Monday, March 05, 2012

খামখেয়ালে দেওয়াল লিখন

গুলাম আলী গাইছেন। আমি পড়ছিলাম অদিতি ফাল্গুণীর হেরুকের বীণা।  ইন্দ্রাণীর উইদাউট আ প্রিফেস। মাথার ভিতর শব্দের কুচকাওয়াজ। বাংলাদেশ বাংলাদেশ। মোচ্ছব। মোচ্ছব। আমি সেই মোচ্ছবে শামিল নই। কোনোভাবেই নই।  অসমাপ্ত লেখার ফোল্ডার ভর্তি লেখাগুলো সব আধখ্যাচড়া। দুই বা তিন প্যারাগ্রাফ। এর বেশি আর এগোয় না। কিছুতেই এগোয় না।

নিশুথি রাত। ম্যালা রাত। কুকুরগুলোও ঘুমিয়ে পড়েছে কখন যেন। বহুকাল বাদে এমন রাত।  মাথা ভার নেই, ওষুধের ঘোর নেই। ঘুম নেই। এমনকি নিত্যসঙ্গী ক্লান্তিও নেই। সোঁ সোঁ শব্দে জোর কদমে পাখা ঘুরছে, ঘুরেই চলেছে  অবিরত, অনন্ত। সুইচ না টেপা অবধি থামবে না, থামবেই না। রাত নিঝুম। নিঃঝুম। বহুদিন পর। গুলাম আলি গেয়েই চলেছেন, আপনি ধুন্‌মে রেহতা হুঁ/ ম্যায় ভি তেরে য্যায়সা হুঁ..কার মত তিনি?

 রাম আর কোক কবে থেকে যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে জো-তে। সেই জো। প্রেমে পড়ে এদেশে থেকে যেতে চেয়েছিল। অথবা প্রেমিককে নিয়ে যেতে চেয়েছিল সঙ্গে, নিজভূমে। প্রেমিকের ঘর-সংসার চুলোয় যাক। সে তো ভালবাসে। সে ভালবেসেছিল। ভালবাসায় ভরিয়ে দেবে সব, পূরণ করবে সমস্ত খামতি। যা কিছু পেছনে পড়ে থাকবে, সব, সমস্ত সে ভরিয়ে দেবে- এমনটাই ভেবেছিল সে.. ভালবাসায় নাকি কোনো দোষ নেই। যদি দোষই থাকত তবে থুড়ি না রাধা-কৃষ্ণ গাঁথা লোকমুখে ফিরত! কোনো দোষ নেই।! জো এমনটাই বিশ্বাস করত, করতে চেয়েছিল।

রাত নিঝুম। নিঃঝুম। ঘুমন্ত। কাল কখন যেন 'আজ' হয়ে গেছে। 'আজ' আবার হয়ে যাবে কাল। কাল কে দেখেছে! আমি তাই কাল-কে নিয়ে ভাবিত নই।  সমস্ত আজই কেমন করে যেন কাল হয়ে যায়। বা কাল হয়ে যায় আজ। এই যেমন আজ হয়েছে। খানিক আগে। না, বেশ আগে। আজ-টাই শুধু গতকাল হয়ে যায়, বাদবাকি সব আজ। আগামী বলে কিছু নেই। ।  নজরুল বলে গেছেন- প্রিয় এমনও রাত.. নজরুল থাকুন। বিদ্রোহী হয়ে। চিরকাল থাকুন। চির উন্নত শির নিয়ে থাকুন। কুচকাওয়াজে থাকুন। বদ্ধ, আবদ্ধ ঘরে না থাকতে চাওয়া নজরুল। বিশ্ব দেখতে চাওয়া নজরুল। ঘুমিয়ে আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। পাশেই মধুদার ক্যান্টিন।

সেদিন, কল্লোলদার গান ছিল ছবির হাটে। ক্ললোলদা একক। ছবির হাট থই থই।  সরু লাল পাড় সাদা শাড়ি নাসরীন। গম্ভীর মুখে কৃষ্ণাদি। অপেক্ষায় কাঁকন, কখন তুমি গাইবে, হেই ক্ষ্যাপা, মানুষ খুজো না! ব্যস্ত সমস্ত সাগর। আমি চুপচাপ এককোণে। সবে জানতে পারলাম, ছাব্বিশ বা সাতাশের আগে তিতাস কোনো নদীর নাম নয়- ছাপাখানার বিজলীবাতির আলো ছাড়িয়ে বাইরের আলো দেখতে পারছে না, পারবে না। রেশনের দোকানে কেরসিন বা চিনির লাইনের চাইতেও বড় লাইন বই-দের। আমার মন লাগে না। কল্লোলদা, আমার মন লাগে না তোমার গানে। ক্ষমা কোরো। তুমি করবেই আমি জানি। তুমিই তো বলেছিলে, গুরু পাওয়া যায় যত্র তত্র, শিষ্য মেলা ভার। আমি ফুটপাথে। ছবির হাটের বাইরে, রাস্তায়। ওয়াসিফ এলো। খানিক বসে থাকে চুপচা্প পাশে। বলে, যাবেন? নজরলের সমাধীতে? আমি কোনো কথা বলি না। ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তায়। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, মধুদার ক্যান্টিন। মন লাগে না। মনও লাগে না। মন পড়ে থাকে ছাপাখানায়, অনেক, অনেক বইয়ের লাইনে, সব, সমস্ত বইয়ের পেছনে লাইনে বসে থাকা আমার তিতাসে।  বিস্বাদ ঠেকে চা। শাপলুরা বসে গজল্লা করে বটতলায়, বলে, শ্যাজা, আসো, গজল্লা করো। মন লাগে না। মনও লাগে না। মন পড়ে থাকে, রয়, ছাপাখানার অন্ধকারে, তিতাসে।

আমি এগুই, এগিয়ে যাই, নজরুলের কাছে। থাকব নাকো বন্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে। আমার তিতাস গুমরে মরে, ছাপাখানার অন্ধকারে। আমার মন লাগে না। মনও লাগে না। কে যেন সেলফোন আবিষ্কার করেছিল, কেন করেছিল কে জানে! না করলে কী ক্ষতি হত!! কীই বা এমন ক্ষতি হতো!!  সেই সেলফোনে ঘন্টা নেজে যায়, বেজে যায়, বেজেই যায়.. লোকজন ব্যস্ত সমস্ত হয়ে অনর্গল ফোন বাজিয়েই চলেছে। কোথায় আছি, কার সঙ্গে আছি, কেন আছি!! তারা জানে না, জানতেও চায় না, আমি নজরুলের সঙ্গে আছি। খানিক থাকতে দে.. এমন রাতও কী বার বার আসে..
চল্ চল চল
উর্ধ গগনে বাজে মাদল
নিম্নে উতলা ধরণীতল
অরুণ প্রাতের তরুণ দল
চল চল চল, চল রে চল রে চল

থাকা হয় না বেশিক্ষণ নজরুলের সঙ্গে। ঘুমাও নজরুল,শান্তি কী অশান্তি জানি না, কিন্তু ঘুমাও তুমি। বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরে, মধুদার ক্যান্টিনের খানিক দূরে ঘুমাও তুমি। আধো আলো আধো অন্ধকারে ঘুমাও তুমি..

আমি এগুই। এগিয়ে যাই। আমার তিতাস যে অন্ধকারে। ওয়াসিফ চুপচাপ। কোনো কথা বলে না। ভাগ্যিস বলে না। আমি কোনো সান্তনা চাই না। আমার একটা বন্দুক চাই। চাই, কিন্তু পাই না। পাব না, জানি।ভাগ্যিস পাই না, দু দিন বাদেই সেই বিডিয়ার হত্যাকাণ্ড। রাস্তায় ট্যাঙ্ক, কার্ফিউ, মুহুর্মুহু গুলি আর বুকের ভিতর হাঁপরের শব্দ। না। আমার কোনো বন্দুক চাই না। আমি বিশ্বাস করি না বন্দুকের নলই ক্ষমতার সকল উৎস।  তাই চুপচাপ হন্ঠন। তাই নত মস্তক। গন্তব্য-ছবির হাট। সেখানে এতক্ষণে কাল্লোলদা হয়ত গান থামিয়েছে। কল্লোলদা নিশ্চয়ই ক্লান্ত। শেষমেশ কল্লোলদাও তো মানুষ। টানা তিন ঘন্টা একা হাতে সামলেছে ছবির হাট। এখন তো ফেরার পালা। পাঠশালায়।

মেঝেতে পাতা কার্পেট, তার উপরে তোষক, আর মতিভাইয়ের দাক্ষিণ্যে পাওয়া একখানা চাদর, যেখানে দিন কতকের অস্থায়ী বাস কল্লোলদা আর কৃষ্ণাদির । রেহানা, মতিভাইয়ের অর্ধাঙ্গিনী। আক্ষরিক অর্থেই। পাঠশালার বাসিন্দারা রেহানার ইচ্ছের অধীন।  মতিভাইও। খুলনার বাসিন্দা মতিভাই। আমি কখনও খুলনা যাইনি। আমি আর কোথায়ই বা গেছি! সে কথা থাক । কল্ললোদা।  আজিজ মার্কেটের কথা বলি বরং। চাচার সিডির দোকান। কল্লোলদা সেখানে কি একটা সিডি কিনতে গেছে। সঙ্গী কৃষ্ণাদি, মাসুদ। নাকি নাসু মিঞা! ভুলে গেছি!  সার্বক্ষণিক সঙ্গী গিটার খাপমুক্ত হয়, চাচার দোকানে গান শুরু হয়। আমি শুনিনি সেই সব গান। আমার মন, আমি অশরীরি হয়ে ছাপাখানায়, তিতাসের কাছে। চাচার সিডির দোকানে পৌঁছানোর আগে, আজিজে পা রাখতেই কানে আসে, সুখে থেকো ভালো থেকো, মনে রেখো এই আমারে! কৃষ্ণকলি আর চন্দনাদি।

আমাদের বাড়িতে দালান যখন তিন কোঠার ছিল, মাইঝের কোঠায়, আমার পিসিমার হাতে করা একখান বান্ধানি টাঙানো ছিল, কয়েকটা সবুজ সুতোয় বোনা ঘাস, সাতা সুতোর ফুল আর লাল সুতোয় লেখা- সুখে থেকো ভালো থেকো, মনে রেখো এই আমারে.. আমি আটকে যাই। থমকে যাই। চমকে যাই। সেই প্রথম কৃষ্ণকলি। সেই প্রথম চন্দনাদি। আমার পিসিমা আর এরা কোথায় যেন মিলে মিশে একাকার.. গীত গাওয়া পিসিমা আমার। রেডিও শুনে শুনে নজরুল গীতি গাওয়া পিসিমা আমার। পিসিমা জানে না, জানবেও না, সেই আটপৌরে শাড়ি, লুকিয়ে শোনা রেডিও, চুপি চুপি গাওয়া গান সব তার অক্ষয় হয়ে রয়ে গেছে কোথাও, আজও আছে সেই সব গান। সেই বান্ধানি আছে কিনা কে জানে। কথাগুলো এখন সুরে সুরে এখন ছড়িয়ে গেছে সবখানে, সবখানে..

ছাপাখানা বদল হয়। সিডিবন্দী হয় আমার তিতাস। নির্মলেন্দু। শক্তি আমি আর আমার কদমগাছ। সাগর হাত বাড়িয়ে দেয়। আরফান সঙ্গে থাকে। এলিফ্যান্ট রোড। কাঁটাবন। প্রেস। সূর্যের প্রথম আলোর সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশের আলো দেখার জন্যে মুখিয়ে থাকে তিতাস। সূর্য  ওঠে। আলোফোটে, সকাল এগোয় দুপুরে। ভুত সওয়ার হয় ছাপাখানায়, তিতাস আছে, আমি নেই। আমি আবার ফুটপাথে। পরনে ঢাকাই শাড়ি, ছবির হাট, ফুটপাথ আর আমি। শেষমেশ নামহীন তিতাস হাজির হয় একুশে বইমেলায়। ধুলোয় বসে আমি, পরনে ঢাকাই শাড়ি। ভুলে যাই, মনেই পড়ে না কাউকে বলা বা ডাকার কথা। আমার বই। প্রথম বই। হুয়ত বা একমাত্র। আমার তিতাস। বড় নীরবে, নিঃশব্দে বয়ে যায় একুশে বইমেলায়। কৃষ্ণাদি অনুযোগ করে, ডাকলে না.. আমার মনেই ছিল না, কাউকে বলা যায়, ডাকা যায়, গান-বাজনা বা নিদেন একটু প্রকাশের অনুষ্ঠান! কিছুই নেই। কিচ্ছু নেই। কিচ্ছুটি নেই.. আমার বন্ধুরা, আমার স্বজনেরা, আমার গুরু, কেউ নেই.. যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল! আমি তো কাউকে ডাকিইনি। আসলে ডাকার কথা মাথায়ও আসেনি যে..

দিন তারিখ হিসেব করলে সেদিনের সমস্ত কিছু আজ'গতকাল হয়ে গেছে। বা গত বছর বা তারও আগের বছর।  সমস্ত কিছু আজ স্মৃতি। কাল, পরশু বা তারও আগেকার স্মৃতি। আমিই শুধু স্মৃতিতে বাঁচি। সবকিছু, সবটুকু তাই আগলে বসে আছি আজও, এখনও। আমাকে ছেড়ে যায় না সেসব কিছুতেই, কিছুতেই আমার পিছু ছাড়ে না..

আমি ভাবতাম বা ভাবি  আমি স্মৃতিতে বাঁচি।  আসলে তা নয়, আমি শুধু আজকেই বাঁচি। শুধু আজকে। আজ-কে নিয়ে.. কোনো ভূত, কোনো ভবিষ্যত কিস্‌সু নয়, নেই, আছে শুধু আজ আর কিছু স্মৃতি কথকতা...

No comments:

Post a Comment