Saturday, November 13, 2010

ষোলতম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব- বৃত্তের বাইরে

ষোলতম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব। কাল ছিল দ্বিতীয় দিন। যদিও উৎসব শুরু হয়েছে দশ তারিখে আর শুরুর অনুষ্ঠান ছাড়াও একটা সিনেমা দেখানো হয়েছে সেখানে কিন্তু আমজনতার সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল না। এগারো তারিখ থেকে শুরু হয় সিনেমা দেখানো। বিভিন্ন কারণে এবারের উৎসব অনেক ছোট, সিনেমা অনেক কম, বিদেশি অতিথি, সিনেমার নির্মাতারা ছাড়াও আর যাঁরা আসেন এবার তাদের অনুপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। কিন্তু উৎসব তো উৎসবই তাই সিনেমাপ্রেমী মানুষদের উৎসাহে কোনো খামতি নেই। সেখানে হাজির বিদেশ থেকে দশদিনের ছুটিতে বাড়িতে আসা তরুনটি, উৎসবের এই সাতদিন যে কিনা উৎসব প্রাঙ্গনেই থাকবে।

আমিও সিনেমা দেখলাম। নন্দন- তিনে বাংলাদেশের একটা সিনেমা আছে লিস্টে দেখে হলে ঢুকতে গিয়েই ফ্যাসাদ। ওইটুকুনি জায়গায় একজনের উপর একজন পারে তো উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে এমন অবস্থা, হলে ঢোকার সময় ভিড়টা এত জোরে আছড়ালো দরজায় যে হলের দরজা ভেঙে গেল! নেমে অন্য কোনো হলে ঢুকব ভাবলেও সময় ছিলো না, সব হলেতেই সিনেমা শুরু গেছে ততক্ষণে। কোনোমতে হলে ঢুকে এক কোণায় এই ভেবে দাঁড়ালাম, মিনিট কয়েক দেখে পালিয়ে আসব আর টিবেটিয়ান ডিলাইটসে গিয়ে মোমো খাবো। কিন্তু আজ কপালে মোমো ছিলো না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জীবনে প্রথমবার দেখে ফেললাম চুরাশি মিনিটের সিনেমাখানি। এবং মোমো না খেতে পাওয়ার দুঃখ বেমালুম ভুলে গিয়ে নিজেকে শাবাশি দিলাম ঐ ভীড় ঠেলে ভেতরে ঢুকেছিলাম বলে এবং কিচ্ছুটি না জেনে সিনেমাটি দেখতে চেয়েছিলাম বলে।

হলের ভেতরেও চুড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। ছোট্ট হলে যে যার মত দৌড়ে সিট দখল করে নেওয়ার পরে হাঁটা চলার জায়গায় লোক বসে পড়েন, বাকি জায়গায় দরজা ব্লক করে বাদবাকি সবাই দাঁড়িয়ে। তখনও ফিল্ম এসে পৌঁছোয়নি! শেষমেশ এলো, অর শুরু হলো গোলাম রব্বানী বিপ্লবের "বৃত্তের বইরে'। বাপ্পা মজুমদারের সঙ্গীত, অভিনয়ে চেনা নাম শুধু দেখলাম- নজরুল ইসলাম বাবু।

প্রত্যন্ত গ্রামের এক বংশীবাদকের গল্প, হরিপদ বাঁশুরিয়া। পেশায় মৃৎশিল্পি। মাটির নানা রকমের পাত্র বানান আর তাঁর পালিত পুত্র মকবুল হোসেন সেগুলো বাজারে বিক্রি করেন। এই মকবুলকে একদিন এই বাজারেই কুড়িয়ে পেয়েছিলেন হরিপদ, মকবুল তখন শিশু। বাজারের একধারে বসে বাঁশী বাজান হরিপদ পাল। বাজারে বসে মাটির পাত্র বিক্রি করা ছাড়াও মকবুল তার বাবার বাঁশীর ঝোলাটি কাঁধে নিয়ে বাবার সঙ্গী হয় সকল গ্রাম্য আসরে, বিভিন্ন বাজারে।

সেই বাজারেই শহর থেকে আসা এক সাংবাদিক তাঁর বাঁশী শুনে একখান ছবি তুলে নিয়ে গিয়ে ঢাকার একটি কাগজে ছাপিয়েছিলেন কবে যেন। সাংবাদিক জানতে চেয়েছিলেন, তার জীবনে এমন কোনো ইচ্ছে আছে কী যা এখনও অপুর্ণ? বাঁশুরিয়া বলেন, এমন কোনো ইচ্ছে তো নাই যা অপূর্ণ তবে একবার ঢাকায় যাওনের ইচ্ছা তাঁর, জীবনে তো শহর দেখেন নাই, আর তাও কিনা রাজধানী! খবরের কাগজে সেই ছবি আর লেখা পাড়ে এক শিল্পপতি লোক পাঠিয়ে বাঁশুরিয়াকে শহরে নিয়ে যান লোকশিল্পিদের জগৎসভায় তুলে ধরার মহান প্রকল্প বাস্তবায়িত করবেন বলে। গল্পের শুরু সেখানেই।

ওয়াইড শটে বিস্তৃত কচি সবুজ ধানের ক্ষেত, শাপলা বিলের ভেতর দিয়ে ছোট্ট নৌকাখানির এগিয়ে যাওয়া দেখে যে কেউ নিজের হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলাটি দেখতে পাবেন চোখের সামনে। ইঞ্জিনের নৌকায় নদী পারাপারে হাজির শুধু বর্তমান।

এক জাদুগর বাঁশীওয়ালা হঠাৎ হঠাৎ হাজির হন কোনো কোনো জায়গায়, আর সৌভাগ্যবানদের শুনিয়ে যান তার মোহনবাঁশী।ঙ্কখনো চলন্ত ট্রেনের কামরায়, কখনো কোনো গ্রাম্য লোকগানের আসরে, আর কখনো বা শহরের ঝাঁ চকচকে অডিটোরিয়ামে, লোকগানে প্রাণ যোগাতে হাজির হন সেই বাঁশী বাজিয়ে। আজ সেই বাঁশীওয়ালা ঢুকে পড়েছিলাম নন্দন-তিনে। ছদ্মবেশী বংশীবাদক- মণিরুল ইসলাম।

হল ফাটানো করতালি সিনেমার শেষে। বাংলাদেশের সিনেমা কোথায় পৌঁছেছে সেই নিয়ে হল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া মানুষদের টুকরো আলোচনা আর কিছু মানুষের মুখে শুধু একটিই শব্দ, ‘অসাধারণ।’ আমি চুপচাপ বেরিয়ে আসি হল ছেড়ে, আজ আর কোনো সিনেমা দেখব না, আজ শুধু কানে-মনে বাজবে ওই বাঁশী..

2 comments: