Sunday, June 07, 2009

ফুকোওকার চিঠি-০৩


প্রিয় পাঠক,
লিখব লিখব করে লেখা আর হয়ে উঠছে না এই চিঠি। দু-এক লাইন লেখা হয়, খসড়ার খাতায় গিয়ে জমা হয়। এই সার্বক্ষণিক বিষন্ন, মেঘলা আকাশ, কাছে-দূরের ও‌ই ঘন সবুজ পাহাড়, যত্র-তত্র ফুটে থাকা নাম না জানা অসংখ্য, অজস্র ছোট-বড় ফুল, যখন তখন বিনা নোটিশে নেমে পড়া এই বৃষ্টি যেন বলে দেয়, এইখানটায় চুপটি করে বসে থাকো, থাকো, থাকো তুমি আমার সঙ্গে...

মন যে কেমন করে তাহা মনই জানে।। 

পাশের স্কুলবাড়িটিতে সকাল থেকে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের কলকাকলিই শুধু যেন ছন্দপতন এই নৈ:শব্দে। বাস থেকে নেমে কালো টুপি- টাই- ঘন নীল ব্লেজার -ঝকঝকে জুতো আর পিঠে ভারী চামড়ার ব্যাগ নিয়ে তুলতুলে শিশুগুলো হুটোপাটি করতে করতে স্কুলে গিয়ে ঢোকে। যারা একটু বড়, তারা সব আসে সাইকেলে, স্ট্যান্ডে সাইকেল রেখে ঢুকে যায় স্কুলবাড়িতে। আবার খানিক সব নীরব, শুনশান.. শনশন করে বাতাস বয়ে যায় মেপল গাছের ডালে ডালে.. শুকনো হলুদ পাতারা ঝরে পড়ে, বিছিয়ে থাকে পাহাড়ী রাস্তা জুড়ে, মাঠ জুড়ে। কয়েকটা পাতা উড়ে এসে ঢুকে পড়ে বারান্দায়, কাঁচের দরজার ওপাশে.. 

একটা পাতা যেন চেনা চেনা লাগে। কোন এক হিন্দি সিনেমা জুড়ে এই পাতারা উড়ে বেড়িয়েছিল না! সিনেমার নামটা এখন মনে পড়ছে না আর পাতাদের তো চিনিই না! মেপল আর সাকুরা তো কেনজি সান চিনিয়ে দিয়েছিলেন, এটা তবে কী গাছ? ইফতেখার আবার গাছ চেনে না। তুমি দেখলে কী চিনতে পারতে?
ইস্নিপস। ঢাকায় কল্লোল'দা। কল্লোল'দার গান শুনি। একের পর এক। বারে বারে। আসার আগেরদিন কল্লোল'দাকে ফোন করেছিলাম। বললেন, পারলে কিছু ফোক আনিস ওখানকার। ফোক-কে জাপানীজ-এ কী বলে? কেউ বলতে পারে না! ইফতেখার বললো, খুঁজে দেখে বলবে। দোকানে গিয়ে ফোক বলাতে কেউ কিস্যু বোঝে না। য়োকা, ঝুমকির বন্ধু, ইংরেজি খানিকটা বুঝে আর খানিকটা না বুঝে কাজ চালিয়ে নেয়, সেও বুঝতে পারে না ফোক কী জিনিস। শেষমেষ কেনজি সান উদ্ধার করেন, যোগাড় করে এনে দেন একখানা সিডি। উনসত্তর সালের। 

লিখব বলে সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম অসমাপ্ত লেখাখানির পাতাগুলি। সে কেবল নেড়েচেড়ে দেখাই সার। এক লাইন এগোয় তো তিন লাইন পেছোয়। চোখ ঘুরে বেড়ায় অর্কুট -ফেসবুক -সচলায়তন-গুরুর পাতায় পাতায়। কোনোখানেই মন লাগে না। 

বড় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে চিঠি.. বরং সিঙ্গাপুরে চলো..


আজ আতিকের গায়ে হলুদ কাল আতিকের বিয়ে..

আজ আতিকের গায়ে হলুদ ছিল বটে তবে কাল আতিকের বিয়ে নয়। আতিকের বিয়ে সামনের মাসের ১২তারিখে, ঢাকায়। বন্ধুরা, যারা আতিকের সাথে থাকে, পড়ে, দিনের একটা নির্দৃষ্ট সময়ে এক জায়গায় জড়ো হয়ে খাওয়া-দাওয়া করে, আড্ডা দেয়, ভাগ করে নেয় সুখ-দুখ। তারা আতিকের বিয়েতে থাকতে পারবে না বলে বিয়ের কোনো অনুষ্ঠানেও থাকবে না তা কী হয়! সক্কলে মিলে তাই অগ্রিম গায়ে হলুদ দিল আতিকের। সারাটা দিন ধরে রান্না করল আরিফ আর গৌতম, এবং তারা প্রমাণ করল, বাইরে বাইরে খেলেও রান্না-টান্না এরা পারে এবং ভালোই পারে আর এমন পারে যে জনা কুড়ি লোকের জন্যে বাড়িতে রেঁধে পার্টি দিতে পারে। আয়োজনে থাকল মঞ্জু আর আরো কয়েকজন। যোগাড় করা হল কাঁচা হলুদ, বোধ হয় হামানদিস্তায় থেঁতো করা হয় ও‌ই হলুদ। গায়ে হলুদের এই অনুষ্ঠানে হাজির হল জন কুড়ি বন্ধু। কেনা হয়েছিল বিশাল বড় কাউবয় হ্যাট, আতিক যেটা কিছুতেই পরবে না। আমি কেমন করে কোথা থেকে যে আতিকের গায়ে হলুদে হাজির হয়ে যাই, এ এক অবাক পৃথিবী বটে! আলাপ হল রাজীবের সাথে, সচলায়তন নিয়মিত পড়ার সুবাদে শ্যাজা আপুকে যে ভালমতন চেনে! এবং দেখলাম ওদের অনেকেই নিয়মিত সচলায়তন পড়ে। ফিকে হলুদ রঙের শাড়ি পরে এসেছিল বর্ণা। সক্কলে মিলে হই হই করে হলুদ দেয় আতিককে। [৩০শে মে, সিঙ্গাপুর]

একটু পেছনদিকে যাই। 

সেদিন আতিকের সাথে বেরিয়ে প্রথমে যাই ওদের বিশ্ববিদ্যালয়ে, ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে দুপুরের খাওয়া। সেখানে আগে থেকেই ছিল গৌতম, আরিফ। ছুটির দিন বেশির ভাগ খাবারের দোকানই বন্ধ, শেষমেষ পিৎজা খাওয়া হল আলুভাজা, পেপসি সহযোগে। কোথায় যাওয়া যেতে পারে বেড়ানোর জন্য? আলোচনা করে ঠিক হল, বার্ডপার্কে যাওয়া যাক, সেখান থেকে মোস্তাফা সেন্টার আর তারপরেও সময় থাকলে সেন্তোসা আইল্যান্ড, সময়ে না কুলোলে মোস্তাফা সেন্টার থেকেই এয়ারপোর্টে চলে যাওয়া যাবে। দু'বছর হল আতিক সিঙ্গাপুরে আছে কিন্তু এখনও লোকে যে'সব জায়গায় বেড়াতে যায় সে'সব জায়গায় যাওয়া হয়নি তার। সঙ্গী হল মঞ্জু, মাস ছয়েক হল সে আছে সিঙ্গাপুরে, এই সব ট্যুরিস্ট স্পটগুলো দেখা হয়নি তারও। যেমন এই বার্ডপার্ক, সেন্তোসা আইল্যান্ড ইত্যাদি ইত্যাদি। বার্ডপার্ক মানে কী পাখিরালয়? হবে হয়তো, নাও হতে পারে, তবে আমি বরং পাখিরালয়ই বলি। 

কী নেই এই পাখিরালয়ে? জল আছে, জঙ্গল আছে, পাহাড় আছে, গাছ আছে, আছে এমনকি মরুভূমিও। আফ্রিকায় যাবে জলপ্রপাত দেখতে? কোনো দরকার নেই, এই পাখিরালয়ে আফ্রিকান ফলও আছে। কত যে পাখি এই পাখিরালয়ে। পায়ের পাতায় তিনখানি আঙুলে ভর করে ঘুরে বেড়ানো বিশাল উটপাখিরা একেবারে সামনে এসে দাঁড়ায়, ছুঁয়ে দেয়া যায় ইচ্ছে করলেই! কত শত পাখি যে ঘুরে বেড়াচ্ছে যে যার নির্দৃষ্ট জায়গায়, জাল দিয়ে ঘেরা জায়গায়। কৃত্রিম লেকে দল বেঁধে ভেসে বেড়াচ্ছে রকমারী হাঁস। বিশাল আকার এক একটার। আর কী তাদের রঙের বাহার। লম্বা সরু গলার ফ্লেমিংগো, (আচ্ছা ফ্লেমিংগোর ও‌ই গায়ের রংটা কমলা না গোলাপী? আমার তো কমলা বলেই মনে হল! কোথায় দেখবে? আহা, গুগলে সার্চ দাও না, জুরং বার্ডপার্ক বলে। দেখে আমাকে বলো তো, ওটা কী রং?) ঈগল, কাকাতূয়া, এমনকি ময়নারাও যে যার জায়গায়, জালের ঘরে। সব দল বেঁধে। পেঙ্গুইন দেখার জন্যে বরফের দেশে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, সিঙ্গাপুরের এই পাখিরালয়ে গেলেই দেখতে পাবে কাঁচের ওপাশে ঠান্ডা বরফের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে সব পেঙ্গুইনেরা। বেবি পেঙ্গুইন, মাম্মা পেঙ্গুইন, ড্যাডি পেঙ্গুইন, ফ্রেন্ড পেঙ্গুইন। সক্কলে আছে সেখানে। সিঙ্গাপুরের ভ্যাপসা গরমে অ্যাত্ত বড় এই পাখিরালয় দেখতে দেখতে যদি ক্লান্ত হয়ে পড়ো, তবে ঢুকে পড়ো পেঙ্গুইনদের এই ঘরে। ঠান্ডা আর শীতল! সব মিলিয়ে কমপ্লিট প্যাকেজ। 

পাখিরালয়ের ছবিগুলো সব মঞ্জুর ক্যামেরায়, ও মঞ্জু, শুনছো কী? এইবার ছবিগুলো পাঠিয়েই দাও!
রাত ১২টায় প্লেনে উঠে স্থানীয় সময় ভোর ছ'টায় সিঙ্গাপুরে নেমে কী করে যেন আমার অর্ধেকটা রাতই হাপিস হয়ে গেল তখন অন্তত সেটা বুঝে উঠতে পারিনি আর তার উপর সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের সেবা নিতে নিতে ক্লান্ত হয়ে যেই না চোখ বন্ধ করেছি, অমনি বলে, আমরা এবার নামছি! আতিকদের বাসায় মিনি একটা ঘুম দিয়ে সারা দুপুর এই পাখিরালয়ে ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে উঁচু-নিচু রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পাখি আর পাখিদের শো দেখে দেখে শেষবেলায় আফ্রিকান ফল দেখার মত শখ বা শক্তি কোনোটাই যখন আমার আর বাকি নেই, তখন আমি বসে পড়ি একটা বেঞ্চে। আতিক আর মঞ্জু যায় ফল দেখতে। আমি অনেকক্ষণ ধরেই খেয়াল করছিলাম, প্রচুর ভারতীয় ঘুরে বেড়াচ্ছেন এই বার্ডপার্ক জুড়ে। অল্প কয়েকজন বিদেশী ছাড়া ওখানে যাদেরকে দেখলাম, প্রায় সকলেই ভারতীয়। আমরা যখন ট্যাক্সির লাইনে দাঁড়াই সূর্য তখন বেশ অনেকটা নেমে পড়েছে মধ্যগগন ছেড়ে..
পরে আবার লিখছি, আজ এই পর্যন্ত..

No comments:

Post a Comment