Sunday, September 23, 2012

জ্বরবেলা এখন ও তখন

দিনকাল কত বদলে গেছে কিন্তু কিছু জিনিস এখনও বদলায়নি। বদলায়নি আমার ঠকঠকিয়ে কাঁপুনি দিয়ে ভালুকজ্বর আসা। ছেলেবেলার মত মনে হওয়া যে -দাঁতকপাটি লাগছে, ভেতরে ভেতরে অসম্ভব কাঁপুনি, অথচ শরীর কাঁপে না একটুও। জ্বরের ঘোরে মুহূর্তে মুহূর্তে চমকে ওঠা, ভয় পাওয়া, মনে হওয়া যে কারা যেন ঘরের মধ্যে হেঁটে-চলে বেড়াচ্ছে। ঘোরের মধ্যে চোখের সামনে নানান রঙের আলোর বলয়দের ঘুরে বেড়ানো, গোল গোল ঝিলিমিলি আলো, এঁকে-বেঁকে যাওয়া সব রামধনু আলো, খুব কান্না পাওয়া, আব্বার সঙ্গে কথা বলতে চাওয়া, আম্মার মশলার গন্ধওয়ালা হাত আর আঁচল খোঁজা –যা ভিজিয়ে আম্মা জ্বরতপ্ত মুখ-গলা, হাত-পা মুছিয়ে দিত, তপ্ত দুই চোখের উপর রেখে দিত সেই আঁচল, প্রিয় মানুষের হাতের স্পর্শ পাওয়ার ইচ্ছেগুলো বদলায়নি একটুও...

যা বদলেছে -এখন জ্বর এলে ইন্দোদাদা-কে একটা ফোন করি, ইন্দোদাদা ওষুধ বলে দেয়, কখনও কিছু পরীক্ষা করতে বলে, কখনও শুধু ওষুধ বলে দেয়,বাবু সেগুলো লিখে নেয়। সেই ওষুধ একবার মাত্র খেলেই জ্বর ‘নরম' হয়ে যায়। -এই ‘জ্বর নরম’ কথাটা আমার দাদি বলত।  ওষুধ খেয়ে দু'দিনের মাথায় আমি হেঁটে-চলে বেড়াই, ঘরের কাজ-কম্ম করি, ফেসবুকে নোট লিখতে বসি। ইন্দোদাদার ফোনে বাৎলানো বিধান অনুযায়ী প্রচুর পরিমানে ওআরএস খাওয়ার ফলে দুর্বলতাও থাকে না। আমার ছেলে বলে –ইন্দো ডাক্তার জিন্দাবাদ!

ডাক্তার প্রসঙ্গে গতকাল রাত থেকেই মনে পড়ছে আমাদের গাঁয়ের এক ডাক্তারবাবুর কথা। এক বর্ষাকালের কথা, অনেক চেষ্টা করেও আমি সেই ডাক্তারবাবুর নাম মনে করতে পারছি না। বহু বহু বছর আগের কথা। সেবছর ছুটিতে বাড়ি গিয়ে কিছুতেই আব্বা-আম্মার সঙ্গে সিলেট ফিরতে চাইলাম না। আরও একটা সপ্তা থেকে যাওয়ার জন্যে রাত থেকেই কান্নাকাটি, সকাল হতেই দাদির খাটের তলায় লুকিয়ে থাকা, স্কুল শুরু হতে এখনও তো এক সপ্তাহ বাকি, কাকা নাহয় পৌঁছে দিয়ে আসবে গিয়ে। শেষমেশ দাদির কথায় আব্বা রাজী হল রেখে যেতে। আমিও বেরিয়ে আসি খাটের তলা থেকে। ভরা বর্ষা। চারিদিকে থৈ থৈ পানি, একটুখানি জেগে আছে শুধু পুকুরের পারগুলো আর বড় রাস্তা অব্দি যাওয়ার কাঁচা সড়ক।

রোদের দেখা নেই, সারাদিন আকাশের মুখ ভার হয়ে থাকে, থেকে থেকেই অঝোর বৃষ্টি। পুকুরের পশ্চিমপারের বাঁশঝাঁড়ের ওধারের খালে টলটলে জল, জলের ভেতর দেখা যায় শ্যাওলায় ঢাকা নানান রকমের লতা-গুল্ম। মনে প্রবল বাসনা, এই খালে নেমে সাঁতার কাটব, বারবার বাড়ির দিকে তাকাই, কাকা কোথায়? কদ্দূর গেছে? দেখতে বা জানতে পেলে আর রক্ষে নেই –এই ভেবে নিজেকে বিরত রাখি খালে নামা থেকে। খানিক দূরে তাকালেই ডুবে যাওয়া সব ক্ষেত-খামার, মৃদু বাতাসে ঢেউ খেলা টলটলে জল, আকাশের মেঘের ছায়া পরে যা কালচে দেখায়। আরেকটু দূরে নজর করে তাকালে দেখা যায় শাপলা বিল। গোটা বিল জুড়ে শাপলা ফুটে থাকে বলে বিলের নামই শাপলাবিল। যেদিন আকাশ একটু পরিষ্কার থাকে, বৃষ্টি থেমে যায়, দাদিকে বললেই বিকেল বেলায় মজিদ ভাইকে নিয়ে নৌকায় করে শাপলা বিলে যাই আমি আর দাদি। দাদি সঙ্গে নেয় রেডিও। নৌকার ধারে বসে আমি টেনে টেনে সব শাপলা তুলি, শালুক খুঁজি, পুড়িয়ে খাব বলে। দাদি ভয় দেখায়, পানির দিনে নাকি সাপেরা থাকার জায়গা পায় না তখন এই সব শাপলাদের গায়ে গায়ে বিষওয়ালা সাপেরা সব জড়িয়ে থাকে, একবার কামড়ে দিলেই শেষ! খানিক শান্ত হয়ে বসে থাকা আবার শাপলা টেনে টেনে নৌকা ভর্তি করা।

সমস্ত দিনে অসংখ্যবার পুকুরে স্নান, পাড়ায় এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়ানো আরও অনেক রকম কাজ-কর্ম করে সন্ধে হলেই চাচির বিছানায়। থালায় ভাত নিয়ে হ্যারিকেনের আলোয় পাখির ডিম, মুরগির ডিম, ময়নার ডিম সব খাওয়ায় চাচি আর গল্প শোনায়। কখন যেন ডিমগুলো সব শেষ হয়ে যায়! চাচি উঠে যায় থালা নিয়ে, আমি গিয়ে দাদির বিছানায় দাদির কোল ঘেঁষে শুয়ে পড়ি। দাদি খানিক গল্প বলে, বিবিদের কিস্‌সা, নবী-রাসুলদের গল্প, আজুজ-মাজুজের কিস্‌সা। এক একদিন একটা গল্প। দাদির হাতে সমানে ঘোরে বাড়িতে বোনা তালপাতার পাখা। আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের মধ্যেও দাদি কেমন করে যেন সারারাত পাখা ঘোরায়। একটুও গরম লাগে না আমার!

কাকা বাড়ি না থাকলে ঘন্টার পর ঘন্টা পুকুরে পড়ে থাকতাম। বাড়ি গেলেই চাচির কাপড়কাটা কাঁচি নিয়ে মাথার চুলের গোছা ধরে কচ কচ করে সব চুল কেটে ফেলতাম, পিঠ অব্দি লম্বা চুল ভিজে থাকে, জলদি শুকায় না, আর কাকা বাড়ি এসে সবার আগে চুলেই হাত দেয়, চুল বিকেল অব্দি ভেজা থাকা মানেই সারাদিন আমি পুকুরে ছিলাম! ছোট চুল তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায় বলে এভাবে চুল আমি প্রত্যেকবারেই কেটে ফেলি, যখনই বাড়ি যাই। এবড়ো-খেবড়ো চুল চাচি পরে সমান করে ছেঁটে দেয় ছেলেদের মতন করে। কাকার কাছে তবুও রক্ষে নেই, ছোট চুল দেখলেই বুঝে যায় কেন এই চুল কাটা হল। মারে না যদিও কিন্তু চোখ লাল করে এমনভাবে তাকায় যে শরীরের সব সব রক্ত পানি হয়ে যায় দুই মিনিটেই! চাচির পেছনে গিয়ে চাচির কোমর জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি যতক্ষণ কাকার গজগজানি শোনা যায়। প্রত্যেক বার একটাই কথা দিয়ে থামে, ‘বর্ষাইত্যা পানি, জ্বর-জারি হইলে ডাক্তর পামু কই? এই শয়তানেরে ভাইসাবে কিয়ের লাইগ্যা যে থুইয়া গেসে আল্লায় জানে! বারে বারে কইসি, লগে লইয়া যান, বাড়িত থাকলে কেউর কতা হোনে না!’

এবং জ্বর আসে। ধুম জ্বর। ঘরে ঘরে তখন থার্মোমিটার থাকে না, আমাদের বাড়িতে যদিও ছিল কিন্তু চাচির ছেলের আবার পারদ ভীষণ পছন্দ! থার্মোমিটার বাড়িতে এলেই ধান্দায় থাকে, কতক্ষণে ওটা হাতে পাওয়া যাবে। পারদকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে আবার জুড়ে দেওয়া, গোটা পারদটাকে খাতার পাতা ছিঁড়ে তাতে তুলে নিতে আমার যে ভাল লাগে না এমন নয় কিন্তু একটা আস্ত থার্মোমিটার আমি ভেঙ্গে ফেলি না পারদের জন্যে। ওগুলো ভাইয়া আর চাচির ছেলে জুন্নুনের কাজ। পারদ দিয়ে খেলা চলে অতএব জ্বর কত দেখার উপায় নেই।

এদিকে পানি বাড়ছে দিনে চার আঙ্গুল তো রাতে আট আঙ্গুল। এগুলো কাকার হিসেব। তাঁর চিন্তা পুকুর আর পুকুরের মাছেদের নিয়ে।  পুকুরের পার ডোবে ডোবে অবস্থা। বড় রাস্তায় যাওয়ার যে একমাত্র সড়ক সে নাকি অনেক জায়গাতেই ডুবে গেছে। কাকা সারাদিন ব্যস্ত জাল দিয়ে গোটা পুকুর ঘেরায়, প্রচুর মাছ আছে পুকুরে, একটা পার ডোবা মানেই সমস্ত মাছ বেরিয়ে প্রথমে খালে আর তারপর যে যেদিকে পারে ছুট লাগাবে। সারা রাত কাকা একহাতে পাঁচ ব্যটারির বড় টর্চ অন্য হাতে লাঠি নিয়ে  পুকুর পারে ঘুরে ঘুরে খালের জল মাপে। পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে আমার জ্বর। দাদি সারাদিন বসে থাকে মাথার কাছে, কপালে-গলায় হাত দিয়ে জ্বএ দেখে, বুঝতে না পেরে নিজের গাল ঠেকায় আমার গালে কপালে, বলে, ‘খৈ ফুটতাসে গো জ্বরে!’ মাথায় পট্টি দেয় আর গজগজ করে, ‘মিন্টুইন্যা যে বকে তোরে এমনি এমনি বকে? অহন ভোগান্তিডা কার অইত্যাসে?’

বিছানার উপরে অয়েলক্লথ বিছিয়ে মাথা বিছানার কিনারায় রেখে মেঝেতে রাখে বড় গামলা, তারপর কলসির পর কলসি পানি ঢালি চাচি দিনে দু-তিনবার করে। জ্বর খানিকটা নামে, আবার ধুম জ্বর। বাজারে বসেন সেই ডাক্তারবাবু। গ্রামের একমাত্র ডাক্তার। এলএমএফ ডাক্তার। কাকা নৌকায় করে গিয়ে ওষুধ নিয়ে আসে। কাগজ কেটে দাগ দিয়ে আঠা দিয়ে আটকানো কাঁচের শিশিতে রাখা লাল রঙের মিক্সচার, কাগজে মোড়ানো সাদা সাদা বড়ি। যেমনি তেতো সেই মিক্সচার, ঠিক ততখানিই তেতো সেই সাদা বড়ি, খেলেই ওয়াক আসে। গাছের গন্ধরাজ লেবু দিয়ে শরবত বানিয়ে খাওয়ায় চাচি, আমি খেয়েই হড়হড়িয়ে বমি করি। আবার ঝিম মেরে পড়ে থাকি। চোখের সামনে নানান রঙের আলোর বলয়। লাল, নীল, সোনালী, হলুদ। কখনও তারা ঘুরে বেড়ায় ঘরময়, কখনও স্থির দাঁড়িয়ে থাকে চোখের সমুখে। একই আকারের থাকে না আলোগুলো। ভাংচুর চলতেই থাকে। কখনো লম্বা রেখা হয়ে ঘুরে বেড়ায় আশে-পাশে, আবার কখনও সাতরঙা রামধনু হয়ে যায়।

আমি আলো দেখে দেখে ক্লান্ত। ভয় লাগে। আম্মার কাছে যেতে চাই। কাকা এসে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। দাদি দোয়া পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে সেই পানি খাওয়ায়, আমি আবার বমি করি। ঘোরের মধ্যে মনে হয় যেন চোয়াল দুটো ঢুকে যাচ্ছে একটার ভেতর আরেকটা। যেন দাঁত কপাটি লাগছে। কথা বলার চেষ্টা করি, পারি না। ভেতরে ভেতরে কাঁপুনি শুরু হয় গোটা শরীর জুড়ে। প্রচণ্ড ভয় লাগে, জানি, একবার কথা বলে ফেলতে পারলেই চলে যাবে এই কাঁপুনি, চোয়াল খুলে যাবে কিন্তু পারি না, স্বর ফোটে না। চোখ দিয়ে জল গড়ায় আপনা থেকেই। একসময় থামে কাঁপুনি, খুলে যায় চোয়াল, শক্ত করে চাচিকে ধরে থাকি, ‘চাচিআম্মা, আমার ডর করে।’ বিছানা থেকে তুলে কোলে নিয়ে বসে চাচি। কাকাকে বলে, ‘বিকালে গিয়া ডাক্তরবাবুরে লইয়া আইও, আমার ভালা ঠেকত্যাসে না, ভাইসাবেরে খবর দ্যাও।’

ডাক্তারবাবু আসেন। পরনে হাফহাতা সাদা ফতুয়া আর সাদা ধুতি, বিশাল লম্বা ঢ্যাঙ্গা চেহারা, ধনুকের মতন বাঁকানো নাক। দাদার কাছাকাছি বয়েস কিন্তু দাদার চেয়ে অনেক বেশি শক্ত। ছোটোখাটো কিছু হলে কাকা গিয়ে বলে ওষুধ নিয়ে আসে, অসুখ সেরে যায়, বাড়াবাড়ি হলে কাকা গিয়ে বাড়ি নিয়ে আসে তাঁকে। আমাদের বাড়ি থেকে দেড়মাইল দূরের বাজারে তাঁর ওষুধের ডিসপেন্সারি, ওখানে বসেই রোগীও দেখেন। এমনি দিনে দেড় মেইল দূরের বাজার থেকে লম্বা লম্বা পা ফেলে হনহনিয়ে হেঁটে চলে আসেন, কাকা হেঁটে পারে না তাঁর সঙ্গে, কিন্তু এই বন্যায় বড় রাস্তা থেকে  আমাদের বাড়ি অব্দি একমাইলের  কাঁচা সড়ক পানির তলায়, কাকা নৌকা করে যায়, বেঁধে রাখে রাস্তার ধারে খালে অন্য আরও অনেক নৌকার সঙ্গে, খাল যেখান থেকে এগিয়ে গেছে তিতাসের দিকে।

পরপর তিনদিন আসেন সেই ডাক্তার। সেই একই রকম ফতুয়া আর ধুতি পরনে, পায়ে রাবারের চটি। রোজ এসে একই কথা জিজ্ঞেস করেন, ‘খুকুমণির জ্বর ছাড়ে না কিয়ের লাইগ্যা?’ প্রথম দিন এসেই বুকে স্টেথো রেখে দেখে নিয়ে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দাদা, দাদি, কাকা, চাচি সবার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘জলে ডুবাইয়া ডুবাইয়া খুকুমণি কফ জমাইসইন বুকত, সারতে সমো লাগবো গো মেন্টু মিঞা।’ শুনেই জোরে চোখ টিপে বন্ধ করে ফেলি আমি, কাকার হিমঠাণ্ডা চোখে যেন আমার চোখ কিছুতেই না পড়ে! কাগজে মোড়ানো সাদা বড়ি, একটা মিক্সচারের সঙ্গে যোগ হয় আরো তেতো এক মিক্সচার, ছদিনের মাথায় জ্বর ছাড়ে।

রেডিওতে দাদি-কাকা খবর শোনে, বন্যায় নাকি রেললাইনও ডুবে গেছে। আমি ভাবি, বাঁচা গেছে, এই সপ্তায় অন্তত কাকা আমাকে নিয়ে যেতে পারবেই না সিলেট! গোসলের সময় কাকা দাঁড়িয়ে থাকে পুকুর পারে, নো সাঁতার কাটা, নো ডুবা-ডুবি, তিনখান ডুব দাও তারপর সিধে উঠে আসো গামছা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা কাকার কাছে! কাকা যা বলে, চুপচাপ করি সেগুলো, মনে ভাবি, কদিন আর চোখে চোখে রাখবে, দু-এক দিন যাক তারপর দেখা যাবে...

No comments:

Post a Comment