Sunday, February 05, 2012

একটি খসড়া রচনা ও এক ঝড়ের কথা

সকালবেলায় এক বন্ধুর ফোন এল, বহুদিন বাদে। এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে সে যাচ্ছে, প্রায়, প্রায় সেই একই রকম সময় আমিও পেরিয়ে এসেছি বলেই হয়ত আমার কথাই তার মনে পড়ল। একটা লেখা পড়ছিলাম প্রায় ওই সময়েই, মিশ্র একটা প্রতিক্রিয়া হল, একসঙ্গে অনেক কিছু, অনেক, অনেক কিছু মাথায় ভীড় করে এল। ভুলে যাওয়া বা ভুলতে চাওয়া সমস্ত, সমস্ত যন্ত্রণা একসঙ্গে মনে পড়ে গেল। বিদ্ধ করল আবার নতুন করে। কোথাও কোনো বাতাস নেই, দম ফেলতে পারছি না এমন একটা অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গেই কিছু ভাল লাগা/ ভাল সময়ও কোথা থেকে যেন এসে হাজির হল। বহুকাল বাদে আজ আবার সেই সব ভাবনাগুলো বা বলা ভাল এই একসঙ্গে ভীড় করে আসা কথা বা ভাবনাগুলো লিপিবদ্ধ করার ইচ্ছেতে এই খসড়া রচনা।
 
ভুলে যাওয়ার  রোগ পেয়ে বসেছে, সব ভুলে যাই, সব সব সব। কেউ একজন হয়ত খুব বাজে বাজে গালি দিল, দিয়ে চলে গেল, পরে আবার তার সঙ্গে দেখা হল, মনেই থাকে না যে সে গালি দিয়েছিল। এমতাবস্থায়  সমস্ত ভাবনাগুলো/ কথাগুলো যাতে হারিয়ে না যায়, তাই এখানে এই খসড়া। তারপরেও যদি ভুলে যাই, মাথায় না থাকে আর কিছু, সাদা সাদা হয়ে যায় সবকিছু, তবে পথ তো খোলা রইলই এই খসড়া ছিঁড়ে ফেলার..

-২০১২-০২-০৫
 
এই খসড়া রচনাটিকে নিয়ে আমি আবার বসব এমনটা ভাবিনি। এটা ফেলাই যাবে, এমনতরই মনে হয়েছিল। যা লিখব বলে এই খসড়ার সূত্রপাত, আজ ঠিক সেই কথা বা ভাবনা নয় অন্য কিছু কথা বলব বলে বসেছি। 

খসড়াটুকুও রইল এখানেই, হয়ত না বলা কথাগুলো আবার কখনও বলতে বসব..



০২
মান আছে আর হুঁশ আছে যার, সেই তো মানুষ হয়.. 

কল্লোলদার গানের এই লাইনটা বড় মনে পড়ছে। আমার যেমন হয়, আগে-পিছে, অন্তরা-মুখড়া কিস্‌সু মনে থাকে না, হঠাৎ হঠাৎ একটা করে লাইন মনে পড়ে আর সেটা পেয়ে বসে। কল্লোলদার কোনো গান হলে আমি তক্ষুনি তাঁকে ফোন করি, আগে-পরের লাইনগুলো জানতে চাই। কল্লোলদা সেটা তক্ষুনি গেয়ে শুনিয়ে দেন, তা সে রাত বারোটা হোক বা দুপুর বারোটা। আজ সেই ইচ্ছেটা জাগছে না। কী হবে!  আমার আজ আগে-পরে, অন্তরা-মুখড়ার প্রয়োজন নেই। ‘মান আর হুঁশ আছে যার, সেই তো মানুষ হয়’ -তোমার এই কথাগুলো যদি সত্যি হয় কল্লোলদা, তবে আমি মানুষ নই। ‘মান আর হুঁশ’ সব বিসর্জন দিয়েছি, আজ তাই অন্তরা, মুখড়া কিচ্ছু, কিচ্ছুটি জানতে চাই না, শুধুমাত্র, শুধুমাত্র এই কথাগুলোই যথেষ্ট আমার জন্যে।

০৩
মাকে আমার বড় হিংসে হয়..

মাকে আমার বড় হিংসে হয়। শুধু আমার মাকে নয়, আমার মায়ের মত সকল মায়েদের আমি হিংসে করি। তাঁরা কেমন নিজের সংসার, সন্তান-সন্ততিতে নিজেকে লীন করে দিয়ে বেঁচে থাকেন। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-কান্না সব, সব নিয়ে দিব্যি মুখে হাসিটি ধরে রাখতে পারেন। সন্তান যখন যন্ত্রণায় থাকে, সে যেখানেই থাকুক না কেন, ‘মা, মাগো, কোথায় তুমি’ বলে ডেকে উঠতে পারে। সেই সব মায়েদের আমি হিংসে করি কারণ আমি এক অযোগ্য মা। আমি শুধু নিজেরটুকু ভাবি, যা কিছু করি, নিজের জন্যে করি এবং শুধুমাত্র নিজের জন্যেই করি। আমার সন্তান তাই যন্ত্রণায়-অপমানে বিদ্ধ হলে মাদুর পেতে মেডিটেশনে বসে, 'মা, মাগো' বলে ডেকে ওঠে না। 

সেই সব মায়েদের, আমার মায়ের, নিজেদের কী কোনো সাধ-আহ্লাদ ছিল না বা নেই? নিজস্ব একটা জগত, সংসার জীবন তো আছে, রইলই, তার বাইরে বা তারই সঙ্গে সঙ্গে শুধুমাত্র নিজের জন্যে একটা জগত তৈরি করার কোনো বাসনা কী কখনও তাদের হয়নি বা হয় না? জানি না। হয়ত হয়, হয়ত হয় না। বা তাঁরা হয়ত এইসব নিয়ে ভাবেনই না। স্কুল-কলেজ-ইউনিতে সেই সব মায়েরাও গেছেন, কেউ গান করতেন, কেউ বা কবিতা লিখতেন তো কেউ বাজাতেন গিটার। কেউ কেউ রাজনীতিও করতেন। সংসার, সন্তান-সন্ততি হয়ে যাওয়ার পর তাঁদের সমস্ত রচনা, সৃষ্টি, সব, সব এসে বসত করে তাদের ঘর-কন্নাটুকুতেই। এর বাইরে কিছু নেই, কিচ্ছু নেই। যেন থাকতেই নেই।

কী করে পারেন তাঁরা? আমি তো পারিনি! মা তো আমিও হয়েছি। খুব স্বাভাবিক নিয়মেই আমারও তো একদিন স্বামী, সংসার, সন্তান এসেছিল? তবে আমি কেন পারলাম না শুধু ওইটুকু, শুধুমাত্র ওইটুকু নিয়েই থাকতে? কেন আমায় যেতে হল মনোরোগ বিশারদের  কাছে? ভাত-মাছ-চা-বিস্কুটের পরিবর্তে শুধুমাত্র ওষুধ খেয়েই কেন আমাকেই কাটাতে হল মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, দেড় যুগ ধরে?? কার দোষে? কী দোষে? কী অপরাধ ছিল আমার? অন্যের দোষ খুঁজতে নেই, আম্মা তো এটাই বলে। তার মানে দোষ আমারই ছিল! ভুল-ভ্রান্তি, অপরাধ- যা কিছু, সে শুধু আমার, অপরাধী আমি, শুধুমাত্রই আমি। আর কেউ নয়।

০৩
হও ধরমেতে ধীর হও করমেতে বীর

আমার দাদি খুব বদমেজাজি ছিলেন। চৌধুরানী বলে কথা। দাদির মেজাজ সামলাতে না পেরে মা যখন চোখের জল ফেলত, আমার দাদা, গ্রামের এক সোজা-সাপ্টা মানুষ নিজের ভাষায় মাকে বলতেন, সোনা, মাটি হও। মাটি। মাটিকে দেখ, এই মাটি দিয়েই মানুষ তৈরি, অথচ কত অত্যাচার এই মানুষ মাটির উপর করে। মাটি কিন্তু ওফ পর্যন্ত করে না। সেই রকম মাটি হও। দেখবে সব কত সোজা আর সরল হয়ে গেছে সবকিছু! আমার মা মাটি হয়ে গেল। আর সবকিছু সত্যি সত্যিই খুব সোজা আর সহজ হয়ে গেল সব, সবকিছু। 

আমি তো নিজের কানে শুনেছি আমার দাদার বলা সেই কথাগুলো, যেগুলো তিনি মাকে বলেছিলেন, আর তারপর মায়ের সবকিছু সত্যি সত্যিই সোজা আর সহজ হয়ে যেতেও দেখেছি। যন্ত্রণায় মা আর কাঁদত না। কোলের সন্তানটিকে বুকে চেপে ধরত বা জায়নামাজে গিয়ে বসত। সব জেনে, শুনেও আমি পারিনি মায়ের মত ‘মাটি’ হয়ে যেতে। একজন আমার পরে অত্যাচার করবে আর আমি মাটি হয়ে গিয়ে সব সইব, পারিনি সেটা করতে। তাই কিছুই সোজা আর সহজ হলো না। যন্ত্রণাও তাই সঙ্গ ছাড়ল না..

০৪
আজ আর দুর্বল নই আমি।।

বড় গর্ব করে একদিন বলেছিলাম উপরের ওই কথাগুলো। সঙ্গে আরও বলেছিলাম, এই ছোট্ট জীবনে এতকিছু দেখেছি, পেরিয়ে এসেছি, এতরকমের যুদ্ধ করতে হয়েছে, কোথাও হেরেছি তো কোথাও জিতেছি, ফলতঃ যা কিছু মানসিক দুর্বলতা, সমস্ত, সমস্ত কাটিয়ে উঠেছি। আজ আমি আর দুর্বল নই। আজ আমাকে কেউ ধাক্কা দিতে এলে, সে যাই হোক- যেই হোক, নিজে পড়ে যাবে, আমাকে ফেলতে পারবে না।। 

কত বড় ভুল আর মিথ্যে ধারণা নিয়ে বাস করছিলাম। গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলাম কথাগুলো। এখন প্রমাণিত, কি ভীষণ ভুল ধারণা বা বিশ্বাস নিজের ভেতরে পুষে রেখেছিলাম। আসলে, আসলে আমি বড় দুর্বল। বড় পলকা। ঝড়-বাতাস সহ্য করার কোনো ক্ষমতা বা শক্তি আর আমার মধ্যে বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট নেই।

০৫
ধূসর দেওয়ালের ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ ছাড়া আর কিছুই ভেসে আসে না..

ঘরে বড় গুমোট ছিল। দক্ষিণের ওই বন্ধ জানালা দিয়ে বাতাস আসার এতটুকুও পথ ছিল না । একদিন বন্ধ জানালার বাইরে থেকে দখিনা বাতাস এসে টোকা দিল, ফিসফিস করে কত কথা বলল। বলল, জানালাটা খুলে দে, দ্যাখ, সবুজ ঘাসেরা কেমন নুয়ে পড়ছে বাতাসে, তালের পাতাগুলো কেমন শনশন শব্দ তুলছে হাওয়ায়, পানকৌড়িটা কেমন ডুবছে, মাথা তুলছে আবার ডুবছে, বাতাস নিচ্ছে,  উড়ে গিয়ে বসছে ওই ছোট্ট গাছের ডালে, দ্যাখ চেয়ে।। কাঠবেড়ালীটাও অপেক্ষা করে আছে, কেটে রাখা সব্জীর টুকরোখানির জন্যে, খুলে দে জানালা, খোল..

আরও বলল, আসলে তো তুই এখনও সেই ছোট্টটিই আছিস, বাবার সেই এমুপাখি, দাদার সেই দুই ঝুঁটির চঞ্চল ঘোড়ামুখী। আসলে তো তুই পনেরো বছর ন'মাস। মাঝে যা কিছু দেখেছিস, পেরিয়েছিস বলে ভাবিস, সে তো স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন। আমি বিশ্বাস করলাম দখিনা সেই বাতাসকে, তার কথাকে।  খুলে দিলাম বন্ধ জানালা। জোর কদমে বাতাস এল, দখিনা বাতাস। প্রাণ জুড়িয়ে গেল। দম ফেলে বাঁচলাম আমি। কত গান, কত সুর যে ভেসে এল সেই বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে! আমি ভাসলাম। আমি ডুবলাম, আবার ভাসলাম, উড়ে গেলাম, ভেসে বেড়ালাম পশ্চিমের পুকুরের ওই পানকৌড়িটির মতন। জনসমক্ষে গলা ছেড়ে আমার গাইতে ইচ্ছে হল- শোনো গো দখিনও হাওয়া, প্রেম করেছি আমি!!

বন্ধ ঘরের জমে থাকায় ধুলোয় লেখা হল নাম, সেই ধুলো আরও পুরু হল, নামটা তবুও রয়েই গেল, ক্রমশ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হল সেই নাম। কে জানত। খোলা জানালা দিয়ে ঢোকা এক ঝলক ঠান্ডা বাতাসের পরেও গুমোট হয়ে যেতে পারে ঘরের ভেতরটা আবার। বাইরে ঝড় যে উঠতে পারে সে আর কে মনে রাখে দখিনা বাতাস পেলে পরে! কিন্তু ঝড়ের নিয়ম মেনে ঝড় উঠল। জানালাটা খোলাই ছিল। দশ নম্বর মহা বিপদ সংকেত ছিল, আমি উপেক্ষা করেছিলাম। বান-বাতাসের দেশের মানুষ আমি, এইসব ঝড়- তুফান আমার করবে কী? সামলে নেব! পারলাম না। উড়ে গেল সব খড়-কুটোর মত। আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে সমস্ত ভরসা, বিশ্বাস আর সবটুকু শক্তি,  সব সব উড়ে গেল। সব ঝড়ই একসময় থামে। এও থামল। হিম, মৃত্যুশীতল নৈঃশব্দ রেখে গেল পেছনে। থকথকে কাদা, আর এলোমেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা আমার ঘর-কন্না ছাড়া আর সব নিয়ে গেল সঙ্গে। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আমার কোনো গত্যন্তর রইল না। 

বড় ঘুম পাচ্ছে। ভীষণ ঘুম। কোথাও কোনো ঘুম পাড়ানি গান নেই কিন্তু আমার বড় ঘুম পাচ্ছে। বড় ভাল হতো এই ঘুম আর যদি না ভাঙত..
  
২০১২-০২-০৯

---------


এই রচনায় কোনো মন্তব্য গ্রহণ করা হবে না বিধায় মন্তব্য করার সুবিধাটুকু সরিয়ে নেওয়া হল।