Sunday, November 21, 2010

Bhupen Hazarika - Bimurto Ei Ratri Amar....

Saturday, November 13, 2010

ষোলতম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব- বৃত্তের বাইরে

ষোলতম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব। কাল ছিল দ্বিতীয় দিন। যদিও উৎসব শুরু হয়েছে দশ তারিখে আর শুরুর অনুষ্ঠান ছাড়াও একটা সিনেমা দেখানো হয়েছে সেখানে কিন্তু আমজনতার সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল না। এগারো তারিখ থেকে শুরু হয় সিনেমা দেখানো। বিভিন্ন কারণে এবারের উৎসব অনেক ছোট, সিনেমা অনেক কম, বিদেশি অতিথি, সিনেমার নির্মাতারা ছাড়াও আর যাঁরা আসেন এবার তাদের অনুপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। কিন্তু উৎসব তো উৎসবই তাই সিনেমাপ্রেমী মানুষদের উৎসাহে কোনো খামতি নেই। সেখানে হাজির বিদেশ থেকে দশদিনের ছুটিতে বাড়িতে আসা তরুনটি, উৎসবের এই সাতদিন যে কিনা উৎসব প্রাঙ্গনেই থাকবে।

আমিও সিনেমা দেখলাম। নন্দন- তিনে বাংলাদেশের একটা সিনেমা আছে লিস্টে দেখে হলে ঢুকতে গিয়েই ফ্যাসাদ। ওইটুকুনি জায়গায় একজনের উপর একজন পারে তো উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে এমন অবস্থা, হলে ঢোকার সময় ভিড়টা এত জোরে আছড়ালো দরজায় যে হলের দরজা ভেঙে গেল! নেমে অন্য কোনো হলে ঢুকব ভাবলেও সময় ছিলো না, সব হলেতেই সিনেমা শুরু গেছে ততক্ষণে। কোনোমতে হলে ঢুকে এক কোণায় এই ভেবে দাঁড়ালাম, মিনিট কয়েক দেখে পালিয়ে আসব আর টিবেটিয়ান ডিলাইটসে গিয়ে মোমো খাবো। কিন্তু আজ কপালে মোমো ছিলো না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জীবনে প্রথমবার দেখে ফেললাম চুরাশি মিনিটের সিনেমাখানি। এবং মোমো না খেতে পাওয়ার দুঃখ বেমালুম ভুলে গিয়ে নিজেকে শাবাশি দিলাম ঐ ভীড় ঠেলে ভেতরে ঢুকেছিলাম বলে এবং কিচ্ছুটি না জেনে সিনেমাটি দেখতে চেয়েছিলাম বলে।

হলের ভেতরেও চুড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। ছোট্ট হলে যে যার মত দৌড়ে সিট দখল করে নেওয়ার পরে হাঁটা চলার জায়গায় লোক বসে পড়েন, বাকি জায়গায় দরজা ব্লক করে বাদবাকি সবাই দাঁড়িয়ে। তখনও ফিল্ম এসে পৌঁছোয়নি! শেষমেশ এলো, অর শুরু হলো গোলাম রব্বানী বিপ্লবের "বৃত্তের বইরে'। বাপ্পা মজুমদারের সঙ্গীত, অভিনয়ে চেনা নাম শুধু দেখলাম- নজরুল ইসলাম বাবু।

প্রত্যন্ত গ্রামের এক বংশীবাদকের গল্প, হরিপদ বাঁশুরিয়া। পেশায় মৃৎশিল্পি। মাটির নানা রকমের পাত্র বানান আর তাঁর পালিত পুত্র মকবুল হোসেন সেগুলো বাজারে বিক্রি করেন। এই মকবুলকে একদিন এই বাজারেই কুড়িয়ে পেয়েছিলেন হরিপদ, মকবুল তখন শিশু। বাজারের একধারে বসে বাঁশী বাজান হরিপদ পাল। বাজারে বসে মাটির পাত্র বিক্রি করা ছাড়াও মকবুল তার বাবার বাঁশীর ঝোলাটি কাঁধে নিয়ে বাবার সঙ্গী হয় সকল গ্রাম্য আসরে, বিভিন্ন বাজারে।

সেই বাজারেই শহর থেকে আসা এক সাংবাদিক তাঁর বাঁশী শুনে একখান ছবি তুলে নিয়ে গিয়ে ঢাকার একটি কাগজে ছাপিয়েছিলেন কবে যেন। সাংবাদিক জানতে চেয়েছিলেন, তার জীবনে এমন কোনো ইচ্ছে আছে কী যা এখনও অপুর্ণ? বাঁশুরিয়া বলেন, এমন কোনো ইচ্ছে তো নাই যা অপূর্ণ তবে একবার ঢাকায় যাওনের ইচ্ছা তাঁর, জীবনে তো শহর দেখেন নাই, আর তাও কিনা রাজধানী! খবরের কাগজে সেই ছবি আর লেখা পাড়ে এক শিল্পপতি লোক পাঠিয়ে বাঁশুরিয়াকে শহরে নিয়ে যান লোকশিল্পিদের জগৎসভায় তুলে ধরার মহান প্রকল্প বাস্তবায়িত করবেন বলে। গল্পের শুরু সেখানেই।

ওয়াইড শটে বিস্তৃত কচি সবুজ ধানের ক্ষেত, শাপলা বিলের ভেতর দিয়ে ছোট্ট নৌকাখানির এগিয়ে যাওয়া দেখে যে কেউ নিজের হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলাটি দেখতে পাবেন চোখের সামনে। ইঞ্জিনের নৌকায় নদী পারাপারে হাজির শুধু বর্তমান।

এক জাদুগর বাঁশীওয়ালা হঠাৎ হঠাৎ হাজির হন কোনো কোনো জায়গায়, আর সৌভাগ্যবানদের শুনিয়ে যান তার মোহনবাঁশী।ঙ্কখনো চলন্ত ট্রেনের কামরায়, কখনো কোনো গ্রাম্য লোকগানের আসরে, আর কখনো বা শহরের ঝাঁ চকচকে অডিটোরিয়ামে, লোকগানে প্রাণ যোগাতে হাজির হন সেই বাঁশী বাজিয়ে। আজ সেই বাঁশীওয়ালা ঢুকে পড়েছিলাম নন্দন-তিনে। ছদ্মবেশী বংশীবাদক- মণিরুল ইসলাম।

হল ফাটানো করতালি সিনেমার শেষে। বাংলাদেশের সিনেমা কোথায় পৌঁছেছে সেই নিয়ে হল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া মানুষদের টুকরো আলোচনা আর কিছু মানুষের মুখে শুধু একটিই শব্দ, ‘অসাধারণ।’ আমি চুপচাপ বেরিয়ে আসি হল ছেড়ে, আজ আর কোনো সিনেমা দেখব না, আজ শুধু কানে-মনে বাজবে ওই বাঁশী..

Sunday, October 24, 2010

পায়ের তলায় সর্ষে- মৃদু মন্দে মন্দারমণি


এ যেন ঠিক কোনো নির্দিষ্ট সৈকত নয়, বালি-ফেনায় মাখা গর্জনের নির্জনতায় এক ফালি সময়। তা লেখাও হয়েছিল সে সমুদ্রতটের কিশোরীবেলায়, আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে, ফলে এখনকার সঙ্গে হয়ত কোন মিলই নেই সেই অর্জনটুকু ছাড়া। এই সমুদ্র গায়ে মেখে জলপরী হয়ে যাই আমি, এই প্রথমবার৷
---------

হাওয়ায় উড়ুক চুল
জলোচ্ছাসে দেহের বল্কল
হোক এলোমেলো।
অন্তহীন অপেক্ষার শেষে
না হয় সমুদ্র আজ
তোমাকেই খুঁজে পেলো
অপসৃত আবরণে,
সৈকতের নির্জন সন্ধায়।

ভুলে যাও তীরে দর্শক,
মনে কর কেউ নেই;
সমস্ত সমুদ্র জুড়ে তুমি
একা, নগ্ন, অনাবৃতা। (নির্মলেন্দু গুণ)


আমার প্রথম সমুদ্রস্নানমন্দারমণিতেআমাদের চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বিচে কেউ কখনো স্নান করে নাবাড়ির কাছে আছে এক আরশিনগর কক্সবাজার কিন্তু সেথায় আমার যাওয়া হয়নি কখনও। আমাদের শহর চট্টগ্রাম থেকে মাত্র চার ঘন্টার দূরত্বের সেই সুবিস্তৃত সমুদ্রসৈকত, কিন্তু সেই দূরত্বটুকু আমার আজও পেরুনো হয়নি তাই এই ভাবে চলে আসা মন্দারমণিতে। প্রস্তূতি ছাড়াই। ঢেউ ভেঙে ভেঙে  খুব বেশিদূর এগুতে পারি না আমি৷অনভ্যস্ত পা। কষ্ট করে যাও বা এগোই ঢেউ আমাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে আসে ডাঙায়, যেন ফিরিয়ে দিয়ে যায়৷ যেন বলে, ওরে কোথায় যাচ্ছিস, ডুবে যাবি যে! আমি ভাবি বড় বড় সৈকতের কথা, পুরী, গোয়া, কোভালম আর না দেখে যে সব থেকে আপন, কক্সবাজার। আচ্ছা বিশালটা কি সে? ঢেঊ বুঝি আরো মস্ত প্রলঙ্কর কিছু। বিশাল এক ঢেউয়ের তলায় চাপা পড়ি আমি, নোনা জলে চোখ জ্বালা করে ওঠে। একই তো সমুদ্র, পড়ে থাকা বালি, দূরে তটরেখা বরাবর ঝাউ। আমি যেন কত দেখেছি। সব কিছু মিলিয়ে মিশিয়ে এক করে নিই আমি। চোখে বালি ঢোকে কিচকিচ। আচ্ছা হবে হয়ত আলাদা। সেরা কোনো একটা দিকে হবে, এত যে কবিতা-টবিতা লেখা হল, গান-টান কিছু একটা আছে হয়ত, সে দিকে মন দিই না আমি। যেন খুঁজে নিতে চাই আরো আলাদা কিছুর স্বাদ, এই মন্দারমণির সৈকতে।
সকল দেশের সেরা সৈকত
এই কক্সবাজার
বালুর চরে ঢেউ খেলে হায়
একি চমৎকার
আহা রূপের কি বাহার।

পাহাড়ে বসাইছে রাডার
আরো বাতিঘর
বালুর চরে হোটেল মোটেল
ঝিনুকের শহর
প্রেমিক যুগল জোড়া জোড়া
প্রেম করিত যারা।। (লোকগান/ইকবাল হায়দার)




ছোট ছোট চারটি গ্রাম নিয়ে এই মন্দারমণি ৷ দাদনপাত্রবার, সোনামুই, মন্দারমণি। চতুর্থ গ্রামের নামটি ভুলে গেছি৷ পাশাপাশি ছোট্ট ছোট্ট সব গ্রাম। আগে সমুদ্র বেশ দূরে ছিল এখান থেকে, এই গ্রামগুলো থেকে, ফসলী জমি থেকে, পুকুরভরা মাছেদের থেকে। ধীরে ধীরে সমুদ্র এগিয়েছে। জনপদের দিকে। ফসলের মাঠ, গৃহস্থের সংসার, ঘর-বাড়ি-পুকুর, গোয়ালের গরু, ছাগল একে একে সব সব গেছে সমুদ্রের পেটে। যেটুকু বাকি আছে, এখন তাতে মানুষের বসতি, তবে এও ক'দিন আছে বলা যায় না৷ সমুদ্রের গর্জন অহর্নিশি জানান দেয়, আমি আর দূরে নেই, একদম দূরে নেই।

সমুদ্রতীরবর্তী সব গ্রামে স্বাভাবিক ভাবেই ছিল বেশ কিছু নোনা জলের ভেড়ি৷ রোজভ্যালির মালিকেরা মন্দারমণিতে মাছের ব্যবসা করতে গেছিলেন বছর পাঁচেক আগে৷ সস্তার জমি কিনে মাছের ভেড়ি করলেন তারা৷ একটি দুটি ঘর তৈরি হল একটি গেস্টহাউস মতন৷ যেখানে মাছ কিনতে আসা লোকজন এসে রাত্রিযাপণ করতেন৷ সৈকতের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁরা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদেরও নিয়ে আসতে লাগলেন৷ ঘর বাড়তে লাগল স্ট্যান্ডবাই গেস্টহাউসের আর কিছুদিনের মধ্যেই সেই গেস্টহাউস রূপ নিল এক চারতারা হোটেলের৷ সমুদ্রের একেবারে ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সেই হোটেল৷ মাছের ব্যবসা করতে আসা রোজভ্যালি সেখানে শুরু করল হোটেলব্যবসা৷ দেখাদেখি সেখানে দাঁড়িয়ে গেল আরও কিছু হোটেল, কটেজ৷ রমরমা ব্যবসা৷শনি-রবি কোনো হোটেলে, কটেজে একটি ঘরও খালি থাকে না সেখানে এখন জানাল গার্ডেন রিট্রিট নামের রঙচঙে কটেজের কেয়ারটেকার কাম ম্যানেজার বিশুবাবু৷

পাঁচখানা ঘর নিয়ে পাঁচমাস আগে হয়েছে এই গার্ডেন রিট্রিট কটেজ৷ রাস্তার ধারে খনিকটা জায়গা গোল করে ঘিরে নিয়ে মাথায় খড়ের ছাউনি দিয়ে রিসেপশন কাম সিটিংপ্লেস৷ পাশেই একটা লম্বাটে ঘরমত জায়গা, তারও মাথায় খড়েরই ছউনি৷ চারপাশ আদ্ধেকটা ঘেরা৷ কাঠের খুঁটির উপরে দাঁড়িয়ে আছে এই খাওয়ার ঘরের ছাউনি৷ খাওয়ার ঘরের পাশেই ডানধার ধরে একের পর এক ছোট ছোট এক কামরার ঘর, কটেজ৷ সাথে একফালি বাথরুম৷ সারি দিয়ে একের পর এক ঘর, শেষমাথার ঘরখানিতে আমরা ঠাঁই নিয়েছিলাম একবেলার জন্যে৷যাওয়ার কথা ছিল না তো, হঠাৎ গিয়ে পড়া। অপরিকল্পিত সমুদ্রস্নান। এই ঘরের পেছনে কাজ চলছে আরও পাঁচখানি ঘরের৷ তবে এই ঘরগুলি ইটের৷ কাজ অলমোস্ট শেষ হয়ে এসেছে, লাল ইটের ঘরগুলি প্রায় তৈরি৷গাঢ় লাল হাফ ইটের দেওয়ালের উপর গাঢ় সবুজ দরমার বেড়া আর মাথায় সাদা অ্যাসবেষ্টাসের চাল দেওয়া এই কটেজগুলির পোষাকি নাম গার্ডেন রিট্রিট ৷ কালো কাঁচের জানালার ধারগুলো সবুজে রাঙানো৷ কালো কাঁচের মাথা নিচু দরজা আর দুটো করে জানালা৷ ঘরের ভিতরে ঢুকতেই দেখা গেল নীল আর সাদা চৌকো চৌকো খোপকাটা ছাপওয়ালা স্যাটিন কাপড়ের শামিয়ানা টাঙানো অ্যাসবেষ্টাসের নিচে৷ আধো আধো আলো আঁধারির খেলা সেখানে৷ লাল, সবুজ, নীল আর সাদা রঙের সাথে কালো কাচের দরজা জানালা৷ সব মিলে মিশে সৃষ্টি করেছে এক অদ্ভুত রঙ্গ৷ গরমটাকে উপেক্ষা করতে পারলে শুধু এই রঙের খেলা দেখেই হয়ত কাটিয়ে দেওয়া যেত একটি বেলা৷ কিন্তু না৷ এই গরমকে উপেক্ষা করা গেল না কিছুতেই৷ আসবাব বলতে এক প্রশস্ত বিছানা, ছোট একখানি কাঁচের সাইড টেবল, আর দু'খানি প্লাস্টিকের চেয়ার৷ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে চোখে পড়ে এক মরা বেগুনের বাগান৷ এবড়ো-খেবড়ো শুকনো ধুলোময় বালুমাটিতে বাগানসুদ্ধু গাছগুলো মরা৷ দাঁড়িয়ে আছে কে জানে কার, কিসের সাক্ষী হয়ে৷ কাদের এই বাগান? এই কটেজ মালিকেরই কি? এখানকার লোকেরা ব্যবসা দেখতে এতটাই ব্যস্ত, এতটাই মগ্ন যে কারোরই একটু  সময় হয়নি ঐ গাছেদের গোড়ায় একটু জল দেওয়ার৷ শুকিয়ে গেছে তাই এক বাগানভর্তি বেগুনগাছ! মরা বেগুনের বাগানের পাশেই সবুজ পত্রবহুল এক নিমগাছ৷নেহাত বড় বলে এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচেছে। কী অদ্ভুত!




এখানে দাঁড়াও এসে চুপচাপ,
কান পাতো হাওয়ার গভীরে--
প্রাণ ভরে শোনো রুদ্র সমুদ্রের গান।
শ্যামের মুরলী আজি
কী লক্ষ্যে উঠিছে বাজি রাধার বিরহে,
কল্লোলিত সমুদ্র সমান।

এখানে দাঁড়াও এসে চুপচাপ,
বসো সমুদ্রবিরহী ভূমিতলে,
তারপর নেমে যাও, ধীরে ধীরে
নিজেকে নিক্ষেপ করো জলে।
ভেবো না আমার কথা,
সংসার- সমুদ্র থাক দূরে।

স্বার্থ-সঙ্কুচিত বন্দীজীবনের
প্রাত্যহিক গ্লানির ভিতরে
প্রবেশ করিয়া রুদ্র সমুদ্রের ঢেউ
জরাজীর্ণ জীবনের তটে
আজ হানুক আঘাত দলে দলে। (নির্মলেন্দু গুণ)

মন্দারমণিতে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছোয়নি৷ তাতে কি? জেনারেটর আছে । আছে সমুদ্রের নন স্টপ সিম্ফনি। হোটেল, কটেজ সবই চলে জেনারেটরে৷ নামমাত্র খরচে যে যেভাবে পারে যেখানে সেখানে কটেজ তুলে দাঁড়িয়ে পড়েছে ব্যবসা করতে৷ দরমার বেড়া, অ্যাসবেষ্টাসের চালের মাথা নিচু সেই সব কটেজে ঢুকলে জাহান্নামের আগুনের আঁচ খানিকটা টের পাওয়া যায়৷ জেনারেটরে চলা পাখার বাতাস যেন আগুন ছড়ায় সেই কটেজে৷ যারা চার অংকে বিল মেটাতে পারবেন তাঁরা ওঠেন রোজভ্যালির চারতারা হোটেলে, সেখানে ঘরগুলো তাপানুকূল৷ আমাদের মত পাতি মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তের সম্বল ঐ জাহান্নামসম কটেজ৷

সেখানে করে খাচ্ছেন এখন বেশ কিছু মানুষ৷ কেউ বা দিয়েছেন বিস্কুট, সফট ড্রিংকস, চিপসের দোকান তো কেউ কিনেছেন গাড়ি৷ মারুতি ভ্যান, টাটাসুমো নিদেনপক্ষে একটি অ্যাম্বাসেডর৷ গাড়ি কেনার টাকা এসেছে ফসলি জমি বিক্রি করে৷ সেইসব জমি আবার কিনে সেখানে ঢালাও চলছে মাছের ব্যবসা৷ তৈরি হয়েছে সব ভেড়ি৷ বাগদা, পোনা, তেলাপিয়ারা সেখানে বড় হয় মানুষের দেওয়া খাবার খেয়ে৷ জমি বিক্রি করে যাঁরা গাড়ি কিনেছেন তাঁরাও ভালই করে খাচ্ছেন৷ দশ কিলোমিটার মতন রাস্তা কলকাতা দীঘা মহাসড়ক থেকে৷যেতে হয় চাউলখোলায় নেমে৷ ট্রেকার আর ইঞ্জিনচালিত ভ্যানরিক্সা ছাড়া যাতায়াতের একমাত্র সম্বল এই গাড়িগুলি৷ চড়া ভাড়ায় দল বেঁধে মানুষ চাপেন এই গাড়িগুলোতে৷ হোটেল, কটেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন গাড়ির মালিকেরা গাড়ি নিয়ে৷ বেড়াতে আসা যাত্রীদের পৌঁছে দিয়ে আসেন এঁরা কাঁথি, জুনপুট, দীঘা৷ দশ কিলোমিটার দূরের চাউলখোলায় যেতে একটি মারুতী ভ্যান ভাড়া নেয় দুশো পঞ্চাশ টাকা, কাঁথি নিয়ে গেলে নেয় সাড়ে চারশো টাকা৷ যাঁরা ফোন করে হোটেল-কটেজ বুক করে আসেন, তাঁরা চাইলে এই সব গাড়িগুলো এসে তাঁদের নিয়ে যায় কাঁথি, জুনপুট কিংবা দীঘা থেকে৷ ভাঙা এবড়ো-খেবড়ো রাস্তার ঝাঁকুনি কিংবা ধুলো থেকে অনেকটাই বাঁচিয়ে দেয় এই গাড়ি৷ গরমের কথা বলাই বাহুল্য৷

অনেকেই একবেলার জন্যে এসে ঘুরে যান এই মন্দারমণিতে৷ গাড়ি করে সকাল সকাল এসে ঘুরে বেড়িয়ে, সমুদ্রস্নান করে আবার ফিরে যাওয়া জুনপুট, দীঘা কিংবা কলকাতায়৷ চমৎকার দীর্ঘ সৈকত, প্রবল গর্জনে আছড়ে পড়া সমুদ্র আর দূরে বিস্তৃত নারকেল বন৷ একটু নীরবতা প্রার্থীদের বেড়াতে আসার জন্যে আদর্শ স্থান৷ সাথে গাড়ি থাকলে ঘুরে আসা যায় আঠেরো কিলোমিটার লম্বা এই বিচ, যার সাথে সাথেই এগিয়েছে নারকোলের বনও৷ গাড়ি না থাকলে চুপটি করে বসে পড়া যায় কোথাও একটা জায়গা দেখে নিয়ে৷ তবে যাঁরা রাত্রিবাস করবেন না তাঁদের এখানে বেলা বেশি না করাটাই শ্রেয়৷ নইলে মিস করতে হতে পারে কলকাতা ফেরার সাড়ে চারটের লাস্ট বাসটি৷ যেমন আমরা করেছিলাম৷ তারপর? একটি বাসের অপেক্ষায় হা পিত্যেশ! মেচেদা, হলদিয়া৷ যাহোক কিছু একটা! সময় বুঝে আকাশের কোণে জমে ওঠে ঘন, কালো মেঘ ৷ দেখতে দেখতেই তা ছড়িয়ে যায় গোটা আকাশে, দেয় গুরুগম্ভীর ডাক আর নেমে আসে অঝোর বৃষ্টি৷ রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকা, টিনের চাল ভেদ করে মাথায় বৃষ্টির ফোটারা এসে মাথায় পড়ে টুপটাপ টুপটাপ৷ কিছুই না পেয়ে অগত্যা উল্টো দিকের বাস ধরে যেতে হবে দীঘায় আর যাওয়ার আগে অবশ্যই মনে মনে একটা হিসেব করে নিতে হবে, হাতে এক্সট্রা সময় আর পয়সাকড়ি আছে তো!

মফিজুল৷ মারুতী ভ্যানের মালিক৷ নিজেই গাড়ি চালিয়ে পর্যটকদের নিয়া আসা যাওয়া করে, কাঁথি, জুনপুট, দীঘা৷ আবার ফিরে আসে মন্দারমণি৷ মফিজুলের বাড়ি সোনামুই'তে৷ গ্রামের নামটি কি সোনামুখী? না না৷ সোনামুখী নয়, সোনামুই! মফিজুলদের একসম বিঘা তিরিশ জমি ছিল৷ সম্পন্ন চাষী পরিবার৷ কিন্তু এখন আর নেই সেই জমি৷ সমুদ্র খেয়ে নিয়েছে ওদের চাষের জমি৷ এখনও খানিকটা আছে বেঁচে, বিঘে দশ মতন৷ তবে এও যেতে পারে সাগরের পেটে যে কোনো সময়৷ সময় থাকতে মফিজুল তাই বেঁচে থাকা জমিটুকু বিক্রি করে দিয়েছে মাছের ব্যবসা করতে আসা একজনের কাছে, সেই টাকায় মফিজুল কিনেছে এই গাড়ি আর একটি ট্রাক্টর৷ গাড়িটি সে নিজেই চালায়৷ ট্রাক্টর ভাড়ায় খাটে৷ যাত্রীর আশায় মফিজুল যখন দাঁড়িয়ে থাকে কটেজের সামনে তখন পরম মমতায় পালকের ঝাড়ন দিয়ে ধুলো ঝাড়ে গাড়ির গা থেকে৷ নরম কাপড় দিয়ে মুছে মুছে চকচকে করে তোলে সে তার গাড়ির শরীর৷ মফিজুলদের গ্রামে এখনও বিদ্যুৎ যায়নি৷ মন্দারমণি থেকে মাইল পাঁচেক দূরে বিদ্যুৎএর শেষ খুঁটিটি দাঁড়িয়ে আছে৷ এরপরে আর কবে এগোবে তা মফিজুল জানে না৷ তবে এগোবে এটুকু জানে৷ কারণ, যেভাবে বাইরের মানুষ মন্দারমণিতে আসছে, মাছের ব্যবসা, হোটেলব্যবসা করছে, তাদের নিজেদের ব্যবসার গরজেই তারা বিদ্যুৎএর জন্যে দৌড়-ঝাঁপ করবে আর আলো নিয়ে আসবে এটা মফিজুলের বিশ্বাস৷


-৩-
চাকমার পাহাড়ি বস্তি, বুদ্ধমন্দিরের চূড়া ছুঁয়ে
ডাকহরকরা চাঁদ মেঘের পল্লীর ঘরে ঘরে
শুভেচ্ছা জানাতে যায়, কেঁদে ফেরে ঘন্টার রোদন
চারদিকে। বাঁশের ঘরে ফালা ফালা দোচোয়ানি চাঁদ
পূর্ণিমার বৌদ্ধ চাঁদ, চাকমার মুখশ্রীমাখা চাঁদ!
নতুন নির্মিত বাড়ি সমুদ্রের জলে ঝুঁকে আছে।
প্রতিষ্ঠাবেষ্টিত ঝাউ, কাজুবাদামের গাছ, বালু
গোটাদিন তেতেপুড়ে, শ্রীতলে নিষ্ক্রান্ত হবে বলে
বাতাসের ভিক্ষাপ্রার্থী! জল সরে গেছে বহুদূর।
নীলাভ মসলিন নিয়ে বহুদূরে বঙ্গোপসাগর
আজ, এই সন্ধ্যাবেলা।
ব্ল্যাকডক মধ্যিখানে নিয়ে দুই কবির কৈশোর
দুটি রাঙা পদচ্ছাপ মেলানোর তদবিরে ব্যাকুল
ব্যর্থ আলোচনা করে, গানের সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ে,
বর্ণমালা নিয়ে লোফালুফি করে তীরে!
রুপচাঁদা জালে পড়ে, খোলামকুচির মতো খেদ
রীভীন কাঁকড়ার স্তুপ সংঘ ভেঙে ছড়ায় মাদুরে
একা একা। উপকূলে।
বুদ্ধপূর্ণিমার চাঁদ কক্সবাজারের কনে-দেখা
আলোয় বিভ্রান্ত আজ। অধিকন্তু, ভরসন্ধেবেলা! -শক্তি চট্টোপাধ্যায়
মন্দারমণি৷ এক কিশোরী, সমুদ্রতট৷ সদ্য সদ্য গজিয়ে ওঠা এই সৈকতে সবে লোকজন যেতে শুরু করেছে, নিয়মিত৷ সমুদ্র পাড়ের চেনা দৃশ্য ভ্যানিশ, না ট্রলার নৌকা, না শুটকির গন্ধ৷ স্নানাভিলাষীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে স্নান করেন সমুদ্রে৷ ঢেউএর পরে ঢেউ এসে ভাঙে আর উচ্ছ্বাস বাড়ে স্নানরত ছেলে-মেয়েদের৷ নারী ও পুরুষদের৷ বাবার হাত ধরে সমুদ্রস্নান করতে আসা ছোট্ট শিশুটি তার হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে খেলা করে জল নিয়ে, তার খিলখিল হাসির শব্দ চাপা পড়ে সমুদ্রের গর্জনে৷ সৈকতময় ভাঙা, গোটা ঝিনুকদের মাঝে ইত:স্তত দাঁড়িয়ে দু-তিনটি ডাবওয়ালা৷ সাইকেলের পেছনে ঝোলানো কাঁদি কাঁদি ডাব আর সমনে ঝোলানো বাজারের থলেতে বিয়ার৷ একটি ডাব খেতে হলে খরচ করতে হবে দশটি টাকা আর বিয়ারের দাম জানা হয়নি৷ বেলা বারোটার জ্বলন্ত সূর্যের গনগনে তাপকে উপেক্ষা করে স্নানে মগ্ন কিছু মানুষ৷ সৈকত ধরে মাঝে মাঝেই ছুটে যাচ্ছে গাড়ি৷ টাটা সুমো, কোয়ালিস, সাফারি৷ এমাথা থেকে ওমাথায়৷ কলেজ পালিয়ে কলকাতা থেকে আসা এক দল ছেলে-মেয়ে জলে হুটোপাটি করতে করতে নিজেদের মধ্যেই তামাশা করে, এখন কোন ক্লাস চলছে? আজকে কোন কোন ক্লাস ছিল? বাড়ি গিয়ে সব ঠিকঠাক বলতে হবে তো! তাদের হাসির শব্দে চাপা পড়ে সমুদ্রের গর্জন৷

আরেকটু বয়েস হলে হয়ত বলব, দিনকাল কত পালটে গেছে, ছেলে-মেয়েরা কলেজ কেটে কলকাতা থেকে মন্দারমণি গিয়ে সমুদ্রস্নান করে সন্ধেয় বাড়ি ফিরে যাচ্ছে! কিন্তু আসলে বোধ হয় খুব একটা পাল্টায়নি। আমাদের স্কুল-কলেজের দিনেও ছেলে-মেয়েরা ক্লাস কেটে বেড়াতে যেত, কর্ণফুলী নদী যেখানে বঙ্গপোসাগরে গিয়ে মিশেছে, সেই মোহনায়, পতেঙ্গা বিচে, কর্ণফুলী থেকে সাম্পান ভাড়া করে দল বেঁধে মোহনার উত্তাল ঢেউয়ের মাথায় চড়ে ছোট্ট আনোয়ারা দ্বীপে আমরাও গেছি। কিন্তু সাগরে স্নান করার কথা কেউই ভাবিনি।
ছোড ছোড ঢেউ তুলি পানিত
লুসাই পাহাড়ত্তুন লামিয়ারে
যার গই কর্ণফুলী।…
পাহাড়ি কন সোন্দরী মাইয়া
ঢেউওর পানিত যাই
সিয়ান গরি উডি দেখের
কানর ফুল তার নাই
যেইদিন কানর ফুল হাজাইয়ে
হেইদিনত্তুন নাম কর্ণফুলী।। -চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান
বেড়ানোতেই আনন্দ! চট্টগ্রাম শহর থেকে পতেঙ্গা বিচ খুব কাছে বলে উইকেন্ডে বরাবরই খুব ভিড় হয় বিকেলবেলা। তবে স্কুল বা কলেজ পালানো ছেলে-মেয়েরা উইকএন্ড বা বিকেলবেলায় তো যেত না, ক্লাসের সময় হিসেব করে যাওয়া, ছুটির সময় হিসেব করে বাড়িতে ঢুকে পড়া।

এখন যেমন বিশাল বিশাল বোল্ডার ফেলে ঘিরে দেয়া হয়েছে গোটা পতেঙ্গা বিচ, তখন ওরকম ছিল না, কিছু বড় আকারের পাথর তখন ছিল রাস্তার শেষমাথায়, যেখানটায় বিচ শুরু হয়েছে। জোয়ারের ঢেউ অবিরাম আছড়ে পড়ে পাড় ভেঙে দেয় বলে। কিন্তু সেগুলো লাফিয়ে পেরিয়ে দিব্যি নেমে যেতাম বালুকাবেলায়। হেঁটে চলে যেতাম দূরের ঝাউবনে। কে কার সঙ্গে আছে সেটা কারোরই খেয়াল থাকত না। সবাই যে যার মতো হাঁটতে থাকত যেদিকে মন চায়। চটি হাতে নিয়ে আলতো পায়ে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাওয়া, খানিকটা ঢেউয়ে পা ভিজিয়ে আবার বালির উপর দিয়ে হাঁটা। ঝাউবন পেরিয়ে ওধারের বিচে একলা যেতে খানিকটা ভয় ভয় করত নীরবতার জন্যে।

যখন তখন বঙ্গপোসাগরে নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ, অতি গভীর নিম্নচাপ তৈরি হয়ে, ঝড় উঠে পড়ে বলে প্রায় গোটা বছরই একটা ছোটোখাটো সিগন্যাল ঝুলিয়ে রাখে আজকাল আবহাওয়া দপ্তর, বন্দর কর্তৃপক্ষ। ঝড়ের আকার-প্রকার বুঝে বাড়ে-কমে সিগন্যালের নম্বর। সেই সব ঝড় যখন আছড়ে পড়ে লোকালয়ে, সঙ্গে করেই নিয়ে আসে জলোচ্ছ্বাস। শহর থেকে দশ মাইল দূরের এই কর্ণফুলী আর বঙ্গপোসাগরের মোহনা তখন সত্যিকারের ভয়াবহ হয়ে ওঠে, পনের-ষোলো ফুট কখনও বা আরো বেশি উঁচু জলোচ্ছ্বাস যখন আসে তখন কারোরই কিছু করার থাকে না কিন্তু ছোটোখাটো ঢেউ বা জলোচ্ছ্বাস যেন কর্ণফুলীর তীর ধরে গড়ে ওঠা ন্যাভাল একাডেমি বা পতেঙ্গা বিচকে ভাসিয়ে না নিতে পারে সেজন্যে বিশাল বিশাল চৌকো কংক্রিট আর সিমেন্টের বোল্ডার দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে পতেঙ্গা বিচ আর শহরের মাঝখান থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তার ধার ধরে বয়ে চলা কর্ণফুলীর ধারকে। কর্ণফুলীর এই পারে শুধু বোল্ডার ফেলেই নিশ্চিন্ত হওয়া যায়নি, মোটা তারের জাল দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে পাথর আর বোল্ডারকে।
রাঙামাটি পাহাড়ি কন্যা
খোঁপায় রাঙা ফুল
সেয়ান গইত্যে আই হাজাইয়ে
তার কানর কর্ণফুল
কাইছা খালর নাম হইয়ে ভাই
হেদিনত্তুন কর্ণফুলী
দেশ বিদেশের কত জাহাজ
এই না নদীর তীরে
নানারকম পণ্য লইয়া
বন্দরত ভিড়ে
নৌকা সাম্পান উজান ভাটি
নানা রঙের পাল তুলি।। -মোহনলাল দাশ/লোকগান
সে সব বন্ধুদের সঙ্গে পালিয়ে সমুদ্রে যাওয়ার কথা। বাড়ির লোকেদের সঙ্গে অফিশিয়ালি সমুদ্রে যেতাম ভোরবেলায়। সূর্যোদয় দেখতে। আজান শোনামাত্র ঘুমচোখে ঝটপট তৈরি হওয়া, হই হই করে ভাই-বোনেরা সব একে ডেকে তাকে তুলে গাড়িতে করে পতেঙ্গা। তখনও দু-একটা চায়ের দোকান ছিল সেখানে, বিচের ধার ধরে। পরোটা ভাজি আর চা খেয়ে বিচে নেমে পড়া। না। সমুদ্রস্নান করার কোনো সীন এখানেও নেই। আমরা জলের ধার ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, ঢেউ এসে পায়ে ভাঙত। তাতে করে যেটুকু জামা-কাপড় ভিজত তাতেই আমাদের আনন্দের সীমা থাকত না। ভিজে কাপড়ে চটি হাতে নিয়ে আমরা সুনসান বিচে হেঁটে বেড়াতাম। কাছে-দূরে দেখা যেত আরও দু-এক পিস গাড়ি, সেই গাড়িগুলো থেকে নেমে আসা ছেলেদের থেকে আমরা দূরত্ব বজায় রাখতাম সযতনে। সমুদ্রের দিকে তাকালে দেখা যায় কাছে-দূরে নোঙ্গর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য জাহাজ। আকাশ পরিষ্কার থাকলে তাদেরকেও পরিষ্কার দেখা যায়, নইলে ধোঁয়া ধোঁয়া ধূসর কুয়াশার চাদর ভেদ করে শুধু জাহাজের আকৃতি দেখা যায়, দূর থেকে মনে হয় যেন স্থির দাঁড়িয়ে আছে জলে। ছোটো জাহাজগুলো কাছে থাকে বলে তাও খানিকটা দেখা যায়, কিন্তু বড় জাহাজগুলো দাঁড়িয়ে থাকে একেবারে দৃষ্টিসীমার শেষমাথায়, গভীর সমুদ্রে, নজরে আসে শুধু তাদের আকৃতি। বিদেশি জাহাজ সব, মাল-পত্র নিয়ে এসেছে চট্টগ্রাম বন্দরে নামাবে বলে। আকারে অনেক বড় বলে মোহনা পেরিয়ে কর্ণফুলী নদীর উপরে বন্দরে ঢুকতে পারে না, ছোট বোটে করে মাল নামিয়ে বন্দরে পাঠিয়ে দিয়ে ফিরে যায় যেখান থেকে এসেছে সেখানে। ছোট জাহাজগুলো সোজা চলে আসে বন্দরে। পতেঙ্গা যাওয়া-আসার পথে কর্ণফুলী নদীতে দেখা যায় সার সার মালবাহী জাহাজ, দেশি বিদেশি জাহাজ সব, এম ভি খন্দকার, বীর সৈনিক বজলুর রহমান, বীর জামাল হোসেন, শেখ কালু, ফজলুর হক জলিল, এম ভি সৈকত, হেলেন অফ ট্রয়, সিগাল ইত্যাদি। আরো অনেক জাহাজ যেন দৃশ্যপট জুড়ে সারসারে ছড়ানো, অনেক রকম নামের অগুন্তি, অসংখ্য জাহাজ।

 
-৪-

আমি এরকম কিছুই পাইনি, কমল পেয়েছে কড়ি,
শিশির পেয়েছে শঙ্খ, আর নীরা যা চেয়েছে তা-ই।

দেখে দেখে অবাক হয়েছি আমি,
এ যেন সমুদ্র নয়, স্রেফ কোনো পোষা হাতী,
কিংবা কোনো আলাদীন সার্কাসের বাঘ।
না কড়ি, না শঙ্খ, না শামুক,
আমার দু চোখে শুধু শস্যমগ্ন সমুদ্রের জল।

দ্যাখো- দ্যাখো কী সুন্দর অস্ত- বলতেই
পশ্চিমের সমুদ্রের ক্ষুধা গিলে খেলো পূর্বের সূর্যকে।
অমিত, শিশির, নীরা, আবছার, শাজাহান,
বন্দী হলো কমলের ক্লিকে। তারপর কয়েক মুহূর্ত
শব্দহীন, সমস্ত সৈকত জুড়ে স্তব্ধ নীরবতা।
আর কোনো ছবি নেই।

হঠাৎ তাকিয়ে দেখি আমার পাশেই নুড়ি কুড়াচ্ছেন
বৃদ্ধ নিউটন, তার হাতে সায়মন হোটেলের চাবি। (নির্মলেন্দু গুণ)


ছোট বড় নানা সাইজের নানা আকারের অজস্র অজস্র ঝিনুক ছড়িয়ে আছে এই মন্দারমণির সৈকতে৷ কুড়িয়ে নেওয়ার কেউ নেই ৷ প্রতিটি ঢেউএর সাথেই আসছে আরও ঝিনুক৷ ছোট্ট নুড়ির মত দেখতে আস্ত ঝিনুকও দেখলাম কিছু কিন্তু অ্যাত্ত নরম! হাতে নেওয়ামাত্রই সেগুলো ভেঙে যায়৷ সৈকতে যদ্দূর ঢেউ আছড়ে পড়ছে, তদ্দূর অব্দি বালি ঠান্ডা, ভেজা ভেজা৷ আর তারপরেই শুকনো তপ্ত বালি৷ খালি পা রাখতেই মনে হল যেন ফোস্কা পড়ল পায়ে! এই গরম বালিতেও কিছু মানুষ বসে আছেন৷ কেউ বেড়াতে এসেছেন, কেউ বা ওখানকারই লোক৷ দুজন মানুষকে দেখলাম খানিকটা বালি সরিয়ে তাতে প্লাষ্টিক বিছিয়ে জল ঢেলে দিয়েছেন দু-তিন গামলা৷ ছোট্ট, খুব ছোট্ট এক পুকুর যেন! তাতে কিলবিল কিলবিল করছে ভীষণ ছোট্ট সব মাছ, ইঞ্চি দুই-তিন লম্বা সাপ৷ মানুষটি বসে বসে কিছু একটা বেছে আলাদা করছেন আর সেই আলাদা করে তুলে রাখা অতি ক্ষুদ্র মাছগুলি তুলে রাখছেন পাশেই রাখা প্লাস্টিকের গামলাভর্তি জলে৷ খানিক দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করেও বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করব ভেবেও কিছু বললাম না, একাগ্র মানুষটির মনযোগ নষ্ট করতে মন চাইল না বলে৷ ডাবওয়ালারা ভিজে গামছা গায়ে মাথায় জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে গরম বালিতে৷ বিচের দিকে এগুনো যে কোনো মানুষকে দেখেই এগিয়ে আসছে তারা সাইকেল নিয়ে, ডাব খান বাবু ডাব৷ ডাব খাবেন না? তবে বিয়ার খান! তোমরা বিয়ারও রাখো? জানতে চাইলে জবাব এলো, হ্যাঁ দিদি, রাখি৷ যা চান সবই পাবেন! কি চাই বলুন!

চারিদিকে তাকিয়ে দেখি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বেশ কিছু মানুষ৷ কেউ বসে আছেন একেবারে জলের ধারটি ঘেঁষে, কোলে একেবারেই ছোট বাচ্চা৷ কর্তা গিন্নি দুজনেই জলের ধারে বসে আছেন৷ ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিলে যেটুকু স্নান হয় ওটুকুতেই তারা খুশি৷ স্কুলপড়ুয়া তিনটি ছেলে হাতে একটা বল নিয়ে নেমে গেছে অনেকটা জলে৷ ঢেউএর সাথে সাথে ওরা ডুবছে ভাসছে৷ হাতের বল ছুঁড়ে দিচ্ছে একে অন্যের দিকে, গায়ে না পড়ে বল পড়ে যাচ্ছে জলে আর ঢেউয়ের মাথায় চড়ে সেই বল সরে যাচ্ছে ছেলেগুলোর থেকে দূরে। ওরা হুল্লোড় করতে করতে জলের উপর গা ভাসিয়ে পৌঁছুনোর চেষ্টা করছে বলের কাছে। বল হাতে এলেই আবার ছুঁড়ে দিচ্ছে কখনও সঙ্গীর দিকে তো কখনও আরেকটু দূরে গভীর জলের দিকে আর তারপর মহানন্দে ঢেউয়ের মাথায় চড়ে চড়ে যাচ্ছে সেই বল আনতে।  মাঝে মাঝে দেখাও যাচ্ছে না ওদের৷ আবার দেখা যায়, ঐ যে! ওরা লাফাচ্ছে বলের পেছনে! আমার মনে হল, এভাবেই তো সমুদ্রে স্নান করতে এসে ডুবে যায় অনেকে৷ মাঝে মাঝেই খবরের কাগজে থাকে সেই সব খবর৷ কিন্তু ঐ বাচ্চাগুলোর কোনোদিকে কো্নো খেয়াল নেই৷ বিশাল উঁচু উঁচু ঢেউএর মাথায় চেপে চেপে তার চলে যাচ্ছে দূরে আরও দূরে!

একটু উঁচু জায়গায় চটি রেখে এগিয়ে যাই জলের দিকে৷ ঝিনুক কোড়োতে কুড়োতে৷ দু'হাত ভরে ওঠে নিমেষেই৷ এত ঝিনুক এতো এতো ঝিনুক! এক সময় মনে হয়, থাক, কী হবে! ক'টা ঝিনুক আমি সাজিয়ে রাখব? থাক ওরা এখানেই৷ সমুদ্র এখানে খুব কাছে ডাঙা থেকে৷ খুব খুব কাছে৷ বিছিয়ে আছে এক সাগর জল নিয়ে৷ শুয়ে আছে৷ ঘোলাটে জল নিয়ে ধুসর সমুদ্র বিছিয়ে আছে দৃষ্টিসীমার বাইরে অব্দি৷ এই সমুদ্রকে, এই বিছিয়ে থাকা বিস্তীর্ণ জলরাশিকে এখানে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়৷ সত্যি সত্যিই ছোঁয়া যায়! হাতে নেওয়া যায় আঁজলাভর্তি জল৷ যদিও নিমেষেই আবার তা গড়িয়ে নেমে যায় সাগরেই! একমুঠো বালি তুলে আনি আমি জলের ভেতর থেকে, মুঠো খোলার আগেই বালি নেমে যায় জলের সাথে৷ আমি দেখতে পাই আমার হাতে ছোট্ট এক নুড়ি আর একটা ছোট্ট ঝিনুক, জ্যান্ত! আমি ওকে আবার জলেই ফিরিয়ে দিই, নুড়িটিকেও৷ এই সমুদ্র গায়ে মেখে জলপরী হয়ে যাই আমি, এই প্রথমবার..





গুরুচণ্ডা৯-র উৎসব সংখ্যায় প্রকাশিত

Sunday, October 03, 2010

আমি লিখছি, আমি লিখছি তোমার ঠিকানায়

ঋতুবদলের সাথে এখন আর বদলায় না জলবায়ু। আশ্বিনে চৈত্রের গরমে পুড়ছে আমার ঘরের ছাদ, দেওয়াল আর আমি। বাইরে থই থই রোদ্দুর, নিস্তরঙ্গ দুপুর। কাক-পক্ষীও ডাকে না কোথাও। ফ্লাইওভারের মাঝখানে শুধু ক্রমশ উচ্চতায় বাড়তে বাড়তে অতিকায় এক দানবের চেহারা নেওয়া বাড়িটায় লোহা-লক্কড়ের ঠুক-ঠাক, যন্ত্রের ঘরর ঘরর ঘরর ঘরর শব্দ ভেঙে দিতে থাকে এই নৈঃশব্দকে। এই ক’দিন আগেও বারোমাস এখানে পাখিদের ডাক, তাদের গান, তাদের ঝগড়া আর প্রেম শোনা যেত, দেখাও যেত। রান্নাঘরে কাঠবেড়ালি যখন তখন ঢুকে পড়ত খাবারের খোঁজে। এই নিঃঝুম গ্রামের মত জায়গাটায় এখন শুধুই চারতলা সব বাড়ি। পক্ষীকুল হারাইয়াছে তাহাদের ঠিকানা। আমি হারিয়েছি ভোরের কুজন, নিঝুম দুপুরে পানকৌড়িদের জলকেলি আর আমার খোলা জানালা..

সেই কবে থেকে একটা চিঠি লিখছি। লিখেই চলেছি। একটা একটা করে অক্ষর, অক্ষর জুড়ে জুড়ে শব্দ। চিঠিটা পৌঁছায় না তোমার ঠিকানায়। হারিয়ে যায় কোথাও, মাঝপথে। নাকি আমিই ডাকে দিই না সে চিঠি? জানি না.. উত্তর আসে না কোনো.. সময় বয়ে যায়, কত কথা, নদী পথ হারায়, হারায় গতি, দিনের আলোর অন্ধকারে বসে থাকি নির্বাক, অর্থ খোঁজা শুরু করি বুঝে না ওঠা এই জীবনের..  ধুশশ.. কি হবে খুঁজে..

০২
দিকে দিকে আগমনী। আগমনী বললেই আমার যদিও মনে পড়ে যায় কিছু তেতো স্মৃতি।  তবু, তবুও বাতাসে বাজে আগমনী। এবছর এখনও কাশের দেখা আমার মেলেনি। এক সময় আমার বন্ধ হয়ে যাওয়া জানালার ওপাশেই দেখা মিলত তাদের, আশ্বিনে। এখন যেখানে বাতাসে হেলানো বারান্দায় দড়িতে ঝোলে শাড়ি-জামা-গামছা। 

পুজো শপিং। জনস্রোত বিদ্যাসাগর সেতু পেরিয়ে ওপারে, শহরে, ছুটির কলকাতায়। ঠাই নেই ঠাই নেই। মেয়ো রোডের উপর থেকে ময়দান পেরিয়ে নিউ মার্কেটের দিকে হাঁটার প্রয়োজন হয় না, ভীড়ই ঠেলে নিয়ে যাবে তোমাকে। কে বলবে আজ গান্ধী জয়ন্তী, ন্যাশনাল হলিডে! খুচরো কাজ আজ থাক। ত্বরিৎ পায়ে ভীড় ঠেলে আমি আবার উল্টোপথে।

০৩
ফোনের ওপারে অদ্রীশ’দা, মৌ’দি। ‘আইলো নকশা পিঠায় চড়িয়া’র উচ্ছসিত প্রশংসায় আমি ভেসে যাই, যদিও নিজেই জানি, অতখানি প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য ওই লেখা কিছুতেই নয় তবুও মন ভরে যায়, আমি ভেসে যাই গঙ্গার উপর দিয়ে, দূরে, কোনো এক শঙ্খচিল শালিকের দেশে। মনে মনে আমি তখনও লিখছি এই চিঠি, তোমাকে। কতকাল কিছু লিখি না বলতো?

দুপুরবেলায় রামস্বামী জানতে চায়, কী লিখছি? কিছুই লিখছি না শুনে বলে, সে আবার কী! সে ইংরেজীতে অনুবাদ করতে চায় ‘তিতাস কোনো নদীর নাম নয়’কে। কিন্তু বাঙাল ভাষায় লেখা জায়গাগুলোয় গিয়ে আটকে যায়, আমাকে বসতে বলে ওর সঙ্গে, সেই কবে থেকে বলে আসছে। আমার আর সময় হয় না। এবার একটু সময় দিলে হয়।

০৪
রশীদ খান। আওগে যব তুম সাজনা, আঙ্গনা ফুল খিলেগা। কানপুরের অমিত মজুমদার গানটা ইলেকট্রনিক চিঠিতে জুড়ে দিয়ে পাঠিয়েছিল সেই কবে। কি করে যেন এই গানটা গুলাম আলীর গজলের ফোল্ডারে ঢুকে পড়েছিল। মন খারাপের দুপুরবেলায় যখন গুলাম আলী শুনছি, তখন বেজে ওঠে এই গানটা। মনে পড়ে যায় রবীন্দ্র সদনে দেখা ও শোনা রশীদ খানের গান। দুঃখ হয়, এই সেদিন নজরুল মঞ্চে গুলাম আলী আর রশীদ খানের যুগলবন্দীতে যেতে পারিনি বলে। কতবার ভাবলাম, একবার যাই, গুলাম আলী শুনব সামনে বসে। কিন্তু না। হলো না। যেমন হয় না অনেক কিছুই। তেমনি সামনে বসে শোনা হলো না গোলাম আলীও।

০৫
তামান্না বলেছিল দুটো লিস্ট বানাতে, একটা লিস্টে চেনা লোকেদের নাম লিখতে আরেকটা লিস্টে আমার স্বপ্নগুলোকে লিখতে। প্রচুর প্রচুর গল্প শোনালো তামান্না এই কদিনে। প্রচুর স্বপ্ন আর প্রচুর গল্প। আমি খুব একটা মাথা কখনই ঘামাই না স্বপ্ন নিয়ে কিন্তু কাল রাতে ভাবলাম। অনেক রাত অব্দি জেগে জেগে ভাবলাম। স্বপ্ন দেখার চেষ্টা করলাম এবং সেই স্বপ্ন দেখা এবং সেটা পূরণ করার জন্যে আমি কি কি করতে পারি সেটা ভাবার চেষ্টা করলাম। এবং অদ্ভুতভাবে আবিস্কার করলাম, আমার কোনো স্বপ্ন নেই! আমার এমন কোনো স্বপ্ন নেই যা আমি পূরণ হওয়ার স্বপ্ন দেখি! চেনা লোক? সারি সারি সব নাম। কিন্তু চেনা কি আদৌ? নাহ। কাউকেই চিনতে পারি না। লিস্টি গেল চুলোয়। স্বপ্ন নেই, চেনা মানুষ নেই, কিচ্ছু নেই? কথাগুলো তামান্নাকে বলতে হবে।

একটা স্বপ্ন আমি খুঁজে পেতে বের করলাম, কিন্তু সেটাও আমি নিজে দেখিনি, মালু-অমিতাভ মালাকার দেখিয়েছিল। কিন্তু কথা হলো, ওটা কি আদতে কোনো স্বপ্ন? ওটা তো আমার কাজ, যা আমি করছি এবং করব। মোটামুটি কম-বেশি চারশো পাতার একটা বই। প্রায় আদ্ধেক হয়ে পড়ে থাকা লেখাটা নিয়ে গড়িমসি করছি বলে রেগে গিয়ে একদিন একটা ডিকশনারি হাতে নিয়ে মালু দেখিয়েছিল, এই দেখো, এই রকম হবে বইটা, দেখতে পাচ্ছো? হুঁ। দেখতে পাচ্ছিলাম এবং হরদম পাই। মালুকে কথা দিয়েছিলাম, অক্টোবরে শেষ করব। সে ছিল এপ্রিল মাস, দেখতে দেখতে অক্টোবরও এসেই গেল আর এই অক্টোবরে অন্তত সেটা শেষ হওয়ার কোনো চান্স নেই..

Friday, September 17, 2010

ঝিনুকে মুক্তো হলে সেই ঝিনুক আর মুখ খোলে না

Posted by Picasa

Tuesday, September 14, 2010

পায়ে পায়ে ঈদের পথে-০২

রোজার শুরু থেকেই দাঁতে একটা যন্ত্রণা শুরু হলো। বছর তিনেক আগে যখন শেষবার দাঁতের ডাক্তারের কাছে গেছিলাম, তখনই ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন যে এটাকে তুলে ফেলতে হবে। বছর তিনেক আর ওপথ মাড়াইনি যদি দাঁত তুলে ফ্যালে সেই ভয়ে। কিন্তু এবার আর পারা গেল না, যেতেই হলো। রোজা তখন সবে তেরোটা পেরিয়েছে। ডাক্তার ফর্দ ধরিয়ে দিলেন ওষুধের আর পাঁচ দিন পরে যেতে বললেন। বললাম, আজকেই তুলে ফেলুন না কারণ পাঁচদিন পরে আমি নিজেকে এখানে আবার নিয়ে আসতে পারব বলে ভরসা হয় না। আমার রোজা রাখা সেদিন থেকেই শেষ। মন দিয়ে ওষুধ খাই আর ভাবি, ব্যথাটা ঠিক হয়ে গেলেই তো হলো, দাঁতটা আল্টিমেটলি তুলতে হবে না। কিন্তু তুলতে হলো। সে আমার দু:খের কথা, সেদিকে না যাই।

বলছিলাম রোজার কথা। দু:খের দিন একলা আসে না। যেই না ভাবতে শুরু করলাম রোজা রাখা শুরু করব আবার অমনি দুম করে রক্তচাপ নেমে গেল। তুলে ফেলে দেওয়া দাঁতের যন্ত্রণা শেষ হয়নি তখনও। ইলেকট্রোবিয়ন চলল কিছুদিন। এদিকে রোজা শেষ হয় হয়। সাধারণত কুড়িটা রোজা পেরিয়ে গেলেই ঈদের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় সব ঘরে ঘরে। মানে ঘর- দোর সাফ-সুতরো করা, জানালা দরজার পর্দা কাঁচা বা নতুন লাগানো। যাঁরা বছরে একবার বাড়ি রং করেন, কুড়ি রোজার মধ্যেই শেষ করিয়ে ফ্যালেন বাড়ি রং করার কাজও। আন্যান্য সব বছরে আমারও তাই হয়। মানে বাড়ি রং করানো নয়, এই ঘর-দোর সাফ-সুতরো করার কথা বলছি। এবারে আর হলো না। আমার ঘর-দোরে মাকড়সারা বাস করে নিশ্চিন্তে। পুরু ধুলোর আস্তরণ সমস্ত আসবাবে, বইয়ের তাকে, টেলিভিশনের পর্দায় দেওয়ালের বড় আয়নাটায়। দিন গুনি শুধু, ঈদের আর ক
দিন বাকি যেন? তার আগে ঠিক করে ফেলব আর তারপরেই নিউ মার্কেটে গিয়ে একদিনে সব কেনাকাটা করে ফেলব। কিন্তু হয় না। একটা একটা করে রোজা যায়।

আজকাল রোজা আসার আগে প্রায় সকলেই ঈদের বাজার করে ফেলেন। রোজা শুরু হওয়া মাত্রই মুসলমান পাড়াগুলোর দর্জিরা অর্ডার ক্লোজড-এর নোটিশ ঝুলিয়ে বলে রোজার আগেই কাপড় কিনে দিয়ে দিতে হয়। নইলে রেডিমেড দিয়ে কাজ চালাতে হবে। ইদানিং কয়েক বছর রোজা আর পুজো প্রায় পাশাপাশি পড়ছে বলে দর্জিপাড়ায় এমনিতেই চাপ। শুধু ঈদের বাজার বলে নয়, রোজারও ত একটা স্পেশাল বাজার হয়, সেটাও রোজা আসার আগেই করে ফ্যালেন অনেকেই। ভালো কোয়ালিটির খেজুর, নানা রকমের ডাল, ছোলা, মটর, চিনি, তেল, হালিমের ডাল ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং শুধু বাজার করা নয়, ফোন করে আত্মীয়-স্বজনেরা একে অন্যের খবরও নেন, রোজার বাজার হয়ে গেছে তো? সেই ফোন কলগুলো অনেক সময়ে আইএসডিও হয়। এমন তো নয় যে রোজার সময় দোকান-পাট বন্ধ থাকবে বা যাঁরা রোজা রাখবেন তাঁরা কেউ বাজারে যাবেন না কিন্তু তবু এই জিনিসগুলোকে একসাথে সামর্থ অনুযায়ী কিনে রাখা। গোটা একটা মাস ধরে সিয়াম সাধনার প্রস্তুতি এভাবেই শুরু হয়।

খেজুর। অনেক রকম ব্যপার স্যাপার আছে তার। রকমারী চেহারা, কত দেশ থেকে আসে তারা। এক এক দেশ থেকে আসা খেজুরের চেহারা এক এক রকম। বড় বড় দানার কালচে লাল আর লম্বাটে একটা খেজুর আসে, যার নাম মরিয়ম খেজুর। মাতা মেরির নামে খেজুরের নাম। নিউ মার্কেটের বড় ড্রাই ফ্রুট ব্যবসায়ী ছাড়া এই মরিয়ম খেজুর পাওয়া যায় স্পেন্সার বা বিগ বাজারে বা বড় বাজারে। ছোট ছোট বক্সে করে অসম্ভব চড়া দামে সেই খেজুর বিক্রি হয়। নিম্ন মধ্যবিত্তদেরও দেখেছি বাজারের অন্য জিনিসে কাট-ছাট করে মরিয়ম খেজুর না হলেও মোটামুটি বড় আর গোটা দানার বিদেশী খেজুর কিনে নিয়ে যেতে, আরবের খেজুর বলে যেগুলো বিক্রী হয়। আরব বলতে সাধারণত লোকে সৌদি আরবকেই বা আরেকটু স্পেসিফিক করে বলতে গেলে মক্কা বা মদীনাকেই বোঝে যদিও বাজারে যা খেজুর পাওয়া যায় তার বেশির ভাগই আসে মালয়শিয়া, ইরাক, ইরান বা আমিরাত থেকে। ঐ আরবী খেজুরে রোজা খুললে তাতে পুণ্য বেশি হয় বলে তাঁদের বিশ্বাস। বড় গোল থালায় সাজানো নানা রকম ফল, ভাজা-ভুজির সাথে রাখা সেই খেজুর দুটো বা তিনটে করে তুলে নিয়ে সারাদিনের উপবাস ভঙ্গ করেন তাঁরা।



[আরেকটু লিখব]

Saturday, September 11, 2010

পায়ে পায়ে ঈদের পথে

গোটা মাস একদিনের জন্যেও কেনাকাটায় না গিয়ে শেষ মুহুর্তে সারাদিন বাজার কলকাতায়। কলিন লেনের শামীম ভাইয়ের দোকানের মাংস, নিউ মার্কেটের কাশ্মীরি হোসেন ভাইয়ের দোকানের জাফরান আর আরো আনুষাঙ্গিক টুকটাক এটা সেটা। প্রচন্ড ভীড়ে ঠেলে এই দোকান ওই দোকান ঘুরে ঘুরে বাজার। সন্ধেবেলায় বাড়ি ফেরার পথে একে তাকে ফোন, চাঁদ উঠল কী! এপাতায় ওপাতায় খোঁজ। জানা গেল, মসজিদে তারাবীর নামাজ চলছে। তার মানে একটা দিন সময় পাওয়া গেল পথ ভুলে যাওয়া সেলুনে গিয়ে নিজেকে খানিক সেবা দেওয়ার। এক ফাঁকে বন্ধুর সাথে বসে বারিস্তার ডবল এসপ্রেসো। মাথা ধরা তাতেও কমে না যদিও..

শেষ সন্ধেয় ঈন্ডিয়ান আর্ট কলেজের গেস্ট হাউসে মাহমুদুল হক স্যারের সাথে বসে কথামালা। এশার নামাজ আর তসবীহ পরা শেষ করে এসে যোগ দেন হক ভাবী। তিনি আবার ব্ল্যাক লেবেল ছাড়া খান না। ইতিমধ্যে উঠে গিয়ে নামাজ সেরে আসেন স্যারও। বিশাল টেবিল ভর্তি নানা রকমের চিপস ভুজিয়া লবনাক্ত কাজু আর ব্ল্যাক লেবেল। আরাফাতের বিরিয়ানি আর চাপ। হক স্যারের চাঁদ রাতের সেলিব্রেশন। এসেছে লিপি আর মাহবুবও। গ্যালারি আকার প্রকারে মঙ্গলবার থেকে ওদের প্রদর্শনী।

রাত দশটায় আড্ডা শেষ হয়ে যাবে এটা জাস্ট হতে পারে না। চাঁদরাতের কলকাতা ঘোরার ইচ্ছে চাপা পড়ে ট্যাক্সিওয়ালা ভাইয়ের অনিচ্ছায়। ঠিকানা হিন্দুস্তান পার্ক, লিপি-মাহবুবের অস্থায়ী ডেরায়। সেখানে অপেক্ষায় রাশান ভদকা। শুভ আর আলোকচিত্রী বন্ধু দেব নায়েক তখন নিয়মমাফিক সান্ধ্য আড্ডায় কালো কুকুরের সাথে। রাশান ভদকার টানে শুভ আর দেবও চলে আসে লিপি মাহবুবের ডেরায়। গেস্ট হাউসের রিসেপশনের তাড়ায় আমরা আবার পথে..
শুনসান রবীন্দ্র সদন। পথশিশু নিশ্চিন্তে ঘুমায় ফুটপাথে। সারাদিনের বিক্রি বাটা সেরে দোকানি তার দোকান, যা কিনা খোলা আকাশের নিচে একখানা টেবিল সেই টেবিলের উপর পলিথিনে পসরা ঢেলে ঘুমে অচেতন পলিথিনে ঢাকা পসরার উপর। দুই পাশে বাপ মাকে নিয়ে বছর খানেকের শিশুটিও হারিয়ে আছে ঘুমের দেশে। হাতটা শুধু মুঠো করে ধরে আছে মায়ের কাপড়ের একটা অংশ। ক্যামেরায় ছবি ওঠে ক্লিক ক্লিক। আমি মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে সদ্য ইন্সটল করা বাংলা ফন্টে দেখি সচলায়তন, ফেসবুক, আর জিমেলের বাজ..

রাস্তায় খানিক পরে পরেই বাইকে করে হুল্লোড় করে ছেলের দল উদযাপন করে চাঁদরাত। নিঝুম রাতে সাঁই সাঁই ছুটে যায় তাদের মোটর বাইক তিন-চারজন করে সওয়ারি নিয়ে। ফুটপাথে বসে আমি অপেক্ষা করি একটা ট্যাক্সির নিদেনপক্ষে একটা শেয়ারের গাড়ির। লরিগুলো গজগামিনী স্টাইলে এগোয় বিদ্যাসাগর সেতুর দিকে। আমাদেরকে টোল অব্দি পৌঁছে দেওয়ার তাদের কোনো ইচ্ছে নেই। খালি ট্যাক্সিগুলো কথা শোনে না। ওরা এগিয়ে যায় যে যার ইচ্ছে মতো। ফুটপাথের আসন ছেড়ে এগোই ট্যাক্সি ধরার আশায়। কী ভেবে যেন একজন রাজিও হয়ে যায়। আমি তুলে নেই অপেক্ষারত আরো দুজন মানুষকে। ওরাও বাড়ি যাবে। সকাল হলেই ঈদ..


সকল বন্ধুকে ঈদের শুভেচ্ছা, ভালবাসা।
ভালো থাকুন সবাই..

Thursday, September 02, 2010

Ever shadwoing me

I never trust cats, they are vehicles of ghosts. As there’s no way of recognising which one’s a cat and which one a ghost, all cats were in my suspects list. And if a cat ever somehow passed by my feet, then death was certain. Neither would anyone get the slightest hint of how the death would take place, and when. Why, just recently, a ghost in cat’s guise actually killed a friend of father’s. Simply dug into and tore his throat. And that Tareque uncle couldn’t do a thing. How could he? Can anyone stand up to ghosts and djinns? Hamdu aunty (Hamid uncle’s wife) had come during youngest uncle’s marriage. She taught that whenever one senses a ghost nearby, the mantra must be recited. Apparently the ghosts would then become aware that this person possesses the great mantra, that no harm can be done him.


Ghostie’s my laddie
Witch’s my maid
O my dear cheap thief
What’ll you do to me?


That’s why I never give any cat a chance to pass beneath my feet. When I sit to eat, I sit with both my legs raised and folded on the chair. But the cats too don’t stop following me. Whenever they get the opportunity they stare intently. They let me know that they know my motives. I’ve been timid from my childhood. Fragments of incidents narrated by friends of my age; the kadam tree standing in one corner of the field, solitary in night’s darkness; the dark of night; all the true-false tales told by the maidservant aunties - all made me permanently timid.



That day returning home drenched in the pouring rain I saw mother was sleeping. Glancing from the veranda I saw the rain water flowing like a waterfall down the second-floor tin roof. Checking once again to see if mother was indeed asleep, I was under that waterfall. The rear of the house was usually quite dirty. Even though the rear courtyard was fairly large, it was not used for anything other than throwing garbage. Just beside the spot where I was standing and bathing in the water of this waterfall was a narrow open drain. As I’d slipped and fallen into it earlier, I knew there was really murky foul water there, which came to my knees. Now, in this torrential rain it had turned into a wide stream.

Fee fie foe
To uncle’s house I go
Aunty gave me milk and rice
Ate till I was full so nice
Uncle comes with a mace oh me
Oh lets flee!

I didn’t notice that an unknown cat came and stopped on the sunshade beneath the second-floor railing. As soon as I spotted it, forgetting all about the rain waterfall bath I became statue-still. I stared unblinking at the cat and the cat too gazed specifically at me with its cold fixed eyes. As soon as my wits returned, just as I was about to scream out Mummy and run, as soon as I put out my foot one leg fell straight into that drain. Mother heard the scream as well as the sound of falling. Rushing there and not finding anyone, she shouted out, Who’s that? What’s happened? I somehow managed to utter, Its me Mummy! By then the cat had disappeared. Having slipped and fallen into the drain, I had hurt myself quite a bit, and on top of that mother first landed two round blows on my back and then dragged me along to the water-tap.


I believe girls’ open hair is loved by evil djinns. Granny said that at twilight (just before and after sunset) all the djinns and ghosts roam around. Hence I was not to go out after evening with my hair open. As soon as the evil djinn spotted open hair it came and made a nest. And if the djinn took a liking to that girl then it was an even graver problem. The djinn married the girl, and started a family with her. Humans cannot see djinns with their eyes. Only those whom the djinns wished to be seen by could see them. The girl would talk to and laugh with the djinn. Cook for him. Even while living among everyone, the djinn remained unseen and so people thought she had become mad. And then she was done for! Stratagems for curing the girl’s madness would start. The moulvi sahib would come. He would make her wear many talismans. Reciting the Surah Fatiha, he would impart water sanctified with his breath. "All praise belongs to God alone, Lord of all worlds …" Reciting the Astagafar and blowing repeatedly into a black braid, he made nine knots and tied it to the djinn-possessed girl’s hand. So that the djinn wouldn’t be able to come near the girl any more.

Astag firullaha rabbi min kulli jambi watubu ilika la howla wala kuyata illa billa hil aliul azim

Despite drinking the sanctified water, the girl did not get well. The djinn was not going to leave the girl at any event. Then there are many djinns who take away the girl they fancy. Who are never found again.

That’s why as soon as its evening I tie up my hair tight. I don’t want to go to the veranda after dusk. The kadam tree in the corner of the field is clearly visible. Darkness nestles thickly on this kadam tree. If for some reason I need to go to the veranda, I force my eyes to keep away from this kadam tree. All the time I think someone watches me from there. Two red eyes. Unblinking, as if they are staring at me, as if were I to dare to look, it would call me with a gesture. Night after night, I keep my eyes away from this kadam tree. As soon as its evening I shut the room’s window. The cat that mews and roams around nearby at daytime, and creeps in and sits under the dining table – at night, the same cat sits perched on this kadam tree. Its eyes are red then. It gazes unblinkingly at me.


But when the kadam blooms during the rains, then on most days, I go with Hena, Mili and Setu to pluck those blooms. Setu too loves kadam flowers. Mili and others sing a ditty:

Moon’s risen
Flowers bloomed
Who goes under the kadam tree?
Little girlie will be wedded
With her head fully covered.

Sometimes I go alone too. The kadam tree really draws me. When I wake up in the morning and go to the veranda, my eyes first settle on that kadam tree. Then I can’t see two red eyes. Then it’s not a nest of any evil djinns. Then it’s just a kadam tree. Its branches and leaves sway in the breeze. Rain falls on the flower-bedecked kadam tree. On some days, right in the morning I go out all alone, across that small field, to the base of the kadam tree. My heart thumps in fear. Yet I go. I can’t stay away. That kadam tree really pulls me.

Noni’s dad says, Afa my dear, don’t leave your home at all at night. I see all that happens at night. I ask Noni’s dad, Old Mian, don’t they say anything to you? Noni’s dad, our old watchman answers, but I recite prayers and blow sanctifying breaths over my body and keep my body shut. That’s why they can’t do a thing to me. Otherwise they’d have finished me off long ago! I plead with Old Mian to teach me to shut my body. I too want to go out at night. I want to go beneath the berry tree. I want to pluck that large safeda from the slender winding branches of the safeda tree. I want to stand leaning on the railing of the second-floor and gaze at the night sky. If Old Mian doesn’t teach me body shutting, then I wouldn’t be able to go out at all. All the time I’d have to stay the way I now do, if I ever awaken at night, keeping my eyes shut tight and lying curled up. How Old Mian, turban on his head, staff in hand, walks around the house all night long! Deep into the night, he recites the Darud tunefully:

Nur mohammad sallallah
Mafi kalfi gairullahAll
recite with pure hearts
La ilaha il allah

My sleep breaks, I lie with my eyes shut. Does Old Mian see them right now?

I can’t speak to anybody about this fear and anxiety of mine. At exactly nine thirty in the morning Setu appears. Its time to go to school. Setu and I study in the same school. White salwar-kameez, pleated white odna tucked into the broad green belt on the waist. Hurriedly grabbing the tiffin money from mother I go out. Setu and I go to school by cycle-rickshaw. My most favourite class is Rubina Apa’s class. Rubina Apa taught Bengali. Most of the girls felt thirsty during the class. For Rubina Apa was very nice. She didn’t make any girl stand outside the class. As many times as the girls asked questions about the subjects, so many times did she explain.

Not a home, but a bird’s nest, a cataract of torn leaves
Just a little bit of rain and the water drips.
Just a bit of breeze and the shanty quivers
Beneath that live the angels all year long.
Can’t eat to belly’s fill, the few bones sticking out of her chest
Are witness to the days she’s gone without food.
Sweet face, lit bright by her smile
Extinguished by the slap of great deprivation
.Clad in a patchwork of hundreds of torn cloths
That mock the golden hue of her colour.
Not a trace of laughter in your two black eyes
From where a flood of tears flow.-Jasimuddin

She told us stories on the pretext of study. Holding the thread of the tale or poem taught she would wander to a land of many more tales. She spoke of poets. Spoke about writers. The question arose in my mind: so beautiful looking was Rubina Apa, didn’t any djinn take a fancy to her? Rubina Apa didn’t wear a head-scarf. So did Rubina Apa know how to shut her body? I ask Setu. Setu says a djinn’s going to take you away for sure one day!

Every Thursday night Old Mian sees them. Apparently there are four or five of them. Really tall. Moving their immense legs they walk over our house and go towards the hillock behind. My sleep is broken again and again on this night. Even if the curtain moves in the wind of the fan I think someone’s in the room. I recite the Ayatul Kursi and blow on my chest:

Allahu la ilaha illa-aa huyal haiyul quaiyum. La ta’khuju hu sina tu wala naum. Lahu ma fis sama wati wama fil arad …

The night seems terribly long and vast.


The original story in bengali is Amar pichu charhe naa. 
Translated by V. Ramaswamy, the translation of my story was published in Metamorphoses, spring issue, 2009.

Sunday, July 25, 2010

মনমাঝি তোর বৈঠা নে রে, আমি আর বাইতে পারলাম না

মাঝে মাঝেই ঘর হইতে শুধু দুই পা ফেলবার জন্যে প্রাণ যখন আই-ঢাঁই কত্তে শুরু করে আমরা তখন বেরিয়ে পড়ি। এথায়-সেথায়, হেথায় বা হোথায়। এমনি এক দুপুরে ঠান্ডা মেশিনের হাওয়ায় যখন আমার খুব ঠান্ডা লাগতে থাকে আর পাখার বাতাসের অল্প গরম হাওয়ায় তার খুব গরম লাগে তখন আমরা বেরিয়ে পড়ি। কোথায় যাই? দিদিমনির কল্যাণে শহর স্তব্ধ। গাড়িও নাই ঘোড়া তো নাই ই। গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ ডাকছে বুকের ভেতরে কোথাও। যদ্দূর যাওয়া যায় আর যেমনি করে যাওয়া যায়। আমরা বেরিয়ে পড়ি পথে। এমনি করে আর অমনি করে কোনোরকম করে আমরা পৌঁছে যাই এক বাগানে।

ইয়াব্বড় এক বাগান। সেই আদ্যিকালে কোনো এক বদ্যিবুড়ো বানিয়েছিলেন। নানান রকম গাছ, লতা-পাতা, ঝোপ-ঝাড়, বাঁশের ঝাড় আর শুকিয়ে যাওয়া সব ছোট ছোট পুকুর বা ঝিলে পদ্মেরা আজও ফুটে আছে যত্নে বা অযত্নে। চারিদিকে সব সবুজ। কী সবুজ কী সবুজ! তাও তো আমার দ্যাশের মত নয়! তাতে কী। সে তো আছে বুকের ভিতরে। সঙ্গে সঙ্গেই থাকে সর্বক্ষণ। আমরা এগোই। মাথা উঁচু লম্বা লম্বা সব গাছ। কোনোটা সাদাটে, কোনোটা ক্ষয়ে আসা। কোনো গাছে শুধুই ফুল, কোনো গাছ আবার শুধুই পাতায় ভরা। বৃদ্ধ গাছেরা মরে গিয়ে ভেঙে পড়ে আছে হেথায় হোথায়। সরকারি ডেথ সার্টিফিকেটের অপেক্ষায়। আমার মাথায়ও আছে কিছু মৃত কোষ, তাই ভুলে যাই বাৎলে দেওয়া সব গাছেদের নাম। ফিকে গোলাপি ফুলে ভরা গাছটার তাই নাম মনে নেই এখন আর। শুধু চোখ জুড়ে থাকে অযত্নে পড়ে থাকা এক বিশাল বাগান। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিই। তাজা বাতাসে দু-একটা মরে যাওয়া কোষ কি আবার বেঁচে উঠল? কে জানে! ডাক্তার ভাল বলতে পারত কিন্তু সে কোথায়? কদ্দিন কথা বলিনি তার সাথে...

বাহারী ক্যাকটাসেরা সব ঘরের ভিতরে বন্দী, লোহার শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা দরজার ওপারে। কী? না, লোকে নাকি চুরি করে নিয়ে যায়! যাগগে। আমাদের তো ওই ছায়ায় ঢাকা সরু পথ আর দুপাশে সব নাম না জানা অচেনা গাছেদের দেখতে দিব্য লাগে। মাঝে মাঝে জলহীন পুকুরে পদ্ম দেখি। এ নিশ্চয়ই স্থলপদ্ম নয় কিন্তু তাও বেঁচে আছে আছে এই বর্ষার জলহীন পুকুরে। প্রায় শুকিয়ে যাওয়া পুকুরে গোল গোল বিশাল বিশাল পাতারা ভেসে আছে, শুনলাম, সেই কোন সুদূর সাগরপারের দেশ থেকে আনা হয়েছে এই পাতাদের, চার-পাঁচ বছরের বাচ্চারা নিকি দিব্যি ভেসে থাকতে পারে এই পাতায়, নৌকোর মত করে! এই পুকুরে অবশ্য এই পাতায় বসলে কেউই ডুববে না কিন্তু সে অন্য কথা। আমার মাথার মৃত কোষেদের কল্যাণে এই পাতাদেরও নাম ভুলে গেছি..

দাঁড়াই মহুল গাছের নিচে। ছোট্ট ছোট্ট কালজামে ভরে থাকা গাছের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি। দেখি দারুচিনি গাছ। আমি শুনেছি দূরে কোথায় যেন একটা দারুচিনি বন আছে। আমি কোনোদিনও সেথায় যাইনি। আছে কী নেই তাই বা কে জানে। আর যদি থেকেও থাকে তো সেথায়ও হয়তো কোনো দরজা দিয়ে তাতে আটকে দেয়া হয়েছে লোহার শেকল আর তালা। জানি না..

আমরা পৌঁছে যাই গঙ্গার ধারে। ফুরিয়ে আসা বিকেলে সরু রাস্তায় নটা-পাঁচটার সাইকেল। ক্ষণিক দাঁড়িয়ে ফিরতি পথ। ওই জালে ঘেরা গঙ্গা পোষায় না। ছোট ছোট পা ফেলে গঙ্গাকে পেছনে রেখে আমরা ঝিলের দিকে যাই। মেমসাহেবেরা যেখানে পা চালিয়ে সৌখিন নৌকো চালাচ্ছে। এই ঝিলের জল টলটলে। দু'পাশে বড় বড় গাছ ছায়া দেয় সর্বক্ষণ। শান্ত নিথর জলে সৌখিন নৌকোরা চলে একের পর এক। বিকেলে ঘরে ফেরার ডাকে পাখিরা সব গাছমুখী। যেতে যেতে শুনিয়ে যায় ঘরের ফেরার গান। আমরা কান পেতে শুনি..

মাথার ভেতর একটা হেলিকপ্টার চলার বিকট শব্দ বাজতে থাকে ক্রমাগত, কখনও বাড়ে, কখনও কমে। জালে ঘেরা গঙ্গার ওপারের পাওয়ার হাউস বলে দেয়, কপ্টার তোমার মাথায় নয়, এখানে চলছে! আমাদের এই জালে ঘেরা গঙ্গা চাই না, আমাদের গঙ্গায় নৌকা চলবে পাল উড়িয়ে, মাঝি গাইবে, 'মনমাঝি তোর বৈঠা নে রে, আমি আর বাইতে পারলাম না..'

আমরা সেই গঙ্গার খোঁজে বাইরের দিকে। বাগানে সন্ধে নামে সাইকেলের ঘন্টি বাজিয়ে। পানায় ভর্তি এক সরু লেক পড়ে ফেরার রাস্তায়। মিনারেল ওয়াটারের খালি বোতল আর চিপসের খালি প্যাকেটেরা ভেসে বেড়ায় কচুরি পানার সঙ্গে সঙ্গে এই লেকের জলে। মাছের পচা গন্ধে নাক কুঁচকে আসে লেক কাছে আসতেই। ছোট্ট একখানি ভিড় লেকের ধারে, কালভার্টের উপর। লেকভর্তি কচুরি পানারা নাকি মরে গিয়ে বিষাক্ত করে তুলেছে জল, সেই বিষে দমচেপে মারা গেছে অজস্র অগুন্তি মাছ। ফুলে ফেঁপে ওঠা মাছ দেখতে পাই হলদে হয়ে আসা পানার ফাঁকে ফাঁকে। ভিড় করা মানুষেরা মাছের ওজন আর কতো মাছ মরে গেছে সেই হিসেব করছেন। কেউ দুষছেন বাগানের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের তো কেউ হিসেব দিচ্ছেন লেকের দায়িত্বে থাকা লোকেদের কাজের মেয়াদ কবে ফুরিয়েছিল, জমা পড়া টেন্ডার কবে খুলবে আর কবে নতুন লোক কাজে লাগবে। সেই হিসেব খানিক শুনে নিয়ে আমরা আবার হাঁটি। এবার গঙ্গার খোঁজে...

[আরেকটু লিখব]

Wednesday, February 17, 2010

লিখব ভাবলেও লেখা হয় না- কলকাতা বইমেলা


কিছু কিছু জিনিস আছে যা অনেক বলেও যখন কাউকে বোঝানো যায় না তখন নিজেই নিজেকে বোঝাতে হয়, কেউ বুঝবে না বলে। তখন নিজেকে সরিয়ে নিতে হয়, হেথায়, হোথায়। ভেতরকার দায়িত্ববোধ, ভালবাসা যখন কিছুতেই স্বস্তি দেয় না তখন আবার আপোস। ফিরে চল মন মিছে হাসি, মন না চাওয়া সব কথার জগতে।

বইমেলা নিয়ে রোজ লিখব বলে ভেবেও লেখা যাচ্ছে না। ব্যস্ত আছি বলাটা খুব একটা সত্যি নয়। অনেকে সারাদিন কাজ করেন, বাড়ি-অফিস-ছেলে-মেয়ে আর আরও সব আনুষঙ্গিক কাজ কম্মো করেও ঠিক সময় বের করে লেখেন। আমি একজন বেকার মানুষ। চাকরি-বাকরি কস্মিনকালেও করিনি, বাড়ি ছানা-পোনা আর অলস গুলতাপ্পি। এই আমার জীবন। মাঝে মাঝে কম্প্যুটারে টাইপ করতে বসি, সক্কলকে বলি, লেখালেখি করছি আর নিজেও বেশ আত্মপ্রসাদ অনুভব করি। আসলে কোনোকিছু করি না বলে কেউ যেন খুব ফ্যালনা না ভেবে বসে তাই এই টাইপে যাওয়া। আমার ছেলেমেয়েরাও আমাকে এভাবেই দেখে অভ্যস্ত, মা সারাদিন অলস সময় কাটায় আর মাঝে মাঝে বসে টাইপায়। হঠাত্ করে পরপর এই মেলা নিয়ে আমার দৌড়ুনো দেখে ওরাও তাই বেশ খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা। কারণ রোজকার নিয়ম-কানুন সব ঘেঁটে ঘন্ট। ছেলের উচ্চমাধ্যমিকের টেষ্ট পরীক্ষা চলছে রোজ, আর মা ভালো মায়েদের মত ছেলেকে সঙ্গ দেওয়া ছেলের দেখাশোনা না করে প্রবল ব্যস্ততা দেখিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু ছেলে আমার সত্যি বুঝদার। মা কিছু একটা কাজ করছে জেনে নিয়ে কোনো বায়না তো করছেই না বরং রোজ রাতে ফিরে এলে খোঁজ খবর নিচ্ছে, কত বিক্রি হলো, আমার দিন কেমন কাটলো, আমি খেয়েছি তো দুপুরে? যেখানে নেটওয়ার্ক সমস্যার জন্যে আমি সারা বিকেল-সন্ধ্যা একবার ফোন করেও খোঁজ নিতে পারছি না সে কখন ফিরলো, পরীক্ষা কেমন হলো। এই যেমন ঠিক এক্ষুণি সে এসে জানতে চাইল, মা নো মেলা টুডে?


টুকরো কথা-মেলা কথা


এত ভ্যানতারা করলাম কিন্তু আসল কথাই বলা হয়নি। গতকাল সোমবারের মন্দার বাজারেও গুরউচন্ডা৯ বেশ ভাল জায়গায়। চটি-কাগুজে গুরু দুইয়েরই বেশ ভালো চাহিদা এবং বিক্রি। হতেই হবে, বিক্রেতা যেখানে শাহজাদী, জো বোউলার!

এক চটি- 'পূর্ব প্রকাশিতের পর'এর লেখক, যিনি এখানে বর্তমান, তাঁর কাছ থেকে বেশ কয়েকজন সইও চেয়ে নিলেন। লেখক বেশ গম্ভিরমত মুখ করে স্কেচ এঁকে সই করে দিলেন। বইয়ে সই করা দেখে পাশ থেকে কাগুজে গুরু বাড়ি দিলেন একজন, আমাকেও সই করে দিন, আর অমন স্কেচও এঁকে দিন! তাঁকে বলা হলো, বই কিনুন সই-স্কেচ সব করে দিচ্ছি। বই না কিনেও তিনি সই পেলেন ম্যাগাজিনে।

চা খেতে গিয়ে সেখানে দেখানে হলো এক মুখচেনা ভদ্রমহিলার সাথে, আসবে না আমাদের টেবিলে? চলো চলো! হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো চটির ব্যাগ:-)

এক ব্যাগ চটি এত কম দামে পেয়ে অনেকেই বেশ অবাক! আরেকজন বললেন, এত খচ্চাই যখন করলেন, তখন একটা ব্যাগও তো রাখতে পারতেন, এই যে মুখে বলছেন, একব্যাগ চটি, সত্যিই যদি ব্যাগে দিতেন, কত ভালো হতো!

কাল আমি স্মার্টলি গুরুচন্ডা৯ হয়ে গেলাম। মানে ঐ ওর্কুটের প্রোফাইল যিনি মেইন্টেন করেন আর কি:-) এতদিন ধরে সমানে বলে যাচ্ছিলাম, আমি তো নইই, কোনো মহিলাও নেই ঐ প্রোফাইলের পেছনে। এবং মাত্র একজনও নয় , বেশ কয়েকজন আছেন ওই প্রোফাইলের পেছনে, যার যখন সময় হয়, সে তখন বসে পড়ে:-) কিন্তু গুরুর নাছোড়বান্দা ওর্কুটবন্ধুরা কিছুতেই সেটা বিশ্বাস করবে না। তো কাল আর সেই চেষ্টাও করিনি, হেসে মাথা নেড়েছি, তিনি বুঝে গেছেন, আর হাসিমুখে এক ব্যাগ চটি, এক সেট কাগুজে গুরু নিয়ে গেছেন..

কাল ব্যাঙ্গালুরুর ভুতোবাবু মেলায় এসেছিলেন। তিনি নাকি ১০বছর পর বইমেলায় এলেন! প্রচুর বই কিনলেন, যেগুলোর অর্ডার তিনি লুরু থেকে নিয়ে এসেছিলেন।

আমরা ফেরার সময় খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম কে সি পালকে, তার থিয়োরি লেখা কাগজ নেবো বলে। দীপুর একপিস চাই। না পেয়ে ভাবলাম, কাল দেখব। ওমা! রাস্তাতেই তো কতো পড়ে আছে! লোকজন হাতে নিয়ে যেগুলো মুচড়ে ফেলে দিয়ে গেছে! তো সেই দোমড়ানো কাগজ দু পিস তুলে বড় ভালবেসে সেগুলোকে সোজা করে ভুতোর ব্যাগে ভরে দেওয়া হলো দীপুর জন্যে..


ও। আমরা একপিস চটিও কিনলাম ফুটপাথের চটির দোকান থেকে, দশ টাকায় যেখানে বিক্রি হয় সমস্ত চটি। আমার ভদ্রলোকটি কিনলেন এসএমএসের চটি। সহজ বাংলা এসএমএস।

(পরে আবার হবে)

Sunday, February 07, 2010

কাগুজে গুরুর বইমেলা অভিযান

প্রথম ও দ্বিতীয় দিন
------------------

এদিকে গুরুগণ বইমেলা- বইপত্তর নিয়ে নানারকম প্ল্যান প্রোগ্রাম, সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে চরম ব্যস্ত। আমার বাড়িতেও তুমুল ব্যস্ততা। রাত-দিন ফোনাফুনি, মেলা-মেলি, টাইপা-টাইপি। ওফফ্ফ
... গুরু পাঁচ নামি নামি করছে, প্রেসে যাবে কে? আমার ভদ্রলোকটি দৌড়ুলেন বইয়ের খোঁজে, হাতে নিয়ে এক্কেবারে মেলায় যাবেন! ততক্ষণ হাতে যা আছে সম্বল তাই নিয়ে আমি গুটি গুটি পায়ে মেলার পথে। সেখানে আবার এক ডাগদারবাবু আসিবেন বলিয়া জানাইয়াছিলেন। আসবে স্যান বালিকা, টিম্ভাই। মেলার গেটে দাঁড়িয়ে বইয়ের ব্যাগ হাতে বাবাই।

প্রেসিডেন্সি আর নন্দন দু জায়গাতেই বেশ সহজেই কা গু জাঁকিয়ে বসেছিল প্রথম দিন থেকেই। চেনা জানা সব লোকজন এসেছেন, পত্রিকা নিয়ে গেছেন, চন্ডালেরা এসেছেন, জোর আড্ডা হয়েছে ক'দিন। কেডি দশ হাতে সব সামলেছেন। রং বেরঙা জামা পরে মেলা ঘুরে, বুকের পরে কাগুজে গুরুর পোস্টার সাঁটিয়ে লোক পর্যন্ত ডেকে এনে বই বিক্রি করেছেন। এতসব কান্ড করতে গিয়ে খানিকটা কাবু হয়ে পড়েছেন শরীরের হাতে। প্রেসিডেন্সি-নন্দনের মেলা শেষ হতে না হতেই আবার অসুস্থ শরীর নিয়ে জুটে গেছেন নিখিল বিশ্ব বঙ্গ ভাট সম্মেলনের আয়োজনে। সেটাকেও সম্পন্ন করেছেন সফলভাবে। কিন্তু শরীর বলে, বাবাজী। মেলা হয়েছে, এবার একটু আরাম দাও আমাকে। ব্যস। কাবলিবাবু কাবু! ফলে যা হল, কলকাতা বইমেলায় গুরুচন্ডা৯ যাত্রা শুরু করল কাবু কাবলি মুখার্জীকে ছাড়াই।

কোথায় মমার্ত কোথায় কী। মেলায় শুধু ধুলো আর ধুলো। দু মাস লাল রঙের চোখ রাঙানি সহ্য করে সদ্য সেরে ওঠা চোখে আমার তুমুল জ্বালা ধুলোর ঝাপটা খাওয়ামাত্রই। উবুদশ খুঁজে পাবো না আমি জেনেও ডান-বাঁ কিছুই না বুঝে শুধু ঘুরে বেড়াই বেদিশার মতো। সাথে ঘোরে বেচারা বাবাই, যে কিনা আমার থেকেও বড় বেদিশা
: -( না পাওয়া যায় মমার্ত, না উবুদশ। সামনে দিয়ে কে বেরিয়ে যায়? সেও কি যেন খুঁজছে। মমার্ত কি? ঠিক! স্যানও মমার্ত খুঁজে বেড়াচ্ছে। সেখানেই ডাগদার্বাবু আমাদের সঙ্গীতাকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন যে! এগলি ওগলি সেগলি কোথাও নেই কাঙ্খিত মমার্ত। অগত্যা ডাগদারবাবুই এগিয়ে আসেন মেক্সিকোর পতপত করে উড়তে থাকা রঙীন কাপড়ের বিশাল ঘেরের প্যাভিলিয়ন পেরিয়ে।

বহুদিন বাদে দেখা সঙ্গীতার সাথে। ছোট্ট করে খানিক আড্ডা। আবার খোঁজ। উবুদশ। ভর্সা আছে মনে, পেয়েই যাব। তবে আমার ভাগ্য খুব ভাল কিনা তাই তখনও মেলায় পৌঁছননি অসিতদা। একমাত্র ভর্সা যাঁর পরে, মেলায় খানিকটা জায়গা তাঁর হাত ধরেই করে নেবে গুরুচন্ডা৯। ভাটুরেগণ ঢুকে যায় বইয়ের দেশে, বইয়ের ব্যাগ নিয়ে আমি উবুদশে, অসিতদা কখন আসবেন। আমার বেজার মুখ দেখেই হয়ত উবুদশের জাঁদরেল সম্পাদকের খানিকটা মায়া হয়, তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যান লিটল ম্যাগ কর্নারে, যেখানে পরবর্তী ১২দিন অধিষ্ঠান করবে কাগুজে গুরু। অসিতদার ব্যবস্থামত গুরুচন্ডা০ খানিকটা জায়গা পেয়ে যায় কণিকার টেবিলে। সহদৃয় অরিজিত বলেন, আপনি বসুন এই টেবিলেই, যতক্ষণ-যদ্দিন আপনাদের টেবিলের ব্যবস্থা না হয়। মনে প্রচন্ড ভয় তখন, যদি আদৌ টেবিল না পাওয়া যায়? অরিজিত বলেন, না পেলে এখানেই বসবেন আর কি। খানিক নিশ্চিন্ত হয়ে আবার সন্ধান, এবার ডাগদারবাবুগো। তাদের যদিবা পাওয়া যায় পাওয়া যায় না চায়ের কোনো দোকান। আবার খোঁজ। এদিক সেদিক। আসলে কোনো দিকেই নয়। প্রায় একই জায়গায় ঘুরপাক। অগত্যা চায়ের আশা বাদ। আমি ৬৭নম্বর টেবিলে এবং জনতা আবার বইয়ের দেশে।