Sunday, June 26, 2011

চিঠি


ইউনিভার্সাল ট্রাভেলসের সেই বিজ্ঞাপন ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী-র সময় থেকেই পৃথিবী ছোট হতে শুরু করেছিল বা হয়ত তারও আগে থেকে। আমি জানতে পারিনি। অনেক বড় পৃথিবীতে তখন সকলেই সকলকে চিঠি লিখত। কেউ সাদা কাগজে, কেউ রুল টানা খাতার পাতা ছিঁড়ে তো কেউ রঙিন ফুল-পাতা হৃদয়ছাপ রাইটিং প্যাডে। কেউ চিঠি লিখত বিচিত্রার ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন কলামে, ছোট্ট ছোট্ট চিরকুট, খোলা চিঠি পাঠকের উদ্দ্যেশ্যে। সে সব চিঠির জবাবও আসত, কোনোটা ব্যক্তিগত ঠিকানায় কোনোটা বা সেই পাতাতেই। হতো পত্রমিতালিও। কেউ কাউকে চেনে না, কোথাও একটা জায়গা থেকে হয়ত পাওয়া গেছে ঠিকানা, চিঠি যেত সেই ঠিকানায়। কখনও জবাব আসত কখনও আসত না।

যে চিঠির জবাব আসত, ফেরত ডাকে আবার চিঠি যেত সেই ঠিকানায়। দেশে, বিদেশে, ক্রমশ ছোট হয়ে আসা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন ঠিকানায়। আমি তখন ছোট, আমার তখন লম্বা ঝুলের ফ্রক। ডাকপিওন যখন চিঠি নিয়ে আসত, আমি সবার আগে দৌড়ুতাম তার কাছে, হাত ঢুকিয়ে দিতাম তার ব্যাগে। প্রচুর চিঠি আসত আমাদের ঠিকানায় যার বেশির ভাগ চিঠিতেই নাম লেখা থাকত আমার কাকার। রং-বেরঙের সব খাম, নানা দেশ থেকে আসা সেই সব চিঠি। আমার আগ্রহের কারণ ছিল সেই সব খামে বসানো ডাকটিকিট। চিঠিগুলো আমি নিজের কাছেই রেখে দিতাম, কাকা এলে হাতে হাতে দেব বলে, আর কাকার হাত থেকে নাবিস্কো চকোলেট, -আসলে যা ক্যান্ডি কিন্তু আমরা বলতাম চকোলেট, সেই চকোলেট আর সঙ্গে খামে বসানো ডাকটিকিটগুলো নেব বলে। রাজা-রানির ছবি, পতাকা, বিভিন্ন বিখ্যাত সব মানুষদের ছোট্ট ছোট্ট ছবির ডাকটিকিট। ক্যান্ডি হাতে ধরিয়ে দিয়ে কাকা ভাগিয়ে দিত, চল ভাগ বলে। কিন্তু আমি ভাগতাম না। ঘুরঘুর করতাম, ঘ্যানঘ্যান করার একটা স্বভাব আমার আছে বলে।

কাকার নিজের প্রচুর ডাকটিকিটের এলবাম, সেখানে নতুন পুরোনো মিলিয়ে হাজারে হাজারে টিকিট। আমাকে খামের গায়ে লাগানো দু-একটা টিকিট ধরিয়ে দিত, আমি মহানন্দে সেই দু-এক পিস টিকিট নিয়ে নিজের ঘরে চলে যেতাম, টিকিট জমানোর খাতায় সেগুলো আবার বসাতাম আঠা দিয়ে। চিঠি আসত আব্বার নামেও। সেও সব দেশ বিদেশের চিঠি, কিন্তু সেগুলো কাকার ওই পত্রমিতালি-র চিঠি নয়, সেগুলো কাজের চিঠি, ব্যবসায়িক চিঠি। তখন অতশত কে বোঝে,  আমি শুধু জায়গা মতো যার যার নামের চিঠি সাপ্লাই দিতাম আর অপেক্ষা করতাম ডাকটিকিটের। আব্বা চিঠি নিয়ে যা ভাগ বলে ভাগিয়ে দিত না, খাম থেকে চিঠিগুলো বের করে নিয়ে খামগুলোই হাতে দিয়ে দিত! আমি বসে বসে টিকিট ছাড়াতাম খামের গা থেকে, কোনোটা ছাড়াতে পারতাম, কোনোটা পারতাম না, সেটা কাঁচি দিয়ে কেটে নিতাম।

ফ্রক ছেড়ে  আমি যখন সালোয়ার-কামিজ আর ওড়নায়, তখন চিঠি এলো আমারও। নাম-ঠিকানা বিহিন সেই সব চিঠি, কত হাত বদল হয়ে হয়ে সেই সব চিঠি এসে পৌঁছুতো সে আমি নিজেও জানতাম না। লুকিয়ে পাঠানো সেই সব চিঠি, লুকিয়েই পড়া হতো আর লুকিয়ে রাখার জায়গার অভাবে সেগুলো যতটা সম্ভব কুটি কুটি করে ছিঁড়ে গোপনেই ফেলে দিয়ে আসা হতো স্কুলে যাওয়া -আসার পথে। কোনো প্রাসঙ্গিক বা কাজের কথা যে সেই সব চিঠিতে থাকত না সেকথা বলাই বাহুল্য। টোকা কবিতা, কোনো উপন্যাসের রোমান্টিক কয়েকটা লাইন বা নিজের মস্তিষ্ক প্রসূত কিছু লাইন, যাকে কবিতা বলে চালানো হতো। চিঠির শেষে আবেদন থাকত ফেরত পত্রের। মায়ের আর মারের ভয়ে সেই সব পত্রের উত্তর দেওয়ার কথা কখনও মাথাতেই আসেনি। আচ্ছা, যদি 'মা এবং মার এই দুইয়ের ভয় না থাকত তবে কি উত্তর যেত? কী জানি.. একদিন হঠাৎ খেয়ালে এক চিঠি চলে যায়, ঠিকানা -ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন, বিচিত্রা।  প্রেরক কর্নফুলী। অক্ষর গুনে গুনে কড়িও গুনতে হতো বলে সেই সব চিঠি আসলে চিঠি হয়ে উঠতে পারেনি কখনোই।

খুব তাড়াতাড়িই সাঙ্গ হল সেই খেলা। আমার ঠিকানা বদল হলো খুব তাড়াতাড়ি, সালোয়ার কামিজ আর ওড়না থেকে আমি শাড়ি আর ঘোমটায়। চিঠি আসে। মাসে দুবার। বিদেশের ঠিকানা থেকে চিঠি। যেদিন ডাকে দেওয়া হয়, সেদিন থেকে নিয়ে ঠিক সাতদিনের মাথায় আমার হাতে পৌঁছুয়। এখন আমি আর ডাকপিওনের কাছে দৌঁড়ুই না, হাত ঢোকাই না তার ব্যাগে, যাই না কাকার কাছেও ক্যান্ডি বা টিকিটের জন্যে। আমি তখন আর ডাকটিকিট জমাই না। আমার নামের চিঠি কেউ একজন আমার হাতে পৌঁছে দেয়। আমি নিয়ম করে সে চিঠির জবাব লিখি। না। সেই সব চিঠিও কোনো প্রেমপত্র হতো না। সে বোধ হয় লিখতে হতো বলে লেখা চিঠি। খামে বন্ধ করে কারুর একটা হাতে দিই, পরদিন সে চিঠি ডাকে চলে যায়। এভাবে মাসে দুবার আমার চিঠি আসে, মাসে দুবার আমি চিঠি লিখি। নিয়মমাফিক।

ছোট হয়ে আসা পৃথিবীর বিজ্ঞাপন দিতে থাকা ইউনিভার্সাল ট্রাভেলস থেকে একদিন টিকিট কাটা হয় আমার জন্যেও। আমি পাড়ি দিই বাড়ির কাছের এই আরশীনগরে, পাশের এই বিদেশবাড়িতে। চিঠি তখনও আসে। দেশ থেকে। আব্বা লেখে, কাকা লেখে, বোন লেখে।  চিঠি পড়া হয়ে গেলে উত্তর লিখে সেই সব চিঠি আবার খামে ভরে রেখে দিই, আলমারির ড্রয়ারে। দিন যায়, মাস গিয়ে বছরও যায়। এভাবেই যেতে থাকে বছরের পর বছর। আমার লেখার খাতা, আমার ডায়রি, আমার সব গল্পের বইয়েরা রয়ে গেছিল দেশেই, কিছুদিন বা কিছু বছর তারা ছিল জায়গামতই। পরে একসময় তারা হয় ঠিকানাবিহিন, কে কোথায় হারিয়ে যায় কেউ জানে না।

কলকাতায় তখনও পানের দোকানের মতো এসটিডি, আইএসডি টেলিফোন বুথ গজিয়ে  ওঠেনি। বাড়ির ফোন থেকে আইএসডি কল যেত না। খুব মন খারাপের সময় বা হঠাৎ এসে পড়া প্রয়োজনে ছোটো সেই ডালহৌসি, বড় পোস্ট অফিস বা টেলিফোন ভবন। একদিন হঠাৎ দেখি বাড়ির সামনের গলিতে এক ছোট্ট দোকান, ঝকঝকে বোর্ডে বড় বড় হরফে দোকানের নাম আর পাশেই ছোট করে লেখা- এখানে আইএসডি কল করা যায়। সপ্তাহের একটা দিন অন্তত আমি সেই দোকানে গিয়ে লাইন দিতাম ফোন করব বলে।


অন্তর্জাল। নেটজমানার তখন সবে শুরু। হাতে লেখা চিঠির দিন শেষ। পালটায় ঠিকানা, হয় ডট কম। পালটায় আমার ঠিকানা। স্ট্যাটাস। নতুন ঠিকানায় হাতে লেখা চিঠি আর আসে না। আসে ডট কমে। ডট কম আসার আগেই কমে এসেছিল চিঠি লেখা, সুখ-দুঃখ, দরকার- অদরকারের কথা লেখা কমে আসছিলো ধীরে ধীরে। খোঁজ-খবর নেওয়া হয়ে যেত ফোনে বা ইমেলে। আন্তর্জালিক যোগাযোগের সুতো ধরে আবার চিঠি আসা শুরু হলো। ততদিনে বাংলা ওয়েব পত্রিকাগুলোর হাত ধরে চেনা-জানা নয় নয় করেও কম হয়নি। শুধু ওয়েব পত্রিকা কেন, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটও তো এসেই গেছিল। ইয়াহু, এমএসএন, ইন্ডিয়াটাইমস, অর্কুট আর তারপর ফেসবুক।  এইসব ই-পত্রের আসার বা যাওয়ার পথে মায়ের চোখ রাঙানির ভয় নেই, সকলের চোখ এড়িয়ে সে চিঠি লুকিয়ে ছিঁড়েও ফেলে আসতে হয় না। অপছন্দের চিঠিতে শুধু ডিলিট বাটনটায় ক্লিক। প্রচুর প্রচুর চিঠি। মেলবাক্‌স উপচে যায় এত চিঠি। ক্লান্তি আসে। ধ্যাত্তেরি বলে গোটা মেলবাক্‌স ধরে একদিন একটা ক্লিক। সব ফর্‌সা। 

বছর কয়েক আগের কথা। তখন আমি প্রায় রোজই কিছু না কিছু লিখি। বাংলা ওয়েব পত্রিকাগুলোতে, বিভিন্ন বাংলা ব্লগসাইটে বা নিজের এই ব্লগ বিবর্ণ কবিতায়। চিঠি আসে তখনও। লেখা পড়ে নিজের ভাল লাগা-মন্দ লাগা জানান অনেকে ব্যক্তিগত ই-পত্রে। ঠিক ওই সময়ে একটা চিঠি এলো। সাত সমুদ্র আর না জানি কত নদীর ওপার হতে। যদিও ই-পত্রই কিন্তু এই অন্তর্জাল শুধুই বাহন ছিল সেই চিঠির। হাতে লেখা এক চিঠি স্ক্যান করে ইমেলে যুক্ত করে পাঠানো। না না। কোনো প্রেমপত্র নয় সে।  ওয়েব পত্রিকায় লেখা পড়ে এক পাঠক নিজের ভাল লাগা প্রকাশ করেছিলেন সেই চিঠিতে। আড়াই পাতার সে চিঠিতে অনেক কাটাকুটি ছিল, আমার লেখা থেকে কিছু উদ্ধৃতি আর সঙ্গে পাঠকের নিজের মত। খানিকটা সমালোচনাও ছিল তবে সে নগন্য। সেই চিঠি পেয়ে বেশ কিছুদিন মাটিতে পা পড়েনি আমার। একজন নিতান্তই অ-লেখককে সত্যি সত্যিই যেন লেখক বানিয়ে দিয়েছিল সেই চিঠি..

Monday, April 11, 2011

তারে স্মরণ ও করি না/ স্বপনেও দেখি না আমি/ এ আমি সঙ্গে সঙ্গে/ এই অঙ্গে অঙ্গে রাখি আমি সারাক্ষণ..

আমার উচ্চতায় ভয়। চারতলা বাড়ির ছাদের রেলিং দিয়ে নিচের দিকে তাকালেও ভয় লাগে, তলপেট কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে, বুক ঢিপঢিপ। সেদিন সকালে হাঁটতে গিয়ে আন্দুলের দিকে যাওয়া অনেকটা উঁচু ফ্লাইওভারের রেলিংএর ধারে গিয়ে ভয়ে ভয়ে দাঁড়াই। নিচের দিকে তাকিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফ্লাইওভার আর তার মাঝে মাঝে আরও নিচে ফাঁকা জায়গা, সরু রাস্তার দিকে দেখতে গিয়ে আজ কেন কে জানে ভয় করল না। বরং ফ্লাইওভারের ফাঁক-ফোকরে পড়ে থাকা  নিচের ফাঁকা জমি, এঁকে বেঁকে এগিয়ে যাওয়া সরু রাস্তা যেন আমায় ডাকল! একটা শিরশিরে ভাব.. অনেক অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকি নিচের দিকে, একটুও ভয় করে না আর..

আমরা প্রতিদিনই কতবার নিচে নামি, উপরে উঠি। সিঁড়ি দিয়ে নামি, কেউ কেউ লিফ্‌টে করে নামেন, ব্রিজ থেকে নামি, আবার উঠিও। যে সিঁড়ি দিয়ে নামি, সেই সিঁড়ি দিয়েই আবার উপরেও উঠে আসি, এতে নতুন কিছু নেই। কেউ কোনো খারাপ কাজ করলে বা করে থাকলে আমরা বলি, অমুক কত নিচে নেমে গেছে, বা গিয়েছিল। সেই একই মানুষ কোনো ভাল কাজ করলে কী আমরা বলি যে অমুক বা এই মানুষটা কত উপরে উঠে গেছে? হয়ত কেউ কেউ বলে থাকেন, আমি জানি না। এই উপরে ওঠা বা নিচে নামা- একই শব্দ অথচ কত তফাৎ এর ব্যবহারিক অর্থে!


 ০২
তারে স্মরণ ও করি না/ স্বপনেও দেখি না আমি/ এ আমি সঙ্গে সঙ্গে/ এই অঙ্গে অঙ্গে রাখি আমি সারাক্ষণ- কফিল আহমেদ

আর যাব না ঠাকুরবাড়ি/ আমার রাধার নাইরে শাড়ি- গানটি সম্ভবত কফিল আহমেদেরই লেখা, সুর করা আর গাওয়া তো বটেই। সম্ববত এজন্যে বললাম, উনি গান বাঁধেন, গান করেন, কিন্তু ঠিক এই গানটি ওনারই লেখা কিনা ঠিক জানি না। সাগরকে জিজ্ঞেস করলে এক্ষুণি জানতে পারা যায় কিন্তু কি দরকার.. এমন কিছু জরুরী তো নয়.. অনেকদিন, অনেকবার গানটি অনেকভাবে অনেক জায়গায় শুনেছি, কফিল আহমেদ নিজেও গেয়ে শুনিয়েছেন। প্রতিবারেই একটা প্রশ্ন মাথায় জেগেছে, ঠাকুরবাড়ি কেন? অন্য কোনো জায়গা বা বাড়ি নয় কেন? দিন দুই ধরে থেকে থেকেই প্রশ্নটা গোত্তা মারছে মাথায়। কফিল আহমেদের সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞেস করতে হবে..


০৩
পুরানো সেই দিনের কথা সে কি ভোলা যায়
স্মৃতি যে সততই মধুর হয় এমনটা নয়। প্রচুর টক-ঝাল-নোনতা-মিষ্টি স্মৃতিদের সঙ্গে সঙ্গে থাকে অনেক অনেক তিক্ত স্মৃতিও। চিরতার পানির চাইতেও বেশি তেতো হয় কখনও কখনও সেসব। তবুও মনে পড়ে। হঠাৎ হঠাৎ আপনা থেকেই। কোনো ছোট্ট একটা টুকরো কথা বা কোনো জিনিস খুলে দেয় স্মৃতির পুরো ঝাঁপিটাকে। যা হয়ত মনে করতে চাই না, দুঃস্বপ্নেও দেখতে চাই না। আবার কখনও বা কেউ মনে করিয়ে দেয়, খেই ধরিয়ে দেয় মনের গহীন কোনো অন্দরে ঘুমিয়ে থাকা, কোনো ভুলে যাওয়া বা ভুলতে চাওয়া স্মৃতি-ঘটনা। বহুকাল আগে একটা কথা শুনেছিলাম, গ্রাম্য এক প্রবাদ- ছোট্ট এক পিঁপড়ের কামড় নাকি কখনও কখনও চেপে থাকা সাপের বিষকে জাগিয়ে দেয়। আমরা ভাবি, যে দিন গেছে, সে গেছে। ফুরিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে। কিন্তু যায় কী আসলেই?   

যায় না। কিছুই হারায় না। যখন তখন ফিরে আসে। কখন, কীভাবে-কেউ জানে না... জীবনের ধন নাকি কিছুই যায় না ফেলা.. স্মৃতিও তেমনি, কিছুই হারায় না, হারিয়ে যায় না..


০৪
আমার এই জ্বরবেলা
আমার বড় জ্বর হয়। জীবন জুড়িয়া কেবলি জ্বর। মাঝে-মধ্যে জ্বর থাকে না, তখন ঘুরে বেড়াই, দৌড়ে বেড়াই। একটু বেশিই দৌড়ে বেড়াই। কারণে বা অকারণে। আবার জ্বর হয়, আবার আমার নক্‌শী কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা, ক্যাল্‌পোল বা ক্রসিন ট্যাব। জ্বরের ফাঁকে ফাঁকেই সংসার, ছেলে-মেয়ে। কাঁথাটা এমনিতে সারাবছরই বিছানায় থাকে, ভাঁজ করা, বিছানার ধার ধরে। এবার শীত পড়ার সময়ে সে যে খাটের ভেতরকার বাক্‌সে ঢুকেছে আর বেরোয়নি। এখন আমার গায়ে মায়ের দেওয়া নক্কশী চাদর। গোটা চাদর জুড়ে কাঁথার ফোঁড়ে ফুল, লতা পাতার রংবাহারি নক্‌শা। বেশ মোটা চাদরটা, দুভাঁজে গায়ে থাকলে আর ঠান্ডা লাগে না। কাঁথার মতো ওম নেই যদিও কিন্তু মায়ের দেওয়া চাদরে যেন মায়ের হাতের ছোঁওয়া লেগে আছে এখনও। সেবার বাড়িতে গিয়ে আম্মার খাটে পাতা এই চাদরটা দেখে জানতে চেয়েছিলাম, কে করেছে কাজটা? বড় সুন্দর! কার একটা নাম যেন বলেছিল আম্মা, যাকে দিয়ে চাদরে কাজটা করিয়েছে। জিজ্ঞেস করলো, তুমার পছন্দ হইছে চাদরটা? 'বড় সুন্দর' বলাতে সঙ্গে সঙ্গেই বিছানায় পাতা চাদরটা তুলে ভাঁজ করে আমার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছিল আম্মা বারবার বারণ করা সত্বেও।

জ্বরটা এমনি এমনি  হয়। কারণে বা অকারণে, যখন তখন। কখনো ভালুকজ্বর তো কখনো ঘুসঘুসে। দুঃখু পেলে জ্বর হয়,  কষ্ট পেলে হয়, কোনো ভাবনা চিন্তা একটু চেপে বসলে জ্বর হয়, ঠান্ডা লেগে সর্দিজর, সিজন চেঞ্জ ইত্যাদি বা ম্যালেরিয়াও আছে। সে সব অবশ্য কম-বেশি সকলেরই হয়। আমার বাড়ির সকলেই মোটামুটি এইসব জ্বর-জ্বালা নিয়ে অভ্যস্ত বলে কেউই খুব একটা মাথা ঘামায় না এখন আর। বাবা-মা বা ভাই বোনেরা খবর পেলে অবশ্য চিন্তায় পড়ে যায়, তবে বেশির ভাগ সময়েই ওরা জানতে পারে না। রোজ রোজ কত আর অসুখ অসুখ করব।  ফোনে বোন তবু গলার আওয়াজে বুঝে যায়, বলে, তোমার এমন বারো মাসই জ্বর থাকে কেন? যখনই ফোন করি, তোমার জ্বর! বললাম, না না, বারো মাসই থাকে এমন নয়, মাঝে মধ্যেই জ্বর থাকে নাঃ-)  

জ্বর হলে বড় মাকে মনে পড়ে। ছেলেবেলাকে মনে পড়ে। হয়ত বড়বেলার সব জ্বরে তো একলা থাকার বেলা বা পালা বলেই মাকে বেশি বেশি করে মনে পড়ে। ছেলেবেলায় হওয়া জ্বর আর মা। নরম করে রাঁধা গরম ভাতে পানি দিয়ে কচলে ভাতটা ফেলে দিয়ে সেই পানিতে নুন আর লেবুর রস দিয়ে চামচে করে খাইয়ে দেওয়া। বিছানার ধার ধরে অয়েলক্লথ পেতে তাতে বালিশ রেখে সেই বালিশে শুইয়ে মাথায় পানি ঢালা, মাথা এপাশ ওপাশ করিয়ে ঘাড় অব্দি ধুইয়ে দেওয়া, মাঝে মধ্যেই মিশ্র মশলার গন্ধ মাখা ভেজা হাতে মুখ মুছে দেওয়া, হাতের আঁজলায় করে পানি নিয়ে দুই চোখেও পানি দেওয়া আর ততক্ষণ পানি ঢালতেই থাকা যতক্ষণ জ্বর না নামছে। তখন, হাতের ওই মশলার গন্ধ বড় নাকে লাগত। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছিয়ে দিয়ে আঁচলে করে মুখ.. 

..বুকের ভেতর দলা পাকায় কষ্ট, কবে কখন কোথায় যে হারালো মধুর সেই জ্বরবেলা ..

Friday, April 08, 2011

মন খারাপ হলে ভূমিকম্প হয়..

একসময় মন খারাপ হলে কুয়াশা হতো, মেঘ জমত, বৃষ্টি হতো, এখন ভূমিকম্প হয়। খানিক আগেই ঢাকায়, ছোট বোন মণি'র সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জানলাম, জাপানে নাকি আবার ভূমিকম্প হয়েছে। কোথায়, কতটা সেসব সেও বলতে পারল না, সকাল থেকে খবর দেখার বা শোনার সময় পায়নি। চিন্তায় আছে, ছুটকিটা যে জাপানেই থাকে। না। খবর আমিও দেখিনি বা শুনিনি। সময় পাইনি এমন নয়, টেলিভিশন চালানোর ইচ্ছেটাই হয়নি আজ। এখনও হচ্ছে না। তার থেকে বরং ছুটকিকে ফোন করে জেনে নেওয়া যাবে।

আজকে, আমার প্রবল মন খারাপের সময়ে জাপানে যখন ভূমিকম্প হলো, আম্মার জন্যে  আমার খুব মন কেমন করে উঠল। ভীষণ রকম মনে পড়ল মায়ের কথা। মনে হলো, কতদিন দেখি না আম্মাকে। সত্যিই তো। দিন তারিখের হিসেব করলে দেড় বছর হয়ে গেল আম্মাকে দেখেছি। দিন পাঁচ-ছয় আগেই ফোনে কথা হয়েছে, চাচিআম্মা মারা যাওয়ার পর তিন-চারবার কথা হয়েছে, তাও মনে হলো অনেকদিন কথা হয়নি। এমনিতে যে আম্মার সঙ্গে সব সময় কথা হয় তেমনটা নয়। আম্মার ফোন অধিকাংশ সময়েই বেজে যায়, আম্মা হয়ত তখন রান্নাঘরে বা একতলায়। বাড়িতে কথা বলার হলে কল যায় তাই আব্বার ফোনে। এমনিতেও গল্প যা হওয়ার তা সব সময়েই আব্বার সঙ্গেই হয়। ফোন যখন করি বেশিরভাগ সময়েই আব্বা নিচে, পুকুরপাড়ে, সেগুন গাছের তলায় হাতলওয়ালা বড় বেঞ্চিতে। এয়ারটেল কম্পানি যখন ব্যালেন্সের হিসেব দিতে থাকে তখন ফোনটা রেখে দিই। যখন এমন হয় যে, অনেকদিন আম্মার সঙ্গে কথাই হয় না, আব্বাকে সেটা বললে আব্বা কাউকে দিয়ে ফোনটা উপরে পাঠিয়ে দেয়।

আজকে আম্মাকে একবারেই পাওয়া গেল। আম্মা বলে ডাকতেই  -সামরান, কুন সময় আইবা? আমার যে ভালা লাগে না..  শেষবার যখন কথা হলো, ফোনের ওধারে তখন আম্মা কাঁদছিল, সদ্য মারা গেছে চাচিআম্মা। তারপর থেকেই অসুস্থ মা আমার আরও বেশি অসুস্থ। আমাকে বলল, তুমি কবে আইবা, আমি মইরা গেলে খবর পাইয়া যদি আইও তবে তো লাশও দেখতা পাইবা না, কবর দিয়া দিব.. আম্মাকে বললাম, আপনার মরে যাওয়ার বয়েস হয় নাই, অনেকদিন বাঁচবেন এখন, বাবুর পরীক্ষা শেষ হলেই আসব, অস্থির হইয়েন না।  আম্মা বলে, হ, তোমার চাচিআম্মার যেন মরবার বয়েস হইসিলো!

সত্যিই তো। মরে যেতে তো বয়েস লাগে না। যে কেউ যে কোনো সময়ে যে কোনো বয়েসে মরে যেতে পারেকত বয়েস হয়েছিল আমার চাচির? ষোল নাকি সতেরো(?) বছরের কিশোরী মেয়েটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের বাড়িতে বউ হয়ে এসেছিল। চল্লিশ বছর পর, স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পুর্তির দিনে চলে গেল। চল্লিশ বছরের সংসারজীবন একত্রে কাটিয়েছে আম্মা আর চাচি। আব্বা বলল, তখন যুদ্ধ চলছে, তোমার চাচিআম্মারা নিজেদের বাড়ি ঘর সব ছেড়ে-ছুঁড়ে পালিয়ে গিয়ে নর্‌হায় উঠেছিল খানসেনাদের ভয়ে, সেখানেই বিয়ে। একটা নৌকায় করে বিয়ের নওশা সহ তিনজন বরযাত্রী। দাদা, আব্বা আর নওশা। ছইওলা কোনো নৌকাও পাওয়া যায়নি যাতে করে বরযাত্রী যাবে, নতুন বউ আসবে। বিয়ের বাজার বলতে খুঁজে পেতে বাজার থেকে কিনে আনা চৌদ্দ টাকা দামের একটা শাড়ি আর একটা গামছা।

বয়েসের কথা আসতে মনে পড়ল, আম্মার বয়েস কত হলো? আমরা কেউ তো আম্মার জন্মদিনও জানি না! জ্ঞান হওয়ার আগেই বাপ-মা দুজনকেই হারিয়ে মামার বাড়িতে মানুষ হওয়া মা আমার নিজের জন্মদিনও জানে না.. ও বললো, একটা ভাল দিন দেখে মায়ের জন্মদিন পালন করো না কেন সবাই মিলে? সত্যিই তো! মণিকে বললাম, সামনে পয়লা বৈশাখ, সেদিন সবাই মিলে আম্মার জন্মদিন পালন করা হোক। আমি তো যেতে পারব না, তুই সেদিন বাড়ি যাবি, আম্মার জন্যে সুন্দর একটা শাড়ি কিনবি, বাড়ি গিয়ে পায়েস রাঁধবি আর ঢাকা থেকে নিজে কেক বানিয়ে নিয়ে যাবি। ভাইয়াকে, টুটুলকে, বাবলিকে, মুন্নাকে সব্বাইকে বলে দে, সেদিন যেন বাড়ি আসে, যেমনটা আব্বার জন্মদিনে সবাই আসে। এবার থেকে পয়লা বৈশাখ আমার মায়ের জন্মদিন...

Monday, April 04, 2011

আজ সকালের আমন্ত্রণে..

ভোরবেলায় হাঁটতে বেরিয়ে নিচে গেটের কাছে আটকে গেলাম, কোলাপ্‌সিবলে তালা আটকানো। রোজই থাকে, আমার ভদ্রলোকটি বাড়িতে থাকলে তার পকেট থেকে চাবি নিয়ে আমি বেরিয়ে যাই, কদিন ভদ্রলোকটি বাড়িতে নেই কাজেই ভরসা দোতলার সিদ্ধার্থবাবু। পাঁচটা কুড়ি নাগাদ তালা খুলে মৌকে সঙ্গে নিয়ে বাইকে করে বেরিয়ে যান, বোটানিক্যাল গার্ডেনে প্রাতঃভ্রমণের উদ্দ্যেশ্যে। আজ কোনো কারণে তিনি বেরোননি, হয়তো বাড়িতেই নেই। গোগোলের উচ্চ মাধ্যমিক শেষ হয়েছে তিরিশ তারিখে, ছেলেকে নিয়ে তাঁরা হয়ত কোথাও বেড়াতে গিয়ে থাকবেন। গত দুসপ্তাহ ধরে আমারও প্রাতঃভ্রমণের ঠিকানা ওই বি গার্ডেন। যেহেতু চাবি নেই ঘরে তাই একটু দেরি করেই বেরুচ্ছি এই কদিন, সাড়ে পাঁচটারও পরে। পাড়ার রিকশাওয়ালা শংকর গলির মুখটায় দাঁড়িয়ে থাকে, রিক্‌শায় চেপে আমি হাঁটতে যাই। ফেরার সময় অবশ্য বাস চালু হয়ে যায়, বাসেই ফিরি। বোটানিক্যাল গার্ডেন অব্দি হেঁটে গেলে বড়জোর মিনিট তিরিশ বা পয়ত্রিশ লাগবে কিন্তু অত ভোরে অক্টোপাশের বাহুদের মত ছড়ানো ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে একা হাঁটা যে মোটেই নিরাপদ নয় বিশেষ করে কোনো মহিলার জন্যে, সে এই এলাকার সকল বাসিন্দাই একবাক্যে বলে থাকেন। আমি নিজেও যে জানি না তা নয়। কাজেই শংকর জিন্দাবাদ।

আধঘন্টা গেটের সামনে সিঁড়িতে বসে থাকার পর কার একটা দরজা খোলার শব্দ পেলাম, দু-তিনজন মানুষের পায়ের শব্দও পাওয়া গেল, নিচে নামার। তিনতলার নতুন ভাড়াটে ভদ্রলোক ও তার মা এবং গিন্নি। ভদ্রলোক অফিস যাবেন বলে মা এবং গিন্নি নিচে গেট অব্দি ছাড়তে এসেছেন। গেটের তালা খুললে আমি উঠে বেরিয়ে গেলাম। শংকর অপেক্ষা করে করে চলে গেছে, হয়ত ভাড়া পেয়ে গেছে। বাসস্ট্যান্ড অব্দি গেলাম, যেদিককার বাস পাই- বি গার্ডেন বা ধর্মতলা, তাতেই চেপে বসব, ধর্মতলার বাস পেলে ভিক্টরিয়ায় চলে যাওয়া যাবে। একসময় যেখানে নিয়মিত হাঁটতে যেতাম ভোরবেলায়। গঙ্গার এপারে যবে থেকে ঠিকানা হয়েছে, ভিক্টোরিয়ায় প্রাতঃভ্রমণও শেষ হয়েছে। স্ট্যান্ডে বেলা ছটায়ও কোনো বাস নেই। বাসস্ট্যান্ড যেখানে, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে ব্রীজ, দেখলাম বেশ কিছু মানুষ হাঁটছেন ব্রীজের উপর। কেউ এগিয়ে যাচ্ছেন ফ্লাইওভার ধরে, কেউ বা হাঁটা শেষ করে ফিরছেন।

বাসের অপেক্ষায় না থেকে এগোলাম ফ্লাইওভার ধরে। খানিক দাঁড়িয়ে দিক ঠিক করে নিলাম, কোনদিকে যাব। যেদিকে বেশি মানুষকে এগোতে দেখলাম, আমিও সেই পথই ধরলাম। দিক নির্দেশনা জানান দিল সে পথ গেছে কোনা এক্সপ্রেসের দিকে। খানিক এগোতে পুলের আরেকটি হাত বেরিয়ে এল, সে নিয়ে যাবে আন্দুল। আমি কোনা এক্সপ্রেসই পছন্দ করলাম।  উড়ালপুলে হাঁটতে গিয়ে দেখা গেল এই সামান্য চড়াইয়েও হাঁফ ধরছে, বুঝলাম, এই চার বছর ধরে ধোঁয়া গিলে গিলে দম বলে কিছু আর বেঁচে নেই!

পুলের ধার ধরে হাঁটতে হাটতে হঠাৎ খেয়াল হল কাঁচের গুড়োর উপর দিয়ে হাঁটছি। কুচো কাঁচ, টুকরো কাঁচ, পাউডার কাঁচ। কদিন পরপরই ব্রীজে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে, ভাবলাম এখানেও হয়েছে হবে, জানতে পারিনি। কিন্তু ভাল করে খেয়াল করতে দেখা গেল, ভুল ভাবছিলাম, এগুলো গাড়ির কাঁচ নয়, বোতল ভাঙা কাঁচ সব। পুলের দুই ধারেই সরু ফুটপাথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা আধভাঙা সব বোতলও দেখা গেল, ম্যাক্‌ডাওয়েল,  হোয়াইট মিস্‌চিফ আর আরও নানারকম লেবেলের বোতলের সব ভাঙা টুকরো। গাড়ির চাকার চাপে যা কিনা গুড়ো গুড়ো হয়ে ছড়িয়ে আছে পুলময়। মিনারেল জলের তোবড়ানো খালি বোতল, আলুভাজার খালি প্যাকেট সবই আছে সেখানে। বুঝলাম, এলাকার ছেলেপুলেদের সান্ধ্য বা রাত্রিকালীন ঠেক এই উড়ালপুল। রেলিংএর ধার ধরে নিচে তাকাতে বসতি দেখতে পেলাম। উড়ালপুলের ঘোরানো প্যাঁচানো সব বাহুদের ফাঁকে ফাঁকে নিচে কোথাও ঝোপ-ঝাঁড়, কোথাও চায়ের দোকানে ছোটোখাটো জটলা, কোথাও দিনশুরুর ব্যস্ততা সমস্ত দিনের জন্যে দৌড়ুতে শুরু করা মানুষগুলোর মধ্যে।

নিচের দিকে তাকিয়ে মনে পড়ল, দিন পনেরো আগে এখানেই কোথাও বাড়ি বাড়ি কাজ করে নিজের ঠিকানায় ফেরার পথে একটি মেয়ে গণধর্ষিতা হয়েছিল। কতজন ছিল সেই ধর্ষকদের দলে জানা নেই। ভোরবেলায় মেয়েটি যখন উড়ালপুলের তলা থেকে লেংচে লেংচে রাস্তার ধারে এসে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, তখনও তার ছেঁড়া সায়া আর কোনোমতে গায়ে জড়ানো শাড়িটিতে  টাটকা  রক্তের দাগ। যে পরিমান রক্ত তার ছেঁড়া সায়া-শাড়িতে ছিল, সে নাকি ঋতুস্রাবের রক্তের থেকেও বেশি। খুব স্বাভাবিক নিয়মেই সেখানে ভীড় হয়, কেউ একজন ছেঁড়া শাড়িটি দিয়ে ঢেকে দেয় মেয়েটির অনাবৃত উর্ধাঙ্গ। মুখে জল ছিটিয়ে তার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টাও করে লোকজন। বেহঁশ পড়ে থাকা মেয়েটির দিকে অজস্র প্রশ্ন ছূঁড়ে দিতে থাকে জমে ওঠা ভীড়- কতজন ছিল? কোথায় করলো? বাড়ি কোথায় তোমার? কেউ একজন পুলিশে খবর দিলে পুলিশ এসে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায় মেয়েটিকে। কোথায় নিয়ে যায় কে জানে, হয়ত থানায়, হয়ত হাসপাতালে। সেই থেকে আমার বাড়িতে কাজ করতে আসা মেয়েটি বিকেল বিকেল কাজ সেরে বাড়ি ফিরে যায়, সন্ধ্যে হওয়ার আগেই। তাকেও তো ওই উড়ালপুলের নিচে দিয়ে অন্ধকার রাস্তায় প্রায় আধঘন্টা হেঁটে বাড়ি ফিরতে হয়।

মন্দিরতলা থেকে কোনা এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে আবার মন্দিরতলা, আমার দুপাক হাঁটা হয়ে যায় ততক্ষণে। বাড়ছে চলমান গাড়ি-ট্রাক-লরির সংখ্যা। সাঁই সাঁই বেরোয় সব গাড়ি। কেউ ভেঁপু বাজায় কেউ বাজায় না। এই ভোরেও কোনো কোনো গাড়ি থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসা উদ্দাম বাজনা্র শব্দ চিরে দেয় সকালের সমস্ত নৈঃশব্দকে।  ভয় লাগে বিশাল বিশাল লরি দেখে। যদি চাপা দেয় তো আমার এই পলকা প্রাণ ফুঁশ করে বেরিয়ে যাবে খাঁচা ছেড়ে। সরু ফুটপাথ ধরে ফেরার পথ। বাড়ি। খবরের কাগজ আর ধোঁয়া ওড়া চা। সঙ্গে তারা মিউজিকের আজ সকালের আমন্ত্রণে..