Monday, October 01, 2012

'হে রাম এ যে কুচো চিংড়ি গো!'


Photo: প্রাতঃভ্রমণের সঙ্গী শিখাদি এন্ড মি, প্রায় প্রত্যহ বোটানিকাল গার্ডেন একনম্বর লঞ্চঘাটের বাঁধানো সোপানে বসিয়া  চা পান করি। শিখাদি মাছের নৌকা দেখিলেই উচাটন হয়, প্রায় রোজই। সুবর্ণরেখাকে মনে করে, সেই নদীর মৎসকূলকে স্মরণ করিয়া দুঃখী হয়। আজ এক পাইকার ঘাটে দাড়াইয়া ওদূরে নোঙর ফেলিয়া দাঁড়াইয়া থাকা একখানি ছোট্ট  জেলে নৌকার সমুখে দাঁড়ানো শাট-পেন্টুলুন পরিহিত এক সজ্জনের সহিত মোবাইল করিতেছিলেন। শিখাদি সেই মোবাইল-কথার মর্ম উদ্ধার করিল, অই নৌকায় বড় বড় গলদা আছে। এবং তাহা গঙ্গার জলের চাইতেও সস্তায় নৌকামালিক বিক্রি করিতেছে। শিখাদি এবং মৎস্য পাইকার খানিক বার্তালাপ করিল, পাইকার ভরসা দিল, এখনি নৌকা তীরে আসিবে এবং পাইকার আমাদিগকে গলদা ক্রয় করিয়া দিবে। ইহাতে কোন গলদ নাই। আমি এন্ড শিখাদি দুইজনাই প্রাতঃভ্রমণের ছোট্ট ছোট্ট বটুয়াগুলি খুলিয়ে পয়সা গুনিয়া লইলাম। পাইকার যা মূল্য শুনাইয়াছে তাহাতে শিখাদি এক সের পরিমান এবং আমি আধাসের পরিমান ক্রয় করিয়াই ফেলিব! চায়ের মূল্য আগামীকল্য মিটাইলেই হইবে এমন ভরসা চা-দিদি দিলেন।

ইতিমধ্যে নৌকার সমুখে দাঁড়িয়ে থাকা সজ্জন ঘাটে য়াসিলেন এবং আমাদিগকে হস্ত-পদ-শুঁড় সঞ্চালনকারী গলদার দর্শন করাইয়া ঘাটে  অবস্থানকারী  পাইকার মহাশয়ের কর্ণে কোন এক মন্ত্র দিলেন এবং দুইজনাই একখানি দ্বিচক্রযানে চড়িয়া নিমেষেই অন্তর্হিত হইলেন। 

শিখাদি প্রবল ব্যস্ত হইয়া পাইকার মহাশয়ের খোঁজ করিতে লাগিল কিন্তু তাঁহার টিকির দর্শনও আর পাওয়া গেল না। এতক্ষণ ধরিয়া পাইকার মহাশয় আমাদিগকে যে আশ্বাসবাণী শুনাইতেছিল  নির্দ্বিধায় সেই বাণীতে বিশ্বাস করিয়া শিখাদি তাহার পাদুকা এবং আমি আমার গাম্বুটজোড়া খুলিয়া তীরে রাখিয়া প্রায় হাঁটুসমপরিমান কর্দমায় পদযুগল রাখিলাম। মনে আশা অন্য কোন সজ্জন পৌঁছাইয়া ঐ গলদা ঝোলাগত করিবার পূর্বেই আমরা ক্রয় করিয়া ফেলিব। তীর হইতে বিহারি চা-দিদিমণি চেঁচাইতে লাগিলেন, ও দিদি, পড়ে গেলে যে হাত-পা ভাবগিয়া যাইবে যে গো! সেদিকে কর্নপাতমাত্র না করিয়া আমরা নৌকার সন্নিকটে পৌঁছাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম এবং এক সময় পৌঁছাইয়াও গেলাম! এমন সময় বেশ ছোট্টমতন একখানা হড়কা বান আসিল এবং জলের অল্প দূরে অবস্থানকারী আমরা এই বান দেখিয়া বেশ পুলকিত বোধ করিলাম। শিখাদি প্রায় দিনই আসসোস করিয়া থাকে, একদিনের তরেও জোয়ার দেখিতে পায় না বলিয়া। আজ জোয়ার না হউক, বান দেখিয়া সে যারপরনাই প্রীত হই্ল। 

নৌকা হইতে মৎসশিকারী আমাদিগকে যে চিংড়ির দর্শন করাইল, তাহাকে গলদা বলিবার মত গলদ কর্ম এমনকি শিখাদিও করিয়া উঠিতে পারিল না, আকুলকন্ঠে অস্ফুটে কহিতে পারিল শুধু, 'হে রাম এ যে কুচো চিংড়ি গো!'

এই প্রকার সেই প্রকার কোন প্রকারে আমরা কাদা ঠেলিয়া একটিও আছাড় না খাইয়া ঘাটে ফিরিয়া আসিলাম এবং গঙ্গাস্নানে নিমগ্ন পিতা-পুত্রের যৎপ্রোনাস্তি বিরক্তির উদ্রেক করিলাম বাঁধানো সোপানে পদযুগল হইতে কাদা ধুইবার অভিলাষ প্রকাশ করায়। অই স্থানে তাহাদের দ্রব্যাদি রহিয়াছে, জল-কাদায় যাহা নোংরা হইবার প্রব সম্ভাবনা!  চা দিদির আগাইয়া দেওয়া বালতির জলে যতটুকু সম্ভব কাদা পরিস্কার হইল। সহৃদয় বৃদ্ধের আগাইয়া দেওয়া গামছাখানিতে পা মুছিয়া গাম্বুট পরিয়া যৎপরোনাস্তি আমোদ প্রাপ্তি করিয়া অদ্যকার প্রাতঃভ্রমণ সম্পন্ন হইল!প্রাতঃভ্রমণের সঙ্গী শিখাদি এন্ড মি, প্রায় প্রত্যহ বোটানিকাল গার্ডেন একনম্বর লঞ্চঘাটের বাঁধানো সোপানে বসিয়া চা পান করি। শিখাদি মাছের নৌকা দেখিলেই উচাটন হয়, প্রায় রোজই। সুবর্ণরেখাকে মনে করিয়া, সেই নদীর মৎসকূলকে স্মরণ করিয়া দুঃখী হয়। আজ এক পাইকার ঘাটে দাড়াইয়া  অদূরে নোঙর ফেলিয়া দাঁড়াইয়া থাকা একখানি ছোট্ট জেলে নৌকার সমুখে দাঁড়াইয়া থাকা  শাট-পেন্টুলুন পরিহিত এক সজ্জনের সহিত মোবাইল করিতেছিলেন। শিখাদি সেই মোবাইল-কথার মর্ম উদ্ধার করিল, অই নৌকায় বড় বড় গলদা আছে। এবং তাহা গঙ্গার জলের চাইতেও সস্তায় নৌকামালিক বিক্রি করিতেছে। শিখাদি এবং মৎস্য পাইকার খানিক বার্তালাপ করিল, পাইকার ভরসা দিল, এখনি নৌকা তীরে আসিবে এবং পাইকার আমাদিগকে গলদা ক্রয় করিয়া দিবে, ইহাতে কোন গলদ নাই। আমি এন্ড শিখাদি দুইজনাই প্রাতঃভ্রমণের ছোট্ট ছোট্ট বটুয়াগুলি খুলিয়া পয়সা গুনিয়া লইলাম। পাইকার যা মূল্য শুনাইয়াছে তাহাতে শিখাদি এক সের পরিমান এবং আমি আধাসের পরিমান ক্রয় করিয়াই ফেলিব! চায়ের মূল্য আগামীকল্য মিটাইলেই হইবে এমন ভরসা চা-দিদি দিলেন।

ইতিমধ্যে নৌকার সমুখে অবস্থানকারী  সজ্জন ঘাটে  আসিলেন এবং পরম হর্ষে আমাদিগকে হস্ত-পদ-শুঁড় সঞ্চালনকারী গলদার দর্শন করাইয়া ঘাটে অবস্থানকারী পাইকার মহাশয়ের কর্ণে কোন এক মন্ত্র দিলেন এবং দুইজনাই একখানি দ্বিচক্রযানে চড়িয়া নিমেষেই অন্তর্হিত হইলেন।

শিখাদি প্রবল ব্যস্ত হইয়া পাইকার মহাশয়ের খোঁজ করিতে লাগিল কিন্তু তাঁহার টিকির দর্শনও আর পাওয়া গেল না। এতক্ষণ ধরিয়া পাইকার মহাশয় আমাদিগকে যে আশ্বাসবাণী শুনাইতেছিলেন নির্দ্বিধায় সেই বাণীতে বিশ্বাস করিয়া শিখাদি তাহার পাদুকা এবং আমি আমার গাম্বুটজোড়া খুলিয়া তীরে রাখিয়া প্রায় হাঁটুসমপরিমান কর্দমায় পদযুগল রাখিলাম। মনে আশা অন্য কোন সজ্জন পৌঁছাইয়া ঐ গলদা ঝোলাগত করিবার পূর্বেই আমরা ক্রয় করিয়া ফেলিব। তীর হইতে বিহারি চা-দিদিমণি চেঁচাইতে লাগিলেন, ও দিদি, পড়ে গেলে যে হাত-পা ভাঙ্গিয়া যাইবে যে গো! সেদিকে কর্নপাতমাত্র না করিয়া আমরা নৌকার সন্নিকটে পৌঁছাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম এবং এক সময় পৌঁছাইয়াও গেলাম! 

এমন সময় বেশ ছোট্টমতন একখানা হড়কা বান আসিল এবং জল হইতে অল্প দূরত্বে অবস্থানকারী আমরা এই বান দেখিয়া বেশ পুলকিত বোধ করিলাম। শিখাদি প্রায় দিনই আসসোস করিয়া থাকে, একদিনের তরেও জোয়ার দেখিতে পায় না বলিয়া। আজ জোয়ার না হউক, বান দেখিয়া সে যারপরনাই প্রীত হই্ল।

নৌকা হইতে মৎসশিকারী আমাদিগকে যে চিংড়ির দর্শন করাইল, তাহাকে গলদা বলিবার মত গলদ কর্ম এমনকি শিখাদিও করিয়া উঠিতে পারিল না, আকুলকন্ঠে অস্ফুটে কহিতে পারিল শুধু, 'হে রাম এ যে কুচো চিংড়ি গো!'

এই প্রকার সেই প্রকার কোন প্রকারে আমরা কাদা ঠেলিয়া একটিও আছাড় না খাইয়া ঘাটে ফিরিয়া আসিলাম এবং গঙ্গাস্নানে নিমগ্ন পিতা-পুত্রের যৎপরোনাস্তি বিরক্তির উদ্রেক করিলাম বাঁধানো সোপানে পদযুগল হইতে কাদা ধুইবার অভিলাষ প্রকাশ করায়। অই স্থানে তাহাদের পরিধেয় দ্রব্যাদি রহিয়াছে, জল-কাদায় যাহা নোংরা হইবার প্রবল সম্ভাবনা! চা দিদির আগাইয়া দেওয়া বালতির জলে যতটুকু সম্ভব কাদা পরিস্কার হইল। সহৃদয় বৃদ্ধের আগাইয়া দেওয়া গামছাখানিতে পা মুছিয়া গাম্বুট পরিয়া যারপরনাই আমোদ প্রাপ্তি করিয়া অদ্যকার প্রাতঃভ্রমণ সম্পন্ন হইল!

Sunday, September 23, 2012

জ্বরবেলা এখন ও তখন

দিনকাল কত বদলে গেছে কিন্তু কিছু জিনিস এখনও বদলায়নি। বদলায়নি আমার ঠকঠকিয়ে কাঁপুনি দিয়ে ভালুকজ্বর আসা। ছেলেবেলার মত মনে হওয়া যে -দাঁতকপাটি লাগছে, ভেতরে ভেতরে অসম্ভব কাঁপুনি, অথচ শরীর কাঁপে না একটুও। জ্বরের ঘোরে মুহূর্তে মুহূর্তে চমকে ওঠা, ভয় পাওয়া, মনে হওয়া যে কারা যেন ঘরের মধ্যে হেঁটে-চলে বেড়াচ্ছে। ঘোরের মধ্যে চোখের সামনে নানান রঙের আলোর বলয়দের ঘুরে বেড়ানো, গোল গোল ঝিলিমিলি আলো, এঁকে-বেঁকে যাওয়া সব রামধনু আলো, খুব কান্না পাওয়া, আব্বার সঙ্গে কথা বলতে চাওয়া, আম্মার মশলার গন্ধওয়ালা হাত আর আঁচল খোঁজা –যা ভিজিয়ে আম্মা জ্বরতপ্ত মুখ-গলা, হাত-পা মুছিয়ে দিত, তপ্ত দুই চোখের উপর রেখে দিত সেই আঁচল, প্রিয় মানুষের হাতের স্পর্শ পাওয়ার ইচ্ছেগুলো বদলায়নি একটুও...

যা বদলেছে -এখন জ্বর এলে ইন্দোদাদা-কে একটা ফোন করি, ইন্দোদাদা ওষুধ বলে দেয়, কখনও কিছু পরীক্ষা করতে বলে, কখনও শুধু ওষুধ বলে দেয়,বাবু সেগুলো লিখে নেয়। সেই ওষুধ একবার মাত্র খেলেই জ্বর ‘নরম' হয়ে যায়। -এই ‘জ্বর নরম’ কথাটা আমার দাদি বলত।  ওষুধ খেয়ে দু'দিনের মাথায় আমি হেঁটে-চলে বেড়াই, ঘরের কাজ-কম্ম করি, ফেসবুকে নোট লিখতে বসি। ইন্দোদাদার ফোনে বাৎলানো বিধান অনুযায়ী প্রচুর পরিমানে ওআরএস খাওয়ার ফলে দুর্বলতাও থাকে না। আমার ছেলে বলে –ইন্দো ডাক্তার জিন্দাবাদ!

ডাক্তার প্রসঙ্গে গতকাল রাত থেকেই মনে পড়ছে আমাদের গাঁয়ের এক ডাক্তারবাবুর কথা। এক বর্ষাকালের কথা, অনেক চেষ্টা করেও আমি সেই ডাক্তারবাবুর নাম মনে করতে পারছি না। বহু বহু বছর আগের কথা। সেবছর ছুটিতে বাড়ি গিয়ে কিছুতেই আব্বা-আম্মার সঙ্গে সিলেট ফিরতে চাইলাম না। আরও একটা সপ্তা থেকে যাওয়ার জন্যে রাত থেকেই কান্নাকাটি, সকাল হতেই দাদির খাটের তলায় লুকিয়ে থাকা, স্কুল শুরু হতে এখনও তো এক সপ্তাহ বাকি, কাকা নাহয় পৌঁছে দিয়ে আসবে গিয়ে। শেষমেশ দাদির কথায় আব্বা রাজী হল রেখে যেতে। আমিও বেরিয়ে আসি খাটের তলা থেকে। ভরা বর্ষা। চারিদিকে থৈ থৈ পানি, একটুখানি জেগে আছে শুধু পুকুরের পারগুলো আর বড় রাস্তা অব্দি যাওয়ার কাঁচা সড়ক।

রোদের দেখা নেই, সারাদিন আকাশের মুখ ভার হয়ে থাকে, থেকে থেকেই অঝোর বৃষ্টি। পুকুরের পশ্চিমপারের বাঁশঝাঁড়ের ওধারের খালে টলটলে জল, জলের ভেতর দেখা যায় শ্যাওলায় ঢাকা নানান রকমের লতা-গুল্ম। মনে প্রবল বাসনা, এই খালে নেমে সাঁতার কাটব, বারবার বাড়ির দিকে তাকাই, কাকা কোথায়? কদ্দূর গেছে? দেখতে বা জানতে পেলে আর রক্ষে নেই –এই ভেবে নিজেকে বিরত রাখি খালে নামা থেকে। খানিক দূরে তাকালেই ডুবে যাওয়া সব ক্ষেত-খামার, মৃদু বাতাসে ঢেউ খেলা টলটলে জল, আকাশের মেঘের ছায়া পরে যা কালচে দেখায়। আরেকটু দূরে নজর করে তাকালে দেখা যায় শাপলা বিল। গোটা বিল জুড়ে শাপলা ফুটে থাকে বলে বিলের নামই শাপলাবিল। যেদিন আকাশ একটু পরিষ্কার থাকে, বৃষ্টি থেমে যায়, দাদিকে বললেই বিকেল বেলায় মজিদ ভাইকে নিয়ে নৌকায় করে শাপলা বিলে যাই আমি আর দাদি। দাদি সঙ্গে নেয় রেডিও। নৌকার ধারে বসে আমি টেনে টেনে সব শাপলা তুলি, শালুক খুঁজি, পুড়িয়ে খাব বলে। দাদি ভয় দেখায়, পানির দিনে নাকি সাপেরা থাকার জায়গা পায় না তখন এই সব শাপলাদের গায়ে গায়ে বিষওয়ালা সাপেরা সব জড়িয়ে থাকে, একবার কামড়ে দিলেই শেষ! খানিক শান্ত হয়ে বসে থাকা আবার শাপলা টেনে টেনে নৌকা ভর্তি করা।

সমস্ত দিনে অসংখ্যবার পুকুরে স্নান, পাড়ায় এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়ানো আরও অনেক রকম কাজ-কর্ম করে সন্ধে হলেই চাচির বিছানায়। থালায় ভাত নিয়ে হ্যারিকেনের আলোয় পাখির ডিম, মুরগির ডিম, ময়নার ডিম সব খাওয়ায় চাচি আর গল্প শোনায়। কখন যেন ডিমগুলো সব শেষ হয়ে যায়! চাচি উঠে যায় থালা নিয়ে, আমি গিয়ে দাদির বিছানায় দাদির কোল ঘেঁষে শুয়ে পড়ি। দাদি খানিক গল্প বলে, বিবিদের কিস্‌সা, নবী-রাসুলদের গল্প, আজুজ-মাজুজের কিস্‌সা। এক একদিন একটা গল্প। দাদির হাতে সমানে ঘোরে বাড়িতে বোনা তালপাতার পাখা। আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের মধ্যেও দাদি কেমন করে যেন সারারাত পাখা ঘোরায়। একটুও গরম লাগে না আমার!

কাকা বাড়ি না থাকলে ঘন্টার পর ঘন্টা পুকুরে পড়ে থাকতাম। বাড়ি গেলেই চাচির কাপড়কাটা কাঁচি নিয়ে মাথার চুলের গোছা ধরে কচ কচ করে সব চুল কেটে ফেলতাম, পিঠ অব্দি লম্বা চুল ভিজে থাকে, জলদি শুকায় না, আর কাকা বাড়ি এসে সবার আগে চুলেই হাত দেয়, চুল বিকেল অব্দি ভেজা থাকা মানেই সারাদিন আমি পুকুরে ছিলাম! ছোট চুল তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায় বলে এভাবে চুল আমি প্রত্যেকবারেই কেটে ফেলি, যখনই বাড়ি যাই। এবড়ো-খেবড়ো চুল চাচি পরে সমান করে ছেঁটে দেয় ছেলেদের মতন করে। কাকার কাছে তবুও রক্ষে নেই, ছোট চুল দেখলেই বুঝে যায় কেন এই চুল কাটা হল। মারে না যদিও কিন্তু চোখ লাল করে এমনভাবে তাকায় যে শরীরের সব সব রক্ত পানি হয়ে যায় দুই মিনিটেই! চাচির পেছনে গিয়ে চাচির কোমর জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি যতক্ষণ কাকার গজগজানি শোনা যায়। প্রত্যেক বার একটাই কথা দিয়ে থামে, ‘বর্ষাইত্যা পানি, জ্বর-জারি হইলে ডাক্তর পামু কই? এই শয়তানেরে ভাইসাবে কিয়ের লাইগ্যা যে থুইয়া গেসে আল্লায় জানে! বারে বারে কইসি, লগে লইয়া যান, বাড়িত থাকলে কেউর কতা হোনে না!’

এবং জ্বর আসে। ধুম জ্বর। ঘরে ঘরে তখন থার্মোমিটার থাকে না, আমাদের বাড়িতে যদিও ছিল কিন্তু চাচির ছেলের আবার পারদ ভীষণ পছন্দ! থার্মোমিটার বাড়িতে এলেই ধান্দায় থাকে, কতক্ষণে ওটা হাতে পাওয়া যাবে। পারদকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে আবার জুড়ে দেওয়া, গোটা পারদটাকে খাতার পাতা ছিঁড়ে তাতে তুলে নিতে আমার যে ভাল লাগে না এমন নয় কিন্তু একটা আস্ত থার্মোমিটার আমি ভেঙ্গে ফেলি না পারদের জন্যে। ওগুলো ভাইয়া আর চাচির ছেলে জুন্নুনের কাজ। পারদ দিয়ে খেলা চলে অতএব জ্বর কত দেখার উপায় নেই।

এদিকে পানি বাড়ছে দিনে চার আঙ্গুল তো রাতে আট আঙ্গুল। এগুলো কাকার হিসেব। তাঁর চিন্তা পুকুর আর পুকুরের মাছেদের নিয়ে।  পুকুরের পার ডোবে ডোবে অবস্থা। বড় রাস্তায় যাওয়ার যে একমাত্র সড়ক সে নাকি অনেক জায়গাতেই ডুবে গেছে। কাকা সারাদিন ব্যস্ত জাল দিয়ে গোটা পুকুর ঘেরায়, প্রচুর মাছ আছে পুকুরে, একটা পার ডোবা মানেই সমস্ত মাছ বেরিয়ে প্রথমে খালে আর তারপর যে যেদিকে পারে ছুট লাগাবে। সারা রাত কাকা একহাতে পাঁচ ব্যটারির বড় টর্চ অন্য হাতে লাঠি নিয়ে  পুকুর পারে ঘুরে ঘুরে খালের জল মাপে। পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে আমার জ্বর। দাদি সারাদিন বসে থাকে মাথার কাছে, কপালে-গলায় হাত দিয়ে জ্বএ দেখে, বুঝতে না পেরে নিজের গাল ঠেকায় আমার গালে কপালে, বলে, ‘খৈ ফুটতাসে গো জ্বরে!’ মাথায় পট্টি দেয় আর গজগজ করে, ‘মিন্টুইন্যা যে বকে তোরে এমনি এমনি বকে? অহন ভোগান্তিডা কার অইত্যাসে?’

বিছানার উপরে অয়েলক্লথ বিছিয়ে মাথা বিছানার কিনারায় রেখে মেঝেতে রাখে বড় গামলা, তারপর কলসির পর কলসি পানি ঢালি চাচি দিনে দু-তিনবার করে। জ্বর খানিকটা নামে, আবার ধুম জ্বর। বাজারে বসেন সেই ডাক্তারবাবু। গ্রামের একমাত্র ডাক্তার। এলএমএফ ডাক্তার। কাকা নৌকায় করে গিয়ে ওষুধ নিয়ে আসে। কাগজ কেটে দাগ দিয়ে আঠা দিয়ে আটকানো কাঁচের শিশিতে রাখা লাল রঙের মিক্সচার, কাগজে মোড়ানো সাদা সাদা বড়ি। যেমনি তেতো সেই মিক্সচার, ঠিক ততখানিই তেতো সেই সাদা বড়ি, খেলেই ওয়াক আসে। গাছের গন্ধরাজ লেবু দিয়ে শরবত বানিয়ে খাওয়ায় চাচি, আমি খেয়েই হড়হড়িয়ে বমি করি। আবার ঝিম মেরে পড়ে থাকি। চোখের সামনে নানান রঙের আলোর বলয়। লাল, নীল, সোনালী, হলুদ। কখনও তারা ঘুরে বেড়ায় ঘরময়, কখনও স্থির দাঁড়িয়ে থাকে চোখের সমুখে। একই আকারের থাকে না আলোগুলো। ভাংচুর চলতেই থাকে। কখনো লম্বা রেখা হয়ে ঘুরে বেড়ায় আশে-পাশে, আবার কখনও সাতরঙা রামধনু হয়ে যায়।

আমি আলো দেখে দেখে ক্লান্ত। ভয় লাগে। আম্মার কাছে যেতে চাই। কাকা এসে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। দাদি দোয়া পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে সেই পানি খাওয়ায়, আমি আবার বমি করি। ঘোরের মধ্যে মনে হয় যেন চোয়াল দুটো ঢুকে যাচ্ছে একটার ভেতর আরেকটা। যেন দাঁত কপাটি লাগছে। কথা বলার চেষ্টা করি, পারি না। ভেতরে ভেতরে কাঁপুনি শুরু হয় গোটা শরীর জুড়ে। প্রচণ্ড ভয় লাগে, জানি, একবার কথা বলে ফেলতে পারলেই চলে যাবে এই কাঁপুনি, চোয়াল খুলে যাবে কিন্তু পারি না, স্বর ফোটে না। চোখ দিয়ে জল গড়ায় আপনা থেকেই। একসময় থামে কাঁপুনি, খুলে যায় চোয়াল, শক্ত করে চাচিকে ধরে থাকি, ‘চাচিআম্মা, আমার ডর করে।’ বিছানা থেকে তুলে কোলে নিয়ে বসে চাচি। কাকাকে বলে, ‘বিকালে গিয়া ডাক্তরবাবুরে লইয়া আইও, আমার ভালা ঠেকত্যাসে না, ভাইসাবেরে খবর দ্যাও।’

ডাক্তারবাবু আসেন। পরনে হাফহাতা সাদা ফতুয়া আর সাদা ধুতি, বিশাল লম্বা ঢ্যাঙ্গা চেহারা, ধনুকের মতন বাঁকানো নাক। দাদার কাছাকাছি বয়েস কিন্তু দাদার চেয়ে অনেক বেশি শক্ত। ছোটোখাটো কিছু হলে কাকা গিয়ে বলে ওষুধ নিয়ে আসে, অসুখ সেরে যায়, বাড়াবাড়ি হলে কাকা গিয়ে বাড়ি নিয়ে আসে তাঁকে। আমাদের বাড়ি থেকে দেড়মাইল দূরের বাজারে তাঁর ওষুধের ডিসপেন্সারি, ওখানে বসেই রোগীও দেখেন। এমনি দিনে দেড় মেইল দূরের বাজার থেকে লম্বা লম্বা পা ফেলে হনহনিয়ে হেঁটে চলে আসেন, কাকা হেঁটে পারে না তাঁর সঙ্গে, কিন্তু এই বন্যায় বড় রাস্তা থেকে  আমাদের বাড়ি অব্দি একমাইলের  কাঁচা সড়ক পানির তলায়, কাকা নৌকা করে যায়, বেঁধে রাখে রাস্তার ধারে খালে অন্য আরও অনেক নৌকার সঙ্গে, খাল যেখান থেকে এগিয়ে গেছে তিতাসের দিকে।

পরপর তিনদিন আসেন সেই ডাক্তার। সেই একই রকম ফতুয়া আর ধুতি পরনে, পায়ে রাবারের চটি। রোজ এসে একই কথা জিজ্ঞেস করেন, ‘খুকুমণির জ্বর ছাড়ে না কিয়ের লাইগ্যা?’ প্রথম দিন এসেই বুকে স্টেথো রেখে দেখে নিয়ে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দাদা, দাদি, কাকা, চাচি সবার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘জলে ডুবাইয়া ডুবাইয়া খুকুমণি কফ জমাইসইন বুকত, সারতে সমো লাগবো গো মেন্টু মিঞা।’ শুনেই জোরে চোখ টিপে বন্ধ করে ফেলি আমি, কাকার হিমঠাণ্ডা চোখে যেন আমার চোখ কিছুতেই না পড়ে! কাগজে মোড়ানো সাদা বড়ি, একটা মিক্সচারের সঙ্গে যোগ হয় আরো তেতো এক মিক্সচার, ছদিনের মাথায় জ্বর ছাড়ে।

রেডিওতে দাদি-কাকা খবর শোনে, বন্যায় নাকি রেললাইনও ডুবে গেছে। আমি ভাবি, বাঁচা গেছে, এই সপ্তায় অন্তত কাকা আমাকে নিয়ে যেতে পারবেই না সিলেট! গোসলের সময় কাকা দাঁড়িয়ে থাকে পুকুর পারে, নো সাঁতার কাটা, নো ডুবা-ডুবি, তিনখান ডুব দাও তারপর সিধে উঠে আসো গামছা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা কাকার কাছে! কাকা যা বলে, চুপচাপ করি সেগুলো, মনে ভাবি, কদিন আর চোখে চোখে রাখবে, দু-এক দিন যাক তারপর দেখা যাবে...

Saturday, September 22, 2012

দরজায় আড়ি পেতে বিষণ্ণতা

ভেবেছে অন্য এক মন, লিখেছে অন্য কলম অথচ কি নির্ভুলভাবে আমার কথাগুলো লেখা হয়েছে! দুটো অক্ষরের তফাৎ শুধু ছিল, ঘুচিয়ে দিলাম...

কখনো ভাবিনি এত তাড়াতড়ি
এত কিছু হয়ে যেতে পারে
ভাবিনি, এই তুমি আমি যখন,
ধরা যাক্‌, সেই ছোট্ট ঘরটায়
নানান রঙের গল্পে মশগুল
দরজায় আড়ি পেতে বিষণ্ণতা
          আমার বিষণ্ণতা
অট্টহাসিতে দমকে দমকে
কেঁপে উঠছিল।
জানলার শার্সিও কেঁপে যাচ্ছিল সমানে।
অথচ, কি অদ্ভূত, আমি
বুঝতেই পারি নি!
আসলে
কখনো ভাবিই নি,
একা থাকার অভ্যাস যখন আবার
একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছি,
আজীবন একাকীত্বের চাবি-কাঠি
এক পা –এক পা করে
অন্য কোনও হাতে লাল মেখে
আমার নাকের নথে,
অথবা রুপোর এই কোমরবন্ধে,
নিশ্চিত জায়গা করে নিচ্ছে।

ভাবি নি, এই সব বাজে কথাগুলো
একটু গুছিয়ে-গাছিয়ে নিলেই
যন্ত্রণাকে পাশ কেটে
কবিতার কাঁধে কাঁধ মেলাতে পারে।

ভ্রমর কইও গিয়া

জলে গিয়াছিলাম সই

অকালবৈশাখী



                       ১০

কলের জলের মতো আসে প্রেম কলের জলের মতো যায়
বিকেল চারটেয় ঠিক হুড়মুড় ঝঞ্ঝাটধ্বনি পরে এসে কে আগে দাঁড়ায়।
গোটাদশ বালতি তিনটে কেরোসিন টিন দুটো মাজাঘষা কলসি মেজোসেজো
সারা পাড়া জড়ো হয় টুংটাং ঝমঝম শব্দে, জল ছাড়া সক্কলে অকেজো
তোমার বয়েস কম, আদুরে গলায় বললে – ‘আমি একটু আগে নিয়ে নিই?’
যাকে অনুরোধ করলে, বুঝতে পারলে না? ওই গায়ে-পড়া বালতি তো আমিই!







                        ১১

অন্ধ করে দিয়ে গেছ, আমি আর ছন্দ কী শেখাব
বরং তোমাকে নিংড়ে হাতের তালুর মধ্যে চটকে পিষে খাব
মেশাব ভাতের সঙ্গে, কোঁৎ করে গিলব এক দলা
তোমার দু’ হাত–দু’ পা আলতো করে ছুঁয়ে দেখবে, হ্যাঁ, আমার গলা
ভাসতে–ভাসতে পেটে নামবে ধারণা, নরম টুকরো, ঝলসানো হাসির একফালি
দু’খানা কানের দুল পোকা হয়ে কুঁড়ে খাবে বিপাকপ্রণালী
কেবল কবিতাখাতা পড়ে থাকবে বাইরে আমি খেয়েদেয়ে উঠে দেখব তাতে
আমারই শেখার কথা, ছন্দ নিজে এসেছিল আমাকে শেখাতে
সম্মোহন সশরীরে সামনে এসে বসে যদি, যাদুকর এক্কেরে বেকাবু
অন্ধ করে দিয়ে গেছ, আমি আর ছন্দ কী শেখাব।







                           ২৭

আজ মেঘ করে এলে শিকারকাহিনি পড়ব খুব
ওল্টাতে ওল্টাতে পাতা ঝিঁঝিডাকা জঙ্গলে দে ডুব –
নামেই অভয়ারণ। কত লোক নিয়ে গেছে বাঘে ...
পাঠকের ভয় করে। লেখকের হাতে তৈরী চাঁদ একা জাগে।
জোছনায় গামবুট কাঁপে। গাইড সারেঞ মিয়াঁ। একটু দূরে গিয়ে
সে বলল ‘দাঁড়ান। শ্‌-শ্‌-শ্‌, আওয়াজ করবেন না। বাঘ হেঁটে গেছে এই পথ দিয়ে!’
‘কীভাবে বুঝলেন মিয়াঁ?’ ... ‘দ্যাখেন, গাছের গায়ে দুটো-একটা লোম লেগে আছে
আর কিছু ঘাসের ডগা ভেঙে বিখরে পড়ে আছে আনাচে কানাচে,
বাঘ এখানে ছিল কি না, বোঝা যায় এইসমস্ত ছোটখাটো দাগে’ ...
যেমন আমাকে দেখলে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে তুমি হেঁটে গেছ একটু আগে!







                         ২৩

আমার ভেতরে তুমি ছটফট করাচ্ছ একটা পাখি
তাকে যে কীভাবে শান্ত রাখি!
বলি – ‘ভাই, ছোলা খাও। কিন্তু চেঁচিও না।
লোক জানাজানি হলে পালাবার পথ খুঁজে পাব না।’
কে কার কথা শোনে, সে দিনরাত শোনায় নাম ডেকে
কী যে সব হাওয়াপত্র পাঠায় পাশের পাড়া থেকে –
আমার ঘরময় ওড়ে লেখার কাগজ আমি তাদের পিছনে ছুটতে থাকি
এমন করে না আর। খাঁচা খুলে উড়ে যেও, দূরে যেও অকালবৈশাখী ...






[শ্রীজাত-র “অকালবৈশাখী” থেকে ]

Thursday, September 20, 2012

যেখানে নতুন ভোরের অপেক্ষায় এক জীবন বিষাদ সিন্ধু

তখনো আলো ফোটে নি। তখনো সে বিছানায় এ’পাশ ও’পাশ করছে। জোর করে বন্ধ করে রেখে রেখে চোখে একটা কেমন ব্যথা। বন্ধ চোখে সব অন্ধকার। চোখ খুললে –সেও অন্ধকার। বন্ধ করে রাখা জানলা, জানলার পর্দা ভেদ করে রাত্রি নগরীর যতটুকু আলো জোর করে ঢুকে পড়ছে ঘরে, যেন ওই অন্ধকারকেই আরো বেশী করে ভরাট করে তুলছে। সে বিছানায় কেবল এ’পাশ ও’পাশ। কখনো বা পাশের বালিশটা নিজের বুকে চেপে ধরছে। না, ভুল হল কি তোমার? এখানে এখন কিন্তু কোনো কাম ভাব নয়– রাত্রি, বিছানা, সে, পাশবালিশ –তোমায় দোষ দেব না প্রিয় পাঠিকা, অমনটা ভেবে নেওয়াই স্বাভাবিক। অমনটাই রীতি। কিন্তু এ তো সেই নিয়মের মুহূর্ত নয়। এক নিতান্ত অনিয়ম –অনিয়মের দিন আর অনিয়মের রাতের কথা। 
এ নিতান্তই কল্পকথা। তো সেই কল্পকথার এই মানুষটি, যে –তখনো ভোরের প্রথম আলো মাথার কাছে পূর্বের জানালা দিয়ে বিছানায় এসে পড়ে নি –সমস্ত রাত একটা ঘোরের মধ্যে কাটিয়ে প্রার্থনা করছে ভোরের প্রথম আলোর, সে, আরো একবার, পাশের বালিশটা নিজের বুকে চেপে ধরল। 
বুকে চেপে ধরা সেই বালিশ তার প্রিয়া হয়ে ওঠে নি, তার গোপন প্রেমিকার রূপক হয়ে ওঠে নি। জোরে নিজের বুকে চেপে ধরা সে বালিশ নিতান্তই বালিশ। আসলে সে চাইল কিছু একটা নিজের বুকে চেপে ধরতে, একটা কোনও চাপ দিতে নিজের বুকে। বাইরে থেকে কোনও একটা চাপ, ভিতরে বয়ে বেড়ানো নিজেরই সৃষ্টি করা সেই অসম্ভব চাপের সাথে পাল্লা দেবে, এমন কোনও চাপ। হয়ত কিছু আরাম হবে তাতে। সেই অবস্থায় সে নিজের ছোটবেলার কথা মনে করবে। নিজেকে অন্য কথা ভাবাবে। 
যতক্ষণ না আলো ফোটে, যতক্ষণ না দরজা খুলে রাস্তায় চলে যেতে পারে, এ’ভাবে অন্য ভাবে, নিজের ছোটবেলার কথা, সেই ছোট্ট শহরের কথা, বাবার সাথে তিনখানা মাঠ পেরিয়ে বকুল গাছের পাশে দু’টো কবরের কাছে তখনো মৃত্যুরহস্য-জন্মরহস্যের ও’পারে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে বুঝতে চেষ্টা করা দু’টো চিরতরে ঘুমন্ত মানুষ কী ভাবে অনন্তকালের জন্য ওইখানে ওইভাবে শুয়ে আছে আজীবন, মুহূর্তেই আবার সে’সব ভুলে ছোট্ট ফুটবল নিয়ে খানিক লাথালাথি, ফেরার সময় দু’হাত, কোঁচড় ভরে বকুল ফুল নিয়ে বাবার হাত ধরে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে বাড়ি ফিরে সেই ফুল ঘরে রেখে দেওয়া, কখনও স্নান সেরে বেরুনো ভেজা চুল মায়ের ঠাকুরের আসন দেওয়ার নকল করে ঠাকুরের সামনে ফুল দিয়ে নিজের মত করে দেড় মিনিটের গম্ভীর পুজো করা, কখনো বা লুকিয়ে সুতো-কাঠি জোগাড় করে মালা গাঁথা, নিজেই সেই মালা ছিঁড়ে একসা করে ঘরময় বকুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে মায়ের বকুনির ভয়ে জ্যেঠির ঘরে গিয়ে বসে থাকা, আর আরো কত কী। 
সে চেষ্টা করে সে সমস্ত ভাবতে। নিজেকে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে। পাড়ি দিতে জন্মের কাছাকাছি –যাকে নির্মল বলে ভাবতে ভালবাসে –পৌঁছে যেতে; নিজেকে স্থিত করতে, শান্ত করতে। তবু সেই অস্থিরতা, সেই সময়টা মনে পড়ে –রাত্রি এগারোটা পঁয়ত্রিশ –আর এক মুহূর্তে যেন পৃথিবীর সমস্ত জননীর প্রসব বেদনা এসে ভীড় করে তার ভিতরে, তার শরীরে, তার বুকের কাছে। সেই বুক, যেখানে ফেলে আসা সন্ধ্যাবেলায় তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি নিশ্চিন্ত আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল। সেই বুক, যেখানে নতুন ভোরের অপেক্ষায় এক জীবন বিষাদ সিন্ধু।

শুভ্রদীপ দাশগুপ্ত
১৩.০৯.১২

Thursday, September 06, 2012

মেঘের পরে মেঘ জমেছে...

হয়ত জানতাম। চেতনে নয়, অবচেতনে। জানতাম। তাই এই অসময়েও একবার ডাকবাক্স খুললাম, এসেছে কি সেই দস্যির কোনো  চিঠি?  দেখলাম, এসেছে। চেতনে, অবচেতনে। আজ গত তিন দিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি ধারার মত...

 
বিচালি ঘাট, রাম কৃষ্ণপুর ঘাট এখন ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে আছে। ষ্টিমার ঘাটে একটা লঞ্চ দাঁড়িয়ে। ছাড়ব ছাড়ব করেও ছাড়ছে না। ভরা বর্ষার মাদকতায় নেচে ওঠা গঙ্গার ছন্দে ছন্দ মিলিয়েছে সে। এখন দ্বিতীয় সেতু থেকে অবনী মলের বাড়িটা দেখা যাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু হারিয়ে আছে হাওড়া ব্রিজ। ধোঁয়াশায় ঢাকা ওই বিচলি ঘাট, রামকৃষ্ণপুর ঘাট..

 
আজ গঙ্গায় মেলা বসেছে। নানা রঙের, নানা আকারের ছোট, মাঝারি সব লঞ্চ নোঙর ফেলে ঠায় দাঁড়িয়ে এখানে ওখানে। যদ্দূর দেখা যায়, গোটা গঙ্গাময় শুধু লঞ্চ। কে জানে, হয়ত বা ওগুলো দূরপাল্লার লঞ্চ, রোজ নদী পারাপার করা ফেরীবোট নয়। এই  অঝোর বর্ষণের ফলে গঙ্গায় জোয়ারের টান বেশি, তাই হয়ত ভাটার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে... নাকি ওই সব যান্ত্রিক নৌকোগুলোও সারা রাত্র নৌকা বেয়ে রাত পোহালে দেখতে পায় যেখানের নাও সেখানেই দাঁড়িয়ে রয়েছে?  


এক ছুট্টে নদী পেরিয়ে যাওয়ার বাসনায় দৌড়ুতে থাকা  বাসে জানলার ধারের সিটে বসে চোখ পেতে চেয়ে থাকি নদীর দিকে, জলভরা মেঘেরা সব জলের টানে নেমে এসেছে নদীর বুকে, এমনভাবে  বিছিয়ে আছে যেন কোন এক  মেঘবরনী কন্যার আলু থালু মেঘলা বসন...ওই ছোট, বড়, মাঝারি জলযানগুলোর দিকে, ভর ভরন্ত নদীর ঘোলা জলের দিকে...বিষম নদীর পানি, ঢেউয়ে করে কানাকানি, মাঝে নদী বহে সাঁই সাঁই...


রাতের দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটে না কিছুতেই, রেশ থেকে যায় সারা দিনমান। কাজ-কর্ম পণ্ড হয়, বেলা বয়ে যায়, দিন ঢলে আসে পশ্চিম আকাশে, অকারণ খিটিমিটি, না পাওয়া সব কড়ির হিসেবে মন ভার হয় প্রকৃতিরও, পূরণ না হওয়া সব চাওয়াগুলো  ভাসিয়ে দিই আকাশে, ঝরুক, ঝরুক ওরা বৃষ্টি হয়ে, ডুবে যাক চরাচর, মন খারাপের ভূমিকম্পে উথালি পাথালি ঢেউ উঠুক নদীতে...ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা যান্ত্রিক নৌকোগুলো সব নোঙর ছিঁড়ে ভেসে যাক দিগন্তের দিকে...

 
জানলার ধারে বসে তালের পাতায় টুপটাপ বৃষ্টির রুনু ঝুনু শব্দ ভেদ করে বহুদূর মনের ওপার থেকে গান ভেসে আসে, তুমি হয়ত  বারান্দায় দাঁড়িয়ে গাইছ বা আমি ভাবছি গাইছ বলে- মেঘের পরে মেঘ জমেছে...

আজ যেমন করে গাইছে আকাশ তেমনি করে গাও গো...

Monday, September 03, 2012

জিতেছি যতটা হেরেছিও ততটাই...

পৃথিবীটা যেমন গোল, সবই কিছুই বোধ হয় এমনই গোল, যেখান থেকেই শুরু করো না কেন, ঘুরে ফিরে পৌঁছুবে আবার সেই একই জায়গায়। আমিও আবার সেই একই জায়গায়, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার করে চলতে শুরু করেছিলাম। ঠিক কবে থমকে দাঁড়ালাম, কবে বৃত্তের সেই জায়গায় পৌঁছুলাম- যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেই দিন-তারিখ এবার ঠিকঠিক মনে আছে যদিও বেশির ভাগ জিনিসই ভুলে যাই, কিন্তু কারণ যাই হোক, মনে আছে। সেসব উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজন। ঘটনা এই, যে আমি আবার সেই একই জায়গায়...


রাত জেগে বসে বসে বাইরের অন্ধকার, না, ঠিক অন্ধকার নয়, কিছু আলো তো আছেই, কোনো এক বাতিওয়ালা একটা বোতাম টিপে সন্ধ্যে হলেই নিয়ম করে রাস্তার, ওই দ্বিতীয় হুগলী সেতু আর তার ছড়ানো বাহুগুলোতে আলো জ্বালিয়ে দেয়, সেই আলোয়  সব পরিস্কার নয়, আঁধার কোথাও কোথাও আরো বেশি ঘন, আমি বসে বসে সেই আধো আলো আর ঘন আঁধার দেখি, পুরনো সেই দিনের মত...

ওয়ান ট্র্যাক মাইন্ড বলে একটা কথা আছে না? আমি একসঙ্গে একাধিক কাজ করতে পারি না। যখন যা করি সেটা সম্পূর্ণ মনোযোগ আর একাগ্রতা দিয়ে করি। রবিশংকরজী যেমন বলেন, একশ শতাংশ দাও, আমি ঠিক তেমনি  একশ শতাংশ দিই, বরাবরই। ওই পথটুকুও ভীষণ মন দিয়ে হেঁটেছি, অন্য কোনো কাজ নয়, শুধুমাত্র চলা, চলতে থাকা আর চলতে থাকা। হঠাৎ যখন থামলাম, পথ চলার ক্লান্তি গ্রাস করল, একা, নিঃসীম শূন্যতা আর এক আবছা আলো যাতে অন্ধকার আরও বেশি গাঢ়। ফলতঃ অবসাদ...


বৃত্তের যেখান থেকে শুরু চলা করেছিলাম, আমি আবার সেখানে... মনে আছে সেই সিনেমাটা? দায়রাহ- দ্য সার্কেল? ঠিক সেই রকম...

মাথার ভিতর একটা চিঠি লিখে চলেছি।  ঠিকানাবিহীন, বা বলে চলেছি এক অনন্ত কথা, যাকে লিখছি,বলছি তার অস্তিত্বই হয়ত নেই, হয়ত আছে, জানি না ঠিক, বিশ্বাস করতে চাই- অস্তিত্ব আছে, কিন্তু বিশ্বাস!  সে শুধুই আমার বিশ্বাস, তার বাইরে কিছু নয়, কিস্‌সু নয়!

সুমন বলেন -
উত্তর আসবে না তুমি আসবেই আমি জানি!

কিন্তু গান, কবিতা বোধ হয় জীবন নয়, আবার জীবনের বাইরেরও কিছু নয়, জীবন থেকেই নেয়া, ক্ষণকালের অনুভব মাত্র। কিছুটা দেখা কিছুটা কল্পনার রঙ মিশে লেখা হয় সেসব,  যেই অনুভূতিটুকু প্রকাশ করা হয় কথায়, সুরে। আমাদের মন যখন যেমন থাকে, ভাল মন, খারাপ মন, উদাস মন, অভিমানি মন, প্রেমিক মন, মনভাঙা মন। আমরা শুনি সেই রকম সব গান, পড়ি কবিতা, সেই গান-কবিতা তখন নিজের হয়ে যায়, নিজের কথা হয়ে যায়, সেটাই তখনকার সত্যি হয়ে যায়।এই যেমন এই গানটা- একটা সময় জাতীয় সঙ্গীতের মত হয়ে উঠেছিল...


সুমন আরও বলেন- 
জিতেছি যতটা হেরেছিও ততটাই...

কি যে হার আর কি যে জিত কে জানে...
দু'দিন ধরে বড় মৌসুমী ভৌমিক মনে পড়ছে - 
ডাক আসে
তোমার না লেখা চিঠি আসেনি
আসে না
আসবে না জানি তবু আমি বসে থাকি...


এরকম আরও অনেক অনেক গান। কোন গানের অন্তরা তো কোন গানের মুখড়া...


মনে পড়ছে মিতালী মুখার্জী। সে আমার ছেলেবেলার কথা। মিতালী ভারতবর্ষের কোন একটা জায়গা থেকে গানের ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে গিয়ে গাইলেন সেই গান- 
এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই
মানুষ নামের মানুষ আছে দুনিয়া বোঝাই
এই মানুষের ভীড়ে আমার সেই সেই মানুষ নাই...

কিছু ভুলতে হলে নাকি পিছন ফিরে তাকাতে নেই, যা কিছু স্মৃতি, তাকে খাঁচায় পুরে তালাচাবি দিয়ে কোন এক অন্ধ কুঠুরিতে ফেলে দিতে হয় বা রেখে আসতে হয় সাত নদী আর তিন সাগর দূরের সেই পদ্মপুকুরের তলাকার লোহার সিন্দুকে, যেখানে বাস করে রূপকথার রাক্ষসের প্রাণভোমরা।  সেই পথে হাঁটতে নেই, যে পথে ছিল নিত্য চলাচল...  কিন্তু আমার যে স্মৃতিতেই বসত ... আমি রক্তাক্ত হই, গোলাপী রঙের রক্ত ঝরে, ঝরতেই থাকে... থামে না...


ঋতু বদলের সাথে সাথে মেঘেরাও চলে গেছে দূরে কোথাও,  হয়তবা কোন পাহাড়ে বা দূরের কোনো গাঁয়, যেখানে ঘোমটা পরা এক কাজল বধু সন্ধে দেয় তুলসীতলায়... এখানে এখন খর রোদ্দুর, এতটুকুও ছায়া নেই কোথাও, কাক-পক্ষীও ওড়ে না এই খরায়..

রয়ে যায় শুধু গানেরা-
পঙ্খী রইয়া যাও রে...


১৮-০৮-১২

Sunday, September 02, 2012

একখান ঘর বানাইলাম আমি ইট কাঠ লোহা পাথর দিয়া...

কি দিয়েছি আর কি পেয়েছি সেই অঙ্কে বেলা বয়ে যায়। কে যেন বলেছিল, যা তোমার, তার চাইতে একরত্তি কমও পাবে না, বেশিও না। এরকম  ভাবতে পারা আর ভেবে/ মেনে নিয়ে সেই অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়া/ যেতে পারা বেশ কঠিন। শক্ত।  

যা কিছু ভাল লাগার
ভালবাসার, সবই যে চাই! 
এক জানালা আকাশ নয়, 
অই গোটা মহাকাশটা চাই। 
সাতটা মহাসাগর
সাতখানি আশমান
আর গোটাগুটি এই পৃথিবী।

সবটুকু চাই।
সবটুকু।
এতুকুও কম নয়।
এক রত্তিও কম নয়।

চিকচিকে তারাদের মেলা
জোনাক জ্বলা রাত 
ভালবাসার শক্ত মুঠি
আর এক জোড়া হাত।।

কাঁচ ভেবে হীরে ফেলে যাওয়া ধুলায়, যখন জ্ঞান আসে,  ফেলে যা এলাম, সে শুধুমাত্র খণ্ড কাঁচ নয়, সে অমূল্য! ততক্ষণে বেজে উঠেছে ভোঁ। ছেড়ে গেছে শেষ ট্রেন...  ট্রেন চলে যায় ...

যা চলমান সে জীবন, থেমে যাওয়ার নাম মৃত্যু। তাই চলতে থাকা। চলতেই থাকা। একের পর এক স্টেশন। বাক্স-প্যাটরা আর মানুষের ওঠা-নামা। ব্যস্ততা। কোলাহলে চাপা পড়ে ফুঁপিয়ে ওঠা। ওড়নিতে চাপা দুই চোখ যেন জল থই থই কাজলা দীঘি... 

পথ হারানো পথিক পথ খুঁজে পায়, এগিয়ে যায় গন্তব্যের দিকে। পেছনে যা পড়ে রয়, তা পড়েই রয়, ফিরে তাকানোর অবকাশ সব সময় থাকে না বা অবকাশ থাকলেও ইচ্ছে বা সাহস থাকে না। কে জানে পিছন ফিরে তাকালে কি চোখে পড়বে! তাছাড়া গন্তব্যে পৌঁছুনোরও তো তাড়া থাকে, যদি মিস হয়ে যায় ট্রেন..

Saturday, September 01, 2012

তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম...

আমরা শুধু শুধুই সাত-আট ঘন্টা করে ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করি। দু-তিন ঘন্টা করে ঘুমিয়েও দিব্যি বেঁচে থাকা যায়! এবং কত কাজ করা যায়! লেখা, সিনেমা দেখা বা গান শোনা বা কিছু একটা পড়া। আমি যদিও কিছুই করি না। বলা ভাল করে উঠতে পারি না। আমার জেগে থেকে কাজ বলতে শুধুমাত্রই একই জিনিস বারবার করে ভেবে যাওয়া এবং ঝিমুনো...

অন্যদিন মাঝরাত বা ভোরের দিকে ঘুম আসে ঘন্টা দু-তিনের জন্যে। ওষুধের ঘোর। কোন স্বপ্ন আসে না। ঘুম ভাঙার পরেও মনেও হয় যেন জেগেই ছিলাম, ঘুমাইনি এক ফোঁটাও! আজ মাঝরাতে উঠব বলে তারাতাড়ি ঘুমানোর জন্যে ডোজ বাড়ে ওষুধের, ঘুম নাকি ঘোর আসে মাঝরাতেরও ঘন্টাখানেক পরে। মোবাইলে ঘন্টি বাজে -উঠে পড়ো, বাচ্চাটা যাবে! 


বহুকাল পরে আবার ভোরের রাস্তা। অন্ধকার। আলো ফোটেনি তখনও। রাস্তার ধারে কোথাও কোন একটা মসজিদে আজান হয়। ঘড়ি বলে সোয়া চারটে বাজে।  রাত বড় হচ্ছে, সকাল হচ্ছে দেরীতে। আলো না ফোটা ভোরের রাস্তা ফাঁকা, শুনশান। মাঝে সাঝে একটা দুটো গাড়ি হুঁশ হাঁশ ছুটে যায়। এয়ারপোর্ট অবধি টানা আলোজ্বলা রাস্তা। রাস্তার ধার ধরে সব তেপায়া শাদা আলো। রাস্তার মাঝে ডিভাইডারে সেই পুরনো পোস্টে পুরনো হলদে আলো। দুজনে  চুপচাপ বসে থাকি গাড়িতে। হাতে হাত।

ঈদ আর জন্মদিন একসঙ্গে পড়েছে বলে দেড় মাস আগে ঘুরে যাওয়া সত্বেও পাঁচ দিনের ঝোড়ো সফরে মেয়ে বাড়ি এসেছিল, ফিরে যাচ্ছে আবার। অফিসের পোষাকে তৈরি হয়েই বেরিয়েছে, এয়ারপোর্ট থেকে সোজা অফিসে চলে যাবে। বাড়ি থেকে ফিরে যাওয়ার সময় যেমনটা হয়ে থাকে সকলেরই, মন ভার, কথা কম আর চুপচাপ থাকা বেশি। যেহেতু সারাদিনই বকবক করে, তাই চুপ করে গেলে সেটা বড় বাজে...

এক সময় আলো ফোটে। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি পৌঁছুতে বেড়ে যায় ছুটন্ত গাড়িদের সংখ্যা। এয়ারপোর্টের সামনে গাড়িদের লাইন। ঘুমচোখ মানুষদের ট্রলি ঠেলে নিয়ে যাওয়া, এন্ট্রির লাইনে একটু আগে পৌঁছুনোর জন্যে রিতিমত দৌড়-ঝাঁপ।  মিষ্টির ছোট্ট ট্রলিব্যাগখানি ঠেলে কোনমতে লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আমি আবার ফিরতি পথে। একা...


ফেরার পথ ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশার চাদরে ঢাকা। নাকি আকাশের মেঘেরা মাটির কাছাকাছি নেমে এসে কুয়াশার মত চাদর বিছিয়েছে কে জানে... বর্ষা। এই বর্ষায় ভিজছে মাটি, ফসলের মাঠ, গ্রামের ছোট্ট খড়ের কুড়েখানি আর মন। নদীতে বাড়ছে জল। অত জল, যাতে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে পার্বতীর সমস্ত কলঙ্ক।  হেডফোন দিয়ে মস্তিস্কের কোষ বেয়ে শিরা-উপশিরায় বয়ে যায় -তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম...



 -----
 ২১-০৮-১২ 

Friday, August 31, 2012

মন ভাঙ্গা আর মস্‌জিদ ভাঙ্গা সমান কথা


কদিন ধরে বাবরী মস্‌জিদের কথা মনে পড়ছে। ছ’তারিখে ভেঙ্গেছিল না বাবরী মসজিদ? আর নয় তারিখে কলকাতায় দাঙ্গা। বোধ হয় এই তারিখগুলো এবং ঘটনাক্রমে সদ্য এক ছয় এবং নয় তারিখে ঘটে যাওয়া একান্ত ব্যক্তিগত কিছু ঘটনাবলীর সঙ্গে খানিকটা যোগসূত্র এবং অবশ্যই এই দুটো তারিখ, যার জন্যে এই বাবরী মসজিদ, এই ছ’তারিখ আর ন’তারিখেরা বারে বারে ফিরে ফিরে আসছে। মনে পড়ে যাচ্ছে সেই সময়কার থমথমে সেই তিন দিন। ছয়ের পরে ন’তারিখ রাত অব্দি থমথমে সেই সময় এবং তারপর ন'তারিখের সেই কাল রাত।

রাত বোধ হয় এগারটা হবে তখন। বাচ্চা দুটো দস্যিপানা সেরে সবে ঘুমিয়েছে। খাওয়া দাওয়া সেরে রান্নাঘরে সেদিনকার মত শেষবারের গোছগাছ করছি। পাশের টায়ারগলি, পুরনো ড্রামের গুদামের ওপাশের মিছরিগলি থেকে হঠাৎ মানুষের ছোটাছুটি, একসঙ্গে অনেক মানুষের চীৎকার চেঁচামেচি আর দৌড়াদৌড়ির আওয়াজ কানে আসে। চারতলার ছোট্ট ফ্ল্যাটের চিলতে বারান্দায় গিয়ে দাড়াই। আওয়াজগুলো ক্রমশ বদলে যেতে থাকে। আশে পাশের সমস্ত বাড়িগুলো অন্ধকার। ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে কারা যেন ভাঙছে ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো। ভয়াল অন্ধকারে হঠাৎ জলন্ত আগুনের ছোটাছুটি দেখা যায়। ঠাহর করতেই বোঝা যায় ওগুলো মশাল। একযোগে জ্বলে উঠেছে শয়ে শয়ে মশাল!। দুই দিকে দুই সম্প্রদায়। দুই দিকে দুই ধবনি।  রণহুঙ্কার। একদিকে হর হর মহাদেব অন্যদিকে নারায়ে তকবীর আল্লাহু আকবার!

দুই হাঁটুর ঠকঠকানিতে বুঝতে পারি বেঁচে আছি আর বেঁচেই থাকতে চাই। শরীর জুড়ে হিম রক্তস্রোত। মুখ দিয়ে চেষ্টা করেও বের করতে পারি না কোন শব্দ। এই রণহুঙ্কারেই শেষ নয়। খাপমুক্ত তরবারীর ঝনঝনানি, সোডার বোতলে কি সব যেন ভরে সেগুলো ছুঁড়ে মারার সঙ্গে সঙ্গেই দুমদাম শব্দে সেগুলো ফাটছে ছড়াচ্ছে আগুন। প্রস্তুতি বোধ হয় আগে থেকেই ছিল। ছ’তারিখের পরের থমথমে ওই তিন দিন ধরেই বোধ হয় প্রস্তুত হচ্ছিল দুই সম্প্রদায়। বেরিয়ে আসছিল নখ-দাঁত, শান পড়ছিল তরবারীতে, তৈরি হচ্ছিল সোডার বোতলে বোমা আরও কী কী সব যেন। একটা সময়ে দেখলাম, পিলপিল করে বস্তিবাসী মানুষের স্রোত এসে ঢুকছে তিন-চারতলা বাড়িগুলোতে। হাতের পোটলায় যে যা পেরেছে গেরস্থালীর টুকিটাকি তুলে নিয়ে পোটলা হাতে ঘর-দুয়ার ফেলে দৌড় লাগিয়েছে প্রাণ বাঁচানোর জন্যে। এসে সব ঢুকছে পাকা বাড়িগুলোতে। দরজা খুলতে দেখা জয়ায় করিডোরে সর্ষে পড়ার জায়গা নেই। সকল বয়েসের নারী পুরুষদের ভীড়। যে যেমন পেরেছে জায়গা নিয়ে বসে পড়েছে, সিঁড়িতে আরও ছুটন্ত পায়ের শব্দ।

সামনের ফ্ল্যাটের মাঝারী আকারের বাম নেতাটির ছেলেদের দেখা যায়, অল্প বয়েসী তিনটি ছেলে, বারো থেকে ষোলর মধ্যে বয়েস, দরজায় আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে, কাকি, খালি বোতল হ্যায়? কি হবে জানতে চাইলে বলে, বম বানায়েঙ্গে! ছোড় দেঙ্গে ক্যায়া উনলোগোকো? ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিই। আবার গিয়ে বারান্দায় দাঁড়াতে বুঝতে পারি, আমাদের ছাদ থেকেও এবার শুরু হয়েছে হাতবোমা ছোঁড়া! বাচ্চাদুটোই জেগে। দুই হাতে দুজনকে জাপটে ধরে খাটের পাশে মেঝেতে বসে একমনে লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুব্‌হানাকা ... পড়ে যাচ্ছি। থমকে যাওয়া সময়ও একসময় চলতে শুরু করে। পুলিশের সাইরেন, নেতাদের মাইকে ভাষণ শোনা যায় যুযুধান দুই পক্ষের রণহুঙ্কার ছাপিয়ে।  গুলির শব্দে চাপা পড়ে মানুষের চীৎকার। একসময় শুধুই সাইরেনের শব্দ থেকে যায়। 

তিনদিন ছিল কার্ফিউ। নাকি চারদিন? ঘন্টা দুইয়ের জন্যে কার্ফিউ লঘু করা হত প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী সংগ্রহের জন্যে। 

রামস্বামী- যিনি আমার একটা লেখার অনুবাদ করেছিলেন, সদ্য যখন এই বাবরী মসজিদ নিয়ে আদালতের রায় বেরুলো, তিনি তাঁর নাম পরিবর্তন করে একটি ইসলামিক নাম রাখলেন। নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। ঘোষণা দিয়েই নাম পরিবর্তন করেন তিনি।  
-------------------



আসলে যা বলতে চাই, সে অন্য কথা। সেকথা বলতে চাই না বলেই এইসব পুরনো কথাদের অবতারণা।