Friday, May 11, 2012

যন্ত্রণার দিনগুলিতে..

বেশ কিছুদিন বাড়ি থেকে বেরুইনি। বাইরের পৃথিবী বলতে এক জানালা আকাশ, চিলতে বারান্দার ওধারের বাতাসে তালপাতাদের দোল খাওয়া, দক্ষিণের জানালার ওধারে একতলা বাড়িটির ছাদে নাইটি পরা কিশোরী মেয়েটির যখন তখন ঘোরা ফেরা, খানিক দূরের তিনতলা বাড়িটির উপর এক ছাদ ভর্তি পায়রা। অতিথি বলতে মাঝে মধ্যে রান্নাঘরের একপাটি খোলা জানালা দিয়ে খাবারের খোঁজ বা জলতেষ্টায় ঢুকে পড়া একটা কাক। কদাচিৎ একটা টুনটুনির ত্বরিৎ এঘর ওঘর ওড়াওড়ি আর তারপর আবার পালিয়ে যাওয়া। 

তিনখানা পুকুরের মাঝেরখানি বুজিয়ে যেদিন থেকে চারতলা বাড়িটা উঠতে শুরু করল, সেদিন, ঠিক সেদিন থেকেই বন্ধ হয়ে গেল আমার পশ্চিমের জানালাখানি। বন্ধ জানালার ওপাশে হারিয়ে গেছে আমার অলস দুপুরে পানকৌড়িদের খেলা, দূর দূরান্ত থেকে উড়ে আসা সব পাখিদের কিচির মিচির, নাম না জানা কিন্তু ভীষণ পরিচিত সেই ঝাঁকড়া গাছটা, যাতে বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে ছোট ছোট ফিকে কমলা রঙা ফুল ফুটে ঢেকে দিত সব পাতাদের, কত, কত্ত সব পাখিদের অস্থায়ী বসত ছিল সেই গাছটা। অপেক্ষার জেগে থাকা গহীন রাতগুলোতে টিমটিমে হলদে রাতবাতিতে ফিকে আঁধার জমা নিস্তরঙ্গ পুকুর, নৈঃশব্দকে ভেঙে দিয়ে পুকুরের ওধার থেকে ভেসে আসা টিভি বা রেডিওর আওয়াজ আর আরো, আরও কত কী..

০২
ফেরেশ্‌তা আসিয়া যখন জিজ্ঞাসা করিবে..
সেদিন সন্ধেবেলা শুয়ে শুয়ে হঠাৎ করে চোখের সমুখে কবর দেখতে পেলাম। পরিচিত এক কবরস্থান, বাঁশের ঝাঁড় আর সদ্য খোড়া এক কবর। সদ্য কাটা বাঁশ, নতুন কিনে আনা যেন তেন করে বোনা চাটাই আর এক চিরকালীন শয্যা। প্রচণ্ড ভয় পেলাম, বেশ জোরে, অজান্তেই বলে উঠলাম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহহু.. স্বপ্ন নয়, জেগেই ছিলাম। পিঠে ব্যথা নিয়ে সারাদিন শুয়ে থাকতে হলে ভর সন্ধ্যেয় কারই বা ঘুম পাবে! উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আবারও শুয়ে পড়ি, বাবুকে ডাকি, মনেই থাকে না যে, বাবু নেই বাড়িতে। বেশ অনেকক্ষণ ধরে থাকে সঙ্গে সেই কবর। দাদির কথা মনে পড়ে, কত কথাই না বলত দাদি আমার এই কবর নিয়ে। রোজ ভোরবেলায় ফজরের নামাজ শেষে হাঁটতে বেরিয়ে প্রথমেই যেত পাড়া পেরিয়ে পূবের পুকুরের দখিণপাড়ের কবরস্থানে, ক্ষণিক দাঁড়িয়ে থাকত পারিবারিক এই কবরস্থানের সমুখে, ধীরপায়ে হেঁটে বাড়ির দিকে ফিরত ঘুম ভাঙা বসতির মধ্যে দিয়ে। রোজ কেন কবরস্থানে যায় জানতে চাইলে বলত, ‘আসল বাড়িডা একবার কইরা দেইখ্যা আয়ি রোজ!’ অন্ধকার এক চিপা ঘর, তাতে আলো জ্বালবে শুধু তোমার কর্ম। স্বজনেরা যখন কবরে শুইয়ে দিয়ে ফিরে আসবে তখন ফেরেশ্‌তা এসে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, কৃতকর্মের হিসেব নেবে। ঈমানদার নেক্‌ বান্দাকে ফেরেশতারা সঙ্গ দেবে, আলোকিত আর সুখকর করে রাখবে কবরকে, নইলে সর্প আর বিচ্ছুতে ভরা শাস্তিময় চির অন্ধকার..

সন্ধে হয়েছে অনেকক্ষণ, কিন্তু আলো জ্বালা হয়নি। মাগরেবের আজানের আগেই তো সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে দিতে হয়, অথচ আমার গোটা বাড়ি অন্ধকার। আলো বলতে শুধু ছিটকে আসা উড়ালপুলের মৃত, হলদে রাতবাতির কিছুটা আভা আর এবাড়ি ওবাড়ির জ্বলে ওঠা সন্ধেবাতির রেশ- যাতে আমার ঘরের আঁধার খানিকটা ফিকে..শব্দ বলতে কারও একটা দেরিতে দেওয়া সন্‌ঝা-র শাঁখ..

০৩
কুচো কুচো করে কাটো বিরক্তি সব
দুপুরবেলায় বিরক্তি পেয়ে বসে। বিরক্তিটা নিজের উপর, এই শরীর খারাপের উপর, এই শুয়ে থাকার উপর এবং এই যন্ত্রণার উপর তো বটেই। একটা সময় বিরক্তিটা রাগে গড়ায়, অসহ্য রাগ হয়। দু’দিন ধরে বাবু একটা ওষুধ খুঁজে বেড়াচ্ছে, পাওয়া যাচ্ছে না সেটা কোথাও। আগেরদিন ধর্মতলা আর পিজি হাসপাতালের আশে-পাশের প্রায় সবকটা ওষুধের দোকান খুঁজে যন্ত্রণাহারক বস্তুটি না পেয়ে সে ডাক্তারবাবুকে ফোন করে অন্য কোনো ওষুধের নাম বলে দিতে বললে তিনি বলেন, আমার পেশেন্টের এই ওষুধটাই লাগবে। দুটো জায়গার নাম বলে দিয়ে বললেন, সেখানেও যদি না পাওয়া যায় তখন যেন আরেকবার ফোন করে, তারপর তিনি অন্য ওষুধ বলবেন! পরদিন দুপুরের রোদ খানিকটা পড়লে বাচ্চা আমার আবার বেরোয় ওষুধের খোঁজে। 

বিরক্তিটা ততক্ষণে মেজাজ খারাপে পরিণত। এতদিন- বলা ভাল, এত মাস ধরে ওষুধ খেয়েই যাচ্ছি, কি লাভ হচ্ছে তাতে? কি হবে আর যদি না খাই? ঠিক করে ফেলি, আজ থেকে আর ওষুধ খাব না। বাবুকে ফোন করে বলি, ওষুধ কিনতে হবে না, তুমি ফিরে এসো। ছেলে অবাক হয়, কেন! আরে তুমি ঘাবড়াচ্ছ কেন, আমি ওষুধ না নিয়ে আজ ফিরবই না। বললাম,  কী লাভ হচ্ছে এত ওষুধ খেয়ে খেয়ে, আমি আর ওষুধ খাব না, আজ থেকে সব ওষুধ বন্ধ। বাবু বলে, হ্যাঁ, এখন আমার দু’মাস ছুটি, তুমি সেই ছুটির বারোটা বাজিয়ে আমাকে ভালমতন ভোগানোর প্ল্যান করেছ তো? চুপচাপ শুয়ে থাকো! 

আবার ফোন। এবার উমা। প্রসঙ্গও অন্য। কি হবে আমি যদি এখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাসস্টপে যাই আর তারপর বাস ধরে কোথাও একটা যাই? যেখানে ইচ্ছে, সেখানে? ক্ষণিক চুপ থেকে সে বলে, কীই আর হবে, কিস্‌সু হবে না, বেরিয়েই পড় ইচ্ছে হলে, তবে বাসে উঠিস না, একটা গাড়ি ডাক, যেখানে যেতে ইচ্ছে করছে ঘুরে আয়, নাহয় আমার বাড়ি চলে আয়। গাড়ি! যেন সে চালকসমেত দাঁড়িয়েই আছে আমার দোরগোড়ায়, ডাকলাম আর চলে এল!  আবার খানিক চুপ থেকে উমা গল্প করতে শুরু করল, নানান গল্প। ভোর চারটেয় ঘুম থেকে উঠে যে ব্যক্তি নিত্য কাজ সেরে সাড়ে ছটায় স্কুলে ঢুকে সই করে, সে যদি শেষ দুপুরের বিশ্রামের সময় ফোন ধরে ওসুস্থ বন্ধুকে স্কুলের অন্য টিচারদের গল্প শোনায়, তখন বুঝে নিতে হয়, ফালতু রাগ করছি, কোনো অর্থ নেই এর..

০৪
মেঘের কোলে রোদ আজও হেসে যায়
দিন কতক আগে ইন্দ্রাণী, আমার আই-মশাই একটা ছোট্ট চিঠি লিখেছিল, তাতে লিখেছিল কতকাল তোমার লেখা পড়িনি বলো তো.. সত্যিই তো, কতকাল কিছু, কিচ্ছুটি লিখিনি। আই-মশাইয়ের কথা মনে পড়ার কারণ, পঁচিশে বৈশাখে তার একটা পুরনো লেখা আবার করে সামনে আসা, সেদিন নয়, সেদিন সেই লেখা বসে পড়তেই পারিনি, গতকাল শুয়ে শুয়েই লেখাটা পড়লাম। শুরুতেই সে লিখেছে, তার নাকি একটা ভিখিরির ঝুলি আছে, যেখান থেকে এই লেখাখানি সে আবার বার করেছে। আই-মশাই গো, ওরকম একটি ঝুলি যদি আমার থাকত, যেখান থেকে খুব বেশি নয়, ওইরকম দু-একটা লেখা অন্তত বেরুবে.

পঁচিশে বৈশাখ নিয়ে লেখা-র পাতা অনেকদূর এগিয়ে গেছে, বেশ কয়েক পাতা পিছিয়ে গিয়ে পড়তে হয়, পড়তে পড়তে আমি নিজেও চলে যাই ছেলেবেলার রবীন্দ্রনাথ-এর কাছে। কত কি, কত কী যে মনে পড়ে.. পড়ার শুরুতে মনে হয়েছিল, আমার এরকম কোনো পঁচিশে বৈশাখ বা ছেলেবেলার রবীন্দ্রনাথ নেই, থাকলে আই-মশাইয়ের মত না হোক, যেটুকু পারি, যেভাবে আমার কাছে আসে, সেভাবেই নাহয় লিখতাম! পড়া শেষ হয়, ভাবনা চলতেই থাকে, স্মৃতিরা কাছে আসে গুটি গুটি পায়ে, দেখতে পাই, নেই- কে বলেছে, আমারও তো আছে শৈশব আর কৈশোরে রবীন্দ্রনাথ! জীবনে প্রথমবার যেদিন স্কুলে যাই, প্রথমবার মাঠে দাঁড়িয়ে যখন জাতীয় সঙ্গীত গাই তখন থেকে, সেই মুহুর্ত থেকেই তো রবীন্দ্রনাথ..



আরেকটু লিখব হয়ত..