Sunday, May 17, 2009

ফুকোওকার চিঠি

এই বছরের শুরুর থেকেই রিতিমত দৌড়ের উপর আছি। ঠিক এই বছরের শেষ না, ঠিকঠাক বললে বলতে হবে, গত বছরের শেষ থেকে। ডিসেম্বরের শেষে ঢাকায় গিয়ে জানুয়ারীর শেষে কলকাতা। ঠিক তিন সপ্তাহ পরে মাঝ ফেব্রুয়ারীতে আবার ঢাকা। পুরো এক মাস। বইমেলা গেল। মেলা শেষ হওয়ার পরেও আমার দৌড় শেষ হলো না। গোটা একটা মাস ঢাকায় থাকা আমার এই প্রথম। আর বাংলাদেশে একমাস আছি কিন্তু আব্বা আম্মার কাছে গোটা একমাসে মাত্র একদিন, সেটাও এই প্রথম। যাই হোক, কলকাতায় ফিরে খানিক দম নিয়ে জিরোতে না জিরোতেই আবার পায়ের তলার সর্ষের বলটা গড়িয়ে গেল আর এবার গড়ালো বেশ অনেকটা দূর অব্দি। একেবারে সাগর পেরিয়ে সূর্যোদয়ের দেশে। 

সিঙ্গাপুরে ১৯ঘন্টার যাত্রাবিরতি। একা একা কোথায় যাবো, প্রায় গোটা একটা দিন কিভাবে কাটাবো, বেশ দু:শ্চিন্তায় ছিলাম। খুব ভোরে সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্টে প্লেন থেকে জখন নামি, তার খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে। সারসার এরোপ্লেন যেন বিছিয়ে আছে জলমগ্ন রানওয়েতে। সুবিশাল এয়ারপোর্ট। হেঁটে হেঁটে কূল-কিনারা পাওয়া যায় না যেন। সারসার শুল্কমুক্ত দোকান দেখে ভুল করে শুল্কমুক্ত কোনো শপিং মলে ঢুকে পড়লাম কিনা মনে হয়। প্লেনের সহযাত্রীরা যেদিকে যায়, আমিও সেদিকেই হাঁটি। বাঙাল বলে কথা তায় আবার জীব্বনে বিদেশ যাইনি! আগের দিনেই পাওয়া এক ফোন নম্বরে ফোন করি, উদ্দেশ্য, এয়ারপোর্ট থেকে বেরুনো, সিঙ্গাপুরটা খানিক ঘুরে দেখা। যদিও সুমেরু বলেছিল, চুপচাপ বসে থাকবে, বেরুনোর দরকার নেই, হারিয়ে যাবে! 

এই সিঙ্গাপুর নিয়ে আমার একটা গল্প আছে, ছেলেবেলার গল্প। আমি তখন বেশ ছোট। আব্বা ব্যবসার কাজে সিঙ্গাপুরে গেলেন সেবার। কী একটা হোটেলে যেন ছিলেন, আমি নামটা ভুলে গেছি। কিছু একটা ইন্টারন্যাশনাল হোটেল। আব্বা আমার জন্যে হোটেলের প্যাড, খাম, ডাকটিকিট ইত্যাদি নিয়ে এসেছিলেন। আর নিয়ে এসেছিলেন বিশাল বড় এক টেপরেকর্ডার, আর ইয়াব্বড় এক আংটি, আমার জন্য। আমি তখন ফ্রক পরতাম কিন্তু আব্বা আমার জন্যে শাড়ী নিয়ে এসেছিলেন, অফ হোয়াইট রঙের জর্জেট শাড়ী। সে শাড়ী আমার কাছে এখনও আছে। তো আব্বা সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে এসে প্রচুর গল্প করেছিলেন, সে নাকি ছোট্ট এক দেশ, সাজানো গোছানো, ছিমছাম আর বড় সুন্দর নাকি সে দেশ। আব্বার যার সাথে ব্যবসা, তার নাম ছিল চু ওয়া । চাইনীজ। সেই আব্বাকে সব জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেত। আব্বা দেশে ফেরার কিছুদিন পরে সেই চু ওয়া বাংলাদেশে এসেছিল আর আমাদের বাসাতেই ছিল এক সপ্তাহ। 

আব্বার মুখে সিঙ্গাপুরের গল্প শুনে শুনে আমার খুব সিঙ্গাপুরে যেতে সাধ হত যদিও কোনোদিন কাওকে বলিনি সে কথা। এর কিছুদিন পরে চট্টগ্রাম থেকে এক জাহাজ গিয়েছিল সিঙ্গাপুর, হিজবুল বাহার। চট্টগ্রাম-সিঙ্গাপুর-চট্টগ্রাম। সেই জাহাজে আমার সেজকাকা সিঙ্গাপুরে গেল বেড়াতে। আব্বাই পাঠালেন, জাহাজটা যাচ্ছে, যাও, ঘুরে এসো! কাকা তখন কলেজে পড়ে। তো কাকা ঘুরে এলো আর সেও এসে প্রচুর গল্প করলো। আর যাওয়ার আগে কাকার সেকি উৎসাহ! তখন কাকার সাথে সিঙ্গাপুরে যাওয়ার ভীষণ ইচ্ছে হয়েছিল আমার কিন্তু আমি তখনও কাওকে কিছু বলিনি। কাকা চলে যাওয়ার পর কয়েকদিন শুধু মুখ গোমড়া করে ছিলাম, কারো সাথেই পারতে কোনো কথা বলতাম না। কাকাও ফিরে এসে প্রচুর গল্প করল। তার গল্প আরো বেশি, জাহাজের গল্প, সমুদ্রের গল্প আর সিঙ্গাপুর তো আছেই! আমার মন খারাপ তখন রিতিমত মেজাজ খারাপে পরিণত হয়েছিল কিন্তু সেটাও আমি কাওকে বলিনি।

তো আমার ট্রাভেল এজেন্ট যখন জানতে চাইলেন, ম্যাডাম, কোন রাস্তায় যাবেন, বাংকক না সিঙ্গাপুর? আমার এক মুহূর্তও লাগেনি 'সিঙ্গাপুর' বলতে! টিকিটের দাম বেশি পড়বে জেনেও বললাম, সিঙ্গাপুর এয়ালাইন্সেই যাবো! 

তো এই সেই সিঙ্গাপুর! অনেক বছর আগে যেখানে বেড়ানোর তীব্র সাধ জেগেছিল আমার। ফোন করি আতিককে। ছোট ভাইয়ের বন্ধু আতিক সিঙ্গাপুরে থেকে পড়াশোনা করছে। ঘুম জড়ানো গলায় আতিক বলে, আপনি দু নম্বর টার্মিনালের সামনে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে থাকুন, আমি আসছি। রোগা পাতলা এক ছেলে এসে সামনে দাঁড়ায় ঘন্টা খানেক পরে, একনজরেই বোঝা যায় ঘুম কাটেনি তার চোখ থেকে তখনও। শুনলাম, আতিক থাকে পশ্চিম জুরংএ,। হাইওয়ে ধরে ট্যাক্সি যায়। বেলা আটটায়ও রাস্তা নীরব আর ফাঁকা। সপ্তাহান্তের সেটা শুরু বলেই হয়তো! ভোররাতে বৃষ্টি হয়েছে কিন্তু আকাশ তখনও মেঘলা। অনুজ্জ্বল সকাল। তকতকে রাস্তা ধরে ছুটে যাওয়া ট্যাক্সির বাইরে যেন ক্যালেন্ডারের পাতারা হুস হাস বেরিয়ে যাচ্ছে। উঁচু-নিচু পাহাড়ী রাস্তা মনে করিয়ে দেয় আমাদের চট্টগ্রামকে। প্রচুর গাছ রাস্তার দু'পাশেই। সবুজে সবুজ। 

জানলাম, আতিকের বাড়িতে যাচ্ছি। আতিকের উপর হুকুম জারী হয়েছে, আমাকে যেন ঘুরিয়ে সিঙ্গাপুর দেখিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশের আরো দুটি ছেলের সঙ্গে আতিক থাকে বিশাল বড় এক বাড়ির চারতলার এক ফ্ল্যাটে। আতিকের সাথে বাসা শেয়ার করে গৌতম, আরিফ। ওরা সকলেই সিঙ্গাপুরে পোষ্ট ডক্টরেট করছে। রোগা পাতলা,ছোট্ট দেখতে আতিককে দেখে ভাবতে অসুবিধে হয় যে, এই ছেলেটি খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়! বাসায় ঢোকার আগে একটা ফুড জাংশানে নিয়ে যায় আতিক, ব্রেকফার্স্টের জন্যে, ওদের বাসায় নাকি রান্না-খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। বিশাল বড় এক মগে করে কড়া এক মগ কফি শুধু খেয়ে আতিকের বাসায় যাই। তিন বেডরুমের বেশ বড়সড় এক বাসা, হলঘরের মেঝেতে মাদুরের উপর দেখলাম দু'জন ঘুমিয়ে আছে, শুনলাম, ওরা গৌতম আর আরিফ। হিজাব পরা মালয়ী এক ভদ্রমহিলা এগিয়ে এলেন, মারিয়ম, আতিকের ল্যান্ডলেডি। মারিয়ম একটি তালাবন্ধ ঘর খুলে দিয়ে বললেন, রেস্ট নাও, দরকার লাগলে ডেকো। আতিকদের দেখাশোনা মারিয়মই করেন শুনলাম। যদি ঘুমিয়ে পড়ি তবে যেন বারোটায় তুলে দেন বলে ঘুমিয়েই পড়লাম অচেনা এক দেশে, অচেনা এক ঘরে..

2 comments:

  1. দিনলিপি লেখার এই ছন্দময় স্টাইলটা ভালো লাগে

    ReplyDelete
  2. দধন্যবাদ মাহবুব।

    ReplyDelete