Thursday, August 06, 2009

এমনি এমনি

বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভাঙল আজ খুব ভোরবেলায়৷ আধোঘুমে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, শব্দটা বৃষ্টির নাকি জানলার ওপাশের আধখানা শেষ হওয়া বাড়িটির ছাদের জমানো জল গড়ানোর৷ খানিক এপাশ-ওপাশ করে আরো একটু ঘুমিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও ঘুম আর এলো না৷ কানে ততক্ষণে পরিষ্কার রিমঝিম বৃষ্টি৷ যাহ৷৷ আজকেও বাজার যাওয়া হল না৷ তার মানে আজকেও ডিম আর ডাল?! আর যা বৃষ্টি পড়ছে, বুয়ার তো আজকেও নিশ্চিত ছুটি! সব গেল! হড়বড়িয়ে জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে বোঝা গেল, এ বৃষ্টি শিগগির থামার জন্যে নামেনি৷ ঘড়ির কাঁটা যদিও বলছে বেলা হয়েছে কিন্তু বাইরে তাকিয়ে সেটা বোঝার উপায় নেই৷ আধো আলো আধো অন্ধকারে সকাল যেন আড়মোড়া ভাঙছে সবে৷ ঝুম বৃষ্টিতে সব জলছবি৷ 

বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আমি চোখের সামনে ডিম দেখতে পেলাম, সাদা সাদা ডিম! ক'দিন ধরেই চলছে এই। রোজই বাজারে যাবো যাবো করেও আর হয়ে উঠছে না আর ডিমও সমানে চলছে কিন্তু মুখে আর রুচছে না, বাজারে যেতেই হবে তাছাড়া বাজারে আজকে নিশ্চয়ই ভাল মাছ পাওয়া যাবে, নতুন পানির সব মাছ নিশ্চয়ই এসেছে আর ইলিশ! হয়ত ধরা-ছোঁয়ার দামের মধ্যে ইলিশও পেয়ে যেতে পারি এমন বাদল দিনে! এই বৃষ্টিতে ক'জন বাজারে যাবে আজ তাও সপ্তার এই মাঝখানে? আজকে বাজারে ভাল মাছ না উঠেই যায় না! মাছ আর ডিমের মাঝখানে কলিং বেলে ডাকে সুইপার, একবারের বেশি দু'বার সে বেল বাজাবে না, আর দরজা খুলতে মিনিটখানেক দেরি করলেও তার টিকির দেখা আর পাওয়া যাবে না বলে আমি উঠেই পড়ি জানলার ধার ছেড়ে৷ বৃষ্টিবিলাস এই সকালবেলায় নয়৷
-----
শবে বরাত৷
সন্ধে থেকেই বাজি-পটকা ফুটছে দূরে দূরে। হালকা হলেও শব্দ শোনা যায় একের পর এক বাজি পোড়ার, উৎসবের আওয়াজ শোনা যায় দূর থেকে হলেও। 
হুম৷ আজকে বরাতের রাত৷ সারারাত জেগে নামাজ পড়ার রাত৷ একশ রাকাত নফল নামাজ বা তারও বেশি৷ যে যত পড়তে পারে৷ সারাদিন ধরে নানান রকমের হালুয়া বানিয়ে সন্ধেবেলায় দরজার বাইরে অপেক্ষারত সব ভিখিরিদের রুটি-হালুয়া বিলি করার রাত৷ না৷ এ'বাড়িতে কোনো ভিখিরি আসে না, না দিনে না সন্ধেয়৷ এ'পাড়ায় বোঝাও যায় না, কোনদিন শবে বরাত আর কোনদিন ঈদ৷ শুধু শবে বরাতের সন্ধেয় বাজি-পটকা ফোটে দূরে দূরে.. হালুয়া আমি এখনও বানাই তবে সে শুধু নিজে খাওয়ার জন্যে৷ খানিকটা ছোলার ডালের, খানিকটা মুগ ডালের আর খানিকটা সুজীর৷ ব্যস৷ 

এমন সব দিনে আমার পুরনো সব কথা মনে পড়ে
পুরনো সেই দিনের কথা সেই কি ভোলা যায
নাহ
ভোলা যায় না..

সে'বছর শবে বরাতের আগের দিন আমরা বাড়ি যাই, দেশের বাড়ি৷ যেখানে আমার দাদা-দাদী থাকেন৷ আব্বা বেশ কিছু নতুন জামা-কাপড় কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন, অনেকগুলো শাড়িও৷ শবে বরাতে তো কেউ নতুন জামা-শাড়ি পরে না, কেন কে জানে আব্বা সেবার সকলের জন্যে নিয়ে এসেছিলেন৷ তার মধ্যে একটা নতুন শাড়ি ছিল আমার চাচীর৷ বায়না করে বসলাম, আমিও শাড়ি পরব, নতুন শাড়ি পরে নামাজ পড়ব! আমর বয়স তখন কত? আট-নয় হবে বোধ হয়৷ সারাদিন ধরে চাচী রান্নাঘরে, চালের রুটি, হালুয়া আর রোজকার রান্না৷
আমার দাদীর একটা স্পেশাল হালুয়া ছিল, সেটা দাদী নিজেই বানাতেন, এমনিতে দাদীকে রান্নাঘরে যেতে দেখিনি কখনো কিন্তু শবে বরাতের ওই স্পেশাল হালুয়া দাদী নিজে বানাতেন৷ বিশাল এক হাঁড়ির মধ্যে একটু মোটা করে চালা চালের গুড়োকে ঘিয়ের মধ্যে নেড়ে নেড়ে চিনি আর গুড় মিশিয়ে একটা হালুয়া বানাতেন দাদী, গোটা গোটা গরম মশলা আর কিশমিশ। সেই হালুয়া আর কাওকে বানাতে দেখিনি কোথাও, এখন অবশ্য চাচী বানায়, কিন্তু আর কেউ না৷ এমনকি আম্মাও না! ফকফকে সাদা চালের গুড়োর হালুয়াতে লাল রং আনার জন্যে দাদী চিনির সাথে গুড় মেশাতেন৷ তো সারাদিন ধরে রান্না হল কয়েক পদের হালুয়া, রুটি, মাংস৷ এমনিতে আমাদের বাজারে সব সময় গরুর মাংস পাওয়া যেত না, বিশেষ বিশেষ দিনে গরু জবাই হত তখন, তো শবে বরাতে বাজারে গরু জবাই হত, দাদা সকাল সকাল বাজার থেকে নিয়ে আসতেন সদ্য জবাই হওয়া গরুর মাংস৷ পুরো বাড়ি জুড়ে মিশ্র এক গন্ধ, হালুয়া, মাংস সেঁকা চালের রুটির গন্ধ৷ সব মিলিয়ে গোটা বাড়ি জুড়ে শুধু খাবারের গন্ধ৷ দুপুরের পর থেকেই লোক আসতে শুরু করল হালুয়া-রুটি খেতে৷ বড় বড় সব থালা-কুলোর উপর পুরনো খবরের কাগজ বিছিয়ে ভাগ দিয়ে রাখা হল সব হালুয়া রুটি, তিনখানা করে রুটি আর তার উপর দাদীর বানানো সেই হালুয়া এক খাবলা করে৷ সেই কোরবানির সময় থালায় করে মাংস রাখা হয় না? দশ-বারোটা করে ভাগ এক একটা থালায়? সব বাড়ি বাড়ি বিলে হবে বলে? এও ঠিক সেই রকম৷ এক একজন আসে, তার হাতে একটা করে রুটি-হালুয়ার ভাগ তুলে দেওয়া হয়৷ সন্ধে পর্যন্ত চলে এই রুটি হালুয়া বিলি৷ কোথা থেকে যে আসত সব মানুষ! এখনও কী আসে..

তিনসন্ধের সময় সূর্য যখন ডুবি ডুবি করছে, দাদী তখন জামা কাপড় নিয়ে পুকুরপারে রেডি, গোসল করবে বলে৷ শবে বরাত-শবে কদরের সন্ধেয় গোসল করলে পানির ফোঁটার সাথে সাথে সব পাপও ঝরে পড়ে যায় শরীর থেকে৷ আমিও গোসল করি দাদীর সাথে, পুকুরে গোসল করতে আসে আমাদের পাড়ার আরো সব মেয়ে-বউরা৷ এমনি সময়ে আমাদের পুকুরে আমার চৌধুরানী দাদী অন্য কাওকে নামতে না দিলেও এই রকম সব বিশেষ দিনগুলোতে দাদী কাওকে কিছু বলে না৷ ঝপাঝপ দু-তিনখানা করে ডুব দিয়ে সদ্য নেমে আসা অন্ধকার পারে দাঁড়িয়ে ভিজে কাপড় ছেড়ে শুকনো কাপড় জড়িয়ে এক ছুটে বাড়ি, মাগরিবের নামাজের সময় বড় কম আর মাগরিবের আগেই পড়ে নিতে হবে তাহিয়াতুল অজুর নামাজ, তারপর মাগরিব৷ সারাদিন রোজা রেখে, হালুয়া- রুটি বানিয়ে বিলি করে সকলেই মোটামুটি ক্লান্ত৷ তারমধ্যেই রোজা খোলার ইন্তেজাম৷ আর তারপর আবার নামাজ৷

এশার নামাজের আগে অব্দি খানিক বিশ্রাম, আর তারপর বরাতের রাতের নামাজ, তা সে তো চলবে সারারাত ধরে৷ চাচীর নতুন শাড়ি পরে আমিও রেডি সারারাত নামাজ পড়ার জন্যে৷ সেদিন সারারাত চাচীকে প্রচন্ড জ্বালিয়েছিলাম৷ রুকুতে গিয়ে চাচীকে জিজ্ঞেস করা, চাচী, এরপর? বা সেজদা গিয়ে জানতে চাওয়া, কি পড়ব এখন? শেষমেশ বিরক্ত চাচীর বলে ওঠা, আমি যা করি, সাথে সাথে সেটাই কর, কিছু পড়তে হবে না তোকে! মাঝরাত পেরিয়ে রাত যখন ভোরের দিকে আমদের তখন একশত রাকাত নামাজ পড়া শেষ! সে আমার প্রথম পড়া একশ রাকাত নামাজ! 

আমাদের বাসায় আমরা, ভাই-বোনেরা সন্ধে থেকে মাঝরাত পর্যন্ত হই হুল্লোড় করে ঘুমিয়ে পড়তাম, শবে বরাতে সারারাত জেগে নামাজ পড়া সেই প্রথম, চাচীর সাথে৷ আমি আর চাচী তখন বাড়ি থেকে বেরোই হাঁটব বলে৷ পায়ে পায়ে জড়ায় নতুন শাড়ি, বারে বারেই হোঁচট খাই বলে দুই হাতে শাড়ি যতটা তোলা যায়, তুলে হাঁটি৷সুনসান রাত। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর।পায়ের তলায় শিশিরে ভেজা ঘাস, খালি পায়ে ভেজা ঘাসের উপার দিয়ে আমরা হাঁটি। এ'উঠোন ও'উঠোন ঘুরে আমরা ছোট্ট পাড়াটা ঘুরে যাই কবরস্থান অব্দি৷ 

বাঁশঝাড়ে ঢাকা কবরস্থানে ঢুকতে আমি দিনের বেলাতেও রাজী নই কিন্তু চাঁদনী রাতের শেষ প্রহরে কী করে যেন নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকি কবরস্থানের সামনে, একটু দূরে দূরে কবর সব, ভেঙে মাটি ঢুকে যাওয়া কবরের সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে চাচী প্রার্থনা করে, কি বুঝে কে জানে নিশুথ রাতে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকি আমি কবরেস্থানের সামনে৷

------
আজকে চাচীর কথাও খুব মনে পড়ছে। চাচী খুব অসুস্থ।

No comments:

Post a Comment