Sunday, October 03, 2010

আমি লিখছি, আমি লিখছি তোমার ঠিকানায়

ঋতুবদলের সাথে এখন আর বদলায় না জলবায়ু। আশ্বিনে চৈত্রের গরমে পুড়ছে আমার ঘরের ছাদ, দেওয়াল আর আমি। বাইরে থই থই রোদ্দুর, নিস্তরঙ্গ দুপুর। কাক-পক্ষীও ডাকে না কোথাও। ফ্লাইওভারের মাঝখানে শুধু ক্রমশ উচ্চতায় বাড়তে বাড়তে অতিকায় এক দানবের চেহারা নেওয়া বাড়িটায় লোহা-লক্কড়ের ঠুক-ঠাক, যন্ত্রের ঘরর ঘরর ঘরর ঘরর শব্দ ভেঙে দিতে থাকে এই নৈঃশব্দকে। এই ক’দিন আগেও বারোমাস এখানে পাখিদের ডাক, তাদের গান, তাদের ঝগড়া আর প্রেম শোনা যেত, দেখাও যেত। রান্নাঘরে কাঠবেড়ালি যখন তখন ঢুকে পড়ত খাবারের খোঁজে। এই নিঃঝুম গ্রামের মত জায়গাটায় এখন শুধুই চারতলা সব বাড়ি। পক্ষীকুল হারাইয়াছে তাহাদের ঠিকানা। আমি হারিয়েছি ভোরের কুজন, নিঝুম দুপুরে পানকৌড়িদের জলকেলি আর আমার খোলা জানালা..

সেই কবে থেকে একটা চিঠি লিখছি। লিখেই চলেছি। একটা একটা করে অক্ষর, অক্ষর জুড়ে জুড়ে শব্দ। চিঠিটা পৌঁছায় না তোমার ঠিকানায়। হারিয়ে যায় কোথাও, মাঝপথে। নাকি আমিই ডাকে দিই না সে চিঠি? জানি না.. উত্তর আসে না কোনো.. সময় বয়ে যায়, কত কথা, নদী পথ হারায়, হারায় গতি, দিনের আলোর অন্ধকারে বসে থাকি নির্বাক, অর্থ খোঁজা শুরু করি বুঝে না ওঠা এই জীবনের..  ধুশশ.. কি হবে খুঁজে..

০২
দিকে দিকে আগমনী। আগমনী বললেই আমার যদিও মনে পড়ে যায় কিছু তেতো স্মৃতি।  তবু, তবুও বাতাসে বাজে আগমনী। এবছর এখনও কাশের দেখা আমার মেলেনি। এক সময় আমার বন্ধ হয়ে যাওয়া জানালার ওপাশেই দেখা মিলত তাদের, আশ্বিনে। এখন যেখানে বাতাসে হেলানো বারান্দায় দড়িতে ঝোলে শাড়ি-জামা-গামছা। 

পুজো শপিং। জনস্রোত বিদ্যাসাগর সেতু পেরিয়ে ওপারে, শহরে, ছুটির কলকাতায়। ঠাই নেই ঠাই নেই। মেয়ো রোডের উপর থেকে ময়দান পেরিয়ে নিউ মার্কেটের দিকে হাঁটার প্রয়োজন হয় না, ভীড়ই ঠেলে নিয়ে যাবে তোমাকে। কে বলবে আজ গান্ধী জয়ন্তী, ন্যাশনাল হলিডে! খুচরো কাজ আজ থাক। ত্বরিৎ পায়ে ভীড় ঠেলে আমি আবার উল্টোপথে।

০৩
ফোনের ওপারে অদ্রীশ’দা, মৌ’দি। ‘আইলো নকশা পিঠায় চড়িয়া’র উচ্ছসিত প্রশংসায় আমি ভেসে যাই, যদিও নিজেই জানি, অতখানি প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য ওই লেখা কিছুতেই নয় তবুও মন ভরে যায়, আমি ভেসে যাই গঙ্গার উপর দিয়ে, দূরে, কোনো এক শঙ্খচিল শালিকের দেশে। মনে মনে আমি তখনও লিখছি এই চিঠি, তোমাকে। কতকাল কিছু লিখি না বলতো?

দুপুরবেলায় রামস্বামী জানতে চায়, কী লিখছি? কিছুই লিখছি না শুনে বলে, সে আবার কী! সে ইংরেজীতে অনুবাদ করতে চায় ‘তিতাস কোনো নদীর নাম নয়’কে। কিন্তু বাঙাল ভাষায় লেখা জায়গাগুলোয় গিয়ে আটকে যায়, আমাকে বসতে বলে ওর সঙ্গে, সেই কবে থেকে বলে আসছে। আমার আর সময় হয় না। এবার একটু সময় দিলে হয়।

০৪
রশীদ খান। আওগে যব তুম সাজনা, আঙ্গনা ফুল খিলেগা। কানপুরের অমিত মজুমদার গানটা ইলেকট্রনিক চিঠিতে জুড়ে দিয়ে পাঠিয়েছিল সেই কবে। কি করে যেন এই গানটা গুলাম আলীর গজলের ফোল্ডারে ঢুকে পড়েছিল। মন খারাপের দুপুরবেলায় যখন গুলাম আলী শুনছি, তখন বেজে ওঠে এই গানটা। মনে পড়ে যায় রবীন্দ্র সদনে দেখা ও শোনা রশীদ খানের গান। দুঃখ হয়, এই সেদিন নজরুল মঞ্চে গুলাম আলী আর রশীদ খানের যুগলবন্দীতে যেতে পারিনি বলে। কতবার ভাবলাম, একবার যাই, গুলাম আলী শুনব সামনে বসে। কিন্তু না। হলো না। যেমন হয় না অনেক কিছুই। তেমনি সামনে বসে শোনা হলো না গোলাম আলীও।

০৫
তামান্না বলেছিল দুটো লিস্ট বানাতে, একটা লিস্টে চেনা লোকেদের নাম লিখতে আরেকটা লিস্টে আমার স্বপ্নগুলোকে লিখতে। প্রচুর প্রচুর গল্প শোনালো তামান্না এই কদিনে। প্রচুর স্বপ্ন আর প্রচুর গল্প। আমি খুব একটা মাথা কখনই ঘামাই না স্বপ্ন নিয়ে কিন্তু কাল রাতে ভাবলাম। অনেক রাত অব্দি জেগে জেগে ভাবলাম। স্বপ্ন দেখার চেষ্টা করলাম এবং সেই স্বপ্ন দেখা এবং সেটা পূরণ করার জন্যে আমি কি কি করতে পারি সেটা ভাবার চেষ্টা করলাম। এবং অদ্ভুতভাবে আবিস্কার করলাম, আমার কোনো স্বপ্ন নেই! আমার এমন কোনো স্বপ্ন নেই যা আমি পূরণ হওয়ার স্বপ্ন দেখি! চেনা লোক? সারি সারি সব নাম। কিন্তু চেনা কি আদৌ? নাহ। কাউকেই চিনতে পারি না। লিস্টি গেল চুলোয়। স্বপ্ন নেই, চেনা মানুষ নেই, কিচ্ছু নেই? কথাগুলো তামান্নাকে বলতে হবে।

একটা স্বপ্ন আমি খুঁজে পেতে বের করলাম, কিন্তু সেটাও আমি নিজে দেখিনি, মালু-অমিতাভ মালাকার দেখিয়েছিল। কিন্তু কথা হলো, ওটা কি আদতে কোনো স্বপ্ন? ওটা তো আমার কাজ, যা আমি করছি এবং করব। মোটামুটি কম-বেশি চারশো পাতার একটা বই। প্রায় আদ্ধেক হয়ে পড়ে থাকা লেখাটা নিয়ে গড়িমসি করছি বলে রেগে গিয়ে একদিন একটা ডিকশনারি হাতে নিয়ে মালু দেখিয়েছিল, এই দেখো, এই রকম হবে বইটা, দেখতে পাচ্ছো? হুঁ। দেখতে পাচ্ছিলাম এবং হরদম পাই। মালুকে কথা দিয়েছিলাম, অক্টোবরে শেষ করব। সে ছিল এপ্রিল মাস, দেখতে দেখতে অক্টোবরও এসেই গেল আর এই অক্টোবরে অন্তত সেটা শেষ হওয়ার কোনো চান্স নেই..

1 comment: