Sunday, February 01, 2009

ছেলেবেলা চলে গেছে সেই কবে..

সে অনেককাল আগের কথা। সে আমার ছেলেবেলার কথা। আমরা বছরে একবার করে বেড়াতে বেরুতাম। আমরা তখন সিলেটে থাকতাম। বেড়াতে যেতাম কখনও ঢাকা, কখনও চিটাগাং। তবে বেশির ভাগই ঢাকা যাওয়া হত, বড়কাকা ঢাকায় থাকতেন, তাঁর বাসায়। বেড়াতে যাওয়ার বেশ কিছুদিন আগে থেকে আব্বা ট্রেনের টিকেট কেটে এনে আম্মাকে সব বিস্তারিত বলতেন, যা শুনতাম তার থেকে আমার কানে দুটো শব্দ শুধু আটকাত, এয়ার কন্ডিশন্ড আর রিজার্ভেশন। প্রথমবার শোনার পর আমি বেশ ছন্দে ছন্দে শব্দদুটি আওড়াতাম, উল্টে পাল্টে, বারে বারে। প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকতাম, কবে, কখন সেই রিজার্ভড এয়ার কন্ডিশন্ড কামরায় গিয়ে উঠব। একদিন অপেক্ষা শেষ হত, সকাল থেকে আম্মা ব্যস্ত থাকত বাক্স গোছানো, বছরভর তুলে রাখা হোল্ড অলে বালিশ-কম্বল-চাদর গোছানো, আমাদেরকে গোছানো আর ট্রেনের জন্যে খাবার গোছানোতে। ট্রেনে খাওয়ার জন্যে আম্মা সব সময়েই বানাত পরোটা আর ভুনা গোশত। অধীর আগ্রহে দিন যেন কাটত না, রাতের ট্রেনে বসার জন্য, পরোটা মাংস খাবার জন্যে।

ট্রেন চলতে শুরু করলেই আব্বা কুপের দরজা বন্ধ করে দিতেন আর নিচের একটা বাঙ্কে শুয়ে পড়তেন। ছোট্ট সেই কুপে আমার জন্যে নির্ধারিত হত উপরের বাঙ্ক, আমি বার কয়েক উপর নিচ করে করে একটা সময় আব্বার বাঙ্কের জানলার ধারটা দখল করতাম। প্রথমে অপেক্ষা ট্রেনে ওঠার, তারপর অপেক্ষা কখন সব খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে পড়বে তার, আর তারপর রাতভর জানলার পাশে বসে বসে কাঁচের ভেতর দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতাম, কখন মেঘনা আসবে। মেঘনা। সে নাকি এক বিশাল নদী আর তার উপর আরও বিশাল এক ব্রীজ, যা দিয়ে ট্রেন যায়। এসব গল্পই ছোটকাকার কাছ থেকে শোনা। যতক্ষণ কামরায় আলো জ্বলত, জানলার কাঁচে ট্রেনের কামরারই প্রতিচ্ছবি দেখা যেত। একসময় বাতি নিভত, বাইরের অন্ধকার, পাশ দিয়ে ছুটে বেরিয়ে যাওয়া গাছগুলোকে দেখতে দেখতে একসময় ঘুম এসে যেত। ট্রেন থামলেই আমারও ঘুম ভাঙ্গে, কোন এক অজানা ষ্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে ষ্টেশনের চাতালে কয়েকজন ঘুমন্ত মানুষ, গভীর রাতের নিস্তব্ধ ষ্টেশন। ভাইয়াকে ডেকে তুলি, ভাইয়া, সামনেই কি মেঘনা! বন্ধ জানালা দিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে সে, কোথায় এল ট্রেন, দুর, এটা তো আখাওড়া, ঘুমা তো তুই! আমি ঘুমাই না তবুও, ট্রেনটা তো এখান থেকেই বাঁক নেবে ঢাকার পথে আর সামনেই তো মেঘনা! ঘুমায় না ভাইয়াও। বসে বসে আমরা অপেক্ষা করি, কখন আসবে মেঘনা...

ছেলেবেলা চলে গেছে সেই কবে.. বহু বহু কাল পরে আমি আবার রাতের ট্রেনে, এবার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা। না। এই কামরা এয়ার কন্ডিশন্ড হলেও রিজার্ভড নয়। স্লিপিং কোচের টিকিট পাওয়া গেল না কিছুতেই তাই এক কম্পার্টমেন্ট লোকের সাথে বসে বসে যাত্রা। সঙ্গী ভদ্রলোকটি ট্রেনে ওঠার সাথে সাথেই ঘুম। আমার ছেলেবেলা যদিও চলে গেছে কিন্তু রাতের ট্রেনে জেগে বসে থাকার অভ্যেস এখনও যায়নি তাই সারা রাত কেটে যায় জানালার বাইরে চেয়ে থেকে। রাতের ট্রেনে কামরাভর্তি লোক, আধেক তাদের ঘুমোয় আর আধেক জেগে রয়। ক্যাটারিংএর লোকেরা বারে বারেই আসে চা-কোল্ড ড্রিংক-চিপস-চকোলেট আর খাবারের প্যাকেট নিয়ে, বারে বারে চেয়েও আমি পাই না একটা জলের বোতল। ঝকঝকে আলো ঝলমল কামরায় জেগে থাকা লোকেরা কত কথা বলে যায়, আমি জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে থাকি। চেনা ষ্টেশনেরা সব একে একে পেছনে রয়ে যায়, যেমন রয়ে গেছে স্বজনেরা... ট্রেন এগোয় ঢাকার পথে...

3 comments:

  1. ki sundar likhechho chokh buje amio chole gelam tomar songe.....

    ReplyDelete
  2. আপনার লেখায় অন্যরকম মাদকতা আছে। কেমন যেনো স্বপ্নের ছোয়া - বাস্তব থেকে একটু দূরে কিন্তু মনে হয় এইতো ছোঁয়া যাবে।

    ReplyDelete
  3. Apni money hoi Chhobi aNkley i Bhalo korten. Apnar kothagulo por por sajiyecchhen kinti kothar majhkhaney n:shobdey jey kothagulo bichoron korchhey tar porichoy paowa bhar. Khub kom manush tar porichoy pai. Ar kothar por arekta kotha , tar por arekta kotha, arekta maney , sei maney r onyo kono many.T S ELIOT ke money porey . Tai bujhi sob Kobi seshe neerob hoye jan.

    ReplyDelete