাকালের কথা, অনেক চেষ্টা করেও আমি সেই ডাক্তারবাবুর নাম মনে করতে পারছি না। বহু বহু বছর আগের কথা। সেবছর ছুটিতে বাড়ি গিয়ে কিছুতেই আব্বা-আম্মার সঙ্গে সিলেট ফিরতে চাইলাম না। আরও একটা সপ্তা থেকে যাওয়ার জন্যে রাত থেকেই কান্নাকাটি, সকাল হতেই দাদির খাটের তলায় লুকিয়ে থাকা, স্কুল শুরু হতে এখনও তো এক সপ্তাহ বাকি, কাকা নাহয় পৌঁছে দিয়ে আসবে গিয়ে। শেষমেশ দাদির কথায় আব্বা রাজী হল রেখে যেতে। আমিও বেরিয়ে আসি খাটের তলা থেকে। ভরা বর্ষা। চারিদিকে থৈ থৈ পানি, একটুখানি জেগে আছে শুধু পুকুরের পারগুলো আর বড় রাস্তা অব্দি যাওয়ার কাঁচা সড়ক।

রোদের দেখা নেই, সারাদিন আকাশের মুখ ভার হয়ে থাকে, থেকে থেকেই অঝোর বৃষ্টি। পুকুরের পশ্চিমপারের বাঁশঝাঁড়ের ওধারের খালে টলটলে জল, জলের ভেতর দেখা যায় শ্যাওলায় ঢাকা নানান রকমের লতা-গুল্ম। মনে প্রবল বাসনা, এই খালে নেমে সাঁতার কাটব, বারবার বাড়ির দিকে তাকাই, কাকা কোথায়? কদ্দূর গেছে? দেখতে বা জানতে পেলে আর রক্ষে নেই –এই ভেবে নিজেকে বিরত রাখি খালে নামা থেকে। খানিক দূরে তাকালেই ডুবে যাওয়া সব ক্ষেত-খামার, মৃদু বাতাসে ঢেউ খেলা টলটলে জল, আকাশের মেঘের ছায়া পরে যা কালচে দেখায়। আরেকটু দূরে নজর করে তাকালে দেখা যায় শাপলা বিল। গোটা বিল জুড়ে শাপলা ফুটে থাকে বলে বিলের নামই শাপলাবিল। যেদিন আকাশ একটু পরিষ্কার থাকে, বৃষ্টি থেমে যায়, দাদিকে বললেই বিকেল বেলায় মজিদ ভাইকে নিয়ে নৌকায় করে শাপলা বিলে যাই আমি আর দাদি। দাদি সঙ্গে নেয় রেডিও। নৌকার ধারে বসে আমি টেনে টেনে সব শাপলা তুলি, শালুক খুঁজি, পুড়িয়ে খাব বলে। দাদি ভয় দেখায়, পানির দিনে নাকি সাপেরা থাকার জায়গা পায় না তখন এই সব শাপলাদের গায়ে গায়ে বিষওয়ালা সাপেরা সব জড়িয়ে থাকে, একবার কামড়ে দিলেই শেষ! খানিক শান্ত হয়ে বসে থাকা আবার শাপলা টেনে টেনে নৌকা ভর্তি করা।

সমস্ত দিনে অসংখ্যবার পুকুরে স্নান, পাড়ায় এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়ানো আরও অনেক রকম কাজ-কর্ম করে সন্ধে হলেই চাচির বিছানায়। থালায় ভাত নিয়ে হ্যারিকেনের আলোয় পাখির ডিম, মুরগির ডিম, ময়নার ডিম সব খাওয়ায় চাচি আর গল্প শোনায়। কখন যেন ডিমগুলো সব শেষ হয়ে যায়! চাচি উঠে যায় থালা নিয়ে, আমি গিয়ে দাদির বিছানায় দাদির কোল ঘেঁষে শুয়ে পড়ি। দাদি খানিক গল্প বলে, বিবিদের কিস্‌সা, নবী-রাসুলদের গল্প, আজুজ-মাজুজের কিস্‌সা। এক একদিন একটা গল্প। দাদির হাতে সমানে ঘোরে বাড়িতে বোনা তালপাতার পাখা। আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের মধ্যেও দাদি কেমন করে যেন সারারাত পাখা ঘোরায়। একটুও গরম লাগে না আমার!

কাকা বাড়ি না থাকলে ঘন্টার পর ঘন্টা পুকুরে পড়ে থাকতাম। বাড়ি গেলেই চাচির কাপড়কাটা কাঁচি নিয়ে মাথার চুলের গোছা ধরে কচ কচ করে সব চুল কেটে ফেলতাম, পিঠ অব্দি লম্বা চুল ভিজে থাকে, জলদি শুকায় না, আর কাকা বাড়ি এসে সবার আগে চুলেই হাত দেয়, চুল বিকেল অব্দি ভেজা থাকা মানেই সারাদিন আমি পুকুরে ছিলাম! ছোট চুল তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায় বলে এভাবে চুল আমি প্রত্যেকবারেই কেটে ফেলি, যখনই বাড়ি যাই। এবড়ো-খেবড়ো চুল চাচি পরে সমান করে ছেঁটে দেয় ছেলেদের মতন করে। কাকার কাছে তবুও রক্ষে নেই, ছোট চুল দেখলেই বুঝে যায় কেন এই চুল কাটা হল। মারে না যদিও কিন্তু চোখ লাল করে এমনভাবে তাকায় যে শরীরের সব সব রক্ত পানি হয়ে যায় দুই মিনিটেই! চাচির পেছনে গিয়ে চাচির কোমর জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি যতক্ষণ কাকার গজগজানি শোনা যায়। প্রত্যেক বার একটাই কথা দিয়ে থামে, ‘বর্ষাইত্যা পানি, জ্বর-জারি হইলে ডাক্তর পামু কই? এই শয়তানেরে ভাইসাবে কিয়ের লাইগ্যা যে থুইয়া গেসে আল্লায় জানে! বারে বারে কইসি, লগে লইয়া যান, বাড়িত থাকলে কেউর কতা হোনে না!’

এবং জ্বর আসে। ধুম জ্বর। ঘরে ঘরে তখন থার্মোমিটার থাকে না, আমাদের বাড়িতে যদিও ছিল কিন্তু চাচির ছেলের আবার পারদ ভীষণ পছন্দ! থার্মোমিটার বাড়িতে এলেই ধান্দায় থাকে, কতক্ষণে ওটা হাতে পাওয়া যাবে। পারদকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে আবার জুড়ে দেওয়া, গোটা পারদটাকে খাতার পাতা ছিঁড়ে তাতে তুলে নিতে আমার যে ভাল লাগে না এমন নয় কিন্তু একটা আস্ত থার্মোমিটার আমি ভেঙ্গে ফেলি না পারদের জন্যে। ওগুলো ভাইয়া আর চাচির ছেলে জুন্নুনের কাজ। পারদ দিয়ে খেলা চলে অতএব জ্বর কত দেখার উপায় নেই।

এদিকে পানি বাড়ছে দিনে চার আঙ্গুল তো রাতে আট আঙ্গুল। এগুলো কাকার হিসেব। তাঁর চিন্তা পুকুর আর পুকুরের মাছেদের নিয়ে।  পুকুরের পার ডোবে ডোবে অবস্থা। বড় রাস্তায় যাওয়ার যে একমাত্র সড়ক সে নাকি অনেক জায়গাতেই ডুবে গেছে। কাকা সারাদিন ব্যস্ত জাল দিয়ে গোটা পুকুর ঘেরায়, প্রচুর মাছ আছে পুকুরে, একটা পার ডোবা মানেই সমস্ত মাছ বেরিয়ে প্রথমে খালে আর তারপর যে যেদিকে পারে ছুট লাগাবে। সারা রাত কাকা একহাতে পাঁচ ব্যটারির বড় টর্চ অন্য হাতে লাঠি নিয়ে  পুকুর পারে ঘুরে ঘুরে খালের জল মাপে। পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে আমার জ্বর। দাদি সারাদিন বসে থাকে মাথার কাছে, কপালে-গলায় হাত দিয়ে জ্বএ দেখে, বুঝতে না পেরে নিজের গাল ঠেকায় আমার গালে কপালে, বলে, ‘খৈ ফুটতাসে গো জ্বরে!’ মাথায় পট্টি দেয় আর গজগজ করে, ‘মিন্টুইন্যা যে বকে তোরে এমনি এমনি বকে? অহন ভোগান্তিডা কার অইত্যাসে?’

বিছানার উপরে অয়েলক্লথ বিছিয়ে মাথা বিছানার কিনারায় রেখে মেঝেতে রাখে বড় গামলা, তারপর কলসির পর কলসি পানি ঢালি চাচি দিনে দু-তিনবার করে। জ্বর খানিকটা নামে, আবার ধুম জ্বর। বাজারে বসেন সেই ডাক্তারবাবু। গ্রামের একমাত্র ডাক্তার। এলএমএফ ডাক্তার। কাকা নৌকায় করে গিয়ে ওষুধ নিয়ে আসে। কাগজ কেটে দাগ দিয়ে আঠা দিয়ে আটকানো কাঁচের শিশিতে রাখা লাল রঙের মিক্সচার, কাগজে মোড়ানো সাদা সাদা বড়ি। যেমনি তেতো সেই মিক্সচার, ঠিক ততখানিই তেতো সেই সাদা বড়ি, খেলেই ওয়াক আসে। গাছের গন্ধরাজ লেবু দিয়ে শরবত বানিয়ে খাওয়ায় চাচি, আমি খেয়েই হড়হড়িয়ে বমি করি। আবার ঝিম মেরে পড়ে থাকি। চোখের সামনে নানান রঙের আলোর বলয়। লাল, নীল, সোনালী, হলুদ। কখনও তারা ঘুরে বেড়ায় ঘরময়, কখনও স্থির দাঁড়িয়ে থাকে চোখের সমুখে। একই আকারের থাকে না আলোগুলো। ভাংচুর চলতেই থাকে। কখনো লম্বা রেখা হয়ে ঘুরে বেড়ায় আশে-পাশে, আবার কখনও সাতরঙা রামধনু হয়ে যায়।

আমি আলো দেখে দেখে ক্লান্ত। ভয় লাগে। আম্মার কাছে যেতে চাই। কাকা এসে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। দাদি দোয়া পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে সেই পানি খাওয়ায়, আমি আবার বমি করি। ঘোরের মধ্যে মনে হয় যেন চোয়াল দুটো ঢুকে যাচ্ছে একটার ভেতর আরেকটা। যেন দাঁত কপাটি লাগছে। কথা বলার চেষ্টা করি, পারি না। ভেতরে ভেতরে কাঁপুনি শুরু হয় গোটা শরীর জুড়ে। প্রচণ্ড ভয় লাগে, জানি, একবার কথা বলে ফেলতে পারলেই চলে যাবে এই কাঁপুনি, চোয়াল খুলে যাবে কিন্তু পারি না, স্বর ফোটে না। চোখ দিয়ে জল গড়ায় আপনা থেকেই। একসময় থামে কাঁপুনি, খুলে যায় চোয়াল, শক্ত করে চাচিকে ধরে থাকি, ‘চাচিআম্মা, আমার ডর করে।’ বিছানা থেকে তুলে কোলে নিয়ে বসে চাচি। কাকাকে বলে, ‘বিকালে গিয়া ডাক্তরবাবুরে লইয়া আইও, আমার ভালা ঠেকত্যাসে না, ভাইসাবেরে খবর দ্যাও।’

ডাক্তারবাবু আসেন। পরনে হাফহাতা সাদা ফতুয়া আর সাদা ধুতি, বিশাল লম্বা ঢ্যাঙ্গা চেহারা, ধনুকের মতন বাঁকানো নাক। দাদার কাছাকাছি বয়েস কিন্তু দাদার চেয়ে অনেক বেশি শক্ত। ছোটোখাটো কিছু হলে কাকা গিয়ে বলে ওষুধ নিয়ে আসে, অসুখ সেরে যায়, বাড়াবাড়ি হলে কাকা গিয়ে বাড়ি নিয়ে আসে তাঁকে। আমাদের বাড়ি থেকে দেড়মাইল দূরের বাজারে তাঁর ওষুধের ডিসপেন্সারি, ওখানে বসেই রোগীও দেখেন। এমনি দিনে দেড় মেইল দূরের বাজার থেকে লম্বা লম্বা পা ফেলে হনহনিয়ে হেঁটে চলে আসেন, কাকা হেঁটে পারে না তাঁর সঙ্গে, কিন্তু এই বন্যায় বড় রাস্তা থেকে  আমাদের বাড়ি অব্দি একমাইলের  কাঁচা সড়ক পানির তলায়, কাকা নৌকা করে যায়, বেঁধে রাখে রাস্তার ধারে খালে অন্য আরও অনেক নৌকার সঙ্গে, খাল যেখান থেকে এগিয়ে গেছে তিতাসের দিকে।

পরপর তিনদিন আসেন সেই ডাক্তার। সেই একই রকম ফতুয়া আর ধুতি পরনে, পায়ে রাবারের চটি। রোজ এসে একই কথা জিজ্ঞেস করেন, ‘খুকুমণির জ্বর ছাড়ে না কিয়ের লাইগ্যা?’ প্রথম দিন এসেই বুকে স্টেথো রেখে দেখে নিয়ে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দাদা, দাদি, কাকা, চাচি সবার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘জলে ডুবাইয়া ডুবাইয়া খুকুমণি কফ জমাইসইন বুকত, সারতে সমো লাগবো গো মেন্টু মিঞা।’ শুনেই জোরে চোখ টিপে বন্ধ করে ফেলি আমি, কাকার হিমঠাণ্ডা চোখে যেন আমার চোখ কিছুতেই না পড়ে! কাগজে মোড়ানো সাদা বড়ি, একটা মিক্সচারের সঙ্গে যোগ হয় আরো তেতো এক মিক্সচার, ছদিনের মাথায় জ্বর ছাড়ে।

রেডিওতে দাদি-কাকা খবর শোনে, বন্যায় নাকি রেললাইনও ডুবে গেছে। আমি ভাবি, বাঁচা গেছে, এই সপ্তায় অন্তত কাকা আমাকে নিয়ে যেতে পারবেই না সিলেট! গোসলের সময় কাকা দাঁড়িয়ে থাকে পুকুর পারে, নো সাঁতার কাটা, নো ডুবা-ডুবি, তিনখান ডুব দাও তারপর সিধে উঠে আসো গামছা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা কাকার কাছে! কাকা যা বলে, চুপচাপ করি সেগুলো, মনে ভাবি, কদিন আর চোখে চোখে রাখবে, দু-এক দিন যাক তারপর দেখা যাবে...

Monday, September 17, 2012

শুধুই আমার বলে কিছু হয় না যে...


জাগরনে যায় বিভাবরী

তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়

Monday, September 03, 2012

জিতেছি যতটা হেরেছিও ততটাই...

পৃথিবীটা যেমন গোল, সবই কিছুই বোধ হয় এমনই গোল, যেখান থেকেই শুরু করো না কেন, ঘুরে ফিরে পৌঁছুবে আবার সেই একই জায়গায়। আমিও আবার সেই একই জায়গায়, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার করে চলতে শুরু করেছিলাম। ঠিক কবে থমকে দাঁড়ালাম, কবে বৃত্তের সেই জায়গায় পৌঁছুলাম- যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেই দিন-তারিখ এবার ঠিকঠিক মনে আছে যদিও বেশির ভাগ জিনিসই ভুলে যাই, কিন্তু কারণ যাই হোক, মনে আছে। সেসব উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজন। ঘটনা এই, যে আমি আবার সেই একই জায়গায়...


রাত জেগে বসে বসে বাইরের অন্ধকার, না, ঠিক অন্ধকার নয়, কিছু আলো তো আছেই, কোনো এক বাতিওয়ালা একটা বোতাম টিপে সন্ধ্যে হলেই নিয়ম করে রাস্তার, ওই দ্বিতীয় হুগলী সেতু আর তার ছড়ানো বাহুগুলোতে আলো জ্বালিয়ে দেয়, সেই আলোয়  সব পরিস্কার নয়, আঁধার কোথাও কোথাও আরো বেশি ঘন, আমি বসে বসে সেই আধো আলো আর ঘন আঁধার দেখি, পুরনো সেই দিনের মত...

ওয়ান ট্র্যাক মাইন্ড বলে একটা কথা আছে না? আমি একসঙ্গে একাধিক কাজ করতে পারি না। যখন যা করি সেটা সম্পূর্ণ মনোযোগ আর একাগ্রতা দিয়ে করি। রবিশংকরজী যেমন বলেন, একশ শতাংশ দাও, আমি ঠিক তেমনি  একশ শতাংশ দিই, বরাবরই। ওই পথটুকুও ভীষণ মন দিয়ে হেঁটেছি, অন্য কোনো কাজ নয়, শুধুমাত্র চলা, চলতে থাকা আর চলতে থাকা। হঠাৎ যখন থামলাম, পথ চলার ক্লান্তি গ্রাস করল, একা, নিঃসীম শূন্যতা আর এক আবছা আলো যাতে অন্ধকার আরও বেশি গাঢ়। ফলতঃ অবসাদ...


বৃত্তের যেখান থেকে শুরু চলা করেছিলাম, আমি আবার সেখানে... মনে আছে সেই সিনেমাটা? দায়রাহ- দ্য সার্কেল? ঠিক সেই রকম...

মাথার ভিতর একটা চিঠি লিখে চলেছি।  ঠিকানাবিহীন, বা বলে চলেছি এক অনন্ত কথা, যাকে লিখছি,বলছি তার অস্তিত্বই হয়ত নেই, হয়ত আছে, জানি না ঠিক, বিশ্বাস করতে চাই- অস্তিত্ব আছে, কিন্তু বিশ্বাস!  সে শুধুই আমার বিশ্বাস, তার বাইরে কিছু নয়, কিস্‌সু নয়!

সুমন বলেন -
উত্তর আসবে না তুমি আসবেই আমি জানি!

কিন্তু গান, কবিতা বোধ হয় জীবন নয়, আবার জীবনের বাইরেরও কিছু নয়, জীবন থেকেই নেয়া, ক্ষণকালের অনুভব মাত্র। কিছুটা দেখা কিছুটা কল্পনার রঙ মিশে লেখা হয় সেসব,  যেই অনুভূতিটুকু প্রকাশ করা হয় কথায়, সুরে। আমাদের মন যখন যেমন থাকে, ভাল মন, খারাপ মন, উদাস মন, অভিমানি মন, প্রেমিক মন, মনভাঙা মন। আমরা শুনি সেই রকম সব গান, পড়ি কবিতা, সেই গান-কবিতা তখন নিজের হয়ে যায়, নিজের কথা হয়ে যায়, সেটাই তখনকার সত্যি হয়ে যায়।এই যেমন এই গানটা- একটা সময় জাতীয় সঙ্গীতের মত হয়ে উঠেছিল...


সুমন আরও বলেন- 
জিতেছি যতটা হেরেছিও ততটাই...

কি যে হার আর কি যে জিত কে জানে...
দু'দিন ধরে বড় মৌসুমী ভৌমিক মনে পড়ছে - 
ডাক আসে
তোমার না লেখা চিঠি আসেনি
আসে না
আসবে না জানি তবু আমি বসে থাকি...


এরকম আরও অনেক অনেক গান। কোন গানের অন্তরা তো কোন গানের মুখড়া...


মনে পড়ছে মিতালী মুখার্জী। সে আমার ছেলেবেলার কথা। মিতালী ভারতবর্ষের কোন একটা জায়গা থেকে গানের ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে গিয়ে গাইলেন সেই গান- 
এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই
মানুষ নামের মানুষ আছে দুনিয়া বোঝাই
এই মানুষের ভীড়ে আমার সেই সেই মানুষ নাই...

কিছু ভুলতে হলে নাকি পিছন ফিরে তাকাতে নেই, যা কিছু স্মৃতি, তাকে খাঁচায় পুরে তালাচাবি দিয়ে কোন এক অন্ধ কুঠুরিতে ফেলে দিতে হয় বা রেখে আসতে হয় সাত নদী আর তিন সাগর দূরের সেই পদ্মপুকুরের তলাকার লোহার সিন্দুকে, যেখানে বাস করে রূপকথার রাক্ষসের প্রাণভোমরা।  সেই পথে হাঁটতে নেই, যে পথে ছিল নিত্য চলাচল...  কিন্তু আমার যে স্মৃতিতেই বসত ... আমি রক্তাক্ত হই, গোলাপী রঙের রক্ত ঝরে, ঝরতেই থাকে... থামে না...


ঋতু বদলের সাথে সাথে মেঘেরাও চলে গেছে দূরে কোথাও,  হয়তবা কোন পাহাড়ে বা দূরের কোনো গাঁয়, যেখানে ঘোমটা পরা এক কাজল বধু সন্ধে দেয় তুলসীতলায়... এখানে এখন খর রোদ্দুর, এতটুকুও ছায়া নেই কোথাও, কাক-পক্ষীও ওড়ে না এই খরায়..

রয়ে যায় শুধু গানেরা-
পঙ্খী রইয়া যাও রে...


১৮-০৮-১২

Sunday, September 02, 2012

একখান ঘর বানাইলাম আমি ইট কাঠ লোহা পাথর দিয়া...

কি দিয়েছি আর কি পেয়েছি সেই অঙ্কে বেলা বয়ে যায়। কে যেন বলেছিল, যা তোমার, তার চাইতে একরত্তি কমও পাবে না, বেশিও না। এরকম  ভাবতে পারা আর ভেবে/ মেনে নিয়ে সেই অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়া/ যেতে পারা বেশ কঠিন। শক্ত।  

যা কিছু ভাল লাগার
ভালবাসার, সবই যে চাই! 
এক জানালা আকাশ নয়, 
অই গোটা মহাকাশটা চাই। 
সাতটা মহাসাগর
সাতখানি আশমান
আর গোটাগুটি এই পৃথিবী।

সবটুকু চাই।
সবটুকু।
এতুকুও কম নয়।
এক রত্তিও কম নয়।

চিকচিকে তারাদের মেলা
জোনাক জ্বলা রাত 
ভালবাসার শক্ত মুঠি
আর এক জোড়া হাত।।

কাঁচ ভেবে হীরে ফেলে যাওয়া ধুলায়, যখন জ্ঞান আসে,  ফেলে যা এলাম, সে শুধুমাত্র খণ্ড কাঁচ নয়, সে অমূল্য! ততক্ষণে বেজে উঠেছে ভোঁ। ছেড়ে গেছে শেষ ট্রেন...  ট্রেন চলে যায় ...

যা চলমান সে জীবন, থেমে যাওয়ার নাম মৃত্যু। তাই চলতে থাকা। চলতেই থাকা। একের পর এক স্টেশন। বাক্স-প্যাটরা আর মানুষের ওঠা-নামা। ব্যস্ততা। কোলাহলে চাপা পড়ে ফুঁপিয়ে ওঠা। ওড়নিতে চাপা দুই চোখ যেন জল থই থই কাজলা দীঘি... 

পথ হারানো পথিক পথ খুঁজে পায়, এগিয়ে যায় গন্তব্যের দিকে। পেছনে যা পড়ে রয়, তা পড়েই রয়, ফিরে তাকানোর অবকাশ সব সময় থাকে না বা অবকাশ থাকলেও ইচ্ছে বা সাহস থাকে না। কে জানে পিছন ফিরে তাকালে কি চোখে পড়বে! তাছাড়া গন্তব্যে পৌঁছুনোরও তো তাড়া থাকে, যদি মিস হয়ে যায় ট্রেন..

Saturday, September 01, 2012

তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম...

আমরা শুধু শুধুই সাত-আট ঘন্টা করে ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করি। দু-তিন ঘন্টা করে ঘুমিয়েও দিব্যি বেঁচে থাকা যায়! এবং কত কাজ করা যায়! লেখা, সিনেমা দেখা বা গান শোনা বা কিছু একটা পড়া। আমি যদিও কিছুই করি না। বলা ভাল করে উঠতে পারি না। আমার জেগে থেকে কাজ বলতে শুধুমাত্রই একই জিনিস বারবার করে ভেবে যাওয়া এবং ঝিমুনো...

অন্যদিন মাঝরাত বা ভোরের দিকে ঘুম আসে ঘন্টা দু-তিনের জন্যে। ওষুধের ঘোর। কোন স্বপ্ন আসে না। ঘুম ভাঙার পরেও মনেও হয় যেন জেগেই ছিলাম, ঘুমাইনি এক ফোঁটাও! আজ মাঝরাতে উঠব বলে তারাতাড়ি ঘুমানোর জন্যে ডোজ বাড়ে ওষুধের, ঘুম নাকি ঘোর আসে মাঝরাতেরও ঘন্টাখানেক পরে। মোবাইলে ঘন্টি বাজে -উঠে পড়ো, বাচ্চাটা যাবে! 


বহুকাল পরে আবার ভোরের রাস্তা। অন্ধকার। আলো ফোটেনি তখনও। রাস্তার ধারে কোথাও কোন একটা মসজিদে আজান হয়। ঘড়ি বলে সোয়া চারটে বাজে।  রাত বড় হচ্ছে, সকাল হচ্ছে দেরীতে। আলো না ফোটা ভোরের রাস্তা ফাঁকা, শুনশান। মাঝে সাঝে একটা দুটো গাড়ি হুঁশ হাঁশ ছুটে যায়। এয়ারপোর্ট অবধি টানা আলোজ্বলা রাস্তা। রাস্তার ধার ধরে সব তেপায়া শাদা আলো। রাস্তার মাঝে ডিভাইডারে সেই পুরনো পোস্টে পুরনো হলদে আলো। দুজনে  চুপচাপ বসে থাকি গাড়িতে। হাতে হাত।

ঈদ আর জন্মদিন একসঙ্গে পড়েছে বলে দেড় মাস আগে ঘুরে যাওয়া সত্বেও পাঁচ দিনের ঝোড়ো সফরে মেয়ে বাড়ি এসেছিল, ফিরে যাচ্ছে আবার। অফিসের পোষাকে তৈরি হয়েই বেরিয়েছে, এয়ারপোর্ট থেকে সোজা অফিসে চলে যাবে। বাড়ি থেকে ফিরে যাওয়ার সময় যেমনটা হয়ে থাকে সকলেরই, মন ভার, কথা কম আর চুপচাপ থাকা বেশি। যেহেতু সারাদিনই বকবক করে, তাই চুপ করে গেলে সেটা বড় বাজে...

এক সময় আলো ফোটে। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি পৌঁছুতে বেড়ে যায় ছুটন্ত গাড়িদের সংখ্যা। এয়ারপোর্টের সামনে গাড়িদের লাইন। ঘুমচোখ মানুষদের ট্রলি ঠেলে নিয়ে যাওয়া, এন্ট্রির লাইনে একটু আগে পৌঁছুনোর জন্যে রিতিমত দৌড়-ঝাঁপ।  মিষ্টির ছোট্ট ট্রলিব্যাগখানি ঠেলে কোনমতে লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আমি আবার ফিরতি পথে। একা...


ফেরার পথ ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশার চাদরে ঢাকা। নাকি আকাশের মেঘেরা মাটির কাছাকাছি নেমে এসে কুয়াশার মত চাদর বিছিয়েছে কে জানে... বর্ষা। এই বর্ষায় ভিজছে মাটি, ফসলের মাঠ, গ্রামের ছোট্ট খড়ের কুড়েখানি আর মন। নদীতে বাড়ছে জল। অত জল, যাতে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে পার্বতীর সমস্ত কলঙ্ক।  হেডফোন দিয়ে মস্তিস্কের কোষ বেয়ে শিরা-উপশিরায় বয়ে যায় -তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম...



 -----
 ২১-০৮-১২ 

Friday, August 31, 2012

মন ভাঙা আর মস্‌জিদ ভাঙা সমান কথা


কদিন ধরে বাবরী মস্‌জিদের কথা মনে পড়ছে। ছ’তারিখে ভেঙ্গেছিল না বাবরী মসজিদ? আর নয় তারিখে কলকাতায় দাঙ্গা। বোধ হয় এই তারিখগুলো এবং ঘটনাক্রমে সদ্য এক ছয় এবং নয় তারিখে ঘটে যাওয়া একান্ত ব্যক্তিগত কিছু ঘটনাবলীর সঙ্গে খানিকটা যোগসূত্র এবং অবশ্যই এই দুটো তারিখ, যার জন্যে এই বাবরী মসজিদ, এই ছ’তারিখ আর ন’তারিখেরা বারে বারে ফিরে ফিরে আসছে। মনে পড়ে যাচ্ছে সেই সময়কার থমথমে সেই তিন দিন। ছয়ের পরে ন’তারিখ রাত অব্দি থমথমে সেই সময় এবং তারপর ন'তারিখের সেই কাল রাত।

রাত বোধ হয় এগারটা হবে তখন। বাচ্চা দুটো দস্যিপানা সেরে সবে ঘুমিয়েছে। খাওয়া দাওয়া সেরে রান্নাঘরে সেদিনকার মত শেষবারের গোছগাছ করছি। পাশের টায়ারগলি, পুরনো ড্রামের গুদামের ওপাশের মিছরিগলি থেকে হঠাৎ মানুষের ছোটাছুটি, একসঙ্গে অনেক মানুষের চীৎকার চেঁচামেচি আর দৌড়াদৌড়ির আওয়াজ কানে আসে। চারতলার ছোট্ট ফ্ল্যাটের চিলতে বারান্দায় গিয়ে দাড়াই। আওয়াজগুলো ক্রমশ বদলে যেতে থাকে। আশে পাশের সমস্ত বাড়িগুলো অন্ধকার। ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে কারা যেন ভাঙছে ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো। ভয়াল অন্ধকারে হঠাৎ জলন্ত আগুনের ছোটাছুটি দেখা যায়। ঠাহর করতেই বোঝা যায় ওগুলো মশাল। একযোগে জ্বলে উঠেছে শয়ে শয়ে মশাল!। দুই দিকে দুই সম্প্রদায়। দুই দিকে দুই ধবনি।  রণহুঙ্কার। একদিকে হর হর মহাদেব অন্যদিকে নারায়ে তকবীর আল্লাহু আকবার!

দুই হাঁটুর ঠকঠকানিতে বুঝতে পারি বেঁচে আছি আর বেঁচেই থাকতে চাই। শরীর জুড়ে হিম রক্তস্রোত। মুখ দিয়ে চেষ্টা করেও বের করতে পারি না কোন শব্দ। এই রণহুঙ্কারেই শেষ নয়। খাপমুক্ত তরবারীর ঝনঝনানি, সোডার বোতলে কি সব যেন ভরে সেগুলো ছুঁড়ে মারার সঙ্গে সঙ্গেই দুমদাম শব্দে সেগুলো ফাটছে ছড়াচ্ছে আগুন। প্রস্তুতি বোধ হয় আগে থেকেই ছিল। ছ’তারিখের পরের থমথমে ওই তিন দিন ধরেই বোধ হয় প্রস্তুত হচ্ছিল দুই সম্প্রদায়। বেরিয়ে আসছিল নখ-দাঁত, শান পড়ছিল তরবারীতে, তৈরি হচ্ছিল সোডার বোতলে বোমা আরও কী কী সব যেন। একটা সময়ে দেখলাম, পিলপিল করে বস্তিবাসী মানুষের স্রোত এসে ঢুকছে তিন-চারতলা বাড়িগুলোতে। হাতের পোটলায় যে যা পেরেছে গেরস্থালীর টুকিটাকি তুলে নিয়ে পোটলা হাতে ঘর-দুয়ার ফেলে দৌড় লাগিয়েছে প্রাণ বাঁচানোর জন্যে। এসে সব ঢুকছে পাকা বাড়িগুলোতে। দরজা খুলতে দেখা জয়ায় করিডোরে সর্ষে পড়ার জায়গা নেই। সকল বয়েসের নারী পুরুষদের ভীড়। যে যেমন পেরেছে জায়গা নিয়ে বসে পড়েছে, সিঁড়িতে আরও ছুটন্ত পায়ের শব্দ।

সামনের ফ্ল্যাটের মাঝারী আকারের বাম নেতাটির ছেলেদের দেখা যায়, অল্প বয়েসী তিনটি ছেলে, বারো থেকে ষোলর মধ্যে বয়েস, দরজায় আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে, কাকি, খালি বোতল হ্যায়? কি হবে জানতে চাইলে বলে, বম বানায়েঙ্গে! ছোড় দেঙ্গে ক্যায়া উনলোগোকো? ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিই। আবার গিয়ে বারান্দায় দাঁড়াতে বুঝতে পারি, আমাদের ছাদ থেকেও এবার শুরু হয়েছে হাতবোমা ছোঁড়া! বাচ্চাদুটোই জেগে। দুই হাতে দুজনকে জাপটে ধরে খাটের পাশে মেঝেতে বসে একমনে লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুব্‌হানাকা ... পড়ে যাচ্ছি। থমকে যাওয়া সময়ও একসময় চলতে শুরু করে। পুলিশের সাইরেন, নেতাদের মাইকে ভাষণ শোনা যায় যুযুধান দুই পক্ষের রণহুঙ্কার ছাপিয়ে।  গুলির শব্দে চাপা পড়ে মানুষের চীৎকার। একসময় শুধুই সাইরেনের শব্দ থেকে যায়। 

তিনদিন ছিল কার্ফিউ। নাকি চারদিন? ঘন্টা দুইয়ের জন্যে কার্ফিউ লঘু করা হত প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী সংগ্রহের জন্যে। 

রামস্বামী- যিনি আমার একটা লেখার অনুবাদ করেছিলেন, সদ্য যখন এই বাবরী মসজিদ নিয়ে আদালতের রায় বেরুলো, তিনি তাঁর নাম পরিবর্তন করে একটি ইসলামিক নাম রাখলেন। নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। ঘোষণা দিয়েই নাম পরিবর্তন করেন তিনি।  
-------------------



আসলে যা বলতে চাই, সে অন্য কথা। সেকথা বলতে চাই না বলেই এইসব পুরনো কথাদের অবতারণা। 

Saturday, August 11, 2012

হে আমার বিবর্ণ কবিতা, নূতন কিছু বিবর্ণতা ঢালো..

শূণ্যতা!
একেকসময় শূণ্য দশা প্রকাশে সাহায্য করে।
একেকসময় আবার সে বিবশতা, আচ্ছন্নতা, ঘোর লেগে থাকা উপহার দেয়।

কিছু করা চলে না তখন। ভাবা - সেও তো এক রকম 'করা'। একটা ক্রিয়া। তাও চলে না।

এখন  হয়ত শূণ্যতার ওই দ্বিতীয় দশা চলছে। ঠিক নিশ্চিত নই সেই ব্যাপারে।
এটা ওর মনে হওয়া।

ইতি।



ইতি! ইতি বলে কিছু হয় নাকি!

ইতি মানে তো শেষ! যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ কিছুরই শেষ নেই যে...

কোনো ইতি নেই...

তাও বোধ হয় ইতি হয়। জীবন পাতার একটা একটা পাতা উলটে উলটে একটা করে অধ্যায়ের ইতি হয়...

বয়ে যাওয়া, চলতে থাকার নাম জীবন, যা থেমে যায় -সে মৃত্যু।  

বহতা জল-সে নদী। এগিয়ে চলে সমুদ্রের দিকে। কত বাঁক, কত ভাঙ্গন কত গড়ন। এক কূল সে ভাঙ্গে, উজাড় হয় বসতি, সর্বহারা মানুষেরা চোখের জলে নদীর জোয়ারে আরও জল জুগিয়ে এগিয়ে যায় নতুন মাটির সন্ধানে, অরণ্যের সন্ধানে। এক কূল ভাঙ্গে তো আরেক কূল গড়েও সে। চর পড়ে দূরে কোথাও... দখল হয় চর, চারা বোনা হয় ফসলের, রোপণ হয় বৃক্ষ। নতুন মানুষে ঘর বাঁধে নতুন চরে। স্বপ্ন দেখে, জীবনের স্বপ্ন, ফসলের স্বপ্ন। গোলাভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছের স্বপ্ন। উঠোনে একটি দুটি শিশুর কলতান, খুঁটিতে বাঁধা পোয়াতী গরু, হাঁস, মুরগিদের সোহাগী স্বর আর পায়রাদের বকম বকম। খুঁটিতে বাঁধা দড়িতে ঝোলে ভেজা গামছা শাড়ী আর সায়া। 

সময় পাতা ওল্টায় জীবনের, নতুন অধ্যায়ের... নতুন অধ্যায়ে নতুন কাহিনী!

Saturday, June 02, 2012

আনো রে গুয়া-পান কাটো রে খাই..

ফ্রিজে একটা পান পড়ে আছে বেশ কিছুদিন ধরে। সাজা পান। মিষ্টি পাতা, ভেজা সুপুরি, চমন বাহার, অল্প মৌরী, আর সামান্য ঝিরিকাটা সুপুরি। টুকরো খবরের কাগজে মোড়া, পলিথিনের ছোট্ট পাউচে ঢোকানো। কতদিন আগেকার পান? হবে হয়ত সাত-আটদিন বা তারও আগে-পরের। মনে নেই। মনে করার চেষ্টাও নেই অবশ্য। সবকিছুই মনে রাখতে হবে এমন তো কোনও কথা নেই..পানটা পড়ে আছে কারণ খেতে ভুলে গেছি। মনেও পড়েনি পান খাওয়ার কথা। পান যে আছে, এটাও মাথায় ছিল না, অথচ খাব বলে বেশ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে যত্ন নিয়ে সাজিয়ে আনা পান..

এখন, কী একটা বার করতে গিয়ে পানটা চোখে পড়ল। পানটা চোখে পড়ামাত্র কত যে ছবি অদৃশ্য এক আয়নায় ফুটে উঠল.. কিছু ছবি পুরনো, সময়ের ধুলো জমে জমেও যা একটুও ঝাপসা বা আবছা নয় আর কিছু সদ্য-নতুন, একেবারে টাটকা। নতুনেরা বরং থাক মনের তাকে, পুরনো হোক, জমুক কিছু ধুলো, সময়ের, বয়সের। ধুলোর আস্তরণ যখন পুরু হবে, ভেতরের পাতাগুলো হবে হলদে, তখন না হয় নামিয়ে আনব তাক থেকে, পালকের বুরুশ দিয়ে ধুলো সরিয়ে খুলব একটা একটা করে পাতা..আমার নাড়াচাড়া তো পুরনো নিয়েই..

বেশ কিছুকাল হবে বোধ হয়,  মাঝে সাঝে পান খেতে শুরু করি, ঠিক কবে সে আর মনে পড়ে না। আমাদের বাড়িতে আম্মা পান খায় না, দাদি খেত, বড়ফুফু, মেজফুফুরা খায়। যদ্দিন দাদির দাঁত ছিল সরু-মিহি করে কাটা সুপুরি, চুন-খয়ের দিয়ে পান সেজে খেত। পেতলের পানের বাটা ছিল দাদির। বড়ফুফু যখন বাপের বাড়ি আসত, বড় কৌটো ভর্তি করে দাদির জন্যে সুপুরি কেটে রেখে যেত। কি ভীষণ মিহি করে সুপুরি কাটত বড়ফুফু! গোটা গোটা সুপুরি রাতভর জলে ভিজিয়ে রাখা হত, কাটার সময় যেন গুড়ো গুড়ো না হয়ে যায়। পান মুখে দিয়ে বারান্দায় গুছিয়ে বসত সুপুরি কাটার জন্যে। গল্প করার জন্যে একে একে অনেকেই জুটে যেত, যে বসত, তাকেই পাশে রাখা দাদির বাটা থেকে এক খিলি পান সেজে দিত ফুফু, এমনিতে যে পান খায় না, সেও খেত সেই সময়। পানের খিলি মুখে নিয়ে যে বসত সেও একসময় হাঁক দিত, কই গো, আরেকখান ছরতা দ্যাও দেহি। এক সময় দেখা যেত, আট-দশজনায় বসে সুপুরি কাটছে। পাশেরজন কেমন কাটছে সেদিকে খেয়াল থাকত সকলেরই, নিজের কাটা সুপুরি যেন মোটা না হয়ে যায়। সমস্ত সুপুরি কাটা হয়ে গেলে বেতের ডালায় করে রোদে শুকিয়ে নিয়ে কৌটোয় ভরে রাখা। এখন চলবে কয়েকমাস এই সুপুরি দিয়ে, বড়ফুফু আরেকবার বাপের বাড়ি বেড়াতে আসা অব্দি..

আমরা, ছোটরা দাদির মুখের চিবুনো পান খেতাম। অনেকক্ষণ ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে পান খেত না দাদি। খানিকক্ষণ চিবিয়ে রসটা খেয়ে নিয়ে পানটা হাতে নিয়ে আওয়াজ দিত, পান কেডা খাইবি আয় বলে। ততক্ষণে পানের রসে টুকটুকে লাল হয়ে যেত দাদির দুই ঠোঁট আর ঠোঁটের কষ। একটা দুটো হাত সঙ্গে সঙ্গেই এগিয়ে যেত সেই চিবুনো পান খাওয়ার জন্যে। সকালের নাশ্‌তা বা দুপুরের খাওয়া বা বিকেলের চায়ের পরে আব্বা যখন বারান্দায় দাদির বেতের সোফার পাশে দ্বিতীয় সোফাখানিতে গিয়ে বসত, তখন একখিলি করে পান এগিয়ে দিত দাদি। মায়ের পাশে বসে গল্প করতে করতে পান চিবুতো আব্বা..

একটা সময় এল, যখন দাদি আর সাজা পান চিবিয়ে খেতে পারে না। হামানদিস্তায় থেঁতো করে নিত। মজাটা হল, আব্বার তো দাঁত ছিল কিন্তু আব্বাও নিজের পান হামানদিস্তাতেই দিয়ে দিত, ছেঁচা পান দুজনে মিলে ভাগ করে খেত। দাদি নেই, এখন আর আব্বা পান খায় না কিন্তু মাঝে মধ্যেই দাদির পেতলের পানের বাটা আর সেই হামানদিস্তার খোঁজ করে। বলে, বাটা আর হামানদিস্তাখান থাকলে পান খাওন যাইত! যেন অন্য কোনো বাটা-হামানদিস্তায় থেঁতো করা পান খাওয়ারই যোগ্য নয়..

আজ সকালে আব্বার সঙ্গে কথা হল। অনেকদিন পরে কথা হল আব্বার সঙ্গে। আজকাল আমি বেশি ফোন করি না আব্বাকে। ফোন করলেই জানতে চাইবে কেমন আছি, কী বৃত্তান্ত। অসুখের কাহিনী বলে আব্বার চিন্তা বাড়াতে চাই না কিন্তু ভাল আছি বলে কাটিয়ে দিতে চাইলেও আব্বা ঠিক ধরে ফ্যালে তাই ফোনই করি না এখন আর। বোন জানায় আম্মা নাকি অসুস্থ। খানিক এটা সেটা গল্প করে আব্বা বলে, বাড়ি চলে এস মাস কতকের জন্যে, আমার কাছে এসে থাক, চাঙ্গা হইয়া যাইবা, এখন তো ব্যারাইম্যা মুরগির মতন ঝিমাইতাছ। বলি, আব্বা, কয়েক মাসের জন্যে চলে গেলে আমার পোলায় কী করবে? প্রায় রেগে গিয়েই আব্বা বলে, পোলায় বড় হইসে না? তুমি আইয়া পড়। বোঝানোর চেষ্টায় ক্ষ্যামা দিই, বলি, হ, মিষ্টি আইয়া ফেরত গেলে পরে দেখি যাইতে পারি কিনা..

বেশিদিন হয়নি বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছি কিন্তু আব্বার এই বাড়ি যেতে বলার বেশ আগে থেকেই মন বড় অস্থির হয়ে আছে, কয়েকমাস না হোক, কিছুদিনের জন্যে অন্তত যেতে পারলে সত্যিই ভাল হত.. সবকিছু, সমস্তকিছু থেকে দূরে, অনেকটা দূরে, বাপ আর মায়ের কাছে, বারান্দায় আব্বার হাতলওয়ালা চেয়ারের পাশে মোড়ায় বসে পানের বাটা আর হামানদিস্তা নিয়ে আব্বার আর নিজের জন্যেও পান থেঁতো করে খেতে খেতে গল্প করলে হয়ত এই অ-সুখও সেরে যেত..


ছবি-গুগল হইতে

Friday, May 11, 2012

যন্ত্রণার দিনগুলিতে..

বেশ কিছুদিন বাড়ি থেকে বেরুইনি। বাইরের পৃথিবী বলতে এক জানালা আকাশ, চিলতে বারান্দার ওধারের বাতাসে তালপাতাদের দোল খাওয়া, দক্ষিণের জানালার ওধারে একতলা বাড়িটির ছাদে নাইটি পরা কিশোরী মেয়েটির যখন তখন ঘোরা ফেরা, খানিক দূরের তিনতলা বাড়িটির উপর এক ছাদ ভর্তি পায়রা। অতিথি বলতে মাঝে মধ্যে রান্নাঘরের একপাটি খোলা জানালা দিয়ে খাবারের খোঁজ বা জলতেষ্টায় ঢুকে পড়া একটা কাক। কদাচিৎ একটা টুনটুনির ত্বরিৎ এঘর ওঘর ওড়াওড়ি আর তারপর আবার পালিয়ে যাওয়া। 

তিনখানা পুকুরের মাঝেরখানি বুজিয়ে যেদিন থেকে চারতলা বাড়িটা উঠতে শুরু করল, সেদিন, ঠিক সেদিন থেকেই বন্ধ হয়ে গেল আমার পশ্চিমের জানালাখানি। বন্ধ জানালার ওপাশে হারিয়ে গেছে আমার অলস দুপুরে পানকৌড়িদের খেলা, দূর দূরান্ত থেকে উড়ে আসা সব পাখিদের কিচির মিচির, নাম না জানা কিন্তু ভীষণ পরিচিত সেই ঝাঁকড়া গাছটা, যাতে বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে ছোট ছোট ফিকে কমলা রঙা ফুল ফুটে ঢেকে দিত সব পাতাদের, কত, কত্ত সব পাখিদের অস্থায়ী বসত ছিল সেই গাছটা। অপেক্ষার জেগে থাকা গহীন রাতগুলোতে টিমটিমে হলদে রাতবাতিতে ফিকে আঁধার জমা নিস্তরঙ্গ পুকুর, নৈঃশব্দকে ভেঙে দিয়ে পুকুরের ওধার থেকে ভেসে আসা টিভি বা রেডিওর আওয়াজ আর আরো, আরও কত কী..

০২
ফেরেশ্‌তা আসিয়া যখন জিজ্ঞাসা করিবে..
সেদিন সন্ধেবেলা শুয়ে শুয়ে হঠাৎ করে চোখের সমুখে কবর দেখতে পেলাম। পরিচিত এক কবরস্থান, বাঁশের ঝাঁড় আর সদ্য খোড়া এক কবর। সদ্য কাটা বাঁশ, নতুন কিনে আনা যেন তেন করে বোনা চাটাই আর এক চিরকালীন শয্যা। প্রচণ্ড ভয় পেলাম, বেশ জোরে, অজান্তেই বলে উঠলাম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহহু.. স্বপ্ন নয়, জেগেই ছিলাম। পিঠে ব্যথা নিয়ে সারাদিন শুয়ে থাকতে হলে ভর সন্ধ্যেয় কারই বা ঘুম পাবে! উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আবারও শুয়ে পড়ি, বাবুকে ডাকি, মনেই থাকে না যে, বাবু নেই বাড়িতে। বেশ অনেকক্ষণ ধরে থাকে সঙ্গে সেই কবর। দাদির কথা মনে পড়ে, কত কথাই না বলত দাদি আমার এই কবর নিয়ে। রোজ ভোরবেলায় ফজরের নামাজ শেষে হাঁটতে বেরিয়ে প্রথমেই যেত পাড়া পেরিয়ে পূবের পুকুরের দখিণপাড়ের কবরস্থানে, ক্ষণিক দাঁড়িয়ে থাকত পারিবারিক এই কবরস্থানের সমুখে, ধীরপায়ে হেঁটে বাড়ির দিকে ফিরত ঘুম ভাঙা বসতির মধ্যে দিয়ে। রোজ কেন কবরস্থানে যায় জানতে চাইলে বলত, ‘আসল বাড়িডা একবার কইরা দেইখ্যা আয়ি রোজ!’ অন্ধকার এক চিপা ঘর, তাতে আলো জ্বালবে শুধু তোমার কর্ম। স্বজনেরা যখন কবরে শুইয়ে দিয়ে ফিরে আসবে তখন ফেরেশ্‌তা এসে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, কৃতকর্মের হিসেব নেবে। ঈমানদার নেক্‌ বান্দাকে ফেরেশতারা সঙ্গ দেবে, আলোকিত আর সুখকর করে রাখবে কবরকে, নইলে সর্প আর বিচ্ছুতে ভরা শাস্তিময় চির অন্ধকার..

সন্ধে হয়েছে অনেকক্ষণ, কিন্তু আলো জ্বালা হয়নি। মাগরেবের আজানের আগেই তো সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে দিতে হয়, অথচ আমার গোটা বাড়ি অন্ধকার। আলো বলতে শুধু ছিটকে আসা উড়ালপুলের মৃত, হলদে রাতবাতির কিছুটা আভা আর এবাড়ি ওবাড়ির জ্বলে ওঠা সন্ধেবাতির রেশ- যাতে আমার ঘরের আঁধার খানিকটা ফিকে..শব্দ বলতে কারও একটা দেরিতে দেওয়া সন্‌ঝা-র শাঁখ..

০৩
কুচো কুচো করে কাটো বিরক্তি সব
দুপুরবেলায় বিরক্তি পেয়ে বসে। বিরক্তিটা নিজের উপর, এই শরীর খারাপের উপর, এই শুয়ে থাকার উপর এবং এই যন্ত্রণার উপর তো বটেই। একটা সময় বিরক্তিটা রাগে গড়ায়, অসহ্য রাগ হয়। দু’দিন ধরে বাবু একটা ওষুধ খুঁজে বেড়াচ্ছে, পাওয়া যাচ্ছে না সেটা কোথাও। আগেরদিন ধর্মতলা আর পিজি হাসপাতালের আশে-পাশের প্রায় সবকটা ওষুধের দোকান খুঁজে যন্ত্রণাহারক বস্তুটি না পেয়ে সে ডাক্তারবাবুকে ফোন করে অন্য কোনো ওষুধের নাম বলে দিতে বললে তিনি বলেন, আমার পেশেন্টের এই ওষুধটাই লাগবে। দুটো জায়গার নাম বলে দিয়ে বললেন, সেখানেও যদি না পাওয়া যায় তখন যেন আরেকবার ফোন করে, তারপর তিনি অন্য ওষুধ বলবেন! পরদিন দুপুরের রোদ খানিকটা পড়লে বাচ্চা আমার আবার বেরোয় ওষুধের খোঁজে। 

বিরক্তিটা ততক্ষণে মেজাজ খারাপে পরিণত। এতদিন- বলা ভাল, এত মাস ধরে ওষুধ খেয়েই যাচ্ছি, কি লাভ হচ্ছে তাতে? কি হবে আর যদি না খাই? ঠিক করে ফেলি, আজ থেকে আর ওষুধ খাব না। বাবুকে ফোন করে বলি, ওষুধ কিনতে হবে না, তুমি ফিরে এসো। ছেলে অবাক হয়, কেন! আরে তুমি ঘাবড়াচ্ছ কেন, আমি ওষুধ না নিয়ে আজ ফিরবই না। বললাম,  কী লাভ হচ্ছে এত ওষুধ খেয়ে খেয়ে, আমি আর ওষুধ খাব না, আজ থেকে সব ওষুধ বন্ধ। বাবু বলে, হ্যাঁ, এখন আমার দু’মাস ছুটি, তুমি সেই ছুটির বারোটা বাজিয়ে আমাকে ভালমতন ভোগানোর প্ল্যান করেছ তো? চুপচাপ শুয়ে থাকো! 

আবার ফোন। এবার উমা। প্রসঙ্গও অন্য। কি হবে আমি যদি এখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাসস্টপে যাই আর তারপর বাস ধরে কোথাও একটা যাই? যেখানে ইচ্ছে, সেখানে? ক্ষণিক চুপ থেকে সে বলে, কীই আর হবে, কিস্‌সু হবে না, বেরিয়েই পড় ইচ্ছে হলে, তবে বাসে উঠিস না, একটা গাড়ি ডাক, যেখানে যেতে ইচ্ছে করছে ঘুরে আয়, নাহয় আমার বাড়ি চলে আয়। গাড়ি! যেন সে চালকসমেত দাঁড়িয়েই আছে আমার দোরগোড়ায়, ডাকলাম আর চলে এল!  আবার খানিক চুপ থেকে উমা গল্প করতে শুরু করল, নানান গল্প। ভোর চারটেয় ঘুম থেকে উঠে যে ব্যক্তি নিত্য কাজ সেরে সাড়ে ছটায় স্কুলে ঢুকে সই করে, সে যদি শেষ দুপুরের বিশ্রামের সময় ফোন ধরে ওসুস্থ বন্ধুকে স্কুলের অন্য টিচারদের গল্প শোনায়, তখন বুঝে নিতে হয়, ফালতু রাগ করছি, কোনো অর্থ নেই এর..

০৪
মেঘের কোলে রোদ আজও হেসে যায়
দিন কতক আগে ইন্দ্রাণী, আমার আই-মশাই একটা ছোট্ট চিঠি লিখেছিল, তাতে লিখেছিল কতকাল তোমার লেখা পড়িনি বলো তো.. সত্যিই তো, কতকাল কিছু, কিচ্ছুটি লিখিনি। আই-মশাইয়ের কথা মনে পড়ার কারণ, পঁচিশে বৈশাখে তার একটা পুরনো লেখা আবার করে সামনে আসা, সেদিন নয়, সেদিন সেই লেখা বসে পড়তেই পারিনি, গতকাল শুয়ে শুয়েই লেখাটা পড়লাম। শুরুতেই সে লিখেছে, তার নাকি একটা ভিখিরির ঝুলি আছে, যেখান থেকে এই লেখাখানি সে আবার বার করেছে। আই-মশাই গো, ওরকম একটি ঝুলি যদি আমার থাকত, যেখান থেকে খুব বেশি নয়, ওইরকম দু-একটা লেখা অন্তত বেরুবে.

পঁচিশে বৈশাখ নিয়ে লেখা-র পাতা অনেকদূর এগিয়ে গেছে, বেশ কয়েক পাতা পিছিয়ে গিয়ে পড়তে হয়, পড়তে পড়তে আমি নিজেও চলে যাই ছেলেবেলার রবীন্দ্রনাথ-এর কাছে। কত কি, কত কী যে মনে পড়ে.. পড়ার শুরুতে মনে হয়েছিল, আমার এরকম কোনো পঁচিশে বৈশাখ বা ছেলেবেলার রবীন্দ্রনাথ নেই, থাকলে আই-মশাইয়ের মত না হোক, যেটুকু পারি, যেভাবে আমার কাছে আসে, সেভাবেই নাহয় লিখতাম! পড়া শেষ হয়, ভাবনা চলতেই থাকে, স্মৃতিরা কাছে আসে গুটি গুটি পায়ে, দেখতে পাই, নেই- কে বলেছে, আমারও তো আছে শৈশব আর কৈশোরে রবীন্দ্রনাথ! জীবনে প্রথমবার যেদিন স্কুলে যাই, প্রথমবার মাঠে দাঁড়িয়ে যখন জাতীয় সঙ্গীত গাই তখন থেকে, সেই মুহুর্ত থেকেই তো রবীন্দ্রনাথ..



আরেকটু লিখব হয়ত..

Thursday, April 26, 2012

সব চরিত্র কাল্পনিক

মাঝে মাঝে একটা ঘর দেখি দেখতে পাই। ঘর না, আসলে বাড়ি। পুরনো বাড়ি। পুরনো সেই বাড়ি। যেখানে জন্মান্তরে বসত ছিল আমার। বাড়িটা কেমন যেন পালটে পালটে যায়, ঘরগুলোও, এভাবে কখনও বাড়ি-ঘর পালটে পালটে যায়? কি জানি.. পালটে যায় দেওয়াল এমনকি পালটে যায় মানুষগুলোও। আমি মাঝে মাঝে যাই সেই বাড়িতে, যেমন আজ এসেছি।  কেন যে যাই নিজেও জানি না কিন্তু যাই, না গিয়ে পারি না বলেই যেন যাই সেখানে, জন্মান্তরে যেখানে বসত ছিল আমার। সেখানে এখন বাস করে অন্য মানবী, বাতাসে অন্য শিশুর কলতান। সেই মানবী বসে আনাজ কোটে, কেরোসিনের স্টোভে রান্না করে। এই স্টোভটা আমার চেনা। এর প্রতিটা সলতে আমার পরিচিত। চেনা এই আঙিনা, অচেনা শুধু ওই মানবী আর ওই শিশুটি। 

একটি পুরুষ আসে, একে আমি চিনি না। হঠাৎ করে সব কেমন অচেনা হয়ে যায়। ভয় লাগতে শুরু করে। বাড়ির দেওয়ালটাও হঠাৎই বদলে যায়। একটা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা আঙিনা হয়ে যায় দেওয়াল ঘেরা ছোট্ট সেই উঠোন, যেখানে এক অপরিচিত নারী বসে আনাজ কোটে, রান্না করে আমার চেনা স্টোভে। আমার ভীষণ ভয় লাগে, আমি পালাতে চাই। জোরে হাঁটতে যাই, পারি না। প্রচণ্ড ভারী লাগে পা দুটো। দৌড়ুতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ি। অচেনা সেই পুরুষটি এসে আমার হাত ধরে, ফলাকাটা এক ছুরি দিয়ে চিরে চিরে দেয় আমার দুই হাত, কনুই অব্দি, কনুইয়ের উপরেও চিরে দিতে থাকে একের পর এক। খুব গভীর নয় সেই সব ক্ষত, যেন ছুরি দিয়ে সে নকশা কাটে আমার হাতে, রক্তের রেখায় ফুটে ওঠে রঙ। আমি কাঁদতে থাকি, যেতে দাও, আমাকে যেতে দাও -বলে অনুনয় করি, সে আমার হাত ছাড়ে না। রক্তের রেখা আমার দুই হাতে, অদ্ভুতভাবে রক্ত জমাট বেঁধে যেতে থাকে সেই চেরা জায়গাগুলোর উপরেই, গড়িয়ে নামে না। নির্বিকার চিত্তে সেই অপরিচিত নারী আনাজ কোটে, শিশুটিকে ডাকে। আমি তাকে বলি, আমাকে ছেড়ে দিতে বলো, আমার ভয় করছে, আমি বাড়ি যাব। সে হাসে, বলে, বাড়ি? তোমাকে তো ও বাড়ি যেতে দেবে না, একবার পালিয়ে গেছ, আর তোমাকে পালাতে দেবে না ও।

বাঁশের বেড়ার ওধারে কার যেন সাড়া পাই, তাকিয়ে দেখি ভীষণ চেনা দুটো মানুষ। ভারী, প্রায় অচল হয়ে যাওয়া পায়ে দৌড়ুনোর চেষ্টা করি, পারি না, তাও একসময় পৌঁছেই যাই বাঁশের গেটের কাছে, যেখানটায় গেটের বাইরে  আমার ভীষণ চেনা মানুষ দুটো দাঁড়িয়ে আছে। আবার হুট করে সব পালটে যায়।  সামনে সেই দেওয়াল! পুরনো বাড়ির পুরনো সেই দেওয়াল, মাঝখানে সদর দরজা। পুরনো কাঠের নড়বড়ে সেই সদর দরজায় শেকল তোলা, পেছন ফিরে তাকাই, ওই অচেনা মানুষটাকে হঠাৎ করেই চিনতে পারি, এ যে ভীষণ চেনা এক মুখ! শেকল নামিয়ে আধভাঙা নড়বড়ে দরজা পেরিয়ে আবার তাকাই পেছন ফিরে, পেছনে যারা আছে, তারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। শিশুটি একই ভাবে খেলে বেড়ায় আঙিনা জুড়ে, বটিতে আনাজ কোটে এক অপরচিত নারী, পাশে রাখা স্টোভে রান্না হয়, ঘরের দরজা পেরিয়ে যে সিঁড়ি তাতে বসে এক অচেনা মানুষ, যাকে আমি কোনোদিন দেখিনি, যাকে আমি চিনি না..

Monday, April 23, 2012

Family looks for cancer funds

Family looks for cancer funds
- Nine-year-old boy advised stem cell transplant after relapse
Shrotrik Dasgupta, 9, can probably count the days he has been well and fit to go to school or play with friends in the last three years since he was diagnosed with blood cancer.
But Shrotrik kept his chin up through the painful treatment from January 2009 to December 2011 and even managed to secure 85 per cent marks in his Class III final examinations despite being irregular at school. Just when things had started looking up for Shrotrik and his family, residents of Dum Dum, the symptoms of his ailment returned and doctors diagnosed a relapse of acute lymphoblastic leukemia (ALL) in late February this year.
“ALL is a form cancer, where the white blood cells turn malignant and overproduce in the bone marrow so that the normal cells get crowded out. These WBCs then spread to other organs,” said Revathy Raj, paediatric haematologist at Apollo Hospital, Chennai, who is treating the boy. “There was a 70 per cent chance that Shrotrik would be absolutely cured after the three years of treatment. But unfortunately he turned out to be among the 30 per cent who have a relapse.”
Doctors advised stem cell transplantation as the only cure but there was no match in the family. The search had to be taken abroad and three matched donors were finally located in the US, but this would send the cost of treatment spiralling.
The boy’s grandfather, Bhabotosh Bhattacharjee, has already spent Rs 16 lakh on his treatment with some contribution from his mother Sanchita, a teacher of Taki SL Girls’ High School, and father Saibal, an LIC agent. Drained of all resources, procuring another Rs 50 lakh is proving a Herculean task for the family.
Desperate, Sanchita joined Facebook last month and posted an appeal (http://www.facebook.com/profile.php?id=100003698598310). The response has been encouraging — Rs 7 lakh has already been collected and Rs 3 lakh more has been promised. Of this, Rs 1 lakh came from St. Stephen’s School, Dum Dum, where Shrotrik studies.
“The chemotherapy is over (the final dose was administered on January 6) and now is the time for the stem cell transplant if we can afford it. Doctors are advising us against any delay but our hands are tied,” said the boy’s mother, who is with him in Chennai.
“The procedure is best done as early as possible as Shrotrik is once more in remission but the problem will resurface. There is an immediate need for Rs 50 lakh, including Rs 5 lakh for the stem cells and Rs 10 lakh for medication. There is also the possibility of life-threatening fungal infection and anti-fungal agents are expensive,” the doctor said.

Thursday, April 05, 2012

Donate for Shortrik - Save a life

http://aryyab.blogspot.in/2012/04/donate-for-shortrik-save-life.html
 

Donate for Shortrik - Save a life


Shortrik Dasgupta a nine year old boy who has been suffering from Acute Lymphoblastic Leukaemia since 2008. Now he needs bone marrow transplantation. Family has borne all the expenses until now, for this treatment they have to accumulate 50 lacs Indian Rs (approximately $100,000). If you trust me and my wife Lydia Ray please donate whatever amount is possible for you to try saving the life of a bright young boy. Thank you in advance.

Donate Money in USA(USD) (Pay Pal):











Donate Money in Canada(CAD)(Pay Pal):










Donet Money in UK (GBP) (PayPal):










Donate Money in Europe (EUR) (PayPal):












Donate Money in India:











Name: Shrotrik Dasgupta Age: 9 years sex: male
Address: 95, Jugipara Road, West Bengal, Kolkata-700074


Case History:
First detection of ALL (Acute Lymphoblastic Leukaemia) by Dr. Amitabha Pahari on 15th Nov, 2008 at Apollo Gleneagles Hospitals, Kolkata. Patient brought to Chennai and admitted at Apollo Specialty Hospital under Dr. Revathi Raj: DCH, MRCP (Paediatrics) UK MRCP Path (Heamatology) UK Bone Marrow Aspiration Cytology(BMA) done on 22nd Nov, 2008 showed 70% blast and when correlated with flow cytometry the final diagnosis made was CALLA positive ALL. Treatment started was based on UK protocol of ALL Regimen A.

By 2nd December 2008, the MRD in the marrow had gone down to 1.2%. As a result of the good response to chemotherapy Shrotrik was admitted on 11th January, 2009 for Chemo port insertion and after its successful implantation, was discharged on 13th January, 2009. From then on till the end of treatment the port was used for chemotherapy. The entire period of three years of treatment Shrotrik responded well to the treatment. The port was removed on 14th December, 2011 and the treatment ended with the final dose of vincristine on 6th January, 2012.
On 27th February, 2012 Shrotrik had to be admitted at Tata Medical Centre, Kolkata with inflamed scrotal wall and bilateral exploration for suspected testicular torsion. No torsion was found.
Since 5th March, 2012 he started getting fever and painful swellings appeared on the legs. He was brought back to Apollo Chennai on 13th March, 2012 and a CBC and Bone Marrow Aspiration revealed a relapse of ALL with 22% blasts in the blood and 66.4% blasts in the bone marrow. Fortunately enough number of MRD was detected in the Cerebro-Spinal Fluid.

Treatment has started according to ALL 3 protocol, after being readmitted at Apollo Specialty, Chennai. Based on the MRD found at the end of a month long treatment, the bone marrow transplant will occur.
Appeal from the Family:
From Nov, 2008 till January, 2012 approximately 16 lakhs of rupees have been spent on his treatment which has mostly been borne by his grandfather and partly by his parents. But now, an estimated 50 lakhs will be needed for the next treatment of which 25 lakhs approximately will be for the stem cell transplant alone.
We shall be much obliged if you can extend whatever help possible. Help us in saving Shrotrik’s life.
Thanking everyone for the solidarity.




Tuesday, April 03, 2012

পুরাকালের কিছু আবোল তাবোল-০৩


এই অভিলেখ, তুমি লেখো
 অক্ষ হিসেব এলোমেলো
উড়ে যায় তার ডানা
এখন তুমি লেখ
নতুন বর্ণমালা সাজ
ভেঙে গ্রামার ঠিকানা।

এবার তোমার পালা
লেখা হবে নতুন রঙ
নতুন আলোর ঠিকানা
বাদুড়েরা ফিরে গেল
অন্ধকারে বিড়ালের চোখ
জ্বলজ্বল করছে অতীত,
কুয়াশা ছেড়া রোদে
পালিয়ে গিয়েছে শীত
থরথর কাঁপে আঙ্গুল
বিরহী লেখনি আমার
ধুলোয় চাদর মুড়ে
পুরোনো টাইপরাইটার
চাঁদেরও বাড়ছে বয়স
গুলির আওয়াজ শুনে
উড়ে যায় মৌন সারস।

আমার নতুন সঙ্গীরা
ভালবাসে সফটওয়ার
তবু রেখে যায় দাগ
গিজগিজে বাড়ি-ঘর
আ্যন্টেনাহীন কাক।
দুরন্ত বিজ্ঞাপনে
ঢেকে যাওয়া মুখ
ব্লগ লেখ বাংলায়
পড়ে পাওয়া সুখ
কেন ছেড়ে দেব?
বরং এটা ওটা
লিখে যাব, রোজ
খুঁড়ে নেব বর্ণমালা
হৃদয়ের খোঁজ। 


১১ ই অক্টোবর, ২০০৬

পুরাকালের কিছু আবোল তাবোল ০২





এই ভাবে যদি বয়ে যাওয়া যেত ...

এভাবে মানে?
গানের মতো, না নদী?
না সময়? নাকি স্তব্ধতা?
হাত ধরে চলে যাই
সাঁকোগুলি পার
এই দ্যাখো পৃথিবী
এই ভাবে যদি
বয়ে যেত, বয়ে যেত নদী ...

হয়ত গানের মত, 
বা হতে পারে সময়ের মত,
কে জানে কিসের মত
বয়ে যেতে চায় ...

যে দিকে শুধু ছাই ওড়ে
চোখ করকর
তার চেয়ে এই ভালো
বসেছি ছায়ায় ...

এই দুটো হাত
এই সব ছোট্ট পৃথিবী
খানদানী রাস্তায় যেস ফরাস পেতেছি,
সব প্রশ্ন তো, তোমাকেই,
যেমন সব বন্দিশ ...

যাও পাখি, যাও, যাও উড়ে ...
ছাই নদীতে পড়লে মাটি,
জন্ম দেবে প্রকৃতির মতো
বিশ্বাসের মতো কোনো পাখি ...

নদী থাকে নদীর জায়গায়,
গাছেরা গাছের মত
থমকে যায় সময়
স্তব্ধ হয় বাতাস
কোথায় হাত?? কোথায়??

হাত তার এই ছিল ডানা, সময় পেলে না ...
দশ দশে গড়ি, তড়িঘড়ি, যাও যাও যাও ,আরেকটু এগোও ...

এতো লবনের স্বাদ
সমুদ্রে এলে বুঝি ?
উড়ে গেলে লাল হবে আকশের রং
ফুঁটে উঠবে ভোর ভঁয়ি রেখা
তখনো, তখনও একই বয়ে যাচ্ছে হাওয়া ।
সমস্ত পাতার পোশাক, এসো একে একে পরাই তোমায় ...

হঠাৎ তখন বৃষ্টি এলো, সাথে এলোমেলো হাওয়া
উড়ল ওড়নি
ভিজে রাস্তা,গছের পাতারাও ভিজে ...
চুলটাও কি ভিজে গেলো?
 
তোমায় নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিতে পারি, অথচ তুমি তো  ...


 ২৯ শে এপ্রিল, ২০০৭ 

পুরাকালের কিছু আবোল তাবোল

ওরা যায় আর আসে
ওরা প্রেম করে,
অল্প বাতাস,
নতুন পাতারা কেবল দোলে,
এদিক ওদিক ছড়িয়ে থাকা ফুল,
ভিজে ঘাসে দাগ রেখে যায় সাইকেলের চাকা
বারবার বারবার,
এদিক ওদিক
ওরা যায় আর আসে,
ওরা কথা বলে না,
বাতসেও কোন গান নেই,
ফুল রোজ ফুটতেই থাকে, রোজ
ওরা রোজ আসে,

বাতাস

ফুল
ঘাস

ওরা প্রেম করে।


১১ ই এপ্রিল, ২০০৭

Monday, March 05, 2012

খামখেয়ালে দেওয়াল লিখন

গুলাম আলী গাইছেন। আমি পড়ছিলাম অদিতি ফাল্গুণীর হেরুকের বীণা।  ইন্দ্রাণীর উইদাউট আ প্রিফেস। মাথার ভিতর শব্দের কুচকাওয়াজ। বাংলাদেশ বাংলাদেশ। মোচ্ছব। মোচ্ছব। আমি সেই মোচ্ছবে শামিল নই। কোনোভাবেই নই।  অসমাপ্ত লেখার ফোল্ডার ভর্তি লেখাগুলো সব আধখ্যাচড়া। দুই বা তিন প্যারাগ্রাফ। এর বেশি আর এগোয় না। কিছুতেই এগোয় না।

নিশুথি রাত। ম্যালা রাত। কুকুরগুলোও ঘুমিয়ে পড়েছে কখন যেন। বহুকাল বাদে এমন রাত।  মাথা ভার নেই, ওষুধের ঘোর নেই। ঘুম নেই। এমনকি নিত্যসঙ্গী ক্লান্তিও নেই। সোঁ সোঁ শব্দে জোর কদমে পাখা ঘুরছে, ঘুরেই চলেছে  অবিরত, অনন্ত। সুইচ না টেপা অবধি থামবে না, থামবেই না। রাত নিঝুম। নিঃঝুম। বহুদিন পর। গুলাম আলি গেয়েই চলেছেন, আপনি ধুন্‌মে রেহতা হুঁ/ ম্যায় ভি তেরে য্যায়সা হুঁ..কার মত তিনি?

 রাম আর কোক কবে থেকে যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে জো-তে। সেই জো। প্রেমে পড়ে এদেশে থেকে যেতে চেয়েছিল। অথবা প্রেমিককে নিয়ে যেতে চেয়েছিল সঙ্গে, নিজভূমে। প্রেমিকের ঘর-সংসার চুলোয় যাক। সে তো ভালবাসে। সে ভালবেসেছিল। ভালবাসায় ভরিয়ে দেবে সব, পূরণ করবে সমস্ত খামতি। যা কিছু পেছনে পড়ে থাকবে, সব, সমস্ত সে ভরিয়ে দেবে- এমনটাই ভেবেছিল সে.. ভালবাসায় নাকি কোনো দোষ নেই। যদি দোষই থাকত তবে থুড়ি না রাধা-কৃষ্ণ গাঁথা লোকমুখে ফিরত! কোনো দোষ নেই।! জো এমনটাই বিশ্বাস করত, করতে চেয়েছিল।

রাত নিঝুম। নিঃঝুম। ঘুমন্ত। কাল কখন যেন 'আজ' হয়ে গেছে। 'আজ' আবার হয়ে যাবে কাল। কাল কে দেখেছে! আমি তাই কাল-কে নিয়ে ভাবিত নই।  সমস্ত আজই কেমন করে যেন কাল হয়ে যায়। বা কাল হয়ে যায় আজ। এই যেমন আজ হয়েছে। খানিক আগে। না, বেশ আগে। আজ-টাই শুধু গতকাল হয়ে যায়, বাদবাকি সব আজ। আগামী বলে কিছু নেই। ।  নজরুল বলে গেছেন- প্রিয় এমনও রাত.. নজরুল থাকুন। বিদ্রোহী হয়ে। চিরকাল থাকুন। চির উন্নত শির নিয়ে থাকুন। কুচকাওয়াজে থাকুন। বদ্ধ, আবদ্ধ ঘরে না থাকতে চাওয়া নজরুল। বিশ্ব দেখতে চাওয়া নজরুল। ঘুমিয়ে আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। পাশেই মধুদার ক্যান্টিন।

সেদিন, কল্লোলদার গান ছিল ছবির হাটে। ক্ললোলদা একক। ছবির হাট থই থই।  সরু লাল পাড় সাদা শাড়ি নাসরীন। গম্ভীর মুখে কৃষ্ণাদি। অপেক্ষায় কাঁকন, কখন তুমি গাইবে, হেই ক্ষ্যাপা, মানুষ খুজো না! ব্যস্ত সমস্ত সাগর। আমি চুপচাপ এককোণে। সবে জানতে পারলাম, ছাব্বিশ বা সাতাশের আগে তিতাস কোনো নদীর নাম নয়- ছাপাখানার বিজলীবাতির আলো ছাড়িয়ে বাইরের আলো দেখতে পারছে না, পারবে না। রেশনের দোকানে কেরসিন বা চিনির লাইনের চাইতেও বড় লাইন বই-দের। আমার মন লাগে না। কল্লোলদা, আমার মন লাগে না তোমার গানে। ক্ষমা কোরো। তুমি করবেই আমি জানি। তুমিই তো বলেছিলে, গুরু পাওয়া যায় যত্র তত্র, শিষ্য মেলা ভার। আমি ফুটপাথে। ছবির হাটের বাইরে, রাস্তায়। ওয়াসিফ এলো। খানিক বসে থাকে চুপচা্প পাশে। বলে, যাবেন? নজরলের সমাধীতে? আমি কোনো কথা বলি না। ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তায়। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, মধুদার ক্যান্টিন। মন লাগে না। মনও লাগে না। মন পড়ে থাকে ছাপাখানায়, অনেক, অনেক বইয়ের লাইনে, সব, সমস্ত বইয়ের পেছনে লাইনে বসে থাকা আমার তিতাসে।  বিস্বাদ ঠেকে চা। শাপলুরা বসে গজল্লা করে বটতলায়, বলে, শ্যাজা, আসো, গজল্লা করো। মন লাগে না। মনও লাগে না। মন পড়ে থাকে, রয়, ছাপাখানার অন্ধকারে, তিতাসে।

আমি এগুই, এগিয়ে যাই, নজরুলের কাছে। থাকব নাকো বন্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে। আমার তিতাস গুমরে মরে, ছাপাখানার অন্ধকারে। আমার মন লাগে না। মনও লাগে না। কে যেন সেলফোন আবিষ্কার করেছিল, কেন করেছিল কে জানে! না করলে কী ক্ষতি হত!! কীই বা এমন ক্ষতি হতো!!  সেই সেলফোনে ঘন্টা নেজে যায়, বেজে যায়, বেজেই যায়.. লোকজন ব্যস্ত সমস্ত হয়ে অনর্গল ফোন বাজিয়েই চলেছে। কোথায় আছি, কার সঙ্গে আছি, কেন আছি!! তারা জানে না, জানতেও চায় না, আমি নজরুলের সঙ্গে আছি। খানিক থাকতে দে.. এমন রাতও কী বার বার আসে..
চল্ চল চল
উর্ধ গগনে বাজে মাদল
নিম্নে উতলা ধরণীতল
অরুণ প্রাতের তরুণ দল
চল চল চল, চল রে চল রে চল

থাকা হয় না বেশিক্ষণ নজরুলের সঙ্গে। ঘুমাও নজরুল,শান্তি কী অশান্তি জানি না, কিন্তু ঘুমাও তুমি। বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরে, মধুদার ক্যান্টিনের খানিক দূরে ঘুমাও তুমি। আধো আলো আধো অন্ধকারে ঘুমাও তুমি..

আমি এগুই। এগিয়ে যাই। আমার তিতাস যে অন্ধকারে। ওয়াসিফ চুপচাপ। কোনো কথা বলে না। ভাগ্যিস বলে না। আমি কোনো সান্তনা চাই না। আমার একটা বন্দুক চাই। চাই, কিন্তু পাই না। পাব না, জানি।ভাগ্যিস পাই না, দু দিন বাদেই সেই বিডিয়ার হত্যাকাণ্ড। রাস্তায় ট্যাঙ্ক, কার্ফিউ, মুহুর্মুহু গুলি আর বুকের ভিতর হাঁপরের শব্দ। না। আমার কোনো বন্দুক চাই না। আমি বিশ্বাস করি না বন্দুকের নলই ক্ষমতার সকল উৎস।  তাই চুপচাপ হন্ঠন। তাই নত মস্তক। গন্তব্য-ছবির হাট। সেখানে এতক্ষণে কাল্লোলদা হয়ত গান থামিয়েছে। কল্লোলদা নিশ্চয়ই ক্লান্ত। শেষমেশ কল্লোলদাও তো মানুষ। টানা তিন ঘন্টা একা হাতে সামলেছে ছবির হাট। এখন তো ফেরার পালা। পাঠশালায়।

মেঝেতে পাতা কার্পেট, তার উপরে তোষক, আর মতিভাইয়ের দাক্ষিণ্যে পাওয়া একখানা চাদর, যেখানে দিন কতকের অস্থায়ী বাস কল্লোলদা আর কৃষ্ণাদির । রেহানা, মতিভাইয়ের অর্ধাঙ্গিনী। আক্ষরিক অর্থেই। পাঠশালার বাসিন্দারা রেহানার ইচ্ছের অধীন।  মতিভাইও। খুলনার বাসিন্দা মতিভাই। আমি কখনও খুলনা যাইনি। আমি আর কোথায়ই বা গেছি! সে কথা থাক । কল্ললোদা।  আজিজ মার্কেটের কথা বলি বরং। চাচার সিডির দোকান। কল্লোলদা সেখানে কি একটা সিডি কিনতে গেছে। সঙ্গী কৃষ্ণাদি, মাসুদ। নাকি নাসু মিঞা! ভুলে গেছি!  সার্বক্ষণিক সঙ্গী গিটার খাপমুক্ত হয়, চাচার দোকানে গান শুরু হয়। আমি শুনিনি সেই সব গান। আমার মন, আমি অশরীরি হয়ে ছাপাখানায়, তিতাসের কাছে। চাচার সিডির দোকানে পৌঁছানোর আগে, আজিজে পা রাখতেই কানে আসে, সুখে থেকো ভালো থেকো, মনে রেখো এই আমারে! কৃষ্ণকলি আর চন্দনাদি।

আমাদের বাড়িতে দালান যখন তিন কোঠার ছিল, মাইঝের কোঠায়, আমার পিসিমার হাতে করা একখান বান্ধানি টাঙানো ছিল, কয়েকটা সবুজ সুতোয় বোনা ঘাস, সাতা সুতোর ফুল আর লাল সুতোয় লেখা- সুখে থেকো ভালো থেকো, মনে রেখো এই আমারে.. আমি আটকে যাই। থমকে যাই। চমকে যাই। সেই প্রথম কৃষ্ণকলি। সেই প্রথম চন্দনাদি। আমার পিসিমা আর এরা কোথায় যেন মিলে মিশে একাকার.. গীত গাওয়া পিসিমা আমার। রেডিও শুনে শুনে নজরুল গীতি গাওয়া পিসিমা আমার। পিসিমা জানে না, জানবেও না, সেই আটপৌরে শাড়ি, লুকিয়ে শোনা রেডিও, চুপি চুপি গাওয়া গান সব তার অক্ষয় হয়ে রয়ে গেছে কোথাও, আজও আছে সেই সব গান। সেই বান্ধানি আছে কিনা কে জানে। কথাগুলো এখন সুরে সুরে এখন ছড়িয়ে গেছে সবখানে, সবখানে..

ছাপাখানা বদল হয়। সিডিবন্দী হয় আমার তিতাস। নির্মলেন্দু। শক্তি আমি আর আমার কদমগাছ। সাগর হাত বাড়িয়ে দেয়। আরফান সঙ্গে থাকে। এলিফ্যান্ট রোড। কাঁটাবন। প্রেস। সূর্যের প্রথম আলোর সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশের আলো দেখার জন্যে মুখিয়ে থাকে তিতাস। সূর্য  ওঠে। আলোফোটে, সকাল এগোয় দুপুরে। ভুত সওয়ার হয় ছাপাখানায়, তিতাস আছে, আমি নেই। আমি আবার ফুটপাথে। পরনে ঢাকাই শাড়ি, ছবির হাট, ফুটপাথ আর আমি। শেষমেশ নামহীন তিতাস হাজির হয় একুশে বইমেলায়। ধুলোয় বসে আমি, পরনে ঢাকাই শাড়ি। ভুলে যাই, মনেই পড়ে না কাউকে বলা বা ডাকার কথা। আমার বই। প্রথম বই। হুয়ত বা একমাত্র। আমার তিতাস। বড় নীরবে, নিঃশব্দে বয়ে যায় একুশে বইমেলায়। কৃষ্ণাদি অনুযোগ করে, ডাকলে না.. আমার মনেই ছিল না, কাউকে বলা যায়, ডাকা যায়, গান-বাজনা বা নিদেন একটু প্রকাশের অনুষ্ঠান! কিছুই নেই। কিচ্ছু নেই। কিচ্ছুটি নেই.. আমার বন্ধুরা, আমার স্বজনেরা, আমার গুরু, কেউ নেই.. যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল! আমি তো কাউকে ডাকিইনি। আসলে ডাকার কথা মাথায়ও আসেনি যে..

দিন তারিখ হিসেব করলে সেদিনের সমস্ত কিছু আজ'গতকাল হয়ে গেছে। বা গত বছর বা তারও আগের বছর।  সমস্ত কিছু আজ স্মৃতি। কাল, পরশু বা তারও আগেকার স্মৃতি। আমিই শুধু স্মৃতিতে বাঁচি। সবকিছু, সবটুকু তাই আগলে বসে আছি আজও, এখনও। আমাকে ছেড়ে যায় না সেসব কিছুতেই, কিছুতেই আমার পিছু ছাড়ে না..

আমি ভাবতাম বা ভাবি  আমি স্মৃতিতে বাঁচি।  আসলে তা নয়, আমি শুধু আজকেই বাঁচি। শুধু আজকে। আজ-কে নিয়ে.. কোনো ভূত, কোনো ভবিষ্যত কিস্‌সু নয়, নেই, আছে শুধু আজ আর কিছু স্মৃতি কথকতা...