Tuesday, October 20, 2009

আমি বরং ব্লগ লিখি..

একদিন একরাত টানা ঘুমিয়ে আর তারপর গত দিনটিও আধো ঘুম আর জাগরণের মধ্যে কাটিয়ে গতরাতটি কাটল প্রায় নির্ঘুম। বহু বহুদিন নাকি বহু বহু কাল, কতদিন, কতকাল পর এমন বেভুল ঘুম সে আমার মনেও নেই আর তারপর এই চেনা জেগে থাকা। এই জেগে থাকাটাই নিত্যকার রুটিন কাজেই এ নিয়ে চিন্তা নেই। আমি বরং ব্লগ লিখি.. 

দীপান্বিতার রাত, কালো রাত আলোয় আলোয় ঝকমক ঝকমক। নানারকমের বাজি ফাটছে মুহুর্মুহু, বাড়িগুলো সেজে আছে আলোর মালায়, জানালায় জানালায় টুনিবাল্বের ঝোলানো-প্যাচানো মালাগুলো জ্বলছে নিভছে, জ্বলছে নিভছে ঝিকমিক ঝিকমিক। ছাদভর্তি ফাটানো বাজির খোলা, আধফাটা না ফাটা ছোটোখাটো বাজিগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে গোটা ছাদময়। নিচের খালি গ্যারাজঘর সদ্য আবারও খালি হয়েছে প্রতিমা নিরঞ্জনের পর, সেখানেই লাল প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে ফ্ল্যাটবাড়ির লোকজন সব, মহিলামহল একজায়গায়, পুরুষেরা এদিক-ওদিক, কেউ সিগারেট, কেউ বা রাতের পানের ব্যবস্থায় ব্যস্ত, কেউ বা খুঁজছে আগের রাতে ছাদে ফেলে আসা আইসট্রেটি, সেটি আর খুঁজে পাওয়া যায় না যদিও। মাঝের একতলা লালবাড়িটির বারান্দা জুড়ে বালতি আর গামলায় রাখা খাবার সব, এখুনি খাওয়া শুরু হলো বলে, বাচ্চাগুলো এদিক ওদিক, মায়েরা ব্যস্ত পড়শি বউটির কেন লালরং অত পছন্দ তা আবিষ্কারে। এরই মধ্যে ইলেক্ট্রিশিয়ান হাজির বাড়ির সামনেটায় যা আলো লাগানো হয়েছে সেগুলো খুলে নিতে, তাকে অনেক বলেও বোঝানো যায় না, যে আরেকটু থাক, মা চলে গেছেন তো কী হয়েছে, ভক্তদের খাওয়া-দাওয়াটা অন্তত হোক!

ফ্ল্যাটবাড়ির বাসিন্দারা, এমনিতে যারা চুড়ান্ত ভদ্রলোক, বাড়ির পুজোর নামে চাঁদা তোলায় তারাই খড়গহস্ত। মোটা অংকের চাঁদা বাধ্যতামূলক দিতে কারই বা ভালো লাগবে, আমার অন্তত লাগেনি, কে কত দিয়েছেন সে সমস্ত শোনা হয়ে যায় আমার বেশ কয়েকবার করে। রাতের বিসর্জন পরবর্তী গেটটুগেদারে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রন বা নিমন্ত্রন কতটা আন্তরিক সে বিচারে আমি আর যাই না। ইতিমধ্যে বারকতক আমার শোনা হয়ে যায়, গতবার যেমন পালিয়ে গিয়েছিলাম, এবার যেন আর তেমনটি না হয়। আমি বুঝে যাই, পালাবার পথ নেই, ভাটন আর খ্যাটনে হাজির থাকতেই হবে, চাঁদার মতই এও বাধ্যতামূলক! 

চ্যানেলে চ্যানেলে রিয়্যালিটি শো, কোথাও চান্স পে ডান্স তো কোথাও দাদাগিরি, একফাঁকে বালিকা বধু আর ফাঁকে ফাঁকেই ডান্স বাংলা ডান্সের প্রোমো। আজও দুমদাম ফাটছে শব্দবাজি, আকাশ চিরে দিয়ে উড়ে যায় রকেট আর আতস, খানিকটা আলোকিত থাকে বাজির আলোয় আবার সেই ল্যাম্পপোষ্টের মরা আলো। মশারা সব আজ বাড়ির ভেতরে, এমনিতেই জঙ্গল সাফাই আর বোজানো পুকুরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা চারতলা সব বাড়ির উৎপাতে ওরা ঘর-বাড়িহীন তার উপর বাইরের অত আলো আর শব্দে ওরাও বেভুল, বাজির শব্দের সাথে সাথে শোনা যায় মশা তাড়ানোর শব্দও।

আজ ভাইফোঁটা ছিল। সকাল সকাল এক ভুলে যাওয়া নাকি হারিয়ে যাওয়া নম্বর থেকে ক্ষুদ্র বার্তা আসে, ফোঁটা নিয়ে নিলাম, আর আশীর্বাদও চেয়ে নিলাম, দিদি আমার শতায়ু হোক! নম্বর দেখে মনে করতে পারি না, কে হতে পারে? তবে ঠাউর হয়, কে হতে পারে, প্রতিবারেই আমি ভুলে যাই বলে ঠিক একইভাবে সে আমার কাছ থেকে ফোঁটা নিজে নিজেই নিয়ে নেয়.. মনে পড়ে গেল, একজনকে বলেছিলাম ফোঁটা দেব, মন থেকেই বলেছিলাম দেব কিন্তু গতবার কলকাতা থেকেই পালিয়ে গেছিলাম আর ফোঁটার কথা বেমালুম ভুলে গেছিলাম বলে আমাকে 'ব্লাডি ফাকিং মুসলিম' উপাধি পেতে হয়েছিল.. এখনও মাঝে মাঝেই প্রায় একই ভাষায় চিঠি-মন্তব্য চলে আসে আমার বিভিন্ন ঠিকানায়..যার মধ্যে যোগ হয়েছে আরো হাজার খানেক অভিযোগ, বিশেষণ!! আমার অবশ্য কোনো অভিযোগ নেই তার বিরুদ্ধে..সত্যিই নেই..

মাঝরাতে চকোলেটের ক্ষিদে মেটাতে ফ্রীজের ভেতরটা আতিপাতি খুঁজেও পাওয়া যায় না চকোলেট, অগত্যা রমজানের লেফটওভার খেজুর। খুঁজে পাওয়া যায় না ফিলিপিন্সের ড্রাই ম্যাঙ্গোর প্যাকেটটিও। মেজাজ চরম খারাপ। আমার ভালুকজ্বর আবার বাড়ছে বেশ বুঝতে পারি..

Wednesday, October 07, 2009

পরকীয়া প্রেমের মতো লেপ্টে থাকে জ্বর

মাঝে মাঝেই জ্বর হয় আমার।
পরকীয়া প্রেমের মতো
লেপ্টে থাকে বহুদিন ধরে
মাঝে মাঝে ছাড়াতে চাই, মাঝে মাঝে চাই না..
জ্বর লেগে থাকে, পরকীয়া প্রেমের মতো
আদরে, ভালবাসায় জড়িয়ে রাখে
কানে কানে কতো কথা কয়, বলে
আমিও তো তোকে ভালবাসিরে পরী!

জ্বরের ঘোরে বা জ্বর ছড়াও স্বপ্ন দেখি
গোল গোল আলোর মালা
চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়
আলো ঠিকরোয়
নানান রঙের
ঝিকিমিকি ঝিকিমিকি
জ্বর লেগে থাকে প্রেমের মতো
পরকীয়া প্রেমের মতো..

এই জনমে আমি রাধা হতে চাই না,আর
পরজনমে তোমাকেও রাধা হতে বলবো না
আমি কখনোই গাইবো না,
শ্রীকৃষ্ণ বিরহে রাধার অঙ্গ যায় জ্বলিয়া
আসলে আমি তো গাইতেও জানি না!

তুমি বরং পরজনমে এমুপরী হইও
বা এমু পাখি, যে কিনা উড়তে জানে না
কিন্তু ওড়ার স্বপ্ন দেখে
তার যে দুটি ডানা আছে
ছোট্ট দুটি ডানা
তবুও সে উড়তে জানে না, পারে না
ডানা দুটি যে ভীষণ ছোট!
তার শুধু জ্বর আছে
পরকীয়া প্রেমের মতো জ্বর
লেপ্টে থাকে, জড়িয়ে রাখে
ছাড়ে না, ছাড়তে চায় না

আমি গান গাইতে জানি না
লোপামুদ্রার মতো, আমি তাই কখনও গাইনি,
দয়ানী..
কখনো ভেসে উঠিনি টিভির পর্দায়
বা তোমার মনিটরে
বা সায়েন্স সিটির অডিটোরিয়ামে
কখনো তাই সিডির ভেতরে ঢুকে
তোমার সঙ্গে ঘুরে বেড়াইনি
মাঠে-ঘাটে বা তেপান্তরে
কখনো না.. কখনো না..

খানিক আগে, নারকোল ছাড়াতে গিয়ে
ছুরির ফলাটা ঢুকে গেলো হাতে
তীক্ষ্ণ ফলা, ছুরির
রক্তে ভেসে গেল ওয়াশ বেসিন, কালচে সবুজ পাথর আর মেঝে
কী আশ্চর্য, এই রক্তের রঙ লাল
গাঢ়, টকটকে লাল
গোলাপী নয়, তবে বুঝি স্বপ্নের রক্তই শুধু গোলাপী হয়...

Tuesday, September 22, 2009

অদ্ভুত আঁধার এক..

গতকাল একটা অদ্ভুত দিন গেল..

মাথাটা কী রকম ফাঁকা, কী রকমও নয়, একদম ফাঁকা..
ঠিক যেমম ফাঁকা ছিল টানা সতেরোটা বছর..

আচ্ছা, সতেরো বছর কাকে বলে তুমি কী জানো?

কোনো ভাবনা নেই..
চিন্তা নেই..
একদম ফাঁকা ..
খালি..
শূণ্য..
অভ্যেসসশত দৈনন্দিন কাজ সব করে যাই একের পর এক, সেই আগের মতো।
যখন আমি অবসাদের ওষুধ খেয়ে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ফাঁকা মাথায় শুধু অভ্যেসবশে করে যেতাম একের পর খুঁটিনাটি সব কাজ, সংসারের কাজ। হাত চলত হাতের মতো, পা চলতো পায়ের মতো, আমার কোনো ইচ্ছে-অনিচ্ছের ধার তারা ধারতো না। আসলে কোনো ইচ্ছে-অনিচ্ছে তো অনুভবও করতাম না।
'মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি কোন মিস্তরী বানাইয়াছে/ একখান চাবি মাইরা দিসে ছাইড়া জনম ভইরা চলতে আছে..' তো আমাকেও সেই চাবিই চালিয়ে নিয়ে যেত, আমাকে ভাবতেও হতো না, এরপর কী করব, কেন করব, কী করা দরকার.. আমি শুধু করে যেতাম..সকালে, দুপুরে আর রাত্তিরে ওষুধ খেতাম আর আমার হাত-পা-শরীর চলত, আমিই শুধু চলতাম না, একটা জায়গায় থমকে ছিলাম, আটকে ছিলাম, আমার শৈশবে, আমার ছেলেবেলায়..

গতকাল আবার সেই রকম একটা দিন গেল, কাল ঈদ ছিল, রোজার ঈদ। প্রতি ঈদে আমার খুব সকালে ঘুম ভেঙে যায়, আপনা থেকেই, কালও ভেঙেছিল, আপনা থেকেই। প্রতি ঈদে আমি ভোর ভোর উঠে ঘর গোছাই, বিছানা-বালিশের কভার বদলাই, ধোপার বাড়ি থেকে সদ্য কেচে আসা কড়কড়ে ইস্তিরি করা
পর্দার ভাঁজ ভেঙে টানিয়ে দিই দরজা-জানালায়, সব কটা দরজায় সামনে পেতে দিই নতুন পাপোষ, কালও দিয়েছি, নিতান্তই অভ্যেসবশে, আমার কোনো হাত ছিল না এই কাজগুলোতে। কালকেও কী আমি আটকে গেছিলাম আমার ছেলেবেলায়?

না। কালকে আমি আটকে গেছিলাম ঝড়ের পরের নিস্তব্ধতায়, জলোচ্ছাসে সব ভেসে যাওয়া গ্রাম দেখেছ তুমি? কিছুই থাকে না যেখানে? তুমি কী দেখেছ কখনো ঘর-বাড়ি, ক্ষেত-খামার, পোষা গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, হাঁড়ি-বাসন, খড়ের গাদা আর জমানো গোবর সব, সব যখন ভেসে যায় আর পড়ে থাকে শুধু থকথকে কাদা? পা দিলে যেখানে ডুবে কোথাও হাঁটু তো কোথাও কোমর অব্দি? সেই কাদার মধ্যে এখানে ওখানে আধখানা ডুবে থাকে মরে পড়ে থাকা গাভীন গাই, সদ্য ডিম থেকে বেরিয়ে আসা মুরগীর ছানা আর ইতি-উতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গেরস্থালী আর দু'চোখের গহীনে বসত করা সীমাহীন স্বপ্ন? যেখানে কোনো রঙ নেই, ধূসর ছাড়া, এমনকি সাদা-কালোও নেই, দেখেছ কখনো?

আমি কাল সেই বিরান হয়ে যাওয়া জনপদে একলা বসেছিলাম.. বসে আছি..

থমকে ছিলাম, আটকে ছিলাম..

আটকে আছি..

একটি স্বপ্নের ভ্রুণ সাথে নিয়ে অবিরাম শুধু বয়ে যাচ্ছিল গোলাপী রঙের রক্ত ..

আর তারপর থেকে বয়েই যাচ্ছে আমাকে ক্রমশ রক্তশূণ্য করতে করতে...

Monday, September 21, 2009

তুমি এলে না বলে..


আজ আমাদের ঈদ নয়

আজ ইদ। কাল সন্ধেবেলায় ছাদের উপর থেকে চাঁদও দেখলাম। বহু বছর পরে। প্রতিবারেই তো সেই রাত এগারোটার পরে মসজিদ থেকে বলে দেওয়া হয়, অমুক জায়গায় চাঁদ দেখা গেছে, অতএব কাল ঈদ! মসজিদে মসজিদে তার বহু আগেই যদিও সারা হয়ে গিয়ে থাকে তারাবির নামাজ। কিন্তু কাল চাঁদ দেখা গেল আর আমিও দেখলাম। ঝকঝকে আকাশে একফালি চাঁদ। ঈদের চাঁদ। লোডশেডিংএর নীরবতায় দূরের মসজিদ থেকে মাইকের আওয়াজে ভেসে এল পরদিনের নামাজের সময়। বারে বারেই.. কোথাও কোনো শব্দ নেই.. এমন দিনে এমন নীরবতায় আধখানা শেষ হওয়া চারতলা বাড়িটিতে বাড়ির কারিগরেরা গান ধরল। কী আশ্চর্য, ওরা ঈদের গান গাইছে..কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারি না, আঞ্চলিক টান, কিন্তু ইদের চাঁদ কথাটা বারে বারে ঘুরে ঘুরে আসে গানের মধ্যে। আহারে.. বছরকার দিনটিতেও ওরা বুঝি বাড়ি যেতে পারল না..
আজ আমাদের ঈদ নয়..
তুমি এলে না বলে.. 
তুমি এলে তবে ঈদ হবে..

বাবুটা তবু রেড রোডের জামাতে গেল আর ভিজে কাক হয়ে বাড়ি ফিরল।
আমি তবু খানিকটা সেমুই রাঁধলাম বাবু নামাজ সেরে ফিরে খাবে বলে। কিন্তু সক্কলে তো আজ ঈদ করছে.. ভাইয়া তাই ফোন করে জানতে চায় কী রান্না করেছি.. আব্বা বলে, সকলেই আছে তুমি শুধু নেই.. এই সেদিন বাড়ি থেকে ঘুরে আসা সত্বেও আম্মা জানতে চায়, কবে বাড়ি আইবা? আমি বিছানার দিকে তাকাই, ওতে পাতা আছে কালোর উপর কাঁথার ফোঁড়ের নকশী চাদরখানি, আমার মায়ের দেয়া। ওতে আমার মায়ের হাতের ছোঁয়া যেন এখনো লেগে.. প্রতি শাবান মাসের এক তারিখে ওটা আমি আমার বিছানায় পাতি, আজও পেতেছি, আমার মা আজ ইদ করছে বলে.. আমার চোখ ভিজে আসে শুধু-মুদুই.. ফোনের ওপাশ থেকে শুনতে পাই পিচ্চিগুলোর কলকলানি। ছোট্ট অপুটার ও ও আমি এখান থেকেই শুনতে পাই। ফোনের ওধারে..
বেলা এগারোটা বাজতে বাজতেই মুখ ভার হয় আকাশের আর নামে অঝোর ধারা সাথে গুরু গুরু, দ্রিমি দ্রিমি.. এমন বৃষ্টিময় দুপুরে আমি বাথরুমের খুপরি জানালায়, কিচেন কাউন্টারে জল ঢেলে দিই ইচ্ছেমতন। এমনি দিনে ন্যাতা দিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতে হয়, জল ঢাললে সোজা গিয়ে পড়বে তিনতলা-দোতলার সব চৌখুপরিতে, আর একতলা থেকে তিনতলার সব নারীকন্ঠে একযোগে অভিশাপ বর্ষিত হতে থাকবে চারতলার বাসিন্দা মুসলমানটির উপরে। তুমুল বৃষ্টিতে আজ কারোর কোনো চেঁচামেচির সুযোগ নেই, আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে


০২
কখন তোমার আসবে টেলিফোন..
ফোন। আমার ফোনটা বছরে দু'বার বাজে। সারাদিন ধরে বাজে। এসএমএসের পর এসএমএস আসে সারাদিন ধরে, বছরে দু'বার। এমনি সময়েও বাজে তবে সেগুলো বেশির ভাগই হয় কোনো বীমা কোম্পানীর নয় কোনো ক্রেডিট কার্ডের নয় এয়ারটেলের। আর এসএমএস গুলো এমনি দিনে পাঠায় এয়ারটেল বা পাড়ার ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের নানান অফার দিয়ে। কিন্তু বছরে দু'বার আমার ফোন বাজে আর সারাদিন ধরে বাজে। এসএমএস আসে আর সারাদিন ধরে আসে। আমার জন্মদিনে আর ঈদের দিনে। ভোর ভোর ফোনের ওধারের গলা শুনে চিনতে পারি না, ওটা রূপক'দার গলা। কখনো তো কথা হয় না, চিনব কী করে! সেই বাংলালাইভের বাংলা আড্ডার আলাপ। বছরে দু-একবার দেখা হয়ে যায় কোনো কমন বন্ধুর বাড়ির বৈঠকখানায়। তোর নাকি জ্বর হয়েছে? কী যে করিস, বছরকার দিনে অসুখ বাঁধিয়ে বসে! আমার বুকের ভেতরটায় কেমন চিনচিন করে ওঠে.. ফোনে একের পর এক উৎকন্ঠিত আওয়াজ সব.. শুভেচ্ছায় শুভেচ্ছায় ভরে ওঠে অর্কুটের পাতা, উপচে ওঠে মোবাইলের ইনবক্স.. বেশির ভাগ নম্বরই চিনতে পারি না, চুরি যাওয়া মোবাইল ফোনখানির সাথে চুরি গেছে সব নম্বরগুলিও। প্রতি ঈদের মত আজও এসএমএস আসে সিডনি থেকে, ইন্দ্রাণী, আমার আই-মশাই। যে কখনোই আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে ভোলে না, ঈদে বা জন্মদিনে। আমার চোখ বুজে আসে। ঝুম মেরে বসে থাকি। নাহ.. আসে না সেই ফোনটি.. কতো কত্তো কাজ..

০৩

কন্টিনিউয়েশন অফ বিশ্বকর্মা পুজো

সেদিন হঠাৎ করেই হাজির হয়েছিলাম শাশ্বতদের বিশ্বকর্মা পুজোয়। খেয়াল ছিল না, যে ওদের পুজো আছে, খাওয়া-দাওয়ার ব্যপার আছে। শুভেন্দু'দা রিতিমত টেনে টুনে বসিয়ে দেন দুপুরের খাওয়ায়, বিকেল পাঁচটায়।ইলিশ মাছ, মুন্না'র দোকানের খাসি আর চাটনি। পুজোর আনন্দে লুকিয়ে পাঁইট গিলে নেওয়া প্রবীরবাবুর আতিথেয়তার আতিশয্যে খাসির ঝোলে আমার জামা-কাপড় একশা। পরদিন শুভেন্দু'দার ফোন, ইলিশের মাথাগুলোর তো একটা গতি করতে হবে, চলে আসুন দুপুরবেলা, সন্ধেটাও এখানেই কাটাবেন। ইলিশের মাথার গতি করতে গিয়ে চলে আসে আরো কয়েক পিস ইলিশ মাছ আর সাথে কচু শাক। উড়ে বামুন জানে না কী করে রাঁধতে হয় কচুর শাক। দশ আঁটি কচু শাক কোটা-বাছা আর রান্না করতে হয় শুভেন্দু'দাকেই। ইলিশের মাথা দিয়ে বিশ্বকর্মা পুজোর কন্টিনিউয়েশনে নেমন্তন্ন পায় আরো দশ-বারো জন। আবারো লাঞ্চ বিকেল পাঁচটায়। আধপচা লিভার পুরোটা না পচে যায় সেই ভয়ে এক হপ্তা শুভজিত সুরাবিহীন। এলজোলামের ঘুম। সন্ধ্যেয় স্বপন'দার ট্রিট, ব্লেন্ডার্স প্রাইড। একটা এসএমএস। কাল তোমাকে হলে দেখতে চাই..! অপরিচিত নম্বর। কে হতে পারে? আরে হ্যাঁ, কাল অনুশ্রীদির গান আছে না বিড়লা অ্যাকাডেমি মঞ্চে? সেখানকারই কেউ? মোবাইল হারিয়ে এই এক যন্ত্রণা হয়েছে, কে ফোন করছে, কে এসএমএস করছে কিস্যু বোঝা যায় না। আসে জোশি, সাথে কাটোয়া কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক নন্দিতা। বেচারী নন্দিতা, জোশি তার একটা ফিল্মে নন্দিতাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিতে রাজী হয়েছে, নন্দিতা ধোঁয়া ফোকা ছেড়ে দেবে এই শর্তে! ব্লেন্ডার্স প্রাইড, শুভেন্দু'দা আর এক গোল টেবিল ভর্তি ধোঁয়ার মাঝখানে চুপচাপ বসে থাকে ব্লেন্ডার্সের গ্লাস হাতে নিয়ে। 

কম্পিউটারে মৌসুমী ভৌমিক, আমি শুনেছি সেদিন নাকি তুমি তুমি তুমি তুমি তোমরা সবাই মিলে সভা করেছিলে.. প্রথমে গুনগুন পরে গলা ছেড়ে গেয়ে ওঠে শমীকও। আমাদের সভা শেষ হলে মঈন ভাইয়ের গাড়ি পাঁক খেতে খেতে লোক নামায়, মন্দিরতলা, উল্টোডাঙা, রুবী, নাকতলা। তারপর পার্ক সার্কাসের গ্যারাজ।
মাঝরাতে ফোনে শুভজিত। ক্লান্ত, বিষন্ন আওয়াজ। রিনিকে একটা ফোন করবে প্লিজ! রিনি আমার ফোন আজকাল আর ধরে না.. আমি চুপ করে থাকি লোডশেডিংএর অন্ধকারে.. শুভ'র হাতটা ধরে..কষ্টের রং নাকি নীল.. এখনও কী শুভ নীল হয়ে আছে..

Wednesday, September 09, 2009

মোর ঘুমো ঘোরে গেলে মনোহর..

টিউবর্গ ও ড্রিংক ইন্ডিয়া

তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে ক'দিন। ক'দিন হলো? দু-তিন হবে বোধ হয়। হুঁ। পরশুর আগের দিন মানে তরশু দুপুর থেকে হু হু বাতাস। ঠান্ডা। শিরশিরে। তারপর বোধ হয় রাত থেকে শুরু হল। পরদিন ভোররাতে সে চলে যাবে। চেষ্টা করেও তাড়াতাড়ি ঘুমুনো গেল না। ড্রিংক ইন্ডিয়া, টিউবর্গ আর শুভজিত। এগারোটা বেজে গেলে আমাদের গেটে তালা পড়ে যায় মাসুদ-কাঁকনের বাড়ির মত। এখানে কোনো সাগর নেই, যার বাড়িতে এমন সব রাতে গিয়ে বডি ফেলে দেওয়া যায় তাই জানলা দিয়ে উঁকি দিতেই হয় একতলার ফ্ল্যাটে। বৌদি মোবাইল ফোনে কাজের মেয়ের প্রেমের ঝামেলা মেটাচ্ছিলেন। রাত বারোটায়। সহৃদয়া বৌদি চাবি দিলে গেট খুলে চারতলার বাসস্থানে। টিউবর্গের ঝিমুনিতে বইভর্তি স্যুটকেস-ব্যাগ খালি করে খালি স্যুটকেসে খালি ব্যাগ ভরে দেওয়া হয়।



 ০২
রিয়্যালিটি/ রিয়্যালিটি
স্টার প্লাসে সাচ কা সামনা- সত্যের মুখোমুখি। ছ'টা সত্যি কথা বললে এক লাখ টাকা পুরষ্কার। এগারোটা সত্যি কথা, পাঁচ লাখ। পনেরোটা সত্যি, দশ লাখ। এভাবেই বেড়ে যেতে থাকে পুরষ্কারের অংক। আপনি একুশ খানি সত্যি কথা বলে ফেলুন, পেয়ে যাবেন এক কোটি টাকা। একটা মিথ্যে- খেল খতম। সত্যি-মিথ্যে কে ধরবে আর কী করে? নো চিন্তা। পলিগ্রাফ মেশিন কী করতে আছে? প্রশ্ন গুলো কেমন? আপনি কী আপনার স্ত্রী-পার্টনারকে সত্যি সত্যি ভালবাসেন? না বললে পলিগ্রাফ খচে যাবে আর হ্যাঁ বললে বউ। তবে রিয়্যালিটি শো বলে কথা। আপনি বলতে বাধ্য হবেন যে আপনি আপনার বউ-পার্টনারকে সত্যি সত্যিই ভালবাসেন না। হ্যাঁ। পলিগ্রাফ মেশিন আপনার সত্যি-মিথ্যের ফরমান জারী করলে আপনি ক্ল্যারিফাই করতে পারেন, যে আপনি ভালবাসেন না বাট কেয়ার করেন! গুড.. তাতে বউ খচে খচুক, আপনি এগিয়ে যাচ্ছেন এক কোটি টাকার দিকে। অতএব এগিয়ে চলুন পরবর্তী প্রশ্নের দিকে, আপনি কী অন্তর্জালে কাউকে আপনার নগ্ন ছবি পাঠিয়েছিলেন? আপনি আর স্বীকার করতে পারলেন না, অমনি জিতে যাওয়া দশ লাখ টাকা চলে গেল শূ্ন্যতে, একটা মিথ্যের দৌলতে। মন্দ নয়... 
শো'য়ের প্রশ্নকর্তা রাজীব খান্ডেলওয়াল। চেনেন নিশ্চয়ই, সেই যে আমীর সিনেমার নায়ক। 'সাচ কা সামনা' মানে এই সত্যি-মিথ্যের খেলাটিতে গেলে কেমন হয়? রাজীব শো'টা হোস্ট করছে :-)



 ০৩
মোর ঘুমো ঘোরে গেলে মনোহর...

ঘুমিয়েছিলাম গভীর নিদ্রায়,
অচেতন প্রায়.. তুমি চলে গেলে,
যাবে বলেই এসেছিলে, 
তবু চলে গেছ এ যেন বিশ্বাস হতে চায় না.. 
কবে থেকে ঘুমোচ্ছিলাম যেন? 
মনে পড়ে না... 
রক্তক্ষরণ হয়, 
গোলাপী রঙের রক্ত.. 
তুমি দেখেছ কখনো গোলাপী রঙের রক্ত? 
বয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই..
ঘুম ভে‌ঙে যায়, 
ক্ষরণ থামে না...

বুকের ধুকপুকুনি জানান দেয় হৃদপিন্ড নামক একটি বস্তু আছে ভেতরে
আর সে এমন জোরে ঢাক বাজায় যে পুজোর ঢাকে আগাম কাঠি পড়ল বলে ভ্রম হয়.. 
শিরায় উপশিরায় আছড়ে আছড়ে পড়ে নার্গিস..
থরথর কাঁপে আঙুলগুলি,
উজাড় হয়ে যায় বনকে বন,
মরে পড়ে থাকে এক জঙ্গল সুন্দরী গাছ..
কবে থেকে যেন বাংলাদেশের নাম হয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তান। রাজাকার। মুসলমান। দেশভাগ, হিন্দু-মুসলমান, পিতৃপুরুষের ছেড়ে আসা ঘরবাড়ি আর অপরিসীম ঘৃণা সব এসে বসত করে ওল্ড মঙ্ক গোল্ড রিজার্ভে। রাত গভীর হয়। পুলিশের কোয়ার্টারে এসে ট্যাক্সি থামে। ডাল রান্নায় কোনো নতুনত্ব নেই। সব একই রকম। মুগ-মুশুর-মটর সবই এক। পাল্টে পাল্টে যায় শুধু বন্দর। এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে এগিয়ে যায় জাহাজ। নতুন গঞ্জ, নতুন মানুষ, আর সবুজে সবুজ.. সওদাগরের নাও গিয়ে ভেড়ে জামাতীদের দেশে..

দিল আফরোজ রেবা তবুও গান গেয়েই যান, 
বন্ধুয়া গেল কুন বা দ্যাশে/
কান্দো বসি মুই পাগল ব্যাশে/
ডাকে কাগা্য ঐ জালের বাতাক্‌ বসে/ 
ওরে মনোতে মোর লাগিল ধাগা/ 
কন্টে যাইয়া সোনা পড়িল্‌ বান্ধা/
আসিয়াও ক্যানো আর না ক্যানে আইসে/ 
ওরে নিয়া গেছে সোনা মুখের হাসি/ 
হাউশের শিঙ্গার মোর হইল রে বাসি..


০৪
এমনও ঘনঘোর বরিষায়
দু'দিন নাকি তিনদিনের বৃষ্টি? তুমুল বৃষ্টিকে সাথে নিয়ে আমি বেরোই আমার লম্বা ডাঁটির বাদামী ছাতাখানি নিয়ে। বাড়ি থেকে বেরোতেই বোঝা গেল, আজকেই তো হেঁটে বেড়ানোর দিন.. সদ্য জ্বর থেকে উঠে আর ছাতা বন্ধ করতে সাহস হয় না, জিনসের পা উঠে যায় যতটা ওঠানো যায়, চটিজোড়া হাতে নিয়ে আমি হাঁটুজল ভেঙে ভেঙে এগিয়ে যাই ফ্লাইওভারের পাশ দিয়ে। গোটা শহর ভেসে গেছে এই দুই নাকি তিনদিনের বৃষ্টিতে? এমন বৃষ্টিদিনেও রাস্তায় লোক কম নেই, আপিস ফেরতা সব নারী-পুরুষেরা গোটানো প্যান্ট আর হাঁটুর উপর তুলে ধরা শাড়ি নিয়ে দৌঁড়ান বাসের পেছনে পেছনে। একখানি ট্যাক্সির পেছনে ছোটেন ডজনখানেক মানুষ। হুঁশ করে ট্যক্সিরা বেরিয়ে যায় কারো দিকে না তাকিয়ে। এক্সাইডের মোড় থেকে হাঁটুজল ভেঙে ভেঙে এলগিনের মোড়, গরম গরম পেঁয়াজি ভাজা খাই দোকানীর পলিথিনের তলায় দাঁড়িয়ে। স্যান্ডেল ছিঁড়ে যায় মীনাক্ষীর। এমন দিনে এর থেকে ভাল আর কীই বা হতে পারত! আমরা হাঁটি ফোরামের দিকে। জল ভেঙে ভেঙে। ঠান্ডা লাগে, কাঁপুনি আসে, কিন্তু এমন দিন কী বারে বারে আসে? মাথার উপর অঝোর বর্ষা নিয়ে লম্বা ডাঁটির বাদামী ছাতা আর চটিজোড়া হাতে নিয়ে হাঁটতেই থাকি, এলগিন পেরিয়ে ল্যান্সডাউন, মিন্টোপার্ক তারপর আবার এক্সাইড..

শেয়ারের ট্যাক্সি,
বিদ্যাসাগর সেতু,
ভেসে যাওয়া উড়ালপুলের নীচের রাস্তা.. 
বাড়ি.. 
আদা আর গোলমরিচ দেওয়া গরম গরম চা..
দিল আফরোজ রেবা.. 
আর বহু বহুদিন পর এই ব্লগ ব্লগানি..

Thursday, August 06, 2009

এমনি এমনি

বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভাঙল আজ খুব ভোরবেলায়৷ আধোঘুমে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, শব্দটা বৃষ্টির নাকি জানলার ওপাশের আধখানা শেষ হওয়া বাড়িটির ছাদের জমানো জল গড়ানোর৷ খানিক এপাশ-ওপাশ করে আরো একটু ঘুমিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও ঘুম আর এলো না৷ কানে ততক্ষণে পরিষ্কার রিমঝিম বৃষ্টি৷ যাহ৷৷ আজকেও বাজার যাওয়া হল না৷ তার মানে আজকেও ডিম আর ডাল?! আর যা বৃষ্টি পড়ছে, বুয়ার তো আজকেও নিশ্চিত ছুটি! সব গেল! হড়বড়িয়ে জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে বোঝা গেল, এ বৃষ্টি শিগগির থামার জন্যে নামেনি৷ ঘড়ির কাঁটা যদিও বলছে বেলা হয়েছে কিন্তু বাইরে তাকিয়ে সেটা বোঝার উপায় নেই৷ আধো আলো আধো অন্ধকারে সকাল যেন আড়মোড়া ভাঙছে সবে৷ ঝুম বৃষ্টিতে সব জলছবি৷ 

বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আমি চোখের সামনে ডিম দেখতে পেলাম, সাদা সাদা ডিম! ক'দিন ধরেই চলছে এই। রোজই বাজারে যাবো যাবো করেও আর হয়ে উঠছে না আর ডিমও সমানে চলছে কিন্তু মুখে আর রুচছে না, বাজারে যেতেই হবে তাছাড়া বাজারে আজকে নিশ্চয়ই ভাল মাছ পাওয়া যাবে, নতুন পানির সব মাছ নিশ্চয়ই এসেছে আর ইলিশ! হয়ত ধরা-ছোঁয়ার দামের মধ্যে ইলিশও পেয়ে যেতে পারি এমন বাদল দিনে! এই বৃষ্টিতে ক'জন বাজারে যাবে আজ তাও সপ্তার এই মাঝখানে? আজকে বাজারে ভাল মাছ না উঠেই যায় না! মাছ আর ডিমের মাঝখানে কলিং বেলে ডাকে সুইপার, একবারের বেশি দু'বার সে বেল বাজাবে না, আর দরজা খুলতে মিনিটখানেক দেরি করলেও তার টিকির দেখা আর পাওয়া যাবে না বলে আমি উঠেই পড়ি জানলার ধার ছেড়ে৷ বৃষ্টিবিলাস এই সকালবেলায় নয়৷
-----
শবে বরাত৷
সন্ধে থেকেই বাজি-পটকা ফুটছে দূরে দূরে। হালকা হলেও শব্দ শোনা যায় একের পর এক বাজি পোড়ার, উৎসবের আওয়াজ শোনা যায় দূর থেকে হলেও। 
হুম৷ আজকে বরাতের রাত৷ সারারাত জেগে নামাজ পড়ার রাত৷ একশ রাকাত নফল নামাজ বা তারও বেশি৷ যে যত পড়তে পারে৷ সারাদিন ধরে নানান রকমের হালুয়া বানিয়ে সন্ধেবেলায় দরজার বাইরে অপেক্ষারত সব ভিখিরিদের রুটি-হালুয়া বিলি করার রাত৷ না৷ এ'বাড়িতে কোনো ভিখিরি আসে না, না দিনে না সন্ধেয়৷ এ'পাড়ায় বোঝাও যায় না, কোনদিন শবে বরাত আর কোনদিন ঈদ৷ শুধু শবে বরাতের সন্ধেয় বাজি-পটকা ফোটে দূরে দূরে.. হালুয়া আমি এখনও বানাই তবে সে শুধু নিজে খাওয়ার জন্যে৷ খানিকটা ছোলার ডালের, খানিকটা মুগ ডালের আর খানিকটা সুজীর৷ ব্যস৷ 

এমন সব দিনে আমার পুরনো সব কথা মনে পড়ে
পুরনো সেই দিনের কথা সেই কি ভোলা যায
নাহ
ভোলা যায় না..

সে'বছর শবে বরাতের আগের দিন আমরা বাড়ি যাই, দেশের বাড়ি৷ যেখানে আমার দাদা-দাদী থাকেন৷ আব্বা বেশ কিছু নতুন জামা-কাপড় কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন, অনেকগুলো শাড়িও৷ শবে বরাতে তো কেউ নতুন জামা-শাড়ি পরে না, কেন কে জানে আব্বা সেবার সকলের জন্যে নিয়ে এসেছিলেন৷ তার মধ্যে একটা নতুন শাড়ি ছিল আমার চাচীর৷ বায়না করে বসলাম, আমিও শাড়ি পরব, নতুন শাড়ি পরে নামাজ পড়ব! আমর বয়স তখন কত? আট-নয় হবে বোধ হয়৷ সারাদিন ধরে চাচী রান্নাঘরে, চালের রুটি, হালুয়া আর রোজকার রান্না৷
আমার দাদীর একটা স্পেশাল হালুয়া ছিল, সেটা দাদী নিজেই বানাতেন, এমনিতে দাদীকে রান্নাঘরে যেতে দেখিনি কখনো কিন্তু শবে বরাতের ওই স্পেশাল হালুয়া দাদী নিজে বানাতেন৷ বিশাল এক হাঁড়ির মধ্যে একটু মোটা করে চালা চালের গুড়োকে ঘিয়ের মধ্যে নেড়ে নেড়ে চিনি আর গুড় মিশিয়ে একটা হালুয়া বানাতেন দাদী, গোটা গোটা গরম মশলা আর কিশমিশ। সেই হালুয়া আর কাওকে বানাতে দেখিনি কোথাও, এখন অবশ্য চাচী বানায়, কিন্তু আর কেউ না৷ এমনকি আম্মাও না! ফকফকে সাদা চালের গুড়োর হালুয়াতে লাল রং আনার জন্যে দাদী চিনির সাথে গুড় মেশাতেন৷ তো সারাদিন ধরে রান্না হল কয়েক পদের হালুয়া, রুটি, মাংস৷ এমনিতে আমাদের বাজারে সব সময় গরুর মাংস পাওয়া যেত না, বিশেষ বিশেষ দিনে গরু জবাই হত তখন, তো শবে বরাতে বাজারে গরু জবাই হত, দাদা সকাল সকাল বাজার থেকে নিয়ে আসতেন সদ্য জবাই হওয়া গরুর মাংস৷ পুরো বাড়ি জুড়ে মিশ্র এক গন্ধ, হালুয়া, মাংস সেঁকা চালের রুটির গন্ধ৷ সব মিলিয়ে গোটা বাড়ি জুড়ে শুধু খাবারের গন্ধ৷ দুপুরের পর থেকেই লোক আসতে শুরু করল হালুয়া-রুটি খেতে৷ বড় বড় সব থালা-কুলোর উপর পুরনো খবরের কাগজ বিছিয়ে ভাগ দিয়ে রাখা হল সব হালুয়া রুটি, তিনখানা করে রুটি আর তার উপর দাদীর বানানো সেই হালুয়া এক খাবলা করে৷ সেই কোরবানির সময় থালায় করে মাংস রাখা হয় না? দশ-বারোটা করে ভাগ এক একটা থালায়? সব বাড়ি বাড়ি বিলে হবে বলে? এও ঠিক সেই রকম৷ এক একজন আসে, তার হাতে একটা করে রুটি-হালুয়ার ভাগ তুলে দেওয়া হয়৷ সন্ধে পর্যন্ত চলে এই রুটি হালুয়া বিলি৷ কোথা থেকে যে আসত সব মানুষ! এখনও কী আসে..

তিনসন্ধের সময় সূর্য যখন ডুবি ডুবি করছে, দাদী তখন জামা কাপড় নিয়ে পুকুরপারে রেডি, গোসল করবে বলে৷ শবে বরাত-শবে কদরের সন্ধেয় গোসল করলে পানির ফোঁটার সাথে সাথে সব পাপও ঝরে পড়ে যায় শরীর থেকে৷ আমিও গোসল করি দাদীর সাথে, পুকুরে গোসল করতে আসে আমাদের পাড়ার আরো সব মেয়ে-বউরা৷ এমনি সময়ে আমাদের পুকুরে আমার চৌধুরানী দাদী অন্য কাওকে নামতে না দিলেও এই রকম সব বিশেষ দিনগুলোতে দাদী কাওকে কিছু বলে না৷ ঝপাঝপ দু-তিনখানা করে ডুব দিয়ে সদ্য নেমে আসা অন্ধকার পারে দাঁড়িয়ে ভিজে কাপড় ছেড়ে শুকনো কাপড় জড়িয়ে এক ছুটে বাড়ি, মাগরিবের নামাজের সময় বড় কম আর মাগরিবের আগেই পড়ে নিতে হবে তাহিয়াতুল অজুর নামাজ, তারপর মাগরিব৷ সারাদিন রোজা রেখে, হালুয়া- রুটি বানিয়ে বিলি করে সকলেই মোটামুটি ক্লান্ত৷ তারমধ্যেই রোজা খোলার ইন্তেজাম৷ আর তারপর আবার নামাজ৷

এশার নামাজের আগে অব্দি খানিক বিশ্রাম, আর তারপর বরাতের রাতের নামাজ, তা সে তো চলবে সারারাত ধরে৷ চাচীর নতুন শাড়ি পরে আমিও রেডি সারারাত নামাজ পড়ার জন্যে৷ সেদিন সারারাত চাচীকে প্রচন্ড জ্বালিয়েছিলাম৷ রুকুতে গিয়ে চাচীকে জিজ্ঞেস করা, চাচী, এরপর? বা সেজদা গিয়ে জানতে চাওয়া, কি পড়ব এখন? শেষমেশ বিরক্ত চাচীর বলে ওঠা, আমি যা করি, সাথে সাথে সেটাই কর, কিছু পড়তে হবে না তোকে! মাঝরাত পেরিয়ে রাত যখন ভোরের দিকে আমদের তখন একশত রাকাত নামাজ পড়া শেষ! সে আমার প্রথম পড়া একশ রাকাত নামাজ! 

আমাদের বাসায় আমরা, ভাই-বোনেরা সন্ধে থেকে মাঝরাত পর্যন্ত হই হুল্লোড় করে ঘুমিয়ে পড়তাম, শবে বরাতে সারারাত জেগে নামাজ পড়া সেই প্রথম, চাচীর সাথে৷ আমি আর চাচী তখন বাড়ি থেকে বেরোই হাঁটব বলে৷ পায়ে পায়ে জড়ায় নতুন শাড়ি, বারে বারেই হোঁচট খাই বলে দুই হাতে শাড়ি যতটা তোলা যায়, তুলে হাঁটি৷সুনসান রাত। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর।পায়ের তলায় শিশিরে ভেজা ঘাস, খালি পায়ে ভেজা ঘাসের উপার দিয়ে আমরা হাঁটি। এ'উঠোন ও'উঠোন ঘুরে আমরা ছোট্ট পাড়াটা ঘুরে যাই কবরস্থান অব্দি৷ 

বাঁশঝাড়ে ঢাকা কবরস্থানে ঢুকতে আমি দিনের বেলাতেও রাজী নই কিন্তু চাঁদনী রাতের শেষ প্রহরে কী করে যেন নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকি কবরস্থানের সামনে, একটু দূরে দূরে কবর সব, ভেঙে মাটি ঢুকে যাওয়া কবরের সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে চাচী প্রার্থনা করে, কি বুঝে কে জানে নিশুথ রাতে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকি আমি কবরেস্থানের সামনে৷

------
আজকে চাচীর কথাও খুব মনে পড়ছে। চাচী খুব অসুস্থ।

Sunday, June 07, 2009

ফুকোওকার চিঠি-০৩


প্রিয় পাঠক,
লিখব লিখব করে লেখা আর হয়ে উঠছে না এই চিঠি। দু-এক লাইন লেখা হয়, খসড়ার খাতায় গিয়ে জমা হয়। এই সার্বক্ষণিক বিষন্ন, মেঘলা আকাশ, কাছে-দূরের ও‌ই ঘন সবুজ পাহাড়, যত্র-তত্র ফুটে থাকা নাম না জানা অসংখ্য, অজস্র ছোট-বড় ফুল, যখন তখন বিনা নোটিশে নেমে পড়া এই বৃষ্টি যেন বলে দেয়, এইখানটায় চুপটি করে বসে থাকো, থাকো, থাকো তুমি আমার সঙ্গে...

মন যে কেমন করে তাহা মনই জানে।। 

পাশের স্কুলবাড়িটিতে সকাল থেকে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের কলকাকলিই শুধু যেন ছন্দপতন এই নৈ:শব্দে। বাস থেকে নেমে কালো টুপি- টাই- ঘন নীল ব্লেজার -ঝকঝকে জুতো আর পিঠে ভারী চামড়ার ব্যাগ নিয়ে তুলতুলে শিশুগুলো হুটোপাটি করতে করতে স্কুলে গিয়ে ঢোকে। যারা একটু বড়, তারা সব আসে সাইকেলে, স্ট্যান্ডে সাইকেল রেখে ঢুকে যায় স্কুলবাড়িতে। আবার খানিক সব নীরব, শুনশান.. শনশন করে বাতাস বয়ে যায় মেপল গাছের ডালে ডালে.. শুকনো হলুদ পাতারা ঝরে পড়ে, বিছিয়ে থাকে পাহাড়ী রাস্তা জুড়ে, মাঠ জুড়ে। কয়েকটা পাতা উড়ে এসে ঢুকে পড়ে বারান্দায়, কাঁচের দরজার ওপাশে.. 

একটা পাতা যেন চেনা চেনা লাগে। কোন এক হিন্দি সিনেমা জুড়ে এই পাতারা উড়ে বেড়িয়েছিল না! সিনেমার নামটা এখন মনে পড়ছে না আর পাতাদের তো চিনিই না! মেপল আর সাকুরা তো কেনজি সান চিনিয়ে দিয়েছিলেন, এটা তবে কী গাছ? ইফতেখার আবার গাছ চেনে না। তুমি দেখলে কী চিনতে পারতে?
ইস্নিপস। ঢাকায় কল্লোল'দা। কল্লোল'দার গান শুনি। একের পর এক। বারে বারে। আসার আগেরদিন কল্লোল'দাকে ফোন করেছিলাম। বললেন, পারলে কিছু ফোক আনিস ওখানকার। ফোক-কে জাপানীজ-এ কী বলে? কেউ বলতে পারে না! ইফতেখার বললো, খুঁজে দেখে বলবে। দোকানে গিয়ে ফোক বলাতে কেউ কিস্যু বোঝে না। য়োকা, ঝুমকির বন্ধু, ইংরেজি খানিকটা বুঝে আর খানিকটা না বুঝে কাজ চালিয়ে নেয়, সেও বুঝতে পারে না ফোক কী জিনিস। শেষমেষ কেনজি সান উদ্ধার করেন, যোগাড় করে এনে দেন একখানা সিডি। উনসত্তর সালের। 

লিখব বলে সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম অসমাপ্ত লেখাখানির পাতাগুলি। সে কেবল নেড়েচেড়ে দেখাই সার। এক লাইন এগোয় তো তিন লাইন পেছোয়। চোখ ঘুরে বেড়ায় অর্কুট -ফেসবুক -সচলায়তন-গুরুর পাতায় পাতায়। কোনোখানেই মন লাগে না। 

বড় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে চিঠি.. বরং সিঙ্গাপুরে চলো..


আজ আতিকের গায়ে হলুদ কাল আতিকের বিয়ে..

আজ আতিকের গায়ে হলুদ ছিল বটে তবে কাল আতিকের বিয়ে নয়। আতিকের বিয়ে সামনের মাসের ১২তারিখে, ঢাকায়। বন্ধুরা, যারা আতিকের সাথে থাকে, পড়ে, দিনের একটা নির্দৃষ্ট সময়ে এক জায়গায় জড়ো হয়ে খাওয়া-দাওয়া করে, আড্ডা দেয়, ভাগ করে নেয় সুখ-দুখ। তারা আতিকের বিয়েতে থাকতে পারবে না বলে বিয়ের কোনো অনুষ্ঠানেও থাকবে না তা কী হয়! সক্কলে মিলে তাই অগ্রিম গায়ে হলুদ দিল আতিকের। সারাটা দিন ধরে রান্না করল আরিফ আর গৌতম, এবং তারা প্রমাণ করল, বাইরে বাইরে খেলেও রান্না-টান্না এরা পারে এবং ভালোই পারে আর এমন পারে যে জনা কুড়ি লোকের জন্যে বাড়িতে রেঁধে পার্টি দিতে পারে। আয়োজনে থাকল মঞ্জু আর আরো কয়েকজন। যোগাড় করা হল কাঁচা হলুদ, বোধ হয় হামানদিস্তায় থেঁতো করা হয় ও‌ই হলুদ। গায়ে হলুদের এই অনুষ্ঠানে হাজির হল জন কুড়ি বন্ধু। কেনা হয়েছিল বিশাল বড় কাউবয় হ্যাট, আতিক যেটা কিছুতেই পরবে না। আমি কেমন করে কোথা থেকে যে আতিকের গায়ে হলুদে হাজির হয়ে যাই, এ এক অবাক পৃথিবী বটে! আলাপ হল রাজীবের সাথে, সচলায়তন নিয়মিত পড়ার সুবাদে শ্যাজা আপুকে যে ভালমতন চেনে! এবং দেখলাম ওদের অনেকেই নিয়মিত সচলায়তন পড়ে। ফিকে হলুদ রঙের শাড়ি পরে এসেছিল বর্ণা। সক্কলে মিলে হই হই করে হলুদ দেয় আতিককে। [৩০শে মে, সিঙ্গাপুর]

একটু পেছনদিকে যাই। 

সেদিন আতিকের সাথে বেরিয়ে প্রথমে যাই ওদের বিশ্ববিদ্যালয়ে, ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে দুপুরের খাওয়া। সেখানে আগে থেকেই ছিল গৌতম, আরিফ। ছুটির দিন বেশির ভাগ খাবারের দোকানই বন্ধ, শেষমেষ পিৎজা খাওয়া হল আলুভাজা, পেপসি সহযোগে। কোথায় যাওয়া যেতে পারে বেড়ানোর জন্য? আলোচনা করে ঠিক হল, বার্ডপার্কে যাওয়া যাক, সেখান থেকে মোস্তাফা সেন্টার আর তারপরেও সময় থাকলে সেন্তোসা আইল্যান্ড, সময়ে না কুলোলে মোস্তাফা সেন্টার থেকেই এয়ারপোর্টে চলে যাওয়া যাবে। দু'বছর হল আতিক সিঙ্গাপুরে আছে কিন্তু এখনও লোকে যে'সব জায়গায় বেড়াতে যায় সে'সব জায়গায় যাওয়া হয়নি তার। সঙ্গী হল মঞ্জু, মাস ছয়েক হল সে আছে সিঙ্গাপুরে, এই সব ট্যুরিস্ট স্পটগুলো দেখা হয়নি তারও। যেমন এই বার্ডপার্ক, সেন্তোসা আইল্যান্ড ইত্যাদি ইত্যাদি। বার্ডপার্ক মানে কী পাখিরালয়? হবে হয়তো, নাও হতে পারে, তবে আমি বরং পাখিরালয়ই বলি। 

কী নেই এই পাখিরালয়ে? জল আছে, জঙ্গল আছে, পাহাড় আছে, গাছ আছে, আছে এমনকি মরুভূমিও। আফ্রিকায় যাবে জলপ্রপাত দেখতে? কোনো দরকার নেই, এই পাখিরালয়ে আফ্রিকান ফলও আছে। কত যে পাখি এই পাখিরালয়ে। পায়ের পাতায় তিনখানি আঙুলে ভর করে ঘুরে বেড়ানো বিশাল উটপাখিরা একেবারে সামনে এসে দাঁড়ায়, ছুঁয়ে দেয়া যায় ইচ্ছে করলেই! কত শত পাখি যে ঘুরে বেড়াচ্ছে যে যার নির্দৃষ্ট জায়গায়, জাল দিয়ে ঘেরা জায়গায়। কৃত্রিম লেকে দল বেঁধে ভেসে বেড়াচ্ছে রকমারী হাঁস। বিশাল আকার এক একটার। আর কী তাদের রঙের বাহার। লম্বা সরু গলার ফ্লেমিংগো, (আচ্ছা ফ্লেমিংগোর ও‌ই গায়ের রংটা কমলা না গোলাপী? আমার তো কমলা বলেই মনে হল! কোথায় দেখবে? আহা, গুগলে সার্চ দাও না, জুরং বার্ডপার্ক বলে। দেখে আমাকে বলো তো, ওটা কী রং?) ঈগল, কাকাতূয়া, এমনকি ময়নারাও যে যার জায়গায়, জালের ঘরে। সব দল বেঁধে। পেঙ্গুইন দেখার জন্যে বরফের দেশে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, সিঙ্গাপুরের এই পাখিরালয়ে গেলেই দেখতে পাবে কাঁচের ওপাশে ঠান্ডা বরফের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে সব পেঙ্গুইনেরা। বেবি পেঙ্গুইন, মাম্মা পেঙ্গুইন, ড্যাডি পেঙ্গুইন, ফ্রেন্ড পেঙ্গুইন। সক্কলে আছে সেখানে। সিঙ্গাপুরের ভ্যাপসা গরমে অ্যাত্ত বড় এই পাখিরালয় দেখতে দেখতে যদি ক্লান্ত হয়ে পড়ো, তবে ঢুকে পড়ো পেঙ্গুইনদের এই ঘরে। ঠান্ডা আর শীতল! সব মিলিয়ে কমপ্লিট প্যাকেজ। 

পাখিরালয়ের ছবিগুলো সব মঞ্জুর ক্যামেরায়, ও মঞ্জু, শুনছো কী? এইবার ছবিগুলো পাঠিয়েই দাও!
রাত ১২টায় প্লেনে উঠে স্থানীয় সময় ভোর ছ'টায় সিঙ্গাপুরে নেমে কী করে যেন আমার অর্ধেকটা রাতই হাপিস হয়ে গেল তখন অন্তত সেটা বুঝে উঠতে পারিনি আর তার উপর সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের সেবা নিতে নিতে ক্লান্ত হয়ে যেই না চোখ বন্ধ করেছি, অমনি বলে, আমরা এবার নামছি! আতিকদের বাসায় মিনি একটা ঘুম দিয়ে সারা দুপুর এই পাখিরালয়ে ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে উঁচু-নিচু রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পাখি আর পাখিদের শো দেখে দেখে শেষবেলায় আফ্রিকান ফল দেখার মত শখ বা শক্তি কোনোটাই যখন আমার আর বাকি নেই, তখন আমি বসে পড়ি একটা বেঞ্চে। আতিক আর মঞ্জু যায় ফল দেখতে। আমি অনেকক্ষণ ধরেই খেয়াল করছিলাম, প্রচুর ভারতীয় ঘুরে বেড়াচ্ছেন এই বার্ডপার্ক জুড়ে। অল্প কয়েকজন বিদেশী ছাড়া ওখানে যাদেরকে দেখলাম, প্রায় সকলেই ভারতীয়। আমরা যখন ট্যাক্সির লাইনে দাঁড়াই সূর্য তখন বেশ অনেকটা নেমে পড়েছে মধ্যগগন ছেড়ে..
পরে আবার লিখছি, আজ এই পর্যন্ত..

Monday, May 25, 2009

ফুকোওকার চিঠি-০৪


পর্ব নম্বর দুই এবং তিন পরে লেখা হইবে, এই ইস্টাইলটুকু জেবতিক আরিফ হইতে ধার করা হইল।
সেই কবে যেন একদিন চিঠি লিখতে বলেছিলে। সে কবে? ভুলে গেছি.. বলেছিলে, চিঠিটা এবার লিখেই ফ্যালো, জানি তুমি পারবে, শুরুটা আমি করে দিয়ে গেলাম... সেদিন চিঠি লেখা হয়নি আর তারপরেও না। কবে যেন একবার লিখেছিলাম একটা চিঠি আর তারপর ফিকে নীল খামে করে পাঠিয়েও ছিলাম কিন্তু সে চিঠির উত্তর আসেনি, ফেরত আসেনি সে চিঠি আজও.. 

বাথরুমে একটু দেখো তো, বোধ হয় কাপড় কাচার সাবান ফুরিয়েছে, যদি বাজারের দিকে যাও তো কিনে নিও। রান্নাঘরটা একবার দেখবে কী? পেঁয়াজ-মশলা-পাতি কী আছে না আছে একটু দেখে নিও না, সেও বোধ হয় কিনতে হবে। শুনেছি দু-তিনদিন হল বাজারে নাকি লিচু এসেছে,যদি দাম বেশি না হ্য় তবে খানিকটা লিচু কিনে নিও.. মরশুমের পয়লা ফল..

এখানে বেশ ঠান্ডা.. আসার পথে ভুল করে এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে জ্যাকেট-চাদর ফেলে এসে দোকানে দোকানে গরম কিছু জামা হন্যে হয়ে খুঁজেছি, পাইনি। এখন তো সামার কাজেই কোথাও কোনো গরম জামা কাপড় নাই, সব ফুলফুলা-ঝুলঝুলা সামারের কাপড়! তবে এদেশের সামারে আমার হাড়ে হাড়ে কাঁপুনি লাগে এই হল সমস্যা! সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলেন আতিক, এখানেও এক আতিক আছেন জানো তো, সে আমাদের ইফতেকারের কলিগ, বললেন, আমাদের বাসায় কিছু গরম জামা কাপড় আছে, যেগুলো কেনা হয়েছিল কিন্তু ইউজ হয়নি, আপনি আপাতত কাজ চালান! বোঝো ঠ্যালা, আমি এখন আতিকের সোয়েটার-জ্যাকেট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছি!
কেনজি কুরোকাওয়ার কথা শোনো। এখানে এসে প্রথম যাঁর সাথে আলাপ, তিনি কেনজি কুরোকাওয়া। 

এয়ারপোর্টে গেছিলেন ইফতি'র সাথে, ইফতি তো গাড়ি চালাতে পারে না আর ঝুমকির গাড়ি চালানো বারণ তাই কেনজি গেলেন সারথী হয়ে, আমাকে আনতে। সদাহাস্য এক মুখ। ব্যবসার কাজে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ান বলে কাজ চালানোর মত ইংরেজি বলেই ফেলেন আর বোঝেনও। একঘন্টার রাস্তায় আমার সাথে খুব একটা কথা বলেননি আমি টায়ার্ড বলে, শুধু বলে দিয়েছিলেন, কোথাও যেতে চাইলে যেব অবশ্যই বলি, তিনি নিয়ে যাবেন, ইফতেকার সান তো সময় পাবেন না। সক্কলের নামে পেছনে একটা 'সান' জুড়ে দিয়ে কথা বলেন এরা। এর মাঝে আমার নামটা দু-তিনবার উচ্চারন করে করে সড়গড় হওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

দিন কয় আগে কিছু কেনাকাটা করব বলাতে ইফতি কেনজি সানকেই ডাকে, সাথে করে নিয়ে যেতে আর পারলে একটু ঘুরিয়েও দিতে। সেদিন শহরের মধ্যেই খানিক ইতি-উতি ঘুরিয়ে নিজের বাড়ি নিয়ে যান কেনজি, গিন্নির সাথে আলাপ করিয়ে দিতে। কেকো কুরোকাওয়া। কেকো সান। ভারী মিষ্টি মহিলা। সদাহাস্য মুখ এঁরও, আর সদালাপী। তিনি যা বলেন আমি সেটা বুঝি না আর আমি যা বলি তিনি সেটা বোঝেন না তাই কিছু একটা কথা বলেই  কেনজি সানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন, আনুবাদ করে সেটা আমাকে বুঝিয়ে দিতে আবার আমি কী বলি সেটাও কেনজি'র কাছ থেকেই বুঝে নেন। 

পাশাপাশি দুটো বাড়িতে দু'জনে থাকেন, খাওয়া-দাওয়া একসঙ্গেই করেন। দুটো বাড়িরই সামনে পেছনে বাগান, যার দেখাশোনা করেন কেনজি। নিজের বাগানের জারবারা, মার্গারেট তুলে দিলেন কেকো সান, পেড়ে দিলেন স্ট্রবেরি, চেরি। আর দিলেন বাঁশের কোর, সব্জি হিসেবে রান্না করে খাওয়ার জন্যে। সময় কম ছিলো বলে শুধু বাগান দেখেই ফিরে এলাম, এর মাঝেই কেকো জেনে নিলেন কোথায় কোথায় যেতে চাই, সেটা চট করে একটা নোট খাতায় লিখেও নিলেন। ঠিক হল, এই রবিবার মানে আজকে বেরুবো আমরা।

এই বাড়ির পেছনটায় নিচু পাহাড় কেটে মাঠ, ছাড়া ছাড়া সব বিল্ডিং, ইউনিভার্সিটির লেকচার রুম, ক্লাসরুম, ল্যাব, জিমন্যাশিয়াম, বিদেশী ছাত্রদের কোয়ার্টার। এখানে জিমন্যাশিয়ামগুলো আমাদের দেশের জিমখানার মত নয়। এখানে স্কুল-কলেজের বাচ্চারা একটা নির্দিষ্ট সময়ে এসে ঢোকে কাঁধে ইয়াব্বড় ব্যাগ নিয়ে। কারো হাতে থাকে স্টিক, বল, কারো বা ব্যাট। ঘড়ি ধরে ওরা সব খেলে আর তারপর ঘড়ি ধরে বেরিয়ে যায়। মিষ্টি বাজনা বাজে জিমন্যাশিয়ামের ভেতরে, খুব বেশিদূর যায় না সে বাজনার শব্দ। ছেলের দল বেরিয়ে গেলে দরজা বন্ধ হয় জিমন্যাশিয়ামের, বন্ধ হয় বাজনাও। নীরব সুনসান আবার সব, আগের মতো।

মাঠের বাঁদিকে জঙ্গল আর তার পাশ ধরে সরু একফালি রাস্তা। মাঠ পেরিয়ে সে এঁকে বেকে চলে গেছে ইউনি এলাকায় আর তারপর কোথায় কে জানে..বেশ বড়সড় আর ঘন জঙ্গল। উঁচু উঁচু সব নাম না জানা গাছ। আছে নানা রকমের জংলী ফুল, ছোটো আর ঘন ঝোপ। অচেনা সব রং-বেরঙের ফুলেরা ফুটে আছে ঝোপ জুড়ে, জঙ্গল জুড়ে। আর আছে সাকুরা গাছ। এখন আর সে সব গাছে ফুল নেই, শুধু পাতা। সবুজ পাতায় ছেয়ে আছে বিশাল ঝাঁকড়া সব সাকুরা গাছ। 

মাঠের কথা বলছিলাম। সে এক বিশাল বড় মাঠ। গোল করে গোটা মাঠ জুড়ে চওড়া রাস্তা বানানো সে মাঠ জুড়ে, দৌড়নোর জন্যে। এবং সেখানে সকাল সন্ধে মানুষ দৌড়ায়। গোল গোল। গোল গোল। দৌড়ুচ্ছে তো দৌড়ুচ্ছেই। মাঠের একধারে বেঞ্চে বসে বসে ভাবি, এরা কত দৌড়ুতে পারে? ক্লান্ত হয় না? নানা বয়েসী মানুষ সব। প্রায় সকলেই পরে থাকে জ্যাকেট। মাঠে আসে ছোট বাচ্চারাও। এত বড় মাঠ যে কয়েকটা দল ছড়িয়ে ছিটিয়ে একসাথে খেলে নানা রকমের খেলা আর সাথে থাকে ছুটন্ত মানুষেরা। 

তুমি কি খেলা দেখছো? আইপিএলের ফাইনাল? .অদ্ভুত একটা ব্যপার জানো.. আমি এখন পর্যন্ত কোথাও কাওকে প্রেম করতে দেখিনি! দেখিনি কোথাও কেউ হাত ধরাধরি করে হাঁটছে! রাস্তায় না। মাঠে না। ইউনি এলাকায় না। কোথাও না। কোথাও না। ছাতা সকলেরই হাতে থাকে যখন তখন বৃষ্টি নেমে পড়ে বলে, লোকে পার্কে-মাঠে-ময়দানেও যায় ছাতা হাতে কিন্তু কোনো প্রেমিক-প্রেমিকা দেখা যায় না! রাস্তায় যেমন গাড়ির হর্ন নেই তেমনি নেই প্রেমিক-প্রেমিকাও। কী ভীষণ অদ্ভুত ব্যপার!!

ক্রমশ..

Sunday, May 17, 2009

ফুকোওকার চিঠি

এই বছরের শুরুর থেকেই রিতিমত দৌড়ের উপর আছি। ঠিক এই বছরের শেষ না, ঠিকঠাক বললে বলতে হবে, গত বছরের শেষ থেকে। ডিসেম্বরের শেষে ঢাকায় গিয়ে জানুয়ারীর শেষে কলকাতা। ঠিক তিন সপ্তাহ পরে মাঝ ফেব্রুয়ারীতে আবার ঢাকা। পুরো এক মাস। বইমেলা গেল। মেলা শেষ হওয়ার পরেও আমার দৌড় শেষ হলো না। গোটা একটা মাস ঢাকায় থাকা আমার এই প্রথম। আর বাংলাদেশে একমাস আছি কিন্তু আব্বা আম্মার কাছে গোটা একমাসে মাত্র একদিন, সেটাও এই প্রথম। যাই হোক, কলকাতায় ফিরে খানিক দম নিয়ে জিরোতে না জিরোতেই আবার পায়ের তলার সর্ষের বলটা গড়িয়ে গেল আর এবার গড়ালো বেশ অনেকটা দূর অব্দি। একেবারে সাগর পেরিয়ে সূর্যোদয়ের দেশে। 

সিঙ্গাপুরে ১৯ঘন্টার যাত্রাবিরতি। একা একা কোথায় যাবো, প্রায় গোটা একটা দিন কিভাবে কাটাবো, বেশ দু:শ্চিন্তায় ছিলাম। খুব ভোরে সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্টে প্লেন থেকে জখন নামি, তার খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে। সারসার এরোপ্লেন যেন বিছিয়ে আছে জলমগ্ন রানওয়েতে। সুবিশাল এয়ারপোর্ট। হেঁটে হেঁটে কূল-কিনারা পাওয়া যায় না যেন। সারসার শুল্কমুক্ত দোকান দেখে ভুল করে শুল্কমুক্ত কোনো শপিং মলে ঢুকে পড়লাম কিনা মনে হয়। প্লেনের সহযাত্রীরা যেদিকে যায়, আমিও সেদিকেই হাঁটি। বাঙাল বলে কথা তায় আবার জীব্বনে বিদেশ যাইনি! আগের দিনেই পাওয়া এক ফোন নম্বরে ফোন করি, উদ্দেশ্য, এয়ারপোর্ট থেকে বেরুনো, সিঙ্গাপুরটা খানিক ঘুরে দেখা। যদিও সুমেরু বলেছিল, চুপচাপ বসে থাকবে, বেরুনোর দরকার নেই, হারিয়ে যাবে! 

এই সিঙ্গাপুর নিয়ে আমার একটা গল্প আছে, ছেলেবেলার গল্প। আমি তখন বেশ ছোট। আব্বা ব্যবসার কাজে সিঙ্গাপুরে গেলেন সেবার। কী একটা হোটেলে যেন ছিলেন, আমি নামটা ভুলে গেছি। কিছু একটা ইন্টারন্যাশনাল হোটেল। আব্বা আমার জন্যে হোটেলের প্যাড, খাম, ডাকটিকিট ইত্যাদি নিয়ে এসেছিলেন। আর নিয়ে এসেছিলেন বিশাল বড় এক টেপরেকর্ডার, আর ইয়াব্বড় এক আংটি, আমার জন্য। আমি তখন ফ্রক পরতাম কিন্তু আব্বা আমার জন্যে শাড়ী নিয়ে এসেছিলেন, অফ হোয়াইট রঙের জর্জেট শাড়ী। সে শাড়ী আমার কাছে এখনও আছে। তো আব্বা সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে এসে প্রচুর গল্প করেছিলেন, সে নাকি ছোট্ট এক দেশ, সাজানো গোছানো, ছিমছাম আর বড় সুন্দর নাকি সে দেশ। আব্বার যার সাথে ব্যবসা, তার নাম ছিল চু ওয়া । চাইনীজ। সেই আব্বাকে সব জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেত। আব্বা দেশে ফেরার কিছুদিন পরে সেই চু ওয়া বাংলাদেশে এসেছিল আর আমাদের বাসাতেই ছিল এক সপ্তাহ। 

আব্বার মুখে সিঙ্গাপুরের গল্প শুনে শুনে আমার খুব সিঙ্গাপুরে যেতে সাধ হত যদিও কোনোদিন কাওকে বলিনি সে কথা। এর কিছুদিন পরে চট্টগ্রাম থেকে এক জাহাজ গিয়েছিল সিঙ্গাপুর, হিজবুল বাহার। চট্টগ্রাম-সিঙ্গাপুর-চট্টগ্রাম। সেই জাহাজে আমার সেজকাকা সিঙ্গাপুরে গেল বেড়াতে। আব্বাই পাঠালেন, জাহাজটা যাচ্ছে, যাও, ঘুরে এসো! কাকা তখন কলেজে পড়ে। তো কাকা ঘুরে এলো আর সেও এসে প্রচুর গল্প করলো। আর যাওয়ার আগে কাকার সেকি উৎসাহ! তখন কাকার সাথে সিঙ্গাপুরে যাওয়ার ভীষণ ইচ্ছে হয়েছিল আমার কিন্তু আমি তখনও কাওকে কিছু বলিনি। কাকা চলে যাওয়ার পর কয়েকদিন শুধু মুখ গোমড়া করে ছিলাম, কারো সাথেই পারতে কোনো কথা বলতাম না। কাকাও ফিরে এসে প্রচুর গল্প করল। তার গল্প আরো বেশি, জাহাজের গল্প, সমুদ্রের গল্প আর সিঙ্গাপুর তো আছেই! আমার মন খারাপ তখন রিতিমত মেজাজ খারাপে পরিণত হয়েছিল কিন্তু সেটাও আমি কাওকে বলিনি।

তো আমার ট্রাভেল এজেন্ট যখন জানতে চাইলেন, ম্যাডাম, কোন রাস্তায় যাবেন, বাংকক না সিঙ্গাপুর? আমার এক মুহূর্তও লাগেনি 'সিঙ্গাপুর' বলতে! টিকিটের দাম বেশি পড়বে জেনেও বললাম, সিঙ্গাপুর এয়ালাইন্সেই যাবো! 

তো এই সেই সিঙ্গাপুর! অনেক বছর আগে যেখানে বেড়ানোর তীব্র সাধ জেগেছিল আমার। ফোন করি আতিককে। ছোট ভাইয়ের বন্ধু আতিক সিঙ্গাপুরে থেকে পড়াশোনা করছে। ঘুম জড়ানো গলায় আতিক বলে, আপনি দু নম্বর টার্মিনালের সামনে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে থাকুন, আমি আসছি। রোগা পাতলা এক ছেলে এসে সামনে দাঁড়ায় ঘন্টা খানেক পরে, একনজরেই বোঝা যায় ঘুম কাটেনি তার চোখ থেকে তখনও। শুনলাম, আতিক থাকে পশ্চিম জুরংএ,। হাইওয়ে ধরে ট্যাক্সি যায়। বেলা আটটায়ও রাস্তা নীরব আর ফাঁকা। সপ্তাহান্তের সেটা শুরু বলেই হয়তো! ভোররাতে বৃষ্টি হয়েছে কিন্তু আকাশ তখনও মেঘলা। অনুজ্জ্বল সকাল। তকতকে রাস্তা ধরে ছুটে যাওয়া ট্যাক্সির বাইরে যেন ক্যালেন্ডারের পাতারা হুস হাস বেরিয়ে যাচ্ছে। উঁচু-নিচু পাহাড়ী রাস্তা মনে করিয়ে দেয় আমাদের চট্টগ্রামকে। প্রচুর গাছ রাস্তার দু'পাশেই। সবুজে সবুজ। 

জানলাম, আতিকের বাড়িতে যাচ্ছি। আতিকের উপর হুকুম জারী হয়েছে, আমাকে যেন ঘুরিয়ে সিঙ্গাপুর দেখিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশের আরো দুটি ছেলের সঙ্গে আতিক থাকে বিশাল বড় এক বাড়ির চারতলার এক ফ্ল্যাটে। আতিকের সাথে বাসা শেয়ার করে গৌতম, আরিফ। ওরা সকলেই সিঙ্গাপুরে পোষ্ট ডক্টরেট করছে। রোগা পাতলা,ছোট্ট দেখতে আতিককে দেখে ভাবতে অসুবিধে হয় যে, এই ছেলেটি খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়! বাসায় ঢোকার আগে একটা ফুড জাংশানে নিয়ে যায় আতিক, ব্রেকফার্স্টের জন্যে, ওদের বাসায় নাকি রান্না-খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। বিশাল বড় এক মগে করে কড়া এক মগ কফি শুধু খেয়ে আতিকের বাসায় যাই। তিন বেডরুমের বেশ বড়সড় এক বাসা, হলঘরের মেঝেতে মাদুরের উপর দেখলাম দু'জন ঘুমিয়ে আছে, শুনলাম, ওরা গৌতম আর আরিফ। হিজাব পরা মালয়ী এক ভদ্রমহিলা এগিয়ে এলেন, মারিয়ম, আতিকের ল্যান্ডলেডি। মারিয়ম একটি তালাবন্ধ ঘর খুলে দিয়ে বললেন, রেস্ট নাও, দরকার লাগলে ডেকো। আতিকদের দেখাশোনা মারিয়মই করেন শুনলাম। যদি ঘুমিয়ে পড়ি তবে যেন বারোটায় তুলে দেন বলে ঘুমিয়েই পড়লাম অচেনা এক দেশে, অচেনা এক ঘরে..

Friday, May 08, 2009

বন্ধু থাকো, থাকো আমার মনে

জীবন অরণ্যে তীরবিদ্ধ আমার পাঁজরে
ঝর্ণার গান ঝর-ঝর আর টুপটাপ
ও ----তুমি আবার এসো
গান শুনে যেও আর স্নান করে যেও। (মাসুদ)

সেদিন ঢাকা থেকে কলকাতা ফেরার পথে সকালবেলায় এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে সঙ্গী হল মাসুদ-কাঁকনসারাটা পথ কাঁকন গান গাইলো, কখনও গুনগুনিয়ে, কখনও গলা খুলেমাঝে মাঝেই গলা মেলাচ্ছিল মাসুদওগানের ফাঁকে ফাঁকে টুকরো টুকরো কথাআমি একটু চুপচাপগত একমাস ঢাকাবাসের স্মৃতি একেবারে টাটকা, কিছু সুখস্মৃতি তো কিছু তিক্ত-বিরক্তিকর, দু : খজনকআগেরদিন সারাদিন শুদ্ধস্বরে বসে থাকা, অপেক্ষায়, কখন সুমেরুর বইটা আসবেআসার আগে অসুস্থ বোনটাকে শেষবারের মত দেখে আসা হলো না বইটার জন্য অপেক্ষায়মনটা বেশ খারাপসন্ধ্যায় বন্দুকের নলই ক্ষমতার প্রকৃত উত্স-এর প্রকাশকে কেন্দ্র করে আয়োজিত অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিএকফাঁকে যে ছুট্টে গিয়ে বোনটাকে দেখে আসব ঢাকার ট্র্যাফিকের কারণে সে জো নেই

মাসুদ আর কাঁকন দুজনেই চারুকলার শেষ বর্ষের ছাত্রট্র্যাজেডি- গত দীর্ঘ নয় বৎসর যাবৎ ওরা চারুকলায় পড়ছেশেষবার বোধ হয় পরীক্ষা দিয়েছিল বছর তিনেক আগেওরা দু'জনেই আশা করছে, 'বছরটায় বোধ হয় ওদের পরীক্ষাটা হয়ে যাবে আর ওরাও উৎরে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাট, যে ঘাটে ওরা আটকে আছে গত নয়টি বছর ধরেইতিমধ্যেই সরকারী চাকুরীর বয়স পেরিয়ে যায় যায় করছে দু'জনেরইকাঁকন উত্তরায় একটা স্কুলে আঁকা শেখায়, করে আরো দু-তিনটি আঁকার টিউশনিআর মাসুদ? ঠিক জানি নাবোধ হয় কাজের চেষ্টায় ঘুরে বেড়ায় এদিক ওদিকওরা থাকে কাঁঠালবাগানের একটা ফ্ল্যাটেরাত এগারটা বেজে গেলেই সেদিন দু'জ্নার আর বাড়ি ফেরা হয় না, থেকে যায়, থেকে যেতে হয় বন্ধুর বাড়ি- সাগরের বাড়িরাত এগারটা বাজলেই ওদের একতলার গেটে তালা পড়ে যায়, বাড়িতে আর ঢোকা যায় না


মাসুদ কবিতা লেখে, গান লেখেসে গানে সুর বসায় কাকনগায় কাঁকনঅদ্ভুত সুরেলা আর মিষ্টি গলা কাঁকনেরকাঁকনের কথা শুনলে মনে হতে বাধ্য, এই মেয়ে নিশ্চয়ই গান গায়যখনই গাইতে শুরু করে, চোখদুটি মুদে আসে আপনা থেকেই কথার মধ্যে ডুবে গিয়ে, মগ্ন হয়ে দুলে দুলে গায় কাঁকনকাঁকন গণসঙ্গীত গয়, গানের দলের সাথে ঘুরে বেড়ায় নানা জায়গায়বন্ধুরা যে বাড়িতে আড্ডা দেয়, সে বাড়ির রান্নাঘরের দায়িত্ব আপনা থেকেই এসে পড়ে কাঁকনের উপরকাঁকন রান্না করে, মাঝে মাঝেই এসে আড্ডায় যোগ দেয় আর রান্না শেষ হলেই গুছিয়ে বসে গান গয় মাসুদের লেখা গান আর লালন

০২
ও যমুনা রে,
জলের নাচন নাচাস বুকে
আমারে তুই নে,
আমিও তো নাচতে জানি রে----(মাসুদ)


সাগরের সাথে আমার প্রথম দেখা আজিজ মার্কেটের সামনের ফুটপাথেসেটা জানুয়ারী মাস, পরদিন আমার কলকাতায় ফেরা, শেষবেলার আড্ডা দিতে সঙ্গে সহব্লগার-বন্ধু ফারুক ওয়াসিফকে নিয়ে আমরা দু'জন পাঠশালায় ফিরব বলে রওয়ানা দিয়েও ফুটপাথে দাঁড়িয়ে হঠাত্ দেখা দেখা হয়ে যাওয়া এক বন্ধুর সাথে কথা বলছিল ওয়াসিফআমরা দু'জন একপাশে দাঁড়িয়ে, হঠাৎ দেখি সুমেরুর চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল, খানিকটা সন্দেহ আর খানিকটা সংকোচের সাথে সে এগিয়ে গিয়ে ওয়াসিফের বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে, "সাগর না?' "আরে, তুই সুমেরু না!' কিল-চড়-ঘুষি সমানে খানিক চলার পর জানা গেল, সাগরের সাথে সুমেরুর শেষ দেখা হয়েছিল দশ বছর আগে, কলকাতায়সম্ভবত সাগর তার বানানো কোনো একটা ফিল্ম নিয়ে কলকাতায় এসেছিলো আর সে নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়েছিলতখনই কিংবা হয়তো তারও আগে থেকে ওরা একে অন্যকে চেনে, সেই সময় সুমেরু আর সাগর মিলে কোনোরকমে সেই ঝামেলা থেকে পার পেয়েছিলতারপর এই সেদিন আবার দেখা, আজিজ মার্কেটের সামনের ফুটপাথেএদের মারপিট আর তারপরের কথপোকথন শুনে আমি এবং ওয়াসিফ দু'জনেই চুপসাগরকে সাথে করে ফেরা হল পাঠশালায়, আমাদের অস্থায়ী আবাসেগলায় ঝোলানো ক্যামেরা খুলে সাগর আমার ছবি তুললো, বইয়ের জন্যমাঝরাত পার হওয়ার পর ওয়াসিফ এবং সাগর দু'জনেই বলতে লাগল, বাকি আড্ডাটা আমার বাড়িতে হোকসকালে আমার ফ্লাইট, কলকাতা ফিরব, কিস্যু গোছনো হয়নি, সাগর বললো, চল নানিয়মের জীবন কত বাঁচবা

সাগরকে 'মোল্লা সাগর' নামে ঢাকায় অনেকেই চিনবেনসাগর ছবি তোলে, ছবি আঁকে, সিনেমা বানায়, গান শোনে, গান সংগ্রহ করে, বাংলা সংস্কৃতি আন্দোলন নামে একটা সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত, বিভিন্ন রকম কর্মশালার আয়োজন করে, সারাক্ষণই ফোন কানে কাউকে না কাউকে কখনও কিছু পরামর্শ কখনও বা কিছু যোগাড়-যন্ত্রের হুকুম করে যায়চারুকলার প্রাক্তন ছাত্র সাগরকে সন্ধে থেকেই পাওয়া যায় ছবির হাটেকোনো না কোনো আয়োজনে সর্বদাই ব্যস্ত থাকে সে সেখানে কখনও কল্লোল'দার গানের আসরের আয়োজন, কখনও হাটের মেঝে জুড়ে লুডুর বোর্ড এঁকে কাঠের বিশাল ছক্কায় সাপলুডু খেলা আর তার সাথেই পর্দা টানিয়ে তাতে সিনেমা দেখানোকখনও বা সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ঘুড়ির উৎসবের আয়োজনে মাসাধিককাল ধরে নানা রকমের, নানা আকারের রং-বেরঙের সব ঘুড়ি বানানো আর তার ফান্ড যোগাড় করার জন্যে চারুকলার ছেলে-পুলেদের নিয়ে সরা, পট আঁকা সারা বিকেল-সন্ধে জুড়েগানপাগল সাগর যেখানে যা গান শোনে, যার গলায় শোনে, পছন্দ হলে আর সম্ভব হলে সাথে সাথেই রেকর্ড করে নেয়, নইলে পরে দিন ঠিক করে সেখানে পৌঁছে যায় বড় ক্যামেরা সহপরে নিজের বানানো সিনেমায় জুড়ে দেয় সেসব গান কারোর কারোর সাথে হয়তো মেলে না সাগরের কিন্তু যার সাথে মেলে সে তার প্রাণের মানুষ


০৩
আর যাবো না ঠাকুরবাড়ি
আমার রাধার নাইরে শাড়ি
সূর্য তুমি ডুবে যাও
সূর্য তুমি নিভে যাও
অন্ধকারে স্বর্গ আঁকো
যে চেনে সে চিনে নেবে
অন্ধকারে ঠাকুরবাড়ি-কফিল আহমেদ

হাসান আরিফআবৃত্তিকারজীবনধারণের জন্যে একটা চাকরীও করেনতাঁর সাথে আমার-আমাদের আলাপও অদ্ভুতভাবে২০০৩সালে সুমেরুর বড়জ্যেঠু খুন হন নিজের চেম্বারে, একজন  ডাক্তার ছিলেন তিনি, তখন কলকাতার চলচ্চিত্রকার বন্ধু গৌতমের সাহায্যে রাতারাতি বর্ডার পেরিয়ে সুমেরু বাংলাদেশে যায়, নিজেদের বাড়িতে, ঝিনেদায়পরে গৌতমের সাথেই গৌতমেরই পরিচিত হাসান আরিফের বাড়িতে গিয়ে গিয়ে ওঠে, ঢাকায়দিন কয়েক ছিল সে সেখানেতখনই আলাপ হয়, আনিস মাহমুদ, বর্তমানে সহব্লগার আনিস ভাইয়ের সাথেওফিরে আসার পরে, যা হয়, কিছুদিন যোগাযোগ ছিল তারপরে এতদিন আর কোনো যোগাযোগ ছিলো না কারো সাথেইউত্তরায় সচলায়তনের ব্লগারদের সম্মেলনে আনিস ভাই চিনতে পারেন সুমেরুকে, খানিক গল্পও হয়কী অদ্ভুত যোগাযোগ! দিন দুই পরে সন্ধের দিকে আজিজ থেকে ফেরার পথে পাঠশালার গেটে "এই সুমেরুউউউ' ডাক শুনে দু'জনেই পেছন ফিরে তাকাই, একজন মানুষ এগিয়ে আসেন, কোনো কথা না বলে জড়িয়ে ধরেন সুমেরুকেকোথায় ছিলা-কেমন ছিলা-কবে আসলা-র পরে তাঁর নজর পড়ে আমার দিকে, সুমেরু আলাপ করিয়ে দেয় হাসান আরিফ ভাইয়ের সাথেপাঠশালার ঘরে বসে খানিক গল্প করার পরে জানা গেল, তিনিও কুমিল্লার অর্থাৎ আমার দেশের মানুষব্যসজমে গেল আড্ডাশুনলাম, নেক্সট ডোরেই থাকেন খালাম্মা, আরিফ ভাইয়ের মাসেখানে গেলে পিঠে খাওয়া যাবে, আমাদের দেশের পিঠেএবং আমরা পিঠে খেলাম সেখানে গিয়েখালাম্মা, আরিফ ভাইয়ের ভগ্নীপতি সহ আড্ডা চলল মাঝরাত অব্দিমাঝে মাঝে ভাবি, এমনও হয়! পৃথিবীটাই আসলে গোলঘুরে ফিরে কোথায়-কখন যে কার সাথে দেখা হয়ে যাবে কেউ জানে না

সেদিন তেরই মার্চ সন্ধেয় হাসান আরিফ ভাই আবার আসেন পাঠশালার ঘরে, পরদিন বন্দুকের নল-এর প্রকাশা উৎসবে তিনি পাঠ করবেন সুমেরুর বইয়ের কিছু অংশআমাকে বললেন, সুমেরুর নিজের লেখা থেকে পাঠ আগেই শুনেছি, আজ তুমি পড়ে শোনাও, তোমার বই থেকে। লেখকের নিজের লেখা থেকে পাঠ শুনলে সুবিধে হয় পরে সেটা থেকে পড়তেদুটো লেখা তিনি নিজেই বেছে দিলেন এবং বসে বসে শুনলেন আমার বইয়ের থেকে গল্প দু'টিআমি পড়ে শোনালাম

দৃক গ্যালারীর অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে আরিফ ভাই বলে রেখেছিলেন, অনুষ্ঠান শেষে তোমরা দু'জন আমার অতিথি, পছন্দসই একটা জায়গায় বসে খানিক আড্ডা আর খাওয়া দাওয়াআনুষ্ঠান শেষে অতিথিসংখ্যা বেশ কয়েকজনে দাঁড়ালো, কৃষ্ণকলি ও তার এক বন্ধু, সাগর, মাসুদ-কাঁকন ও সাগরের আরেক বন্ধু অ্যানীও হ্যাঁ, আরফানও ছিলঠিক হলো, আড্ডা হবে পাঠশালাতেইকাবাব আর পরোটা নিয়ে এলেন আরিফ ভাই, সাগর নিয়ে এলো পানীয়কফিল আহমেদ আবারও গান গাইলেনএবারে গান শোনালেন কৃষ্ণকলিওপরদিন সকালে আমার বেরুনো, বাক্সো-প্যাটরা কিস্‌সু গোছানো হয়নি কিন্তু গান আর কথা - সে যে ফুরায় না ...

কফিল আহমেদের কথা প্রথম শুনি ব্লগার বন্ধু শাপলুর কাছেসে বছর দৃকে সিনেমা বিষয়ক একটা কর্মশালার জন্য সুমেরু ঢাকায় যায়, সঙ্গে আমিশাপলু আমাকে একটা সিডি দেয় কফিল আহমেদেরতাঁর কথা- তাঁর গানের কথা শুনেছি ব্লগবন্ধু ইমরুল হাসানের কাছেওএবার সাগরের বাড়িতে যেদিন কল্লোল'দা গান করেন, সেদিন সাগর ফোনে ডাকে কফিল আহমেদকেওসাগরের বহু স্বল্প দৈর্ঘের চলচ্চিত্রে কফিল আহমেদ গান করেছেন, সে'সব চলচ্চিত্র দেখেছি কখনও পাঠশালার ঘরে, কখনও সাগরের বাড়িতেতাঁর গান শুনেছি সাগরের মোবাইল ফোনে- সাগরের গানের সংগ্রহ থেকে শুনেছি-দেখেছি তাঁর গানের ভিডিওভালো লেগেছে বলা বাহুল্যঢাকার বাইরে ছিলেন, আসতে পারেননি সে'দিন তিনিআসার কথা ছিলো পাঠশালার ঘরেও, গান-আড্ডায়রেকর্ডিংএ আটকে গিয়ে সেদিনও আসা হয়নি তাঁরসব অপেক্ষা পুষিয়ে দিলেন কফিল আহমেদ, চৌদ্দ তারিখে, দৃক গ্যালারীতে, বন্দুকের নল-এর প্রকাশনা উৎসবে, অপেক্ষমান বন্ধুদের অনুরোধে একের পর এক গান শুনিয়েছেন কফিল আহমেদযেটুকু বাকি ছিল, সেটুকুও পূর্ণ হয় পাঠশালার ঘরে, কৃষ্ণকলির সাথে যুগলবন্দীতে

০৪
ভালো থাইকো বন্ধু আমার এমন বিজনে
ভালো থাইকো ভালোবাসায় বন্ধুর পরাণে
ভালো থাইকো বন্ধু আমার এমন বিজনে
বুকের মাঝে বন্ধুর বাড়ি, তাতে দরজা সারি সারি
তাতে নাইকো আগল নাইকো দ্বারী। -কল্লোল দাশগুপ্ত


কল্লোল দাশগুপ্তআমাদের কল্লোল'দাঢাকা যাওয়ার আগেরদিন সন্ধ্যায় দৃকের অফিসে গিয়ে শুনলাম, পরদিন কল্লোল'দাও ঢাকা যাচ্ছেন ছবিমেলা দেখতে কল্লোল'দার বহু পুরনো বন্ধু দৃক বাংলাদেশের বর্তমান ডিরেক্টর, জহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক রেহনুমা'র আমন্ত্রণে কল্লোল'দা আগেও ছবিমেলায় গেছেন শুনলাম শুভেন্দু'দার কাছে, সেদিন সারাদিনই নাকি কল্লোল'দার সাথে বাংলাদেশ হাই কমিশনে ছিলেন তিনিদৃক ইন্ডিয়ার ডিরেক্টর শুভেন্দু চ্যাটার্জীও কল্লোল'দার পুরোনো বন্ধু ও প্রাক্তন নকশালকল্লোল'দার সাথে এর আগে আমার শুধু ফোনে কথা হয়েছে, দেখা হয়নিগুরুচন্ডা৯-তে কারাগার, বধ্যভূমি-র সুবাদে কল্লোল'দা আমার কাছে এক বিশাল আকারের মানুষ, যাঁর দিকে তাকাতে গেলে ঘাঁড় অনেকটা উঁচু করতে হয়, নিজেকে অনেক অনেক ছোট দেখা যায় তাঁর সামনেসেই কল্লোল'দাও সেদিনই ঢাকা যাচ্ছেন, যেদিন আমি যাচ্ছি, শুনে কিরকম একটা মিশ্র অনুভূতি হলপরদিন দুপুরে ঢাকা পৌঁছেই আমি সোজা শুদ্ধস্বরে, প্রকাশকের অফিসে, সুমেরু সকাল থেকে এয়ারপোর্টে বসে ছিল বলে জরুরী মিটিংকে ঠেলে ঠেলে সন্ধেয় নিয়ে ফেলেছিল, সেই মিটিং সারতে সে গেল তার অফিসে, দৃকে সাগর আমাকে আজিজ মার্কেটে, প্রকাশকের অফিসে পৌঁছে দিয়ে চলে গেছে ছবির হাটে, সেখানে তখন ঘুড়ি উৎসবের প্রস্তুতিপর্ব চলছেসন্ধেয় বন্ধুবর মাহবুব লীলেনের সাথে বইমেলাআমার প্রথম বইমেলা ঢাকায়, প্রথম একুশে বইমেলা ঘুরে-ফিরে-দেখে একরাশ উত্তেজনা আর আনন্দে মাতাল হয়ে আবার লীলেনের সাথেই হাঁটতে হাঁটতে ছবির হাট, সেখানে সাগর অপেক্ষা করছে, আমাকে পাঠশালায় পৌঁছে দেবে বলে

আলাপ হল ওয়েনের সাথেফরাসী যুবক, কী একটা কাজে বেশ কয়েকমাসের জন্যে ঢাকায় আছেসাগর ওয়েনের সঙ্গে এক অক্ষরও ইংরাজী বলে না আর ওয়েন? কতটা বোঝে না বোঝে আল্লাহ মালুম কিন্তু কথা যেটুকু বলে সাগরের সঙ্গে, বাংলাতেই বলেএক রিকশায় তিনজন, আমি-সাগর-ওয়েনগন্তব্য ষ্টার কাবাবসুমেরুর ফোন নট রিচেবলপরোটা কাবাব, চিকেন তন্দুরি আর বোরহানীসুমেরু ফোনে জানায়, কল্লোল'দা আর কৃষ্ঞা বৌদি পাঠশালার দরজায় অপেক্ষা করছেন সন্ধে থেকেআবার এক রিকশায় তিনজন, এবার সাথে পরোটা আর কাবাবের প্যাকেট

কল্লোল'দার সাথে দেখা হওয়ার পর একবারের জন্যেও মনে হয়নি যে এই মানুষটাকে আমি আগে কখনও দেখিনি বা ওঁর কথা ভাবলে আমার এক ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধাবোধ কাজ করতআমি রান্নাঘরে খাবার গরম করার মাঝেই গিটার খুলে কল্লোল'দার গান শুরু হয়ে যায়, উঁকি দিয়ে দেখি, ছোট্ট টেপরেকর্ডার অন করে গালে হাত দিয়ে ওয়েন চুপ করে বসে আছে,গান শুনছে একমনে আর চোখ বন্ধ করে সাগর শুধু হাতের ম্যাচবক্স দিয়ে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে গিটারের সঙ্গেটেলিফোনের ওধার থেকে কল্লোল'দা আমাকে একদিন গান শুনিয়েছিলেন মাঝরাতে, আর কল্লোল'দার ছবি দেখেছিলাম দময়ন্তীর দেওয়া ওয়েব অ্যালবামের পাতায়, আর সামনে ছিল কল্লোল'দার লিখে যাওয়া নকশাল অন্দোলনের কথা, সেই কারাগার, বধ্যভূমি ... সে'রাতে গান চলে রাত একটা অব্দিচার ঘন্টার ঐ ঘরোয়া আসরের সবটুকু তোলা থাকে ওয়েনের ছোট্ট কিন্তু শক্তিশালী ডিজিটাল টেপরেকর্ডারেকল্লোল'দার গান, গানের পেছনের কথা, মাঝে মাঝে আমাদের কিছু কথা, সব, সব তোলা থাকে ওয়েনের সেই রেকর্ডারেযেটুকু জায়্গা সাগরের মোবাইল ফোনের মেমরি কার্ডে ছিল, সবটুকু জায়গা জুড়ে নেয় কল্লোল'দার গান

আটদিন কল্লোল'দা আর বৌদি ঢাকায় ছিলেনযেখানেই গেছেন সার্বক্ষণিক সঙ্গী গিটারটির খাপ খুলে গান শুনিয়েছেন সকলকে, কখনও সেটা রেহনুমার বাড়িতে, কখনও ছবির হাটে, কখনও আজিজে মার্কেটের নিচতলায় কাকা'র সিডি-ক্যাসেটের দোকানে তো কখনও অচেনা বন্ধু হাসান মোরশেদের বই প্রকাশের উৎসবে, একুশের বইমেলায়কখনও বা রাতভর গান চলেছে পাঠশালার ঘরে-সাগরের বাড়ির হলঘরেআর তার অসাধারণ মায়াময় ব্যাক্তিত্বের জোরে ভিনসুরে সারাজীবনের তরে বেঁধে এসেছেন কিছু মানুষকে


এ থাকার সাথী যত, আসে যায় অবিরত
তুমি যাবে তোমার মত, সঙ্গে নেবে কারে।।
আমার ডাক পড়ে না ত, আমায় নিতে ডাকছি কত
ভবা পাগলার মনের মত, সঙ্গে নিতে পারে।। -ভবা পাগলা


এয়ারপোর্টসুমেরু, মাসুদ, কাঁকনকে বিদায় জানিয়ে আমি ভেতরে ঢুকে যাইওরা বাইরে অপেক্ষা করে, আমি বোর্ডিং পাস পেয়ে গেলে তবে যাবেবিমানের কাউন্টার বন্ধ দেখে খটকা লাগে, দু'টোয় ফ্লাইট, এখনও কাউন্টার বন্ধ, বেলা তো সোয়া বারোটা! একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, বেলা দুটোয় তো বিমানের আজকে কোনো ফ্লাইট নেই! রিতিমতো ভয় পেয়ে গিয়ে টিকিট দেখাতে তিনি সেটি নিয়ে কম্প্যুটারে দেখে জানালেন, সে ফ্লাইট ক্যানসেল হয়েছে, আপনি কাস্টমার কেয়ারে গিয়ে খোঁজ নিন! ফোনে বাইরে অপেক্ষারত সুমেরুকে জানালাম, ঘাপলা আছে, ফ্লাইট বাতিল অপেক্ষা করো! কাস্টমার কেয়ারের ভাদ্রলোকটি কম্প্যু ঘেঁটে-ঘুটে বললেন, জেট-এ ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, ফ্লাইট বিকেলে, চারটে বেজে দশ মিনিটে ধুকপুকুনি খানিক কমলো এটা শুনে যে, বিকেলে হলেও যেতে তো পারছি, কারণ আমার ভিসার মেয়াদ সেদিনই শেষবিমানের বাতিল হয়ে যাওয়া উড়ানের আরো কিছু যাত্রী ততক্ষণে পৌঁছেছেন কাস্টমার কেয়ারে, রিতিমতো চেঁচামেচি করতে করতেফোন করে যাত্রীদের কেন ইনফর্ম করা হয় না? আমি ছুটির ছাড়পত্র হাতে মালপত্র সমেত ট্রলি ঠেলে আবার বাইরে

তারপর যেতে যেতে
ফিরে ফিরে দেখেছিলাম
তবু অসীম শূণ্যতা ছাড়া
আমি আর কিছুই দেখিনি
দিগন্ত ধূসর কুয়াশা চারিধারে। - মাসুদ

কোথাও একটা বেড়াতে যাওয়া যাক! কোথায়? আশুলিয়া যাওয়া যেতে পারেগাড়ি এগোয় আশুলিয়ার দিকেকাঁকন আবার গান গায়এবার গানে আর আমার মন ঢোকে নাভালো লাগে নাচুপ করে থাকিসরু ফিতের মত নদী দেখা যায় দূরে, মাঝে ফসলের মাঠ সবুজে সবুজ, মাঝে মাঝে বোর্ডে লেখা অমুক ইউনিভার্সিটি তমুক হাসপাতালছোট ছোট নৌকো, দূর থেকে খেলনার মত দেখায়বাঁদিকে রাস্তা থেকে বেশ নিচু জমিতে দেখা গেল একদল লোকগাড়ি থামিয়ে ভাল করে তাকিয়ে বোঝা গেল, মিউজিক ভিডিওর শ্যুটিং হচ্চেক্যামেরা, পরিচালক, অ্যাসিস্ট্যান্ট, একদল ছেলে, স্থুলকায়া হিরোইন আর শ্যুটিং দেখতে ভিড় জমানো কিছু গ্রামের মানুষআমার সঙ্গীরা প্রবল উৎসাহে শ্যুটিং দেখতে ব্যস্ত হনকোনো কোন শট ওকে হয়, তো কোনো কোনো শট বারবার রিটেক করা হয়একটি ছেলে, বোধ হয় হিরো, বারে বারেই হিরোইনকে কোলে তুলে নেয়, শট ওকে হয় না, উদ্দাম বাজনা শোনা যায়, ঠা ঠা রোদ্দুরে একদল ছেলে বারে বারেই একই শট দেয় আর বেচারা হিরো, স্থুলাঙ্গী হিরোইনকে কোলে তুলে নাচতে গিয়ে প্রাণান্ত অবস্থা, বারে বারেই বেচারা ক্ষেতের আলে রাখা বোতল থেকে জল খায়

পাশেই দু-তিনটি জমি পেরিয়ে অন্য শ্যুটিং, অন্য গল্পসেখানে বাচ্চাদের একটা গানের উপর নাচের ভিডিওর শ্যুটিংবাচ্চা মেয়েটি বারে বারেই ভুল করে, তাল কেটে যায়রানিং কমেন্ট্রি দেয় সুমেরু, কাঁকনপ্রবল উৎসাহে কখনও বড়দের নাচের তো কখনও বাচ্চাটির নাচের শ্যুট নিয়েখানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে শ্যুটিং দেখে আমাদের ড্রাইভারঘড়ি বলে দেয়, এবার আমাদের ফেরা উচিৎরাস্তার ধারে সুরুচি'তে ডাল-ভাত-ভর্তাঅথচ আমার তো কলকাতার বাড়িতে এসে ভাত খাওয়ার কথা ছিল!

গাজীপুরে শ্যুটিংএর জায়গা দেখতে গিয়েছিল সাগর সেদিন ভোরবেলাতেইফেরার পথে এয়ারপোর্টে বুড়ি ছুঁয়ে যায় সেওআমি আবার ট্রলিতে জিনিসপত্তর চাপিয়ে এয়ারপোর্টের ভেতরে এবং সুমেরুরা আবারও অপেক্ষা করে বাইরে, এবার ঠিকঠাক মিটে যায় সবযাত্রীদের মধ্যে দেখতে পাই, বিমানের বাতিল হয়ে যাওয়া ফ্লাইটের যাত্রীরাও এই প্লেনে জায়গা পেয়ে গেছেন ক্ষোভ আপাতত শান্ত, টুকরো টুকরো ক্ষোভ ও আনন্দের বাংলাদেশ কিছুক্ষণের মধ্যেই কলকাতা পৌঁছে যাবে



-
শেষ-