Saturday, November 16, 2013

আমার সোনার ময়না পাখী, কোন দ্যাশেতে উইড়া গেলা রে, দিয়া মোরে ফাঁকি...

নভেম্বর মাস জুড়ে মৃত্যুর ছায়া। মৃত্যুর গন্ধ।

দিকে দিকে জগদ্ধাত্রীর আহবান। প্যান্ডেল। চন্দননগরের আলোশিল্পিদের সবটুকু উজাড় করে সাজিয়ে দেওয়া আলো। মাইকে হিন্দি সিনেমার আইটেম সঙ। কোথাও বা আগমনী। আসি আসি শীত। কুঁড়ি না মেলা ফুলকপি আর ল্যাজায় ফুল সমেত থোকা থোকা শিম।

এতসবকিছুর সঙ্গে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে মৃত্যু। নিঃশ্বাসে বাতাস কম। সেরিব্রাল। কমজোরী হৃদপিণ্ড। পড়ে পাওয়া ভাঙ্গা হাত। নার্সিং হোম। ভেন্টিলেটার। যুদ্ধ চলে মৃত্যুর সঙ্গে।

সময়ের ভারে নুয়ে পড়া অশক্ত একটি মানুষ নেতাজীর মুর্তির পেছনের বাড়িটিতে বসে আজীবনের সঙ্গী মানুষটির অক্সিজেনের যোগান দেওয়ার চেষ্টা করে যায় আপ্রাণ। নিজের নিঃশ্বাসের বাতাসটুকুও দিতে পারলে সেটা দিতেও কার্পণ্য নেই। মৃত্যু বলে, আমি একটু ওদিক ঘুরে আসি, তুই আরেকটু বাতাস নিয়ে নে...

খুলে যায় ভেন্টিলেটর। হাসপাতালের শীতল মেঝেয় এক পা, দুই পা হাঁটা-হাঁটি। আশা জাগে মনে। এযাত্রায় বোধ হয় যেতে হল না...!

উৎসব উৎসব। নার্সিং হোমে ছুটির মেজাজ। ছুটিতে ডাক্তার। ছুটিতে নার্স। ছুটিতে আয়া। মরনাপন্ন রোগীকে অ্যাম্বুল্যান্সে চাপিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন ডাক্তারের দল। পেশেন্ট পার্টি ভাবে, বুঝি বা মানুষটি সেরেই উঠলেন! নাকে নল, বোতলবন্দী বাতাস আর সার্বক্ষণিক অ্যাটেনডেন্ট। মাপা জল, মাপা সেদ্ধ ডাল-ভাত।

সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী। বিজয়া।  উৎসবে মত্ত মানুষ। রাস্তা-ঘাট বন্ধ। রাত্রি জুড়ে মানুষের ঢল। অক্লান্ত ঢাক আর মাইক। এই সমস্ত শব্দজট ছাপিয়ে সজোরে কড়া নাড়ে মৃত্যু।  চার দিন, চার রাত্তির সঙ্গী আগলে বসে থাকা অশক্ত মানুষটিকে পিছু হটিয়ে ক্রমশ হেরে যেতে থাকা মানুষটির দখল নেয় সে। এবং সঙ্গে নিয়ে যায়। 

অক্সিজেন সিলিন্ডারে তখনও বুড়বুড়ি কেটেই চলেছে বাতাস...

Tuesday, September 10, 2013

শূন্য থেকে শুরু হয়ে শূন্যেতেই যায় ফিরে

দিন বদলের পালা নাকি পালা বদলের দিন?
সে যাই হোক না কেন বৃত্ত যেন একটাই
ঘুরছে ফিরছে আবার ঘুরছে আবার ফিরছে
সময়ের যাঁতায় পিষছে হৃদযন্ত্র।
হৃদয় তো নয় যেন থার্মোমিটারের পারদ
সহস্র কুচিতে ছড়িয়ে পড়ছে
অদৃশ্য যাদুকাঠির পরশে জুড়ছে
আবার ভাঙছে। অবিরাম। অবিরত।

Sunday, September 08, 2013

ব্লগের ভাষা। ব্লগের মতন কথা...!!

আজ রবিবার। আমি রবিবারকে চিনতে পারি মাংস রান্নার গন্ধ দিয়ে। জানালা দিয়ে নানান রকম মাংসের গন্ধ উড়ে এসে জানান দেয়, আজ রবিবার। আজ ব্যতিক্রম। জানালা দিয়ে ভুরভুর করে ইলিশের গন্ধ আসছে। প্রথমে মাছ ভাজার গন্ধ তারপর ঝোলের গন্ধ। পাগলা, মনটারে তুই বাঁধ...!!

সপ্তার প্রতিদিনই আমার রবিবার। ছুটি। ছেলের জন্যে সকালবেলায় তাড়া করে মাঝে-মধ্যে একটু নাশতা কখনও সখনও বানিয়ে দিই। বেশির ভাগ দিনই সে নিজে নিজেই কিছু-মিছু একটা খেয়ে বা না খেয়ে বেরিয়ে যায়। রবিবার শান্তি। ভুল করেও কোনো তাড়া নেই।

বিরস দিন বিরল কাজ। এর মধ্যে কোনো সমারোহ তো দূর, চুপি চুপিও প্রেম আসে না। নিতান্তই অপ্রেমে দিন কাটে। রাত। রাত আসে ঘুমের বড়ি নিয়ে। স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্নের তুমিময় রাত। ওষুধের ঘোর। সেই যে, সেই যে গো, ব্রেকডাউন হলো! তারপর আর
নেই কোনো ওভারহল।

গান-টানেরাও আজকাল চলে গেছে অনেক দূরে। কদাচিৎ ইউটিউব। দু-চারটে গান। ব্যস! একতারাটায় বোধ হয় ধুলো জমেছে... নাকি সে আর নেই কোথাও?? আসলেই কি ছিল কখনও স্বপ্ন ছাড়া অন্য কোথাও!...   গীতবিতান? থাক নাহয় সে বন্ধ...  তার উপর জমুক নাহয় কিছু সময়...

ইকড়ি মিকড়ি মোজাইকের দাগকাটা এক ঘর। মেঝেতে মাদুর পাতা। ঘরে বাতি জ্বলে না কোনো। চাঁদের আলোয় বিছানা ভেসে যায়। এ আমার গানঘর। এই ঘরে গান ফুরোয় না কখনও। আধখানা গান। সিকিখানা গান আর অনেক ক'টা গোটা গান। রয়েছে এমনকি এক লাইনের গানও। গান যেন না থামে কখনও! আমার এই গানঘরে গান থামে না। সুরে বা বে-সুরে খেলনা একতারাটা শুধু আমিই বাজাবো।


"ও গানওয়ালা, আরেকটা গান গাও, আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই, কিচ্ছু করার নেই..."


মাঝে মধ্যে কিছু চিঠি লিখে রাখা। যেসব চিঠিরা কোনো ঠিকানায় যায় না। কোনো ঠিকানা আসলে নেইও কোথাও। চিঠিরা তাই বন্দী থাকে ড্রাফটের খাঁচায়। কেন লিখি? জানি না তো... 

অনেক কথা, অ- নে- ক কথা বলবার থাকে যে... সেই কথাগুলো না বললে যদি হারিয়ে যায়? এমন কিছু মূল্যবানও নয় সেই সব কথা, যা হারিয়ে গেলে কারো কোনো ক্ষতি হবে। কিন্তু এতকিছু, এত কিছু হারিয়েছে যে এখন টুকরো সব ভাবনাও অমূল্য মনে হয়। নাই থাকুক কোনো ঠিকানা, অন্তত লিখে তো রাখি...সব পাখি ঘরে ফেরে না, সব নদী যায় না মোহনায়, আমার চিঠিও যায় না কোনো ঠিকানায়।

আমার কোনো কবিতা নেই। নেই কোনো অমৌলিক ভাবনাজট। আমার গদ্যেরা সহসা আমার কাছে আসে না। ধরা দেয় না। থেকে যায় তোমারই মতন, অধরা। এতে কোনো মাধূর্য নেই। ক্ষিদের পেটে পৃথিবী গদ্যময়। 

এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর। থেকে থেকে মেঘ জমে আকাশে। দ্রিমি দ্রিমি শব্দে মাদল বাজায় বাদল। বৃষ্টি। অঝোর ধারায় বৃষ্টিও হয়। আবার রাত পোহালেই রোদ। ঠা ঠা রোদ্দুর। বাতাসে ঘাম। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যায়। একফোটা জলও নেই কোথাও।


টুকরো টুকরো ভাবনাগুলোকে জুড়ে দিলেই দিব্যি একটা ব্লগ হয়ে যায়। তাই না? ব্লগের ভাষা। ব্লগের মতন কথা...!!



Wednesday, July 17, 2013

Nusrat Fateh Ali Khan

Wednesday, June 26, 2013

Kabir ke DOHE by JAGJIT AND KABIR

Tuesday, June 25, 2013

kumar-Gandharva (playlist)

Kumar Gandharva - Ud Jayega

আসল বাড়ি গোরস্থানে, একবার যেন স্মরণ হয়



একটা সময় ছিল যখন প্রায় রোজই আমি কিছু না কিছু লিখতাম। সেটা হয়ত পাতে দেওয়ার মতো কিছু নয়, হয়ত সামান্য একটা ব্লগ বা এমনি এমনি কিছু মিছু কয়েকটা লাইন, একটা ছোট্ট লেখা। কিন্তু লিখতাম। সে এখন অতীত। এখন ছমাসে ন’মাসেও কিছু লেখা হয় না। কখনো সময় পাই না, কখনো প্রচুর সময় কিন্তু অকারণ এটা ওটা সেটা করে সময় কাটাই, লেখার ধার-কাছ দিয়েও যাই না। আবার কখনও লেখার মতো কিছু খুঁজে পাই না। এই খানিক আগে বন্ধুবর শুভ্রদীপের একটা ছোট্ট লেখা পড়লাম। শবে বরাত নিয়ে। পড়ে খানিক চুপ করে বসে রইলাম। মনে পড়ল, এমনই এক শবে বরাতের দিনে একটা ছোট্ট লেখা লিখেছিলাম।  শবে বরাত নিয়ে পুরনো কিছু কথা। নিচে সেই কথা গুলোই, সেই লেখাটা্কেই একটু ভাং-চুর করে আজ আবার লিখলাম...

শবে বরাত।।
সন্ধে থেকেই বাজি-পটকা ফুটছে দূরে দূরে। হালকা হলেও শব্দ শোনা যায় একের পর এক বাজি পোড়ার, উৎসবের আওয়াজ শোনা যায় দূর থেকে হলেও। 

আজকে বরাতের রাত৷ সারারাত জেগে নামাজ পড়ার রাত৷ একশ রাকাত নফল নামাজ বা তারও বেশি৷ যে যত পড়তে পারে৷ রোজা রেখে, সারাদিন ধরে নানান রকমের হালুয়া বানিয়ে সন্ধেবেলায় দরজার বাইরে অপেক্ষারত সব ভিখিরিদের রুটি-হালুয়া বিলি করার রাত৷ না। আমার এই বাড়িতে কোনো ভিখিরি আসে না না দিনে, না সন্ধেয়৷ এ'পাড়ায় বোঝাও যায় না, কোনদিন শবে বরাত আর কোনদিন ঈদ৷ শুধু শবে বরাতের সন্ধেয় বাজি-পটকা ফাটে দূরে দূরে.. হালুয়া আমি এখনও বানাই তবে সে শুধু নিজেরা খাওয়ার জন্যে৷ খানিকটা ছোলার ডালের, খানিকটা মুগ ডালের আর খানিকটা সুজীর৷ ব্যস৷ 
এমন সব দিনে আমার পুরনো সব কথা মনে পড়ে পুরনো সেই দিনের কথা সেই কি ভোলা যায়...

নাহ
ভোলা যায় না।।

সে'বছর শবে বরাতের আগের দিন আমরা বাড়ি যাই, দেশের বাড়ি৷দাদা-দাদির কাছে। আব্বা বেশ কিছু নতুন জামা-কাপড় কিনে নিয়ে গিয়েছিল, অনেকগুলো শাড়িও৷ শবে বরাতে কেউ নতুন জামা-শাড়ি পরে না কেন কে জানে আব্বা সেবার সকলের জন্যে জামা-কাপড় নিয়ে এসেছিল। তার মধ্যে একটা নতুন শাড়ি ছিল আমার চাচি লাল রঙের জংলা ছাপের শাড়ি। বায়না করে বসলাম, আমিও শাড়ি পরব, নতুন শাড়ি পরে নামাজ পড়ব! আমর বয়স তখন কত? আট-নয় হবে বোধ হয়৷ সারাদিন ধরে চাচি রান্নাঘরে, চালের রুটি, হালুয়া আর রোজকার রান্না।

আমার দাদির একটা স্পেশাল হালুয়া ছিল, সেটা দাদি নিজেই বানাত এমনিতে দাদিকে রান্নাঘরে যেতে দেখিনি কখনো কিন্তু শবে বরাতের ওই স্পেশাল হালুয়া দাদি নিজে বানাত বিশাল এক হাঁড়ির মধ্যে একটু মোটা করে চালা চালের গুড়োকে ঘিয়ের মধ্যে নেড়ে নেড়ে চিনি আর গুড় মিশিয়ে হালুয়া বানাত দাদি, গোটা গোটা গরম মশলা আর কিশমিশ দিয়ে। সেই হালুয়া আর কাকে বানাতে দেখিনি কোথাও। কাউকে নয়, এমনকি আম্মাও না! 

ফকফকে সাদা চালের গুড়োর হালুয়াতে লাল রং আনার জন্যে দাদী চিনির সাথে গুড় মেশাত৷ তো সারাদিন ধরে রান্না হলো কয়েক পদের হালুয়া, রুটি, মাংস৷ এমনিতে আমাদের বাজারে সব সময় গরুর মাংস পাওয়া যেত না বিশেষ বিশেষ দিনে গরু জবাই হতো তখন যেমন শবে বরাতদাদা সকাল সকাল বাজার থেকে নিয়ে আসত সদ্য জবাই হওয়া গরুর মাংস৷

পুরো বাড়ি জুড়ে মিশ্র এক গন্ধ হালুয়া,ভুনা মাংস আর সেঁকা চালের রুটির গন্ধ৷ সব মিলিয়ে গোটা বাড়ি জুড়ে শুধু খাবারের গন্ধ৷ দুপুরের পর থেকেই লোক আসতে শুরু কর হালুয়া-রুটি খেতে বড় বড় সব থালা-কুলোর উপর পুরনো খবরের কাগজ বিছিয়ে ভাগ দিয়ে রাখা হতো সব হালুয়া রুটি তিনখানা করে রুটি আর তার উপর দাদির বানানো সেই হালুয়া এক খাবলা করে৷ 

সেই কোরবানির সময় থালায় করে মাংস রাখা হয় না? দশ-বারোটা করে ভাগ এক একটা থালায়? সব বাড়ি বাড়ি বিলে হবে বলে? এও ঠিক সেই রকম৷ এক একজন আসে, তার হাতে একটা করে রুটি-হালুয়ার ভাগ তুলে দেওয়া হয় সন্ধে পর্যন্ত চলে এই রুটি হালুয়া বিলি কোথা থেকে যে আসত সব মানুষ! এখনও কী আসে? কে জানে...

তিনসন্ধের সময় সূর্য যখন ডুবি ডুবি করছে, দাদি তখন জামা কাপড় নিয়ে পুকুরের দিকে রওয়ানা দেয় গোসল করবে বলে শবে বরাত-শবে কদরের সন্ধেয় গোসল করলে শরীর থেকে ঝরে পড়া পানির ফোঁটার সঙ্গে সমস্ত গুনাহ ঝরে পড়ে যায় শরীর থেকে। আমি তাই গোসল সেরে গা মুছি না। সূর্য ডোবা আর মাগরিবের আযানের মাঝের সময়টুকুতে ঝটপট গোসল সেরে ঘরে ফেরা, সারাদিনের উপবাস, রোযা খোলার জন্যে।

গোসল করে চাচি, আম্মা আর বাড়ির কাজের মহিলারাও। পুকুরে গোসল করতে আসে আমাদের পাড়ার আরো সব মেয়ে-বউরা এমনি সময়ে আমার চৌধুরানী দাদি এই পুকুরে অন্য কাকে নামতে না দিলেও এই রকম সব বিশেষ দিনগুলোতে কাকে কিছু বলে না ঝপ ঝপ দু-তিনখানা করে ডুব দিয়ে সদ্য নেমে আসা  আবছা অন্ধকারে পুকুরের পারে দাঁড়িয়ে ভিজে কাপড় ছেড়ে শুকনো কাপড় জড়িয়ে এক ছুটে বাড়ি এমনিতেই মাগরিবের নামাজের সময় খুব কম তার উপর মাগরিবের আগেই পড়ে নিতে হবে তাহিয়াতুল অজুর নামাজ সারাদিন রোজা রেখে, হালুয়া- রুটি বানিয়ে- বিলি করে সকলেই মোটামুটি ক্লান্ত৷ রোজা খুলেই মাগরিবের নামাজে দাঁড়াতে হবে। পবিত্র সন্ধ্যায় সময় ফুরোয় বড় তাড়াতাড়ি। 

রোযা খুলে মাগরিব অন্তে এশার নামাজের আগে অব্দি খানিক বিশ্রাম। চা, পান, খানিক গল্প-গুজব। কত লোক এলো সারাদিনে, কতজনকে খাওয়াতে পারা গেছে সেই নিয়ে আলোচনা। ফাঁকে ফাঁকে দাদি গল্প শোনায়। বরাতের রাতের গল্প। এই রাত প্রার্থনার রাত। ক্ষমা প্রার্থনার রাত। ভবিষ্যতের সুখ-সমৃদ্ধি আর নিরাপদ জীবনের প্রার্থনা করার রাত। প্রার্থনা মৃতদের জন্যে। তাঁদের আত্মার শান্তির জন্যে। তাঁদের যেন বেহেশ্‌ত নসীব হয়, প্রার্থনা সেই জন্যে। এই রাত- প্রার্থনা মঞ্জুর হওয়ার রাত।  মানুষের জন্যে আল্লাহ্‌ তাঁর রহ্‌মতের দরজা খুলে দেন এই রাতে। বিশ্বাসের সঙ্গে যা চাইবে তাই পাবে এমন এক রাত এই শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাত।

যেহেতু প্রার্থনা মঞ্জুর হবে তাই গোটা বছর যাঁরা নামাজ পড়ে না তাঁরাও এই রাতে নামাজে দাঁড়ায়। ছেলেরা সব মসজিদে যায়। অল্পবয়েসী ছেলের দল মসজিদে থাকার নাম করে ঘুরে বেড়ায় সারা রাত্তির ধরে। হই-হল্লা করে, বাজি-পটকা ফাটায়, কেউ কেউ হাঙ্গামাও করে অন্য পাড়ায় গিয়ে। সমস্ত রাত বাইরে থাকার এমন সুযোগ তো আর সচরাচর পাওয়া যায় না!

মসজিদ থেকে দাদা, আব্বা, কাকা এশার নামাজ সেরে বাড়ি ফিরলেই রাতের খাওয়া। কাল আবার রোজা। আর তারপর বরাতের রাতের নামাজ চলবে সারারাত ধরে চাচীর নতুন শাড়ি পরে আমিও তৈরি সারারাত নামাজ পড়ার জন্যে৷ 

সেদিন সারারাত চাচিকে প্রচন্ড জ্বালিয়েছিলাম৷ রুকুতে গিয়ে চাচীকে জিজ্ঞেস করা, চাচী, এরপর? বা সেজদা দেওয়ার সময় সেজদা না দিয়ে জানতে চাওয়া, কি পড়ব এখন? শেষমেশ বিরক্ত চাচির বলে ওঠা -আমি যা করি,দেখে দেখে সেটাই কর, কিছু পড়তে হবে না তোকে! মাঝরাত পেরিয়ে রাত যখন ভোরের দিকে আমদের তখন একশত রাকাত নামাজ পড়া শেষ! সে আমার প্রথম পড়া একশত  রাকাত নামাজ! 

আমাদের বাসায় আমরা, ভাই-বোনেরা সন্ধে থেকে মাঝরাত পর্যন্ত হই হুল্লোড় করে ঘুমিয়ে পড়তাম শবে বরাতে সারারাত জেগে নামাজ পড়া সেই প্রথম, চাচীর সঙ্গে। নামাজ শেষ হয়, রাত তখনও বাকি। একটু পরেই সেহরী খাওয়া কালকের রোযার জন্যে। আমি আর চাচী তখন বাড়ি থেকে বেরোই হাঁটব বলে
পায়ে পায়ে জড়ায় নতুন শাড়ি, বারে বারেই হোঁচট খাই বলে দুই হাতে শাড়ি যতটা তোলা যায়, তুলে হাঁটা। 

সুনসান রাত। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। পায়ের তলায় শিশিরে ভেজা ঘাস, খালি পায়ে ভেজা ঘাসের উপার দিয়ে আমরা হাঁটি। চাচি বলে, এই রাতে আল্লাহর রহমতের বর্ষা হয়। বুঝিয়ে বলে চাচি, বর্ষা মানে বৃষ্টি নয়, বৃষ্টির জলের মত রহমত –করুণা ঝরে আকাশ থেকে। রাতের শেষ প্রহরে নাকি ফেরেশতারা মাটিতে নেমে আসে, আর বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে ডাকে, কে জাগে রে? কেউ কি জাগে এই বাড়িতে? ফেরেশতারা যদি দেখতে পায় সবাই ঘুমিয়ে আছে, কেউ জেগে নেই তবে সেই বাড়ির লোকেদের উপর অভিশাপ দিতে দিতে তারা চলে যায় অন্য বাড়ির দিকে।  

আকাশ থেকে এই রাতে কয়েক ফোটা জল ঝরে পৃথিবীর উপরে। শিশিরবিন্দুর মত জল। এই জল মানুষের গায়ে পড়লে সেই মানুষ হয় রাজা বা বাদ্‌শাহ। মাটিতে পড়লে সেই মাটি হয় উর্বর। নদীতে পড়লে সেই নদীর জল কখনও শুকোয় না। সেই নদীতে মাছ হয় অফুরন্ত। যদি হরিণের গায়ে পড়ে তবে সেই হরিণ হয় মৃগনাভী। এমনি আরও কত কত গল্প করে চাচি। আমি তখন দুই হাত দু’দিকে ছড়িয়ে দিয়ে গোটা উঠোন জুড়ে ছুটে বেড়াই। সেই জল যদি পড়ে তবে সে যেন আমার গায়েই পড়ে!

এ'উঠোন ও'উঠোন ঘুরে আমরা ছোট্ট পাড়াটা ঘুরে যাই কবরস্থান অব্দি৷ বাঁশঝাড়ে ঢাকা কবরস্থানে ঢুকতে আমি দিনের বেলাতেও রাজী নই কিন্তু চাচি অভয় দেয়, বলে, শবে বরাতএর রাতে শয়তান-ভূত-প্রেত সব বাঁধা থাকে শেকলে। তারা বাঁধা থাকবে রোযা পেরিয়ে সেই ঈদ অব্দি। কাজেই কবরের দিকে যেতে কোনো ভয় নেই! শুধুমাত্র এই কথাগুলোতেই অভয় পাই এমনটা নয়। একটু দূরে দূরে কবর সব ভেঙ্গে ভেঙ্গে ভেতরে মাটি ঢুকে যাওয়া কবরের সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে চাচী প্রার্থনা করে। সেই রাতে, পূর্ণিমার ওই রাতের শেষ প্রহরে কী যেন ছিল, চাচির পাশে নির্ভয়ে, নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকি কবরস্থানে, কবরের সামনে
-------------


আজ চাচি নেই। বড় অসময়ে চাচি আমার চলে গেছে ওই কবরস্থানে, যেখানে এক শবে বরাতের রাতে আমরা দাঁড়িয়েছিলাম...

Monday, June 17, 2013

আধখানা চাঁদ আমার সঙ্গে এলো

আধখানা চাঁদ রেখে এলাম তোমার জানালায়
অর্ধেক তার আমার সঙ্গে এলো

তোমার গান শুনবে বলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে জোছনা বসে আছে
পূবের বারান্দায়, দক্ষিণের জানালায়, মাদুরকাঠির পাটিতে 
আর অগোছালো শয্যায়...

গাইবে কি একটা গান? 
আনমনে, অকারণে...

নিয়ম মেনে আধখানা চাঁদ আমার সঙ্গে এলো
একলা, না যেন ফিরি আমি ঘরে...



Saturday, June 15, 2013

খাঁচার ভিতর অচিন পাখী কমনে আসে যায়

মাঝে মাঝে নিজের শরীর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি আমি। ইচ্ছে বা অনিচ্ছে কিছুই কাজ করে না। ব্যস বেরিয়ে পড়ি। খুব বেশি দূরে যাই না। খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে অন্য আমাকে দেখি। খুব অবাক লাগে। নিষ্পলক তাকিয়ে থাকি নিজেরই দিকে।

খানিক দূরে যে আমি দাঁড়িয়ে থাকি সেই আমাতে কোনো অনুভূতি কাজ করে না। কোনো ভাবনাও আসে না। যেন একটা মৃত শরীর বা মৃত আমি। ঠাণ্ডা আর নিরুত্তাপ। যেন কোনো অদৃশ্য ইশারায় হাত নড়ে, পা নড়ে, হাতের কাজ সারি, হেঁটে চলে বেড়াই। খানিক দূরে দাঁড়ানো আমি কিছু বলতে চাই। কথা বলতে চাই। প্রাণপণ চেষ্টা করি কথা বলবার। ঠোঁট নড়ে না। শব্দ ফোটে না। কথা বলব কি করে, আমার তো মুখ নেই, শরীর নেই। আমার শরীর, সে ওই যে খানিক দূরে ভাষাহীন মৃত দুই চোখ নিয়ে রোবটের মতন কী সব যেন করে বেড়াচ্ছে।

নিজের মধ্যে ঢুকে যেতে চাই। যে শরীর ছেড়ে দূরে দাঁড়িয়ে আছি সেই শরীরের আশ্রয় চাই। কিন্তু এই অশরীরি আমারও নিজের উপর কোনো বশ থাকে না। কে জানে কার বা কিসের ইশারায় নাকি ইচ্ছেতে এমন দুই ভাগে ভাগ হয়ে নিরুপায় তাকিয়ে থাকি নিজেরই দিকে। আপেক্ষা, কতক্ষণে ফিরে পাব নিজেকে...

শহরে তুমি নেই

শহরে তুমি নেই
তবুও নিয়ম মেনে বর্ষা এসেছে
মেঘ বৃষ্টি রোদ আর
মন খারাপের খেলা চলে এ'বেলা ও'বেলা

টেলিভিশনে বর্ষার গান
খবরের কাগজে ধর্ষণ আর হত্যা
শহরে তুমি নেই
আমার ভয় করে। ভীষণ ভয়।