Tuesday, March 31, 2009

আমাদের একটু দেখো, এই মানুষগুলিরে একটু দেখো তুমরা...

শিল্পী বিপুল চক্রবর্তীর অর্কুট নিমন্ত্রনে সন্ধেবেলায় হাজির হয়েছিলাম বিড়লা একাডেমী মঞ্চে, ২৮তারিখের সন্ধেয়। অন্য এক অর্কুট বন্ধু আগে একদিন কী সব যেন বলেছিল 'উড়াল' বিষয়ে, মালদায় গঙ্গার ভাঙন, টাকা পয়সা, সাহায্য ইত্যাদি নিয়ে। অরা নাকি সেখানে, হামিদপুরে একটা স্কুলবাড়ি করে দেওয়ার জন্য টাকা তুলছে। আর এই উড়াল নাকি সরকারী-বেসরকারী কোনো সংস্থার অর্থসাহায্য না নিয়ে শুধুমাত্র নিজেদের উদ্যোগে সেখানে, সেখানকার মানুষদের জন্যে কিছু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বন্ধুটির কথা শুনেছি, আবার ভুলেও গেছি।
একাডেমীর হলঘরে ঢোকামাত্র একজন একখানি ছাপা লিফলেট ধরিয়ে দিলেন,
'উড়াল',
মেলো তোমার ইচ্ছেডানা
তোমার জন্য আকাশখানা..

পড়ে যেটুকু জানা গেল, 'উড়াল' একটি সংগঠন, কিছু সচেতন মানুষ মিলে যেটি তৈরি করেছেন। গান-বাজনা করে, কবিতা পাঠের আসর করে, পরিচিত-অপরিচিত লোকজনের কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করে তোলা সেই টাকা-সাহায্য নিয়ে তাঁরা সেখানে যান সেগুলো পৌঁছে দিতে। নিজেদের শত কাজের মাঝেও সময় বের করে মাঝে মাঝেই নাকি তাঁরা যান সেখানে। যাঁদের মধ্যে একজন কবি-সুরকার-গীতিকার বিপুল চক্রবর্তী, অপরজন শিল্পী অনুশ্রী চক্রবর্তী। সেদিন সন্ধ্যায় মালদার হামিদপুর থেকে আসা কয়েকজন মানুষের হাতে তাঁরা তুলে দেন কিছু অর্থ সাহায্য। সঙ্গে শ্রোতা-দর্শকদের জন্যে ছিল গান, অনুশ্রী-বিপুলের গান।


এক অর্কুট বন্ধুর আমন্ত্রনে বিপুল চক্রবর্তী ও অনুশ্রী-বিপুল নামে দু'খানি কমিউনিটিতে যোগ দিয়েছিলাম বেশ অনেকদিন আগেই। কিন্তু যা হয়, সেই সব পাতা বা কমিউনিটি কোনোদিনই সেভাবে নেড়ে-চেড়ে দেখিনি খানিকটা সময়ের অভাবে বা খানিকটা নিস্পৃহতায়। সেদিন বিপুল চক্রবর্তী নিজে এসে স্ক্র্যাপের পাতায় গান শোনার আমন্ত্রন জানিয়ে গেলে আর কোন বাহানায় না গিয়ে পৌঁছে যাই বিড়লা একাডেমী মঞ্চে। অনুষ্ঠানের আয়োজনে ব্যস্ত বিপুল চক্রবর্তীকে গিয়ে নিজের পরিচয় দেওয়া মাত্র হাত ধরে নিয়ে গেলেন সভাঘরে, সহযোগী দীপঙ্করকে বলেন, ওঁকে বসাও, অনুশ্রী'র সাথে আলাপ করিয়ে দাও। একেবারে সামনের সারিতে একটি আসন দেখিয়ে বসতে অনুরোধ করে দীপঙ্কর নিয়ে যায় মঞ্চে। পর্দা ফেলা মঞ্চে অনুশ্রী তখন হার্মোনিয়ামে শেষবারের ঝালিয়ে নিচ্ছিলেন গানের সুর। বললেন, গানের শেষে আপনার সাথে আলাপ হবে, আপনি বসুন।



হামিদপুর থেকে আসা মানুষ তিনজনকে মঞ্চে দেকে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সামান্য অর্থসাহায্য, বলা হয়, কিছু বলুন। যিনি প্রথম কথা বললেন, তিনি একসময় স্কুলমাষ্টার ছিলেন, স্কুলটি যখন ছিল। এখন সেখানে থৈ থৈ জল, গঙ্গার ঘোলা জল। একদিন মাঝরাতে তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠেন স্থানীয় মসজিদের মাইকের আওয়াজে, ভাঙন লেগেছে, ভাঙন! আপনারা সকলে যেটুকু পারেন সম্বল করে ঘর-বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসুন। এবং তাঁরা শুধুমাত্র প্রাণটুকু সম্বল করে বেরিয়ে যান। সামনে দাঁড়িয়ে দেখেন, একে একে গঙ্গা খেয়ে নিচ্ছে তাঁদের ভিটে-মাটি, গাছ, ফসলী জমি, স্কুল, মসজিদ, আর পালাতে না পারা গবাদি পশুগুলোকে। রাতের আকাশ চিরে ওঠে সব হারানো মানুষগুলোর আর্তনাদ। কিন্তু সে আওয়াজও চাপা পড়ে যায় সগর্জনে ধেয়ে আসা গঙ্গার ভাঙনের বিকট আওয়াজে।



ওই মানুষগুলোর আর্তনাদ খুব বেশিদূর যায় না, যেতে পারে না। সরকারের বাড়ি যে বহুদূর! সব হারান মানুষগুলো আশ্রয় নেন পার্শবর্তী গ্রামে, স্কুলবাড়িতে, মাঠে-ময়দানে। তাঁদের বাড়ি নেই, ঘর নেই, ক্ষুধায় অন্ন নেই, পরনে বস্ত্র নেই, আল নেই, অসুখে ডাক্তার নেই, ওষুধও নেই। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের স্কুল নেই। আছে শুধু হাহাকার, বুকফাটা কান্না আর মানুষের কাছে-সরকারের কাছে আবেদন, আমাদের একটু দেখ, তোমরা আমাদের একটু দেখো...


একসময় তিনি চাষী ছিলেন, মাঠে লাঙল চালাতে চালাতে নিজের মনে গান বাঁধতেন, তাতে সুর দিতেন, আর আনমনে গাইতেন নিজেরই গান। এখন মাঠ নেই, গরু নেই, লাঙলটাও নেই। এখনো তিনি গান বাঁধেন, সুর দেন আর গান করেন। শুধু গানের কথা গেছে বদলে, গান গাওয়ার স্থান-কালও গেছে বদলে। এখনকার গানে আছে হাহাকার, সাহায্য প্রার্থনা আর সরকারের কাছে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠার আকুল আর্তি। গান গাইতে গাইতে সুর কখন যেন বদলে যায়, চোখে কখন যেন জল আসে আর বুকফাটা আর্তনাদে-কান্নায় তিনি লুটিয়ে পড়েন মেঝেতে, বিড়লা একাডেমী মঞ্চের কাঠের মেঝেতে। গান ভুলে গিয়ে তিনি কাঁদতে থাকেন, চীৎকার করে কাঁদতে থাকেন এই আহাজারি নিয়ে, আমাদের একটু দেখো, এই মানুষগুলিরে একটু দেখো তুমরা...

4 comments:

  1. Ato sohoj , a mori bangla bhasha,  Tumi kemon kore lekho he guni, ami abak hoye porri shudhu porriHan dekhbo.

    ReplyDelete
  2. Besh laglo abar.
    Han dekhbo.

    ReplyDelete
  3. Aro anek lekha porhe aachhe, parhaar apexaay..

    ReplyDelete
  4. আপনার লেখাগুলো পড়ছি গতদিন ধরে। দিদি ভীষণ মনে ধরেছে আপনার ব্লগটা।

    ReplyDelete