Sunday, October 24, 2010

পায়ের তলায় সর্ষে- মৃদু মন্দে মন্দারমণি


এ যেন ঠিক কোনো নির্দিষ্ট সৈকত নয়, বালি-ফেনায় মাখা গর্জনের নির্জনতায় এক ফালি সময়। তা লেখাও হয়েছিল সে সমুদ্রতটের কিশোরীবেলায়, আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে, ফলে এখনকার সঙ্গে হয়ত কোন মিলই নেই সেই অর্জনটুকু ছাড়া। এই সমুদ্র গায়ে মেখে জলপরী হয়ে যাই আমি, এই প্রথমবার৷
---------

হাওয়ায় উড়ুক চুল
জলোচ্ছাসে দেহের বল্কল
হোক এলোমেলো।
অন্তহীন অপেক্ষার শেষে
না হয় সমুদ্র আজ
তোমাকেই খুঁজে পেলো
অপসৃত আবরণে,
সৈকতের নির্জন সন্ধায়।

ভুলে যাও তীরে দর্শক,
মনে কর কেউ নেই;
সমস্ত সমুদ্র জুড়ে তুমি
একা, নগ্ন, অনাবৃতা। (নির্মলেন্দু গুণ)


আমার প্রথম সমুদ্রস্নানমন্দারমণিতেআমাদের চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বিচে কেউ কখনো স্নান করে নাবাড়ির কাছে আছে এক আরশিনগর কক্সবাজার কিন্তু সেথায় আমার যাওয়া হয়নি কখনও। আমাদের শহর চট্টগ্রাম থেকে মাত্র চার ঘন্টার দূরত্বের সেই সুবিস্তৃত সমুদ্রসৈকত, কিন্তু সেই দূরত্বটুকু আমার আজও পেরুনো হয়নি তাই এই ভাবে চলে আসা মন্দারমণিতে। প্রস্তূতি ছাড়াই। ঢেউ ভেঙে ভেঙে  খুব বেশিদূর এগুতে পারি না আমি৷অনভ্যস্ত পা। কষ্ট করে যাও বা এগোই ঢেউ আমাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে আসে ডাঙায়, যেন ফিরিয়ে দিয়ে যায়৷ যেন বলে, ওরে কোথায় যাচ্ছিস, ডুবে যাবি যে! আমি ভাবি বড় বড় সৈকতের কথা, পুরী, গোয়া, কোভালম আর না দেখে যে সব থেকে আপন, কক্সবাজার। আচ্ছা বিশালটা কি সে? ঢেঊ বুঝি আরো মস্ত প্রলঙ্কর কিছু। বিশাল এক ঢেউয়ের তলায় চাপা পড়ি আমি, নোনা জলে চোখ জ্বালা করে ওঠে। একই তো সমুদ্র, পড়ে থাকা বালি, দূরে তটরেখা বরাবর ঝাউ। আমি যেন কত দেখেছি। সব কিছু মিলিয়ে মিশিয়ে এক করে নিই আমি। চোখে বালি ঢোকে কিচকিচ। আচ্ছা হবে হয়ত আলাদা। সেরা কোনো একটা দিকে হবে, এত যে কবিতা-টবিতা লেখা হল, গান-টান কিছু একটা আছে হয়ত, সে দিকে মন দিই না আমি। যেন খুঁজে নিতে চাই আরো আলাদা কিছুর স্বাদ, এই মন্দারমণির সৈকতে।
সকল দেশের সেরা সৈকত
এই কক্সবাজার
বালুর চরে ঢেউ খেলে হায়
একি চমৎকার
আহা রূপের কি বাহার।

পাহাড়ে বসাইছে রাডার
আরো বাতিঘর
বালুর চরে হোটেল মোটেল
ঝিনুকের শহর
প্রেমিক যুগল জোড়া জোড়া
প্রেম করিত যারা।। (লোকগান/ইকবাল হায়দার)




ছোট ছোট চারটি গ্রাম নিয়ে এই মন্দারমণি ৷ দাদনপাত্রবার, সোনামুই, মন্দারমণি। চতুর্থ গ্রামের নামটি ভুলে গেছি৷ পাশাপাশি ছোট্ট ছোট্ট সব গ্রাম। আগে সমুদ্র বেশ দূরে ছিল এখান থেকে, এই গ্রামগুলো থেকে, ফসলী জমি থেকে, পুকুরভরা মাছেদের থেকে। ধীরে ধীরে সমুদ্র এগিয়েছে। জনপদের দিকে। ফসলের মাঠ, গৃহস্থের সংসার, ঘর-বাড়ি-পুকুর, গোয়ালের গরু, ছাগল একে একে সব সব গেছে সমুদ্রের পেটে। যেটুকু বাকি আছে, এখন তাতে মানুষের বসতি, তবে এও ক'দিন আছে বলা যায় না৷ সমুদ্রের গর্জন অহর্নিশি জানান দেয়, আমি আর দূরে নেই, একদম দূরে নেই।

সমুদ্রতীরবর্তী সব গ্রামে স্বাভাবিক ভাবেই ছিল বেশ কিছু নোনা জলের ভেড়ি৷ রোজভ্যালির মালিকেরা মন্দারমণিতে মাছের ব্যবসা করতে গেছিলেন বছর পাঁচেক আগে৷ সস্তার জমি কিনে মাছের ভেড়ি করলেন তারা৷ একটি দুটি ঘর তৈরি হল একটি গেস্টহাউস মতন৷ যেখানে মাছ কিনতে আসা লোকজন এসে রাত্রিযাপণ করতেন৷ সৈকতের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁরা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদেরও নিয়ে আসতে লাগলেন৷ ঘর বাড়তে লাগল স্ট্যান্ডবাই গেস্টহাউসের আর কিছুদিনের মধ্যেই সেই গেস্টহাউস রূপ নিল এক চারতারা হোটেলের৷ সমুদ্রের একেবারে ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সেই হোটেল৷ মাছের ব্যবসা করতে আসা রোজভ্যালি সেখানে শুরু করল হোটেলব্যবসা৷ দেখাদেখি সেখানে দাঁড়িয়ে গেল আরও কিছু হোটেল, কটেজ৷ রমরমা ব্যবসা৷শনি-রবি কোনো হোটেলে, কটেজে একটি ঘরও খালি থাকে না সেখানে এখন জানাল গার্ডেন রিট্রিট নামের রঙচঙে কটেজের কেয়ারটেকার কাম ম্যানেজার বিশুবাবু৷

পাঁচখানা ঘর নিয়ে পাঁচমাস আগে হয়েছে এই গার্ডেন রিট্রিট কটেজ৷ রাস্তার ধারে খনিকটা জায়গা গোল করে ঘিরে নিয়ে মাথায় খড়ের ছাউনি দিয়ে রিসেপশন কাম সিটিংপ্লেস৷ পাশেই একটা লম্বাটে ঘরমত জায়গা, তারও মাথায় খড়েরই ছউনি৷ চারপাশ আদ্ধেকটা ঘেরা৷ কাঠের খুঁটির উপরে দাঁড়িয়ে আছে এই খাওয়ার ঘরের ছাউনি৷ খাওয়ার ঘরের পাশেই ডানধার ধরে একের পর এক ছোট ছোট এক কামরার ঘর, কটেজ৷ সাথে একফালি বাথরুম৷ সারি দিয়ে একের পর এক ঘর, শেষমাথার ঘরখানিতে আমরা ঠাঁই নিয়েছিলাম একবেলার জন্যে৷যাওয়ার কথা ছিল না তো, হঠাৎ গিয়ে পড়া। অপরিকল্পিত সমুদ্রস্নান। এই ঘরের পেছনে কাজ চলছে আরও পাঁচখানি ঘরের৷ তবে এই ঘরগুলি ইটের৷ কাজ অলমোস্ট শেষ হয়ে এসেছে, লাল ইটের ঘরগুলি প্রায় তৈরি৷গাঢ় লাল হাফ ইটের দেওয়ালের উপর গাঢ় সবুজ দরমার বেড়া আর মাথায় সাদা অ্যাসবেষ্টাসের চাল দেওয়া এই কটেজগুলির পোষাকি নাম গার্ডেন রিট্রিট ৷ কালো কাঁচের জানালার ধারগুলো সবুজে রাঙানো৷ কালো কাঁচের মাথা নিচু দরজা আর দুটো করে জানালা৷ ঘরের ভিতরে ঢুকতেই দেখা গেল নীল আর সাদা চৌকো চৌকো খোপকাটা ছাপওয়ালা স্যাটিন কাপড়ের শামিয়ানা টাঙানো অ্যাসবেষ্টাসের নিচে৷ আধো আধো আলো আঁধারির খেলা সেখানে৷ লাল, সবুজ, নীল আর সাদা রঙের সাথে কালো কাচের দরজা জানালা৷ সব মিলে মিশে সৃষ্টি করেছে এক অদ্ভুত রঙ্গ৷ গরমটাকে উপেক্ষা করতে পারলে শুধু এই রঙের খেলা দেখেই হয়ত কাটিয়ে দেওয়া যেত একটি বেলা৷ কিন্তু না৷ এই গরমকে উপেক্ষা করা গেল না কিছুতেই৷ আসবাব বলতে এক প্রশস্ত বিছানা, ছোট একখানি কাঁচের সাইড টেবল, আর দু'খানি প্লাস্টিকের চেয়ার৷ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে চোখে পড়ে এক মরা বেগুনের বাগান৷ এবড়ো-খেবড়ো শুকনো ধুলোময় বালুমাটিতে বাগানসুদ্ধু গাছগুলো মরা৷ দাঁড়িয়ে আছে কে জানে কার, কিসের সাক্ষী হয়ে৷ কাদের এই বাগান? এই কটেজ মালিকেরই কি? এখানকার লোকেরা ব্যবসা দেখতে এতটাই ব্যস্ত, এতটাই মগ্ন যে কারোরই একটু  সময় হয়নি ঐ গাছেদের গোড়ায় একটু জল দেওয়ার৷ শুকিয়ে গেছে তাই এক বাগানভর্তি বেগুনগাছ! মরা বেগুনের বাগানের পাশেই সবুজ পত্রবহুল এক নিমগাছ৷নেহাত বড় বলে এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচেছে। কী অদ্ভুত!




এখানে দাঁড়াও এসে চুপচাপ,
কান পাতো হাওয়ার গভীরে--
প্রাণ ভরে শোনো রুদ্র সমুদ্রের গান।
শ্যামের মুরলী আজি
কী লক্ষ্যে উঠিছে বাজি রাধার বিরহে,
কল্লোলিত সমুদ্র সমান।

এখানে দাঁড়াও এসে চুপচাপ,
বসো সমুদ্রবিরহী ভূমিতলে,
তারপর নেমে যাও, ধীরে ধীরে
নিজেকে নিক্ষেপ করো জলে।
ভেবো না আমার কথা,
সংসার- সমুদ্র থাক দূরে।

স্বার্থ-সঙ্কুচিত বন্দীজীবনের
প্রাত্যহিক গ্লানির ভিতরে
প্রবেশ করিয়া রুদ্র সমুদ্রের ঢেউ
জরাজীর্ণ জীবনের তটে
আজ হানুক আঘাত দলে দলে। (নির্মলেন্দু গুণ)

মন্দারমণিতে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছোয়নি৷ তাতে কি? জেনারেটর আছে । আছে সমুদ্রের নন স্টপ সিম্ফনি। হোটেল, কটেজ সবই চলে জেনারেটরে৷ নামমাত্র খরচে যে যেভাবে পারে যেখানে সেখানে কটেজ তুলে দাঁড়িয়ে পড়েছে ব্যবসা করতে৷ দরমার বেড়া, অ্যাসবেষ্টাসের চালের মাথা নিচু সেই সব কটেজে ঢুকলে জাহান্নামের আগুনের আঁচ খানিকটা টের পাওয়া যায়৷ জেনারেটরে চলা পাখার বাতাস যেন আগুন ছড়ায় সেই কটেজে৷ যারা চার অংকে বিল মেটাতে পারবেন তাঁরা ওঠেন রোজভ্যালির চারতারা হোটেলে, সেখানে ঘরগুলো তাপানুকূল৷ আমাদের মত পাতি মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তের সম্বল ঐ জাহান্নামসম কটেজ৷

সেখানে করে খাচ্ছেন এখন বেশ কিছু মানুষ৷ কেউ বা দিয়েছেন বিস্কুট, সফট ড্রিংকস, চিপসের দোকান তো কেউ কিনেছেন গাড়ি৷ মারুতি ভ্যান, টাটাসুমো নিদেনপক্ষে একটি অ্যাম্বাসেডর৷ গাড়ি কেনার টাকা এসেছে ফসলি জমি বিক্রি করে৷ সেইসব জমি আবার কিনে সেখানে ঢালাও চলছে মাছের ব্যবসা৷ তৈরি হয়েছে সব ভেড়ি৷ বাগদা, পোনা, তেলাপিয়ারা সেখানে বড় হয় মানুষের দেওয়া খাবার খেয়ে৷ জমি বিক্রি করে যাঁরা গাড়ি কিনেছেন তাঁরাও ভালই করে খাচ্ছেন৷ দশ কিলোমিটার মতন রাস্তা কলকাতা দীঘা মহাসড়ক থেকে৷যেতে হয় চাউলখোলায় নেমে৷ ট্রেকার আর ইঞ্জিনচালিত ভ্যানরিক্সা ছাড়া যাতায়াতের একমাত্র সম্বল এই গাড়িগুলি৷ চড়া ভাড়ায় দল বেঁধে মানুষ চাপেন এই গাড়িগুলোতে৷ হোটেল, কটেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন গাড়ির মালিকেরা গাড়ি নিয়ে৷ বেড়াতে আসা যাত্রীদের পৌঁছে দিয়ে আসেন এঁরা কাঁথি, জুনপুট, দীঘা৷ দশ কিলোমিটার দূরের চাউলখোলায় যেতে একটি মারুতী ভ্যান ভাড়া নেয় দুশো পঞ্চাশ টাকা, কাঁথি নিয়ে গেলে নেয় সাড়ে চারশো টাকা৷ যাঁরা ফোন করে হোটেল-কটেজ বুক করে আসেন, তাঁরা চাইলে এই সব গাড়িগুলো এসে তাঁদের নিয়ে যায় কাঁথি, জুনপুট কিংবা দীঘা থেকে৷ ভাঙা এবড়ো-খেবড়ো রাস্তার ঝাঁকুনি কিংবা ধুলো থেকে অনেকটাই বাঁচিয়ে দেয় এই গাড়ি৷ গরমের কথা বলাই বাহুল্য৷

অনেকেই একবেলার জন্যে এসে ঘুরে যান এই মন্দারমণিতে৷ গাড়ি করে সকাল সকাল এসে ঘুরে বেড়িয়ে, সমুদ্রস্নান করে আবার ফিরে যাওয়া জুনপুট, দীঘা কিংবা কলকাতায়৷ চমৎকার দীর্ঘ সৈকত, প্রবল গর্জনে আছড়ে পড়া সমুদ্র আর দূরে বিস্তৃত নারকেল বন৷ একটু নীরবতা প্রার্থীদের বেড়াতে আসার জন্যে আদর্শ স্থান৷ সাথে গাড়ি থাকলে ঘুরে আসা যায় আঠেরো কিলোমিটার লম্বা এই বিচ, যার সাথে সাথেই এগিয়েছে নারকোলের বনও৷ গাড়ি না থাকলে চুপটি করে বসে পড়া যায় কোথাও একটা জায়গা দেখে নিয়ে৷ তবে যাঁরা রাত্রিবাস করবেন না তাঁদের এখানে বেলা বেশি না করাটাই শ্রেয়৷ নইলে মিস করতে হতে পারে কলকাতা ফেরার সাড়ে চারটের লাস্ট বাসটি৷ যেমন আমরা করেছিলাম৷ তারপর? একটি বাসের অপেক্ষায় হা পিত্যেশ! মেচেদা, হলদিয়া৷ যাহোক কিছু একটা! সময় বুঝে আকাশের কোণে জমে ওঠে ঘন, কালো মেঘ ৷ দেখতে দেখতেই তা ছড়িয়ে যায় গোটা আকাশে, দেয় গুরুগম্ভীর ডাক আর নেমে আসে অঝোর বৃষ্টি৷ রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকা, টিনের চাল ভেদ করে মাথায় বৃষ্টির ফোটারা এসে মাথায় পড়ে টুপটাপ টুপটাপ৷ কিছুই না পেয়ে অগত্যা উল্টো দিকের বাস ধরে যেতে হবে দীঘায় আর যাওয়ার আগে অবশ্যই মনে মনে একটা হিসেব করে নিতে হবে, হাতে এক্সট্রা সময় আর পয়সাকড়ি আছে তো!

মফিজুল৷ মারুতী ভ্যানের মালিক৷ নিজেই গাড়ি চালিয়ে পর্যটকদের নিয়া আসা যাওয়া করে, কাঁথি, জুনপুট, দীঘা৷ আবার ফিরে আসে মন্দারমণি৷ মফিজুলের বাড়ি সোনামুই'তে৷ গ্রামের নামটি কি সোনামুখী? না না৷ সোনামুখী নয়, সোনামুই! মফিজুলদের একসম বিঘা তিরিশ জমি ছিল৷ সম্পন্ন চাষী পরিবার৷ কিন্তু এখন আর নেই সেই জমি৷ সমুদ্র খেয়ে নিয়েছে ওদের চাষের জমি৷ এখনও খানিকটা আছে বেঁচে, বিঘে দশ মতন৷ তবে এও যেতে পারে সাগরের পেটে যে কোনো সময়৷ সময় থাকতে মফিজুল তাই বেঁচে থাকা জমিটুকু বিক্রি করে দিয়েছে মাছের ব্যবসা করতে আসা একজনের কাছে, সেই টাকায় মফিজুল কিনেছে এই গাড়ি আর একটি ট্রাক্টর৷ গাড়িটি সে নিজেই চালায়৷ ট্রাক্টর ভাড়ায় খাটে৷ যাত্রীর আশায় মফিজুল যখন দাঁড়িয়ে থাকে কটেজের সামনে তখন পরম মমতায় পালকের ঝাড়ন দিয়ে ধুলো ঝাড়ে গাড়ির গা থেকে৷ নরম কাপড় দিয়ে মুছে মুছে চকচকে করে তোলে সে তার গাড়ির শরীর৷ মফিজুলদের গ্রামে এখনও বিদ্যুৎ যায়নি৷ মন্দারমণি থেকে মাইল পাঁচেক দূরে বিদ্যুৎএর শেষ খুঁটিটি দাঁড়িয়ে আছে৷ এরপরে আর কবে এগোবে তা মফিজুল জানে না৷ তবে এগোবে এটুকু জানে৷ কারণ, যেভাবে বাইরের মানুষ মন্দারমণিতে আসছে, মাছের ব্যবসা, হোটেলব্যবসা করছে, তাদের নিজেদের ব্যবসার গরজেই তারা বিদ্যুৎএর জন্যে দৌড়-ঝাঁপ করবে আর আলো নিয়ে আসবে এটা মফিজুলের বিশ্বাস৷


-৩-
চাকমার পাহাড়ি বস্তি, বুদ্ধমন্দিরের চূড়া ছুঁয়ে
ডাকহরকরা চাঁদ মেঘের পল্লীর ঘরে ঘরে
শুভেচ্ছা জানাতে যায়, কেঁদে ফেরে ঘন্টার রোদন
চারদিকে। বাঁশের ঘরে ফালা ফালা দোচোয়ানি চাঁদ
পূর্ণিমার বৌদ্ধ চাঁদ, চাকমার মুখশ্রীমাখা চাঁদ!
নতুন নির্মিত বাড়ি সমুদ্রের জলে ঝুঁকে আছে।
প্রতিষ্ঠাবেষ্টিত ঝাউ, কাজুবাদামের গাছ, বালু
গোটাদিন তেতেপুড়ে, শ্রীতলে নিষ্ক্রান্ত হবে বলে
বাতাসের ভিক্ষাপ্রার্থী! জল সরে গেছে বহুদূর।
নীলাভ মসলিন নিয়ে বহুদূরে বঙ্গোপসাগর
আজ, এই সন্ধ্যাবেলা।
ব্ল্যাকডক মধ্যিখানে নিয়ে দুই কবির কৈশোর
দুটি রাঙা পদচ্ছাপ মেলানোর তদবিরে ব্যাকুল
ব্যর্থ আলোচনা করে, গানের সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ে,
বর্ণমালা নিয়ে লোফালুফি করে তীরে!
রুপচাঁদা জালে পড়ে, খোলামকুচির মতো খেদ
রীভীন কাঁকড়ার স্তুপ সংঘ ভেঙে ছড়ায় মাদুরে
একা একা। উপকূলে।
বুদ্ধপূর্ণিমার চাঁদ কক্সবাজারের কনে-দেখা
আলোয় বিভ্রান্ত আজ। অধিকন্তু, ভরসন্ধেবেলা! -শক্তি চট্টোপাধ্যায়
মন্দারমণি৷ এক কিশোরী, সমুদ্রতট৷ সদ্য সদ্য গজিয়ে ওঠা এই সৈকতে সবে লোকজন যেতে শুরু করেছে, নিয়মিত৷ সমুদ্র পাড়ের চেনা দৃশ্য ভ্যানিশ, না ট্রলার নৌকা, না শুটকির গন্ধ৷ স্নানাভিলাষীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে স্নান করেন সমুদ্রে৷ ঢেউএর পরে ঢেউ এসে ভাঙে আর উচ্ছ্বাস বাড়ে স্নানরত ছেলে-মেয়েদের৷ নারী ও পুরুষদের৷ বাবার হাত ধরে সমুদ্রস্নান করতে আসা ছোট্ট শিশুটি তার হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে খেলা করে জল নিয়ে, তার খিলখিল হাসির শব্দ চাপা পড়ে সমুদ্রের গর্জনে৷ সৈকতময় ভাঙা, গোটা ঝিনুকদের মাঝে ইত:স্তত দাঁড়িয়ে দু-তিনটি ডাবওয়ালা৷ সাইকেলের পেছনে ঝোলানো কাঁদি কাঁদি ডাব আর সমনে ঝোলানো বাজারের থলেতে বিয়ার৷ একটি ডাব খেতে হলে খরচ করতে হবে দশটি টাকা আর বিয়ারের দাম জানা হয়নি৷ বেলা বারোটার জ্বলন্ত সূর্যের গনগনে তাপকে উপেক্ষা করে স্নানে মগ্ন কিছু মানুষ৷ সৈকত ধরে মাঝে মাঝেই ছুটে যাচ্ছে গাড়ি৷ টাটা সুমো, কোয়ালিস, সাফারি৷ এমাথা থেকে ওমাথায়৷ কলেজ পালিয়ে কলকাতা থেকে আসা এক দল ছেলে-মেয়ে জলে হুটোপাটি করতে করতে নিজেদের মধ্যেই তামাশা করে, এখন কোন ক্লাস চলছে? আজকে কোন কোন ক্লাস ছিল? বাড়ি গিয়ে সব ঠিকঠাক বলতে হবে তো! তাদের হাসির শব্দে চাপা পড়ে সমুদ্রের গর্জন৷

আরেকটু বয়েস হলে হয়ত বলব, দিনকাল কত পালটে গেছে, ছেলে-মেয়েরা কলেজ কেটে কলকাতা থেকে মন্দারমণি গিয়ে সমুদ্রস্নান করে সন্ধেয় বাড়ি ফিরে যাচ্ছে! কিন্তু আসলে বোধ হয় খুব একটা পাল্টায়নি। আমাদের স্কুল-কলেজের দিনেও ছেলে-মেয়েরা ক্লাস কেটে বেড়াতে যেত, কর্ণফুলী নদী যেখানে বঙ্গপোসাগরে গিয়ে মিশেছে, সেই মোহনায়, পতেঙ্গা বিচে, কর্ণফুলী থেকে সাম্পান ভাড়া করে দল বেঁধে মোহনার উত্তাল ঢেউয়ের মাথায় চড়ে ছোট্ট আনোয়ারা দ্বীপে আমরাও গেছি। কিন্তু সাগরে স্নান করার কথা কেউই ভাবিনি।
ছোড ছোড ঢেউ তুলি পানিত
লুসাই পাহাড়ত্তুন লামিয়ারে
যার গই কর্ণফুলী।…
পাহাড়ি কন সোন্দরী মাইয়া
ঢেউওর পানিত যাই
সিয়ান গরি উডি দেখের
কানর ফুল তার নাই
যেইদিন কানর ফুল হাজাইয়ে
হেইদিনত্তুন নাম কর্ণফুলী।। -চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান
বেড়ানোতেই আনন্দ! চট্টগ্রাম শহর থেকে পতেঙ্গা বিচ খুব কাছে বলে উইকেন্ডে বরাবরই খুব ভিড় হয় বিকেলবেলা। তবে স্কুল বা কলেজ পালানো ছেলে-মেয়েরা উইকএন্ড বা বিকেলবেলায় তো যেত না, ক্লাসের সময় হিসেব করে যাওয়া, ছুটির সময় হিসেব করে বাড়িতে ঢুকে পড়া।

এখন যেমন বিশাল বিশাল বোল্ডার ফেলে ঘিরে দেয়া হয়েছে গোটা পতেঙ্গা বিচ, তখন ওরকম ছিল না, কিছু বড় আকারের পাথর তখন ছিল রাস্তার শেষমাথায়, যেখানটায় বিচ শুরু হয়েছে। জোয়ারের ঢেউ অবিরাম আছড়ে পড়ে পাড় ভেঙে দেয় বলে। কিন্তু সেগুলো লাফিয়ে পেরিয়ে দিব্যি নেমে যেতাম বালুকাবেলায়। হেঁটে চলে যেতাম দূরের ঝাউবনে। কে কার সঙ্গে আছে সেটা কারোরই খেয়াল থাকত না। সবাই যে যার মতো হাঁটতে থাকত যেদিকে মন চায়। চটি হাতে নিয়ে আলতো পায়ে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাওয়া, খানিকটা ঢেউয়ে পা ভিজিয়ে আবার বালির উপর দিয়ে হাঁটা। ঝাউবন পেরিয়ে ওধারের বিচে একলা যেতে খানিকটা ভয় ভয় করত নীরবতার জন্যে।

যখন তখন বঙ্গপোসাগরে নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ, অতি গভীর নিম্নচাপ তৈরি হয়ে, ঝড় উঠে পড়ে বলে প্রায় গোটা বছরই একটা ছোটোখাটো সিগন্যাল ঝুলিয়ে রাখে আজকাল আবহাওয়া দপ্তর, বন্দর কর্তৃপক্ষ। ঝড়ের আকার-প্রকার বুঝে বাড়ে-কমে সিগন্যালের নম্বর। সেই সব ঝড় যখন আছড়ে পড়ে লোকালয়ে, সঙ্গে করেই নিয়ে আসে জলোচ্ছ্বাস। শহর থেকে দশ মাইল দূরের এই কর্ণফুলী আর বঙ্গপোসাগরের মোহনা তখন সত্যিকারের ভয়াবহ হয়ে ওঠে, পনের-ষোলো ফুট কখনও বা আরো বেশি উঁচু জলোচ্ছ্বাস যখন আসে তখন কারোরই কিছু করার থাকে না কিন্তু ছোটোখাটো ঢেউ বা জলোচ্ছ্বাস যেন কর্ণফুলীর তীর ধরে গড়ে ওঠা ন্যাভাল একাডেমি বা পতেঙ্গা বিচকে ভাসিয়ে না নিতে পারে সেজন্যে বিশাল বিশাল চৌকো কংক্রিট আর সিমেন্টের বোল্ডার দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে পতেঙ্গা বিচ আর শহরের মাঝখান থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তার ধার ধরে বয়ে চলা কর্ণফুলীর ধারকে। কর্ণফুলীর এই পারে শুধু বোল্ডার ফেলেই নিশ্চিন্ত হওয়া যায়নি, মোটা তারের জাল দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে পাথর আর বোল্ডারকে।
রাঙামাটি পাহাড়ি কন্যা
খোঁপায় রাঙা ফুল
সেয়ান গইত্যে আই হাজাইয়ে
তার কানর কর্ণফুল
কাইছা খালর নাম হইয়ে ভাই
হেদিনত্তুন কর্ণফুলী
দেশ বিদেশের কত জাহাজ
এই না নদীর তীরে
নানারকম পণ্য লইয়া
বন্দরত ভিড়ে
নৌকা সাম্পান উজান ভাটি
নানা রঙের পাল তুলি।। -মোহনলাল দাশ/লোকগান
সে সব বন্ধুদের সঙ্গে পালিয়ে সমুদ্রে যাওয়ার কথা। বাড়ির লোকেদের সঙ্গে অফিশিয়ালি সমুদ্রে যেতাম ভোরবেলায়। সূর্যোদয় দেখতে। আজান শোনামাত্র ঘুমচোখে ঝটপট তৈরি হওয়া, হই হই করে ভাই-বোনেরা সব একে ডেকে তাকে তুলে গাড়িতে করে পতেঙ্গা। তখনও দু-একটা চায়ের দোকান ছিল সেখানে, বিচের ধার ধরে। পরোটা ভাজি আর চা খেয়ে বিচে নেমে পড়া। না। সমুদ্রস্নান করার কোনো সীন এখানেও নেই। আমরা জলের ধার ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, ঢেউ এসে পায়ে ভাঙত। তাতে করে যেটুকু জামা-কাপড় ভিজত তাতেই আমাদের আনন্দের সীমা থাকত না। ভিজে কাপড়ে চটি হাতে নিয়ে আমরা সুনসান বিচে হেঁটে বেড়াতাম। কাছে-দূরে দেখা যেত আরও দু-এক পিস গাড়ি, সেই গাড়িগুলো থেকে নেমে আসা ছেলেদের থেকে আমরা দূরত্ব বজায় রাখতাম সযতনে। সমুদ্রের দিকে তাকালে দেখা যায় কাছে-দূরে নোঙ্গর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য জাহাজ। আকাশ পরিষ্কার থাকলে তাদেরকেও পরিষ্কার দেখা যায়, নইলে ধোঁয়া ধোঁয়া ধূসর কুয়াশার চাদর ভেদ করে শুধু জাহাজের আকৃতি দেখা যায়, দূর থেকে মনে হয় যেন স্থির দাঁড়িয়ে আছে জলে। ছোটো জাহাজগুলো কাছে থাকে বলে তাও খানিকটা দেখা যায়, কিন্তু বড় জাহাজগুলো দাঁড়িয়ে থাকে একেবারে দৃষ্টিসীমার শেষমাথায়, গভীর সমুদ্রে, নজরে আসে শুধু তাদের আকৃতি। বিদেশি জাহাজ সব, মাল-পত্র নিয়ে এসেছে চট্টগ্রাম বন্দরে নামাবে বলে। আকারে অনেক বড় বলে মোহনা পেরিয়ে কর্ণফুলী নদীর উপরে বন্দরে ঢুকতে পারে না, ছোট বোটে করে মাল নামিয়ে বন্দরে পাঠিয়ে দিয়ে ফিরে যায় যেখান থেকে এসেছে সেখানে। ছোট জাহাজগুলো সোজা চলে আসে বন্দরে। পতেঙ্গা যাওয়া-আসার পথে কর্ণফুলী নদীতে দেখা যায় সার সার মালবাহী জাহাজ, দেশি বিদেশি জাহাজ সব, এম ভি খন্দকার, বীর সৈনিক বজলুর রহমান, বীর জামাল হোসেন, শেখ কালু, ফজলুর হক জলিল, এম ভি সৈকত, হেলেন অফ ট্রয়, সিগাল ইত্যাদি। আরো অনেক জাহাজ যেন দৃশ্যপট জুড়ে সারসারে ছড়ানো, অনেক রকম নামের অগুন্তি, অসংখ্য জাহাজ।

 
-৪-

আমি এরকম কিছুই পাইনি, কমল পেয়েছে কড়ি,
শিশির পেয়েছে শঙ্খ, আর নীরা যা চেয়েছে তা-ই।

দেখে দেখে অবাক হয়েছি আমি,
এ যেন সমুদ্র নয়, স্রেফ কোনো পোষা হাতী,
কিংবা কোনো আলাদীন সার্কাসের বাঘ।
না কড়ি, না শঙ্খ, না শামুক,
আমার দু চোখে শুধু শস্যমগ্ন সমুদ্রের জল।

দ্যাখো- দ্যাখো কী সুন্দর অস্ত- বলতেই
পশ্চিমের সমুদ্রের ক্ষুধা গিলে খেলো পূর্বের সূর্যকে।
অমিত, শিশির, নীরা, আবছার, শাজাহান,
বন্দী হলো কমলের ক্লিকে। তারপর কয়েক মুহূর্ত
শব্দহীন, সমস্ত সৈকত জুড়ে স্তব্ধ নীরবতা।
আর কোনো ছবি নেই।

হঠাৎ তাকিয়ে দেখি আমার পাশেই নুড়ি কুড়াচ্ছেন
বৃদ্ধ নিউটন, তার হাতে সায়মন হোটেলের চাবি। (নির্মলেন্দু গুণ)


ছোট বড় নানা সাইজের নানা আকারের অজস্র অজস্র ঝিনুক ছড়িয়ে আছে এই মন্দারমণির সৈকতে৷ কুড়িয়ে নেওয়ার কেউ নেই ৷ প্রতিটি ঢেউএর সাথেই আসছে আরও ঝিনুক৷ ছোট্ট নুড়ির মত দেখতে আস্ত ঝিনুকও দেখলাম কিছু কিন্তু অ্যাত্ত নরম! হাতে নেওয়ামাত্রই সেগুলো ভেঙে যায়৷ সৈকতে যদ্দূর ঢেউ আছড়ে পড়ছে, তদ্দূর অব্দি বালি ঠান্ডা, ভেজা ভেজা৷ আর তারপরেই শুকনো তপ্ত বালি৷ খালি পা রাখতেই মনে হল যেন ফোস্কা পড়ল পায়ে! এই গরম বালিতেও কিছু মানুষ বসে আছেন৷ কেউ বেড়াতে এসেছেন, কেউ বা ওখানকারই লোক৷ দুজন মানুষকে দেখলাম খানিকটা বালি সরিয়ে তাতে প্লাষ্টিক বিছিয়ে জল ঢেলে দিয়েছেন দু-তিন গামলা৷ ছোট্ট, খুব ছোট্ট এক পুকুর যেন! তাতে কিলবিল কিলবিল করছে ভীষণ ছোট্ট সব মাছ, ইঞ্চি দুই-তিন লম্বা সাপ৷ মানুষটি বসে বসে কিছু একটা বেছে আলাদা করছেন আর সেই আলাদা করে তুলে রাখা অতি ক্ষুদ্র মাছগুলি তুলে রাখছেন পাশেই রাখা প্লাস্টিকের গামলাভর্তি জলে৷ খানিক দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করেও বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করব ভেবেও কিছু বললাম না, একাগ্র মানুষটির মনযোগ নষ্ট করতে মন চাইল না বলে৷ ডাবওয়ালারা ভিজে গামছা গায়ে মাথায় জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে গরম বালিতে৷ বিচের দিকে এগুনো যে কোনো মানুষকে দেখেই এগিয়ে আসছে তারা সাইকেল নিয়ে, ডাব খান বাবু ডাব৷ ডাব খাবেন না? তবে বিয়ার খান! তোমরা বিয়ারও রাখো? জানতে চাইলে জবাব এলো, হ্যাঁ দিদি, রাখি৷ যা চান সবই পাবেন! কি চাই বলুন!

চারিদিকে তাকিয়ে দেখি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বেশ কিছু মানুষ৷ কেউ বসে আছেন একেবারে জলের ধারটি ঘেঁষে, কোলে একেবারেই ছোট বাচ্চা৷ কর্তা গিন্নি দুজনেই জলের ধারে বসে আছেন৷ ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিলে যেটুকু স্নান হয় ওটুকুতেই তারা খুশি৷ স্কুলপড়ুয়া তিনটি ছেলে হাতে একটা বল নিয়ে নেমে গেছে অনেকটা জলে৷ ঢেউএর সাথে সাথে ওরা ডুবছে ভাসছে৷ হাতের বল ছুঁড়ে দিচ্ছে একে অন্যের দিকে, গায়ে না পড়ে বল পড়ে যাচ্ছে জলে আর ঢেউয়ের মাথায় চড়ে সেই বল সরে যাচ্ছে ছেলেগুলোর থেকে দূরে। ওরা হুল্লোড় করতে করতে জলের উপর গা ভাসিয়ে পৌঁছুনোর চেষ্টা করছে বলের কাছে। বল হাতে এলেই আবার ছুঁড়ে দিচ্ছে কখনও সঙ্গীর দিকে তো কখনও আরেকটু দূরে গভীর জলের দিকে আর তারপর মহানন্দে ঢেউয়ের মাথায় চড়ে চড়ে যাচ্ছে সেই বল আনতে।  মাঝে মাঝে দেখাও যাচ্ছে না ওদের৷ আবার দেখা যায়, ঐ যে! ওরা লাফাচ্ছে বলের পেছনে! আমার মনে হল, এভাবেই তো সমুদ্রে স্নান করতে এসে ডুবে যায় অনেকে৷ মাঝে মাঝেই খবরের কাগজে থাকে সেই সব খবর৷ কিন্তু ঐ বাচ্চাগুলোর কোনোদিকে কো্নো খেয়াল নেই৷ বিশাল উঁচু উঁচু ঢেউএর মাথায় চেপে চেপে তার চলে যাচ্ছে দূরে আরও দূরে!

একটু উঁচু জায়গায় চটি রেখে এগিয়ে যাই জলের দিকে৷ ঝিনুক কোড়োতে কুড়োতে৷ দু'হাত ভরে ওঠে নিমেষেই৷ এত ঝিনুক এতো এতো ঝিনুক! এক সময় মনে হয়, থাক, কী হবে! ক'টা ঝিনুক আমি সাজিয়ে রাখব? থাক ওরা এখানেই৷ সমুদ্র এখানে খুব কাছে ডাঙা থেকে৷ খুব খুব কাছে৷ বিছিয়ে আছে এক সাগর জল নিয়ে৷ শুয়ে আছে৷ ঘোলাটে জল নিয়ে ধুসর সমুদ্র বিছিয়ে আছে দৃষ্টিসীমার বাইরে অব্দি৷ এই সমুদ্রকে, এই বিছিয়ে থাকা বিস্তীর্ণ জলরাশিকে এখানে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়৷ সত্যি সত্যিই ছোঁয়া যায়! হাতে নেওয়া যায় আঁজলাভর্তি জল৷ যদিও নিমেষেই আবার তা গড়িয়ে নেমে যায় সাগরেই! একমুঠো বালি তুলে আনি আমি জলের ভেতর থেকে, মুঠো খোলার আগেই বালি নেমে যায় জলের সাথে৷ আমি দেখতে পাই আমার হাতে ছোট্ট এক নুড়ি আর একটা ছোট্ট ঝিনুক, জ্যান্ত! আমি ওকে আবার জলেই ফিরিয়ে দিই, নুড়িটিকেও৷ এই সমুদ্র গায়ে মেখে জলপরী হয়ে যাই আমি, এই প্রথমবার..





গুরুচণ্ডা৯-র উৎসব সংখ্যায় প্রকাশিত

6 comments:

  1. পড়লাম.... বেশ ভালো লাগলো।
    কিন্তু ফন্ট সমস্যার কারনে পড়তে একটু কষ্ট হয়েছে !

    প্রশান্তিতে থাকুন নিরন্তর............

    ReplyDelete
  2. ধন্যবাদ আহমেদ।

    ফন্টের কি সমস্যা জানালে সমাধানের চেষ্টা করতে পারি।

    ReplyDelete
  3. Anonymous7:26 PM

    waves at maandarmoni is not harsh. vary gentle unless there is a storm. that's my experience. Puri waves are good to play with if one knows swimming. Puri sea is unsuitable for Saree clad ladies.

    ReplyDelete
  4. এমন বর্ণনা করার ক্ষমতা যার তার তো শুধু লিখে যাওয়াই উচিত, শুধুই লিখে যাওয়া। আমার থাকলে আমি যা করতাম। কতবারই তো গেছি পতেঙ্গায়, কক্সবাজারে, লিখব কি, দেখিই না চারপাশটা ভালো করে।
    খুব ভালো লাগল। আপনার চোখে যা পড়ে তা-ই ধরে রাখে আপনার সংবেদনশীল মন। লেখা আপনিই এসে পড়ে। এমন লেখা যেখানে যত দেখব, না পড়ে পারব না বলেই মনে হয়।

    ReplyDelete