Thursday, September 20, 2012

যেখানে নতুন ভোরের অপেক্ষায় এক জীবন বিষাদ সিন্ধু

তখনো আলো ফোটে নি। তখনো সে বিছানায় এ’পাশ ও’পাশ করছে। জোর করে বন্ধ করে রেখে রেখে চোখে একটা কেমন ব্যথা। বন্ধ চোখে সব অন্ধকার। চোখ খুললে –সেও অন্ধকার। বন্ধ করে রাখা জানলা, জানলার পর্দা ভেদ করে রাত্রি নগরীর যতটুকু আলো জোর করে ঢুকে পড়ছে ঘরে, যেন ওই অন্ধকারকেই আরো বেশী করে ভরাট করে তুলছে। সে বিছানায় কেবল এ’পাশ ও’পাশ। কখনো বা পাশের বালিশটা নিজের বুকে চেপে ধরছে। না, ভুল হল কি তোমার? এখানে এখন কিন্তু কোনো কাম ভাব নয়– রাত্রি, বিছানা, সে, পাশবালিশ –তোমায় দোষ দেব না প্রিয় পাঠিকা, অমনটা ভেবে নেওয়াই স্বাভাবিক। অমনটাই রীতি। কিন্তু এ তো সেই নিয়মের মুহূর্ত নয়। এক নিতান্ত অনিয়ম –অনিয়মের দিন আর অনিয়মের রাতের কথা। 
এ নিতান্তই কল্পকথা। তো সেই কল্পকথার এই মানুষটি, যে –তখনো ভোরের প্রথম আলো মাথার কাছে পূর্বের জানালা দিয়ে বিছানায় এসে পড়ে নি –সমস্ত রাত একটা ঘোরের মধ্যে কাটিয়ে প্রার্থনা করছে ভোরের প্রথম আলোর, সে, আরো একবার, পাশের বালিশটা নিজের বুকে চেপে ধরল। 
বুকে চেপে ধরা সেই বালিশ তার প্রিয়া হয়ে ওঠে নি, তার গোপন প্রেমিকার রূপক হয়ে ওঠে নি। জোরে নিজের বুকে চেপে ধরা সে বালিশ নিতান্তই বালিশ। আসলে সে চাইল কিছু একটা নিজের বুকে চেপে ধরতে, একটা কোনও চাপ দিতে নিজের বুকে। বাইরে থেকে কোনও একটা চাপ, ভিতরে বয়ে বেড়ানো নিজেরই সৃষ্টি করা সেই অসম্ভব চাপের সাথে পাল্লা দেবে, এমন কোনও চাপ। হয়ত কিছু আরাম হবে তাতে। সেই অবস্থায় সে নিজের ছোটবেলার কথা মনে করবে। নিজেকে অন্য কথা ভাবাবে। 
যতক্ষণ না আলো ফোটে, যতক্ষণ না দরজা খুলে রাস্তায় চলে যেতে পারে, এ’ভাবে অন্য ভাবে, নিজের ছোটবেলার কথা, সেই ছোট্ট শহরের কথা, বাবার সাথে তিনখানা মাঠ পেরিয়ে বকুল গাছের পাশে দু’টো কবরের কাছে তখনো মৃত্যুরহস্য-জন্মরহস্যের ও’পারে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে বুঝতে চেষ্টা করা দু’টো চিরতরে ঘুমন্ত মানুষ কী ভাবে অনন্তকালের জন্য ওইখানে ওইভাবে শুয়ে আছে আজীবন, মুহূর্তেই আবার সে’সব ভুলে ছোট্ট ফুটবল নিয়ে খানিক লাথালাথি, ফেরার সময় দু’হাত, কোঁচড় ভরে বকুল ফুল নিয়ে বাবার হাত ধরে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে বাড়ি ফিরে সেই ফুল ঘরে রেখে দেওয়া, কখনও স্নান সেরে বেরুনো ভেজা চুল মায়ের ঠাকুরের আসন দেওয়ার নকল করে ঠাকুরের সামনে ফুল দিয়ে নিজের মত করে দেড় মিনিটের গম্ভীর পুজো করা, কখনো বা লুকিয়ে সুতো-কাঠি জোগাড় করে মালা গাঁথা, নিজেই সেই মালা ছিঁড়ে একসা করে ঘরময় বকুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে মায়ের বকুনির ভয়ে জ্যেঠির ঘরে গিয়ে বসে থাকা, আর আরো কত কী। 
সে চেষ্টা করে সে সমস্ত ভাবতে। নিজেকে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে। পাড়ি দিতে জন্মের কাছাকাছি –যাকে নির্মল বলে ভাবতে ভালবাসে –পৌঁছে যেতে; নিজেকে স্থিত করতে, শান্ত করতে। তবু সেই অস্থিরতা, সেই সময়টা মনে পড়ে –রাত্রি এগারোটা পঁয়ত্রিশ –আর এক মুহূর্তে যেন পৃথিবীর সমস্ত জননীর প্রসব বেদনা এসে ভীড় করে তার ভিতরে, তার শরীরে, তার বুকের কাছে। সেই বুক, যেখানে ফেলে আসা সন্ধ্যাবেলায় তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি নিশ্চিন্ত আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল। সেই বুক, যেখানে নতুন ভোরের অপেক্ষায় এক জীবন বিষাদ সিন্ধু।

শুভ্রদীপ দাশগুপ্ত
১৩.০৯.১২

No comments:

Post a Comment