Monday, February 27, 2012

আমার আর গান শোনা হয় না

পার্বতী বাউল আর ফরিদা পারভীন। প্রিন্সেপ ঘাট। শুনেছিলাম সেখানে গান হবে। গান হবে - এই কথাটা শোনারও প্রয়োজন ছিল না। ফরিদা পারভীন, পার্বতী বাউল আর প্রিন্সেপ ঘাট। গান যে হবেই এমনটা ধরেই নেওয়া যায়। গান শুনতে যাওয়ার আমন্ত্রন ছিল, যাব না জানতাম। আমার তো বাড়ি যাওয়ার কথা। আমি তাই আরশীনগরে যাওয়ার কথা ভাবি না।  কিছুই হয় না। বাড়ি যাওয়া হয় না। গান শোনা হয় না। সামনে বসে শোনা হয় না ফরিদা পারভীন। লালন। পার্বতী বাউল। সঙ্গী মন খারাপ। যন্ত্রনা আর চওড়া বেল্ট।   সম্বল বলতে আইপড। বা সেলফোনে ধরে রাখা কিছু সময়। অন্ধকার স্ক্রীন আর জাতিস্মর।  সাত্যকী আর আষাঢ়ের ভিজা পথ। বিক্রম সিং। কিছুই তো  হলো না, সেই সব, সেই সব.. অপার হয়ে বসেই থাকেন ফরিদা পারভীন।

উড়ালপুলের ল্যাম্পপোস্টের মরা হলদেটে আলো, সরু এই একচিলতে বারান্দা, প্লাস্টিকের চেয়ার আর বসন্ত বাতাসে অল্প অল্প নড়া একগাছ তালের পাতা। ঠিক যেন কেউ চামর দোলাচ্ছে সিংহাসনের পাশে দাঁড়িয়ে.. গ্রীলের বাইরে রাত গাঢ় হয়। স্টিলের গ্লাসে মিশ্রিত জলে দু কুচি বরফ। একসময় দুঃখেরা এসে জমাট বাঁধে স্টিলের গ্লাসে। গঙ্গার ধারে কোনো এক প্রিন্সেপ ঘাটে গান গেয়েই যান ফরিদা পারভীন। পার্বতী বাউল। গঙ্গা পেরিয়ে এপারে ভেসে আসে না কোনো সুর..


ল্যাম্পপোস্টের আলোয় মরে যাওয়া  আধখানা চাঁদ। সামনে নাকি দোল। দোল বলতেই মনে পড়ে কল্যাণী আর কলি। এক বাড়ি ভর্তি ফুলগাছ আর গাছভর্তি সব ফুল। মালু আর বাদশাহ। নিঃঝুম দুপুর আর সাঁই সাঁই মোটর বাইক। রঙে রঙে রঙীন সব মেলাযাত্রী। যেহেতু দোল তাই আকাশে একটা পূর্ণ চাঁদ থাকবেই। বাড়ির সবকটা আলো তাই নেভানো। পেছনের বাগানে বার্বিকিউ, পোড়া পোড়া মুর্গি, আলু, আর টম্যাটো। অফুরন্ত স্টক থেকে একের পর এক শুধু খাবারেরই গল্প বলে যাওয়া মালু। বুঁদ হয়ে থাকা শুভজিত। টাল খাওয়া বাদশাহ।   দড়ির দোলনায় নিরন্তর দোলে জো। আশ্রমের প্রার্থনা সঙ্গীতকে  ছাপিয়ে দিয়ে কলি গায়, আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে..

Wednesday, February 15, 2012

মনে পড়ে, মন পড়ে থাকে শালুক পদ্মের ফাঁকে ফাঁকে..

ইন্দোদাদার পরণকথার দেশ আর  এক ঝিল পদ্ম...
বিদ্যাসাগর সেতুর উড়ালপুলময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য, অজস্র ভাঙা কাঁচের টুকরোর উপর দিয়ে, উড়ালপুলের চড়াই উৎরাই ভেঙে ইত্যাদি ইত্যাদি করে চার কিমি হাঁটলে তবেই পৌঁছানো যায় এক বিলাসবহুল উদ্যানে সেই উদ্যানের ভিতরে কোথাও পথ বকুল বিছানো, যে পথে সে গিয়াছে চলে.. কোথাও নাম না জানা ফুলে চাপা পড়ে যাওয়া সরু পিচরাস্তা তো কোথাও শুকনো পাতার মোটা গালিচা পাতা যে পথে চলতে গিয়ে মনে পড়বেই শুকনো পাতার নুপুরের কথানাম না জানা সব পাখির ডাক শুদ্ধ করে দেয় কান, মন আর মস্তিস্ককে ধবল বক এখানে শুধুই মাছের আশে ধ্যানমগ্ন হয়ে জলের ধারে দাঁড়িয়ে থাকে না, তারা হেঁটে-চলে বেড়ায় গাছতলায়, মাঠে গাছেদের থেকে রঙ নিয়ে ঝিলের জল এখানে গাঢ় সবুজ সবজেটে এই জলের আয়নায় প্রাচীন গাছেদের প্রতিবিম্ব। মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলাম না... এই ঝিলে কোনো হংস মিথুন নেই। ...


এই জলে, এই নি:ঝুম ধোয়া ধোঁয়া ভোরে এঁকে-বেঁকে এগিয়ে যাওয়া ঝিলের জলে থরে থরে ফুটে আছে সব পদ্ম। লাল সাদা। দেখে কেমন ঘোর লেগে যায়। ওদিকে গুরুচণ্ডালীতে ইন্দোদাদার পরণকথার দেশ আর এদিকে এক ঝিল পদ্ম।

০২
মনে পড়ে, মন পড়ে থাকে শালুক পদ্মের ফাঁকে ফাঁকে..
হাওড়ের মাঝখান দিয়ে সদ্য হওয়া এক পিচরাস্তা, যে রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে পথে পড়বে দু খানা নদী, যারা এখান দিয়ে, সেখান দিয়ে, মাঠ পেরিয়ে, বিল ছাড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে মিশেছে মেঘনায়। শুকনো মরশুমের শুকিয়ে থাকা বিলের ইতি উতি জমে থাকা জলে রাজহাঁসের দল। সাদা, ছাই ছাই রঙা সব হাঁসের দল চড়ে বেড়াচ্ছে রাজকীয় মেজাজে। ছানা হাঁস, মা হাঁস, বাবা হাঁসেদের সঙ্গে তাদের পাড়া-পড়শী আর আত্মীয় স্বজনেরা। খুঁটে খুঁটে খায় সব শামুক, চুনো মাছ। কেউ বা গলা উঁচিয়ে রাজার মতই এদিকে ওদিকে সেদিকে চোখ চালিয়ে দেখে তাদের রাজত্ব। বর্ষার জল নেমে যাওয়ার পরে বেরিয়ে এসেছে সব ফসলী জমি। সদ্য বোনা কচি ধানগাছেদের রঙ নরম আর মোলায়েম এক সবুজ। কোথাও এখনও কিছুই লাগানো হয়নি, জমি শুধু চষে তৈরি করে রাখা। দূরে দূরে গ্রাম দেখা যায়, গাছ-গাছালীতে ঢাকা ছায়া সুনিবিড় সব গ্রাম। সন্ধে হলে যেখানে এখনও লম্ফ বা হ্যারিকেনের আলো জ্বলে। সেই সব গ্রামে এই দুই হাজার এগারোতেও বিজলীবাতি নামে কোনোকিছুর অস্তিত্ব নেই। বিলের মাঝে বাথানে বাস করা রাখাল গরু-ছাগলের দলকে বিলে ছেড়ে দিয়ে শুয়ে-বসে অলস সময় কাটায় ছায়া খুঁজে নিয়ে। বিলে ঘুরে বেড়ানো বেশিরভাগ হাঁসেদের ঠিকানা ওইসব বাথান। শুনশান হাওড়। নতুন এই রাস্তায় গাড়ি চলে সারাদিনে হাতে গুনে কয়েকটা। মাঝে মধ্যে হুস হাস শব্দে হাওড়ের এখানে সেখানে ঝিমুতে থাকা পাখা-পাখালীদের উড়িয়ে দিয়ে যায় মোটর বাইক। হাঁসেরা ঘাঁড় বেঁকিয়ে তাকিয়ে থাকে শব্দের উৎসের দিকে। 

বোধ হয় বছরখানেক হয়েছে ইঁট বিছিয়ে বছরের পর বছর পড়ে থাকা এই সড়ক পাকা হয়েছে, মেঘনার এই ছোট আর সরু দুই শাখানদী, বর্ষায় যাকে দেখলে মনে হয়- কূল নাই কিনার নাই অথৈ দইরার পানি সেই ছোট্ট ছোট্ট দুই নদীর উপর কবে থেকে যেন সেতু বানাবে বলে খাম্বা গেড়ে রেখেছিল। বহু বছর পর এই সেদিন সত্যি সত্যিই সেতু হয়েছে,  গুদারা ঘাটের গুদারা গুলো গেছে অন্য কোনো নদীতে, যেখানে এখনও সেতু হয়নি। গুদারাঘাটের পাশেই ঘাট, ইঞ্জিনের নৌকোরা সব এখনও আছে, সকাল বিকেল তারা সওয়ারী তুলে নিয়ে যায় কাছে দূরের সব গাঁয়ে, গঞ্জে, যেসব জায়গায় যেতে এখনও বাহন বলতে শুধু নৌকাকেই বোঝায়। এই রাস্তার শেষে আছে এক গ্রাম, যেখানে আমার মামার বাড়ি। একসময় আম্মা বাপের বাড়ি যেত শুধুমাত্র বর্ষাকালেই। নৌকায় চেপে। এই  রাস্তায় রিকশা বা বেবি ট্যাক্সিতেও যাওয়া যেত, কিন্তু সময় অনেক বেশি লাগত, আর যাত্রাও ছিল কষ্টকর, বর্ষাকালে ছইওয়ালা নৌকায় লোকে এমনিও বেড়াতে যেত তো আম্মা যেত বাপের বাড়ি। 

এবার বাড়ি গিয়ে মামার বাড়ি একনজর দেখে আসার সাধ হওয়াতে আমরা দুই বোন রওয়ানা দিলাম সিএনজিতে, নতুন রাস্তা দিয়ে, নতুন হওয়া সেতুর উপর দিয়ে। বিষন্ন মুখে আম্মা বলল, কই যাইবা, ছাড়া বাড়ি ছাড়া ঘর বাবলী, আমার বোন বলল, চল না আপা, লংঘন নদী দিয়ে নৌকা করে আমরা বেড়িয়ে আসব আম্মার নানির বাড়ি পর্যন্ত, ডাকবাংলার সামনে বসে চিপস আর চানাচুর খাব কোকাকোলার সঙ্গে! নদীর পাড়ে বসে চিপস- চানাচুর- কোকাকোলা খাওয়াটা লোভনীয় অফার হলেও মামার বাড়ি থেকে একবার এমনি এমনি ঘুরে আসাটা অনেক, অনেক বেশি আকর্ষনীয়

০৩
আমারে ছাড়িয়া রে বন্ধু কই গেলা রে
শূণ্য এক বাড়ি। উঠোনের উত্তরে আর দক্ষিণের ভিটেয় তালাবন্ধ সব শূণ্য ঘর। দক্ষিণের ভিটের এই লম্বাটে হাফ ইঁটের দেওয়ালের উপর টিনের ঘরটা আমার মেজমামার। আমার মেজর মামার। একাত্তরে মামার পোস্টিং ছিল পেশোয়ারে। পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিজের ভূমে এসে যুদ্ধ করতে আদেশ দিয়েছিল সেনাবাহিনি। যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করে চাকরী ছেড়ে দিয়ে দেশে ফিরতে চাওয়ায় মামা বন্দী হয় সেখানকার জেলে। যুদ্ধ শেষ হয়। দেশ স্বাধীন হয়। মামার কোনো খবর আসে না। আত্মীয়-স্বজনেরা মামিকে বলে বিধবার বেশ- সাদা কাপড় পরতে।  শোকে-দুঃখে মাথা খারাপ হয়ে যাওয়া মামি আমার দৌড়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যেত, রাস্তায় চলে যেত সাদা কাপড় দেখলে, পরনের কাপড় পড়ে থাকত পেছনে, মামি দৌড়াত রাস্তায়। তিয়াত্তরের শেষের দিকে, যখন মামিও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে মামা আর নেই, মরে গেছে, মিশে গেছে পাকিস্তানের মাটিতেই সেই সময় একদিন মামা ফিরে আসে। ছ’ফুট লম্বা সাজোয়ান মামা আমার প্রায় পঙ্গু আর কুঁজো অবস্থায় ফেরে। মামার হাতে পায়ে একটাও নখ নেই, সমস্ত উপড়ে নিয়েছে খান সেনারা। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারত না মামা আমার। বছরখানেক বাড়িতে থেকে মামা আবার চাকরীতে ফিরে যায়। এবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনি। শারীরিক অক্ষমতার কারণে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ডেস্কে বসে কাজ করতেন মেজর আকরাম হোসেন। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটত মামা। নানান রকম অসুখ বাসা বেঁধেছিল শরীরে। একদিন রাতে বুকে ব্যথা শুরু হয়, হাসপাতালেও নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নিজের শরীরের সঙ্গে যুদ্ধে আর পেরে ওঠেনি মামা আমার। থেমে যায় ধুকপুকুনি। হাসপাতালের মাটি চাপড়ানোর শব্দ জানান দেয়, মামা আর নেই

নিয়ামুল, মেজমামার ছেলে। সিলেটের এক চা বাগানে চাকরী করে। বাগানেই থাকে। অকালেই বুড়িয়ে যাওয়া সাদা চুলের সামসুন্নাহার, আমার মামার বড় আদরের নাহার সেখানেই থাকে ছেলে আর ছেলেবৌয়ের সঙ্গে। এক নাতি আর এক নাতনি মামির। ঈদে-চান্দে তারা সবাই বাড়ি আসে, তালা খোলে ঘরের, মামি তার ছেলের বৌকে নিয়ে ঘর-দোর-উঠোন সাফ সুতরো করে, দু-চারদিন থাকে তারা বাড়িতে। আত্মীয়-স্বজন আসে এবাড়ি-ওবাড়ি থেকে। মামি তাদের সঙ্গে গল্প করে, যুদ্ধের গল্প, ‘তাইন’এর গল্প। নিয়ামুলের ছুটি ফুরোয়, ঘরদোর তালাবন্ধ করে তারা চলে যায় সিলেটের কোনো এক চা বাগানে। আবার একবছরের জন্য

০৪
আমার সোনার ময়না পাখি, কোন দ্যাশেতে উইড়া গেলা রে, দিয়া মোরে ফাঁকি..
উঠোনের অন্যদিকের দেওয়ালের উপর টিনের চালের বড় ঘরখানি বড়মামার। একটা ঘরের ভিতর তিনখানি ঘর, গ্রিল দেওয়া বারান্দার ওধারে একটা ছোট উঠোন, উঠোন পেরিয়ে আরেকটা ছোট দালান, তাতেও তিনখানি ঘর,একটা গ্রিল দেওয়া বারান্দা। সবকটা ঘর তালাবন্ধ। এই ছোট উঠোনের ধারে ধারে বড় বড় সব গাছ, প্রাচীন আর বৃদ্ধ। নীরবে সব দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। উঠোনে সিমেন্টের বাঁধানো একখানি বড় গামলা, এক সময় এই বাড়ির গরু বাঁধা থাকত এই গামলার ধারে। এখন সেই গামলার গায়ে শ্যাওলা, গামলা শূণ্য আর শুকনো। উঠোনের ধারে একটা শূণ্য ভিটে পড়ে আছে, আমি জানি, একসময় ওখানে গোয়াল ঘর ছিল।

বড় মামার মেজছেলে, বছর সাতেক বয়েস ছিল তার, বাড়ির সামনের পুকুরে ডুবে গিয়ে মারা গিয়েছিল। ঠিক সাত বছর পর মামার একমাত্র মেয়ে, তারও বয়েস ওই বছর সাতই ছিল, ছোট্ট কলসিটি হাতে নিয়ে কলতলায় গিয়েছিল খাওয়ার জল আনতে। অনেকক্ষণ ধরে ফিরছে না দেখে মামি দৌড়ে গিয়ে পুকুরপাড়ে দাঁড়ায়, নিথর শান্ত জল পুকুরের। এদিক ওদিক কোনোদিকে না তাকিয়ে মামি সোজা নেমে যায় পুকুরে। বাড়ির অন্যেরা তখন রীতাকে এদিক ওদিক খুঁজছে। মামারও বোধ হয় মনে কু ডেকেছিল, সঙ্গে সঙ্গেই জাল নিয়ে পুকুরে নেমে পড়ে। বেশিক্ষণ লাগেনি মেয়ের নিথর দেহ তুলে আনতে। ঠিক সাত বছর আগে এভাবেই তুলেছিল ছেলের লাশ। মামি পাগলের মত শরীরের উত্তাপ দিয়ে ছেলের শরীরের প্রাণ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। গোটা শরীরে ছাই মাখিয়ে দিয়েছিল শরীর গরম হবে বলে.. মেয়েকে মাটি দিয়ে মামা এসে দেখে বড়ছেলের হাত ধরে মামি হেঁটে রওয়ানা দিয়েছে চল্লিশ মাইল দূরের বাপের বাড়ি যাবে বলে।

মামার সরকারি চাকরী ছিল পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরে। গ্রামের লোক, আত্মীয়-স্বজন সবাই বলল, ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর চাকরি করে বলে এভাবে নিজের ছেলে-মেয়ে সব মরে যাচ্ছে। চাকরী ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শও এল অনেক। বছরখানেক মামি বাপের বাড়িতেই ছিল, তারপর শহরে চলে যায়, মামার চাকরির জায়গায়। সেই যে গেল, মামি আর ফেরেনি এই বাড়িতে। এখন, মাঝে-মধ্যে বাড়িতে আসে দু-চারদিনের জন্য, ঈদে বা এমনি দিনে। মামা অবসর নিয়েছে অনেকদিন, বড়ছেলে-বৌ আর দুই নাতনিকে নিয়ে তারা সকলেই শহরবাসী।

বাড়ির সীমানার দর্মার বেড়া ভেঙে পড়ে গেছে অনেককাল। শ্যাওলায় ঢাকা স্যাতসেতে উঠোনে বড় বড় লাল-কাল পিঁপড়ের দল ঘুরে বেড়ায় নির্বিঘ্নে, নিশ্চিন্তে। বাড়ির পাহারাদার, একসময় যে এই বাড়ির জমি-জিরেত দেখাশোনা করত, সন্ধেবেলায় এসে বারবাড়িতে, ভেতরের বড় উঠোনে আর পেছনের ছোট উঠোনে আলো জ্বেলে দিয়ে যায়, নিজে বসে থাকে বারবাড়ির বৈঠকঘরে, রেডিও শোনে, পাড়ার দু-একজন আসে, গল্পগাছা হয়, এশার আজান হলে সবাই যে যার বাড়ি চলে যায়, পাহারাদার শুধু থেকে যায় বারবাড়ির এই বৈঠকে।

০৫
পরিবর্তনের হাত ধরে মানুষ এখন প্রবল রবীন্দ্রভক্ত। নদীর এপারে, আমার বাড়ির আশে পাশের সবকটি কালীপুজার মন্ডপে উত্তাল আইটেম সঙ-এর বদলে মাইকে বাজছে রবীন্দ্রনাথের গান। বিকেল থেকে মাঝরাত্তির অব্দি। নো নাচনা। নো হিন্দি গানা।  ঘুম না আসা রাতে মাইক থামতে কানে আসে বাঁশীর সুর। দোতলার ডাক্তারদাদা বাজাচ্ছেন। শুনশান রাত, কালীপুজোর আগের রাতে কোনো বাজি পটকা কিসসু নেই। বাঁশী বাজে গহীন রাত অব্দি। মাঝে মধ্যে বোধ হয় হাতবদলও হয়েছে বাঁশী, হবু ডাক্তার ওংকার। সামনে বসে কখনও শোনা হয়নি এই বাঁশী। একটু গভীর রাতের দিকে জানলার ধারে বসলে প্রায়শই কানে আসে বাঁশীর সুর। কখনও বা সন্ধেবেলায় বা হঠাৎ কোনো দুপুরবেলাতেও বাঁশী শোনা যায়। বড় মিঠে বাজান ডাক্তারদাদা

০৬
উদ্যানে সকালের বেড়ানো শেষে গেটের বাইরে এসে বাচ্চা’র চায়ের দোকানে চা খেয়ে দাম দিতে গিয়ে যে দশ টাকার নোটটি হাতে এল, তাতে কেউ একজন নীল কালিতে লিখে রেখেছেন মিট মি এট-  পরের অংশটুকু আবার হয়ত অন্য কেউ একজন কেটে দিয়েছেন। এমনভাবে কাটা যে পড়ার উপায় নেই। নোট প্রসঙ্গে মনে পড়ল দিন কতক আগে আমি একখানা পাঁচশত টাকার নকল নোটের মালিক হয়েছি। কোথা থেকে, কিভাবে আমার হাতে এসে পড়ল সে ঠিকঠাক মনে নেই। অবশ্য মনে আর ঠিকঠাক কোন জিনিসটা থাকে আমার! মন তো বেভুল হয়ে পথ হারিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছে বিগত দুই জনম আগে। বলছিলাম নকল পাঁচশতি নোটখানার কথা। সম্ভাব্য যেই জায়গা থেকে নোটখানি এসেছে সেখানে গেল নোটখানি। কিন্তু তিনি খুব সঙ্গত কারণেই মালিকানা অস্বীকার করলেন। ফলত: আমি একখানা পাঁচশত টাকার নকল নোটের চিরকালীন মালিক হলাম। টাকা-পয়সা যতই খরচ করি, সর্বস্ব খরচ করে ফেলি না কেন, এই নোটখানি কমসে কম আমার কাছে থাকবেই থাকবে। সেই কৌন বনেগা কড়োরপতিতে অমিতাভ বচ্চন বলেন না? কম সে কম আজ আপ ইহাসে -----রুপাইয়া লেকর হি জায়েঙ্গে। ঠিক সেই রকম!

ছোট সাদা বাস দেখা যায়, গুমটি থেকে বেরিয়ে গুটি গুটি এগিয়ে আসছে, আমিও এগোই, ঘরে ফেরার সময় হল


------

কালীপুজোর সময়কার  লেখা, আরও খানিকটা লেখার ছিল, আছে বলে খসড়ার খাতায় ছিল। আজ তুলে দিলাম, পরে কখনও বসব আবার এটা নিয়ে..

Sunday, February 05, 2012

একটি খসড়া রচনা ও এক ঝড়ের কথা

সকালবেলায় এক বন্ধুর ফোন এল, বহুদিন বাদে। এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে সে যাচ্ছে, প্রায়, প্রায় সেই একই রকম সময় আমিও পেরিয়ে এসেছি বলেই হয়ত আমার কথাই তার মনে পড়ল। একটা লেখা পড়ছিলাম প্রায় ওই সময়েই, মিশ্র একটা প্রতিক্রিয়া হল, একসঙ্গে অনেক কিছু, অনেক, অনেক কিছু মাথায় ভীড় করে এল। ভুলে যাওয়া বা ভুলতে চাওয়া সমস্ত, সমস্ত যন্ত্রণা একসঙ্গে মনে পড়ে গেল। বিদ্ধ করল আবার নতুন করে। কোথাও কোনো বাতাস নেই, দম ফেলতে পারছি না এমন একটা অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গেই কিছু ভাল লাগা/ ভাল সময়ও কোথা থেকে যেন এসে হাজির হল। বহুকাল বাদে আজ আবার সেই সব ভাবনাগুলো বা বলা ভাল এই একসঙ্গে ভীড় করে আসা কথা বা ভাবনাগুলো লিপিবদ্ধ করার ইচ্ছেতে এই খসড়া রচনা।
 
ভুলে যাওয়ার  রোগ পেয়ে বসেছে, সব ভুলে যাই, সব সব সব। কেউ একজন হয়ত খুব বাজে বাজে গালি দিল, দিয়ে চলে গেল, পরে আবার তার সঙ্গে দেখা হল, মনেই থাকে না যে সে গালি দিয়েছিল। এমতাবস্থায়  সমস্ত ভাবনাগুলো/ কথাগুলো যাতে হারিয়ে না যায়, তাই এখানে এই খসড়া। তারপরেও যদি ভুলে যাই, মাথায় না থাকে আর কিছু, সাদা সাদা হয়ে যায় সবকিছু, তবে পথ তো খোলা রইলই এই খসড়া ছিঁড়ে ফেলার..

-২০১২-০২-০৫
 
এই খসড়া রচনাটিকে নিয়ে আমি আবার বসব এমনটা ভাবিনি। এটা ফেলাই যাবে, এমনতরই মনে হয়েছিল। যা লিখব বলে এই খসড়ার সূত্রপাত, আজ ঠিক সেই কথা বা ভাবনা নয় অন্য কিছু কথা বলব বলে বসেছি। 

খসড়াটুকুও রইল এখানেই, হয়ত না বলা কথাগুলো আবার কখনও বলতে বসব..



০২
মান আছে আর হুঁশ আছে যার, সেই তো মানুষ হয়.. 

কল্লোলদার গানের এই লাইনটা বড় মনে পড়ছে। আমার যেমন হয়, আগে-পিছে, অন্তরা-মুখড়া কিস্‌সু মনে থাকে না, হঠাৎ হঠাৎ একটা করে লাইন মনে পড়ে আর সেটা পেয়ে বসে। কল্লোলদার কোনো গান হলে আমি তক্ষুনি তাঁকে ফোন করি, আগে-পরের লাইনগুলো জানতে চাই। কল্লোলদা সেটা তক্ষুনি গেয়ে শুনিয়ে দেন, তা সে রাত বারোটা হোক বা দুপুর বারোটা। আজ সেই ইচ্ছেটা জাগছে না। কী হবে!  আমার আজ আগে-পরে, অন্তরা-মুখড়ার প্রয়োজন নেই। ‘মান আর হুঁশ আছে যার, সেই তো মানুষ হয়’ -তোমার এই কথাগুলো যদি সত্যি হয় কল্লোলদা, তবে আমি মানুষ নই। ‘মান আর হুঁশ’ সব বিসর্জন দিয়েছি, আজ তাই অন্তরা, মুখড়া কিচ্ছু, কিচ্ছুটি জানতে চাই না, শুধুমাত্র, শুধুমাত্র এই কথাগুলোই যথেষ্ট আমার জন্যে।

০৩
মাকে আমার বড় হিংসে হয়..

মাকে আমার বড় হিংসে হয়। শুধু আমার মাকে নয়, আমার মায়ের মত সকল মায়েদের আমি হিংসে করি। তাঁরা কেমন নিজের সংসার, সন্তান-সন্ততিতে নিজেকে লীন করে দিয়ে বেঁচে থাকেন। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-কান্না সব, সব নিয়ে দিব্যি মুখে হাসিটি ধরে রাখতে পারেন। সন্তান যখন যন্ত্রণায় থাকে, সে যেখানেই থাকুক না কেন, ‘মা, মাগো, কোথায় তুমি’ বলে ডেকে উঠতে পারে। সেই সব মায়েদের আমি হিংসে করি কারণ আমি এক অযোগ্য মা। আমি শুধু নিজেরটুকু ভাবি, যা কিছু করি, নিজের জন্যে করি এবং শুধুমাত্র নিজের জন্যেই করি। আমার সন্তান তাই যন্ত্রণায়-অপমানে বিদ্ধ হলে মাদুর পেতে মেডিটেশনে বসে, 'মা, মাগো' বলে ডেকে ওঠে না। 

সেই সব মায়েদের, আমার মায়ের, নিজেদের কী কোনো সাধ-আহ্লাদ ছিল না বা নেই? নিজস্ব একটা জগত, সংসার জীবন তো আছে, রইলই, তার বাইরে বা তারই সঙ্গে সঙ্গে শুধুমাত্র নিজের জন্যে একটা জগত তৈরি করার কোনো বাসনা কী কখনও তাদের হয়নি বা হয় না? জানি না। হয়ত হয়, হয়ত হয় না। বা তাঁরা হয়ত এইসব নিয়ে ভাবেনই না। স্কুল-কলেজ-ইউনিতে সেই সব মায়েরাও গেছেন, কেউ গান করতেন, কেউ বা কবিতা লিখতেন তো কেউ বাজাতেন গিটার। কেউ কেউ রাজনীতিও করতেন। সংসার, সন্তান-সন্ততি হয়ে যাওয়ার পর তাঁদের সমস্ত রচনা, সৃষ্টি, সব, সব এসে বসত করে তাদের ঘর-কন্নাটুকুতেই। এর বাইরে কিছু নেই, কিচ্ছু নেই। যেন থাকতেই নেই।

কী করে পারেন তাঁরা? আমি তো পারিনি! মা তো আমিও হয়েছি। খুব স্বাভাবিক নিয়মেই আমারও তো একদিন স্বামী, সংসার, সন্তান এসেছিল? তবে আমি কেন পারলাম না শুধু ওইটুকু, শুধুমাত্র ওইটুকু নিয়েই থাকতে? কেন আমায় যেতে হল মনোরোগ বিশারদের  কাছে? ভাত-মাছ-চা-বিস্কুটের পরিবর্তে শুধুমাত্র ওষুধ খেয়েই কেন আমাকেই কাটাতে হল মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, দেড় যুগ ধরে?? কার দোষে? কী দোষে? কী অপরাধ ছিল আমার? অন্যের দোষ খুঁজতে নেই, আম্মা তো এটাই বলে। তার মানে দোষ আমারই ছিল! ভুল-ভ্রান্তি, অপরাধ- যা কিছু, সে শুধু আমার, অপরাধী আমি, শুধুমাত্রই আমি। আর কেউ নয়।

০৩
হও ধরমেতে ধীর হও করমেতে বীর

আমার দাদি খুব বদমেজাজি ছিলেন। চৌধুরানী বলে কথা। দাদির মেজাজ সামলাতে না পেরে মা যখন চোখের জল ফেলত, আমার দাদা, গ্রামের এক সোজা-সাপ্টা মানুষ নিজের ভাষায় মাকে বলতেন, সোনা, মাটি হও। মাটি। মাটিকে দেখ, এই মাটি দিয়েই মানুষ তৈরি, অথচ কত অত্যাচার এই মানুষ মাটির উপর করে। মাটি কিন্তু ওফ পর্যন্ত করে না। সেই রকম মাটি হও। দেখবে সব কত সোজা আর সরল হয়ে গেছে সবকিছু! আমার মা মাটি হয়ে গেল। আর সবকিছু সত্যি সত্যিই খুব সোজা আর সহজ হয়ে গেল সব, সবকিছু। 

আমি তো নিজের কানে শুনেছি আমার দাদার বলা সেই কথাগুলো, যেগুলো তিনি মাকে বলেছিলেন, আর তারপর মায়ের সবকিছু সত্যি সত্যিই সোজা আর সহজ হয়ে যেতেও দেখেছি। যন্ত্রণায় মা আর কাঁদত না। কোলের সন্তানটিকে বুকে চেপে ধরত বা জায়নামাজে গিয়ে বসত। সব জেনে, শুনেও আমি পারিনি মায়ের মত ‘মাটি’ হয়ে যেতে। একজন আমার পরে অত্যাচার করবে আর আমি মাটি হয়ে গিয়ে সব সইব, পারিনি সেটা করতে। তাই কিছুই সোজা আর সহজ হলো না। যন্ত্রণাও তাই সঙ্গ ছাড়ল না..

০৪
আজ আর দুর্বল নই আমি।।

বড় গর্ব করে একদিন বলেছিলাম উপরের ওই কথাগুলো। সঙ্গে আরও বলেছিলাম, এই ছোট্ট জীবনে এতকিছু দেখেছি, পেরিয়ে এসেছি, এতরকমের যুদ্ধ করতে হয়েছে, কোথাও হেরেছি তো কোথাও জিতেছি, ফলতঃ যা কিছু মানসিক দুর্বলতা, সমস্ত, সমস্ত কাটিয়ে উঠেছি। আজ আমি আর দুর্বল নই। আজ আমাকে কেউ ধাক্কা দিতে এলে, সে যাই হোক- যেই হোক, নিজে পড়ে যাবে, আমাকে ফেলতে পারবে না।। 

কত বড় ভুল আর মিথ্যে ধারণা নিয়ে বাস করছিলাম। গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলাম কথাগুলো। এখন প্রমাণিত, কি ভীষণ ভুল ধারণা বা বিশ্বাস নিজের ভেতরে পুষে রেখেছিলাম। আসলে, আসলে আমি বড় দুর্বল। বড় পলকা। ঝড়-বাতাস সহ্য করার কোনো ক্ষমতা বা শক্তি আর আমার মধ্যে বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট নেই।

০৫
ধূসর দেওয়ালের ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ ছাড়া আর কিছুই ভেসে আসে না..

ঘরে বড় গুমোট ছিল। দক্ষিণের ওই বন্ধ জানালা দিয়ে বাতাস আসার এতটুকুও পথ ছিল না । একদিন বন্ধ জানালার বাইরে থেকে দখিনা বাতাস এসে টোকা দিল, ফিসফিস করে কত কথা বলল। বলল, জানালাটা খুলে দে, দ্যাখ, সবুজ ঘাসেরা কেমন নুয়ে পড়ছে বাতাসে, তালের পাতাগুলো কেমন শনশন শব্দ তুলছে হাওয়ায়, পানকৌড়িটা কেমন ডুবছে, মাথা তুলছে আবার ডুবছে, বাতাস নিচ্ছে,  উড়ে গিয়ে বসছে ওই ছোট্ট গাছের ডালে, দ্যাখ চেয়ে।। কাঠবেড়ালীটাও অপেক্ষা করে আছে, কেটে রাখা সব্জীর টুকরোখানির জন্যে, খুলে দে জানালা, খোল..

আরও বলল, আসলে তো তুই এখনও সেই ছোট্টটিই আছিস, বাবার সেই এমুপাখি, দাদার সেই দুই ঝুঁটির চঞ্চল ঘোড়ামুখী। আসলে তো তুই পনেরো বছর ন'মাস। মাঝে যা কিছু দেখেছিস, পেরিয়েছিস বলে ভাবিস, সে তো স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন। আমি বিশ্বাস করলাম দখিনা সেই বাতাসকে, তার কথাকে।  খুলে দিলাম বন্ধ জানালা। জোর কদমে বাতাস এল, দখিনা বাতাস। প্রাণ জুড়িয়ে গেল। দম ফেলে বাঁচলাম আমি। কত গান, কত সুর যে ভেসে এল সেই বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে! আমি ভাসলাম। আমি ডুবলাম, আবার ভাসলাম, উড়ে গেলাম, ভেসে বেড়ালাম পশ্চিমের পুকুরের ওই পানকৌড়িটির মতন। জনসমক্ষে গলা ছেড়ে আমার গাইতে ইচ্ছে হল- শোনো গো দখিনও হাওয়া, প্রেম করেছি আমি!!

বন্ধ ঘরের জমে থাকায় ধুলোয় লেখা হল নাম, সেই ধুলো আরও পুরু হল, নামটা তবুও রয়েই গেল, ক্রমশ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হল সেই নাম। কে জানত। খোলা জানালা দিয়ে ঢোকা এক ঝলক ঠান্ডা বাতাসের পরেও গুমোট হয়ে যেতে পারে ঘরের ভেতরটা আবার। বাইরে ঝড় যে উঠতে পারে সে আর কে মনে রাখে দখিনা বাতাস পেলে পরে! কিন্তু ঝড়ের নিয়ম মেনে ঝড় উঠল। জানালাটা খোলাই ছিল। দশ নম্বর মহা বিপদ সংকেত ছিল, আমি উপেক্ষা করেছিলাম। বান-বাতাসের দেশের মানুষ আমি, এইসব ঝড়- তুফান আমার করবে কী? সামলে নেব! পারলাম না। উড়ে গেল সব খড়-কুটোর মত। আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে সমস্ত ভরসা, বিশ্বাস আর সবটুকু শক্তি,  সব সব উড়ে গেল। সব ঝড়ই একসময় থামে। এও থামল। হিম, মৃত্যুশীতল নৈঃশব্দ রেখে গেল পেছনে। থকথকে কাদা, আর এলোমেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা আমার ঘর-কন্না ছাড়া আর সব নিয়ে গেল সঙ্গে। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আমার কোনো গত্যন্তর রইল না। 

বড় ঘুম পাচ্ছে। ভীষণ ঘুম। কোথাও কোনো ঘুম পাড়ানি গান নেই কিন্তু আমার বড় ঘুম পাচ্ছে। বড় ভাল হতো এই ঘুম আর যদি না ভাঙত..
  
২০১২-০২-০৯

---------


এই রচনায় কোনো মন্তব্য গ্রহণ করা হবে না বিধায় মন্তব্য করার সুবিধাটুকু সরিয়ে নেওয়া হল।