Friday, August 31, 2012

মন ভাঙ্গা আর মস্‌জিদ ভাঙ্গা সমান কথা


কদিন ধরে বাবরী মস্‌জিদের কথা মনে পড়ছে। ছ’তারিখে ভেঙ্গেছিল না বাবরী মসজিদ? আর নয় তারিখে কলকাতায় দাঙ্গা। বোধ হয় এই তারিখগুলো এবং ঘটনাক্রমে সদ্য এক ছয় এবং নয় তারিখে ঘটে যাওয়া একান্ত ব্যক্তিগত কিছু ঘটনাবলীর সঙ্গে খানিকটা যোগসূত্র এবং অবশ্যই এই দুটো তারিখ, যার জন্যে এই বাবরী মসজিদ, এই ছ’তারিখ আর ন’তারিখেরা বারে বারে ফিরে ফিরে আসছে। মনে পড়ে যাচ্ছে সেই সময়কার থমথমে সেই তিন দিন। ছয়ের পরে ন’তারিখ রাত অব্দি থমথমে সেই সময় এবং তারপর ন'তারিখের সেই কাল রাত।

রাত বোধ হয় এগারটা হবে তখন। বাচ্চা দুটো দস্যিপানা সেরে সবে ঘুমিয়েছে। খাওয়া দাওয়া সেরে রান্নাঘরে সেদিনকার মত শেষবারের গোছগাছ করছি। পাশের টায়ারগলি, পুরনো ড্রামের গুদামের ওপাশের মিছরিগলি থেকে হঠাৎ মানুষের ছোটাছুটি, একসঙ্গে অনেক মানুষের চীৎকার চেঁচামেচি আর দৌড়াদৌড়ির আওয়াজ কানে আসে। চারতলার ছোট্ট ফ্ল্যাটের চিলতে বারান্দায় গিয়ে দাড়াই। আওয়াজগুলো ক্রমশ বদলে যেতে থাকে। আশে পাশের সমস্ত বাড়িগুলো অন্ধকার। ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে কারা যেন ভাঙছে ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো। ভয়াল অন্ধকারে হঠাৎ জলন্ত আগুনের ছোটাছুটি দেখা যায়। ঠাহর করতেই বোঝা যায় ওগুলো মশাল। একযোগে জ্বলে উঠেছে শয়ে শয়ে মশাল!। দুই দিকে দুই সম্প্রদায়। দুই দিকে দুই ধবনি।  রণহুঙ্কার। একদিকে হর হর মহাদেব অন্যদিকে নারায়ে তকবীর আল্লাহু আকবার!

দুই হাঁটুর ঠকঠকানিতে বুঝতে পারি বেঁচে আছি আর বেঁচেই থাকতে চাই। শরীর জুড়ে হিম রক্তস্রোত। মুখ দিয়ে চেষ্টা করেও বের করতে পারি না কোন শব্দ। এই রণহুঙ্কারেই শেষ নয়। খাপমুক্ত তরবারীর ঝনঝনানি, সোডার বোতলে কি সব যেন ভরে সেগুলো ছুঁড়ে মারার সঙ্গে সঙ্গেই দুমদাম শব্দে সেগুলো ফাটছে ছড়াচ্ছে আগুন। প্রস্তুতি বোধ হয় আগে থেকেই ছিল। ছ’তারিখের পরের থমথমে ওই তিন দিন ধরেই বোধ হয় প্রস্তুত হচ্ছিল দুই সম্প্রদায়। বেরিয়ে আসছিল নখ-দাঁত, শান পড়ছিল তরবারীতে, তৈরি হচ্ছিল সোডার বোতলে বোমা আরও কী কী সব যেন। একটা সময়ে দেখলাম, পিলপিল করে বস্তিবাসী মানুষের স্রোত এসে ঢুকছে তিন-চারতলা বাড়িগুলোতে। হাতের পোটলায় যে যা পেরেছে গেরস্থালীর টুকিটাকি তুলে নিয়ে পোটলা হাতে ঘর-দুয়ার ফেলে দৌড় লাগিয়েছে প্রাণ বাঁচানোর জন্যে। এসে সব ঢুকছে পাকা বাড়িগুলোতে। দরজা খুলতে দেখা জয়ায় করিডোরে সর্ষে পড়ার জায়গা নেই। সকল বয়েসের নারী পুরুষদের ভীড়। যে যেমন পেরেছে জায়গা নিয়ে বসে পড়েছে, সিঁড়িতে আরও ছুটন্ত পায়ের শব্দ।

সামনের ফ্ল্যাটের মাঝারী আকারের বাম নেতাটির ছেলেদের দেখা যায়, অল্প বয়েসী তিনটি ছেলে, বারো থেকে ষোলর মধ্যে বয়েস, দরজায় আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে, কাকি, খালি বোতল হ্যায়? কি হবে জানতে চাইলে বলে, বম বানায়েঙ্গে! ছোড় দেঙ্গে ক্যায়া উনলোগোকো? ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিই। আবার গিয়ে বারান্দায় দাঁড়াতে বুঝতে পারি, আমাদের ছাদ থেকেও এবার শুরু হয়েছে হাতবোমা ছোঁড়া! বাচ্চাদুটোই জেগে। দুই হাতে দুজনকে জাপটে ধরে খাটের পাশে মেঝেতে বসে একমনে লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুব্‌হানাকা ... পড়ে যাচ্ছি। থমকে যাওয়া সময়ও একসময় চলতে শুরু করে। পুলিশের সাইরেন, নেতাদের মাইকে ভাষণ শোনা যায় যুযুধান দুই পক্ষের রণহুঙ্কার ছাপিয়ে।  গুলির শব্দে চাপা পড়ে মানুষের চীৎকার। একসময় শুধুই সাইরেনের শব্দ থেকে যায়। 

তিনদিন ছিল কার্ফিউ। নাকি চারদিন? ঘন্টা দুইয়ের জন্যে কার্ফিউ লঘু করা হত প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী সংগ্রহের জন্যে। 

রামস্বামী- যিনি আমার একটা লেখার অনুবাদ করেছিলেন, সদ্য যখন এই বাবরী মসজিদ নিয়ে আদালতের রায় বেরুলো, তিনি তাঁর নাম পরিবর্তন করে একটি ইসলামিক নাম রাখলেন। নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। ঘোষণা দিয়েই নাম পরিবর্তন করেন তিনি।  
-------------------



আসলে যা বলতে চাই, সে অন্য কথা। সেকথা বলতে চাই না বলেই এইসব পুরনো কথাদের অবতারণা। 

2 comments:

  1. বাস্তুসংস্থানের নিয়মেই গরীব হচ্ছে বড়দের বেঁচে থাকার এক খাদ্য-মাত্র। রাজনীতির বলি প্রতি-যুগে অনেকগুলো হয়,সেগুলো রাষ্ট-ক্ষমতা নামের ভগবানকে টিকিয়ে রাখতে করতেই হয়, করা হয় কিংবা ঘটে গেলে নতুন রং দিয়ে তাকে নতুন মাত্রা দিতে হয়।

    যাই হোক, আপনার বর্ণনায় চিত্র ছিল, যা অতীব সুন্দর, কারন লেখক হচ্ছেন শিল্পী যিনি শব্দ দিয়ে ছবি আঁকেন।

    ReplyDelete
  2. tao sab katha bola hoe galo.... odvut onuvuti holo go... asha kori tumi e bujhbe... amader "noy chhoy" hoe jaoar goppo... :-)

    ReplyDelete