Monday, May 25, 2009

ফুকোওকার চিঠি-০৪


পর্ব নম্বর দুই এবং তিন পরে লেখা হইবে, এই ইস্টাইলটুকু জেবতিক আরিফ হইতে ধার করা হইল।
সেই কবে যেন একদিন চিঠি লিখতে বলেছিলে। সে কবে? ভুলে গেছি.. বলেছিলে, চিঠিটা এবার লিখেই ফ্যালো, জানি তুমি পারবে, শুরুটা আমি করে দিয়ে গেলাম... সেদিন চিঠি লেখা হয়নি আর তারপরেও না। কবে যেন একবার লিখেছিলাম একটা চিঠি আর তারপর ফিকে নীল খামে করে পাঠিয়েও ছিলাম কিন্তু সে চিঠির উত্তর আসেনি, ফেরত আসেনি সে চিঠি আজও.. 

বাথরুমে একটু দেখো তো, বোধ হয় কাপড় কাচার সাবান ফুরিয়েছে, যদি বাজারের দিকে যাও তো কিনে নিও। রান্নাঘরটা একবার দেখবে কী? পেঁয়াজ-মশলা-পাতি কী আছে না আছে একটু দেখে নিও না, সেও বোধ হয় কিনতে হবে। শুনেছি দু-তিনদিন হল বাজারে নাকি লিচু এসেছে,যদি দাম বেশি না হ্য় তবে খানিকটা লিচু কিনে নিও.. মরশুমের পয়লা ফল..

এখানে বেশ ঠান্ডা.. আসার পথে ভুল করে এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে জ্যাকেট-চাদর ফেলে এসে দোকানে দোকানে গরম কিছু জামা হন্যে হয়ে খুঁজেছি, পাইনি। এখন তো সামার কাজেই কোথাও কোনো গরম জামা কাপড় নাই, সব ফুলফুলা-ঝুলঝুলা সামারের কাপড়! তবে এদেশের সামারে আমার হাড়ে হাড়ে কাঁপুনি লাগে এই হল সমস্যা! সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলেন আতিক, এখানেও এক আতিক আছেন জানো তো, সে আমাদের ইফতেকারের কলিগ, বললেন, আমাদের বাসায় কিছু গরম জামা কাপড় আছে, যেগুলো কেনা হয়েছিল কিন্তু ইউজ হয়নি, আপনি আপাতত কাজ চালান! বোঝো ঠ্যালা, আমি এখন আতিকের সোয়েটার-জ্যাকেট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছি!
কেনজি কুরোকাওয়ার কথা শোনো। এখানে এসে প্রথম যাঁর সাথে আলাপ, তিনি কেনজি কুরোকাওয়া। 

এয়ারপোর্টে গেছিলেন ইফতি'র সাথে, ইফতি তো গাড়ি চালাতে পারে না আর ঝুমকির গাড়ি চালানো বারণ তাই কেনজি গেলেন সারথী হয়ে, আমাকে আনতে। সদাহাস্য এক মুখ। ব্যবসার কাজে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ান বলে কাজ চালানোর মত ইংরেজি বলেই ফেলেন আর বোঝেনও। একঘন্টার রাস্তায় আমার সাথে খুব একটা কথা বলেননি আমি টায়ার্ড বলে, শুধু বলে দিয়েছিলেন, কোথাও যেতে চাইলে যেব অবশ্যই বলি, তিনি নিয়ে যাবেন, ইফতেকার সান তো সময় পাবেন না। সক্কলের নামে পেছনে একটা 'সান' জুড়ে দিয়ে কথা বলেন এরা। এর মাঝে আমার নামটা দু-তিনবার উচ্চারন করে করে সড়গড় হওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

দিন কয় আগে কিছু কেনাকাটা করব বলাতে ইফতি কেনজি সানকেই ডাকে, সাথে করে নিয়ে যেতে আর পারলে একটু ঘুরিয়েও দিতে। সেদিন শহরের মধ্যেই খানিক ইতি-উতি ঘুরিয়ে নিজের বাড়ি নিয়ে যান কেনজি, গিন্নির সাথে আলাপ করিয়ে দিতে। কেকো কুরোকাওয়া। কেকো সান। ভারী মিষ্টি মহিলা। সদাহাস্য মুখ এঁরও, আর সদালাপী। তিনি যা বলেন আমি সেটা বুঝি না আর আমি যা বলি তিনি সেটা বোঝেন না তাই কিছু একটা কথা বলেই  কেনজি সানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন, আনুবাদ করে সেটা আমাকে বুঝিয়ে দিতে আবার আমি কী বলি সেটাও কেনজি'র কাছ থেকেই বুঝে নেন। 

পাশাপাশি দুটো বাড়িতে দু'জনে থাকেন, খাওয়া-দাওয়া একসঙ্গেই করেন। দুটো বাড়িরই সামনে পেছনে বাগান, যার দেখাশোনা করেন কেনজি। নিজের বাগানের জারবারা, মার্গারেট তুলে দিলেন কেকো সান, পেড়ে দিলেন স্ট্রবেরি, চেরি। আর দিলেন বাঁশের কোর, সব্জি হিসেবে রান্না করে খাওয়ার জন্যে। সময় কম ছিলো বলে শুধু বাগান দেখেই ফিরে এলাম, এর মাঝেই কেকো জেনে নিলেন কোথায় কোথায় যেতে চাই, সেটা চট করে একটা নোট খাতায় লিখেও নিলেন। ঠিক হল, এই রবিবার মানে আজকে বেরুবো আমরা।

এই বাড়ির পেছনটায় নিচু পাহাড় কেটে মাঠ, ছাড়া ছাড়া সব বিল্ডিং, ইউনিভার্সিটির লেকচার রুম, ক্লাসরুম, ল্যাব, জিমন্যাশিয়াম, বিদেশী ছাত্রদের কোয়ার্টার। এখানে জিমন্যাশিয়ামগুলো আমাদের দেশের জিমখানার মত নয়। এখানে স্কুল-কলেজের বাচ্চারা একটা নির্দিষ্ট সময়ে এসে ঢোকে কাঁধে ইয়াব্বড় ব্যাগ নিয়ে। কারো হাতে থাকে স্টিক, বল, কারো বা ব্যাট। ঘড়ি ধরে ওরা সব খেলে আর তারপর ঘড়ি ধরে বেরিয়ে যায়। মিষ্টি বাজনা বাজে জিমন্যাশিয়ামের ভেতরে, খুব বেশিদূর যায় না সে বাজনার শব্দ। ছেলের দল বেরিয়ে গেলে দরজা বন্ধ হয় জিমন্যাশিয়ামের, বন্ধ হয় বাজনাও। নীরব সুনসান আবার সব, আগের মতো।

মাঠের বাঁদিকে জঙ্গল আর তার পাশ ধরে সরু একফালি রাস্তা। মাঠ পেরিয়ে সে এঁকে বেকে চলে গেছে ইউনি এলাকায় আর তারপর কোথায় কে জানে..বেশ বড়সড় আর ঘন জঙ্গল। উঁচু উঁচু সব নাম না জানা গাছ। আছে নানা রকমের জংলী ফুল, ছোটো আর ঘন ঝোপ। অচেনা সব রং-বেরঙের ফুলেরা ফুটে আছে ঝোপ জুড়ে, জঙ্গল জুড়ে। আর আছে সাকুরা গাছ। এখন আর সে সব গাছে ফুল নেই, শুধু পাতা। সবুজ পাতায় ছেয়ে আছে বিশাল ঝাঁকড়া সব সাকুরা গাছ। 

মাঠের কথা বলছিলাম। সে এক বিশাল বড় মাঠ। গোল করে গোটা মাঠ জুড়ে চওড়া রাস্তা বানানো সে মাঠ জুড়ে, দৌড়নোর জন্যে। এবং সেখানে সকাল সন্ধে মানুষ দৌড়ায়। গোল গোল। গোল গোল। দৌড়ুচ্ছে তো দৌড়ুচ্ছেই। মাঠের একধারে বেঞ্চে বসে বসে ভাবি, এরা কত দৌড়ুতে পারে? ক্লান্ত হয় না? নানা বয়েসী মানুষ সব। প্রায় সকলেই পরে থাকে জ্যাকেট। মাঠে আসে ছোট বাচ্চারাও। এত বড় মাঠ যে কয়েকটা দল ছড়িয়ে ছিটিয়ে একসাথে খেলে নানা রকমের খেলা আর সাথে থাকে ছুটন্ত মানুষেরা। 

তুমি কি খেলা দেখছো? আইপিএলের ফাইনাল? .অদ্ভুত একটা ব্যপার জানো.. আমি এখন পর্যন্ত কোথাও কাওকে প্রেম করতে দেখিনি! দেখিনি কোথাও কেউ হাত ধরাধরি করে হাঁটছে! রাস্তায় না। মাঠে না। ইউনি এলাকায় না। কোথাও না। কোথাও না। ছাতা সকলেরই হাতে থাকে যখন তখন বৃষ্টি নেমে পড়ে বলে, লোকে পার্কে-মাঠে-ময়দানেও যায় ছাতা হাতে কিন্তু কোনো প্রেমিক-প্রেমিকা দেখা যায় না! রাস্তায় যেমন গাড়ির হর্ন নেই তেমনি নেই প্রেমিক-প্রেমিকাও। কী ভীষণ অদ্ভুত ব্যপার!!

ক্রমশ..

Sunday, May 17, 2009

ফুকোওকার চিঠি

এই বছরের শুরুর থেকেই রিতিমত দৌড়ের উপর আছি। ঠিক এই বছরের শেষ না, ঠিকঠাক বললে বলতে হবে, গত বছরের শেষ থেকে। ডিসেম্বরের শেষে ঢাকায় গিয়ে জানুয়ারীর শেষে কলকাতা। ঠিক তিন সপ্তাহ পরে মাঝ ফেব্রুয়ারীতে আবার ঢাকা। পুরো এক মাস। বইমেলা গেল। মেলা শেষ হওয়ার পরেও আমার দৌড় শেষ হলো না। গোটা একটা মাস ঢাকায় থাকা আমার এই প্রথম। আর বাংলাদেশে একমাস আছি কিন্তু আব্বা আম্মার কাছে গোটা একমাসে মাত্র একদিন, সেটাও এই প্রথম। যাই হোক, কলকাতায় ফিরে খানিক দম নিয়ে জিরোতে না জিরোতেই আবার পায়ের তলার সর্ষের বলটা গড়িয়ে গেল আর এবার গড়ালো বেশ অনেকটা দূর অব্দি। একেবারে সাগর পেরিয়ে সূর্যোদয়ের দেশে। 

সিঙ্গাপুরে ১৯ঘন্টার যাত্রাবিরতি। একা একা কোথায় যাবো, প্রায় গোটা একটা দিন কিভাবে কাটাবো, বেশ দু:শ্চিন্তায় ছিলাম। খুব ভোরে সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্টে প্লেন থেকে জখন নামি, তার খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে। সারসার এরোপ্লেন যেন বিছিয়ে আছে জলমগ্ন রানওয়েতে। সুবিশাল এয়ারপোর্ট। হেঁটে হেঁটে কূল-কিনারা পাওয়া যায় না যেন। সারসার শুল্কমুক্ত দোকান দেখে ভুল করে শুল্কমুক্ত কোনো শপিং মলে ঢুকে পড়লাম কিনা মনে হয়। প্লেনের সহযাত্রীরা যেদিকে যায়, আমিও সেদিকেই হাঁটি। বাঙাল বলে কথা তায় আবার জীব্বনে বিদেশ যাইনি! আগের দিনেই পাওয়া এক ফোন নম্বরে ফোন করি, উদ্দেশ্য, এয়ারপোর্ট থেকে বেরুনো, সিঙ্গাপুরটা খানিক ঘুরে দেখা। যদিও সুমেরু বলেছিল, চুপচাপ বসে থাকবে, বেরুনোর দরকার নেই, হারিয়ে যাবে! 

এই সিঙ্গাপুর নিয়ে আমার একটা গল্প আছে, ছেলেবেলার গল্প। আমি তখন বেশ ছোট। আব্বা ব্যবসার কাজে সিঙ্গাপুরে গেলেন সেবার। কী একটা হোটেলে যেন ছিলেন, আমি নামটা ভুলে গেছি। কিছু একটা ইন্টারন্যাশনাল হোটেল। আব্বা আমার জন্যে হোটেলের প্যাড, খাম, ডাকটিকিট ইত্যাদি নিয়ে এসেছিলেন। আর নিয়ে এসেছিলেন বিশাল বড় এক টেপরেকর্ডার, আর ইয়াব্বড় এক আংটি, আমার জন্য। আমি তখন ফ্রক পরতাম কিন্তু আব্বা আমার জন্যে শাড়ী নিয়ে এসেছিলেন, অফ হোয়াইট রঙের জর্জেট শাড়ী। সে শাড়ী আমার কাছে এখনও আছে। তো আব্বা সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে এসে প্রচুর গল্প করেছিলেন, সে নাকি ছোট্ট এক দেশ, সাজানো গোছানো, ছিমছাম আর বড় সুন্দর নাকি সে দেশ। আব্বার যার সাথে ব্যবসা, তার নাম ছিল চু ওয়া । চাইনীজ। সেই আব্বাকে সব জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেত। আব্বা দেশে ফেরার কিছুদিন পরে সেই চু ওয়া বাংলাদেশে এসেছিল আর আমাদের বাসাতেই ছিল এক সপ্তাহ। 

আব্বার মুখে সিঙ্গাপুরের গল্প শুনে শুনে আমার খুব সিঙ্গাপুরে যেতে সাধ হত যদিও কোনোদিন কাওকে বলিনি সে কথা। এর কিছুদিন পরে চট্টগ্রাম থেকে এক জাহাজ গিয়েছিল সিঙ্গাপুর, হিজবুল বাহার। চট্টগ্রাম-সিঙ্গাপুর-চট্টগ্রাম। সেই জাহাজে আমার সেজকাকা সিঙ্গাপুরে গেল বেড়াতে। আব্বাই পাঠালেন, জাহাজটা যাচ্ছে, যাও, ঘুরে এসো! কাকা তখন কলেজে পড়ে। তো কাকা ঘুরে এলো আর সেও এসে প্রচুর গল্প করলো। আর যাওয়ার আগে কাকার সেকি উৎসাহ! তখন কাকার সাথে সিঙ্গাপুরে যাওয়ার ভীষণ ইচ্ছে হয়েছিল আমার কিন্তু আমি তখনও কাওকে কিছু বলিনি। কাকা চলে যাওয়ার পর কয়েকদিন শুধু মুখ গোমড়া করে ছিলাম, কারো সাথেই পারতে কোনো কথা বলতাম না। কাকাও ফিরে এসে প্রচুর গল্প করল। তার গল্প আরো বেশি, জাহাজের গল্প, সমুদ্রের গল্প আর সিঙ্গাপুর তো আছেই! আমার মন খারাপ তখন রিতিমত মেজাজ খারাপে পরিণত হয়েছিল কিন্তু সেটাও আমি কাওকে বলিনি।

তো আমার ট্রাভেল এজেন্ট যখন জানতে চাইলেন, ম্যাডাম, কোন রাস্তায় যাবেন, বাংকক না সিঙ্গাপুর? আমার এক মুহূর্তও লাগেনি 'সিঙ্গাপুর' বলতে! টিকিটের দাম বেশি পড়বে জেনেও বললাম, সিঙ্গাপুর এয়ালাইন্সেই যাবো! 

তো এই সেই সিঙ্গাপুর! অনেক বছর আগে যেখানে বেড়ানোর তীব্র সাধ জেগেছিল আমার। ফোন করি আতিককে। ছোট ভাইয়ের বন্ধু আতিক সিঙ্গাপুরে থেকে পড়াশোনা করছে। ঘুম জড়ানো গলায় আতিক বলে, আপনি দু নম্বর টার্মিনালের সামনে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে থাকুন, আমি আসছি। রোগা পাতলা এক ছেলে এসে সামনে দাঁড়ায় ঘন্টা খানেক পরে, একনজরেই বোঝা যায় ঘুম কাটেনি তার চোখ থেকে তখনও। শুনলাম, আতিক থাকে পশ্চিম জুরংএ,। হাইওয়ে ধরে ট্যাক্সি যায়। বেলা আটটায়ও রাস্তা নীরব আর ফাঁকা। সপ্তাহান্তের সেটা শুরু বলেই হয়তো! ভোররাতে বৃষ্টি হয়েছে কিন্তু আকাশ তখনও মেঘলা। অনুজ্জ্বল সকাল। তকতকে রাস্তা ধরে ছুটে যাওয়া ট্যাক্সির বাইরে যেন ক্যালেন্ডারের পাতারা হুস হাস বেরিয়ে যাচ্ছে। উঁচু-নিচু পাহাড়ী রাস্তা মনে করিয়ে দেয় আমাদের চট্টগ্রামকে। প্রচুর গাছ রাস্তার দু'পাশেই। সবুজে সবুজ। 

জানলাম, আতিকের বাড়িতে যাচ্ছি। আতিকের উপর হুকুম জারী হয়েছে, আমাকে যেন ঘুরিয়ে সিঙ্গাপুর দেখিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশের আরো দুটি ছেলের সঙ্গে আতিক থাকে বিশাল বড় এক বাড়ির চারতলার এক ফ্ল্যাটে। আতিকের সাথে বাসা শেয়ার করে গৌতম, আরিফ। ওরা সকলেই সিঙ্গাপুরে পোষ্ট ডক্টরেট করছে। রোগা পাতলা,ছোট্ট দেখতে আতিককে দেখে ভাবতে অসুবিধে হয় যে, এই ছেলেটি খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়! বাসায় ঢোকার আগে একটা ফুড জাংশানে নিয়ে যায় আতিক, ব্রেকফার্স্টের জন্যে, ওদের বাসায় নাকি রান্না-খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। বিশাল বড় এক মগে করে কড়া এক মগ কফি শুধু খেয়ে আতিকের বাসায় যাই। তিন বেডরুমের বেশ বড়সড় এক বাসা, হলঘরের মেঝেতে মাদুরের উপর দেখলাম দু'জন ঘুমিয়ে আছে, শুনলাম, ওরা গৌতম আর আরিফ। হিজাব পরা মালয়ী এক ভদ্রমহিলা এগিয়ে এলেন, মারিয়ম, আতিকের ল্যান্ডলেডি। মারিয়ম একটি তালাবন্ধ ঘর খুলে দিয়ে বললেন, রেস্ট নাও, দরকার লাগলে ডেকো। আতিকদের দেখাশোনা মারিয়মই করেন শুনলাম। যদি ঘুমিয়ে পড়ি তবে যেন বারোটায় তুলে দেন বলে ঘুমিয়েই পড়লাম অচেনা এক দেশে, অচেনা এক ঘরে..

Friday, May 08, 2009

বন্ধু থাকো, থাকো আমার মনে

জীবন অরণ্যে তীরবিদ্ধ আমার পাঁজরে
ঝর্ণার গান ঝর-ঝর আর টুপটাপ
ও ----তুমি আবার এসো
গান শুনে যেও আর স্নান করে যেও। (মাসুদ)

সেদিন ঢাকা থেকে কলকাতা ফেরার পথে সকালবেলায় এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে সঙ্গী হল মাসুদ-কাঁকনসারাটা পথ কাঁকন গান গাইলো, কখনও গুনগুনিয়ে, কখনও গলা খুলেমাঝে মাঝেই গলা মেলাচ্ছিল মাসুদওগানের ফাঁকে ফাঁকে টুকরো টুকরো কথাআমি একটু চুপচাপগত একমাস ঢাকাবাসের স্মৃতি একেবারে টাটকা, কিছু সুখস্মৃতি তো কিছু তিক্ত-বিরক্তিকর, দু : খজনকআগেরদিন সারাদিন শুদ্ধস্বরে বসে থাকা, অপেক্ষায়, কখন সুমেরুর বইটা আসবেআসার আগে অসুস্থ বোনটাকে শেষবারের মত দেখে আসা হলো না বইটার জন্য অপেক্ষায়মনটা বেশ খারাপসন্ধ্যায় বন্দুকের নলই ক্ষমতার প্রকৃত উত্স-এর প্রকাশকে কেন্দ্র করে আয়োজিত অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিএকফাঁকে যে ছুট্টে গিয়ে বোনটাকে দেখে আসব ঢাকার ট্র্যাফিকের কারণে সে জো নেই

মাসুদ আর কাঁকন দুজনেই চারুকলার শেষ বর্ষের ছাত্রট্র্যাজেডি- গত দীর্ঘ নয় বৎসর যাবৎ ওরা চারুকলায় পড়ছেশেষবার বোধ হয় পরীক্ষা দিয়েছিল বছর তিনেক আগেওরা দু'জনেই আশা করছে, 'বছরটায় বোধ হয় ওদের পরীক্ষাটা হয়ে যাবে আর ওরাও উৎরে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাট, যে ঘাটে ওরা আটকে আছে গত নয়টি বছর ধরেইতিমধ্যেই সরকারী চাকুরীর বয়স পেরিয়ে যায় যায় করছে দু'জনেরইকাঁকন উত্তরায় একটা স্কুলে আঁকা শেখায়, করে আরো দু-তিনটি আঁকার টিউশনিআর মাসুদ? ঠিক জানি নাবোধ হয় কাজের চেষ্টায় ঘুরে বেড়ায় এদিক ওদিকওরা থাকে কাঁঠালবাগানের একটা ফ্ল্যাটেরাত এগারটা বেজে গেলেই সেদিন দু'জ্নার আর বাড়ি ফেরা হয় না, থেকে যায়, থেকে যেতে হয় বন্ধুর বাড়ি- সাগরের বাড়িরাত এগারটা বাজলেই ওদের একতলার গেটে তালা পড়ে যায়, বাড়িতে আর ঢোকা যায় না


মাসুদ কবিতা লেখে, গান লেখেসে গানে সুর বসায় কাকনগায় কাঁকনঅদ্ভুত সুরেলা আর মিষ্টি গলা কাঁকনেরকাঁকনের কথা শুনলে মনে হতে বাধ্য, এই মেয়ে নিশ্চয়ই গান গায়যখনই গাইতে শুরু করে, চোখদুটি মুদে আসে আপনা থেকেই কথার মধ্যে ডুবে গিয়ে, মগ্ন হয়ে দুলে দুলে গায় কাঁকনকাঁকন গণসঙ্গীত গয়, গানের দলের সাথে ঘুরে বেড়ায় নানা জায়গায়বন্ধুরা যে বাড়িতে আড্ডা দেয়, সে বাড়ির রান্নাঘরের দায়িত্ব আপনা থেকেই এসে পড়ে কাঁকনের উপরকাঁকন রান্না করে, মাঝে মাঝেই এসে আড্ডায় যোগ দেয় আর রান্না শেষ হলেই গুছিয়ে বসে গান গয় মাসুদের লেখা গান আর লালন

০২
ও যমুনা রে,
জলের নাচন নাচাস বুকে
আমারে তুই নে,
আমিও তো নাচতে জানি রে----(মাসুদ)


সাগরের সাথে আমার প্রথম দেখা আজিজ মার্কেটের সামনের ফুটপাথেসেটা জানুয়ারী মাস, পরদিন আমার কলকাতায় ফেরা, শেষবেলার আড্ডা দিতে সঙ্গে সহব্লগার-বন্ধু ফারুক ওয়াসিফকে নিয়ে আমরা দু'জন পাঠশালায় ফিরব বলে রওয়ানা দিয়েও ফুটপাথে দাঁড়িয়ে হঠাত্ দেখা দেখা হয়ে যাওয়া এক বন্ধুর সাথে কথা বলছিল ওয়াসিফআমরা দু'জন একপাশে দাঁড়িয়ে, হঠাৎ দেখি সুমেরুর চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল, খানিকটা সন্দেহ আর খানিকটা সংকোচের সাথে সে এগিয়ে গিয়ে ওয়াসিফের বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে, "সাগর না?' "আরে, তুই সুমেরু না!' কিল-চড়-ঘুষি সমানে খানিক চলার পর জানা গেল, সাগরের সাথে সুমেরুর শেষ দেখা হয়েছিল দশ বছর আগে, কলকাতায়সম্ভবত সাগর তার বানানো কোনো একটা ফিল্ম নিয়ে কলকাতায় এসেছিলো আর সে নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়েছিলতখনই কিংবা হয়তো তারও আগে থেকে ওরা একে অন্যকে চেনে, সেই সময় সুমেরু আর সাগর মিলে কোনোরকমে সেই ঝামেলা থেকে পার পেয়েছিলতারপর এই সেদিন আবার দেখা, আজিজ মার্কেটের সামনের ফুটপাথেএদের মারপিট আর তারপরের কথপোকথন শুনে আমি এবং ওয়াসিফ দু'জনেই চুপসাগরকে সাথে করে ফেরা হল পাঠশালায়, আমাদের অস্থায়ী আবাসেগলায় ঝোলানো ক্যামেরা খুলে সাগর আমার ছবি তুললো, বইয়ের জন্যমাঝরাত পার হওয়ার পর ওয়াসিফ এবং সাগর দু'জনেই বলতে লাগল, বাকি আড্ডাটা আমার বাড়িতে হোকসকালে আমার ফ্লাইট, কলকাতা ফিরব, কিস্যু গোছনো হয়নি, সাগর বললো, চল নানিয়মের জীবন কত বাঁচবা

সাগরকে 'মোল্লা সাগর' নামে ঢাকায় অনেকেই চিনবেনসাগর ছবি তোলে, ছবি আঁকে, সিনেমা বানায়, গান শোনে, গান সংগ্রহ করে, বাংলা সংস্কৃতি আন্দোলন নামে একটা সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত, বিভিন্ন রকম কর্মশালার আয়োজন করে, সারাক্ষণই ফোন কানে কাউকে না কাউকে কখনও কিছু পরামর্শ কখনও বা কিছু যোগাড়-যন্ত্রের হুকুম করে যায়চারুকলার প্রাক্তন ছাত্র সাগরকে সন্ধে থেকেই পাওয়া যায় ছবির হাটেকোনো না কোনো আয়োজনে সর্বদাই ব্যস্ত থাকে সে সেখানে কখনও কল্লোল'দার গানের আসরের আয়োজন, কখনও হাটের মেঝে জুড়ে লুডুর বোর্ড এঁকে কাঠের বিশাল ছক্কায় সাপলুডু খেলা আর তার সাথেই পর্দা টানিয়ে তাতে সিনেমা দেখানোকখনও বা সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ঘুড়ির উৎসবের আয়োজনে মাসাধিককাল ধরে নানা রকমের, নানা আকারের রং-বেরঙের সব ঘুড়ি বানানো আর তার ফান্ড যোগাড় করার জন্যে চারুকলার ছেলে-পুলেদের নিয়ে সরা, পট আঁকা সারা বিকেল-সন্ধে জুড়েগানপাগল সাগর যেখানে যা গান শোনে, যার গলায় শোনে, পছন্দ হলে আর সম্ভব হলে সাথে সাথেই রেকর্ড করে নেয়, নইলে পরে দিন ঠিক করে সেখানে পৌঁছে যায় বড় ক্যামেরা সহপরে নিজের বানানো সিনেমায় জুড়ে দেয় সেসব গান কারোর কারোর সাথে হয়তো মেলে না সাগরের কিন্তু যার সাথে মেলে সে তার প্রাণের মানুষ


০৩
আর যাবো না ঠাকুরবাড়ি
আমার রাধার নাইরে শাড়ি
সূর্য তুমি ডুবে যাও
সূর্য তুমি নিভে যাও
অন্ধকারে স্বর্গ আঁকো
যে চেনে সে চিনে নেবে
অন্ধকারে ঠাকুরবাড়ি-কফিল আহমেদ

হাসান আরিফআবৃত্তিকারজীবনধারণের জন্যে একটা চাকরীও করেনতাঁর সাথে আমার-আমাদের আলাপও অদ্ভুতভাবে২০০৩সালে সুমেরুর বড়জ্যেঠু খুন হন নিজের চেম্বারে, একজন  ডাক্তার ছিলেন তিনি, তখন কলকাতার চলচ্চিত্রকার বন্ধু গৌতমের সাহায্যে রাতারাতি বর্ডার পেরিয়ে সুমেরু বাংলাদেশে যায়, নিজেদের বাড়িতে, ঝিনেদায়পরে গৌতমের সাথেই গৌতমেরই পরিচিত হাসান আরিফের বাড়িতে গিয়ে গিয়ে ওঠে, ঢাকায়দিন কয়েক ছিল সে সেখানেতখনই আলাপ হয়, আনিস মাহমুদ, বর্তমানে সহব্লগার আনিস ভাইয়ের সাথেওফিরে আসার পরে, যা হয়, কিছুদিন যোগাযোগ ছিল তারপরে এতদিন আর কোনো যোগাযোগ ছিলো না কারো সাথেইউত্তরায় সচলায়তনের ব্লগারদের সম্মেলনে আনিস ভাই চিনতে পারেন সুমেরুকে, খানিক গল্পও হয়কী অদ্ভুত যোগাযোগ! দিন দুই পরে সন্ধের দিকে আজিজ থেকে ফেরার পথে পাঠশালার গেটে "এই সুমেরুউউউ' ডাক শুনে দু'জনেই পেছন ফিরে তাকাই, একজন মানুষ এগিয়ে আসেন, কোনো কথা না বলে জড়িয়ে ধরেন সুমেরুকেকোথায় ছিলা-কেমন ছিলা-কবে আসলা-র পরে তাঁর নজর পড়ে আমার দিকে, সুমেরু আলাপ করিয়ে দেয় হাসান আরিফ ভাইয়ের সাথেপাঠশালার ঘরে বসে খানিক গল্প করার পরে জানা গেল, তিনিও কুমিল্লার অর্থাৎ আমার দেশের মানুষব্যসজমে গেল আড্ডাশুনলাম, নেক্সট ডোরেই থাকেন খালাম্মা, আরিফ ভাইয়ের মাসেখানে গেলে পিঠে খাওয়া যাবে, আমাদের দেশের পিঠেএবং আমরা পিঠে খেলাম সেখানে গিয়েখালাম্মা, আরিফ ভাইয়ের ভগ্নীপতি সহ আড্ডা চলল মাঝরাত অব্দিমাঝে মাঝে ভাবি, এমনও হয়! পৃথিবীটাই আসলে গোলঘুরে ফিরে কোথায়-কখন যে কার সাথে দেখা হয়ে যাবে কেউ জানে না

সেদিন তেরই মার্চ সন্ধেয় হাসান আরিফ ভাই আবার আসেন পাঠশালার ঘরে, পরদিন বন্দুকের নল-এর প্রকাশা উৎসবে তিনি পাঠ করবেন সুমেরুর বইয়ের কিছু অংশআমাকে বললেন, সুমেরুর নিজের লেখা থেকে পাঠ আগেই শুনেছি, আজ তুমি পড়ে শোনাও, তোমার বই থেকে। লেখকের নিজের লেখা থেকে পাঠ শুনলে সুবিধে হয় পরে সেটা থেকে পড়তেদুটো লেখা তিনি নিজেই বেছে দিলেন এবং বসে বসে শুনলেন আমার বইয়ের থেকে গল্প দু'টিআমি পড়ে শোনালাম

দৃক গ্যালারীর অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে আরিফ ভাই বলে রেখেছিলেন, অনুষ্ঠান শেষে তোমরা দু'জন আমার অতিথি, পছন্দসই একটা জায়গায় বসে খানিক আড্ডা আর খাওয়া দাওয়াআনুষ্ঠান শেষে অতিথিসংখ্যা বেশ কয়েকজনে দাঁড়ালো, কৃষ্ণকলি ও তার এক বন্ধু, সাগর, মাসুদ-কাঁকন ও সাগরের আরেক বন্ধু অ্যানীও হ্যাঁ, আরফানও ছিলঠিক হলো, আড্ডা হবে পাঠশালাতেইকাবাব আর পরোটা নিয়ে এলেন আরিফ ভাই, সাগর নিয়ে এলো পানীয়কফিল আহমেদ আবারও গান গাইলেনএবারে গান শোনালেন কৃষ্ণকলিওপরদিন সকালে আমার বেরুনো, বাক্সো-প্যাটরা কিস্‌সু গোছানো হয়নি কিন্তু গান আর কথা - সে যে ফুরায় না ...

কফিল আহমেদের কথা প্রথম শুনি ব্লগার বন্ধু শাপলুর কাছেসে বছর দৃকে সিনেমা বিষয়ক একটা কর্মশালার জন্য সুমেরু ঢাকায় যায়, সঙ্গে আমিশাপলু আমাকে একটা সিডি দেয় কফিল আহমেদেরতাঁর কথা- তাঁর গানের কথা শুনেছি ব্লগবন্ধু ইমরুল হাসানের কাছেওএবার সাগরের বাড়িতে যেদিন কল্লোল'দা গান করেন, সেদিন সাগর ফোনে ডাকে কফিল আহমেদকেওসাগরের বহু স্বল্প দৈর্ঘের চলচ্চিত্রে কফিল আহমেদ গান করেছেন, সে'সব চলচ্চিত্র দেখেছি কখনও পাঠশালার ঘরে, কখনও সাগরের বাড়িতেতাঁর গান শুনেছি সাগরের মোবাইল ফোনে- সাগরের গানের সংগ্রহ থেকে শুনেছি-দেখেছি তাঁর গানের ভিডিওভালো লেগেছে বলা বাহুল্যঢাকার বাইরে ছিলেন, আসতে পারেননি সে'দিন তিনিআসার কথা ছিলো পাঠশালার ঘরেও, গান-আড্ডায়রেকর্ডিংএ আটকে গিয়ে সেদিনও আসা হয়নি তাঁরসব অপেক্ষা পুষিয়ে দিলেন কফিল আহমেদ, চৌদ্দ তারিখে, দৃক গ্যালারীতে, বন্দুকের নল-এর প্রকাশনা উৎসবে, অপেক্ষমান বন্ধুদের অনুরোধে একের পর এক গান শুনিয়েছেন কফিল আহমেদযেটুকু বাকি ছিল, সেটুকুও পূর্ণ হয় পাঠশালার ঘরে, কৃষ্ণকলির সাথে যুগলবন্দীতে

০৪
ভালো থাইকো বন্ধু আমার এমন বিজনে
ভালো থাইকো ভালোবাসায় বন্ধুর পরাণে
ভালো থাইকো বন্ধু আমার এমন বিজনে
বুকের মাঝে বন্ধুর বাড়ি, তাতে দরজা সারি সারি
তাতে নাইকো আগল নাইকো দ্বারী। -কল্লোল দাশগুপ্ত


কল্লোল দাশগুপ্তআমাদের কল্লোল'দাঢাকা যাওয়ার আগেরদিন সন্ধ্যায় দৃকের অফিসে গিয়ে শুনলাম, পরদিন কল্লোল'দাও ঢাকা যাচ্ছেন ছবিমেলা দেখতে কল্লোল'দার বহু পুরনো বন্ধু দৃক বাংলাদেশের বর্তমান ডিরেক্টর, জহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক রেহনুমা'র আমন্ত্রণে কল্লোল'দা আগেও ছবিমেলায় গেছেন শুনলাম শুভেন্দু'দার কাছে, সেদিন সারাদিনই নাকি কল্লোল'দার সাথে বাংলাদেশ হাই কমিশনে ছিলেন তিনিদৃক ইন্ডিয়ার ডিরেক্টর শুভেন্দু চ্যাটার্জীও কল্লোল'দার পুরোনো বন্ধু ও প্রাক্তন নকশালকল্লোল'দার সাথে এর আগে আমার শুধু ফোনে কথা হয়েছে, দেখা হয়নিগুরুচন্ডা৯-তে কারাগার, বধ্যভূমি-র সুবাদে কল্লোল'দা আমার কাছে এক বিশাল আকারের মানুষ, যাঁর দিকে তাকাতে গেলে ঘাঁড় অনেকটা উঁচু করতে হয়, নিজেকে অনেক অনেক ছোট দেখা যায় তাঁর সামনেসেই কল্লোল'দাও সেদিনই ঢাকা যাচ্ছেন, যেদিন আমি যাচ্ছি, শুনে কিরকম একটা মিশ্র অনুভূতি হলপরদিন দুপুরে ঢাকা পৌঁছেই আমি সোজা শুদ্ধস্বরে, প্রকাশকের অফিসে, সুমেরু সকাল থেকে এয়ারপোর্টে বসে ছিল বলে জরুরী মিটিংকে ঠেলে ঠেলে সন্ধেয় নিয়ে ফেলেছিল, সেই মিটিং সারতে সে গেল তার অফিসে, দৃকে সাগর আমাকে আজিজ মার্কেটে, প্রকাশকের অফিসে পৌঁছে দিয়ে চলে গেছে ছবির হাটে, সেখানে তখন ঘুড়ি উৎসবের প্রস্তুতিপর্ব চলছেসন্ধেয় বন্ধুবর মাহবুব লীলেনের সাথে বইমেলাআমার প্রথম বইমেলা ঢাকায়, প্রথম একুশে বইমেলা ঘুরে-ফিরে-দেখে একরাশ উত্তেজনা আর আনন্দে মাতাল হয়ে আবার লীলেনের সাথেই হাঁটতে হাঁটতে ছবির হাট, সেখানে সাগর অপেক্ষা করছে, আমাকে পাঠশালায় পৌঁছে দেবে বলে

আলাপ হল ওয়েনের সাথেফরাসী যুবক, কী একটা কাজে বেশ কয়েকমাসের জন্যে ঢাকায় আছেসাগর ওয়েনের সঙ্গে এক অক্ষরও ইংরাজী বলে না আর ওয়েন? কতটা বোঝে না বোঝে আল্লাহ মালুম কিন্তু কথা যেটুকু বলে সাগরের সঙ্গে, বাংলাতেই বলেএক রিকশায় তিনজন, আমি-সাগর-ওয়েনগন্তব্য ষ্টার কাবাবসুমেরুর ফোন নট রিচেবলপরোটা কাবাব, চিকেন তন্দুরি আর বোরহানীসুমেরু ফোনে জানায়, কল্লোল'দা আর কৃষ্ঞা বৌদি পাঠশালার দরজায় অপেক্ষা করছেন সন্ধে থেকেআবার এক রিকশায় তিনজন, এবার সাথে পরোটা আর কাবাবের প্যাকেট

কল্লোল'দার সাথে দেখা হওয়ার পর একবারের জন্যেও মনে হয়নি যে এই মানুষটাকে আমি আগে কখনও দেখিনি বা ওঁর কথা ভাবলে আমার এক ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধাবোধ কাজ করতআমি রান্নাঘরে খাবার গরম করার মাঝেই গিটার খুলে কল্লোল'দার গান শুরু হয়ে যায়, উঁকি দিয়ে দেখি, ছোট্ট টেপরেকর্ডার অন করে গালে হাত দিয়ে ওয়েন চুপ করে বসে আছে,গান শুনছে একমনে আর চোখ বন্ধ করে সাগর শুধু হাতের ম্যাচবক্স দিয়ে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে গিটারের সঙ্গেটেলিফোনের ওধার থেকে কল্লোল'দা আমাকে একদিন গান শুনিয়েছিলেন মাঝরাতে, আর কল্লোল'দার ছবি দেখেছিলাম দময়ন্তীর দেওয়া ওয়েব অ্যালবামের পাতায়, আর সামনে ছিল কল্লোল'দার লিখে যাওয়া নকশাল অন্দোলনের কথা, সেই কারাগার, বধ্যভূমি ... সে'রাতে গান চলে রাত একটা অব্দিচার ঘন্টার ঐ ঘরোয়া আসরের সবটুকু তোলা থাকে ওয়েনের ছোট্ট কিন্তু শক্তিশালী ডিজিটাল টেপরেকর্ডারেকল্লোল'দার গান, গানের পেছনের কথা, মাঝে মাঝে আমাদের কিছু কথা, সব, সব তোলা থাকে ওয়েনের সেই রেকর্ডারেযেটুকু জায়্গা সাগরের মোবাইল ফোনের মেমরি কার্ডে ছিল, সবটুকু জায়গা জুড়ে নেয় কল্লোল'দার গান

আটদিন কল্লোল'দা আর বৌদি ঢাকায় ছিলেনযেখানেই গেছেন সার্বক্ষণিক সঙ্গী গিটারটির খাপ খুলে গান শুনিয়েছেন সকলকে, কখনও সেটা রেহনুমার বাড়িতে, কখনও ছবির হাটে, কখনও আজিজে মার্কেটের নিচতলায় কাকা'র সিডি-ক্যাসেটের দোকানে তো কখনও অচেনা বন্ধু হাসান মোরশেদের বই প্রকাশের উৎসবে, একুশের বইমেলায়কখনও বা রাতভর গান চলেছে পাঠশালার ঘরে-সাগরের বাড়ির হলঘরেআর তার অসাধারণ মায়াময় ব্যাক্তিত্বের জোরে ভিনসুরে সারাজীবনের তরে বেঁধে এসেছেন কিছু মানুষকে


এ থাকার সাথী যত, আসে যায় অবিরত
তুমি যাবে তোমার মত, সঙ্গে নেবে কারে।।
আমার ডাক পড়ে না ত, আমায় নিতে ডাকছি কত
ভবা পাগলার মনের মত, সঙ্গে নিতে পারে।। -ভবা পাগলা


এয়ারপোর্টসুমেরু, মাসুদ, কাঁকনকে বিদায় জানিয়ে আমি ভেতরে ঢুকে যাইওরা বাইরে অপেক্ষা করে, আমি বোর্ডিং পাস পেয়ে গেলে তবে যাবেবিমানের কাউন্টার বন্ধ দেখে খটকা লাগে, দু'টোয় ফ্লাইট, এখনও কাউন্টার বন্ধ, বেলা তো সোয়া বারোটা! একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, বেলা দুটোয় তো বিমানের আজকে কোনো ফ্লাইট নেই! রিতিমতো ভয় পেয়ে গিয়ে টিকিট দেখাতে তিনি সেটি নিয়ে কম্প্যুটারে দেখে জানালেন, সে ফ্লাইট ক্যানসেল হয়েছে, আপনি কাস্টমার কেয়ারে গিয়ে খোঁজ নিন! ফোনে বাইরে অপেক্ষারত সুমেরুকে জানালাম, ঘাপলা আছে, ফ্লাইট বাতিল অপেক্ষা করো! কাস্টমার কেয়ারের ভাদ্রলোকটি কম্প্যু ঘেঁটে-ঘুটে বললেন, জেট-এ ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, ফ্লাইট বিকেলে, চারটে বেজে দশ মিনিটে ধুকপুকুনি খানিক কমলো এটা শুনে যে, বিকেলে হলেও যেতে তো পারছি, কারণ আমার ভিসার মেয়াদ সেদিনই শেষবিমানের বাতিল হয়ে যাওয়া উড়ানের আরো কিছু যাত্রী ততক্ষণে পৌঁছেছেন কাস্টমার কেয়ারে, রিতিমতো চেঁচামেচি করতে করতেফোন করে যাত্রীদের কেন ইনফর্ম করা হয় না? আমি ছুটির ছাড়পত্র হাতে মালপত্র সমেত ট্রলি ঠেলে আবার বাইরে

তারপর যেতে যেতে
ফিরে ফিরে দেখেছিলাম
তবু অসীম শূণ্যতা ছাড়া
আমি আর কিছুই দেখিনি
দিগন্ত ধূসর কুয়াশা চারিধারে। - মাসুদ

কোথাও একটা বেড়াতে যাওয়া যাক! কোথায়? আশুলিয়া যাওয়া যেতে পারেগাড়ি এগোয় আশুলিয়ার দিকেকাঁকন আবার গান গায়এবার গানে আর আমার মন ঢোকে নাভালো লাগে নাচুপ করে থাকিসরু ফিতের মত নদী দেখা যায় দূরে, মাঝে ফসলের মাঠ সবুজে সবুজ, মাঝে মাঝে বোর্ডে লেখা অমুক ইউনিভার্সিটি তমুক হাসপাতালছোট ছোট নৌকো, দূর থেকে খেলনার মত দেখায়বাঁদিকে রাস্তা থেকে বেশ নিচু জমিতে দেখা গেল একদল লোকগাড়ি থামিয়ে ভাল করে তাকিয়ে বোঝা গেল, মিউজিক ভিডিওর শ্যুটিং হচ্চেক্যামেরা, পরিচালক, অ্যাসিস্ট্যান্ট, একদল ছেলে, স্থুলকায়া হিরোইন আর শ্যুটিং দেখতে ভিড় জমানো কিছু গ্রামের মানুষআমার সঙ্গীরা প্রবল উৎসাহে শ্যুটিং দেখতে ব্যস্ত হনকোনো কোন শট ওকে হয়, তো কোনো কোনো শট বারবার রিটেক করা হয়একটি ছেলে, বোধ হয় হিরো, বারে বারেই হিরোইনকে কোলে তুলে নেয়, শট ওকে হয় না, উদ্দাম বাজনা শোনা যায়, ঠা ঠা রোদ্দুরে একদল ছেলে বারে বারেই একই শট দেয় আর বেচারা হিরো, স্থুলাঙ্গী হিরোইনকে কোলে তুলে নাচতে গিয়ে প্রাণান্ত অবস্থা, বারে বারেই বেচারা ক্ষেতের আলে রাখা বোতল থেকে জল খায়

পাশেই দু-তিনটি জমি পেরিয়ে অন্য শ্যুটিং, অন্য গল্পসেখানে বাচ্চাদের একটা গানের উপর নাচের ভিডিওর শ্যুটিংবাচ্চা মেয়েটি বারে বারেই ভুল করে, তাল কেটে যায়রানিং কমেন্ট্রি দেয় সুমেরু, কাঁকনপ্রবল উৎসাহে কখনও বড়দের নাচের তো কখনও বাচ্চাটির নাচের শ্যুট নিয়েখানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে শ্যুটিং দেখে আমাদের ড্রাইভারঘড়ি বলে দেয়, এবার আমাদের ফেরা উচিৎরাস্তার ধারে সুরুচি'তে ডাল-ভাত-ভর্তাঅথচ আমার তো কলকাতার বাড়িতে এসে ভাত খাওয়ার কথা ছিল!

গাজীপুরে শ্যুটিংএর জায়গা দেখতে গিয়েছিল সাগর সেদিন ভোরবেলাতেইফেরার পথে এয়ারপোর্টে বুড়ি ছুঁয়ে যায় সেওআমি আবার ট্রলিতে জিনিসপত্তর চাপিয়ে এয়ারপোর্টের ভেতরে এবং সুমেরুরা আবারও অপেক্ষা করে বাইরে, এবার ঠিকঠাক মিটে যায় সবযাত্রীদের মধ্যে দেখতে পাই, বিমানের বাতিল হয়ে যাওয়া ফ্লাইটের যাত্রীরাও এই প্লেনে জায়গা পেয়ে গেছেন ক্ষোভ আপাতত শান্ত, টুকরো টুকরো ক্ষোভ ও আনন্দের বাংলাদেশ কিছুক্ষণের মধ্যেই কলকাতা পৌঁছে যাবে



-
শেষ-