Sunday, June 26, 2011

চিঠি


ইউনিভার্সাল ট্রাভেলসের সেই বিজ্ঞাপন ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী-র সময় থেকেই পৃথিবী ছোট হতে শুরু করেছিল বা হয়ত তারও আগে থেকে। আমি জানতে পারিনি। অনেক বড় পৃথিবীতে তখন সকলেই সকলকে চিঠি লিখত। কেউ সাদা কাগজে, কেউ রুল টানা খাতার পাতা ছিঁড়ে তো কেউ রঙিন ফুল-পাতা হৃদয়ছাপ রাইটিং প্যাডে। কেউ চিঠি লিখত বিচিত্রার ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন কলামে, ছোট্ট ছোট্ট চিরকুট, খোলা চিঠি পাঠকের উদ্দ্যেশ্যে। সে সব চিঠির জবাবও আসত, কোনোটা ব্যক্তিগত ঠিকানায় কোনোটা বা সেই পাতাতেই। হতো পত্রমিতালিও। কেউ কাউকে চেনে না, কোথাও একটা জায়গা থেকে হয়ত পাওয়া গেছে ঠিকানা, চিঠি যেত সেই ঠিকানায়। কখনও জবাব আসত কখনও আসত না।

যে চিঠির জবাব আসত, ফেরত ডাকে আবার চিঠি যেত সেই ঠিকানায়। দেশে, বিদেশে, ক্রমশ ছোট হয়ে আসা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন ঠিকানায়। আমি তখন ছোট, আমার তখন লম্বা ঝুলের ফ্রক। ডাকপিওন যখন চিঠি নিয়ে আসত, আমি সবার আগে দৌড়ুতাম তার কাছে, হাত ঢুকিয়ে দিতাম তার ব্যাগে। প্রচুর চিঠি আসত আমাদের ঠিকানায় যার বেশির ভাগ চিঠিতেই নাম লেখা থাকত আমার কাকার। রং-বেরঙের সব খাম, নানা দেশ থেকে আসা সেই সব চিঠি। আমার আগ্রহের কারণ ছিল সেই সব খামে বসানো ডাকটিকিট। চিঠিগুলো আমি নিজের কাছেই রেখে দিতাম, কাকা এলে হাতে হাতে দেব বলে, আর কাকার হাত থেকে নাবিস্কো চকোলেট, -আসলে যা ক্যান্ডি কিন্তু আমরা বলতাম চকোলেট, সেই চকোলেট আর সঙ্গে খামে বসানো ডাকটিকিটগুলো নেব বলে। রাজা-রানির ছবি, পতাকা, বিভিন্ন বিখ্যাত সব মানুষদের ছোট্ট ছোট্ট ছবির ডাকটিকিট। ক্যান্ডি হাতে ধরিয়ে দিয়ে কাকা ভাগিয়ে দিত, চল ভাগ বলে। কিন্তু আমি ভাগতাম না। ঘুরঘুর করতাম, ঘ্যানঘ্যান করার একটা স্বভাব আমার আছে বলে।

কাকার নিজের প্রচুর ডাকটিকিটের এলবাম, সেখানে নতুন পুরোনো মিলিয়ে হাজারে হাজারে টিকিট। আমাকে খামের গায়ে লাগানো দু-একটা টিকিট ধরিয়ে দিত, আমি মহানন্দে সেই দু-এক পিস টিকিট নিয়ে নিজের ঘরে চলে যেতাম, টিকিট জমানোর খাতায় সেগুলো আবার বসাতাম আঠা দিয়ে। চিঠি আসত আব্বার নামেও। সেও সব দেশ বিদেশের চিঠি, কিন্তু সেগুলো কাকার ওই পত্রমিতালি-র চিঠি নয়, সেগুলো কাজের চিঠি, ব্যবসায়িক চিঠি। তখন অতশত কে বোঝে,  আমি শুধু জায়গা মতো যার যার নামের চিঠি সাপ্লাই দিতাম আর অপেক্ষা করতাম ডাকটিকিটের। আব্বা চিঠি নিয়ে যা ভাগ বলে ভাগিয়ে দিত না, খাম থেকে চিঠিগুলো বের করে নিয়ে খামগুলোই হাতে দিয়ে দিত! আমি বসে বসে টিকিট ছাড়াতাম খামের গা থেকে, কোনোটা ছাড়াতে পারতাম, কোনোটা পারতাম না, সেটা কাঁচি দিয়ে কেটে নিতাম।

ফ্রক ছেড়ে  আমি যখন সালোয়ার-কামিজ আর ওড়নায়, তখন চিঠি এলো আমারও। নাম-ঠিকানা বিহিন সেই সব চিঠি, কত হাত বদল হয়ে হয়ে সেই সব চিঠি এসে পৌঁছুতো সে আমি নিজেও জানতাম না। লুকিয়ে পাঠানো সেই সব চিঠি, লুকিয়েই পড়া হতো আর লুকিয়ে রাখার জায়গার অভাবে সেগুলো যতটা সম্ভব কুটি কুটি করে ছিঁড়ে গোপনেই ফেলে দিয়ে আসা হতো স্কুলে যাওয়া -আসার পথে। কোনো প্রাসঙ্গিক বা কাজের কথা যে সেই সব চিঠিতে থাকত না সেকথা বলাই বাহুল্য। টোকা কবিতা, কোনো উপন্যাসের রোমান্টিক কয়েকটা লাইন বা নিজের মস্তিষ্ক প্রসূত কিছু লাইন, যাকে কবিতা বলে চালানো হতো। চিঠির শেষে আবেদন থাকত ফেরত পত্রের। মায়ের আর মারের ভয়ে সেই সব পত্রের উত্তর দেওয়ার কথা কখনও মাথাতেই আসেনি। আচ্ছা, যদি 'মা এবং মার এই দুইয়ের ভয় না থাকত তবে কি উত্তর যেত? কী জানি.. একদিন হঠাৎ খেয়ালে এক চিঠি চলে যায়, ঠিকানা -ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন, বিচিত্রা।  প্রেরক কর্নফুলী। অক্ষর গুনে গুনে কড়িও গুনতে হতো বলে সেই সব চিঠি আসলে চিঠি হয়ে উঠতে পারেনি কখনোই।

খুব তাড়াতাড়িই সাঙ্গ হল সেই খেলা। আমার ঠিকানা বদল হলো খুব তাড়াতাড়ি, সালোয়ার কামিজ আর ওড়না থেকে আমি শাড়ি আর ঘোমটায়। চিঠি আসে। মাসে দুবার। বিদেশের ঠিকানা থেকে চিঠি। যেদিন ডাকে দেওয়া হয়, সেদিন থেকে নিয়ে ঠিক সাতদিনের মাথায় আমার হাতে পৌঁছুয়। এখন আমি আর ডাকপিওনের কাছে দৌঁড়ুই না, হাত ঢোকাই না তার ব্যাগে, যাই না কাকার কাছেও ক্যান্ডি বা টিকিটের জন্যে। আমি তখন আর ডাকটিকিট জমাই না। আমার নামের চিঠি কেউ একজন আমার হাতে পৌঁছে দেয়। আমি নিয়ম করে সে চিঠির জবাব লিখি। না। সেই সব চিঠিও কোনো প্রেমপত্র হতো না। সে বোধ হয় লিখতে হতো বলে লেখা চিঠি। খামে বন্ধ করে কারুর একটা হাতে দিই, পরদিন সে চিঠি ডাকে চলে যায়। এভাবে মাসে দুবার আমার চিঠি আসে, মাসে দুবার আমি চিঠি লিখি। নিয়মমাফিক।

ছোট হয়ে আসা পৃথিবীর বিজ্ঞাপন দিতে থাকা ইউনিভার্সাল ট্রাভেলস থেকে একদিন টিকিট কাটা হয় আমার জন্যেও। আমি পাড়ি দিই বাড়ির কাছের এই আরশীনগরে, পাশের এই বিদেশবাড়িতে। চিঠি তখনও আসে। দেশ থেকে। আব্বা লেখে, কাকা লেখে, বোন লেখে।  চিঠি পড়া হয়ে গেলে উত্তর লিখে সেই সব চিঠি আবার খামে ভরে রেখে দিই, আলমারির ড্রয়ারে। দিন যায়, মাস গিয়ে বছরও যায়। এভাবেই যেতে থাকে বছরের পর বছর। আমার লেখার খাতা, আমার ডায়রি, আমার সব গল্পের বইয়েরা রয়ে গেছিল দেশেই, কিছুদিন বা কিছু বছর তারা ছিল জায়গামতই। পরে একসময় তারা হয় ঠিকানাবিহিন, কে কোথায় হারিয়ে যায় কেউ জানে না।

কলকাতায় তখনও পানের দোকানের মতো এসটিডি, আইএসডি টেলিফোন বুথ গজিয়ে  ওঠেনি। বাড়ির ফোন থেকে আইএসডি কল যেত না। খুব মন খারাপের সময় বা হঠাৎ এসে পড়া প্রয়োজনে ছোটো সেই ডালহৌসি, বড় পোস্ট অফিস বা টেলিফোন ভবন। একদিন হঠাৎ দেখি বাড়ির সামনের গলিতে এক ছোট্ট দোকান, ঝকঝকে বোর্ডে বড় বড় হরফে দোকানের নাম আর পাশেই ছোট করে লেখা- এখানে আইএসডি কল করা যায়। সপ্তাহের একটা দিন অন্তত আমি সেই দোকানে গিয়ে লাইন দিতাম ফোন করব বলে।


অন্তর্জাল। নেটজমানার তখন সবে শুরু। হাতে লেখা চিঠির দিন শেষ। পালটায় ঠিকানা, হয় ডট কম। পালটায় আমার ঠিকানা। স্ট্যাটাস। নতুন ঠিকানায় হাতে লেখা চিঠি আর আসে না। আসে ডট কমে। ডট কম আসার আগেই কমে এসেছিল চিঠি লেখা, সুখ-দুঃখ, দরকার- অদরকারের কথা লেখা কমে আসছিলো ধীরে ধীরে। খোঁজ-খবর নেওয়া হয়ে যেত ফোনে বা ইমেলে। আন্তর্জালিক যোগাযোগের সুতো ধরে আবার চিঠি আসা শুরু হলো। ততদিনে বাংলা ওয়েব পত্রিকাগুলোর হাত ধরে চেনা-জানা নয় নয় করেও কম হয়নি। শুধু ওয়েব পত্রিকা কেন, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটও তো এসেই গেছিল। ইয়াহু, এমএসএন, ইন্ডিয়াটাইমস, অর্কুট আর তারপর ফেসবুক।  এইসব ই-পত্রের আসার বা যাওয়ার পথে মায়ের চোখ রাঙানির ভয় নেই, সকলের চোখ এড়িয়ে সে চিঠি লুকিয়ে ছিঁড়েও ফেলে আসতে হয় না। অপছন্দের চিঠিতে শুধু ডিলিট বাটনটায় ক্লিক। প্রচুর প্রচুর চিঠি। মেলবাক্‌স উপচে যায় এত চিঠি। ক্লান্তি আসে। ধ্যাত্তেরি বলে গোটা মেলবাক্‌স ধরে একদিন একটা ক্লিক। সব ফর্‌সা। 

বছর কয়েক আগের কথা। তখন আমি প্রায় রোজই কিছু না কিছু লিখি। বাংলা ওয়েব পত্রিকাগুলোতে, বিভিন্ন বাংলা ব্লগসাইটে বা নিজের এই ব্লগ বিবর্ণ কবিতায়। চিঠি আসে তখনও। লেখা পড়ে নিজের ভাল লাগা-মন্দ লাগা জানান অনেকে ব্যক্তিগত ই-পত্রে। ঠিক ওই সময়ে একটা চিঠি এলো। সাত সমুদ্র আর না জানি কত নদীর ওপার হতে। যদিও ই-পত্রই কিন্তু এই অন্তর্জাল শুধুই বাহন ছিল সেই চিঠির। হাতে লেখা এক চিঠি স্ক্যান করে ইমেলে যুক্ত করে পাঠানো। না না। কোনো প্রেমপত্র নয় সে।  ওয়েব পত্রিকায় লেখা পড়ে এক পাঠক নিজের ভাল লাগা প্রকাশ করেছিলেন সেই চিঠিতে। আড়াই পাতার সে চিঠিতে অনেক কাটাকুটি ছিল, আমার লেখা থেকে কিছু উদ্ধৃতি আর সঙ্গে পাঠকের নিজের মত। খানিকটা সমালোচনাও ছিল তবে সে নগন্য। সেই চিঠি পেয়ে বেশ কিছুদিন মাটিতে পা পড়েনি আমার। একজন নিতান্তই অ-লেখককে সত্যি সত্যিই যেন লেখক বানিয়ে দিয়েছিল সেই চিঠি..