Monday, May 25, 2009

ফুকোওকার চিঠি-০৪


পর্ব নম্বর দুই এবং তিন পরে লেখা হইবে, এই ইস্টাইলটুকু জেবতিক আরিফ হইতে ধার করা হইল।
সেই কবে যেন একদিন চিঠি লিখতে বলেছিলে। সে কবে? ভুলে গেছি.. বলেছিলে, চিঠিটা এবার লিখেই ফ্যালো, জানি তুমি পারবে, শুরুটা আমি করে দিয়ে গেলাম... সেদিন চিঠি লেখা হয়নি আর তারপরেও না। কবে যেন একবার লিখেছিলাম একটা চিঠি আর তারপর ফিকে নীল খামে করে পাঠিয়েও ছিলাম কিন্তু সে চিঠির উত্তর আসেনি, ফেরত আসেনি সে চিঠি আজও.. 

বাথরুমে একটু দেখো তো, বোধ হয় কাপড় কাচার সাবান ফুরিয়েছে, যদি বাজারের দিকে যাও তো কিনে নিও। রান্নাঘরটা একবার দেখবে কী? পেঁয়াজ-মশলা-পাতি কী আছে না আছে একটু দেখে নিও না, সেও বোধ হয় কিনতে হবে। শুনেছি দু-তিনদিন হল বাজারে নাকি লিচু এসেছে,যদি দাম বেশি না হ্য় তবে খানিকটা লিচু কিনে নিও.. মরশুমের পয়লা ফল..

এখানে বেশ ঠান্ডা.. আসার পথে ভুল করে এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে জ্যাকেট-চাদর ফেলে এসে দোকানে দোকানে গরম কিছু জামা হন্যে হয়ে খুঁজেছি, পাইনি। এখন তো সামার কাজেই কোথাও কোনো গরম জামা কাপড় নাই, সব ফুলফুলা-ঝুলঝুলা সামারের কাপড়! তবে এদেশের সামারে আমার হাড়ে হাড়ে কাঁপুনি লাগে এই হল সমস্যা! সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলেন আতিক, এখানেও এক আতিক আছেন জানো তো, সে আমাদের ইফতেকারের কলিগ, বললেন, আমাদের বাসায় কিছু গরম জামা কাপড় আছে, যেগুলো কেনা হয়েছিল কিন্তু ইউজ হয়নি, আপনি আপাতত কাজ চালান! বোঝো ঠ্যালা, আমি এখন আতিকের সোয়েটার-জ্যাকেট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছি!
কেনজি কুরোকাওয়ার কথা শোনো। এখানে এসে প্রথম যাঁর সাথে আলাপ, তিনি কেনজি কুরোকাওয়া। 

এয়ারপোর্টে গেছিলেন ইফতি'র সাথে, ইফতি তো গাড়ি চালাতে পারে না আর ঝুমকির গাড়ি চালানো বারণ তাই কেনজি গেলেন সারথী হয়ে, আমাকে আনতে। সদাহাস্য এক মুখ। ব্যবসার কাজে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ান বলে কাজ চালানোর মত ইংরেজি বলেই ফেলেন আর বোঝেনও। একঘন্টার রাস্তায় আমার সাথে খুব একটা কথা বলেননি আমি টায়ার্ড বলে, শুধু বলে দিয়েছিলেন, কোথাও যেতে চাইলে যেব অবশ্যই বলি, তিনি নিয়ে যাবেন, ইফতেকার সান তো সময় পাবেন না। সক্কলের নামে পেছনে একটা 'সান' জুড়ে দিয়ে কথা বলেন এরা। এর মাঝে আমার নামটা দু-তিনবার উচ্চারন করে করে সড়গড় হওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

দিন কয় আগে কিছু কেনাকাটা করব বলাতে ইফতি কেনজি সানকেই ডাকে, সাথে করে নিয়ে যেতে আর পারলে একটু ঘুরিয়েও দিতে। সেদিন শহরের মধ্যেই খানিক ইতি-উতি ঘুরিয়ে নিজের বাড়ি নিয়ে যান কেনজি, গিন্নির সাথে আলাপ করিয়ে দিতে। কেকো কুরোকাওয়া। কেকো সান। ভারী মিষ্টি মহিলা। সদাহাস্য মুখ এঁরও, আর সদালাপী। তিনি যা বলেন আমি সেটা বুঝি না আর আমি যা বলি তিনি সেটা বোঝেন না তাই কিছু একটা কথা বলেই  কেনজি সানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন, আনুবাদ করে সেটা আমাকে বুঝিয়ে দিতে আবার আমি কী বলি সেটাও কেনজি'র কাছ থেকেই বুঝে নেন। 

পাশাপাশি দুটো বাড়িতে দু'জনে থাকেন, খাওয়া-দাওয়া একসঙ্গেই করেন। দুটো বাড়িরই সামনে পেছনে বাগান, যার দেখাশোনা করেন কেনজি। নিজের বাগানের জারবারা, মার্গারেট তুলে দিলেন কেকো সান, পেড়ে দিলেন স্ট্রবেরি, চেরি। আর দিলেন বাঁশের কোর, সব্জি হিসেবে রান্না করে খাওয়ার জন্যে। সময় কম ছিলো বলে শুধু বাগান দেখেই ফিরে এলাম, এর মাঝেই কেকো জেনে নিলেন কোথায় কোথায় যেতে চাই, সেটা চট করে একটা নোট খাতায় লিখেও নিলেন। ঠিক হল, এই রবিবার মানে আজকে বেরুবো আমরা।

এই বাড়ির পেছনটায় নিচু পাহাড় কেটে মাঠ, ছাড়া ছাড়া সব বিল্ডিং, ইউনিভার্সিটির লেকচার রুম, ক্লাসরুম, ল্যাব, জিমন্যাশিয়াম, বিদেশী ছাত্রদের কোয়ার্টার। এখানে জিমন্যাশিয়ামগুলো আমাদের দেশের জিমখানার মত নয়। এখানে স্কুল-কলেজের বাচ্চারা একটা নির্দিষ্ট সময়ে এসে ঢোকে কাঁধে ইয়াব্বড় ব্যাগ নিয়ে। কারো হাতে থাকে স্টিক, বল, কারো বা ব্যাট। ঘড়ি ধরে ওরা সব খেলে আর তারপর ঘড়ি ধরে বেরিয়ে যায়। মিষ্টি বাজনা বাজে জিমন্যাশিয়ামের ভেতরে, খুব বেশিদূর যায় না সে বাজনার শব্দ। ছেলের দল বেরিয়ে গেলে দরজা বন্ধ হয় জিমন্যাশিয়ামের, বন্ধ হয় বাজনাও। নীরব সুনসান আবার সব, আগের মতো।

মাঠের বাঁদিকে জঙ্গল আর তার পাশ ধরে সরু একফালি রাস্তা। মাঠ পেরিয়ে সে এঁকে বেকে চলে গেছে ইউনি এলাকায় আর তারপর কোথায় কে জানে..বেশ বড়সড় আর ঘন জঙ্গল। উঁচু উঁচু সব নাম না জানা গাছ। আছে নানা রকমের জংলী ফুল, ছোটো আর ঘন ঝোপ। অচেনা সব রং-বেরঙের ফুলেরা ফুটে আছে ঝোপ জুড়ে, জঙ্গল জুড়ে। আর আছে সাকুরা গাছ। এখন আর সে সব গাছে ফুল নেই, শুধু পাতা। সবুজ পাতায় ছেয়ে আছে বিশাল ঝাঁকড়া সব সাকুরা গাছ। 

মাঠের কথা বলছিলাম। সে এক বিশাল বড় মাঠ। গোল করে গোটা মাঠ জুড়ে চওড়া রাস্তা বানানো সে মাঠ জুড়ে, দৌড়নোর জন্যে। এবং সেখানে সকাল সন্ধে মানুষ দৌড়ায়। গোল গোল। গোল গোল। দৌড়ুচ্ছে তো দৌড়ুচ্ছেই। মাঠের একধারে বেঞ্চে বসে বসে ভাবি, এরা কত দৌড়ুতে পারে? ক্লান্ত হয় না? নানা বয়েসী মানুষ সব। প্রায় সকলেই পরে থাকে জ্যাকেট। মাঠে আসে ছোট বাচ্চারাও। এত বড় মাঠ যে কয়েকটা দল ছড়িয়ে ছিটিয়ে একসাথে খেলে নানা রকমের খেলা আর সাথে থাকে ছুটন্ত মানুষেরা। 

তুমি কি খেলা দেখছো? আইপিএলের ফাইনাল? .অদ্ভুত একটা ব্যপার জানো.. আমি এখন পর্যন্ত কোথাও কাওকে প্রেম করতে দেখিনি! দেখিনি কোথাও কেউ হাত ধরাধরি করে হাঁটছে! রাস্তায় না। মাঠে না। ইউনি এলাকায় না। কোথাও না। কোথাও না। ছাতা সকলেরই হাতে থাকে যখন তখন বৃষ্টি নেমে পড়ে বলে, লোকে পার্কে-মাঠে-ময়দানেও যায় ছাতা হাতে কিন্তু কোনো প্রেমিক-প্রেমিকা দেখা যায় না! রাস্তায় যেমন গাড়ির হর্ন নেই তেমনি নেই প্রেমিক-প্রেমিকাও। কী ভীষণ অদ্ভুত ব্যপার!!

ক্রমশ..

No comments:

Post a Comment