Wednesday, June 17, 2009

বন্ধু থাকো, থাকো আমার মনে -০৪

ভালো থাইকো বন্ধু আমার এমন বিজনে
ভালো থাইকো ভালোবাসায় বন্ধুর পরাণে
ভালো থাইকো বন্ধু আমার এমন বিজনে
বুকের মাঝে বন্ধুর বাড়ি, তাতে দরজা সারি সারি
তাতে নাইকো আগল নাইকো দ্বারী। (কল্লোল দাশগুপ্ত)


কল্লোল দাশগুপ্ত। আমাদের কল্লোল'দা। ঢাকা যাওয়ার আগেরদিন সন্ধ্যায় দৃকের অফিসে গিয়ে শুনলাম, পরদিন কল্লোল'দাও ঢাকা যাচ্ছেন ছবিমেলা দেখতে। কল্লোল'দার বহু পুরনো বন্ধু দৃক বাংলাদেশের বর্তমান ডিরেক্টর, জহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক রেহনুমা'র আমন্ত্রণে কল্লোল'দা আগেও ছবিমেলায় গেছেন শুনলাম শুভেন্দু'দার কাছে, সেদিন সারাদিনই নাকি কল্লোল'দার সাথে বাংলাদেশ হাই কমিশনে ছিলেন তিনি। দৃক ইন্ডিয়ার ডিরেক্টর শুভেন্দু চ্যাটার্জীও কল্লোল'দার পুরোনো বন্ধু ও প্রাক্তন নকশাল। কল্লোল'দার সাথে এর আগে আমার শুধু ফোনে কথা হয়েছে, দেখা হয়নি। গুরুচন্ডা৯-তে কারাগার, বধ্যভূমি-র সুবাদে কল্লোল'দা আমার কাছে এক বিশাল আকারের মানুষ, যাঁর দিকে তাকাতে গেলে ঘাঁড় অনেকটা উঁচু করতে হয়, নিজেকে অনেক অনেক ছোট দেখা যায় তাঁর সামনে। সেই কল্লোল'দাও সেদিনই ঢাকা যাচ্ছেন, যেদিন আমি যাচ্ছি, শুনে কিরকম একটা মিশ্র অনুভূতি হল। পরদিন দুপুরে ঢাকা পৌঁছেই আমি সোজা শুদ্ধস্বরে, প্রকাশকের অফিসে, সুমেরু সকাল থেকে এয়ারপোর্টে বসে ছিল বলে জরুরী মিটিংকে ঠেলে ঠেলে সন্ধেয় নিয়ে ফেলেছিল, সেই মিটিং সারতে সে গেল তার অফিসে, দৃকে। সাগর আমাকে আজিজ মার্কেটে, প্রকাশকের অফিসে পৌঁছে দিয়ে চলে গেছে ছবির হাটে, সেখানে তখন ঘুড়ি উত্সবের প্রস্তুতিপর্ব চলছে। সন্ধেয় বন্ধুবর বন্ধুবর মাহবুব লীলেনের সাথে বইমেলা। আমার প্রথম বইমেলা ঢাকায়, প্রথম একুশে বইমেলা। ঘুরে-ফিরে-দেখে একরাশ উত্তেজনা আর আনন্দে মাতাল হয়ে আবার লীলেনের সাথেই হাঁটতে হাঁটতে ছবির হাট, সেখানে সাগর অপেক্ষা করছে, আমাকে পাঠশালায় পৌঁছে দেবে বলে।

আলাপ হল ওয়েনের সাথে। ফরাসী যুবক, কী একটা কাজে বেশ কয়েকমাসের জন্যে ঢাকায় আছে। সাগর ওয়েনের সাথে এক অক্ষরও ইংরাজী বলে না আর ওয়েন? কতটা বোঝে না বোঝে আল্লাহ মালুম কিন্তু কথা যেটুকু বলে সাগরের সাথে, বাংলাতেই বলে। এক রিকশায় তিনজন, আমি-সাগর-ওয়েন। গন্তব্য ষ্টার কাবাব। সুমেরুর ফোন নট রিচেবল। পরোটা কাবাব, চিকেন তন্দুরি আর বোরহানী। সুমেরু ফোনে জানায়, কল্লোল'দা আর কৃষ্ঞা বৌদি পাঠশালার দরজায় অপেক্ষা করছেন সন্ধে থেকে। আবার এক রিকশায় তিনজন, এবার সাথে পরোটা আর কাবাবের প্যাকেট।

কল্লোল'দার সাথে দেখা হওয়ার পর একবারের জন্যেও মনে হয়নি যে এই মানুষটাকে আমি আগে কখনও দেখিনি বা ওঁর কথা ভাবলে আমার এক ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধাবোধ কাজ করত। আমি রান্নাঘরে খাবার গরম করার মাঝেই গিটার খুলে কল্লোল'দার গান শুরু হয়ে যায়, উঁকি দিয়ে দেখি, ছোট্ট টেপরেকর্ডার অন করে গালে হাত দিয়ে ওয়েন চুপ করে বসে আছে,গান শুনছে একমনে আর চোখ বন্ধ করে সাগর শুধু হাতের ম্যাচবক্স দিয়ে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে গিটারের সঙ্গে। টেলিফোনের ওধার থেকে কল্লোল'দা আমাকে একদিন গান শুনিয়েছিলেন মাঝরাতে, আর কল্লোল'দার ছবি দেখেছিলাম দময়ন্তীর দেওয়া ওয়েব অ্যালবামের পাতায়, আর সামনে ছিল কল্লোল'দার লিখে যাওয়া নকশাল অন্দোলনের কথা, সেই কারাগার, বধ্যভূমি ... সে'রাতে গান চলে রাত একটা অব্দি। চার ঘন্টার ঐ ঘরোয়া আসরের সবটুকু তোলা থাকে ওয়েনের ছোট্ট কিন্তু শক্তিশালী ডিজিটাল টেপরেকর্ডারে। কল্লোল'দার গান, গানের পেছনের কথা, মাঝে মাঝে আমাদের কিছু কথা, সব, সব তোলা থাকে ওয়েনের সেই রেকর্ডারে। যেটুকু জায়্গা সাগরের মোবাইল ফোনের মেমরি কার্ডে ছিল, সবটুকু জায়গা জুড়ে নেয় কল্লোল'দার গান।

আটদিন কল্লোল'দা আর বৌদি ঢাকায় ছিলেন। যেখানেই গেছেন সার্বক্ষণিক সঙ্গী গিটারটির খাপ খুলে গান শুনিয়েছেন সকলকে, কখনও সেটা রেহনুমার বাড়িতে, কখনও ছবির হাটে, কখনও আজিজে মার্কেটের নিচতলায় কাকা'র সিডি-ক্যাসেটের দোকানে তো কখনও অচেনা বন্ধু হাসান মোরশেদের বই প্রকাশের উৎসবে, একুশের বইমেলায়। কখনও বা রাতভর গান চলেছে পাঠশালার ঘরে-সাগরের বাড়ির হলঘরে। আর তার অসাধারণ মায়াময় ব্যাক্তিত্বের জোরে ভিনসুরে সারাজীবনের তরে বেঁধে এসেছেন কিছু মানুষকে


এ থাকার সাথী যত, আসে যায় অবিরত।
তুমি যাবে তোমার মত, সঙ্গে নেবে কারে।।
আমার ডাক পড়ে না ত, আমায় নিতে ডাকছি কত।
ভবা পাগলার মনের মত, সঙ্গে নিতে পারে।। ( ভবা পাগলা)


এয়ারপোর্ট। সুমেরু, মাসুদ, কাঁকনকে বিদায় জানিয়ে আমি ভেতরে ঢুকে যাই। ওরা বাইরে অপেক্ষা করে, আমি বোর্ডিং পাস পেয়ে গেলে তবে যাবে। বিমানের কাউন্টার বন্ধ দেখে খটকা লাগে, ২টোয় ফ্লাইট, এখনও কাউন্টার বন্ধ, বেলা তো সোয়া বারোটা! একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, বেলা দুটোয় তো বিমানের আজকে কোনো ফ্লাইট নেই! রিতিমতো ভয় পেয়ে গিয়ে টিকিট দেখাতে তিনি সেটি নিয়ে কম্প্যুটারে দেখে জানালেন, সে ফ্লাইট ক্যানসেল হয়েছে, আপনি কাস্টমার কেয়ারে গিয়ে খোঁজ নিন! ফোনে বাইরে অপেক্ষারত সুমেরুকে জানালাম, ঘাপলা আছে, ফ্লাইট বাতিল অপেক্ষা করো! কাস্টমার কেয়ারের ভাদ্রলোকটি কম্প্যু ঘেঁটে-ঘুটে বললেন, জেট-এ ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, ফ্লাইট বিকেলে, ৪টে বেজে দশ মিনিটে। ধুকপুকুনি খানিক কমলো এটা শুনে যে, বিকেলে হলেও যেতে তো পারছি, কারণ আমার ভিসার মেয়াদ সেদিনই শেষ। বিমানের বাতিল হয়ে যাওয়া উড়ানের আরো কিছু যাত্রী ততক্ষণে পৌঁছেছেন কাস্টমার কেয়ারে, রিতিমতো চেঁচামেচি করতে করতে। ফোন করে যাত্রীদের কেন ইনফর্ম করা হয় না? আমি ছুটির ছাড়পত্র হাতে মালপত্র সমেত ট্রলি ঠেলে আবার বাইরে।

তারপর যেতে যেতে
ফিরে ফিরে দেখেছিলাম
তবু অসীম শূণ্যতা ছাড়া
আমি আর কিছুই দেখিনি
দিগন্ত ধূসর কুয়াশা চারিধারে। ( মাসুদ)

কোথাও একটা বেড়াতে যাওয়া যাক! কোথায়? আশুলিয়া যাওয়া যেতে পারে। গাড়ি এগোয় আশুলিয়ার দিকে। কাঁকন আবার গান গায়। এবার গানে আর আমার মন ঢোকে না। ভালো লাগে না। চুপ করে থাকি। সরু ফিতের মত নদী দেখা যায় দূরে, মাঝে ফসলের মাঠ। সবুজে সবুজ, মাঝে মাঝে বোর্ডে লেখা অমুক ইউনিভার্সিটি তমুক হাসপাতাল। ছোট ছোট নৌকো, দূর থেকে খেলনার মত দেখায়। বাঁদিকে রাস্তা থেকে বেশ নিচু জমিতে দেখা গেল একদল লোক। গাড়ি থামিয়ে ভাল করে তাকিয়ে বোঝা গেল, মিউজিক ভিডিওর শ্যুটিং হচ্চে। ক্যামেরা, পরিচালক, অ্যাসিস্ট্যান্ট, একদল ছেলে, স্থুলকায়া হিরোইন আর শ্যুটিং দেখতে ভিড় জমানো কিছু গ্রামের মানুষ। আমার সঙ্গীরা প্রবল উৎসাহে শ্যুটিং দেখতে ব্যস্ত হন। কোনো কোন শট ওকে হয়, তো কোনো কোনো শট বারবার রিটেক করা হয়। একটি ছেলে, বোধ হয় হিরো, বারে বারেই হিরোইনকে কোলে তুলে নেয়, শট ওকে হয় না, উদ্দাম বাজনা শোনা যায়, ঠা ঠা রোদ্দুরে একদল ছেলে বারে বারেই একই শট দেয় আর বেচারা হিরো, স্থুলাঙ্গী হিরোইনকে কোলে তুলে নাচতে গিয়ে প্রাণান্ত অবস্থা, বারে বারেই বেচারা ক্ষেতের আলে রাখা বোতল থেকে জল খায়।

পাশেই দু-তিনটি জমি পেরিয়ে অন্য শ্যুটিং, অন্য গল্প। সেখানে বাচ্চাদের একটা গানের উপর নাচের ভিডিওর শ্যুটিং। বাচ্চা মেয়েটি বারে বারেই ভুল করে, তাল কেটে যায়। রানিং কমেন্ট্রি দেয় সুমেরু, কাঁকন। প্রবল উৎসাহে কখনও বড়দের নাচের তো কখনও বাচ্চাটির নাচের শ্যুট নিয়ে। খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে শ্যুটিং দেখে আমাদের ড্রাইভার। ঘড়ি বলে দেয়, এবার আমাদের ফেরা উচিৎ। রাস্তার ধারে সুরুচি'তে ডাল-ভাত-ভর্তা। অথচ আমার তো কলকাতার বাড়িতে এসে ভাত খাওয়ার কথা ছিল!

গাজীপুরে শ্যুটিংএর জায়গা দেখতে গিয়েছিল সাগর সেদিন ভোরবেলাতেই। ফেরার পথে এয়ারপোর্টে বুড়ি ছুঁয়ে যায় সেও। আমি আবার ট্রলিতে জিনিসপত্তর চাপিয়ে এয়ারপোর্টের ভেতরে এবং সুমেরুরা আবারও অপেক্ষা করে বাইরে, এবার ঠিকঠাক মিটে যায় সব। যাত্রীদের মধ্যে দেখতে পাই, বিমানের বাতিল হয়ে যাওয়া ফ্লাইটের যাত্রীরাও এই প্লেনে জায়গা পেয়ে গেছেন ক্ষোভ আপাতত শান্ত, টুকরো টুকরো ক্ষোভ ও আনন্দের বাংলাদেশ কিছুক্ষণের মধ্যেই কলকাতা পৌঁছে যাবে।



-শেষ-

0 comments: