Wednesday, February 17, 2010

লিখব ভাবলেও লেখা হয় না- কলকাতা বইমেলা


কিছু কিছু জিনিস আছে যা অনেক বলেও যখন কাউকে বোঝানো যায় না তখন নিজেই নিজেকে বোঝাতে হয়, কেউ বুঝবে না বলে। তখন নিজেকে সরিয়ে নিতে হয়, হেথায়, হোথায়। ভেতরকার দায়িত্ববোধ, ভালবাসা যখন কিছুতেই স্বস্তি দেয় না তখন আবার আপোস। ফিরে চল মন মিছে হাসি, মন না চাওয়া সব কথার জগতে।

বইমেলা নিয়ে রোজ লিখব বলে ভেবেও লেখা যাচ্ছে না। ব্যস্ত আছি বলাটা খুব একটা সত্যি নয়। অনেকে সারাদিন কাজ করেন, বাড়ি-অফিস-ছেলে-মেয়ে আর আরও সব আনুষঙ্গিক কাজ কম্মো করেও ঠিক সময় বের করে লেখেন। আমি একজন বেকার মানুষ। চাকরি-বাকরি কস্মিনকালেও করিনি, বাড়ি ছানা-পোনা আর অলস গুলতাপ্পি। এই আমার জীবন। মাঝে মাঝে কম্প্যুটারে টাইপ করতে বসি, সক্কলকে বলি, লেখালেখি করছি আর নিজেও বেশ আত্মপ্রসাদ অনুভব করি। আসলে কোনোকিছু করি না বলে কেউ যেন খুব ফ্যালনা না ভেবে বসে তাই এই টাইপে যাওয়া। আমার ছেলেমেয়েরাও আমাকে এভাবেই দেখে অভ্যস্ত, মা সারাদিন অলস সময় কাটায় আর মাঝে মাঝে বসে টাইপায়। হঠাত্ করে পরপর এই মেলা নিয়ে আমার দৌড়ুনো দেখে ওরাও তাই বেশ খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা। কারণ রোজকার নিয়ম-কানুন সব ঘেঁটে ঘন্ট। ছেলের উচ্চমাধ্যমিকের টেষ্ট পরীক্ষা চলছে রোজ, আর মা ভালো মায়েদের মত ছেলেকে সঙ্গ দেওয়া ছেলের দেখাশোনা না করে প্রবল ব্যস্ততা দেখিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু ছেলে আমার সত্যি বুঝদার। মা কিছু একটা কাজ করছে জেনে নিয়ে কোনো বায়না তো করছেই না বরং রোজ রাতে ফিরে এলে খোঁজ খবর নিচ্ছে, কত বিক্রি হলো, আমার দিন কেমন কাটলো, আমি খেয়েছি তো দুপুরে? যেখানে নেটওয়ার্ক সমস্যার জন্যে আমি সারা বিকেল-সন্ধ্যা একবার ফোন করেও খোঁজ নিতে পারছি না সে কখন ফিরলো, পরীক্ষা কেমন হলো। এই যেমন ঠিক এক্ষুণি সে এসে জানতে চাইল, মা নো মেলা টুডে?


টুকরো কথা-মেলা কথা


এত ভ্যানতারা করলাম কিন্তু আসল কথাই বলা হয়নি। গতকাল সোমবারের মন্দার বাজারেও গুরউচন্ডা৯ বেশ ভাল জায়গায়। চটি-কাগুজে গুরু দুইয়েরই বেশ ভালো চাহিদা এবং বিক্রি। হতেই হবে, বিক্রেতা যেখানে শাহজাদী, জো বোউলার!

এক চটি- 'পূর্ব প্রকাশিতের পর'এর লেখক, যিনি এখানে বর্তমান, তাঁর কাছ থেকে বেশ কয়েকজন সইও চেয়ে নিলেন। লেখক বেশ গম্ভিরমত মুখ করে স্কেচ এঁকে সই করে দিলেন। বইয়ে সই করা দেখে পাশ থেকে কাগুজে গুরু বাড়ি দিলেন একজন, আমাকেও সই করে দিন, আর অমন স্কেচও এঁকে দিন! তাঁকে বলা হলো, বই কিনুন সই-স্কেচ সব করে দিচ্ছি। বই না কিনেও তিনি সই পেলেন ম্যাগাজিনে।

চা খেতে গিয়ে সেখানে দেখানে হলো এক মুখচেনা ভদ্রমহিলার সাথে, আসবে না আমাদের টেবিলে? চলো চলো! হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো চটির ব্যাগ:-)

এক ব্যাগ চটি এত কম দামে পেয়ে অনেকেই বেশ অবাক! আরেকজন বললেন, এত খচ্চাই যখন করলেন, তখন একটা ব্যাগও তো রাখতে পারতেন, এই যে মুখে বলছেন, একব্যাগ চটি, সত্যিই যদি ব্যাগে দিতেন, কত ভালো হতো!

কাল আমি স্মার্টলি গুরুচন্ডা৯ হয়ে গেলাম। মানে ঐ ওর্কুটের প্রোফাইল যিনি মেইন্টেন করেন আর কি:-) এতদিন ধরে সমানে বলে যাচ্ছিলাম, আমি তো নইই, কোনো মহিলাও নেই ঐ প্রোফাইলের পেছনে। এবং মাত্র একজনও নয় , বেশ কয়েকজন আছেন ওই প্রোফাইলের পেছনে, যার যখন সময় হয়, সে তখন বসে পড়ে:-) কিন্তু গুরুর নাছোড়বান্দা ওর্কুটবন্ধুরা কিছুতেই সেটা বিশ্বাস করবে না। তো কাল আর সেই চেষ্টাও করিনি, হেসে মাথা নেড়েছি, তিনি বুঝে গেছেন, আর হাসিমুখে এক ব্যাগ চটি, এক সেট কাগুজে গুরু নিয়ে গেছেন..

কাল ব্যাঙ্গালুরুর ভুতোবাবু মেলায় এসেছিলেন। তিনি নাকি ১০বছর পর বইমেলায় এলেন! প্রচুর বই কিনলেন, যেগুলোর অর্ডার তিনি লুরু থেকে নিয়ে এসেছিলেন।

আমরা ফেরার সময় খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম কে সি পালকে, তার থিয়োরি লেখা কাগজ নেবো বলে। দীপুর একপিস চাই। না পেয়ে ভাবলাম, কাল দেখব। ওমা! রাস্তাতেই তো কতো পড়ে আছে! লোকজন হাতে নিয়ে যেগুলো মুচড়ে ফেলে দিয়ে গেছে! তো সেই দোমড়ানো কাগজ দু পিস তুলে বড় ভালবেসে সেগুলোকে সোজা করে ভুতোর ব্যাগে ভরে দেওয়া হলো দীপুর জন্যে..


ও। আমরা একপিস চটিও কিনলাম ফুটপাথের চটির দোকান থেকে, দশ টাকায় যেখানে বিক্রি হয় সমস্ত চটি। আমার ভদ্রলোকটি কিনলেন এসএমএসের চটি। সহজ বাংলা এসএমএস।

(পরে আবার হবে)

Sunday, February 07, 2010

কাগুজে গুরুর বইমেলা অভিযান

প্রথম ও দ্বিতীয় দিন
------------------

এদিকে গুরুগণ বইমেলা- বইপত্তর নিয়ে নানারকম প্ল্যান প্রোগ্রাম, সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে চরম ব্যস্ত। আমার বাড়িতেও তুমুল ব্যস্ততা। রাত-দিন ফোনাফুনি, মেলা-মেলি, টাইপা-টাইপি। ওফফ্ফ
... গুরু পাঁচ নামি নামি করছে, প্রেসে যাবে কে? আমার ভদ্রলোকটি দৌড়ুলেন বইয়ের খোঁজে, হাতে নিয়ে এক্কেবারে মেলায় যাবেন! ততক্ষণ হাতে যা আছে সম্বল তাই নিয়ে আমি গুটি গুটি পায়ে মেলার পথে। সেখানে আবার এক ডাগদারবাবু আসিবেন বলিয়া জানাইয়াছিলেন। আসবে স্যান বালিকা, টিম্ভাই। মেলার গেটে দাঁড়িয়ে বইয়ের ব্যাগ হাতে বাবাই।

প্রেসিডেন্সি আর নন্দন দু জায়গাতেই বেশ সহজেই কা গু জাঁকিয়ে বসেছিল প্রথম দিন থেকেই। চেনা জানা সব লোকজন এসেছেন, পত্রিকা নিয়ে গেছেন, চন্ডালেরা এসেছেন, জোর আড্ডা হয়েছে ক'দিন। কেডি দশ হাতে সব সামলেছেন। রং বেরঙা জামা পরে মেলা ঘুরে, বুকের পরে কাগুজে গুরুর পোস্টার সাঁটিয়ে লোক পর্যন্ত ডেকে এনে বই বিক্রি করেছেন। এতসব কান্ড করতে গিয়ে খানিকটা কাবু হয়ে পড়েছেন শরীরের হাতে। প্রেসিডেন্সি-নন্দনের মেলা শেষ হতে না হতেই আবার অসুস্থ শরীর নিয়ে জুটে গেছেন নিখিল বিশ্ব বঙ্গ ভাট সম্মেলনের আয়োজনে। সেটাকেও সম্পন্ন করেছেন সফলভাবে। কিন্তু শরীর বলে, বাবাজী। মেলা হয়েছে, এবার একটু আরাম দাও আমাকে। ব্যস। কাবলিবাবু কাবু! ফলে যা হল, কলকাতা বইমেলায় গুরুচন্ডা৯ যাত্রা শুরু করল কাবু কাবলি মুখার্জীকে ছাড়াই।

কোথায় মমার্ত কোথায় কী। মেলায় শুধু ধুলো আর ধুলো। দু মাস লাল রঙের চোখ রাঙানি সহ্য করে সদ্য সেরে ওঠা চোখে আমার তুমুল জ্বালা ধুলোর ঝাপটা খাওয়ামাত্রই। উবুদশ খুঁজে পাবো না আমি জেনেও ডান-বাঁ কিছুই না বুঝে শুধু ঘুরে বেড়াই বেদিশার মতো। সাথে ঘোরে বেচারা বাবাই, যে কিনা আমার থেকেও বড় বেদিশা
: -( না পাওয়া যায় মমার্ত, না উবুদশ। সামনে দিয়ে কে বেরিয়ে যায়? সেও কি যেন খুঁজছে। মমার্ত কি? ঠিক! স্যানও মমার্ত খুঁজে বেড়াচ্ছে। সেখানেই ডাগদার্বাবু আমাদের সঙ্গীতাকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন যে! এগলি ওগলি সেগলি কোথাও নেই কাঙ্খিত মমার্ত। অগত্যা ডাগদারবাবুই এগিয়ে আসেন মেক্সিকোর পতপত করে উড়তে থাকা রঙীন কাপড়ের বিশাল ঘেরের প্যাভিলিয়ন পেরিয়ে।

বহুদিন বাদে দেখা সঙ্গীতার সাথে। ছোট্ট করে খানিক আড্ডা। আবার খোঁজ। উবুদশ। ভর্সা আছে মনে, পেয়েই যাব। তবে আমার ভাগ্য খুব ভাল কিনা তাই তখনও মেলায় পৌঁছননি অসিতদা। একমাত্র ভর্সা যাঁর পরে, মেলায় খানিকটা জায়গা তাঁর হাত ধরেই করে নেবে গুরুচন্ডা৯। ভাটুরেগণ ঢুকে যায় বইয়ের দেশে, বইয়ের ব্যাগ নিয়ে আমি উবুদশে, অসিতদা কখন আসবেন। আমার বেজার মুখ দেখেই হয়ত উবুদশের জাঁদরেল সম্পাদকের খানিকটা মায়া হয়, তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যান লিটল ম্যাগ কর্নারে, যেখানে পরবর্তী ১২দিন অধিষ্ঠান করবে কাগুজে গুরু। অসিতদার ব্যবস্থামত গুরুচন্ডা০ খানিকটা জায়গা পেয়ে যায় কণিকার টেবিলে। সহদৃয় অরিজিত বলেন, আপনি বসুন এই টেবিলেই, যতক্ষণ-যদ্দিন আপনাদের টেবিলের ব্যবস্থা না হয়। মনে প্রচন্ড ভয় তখন, যদি আদৌ টেবিল না পাওয়া যায়? অরিজিত বলেন, না পেলে এখানেই বসবেন আর কি। খানিক নিশ্চিন্ত হয়ে আবার সন্ধান, এবার ডাগদারবাবুগো। তাদের যদিবা পাওয়া যায় পাওয়া যায় না চায়ের কোনো দোকান। আবার খোঁজ। এদিক সেদিক। আসলে কোনো দিকেই নয়। প্রায় একই জায়গায় ঘুরপাক। অগত্যা চায়ের আশা বাদ। আমি ৬৭নম্বর টেবিলে এবং জনতা আবার বইয়ের দেশে।