Thursday, October 09, 2008

রোজনামচা -০২

লিখি না, লেখা হয় না
-------------------
রমযানের গোটা মাসটাই আমি ঝিমোই। পারতপক্ষে দিনের বেলায় বাইরে কোথাও যাই না। যেটুকু না করলেই নয় কাজও সেটুকুই করি। সন্ধেয় পরপর দু কাপ চা খেয়ে মনে হয়, নাহ, এবার একটু নড়াচড়া করা যাক! তো খানিকটা চাঙ্গা হয়ে নিয়ে আমি ব্যায়ামাগারে যাই। যদিও প্রতিদিনই সকাল থেকেই মনে মনে ঠিক করা থাকে, আজকে আমি কিছুতেই যাব না, কিন্তু সন্ধের পর মনে হয়, যাই, ঘুরেই আসি এবং আমি ঘুরে আসি। ক্লান্তির একটা ভোঁতা অনুভূতি ঘিরে রাখে আমাকে। মাথা কাজ করে না। এক মগ চা নিয়ে এসে টেলিভিশনে বিগ বস চালিয়ে দিয়ে বিছানায় এসে বসি। ধীরে ধীরে চা খাই। চোখ বুজে বুজে বিগ বস দেখি। লিখবো বলে সমস্ত ওয়েব পাতা থেকে নিজেকে ছুটি দিয়ে রেখেছি বেশ কিছুদিন হল কিন্তু লেখা কিছুতেই এগুচ্ছে না। এই এগুচ্ছে না বলাটা নিজের কাছেই বেশ একটা বাহানা বা বিলাসিতা বলে ঠেকে কিন্তু এগুচ্ছে যে না এটা ঘটনা। 
সকালবেলায় বেশ একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠি বলে রাতে ঘুম আসতে দেরী হয়। দেরী করে ঘুমুতে যাওয়াটা যদিও অভ্যেসে দাঁড়িয়েছে কিন্তু এখন রাত প্রায় ভোর হয়ে যায় ঘুম আসতেই। ভদ্রলোকটি বলেন, ঘুম আসছে না এ তো খুব আনন্দের কথা, ওঠো, বসে লেখো! আমি সেটাও পারি না। টেলিফোনের বিল, ইলেকট্রিকে বিলেরা আমার চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়। কবে যেন লাষ্ট ডেট? ওহ, কালকেই তো! মিক্সিটা সারাতে হবে, আদা বাটতে গিয়ে বিনা নোটিশে চুপ করে গেছে জিনিসটা। দরজার তালাটা এখনো ঠিক হল না। মিস্ত্রী ব্যাটা কবে যে আসবে কে জানে!
বাবা তুমি কেমন আছ?
-------------------
বাবার কথা খুব খুব মনে পড়ে। রমযানের পয়লা শুক্কুরবার দুপুরে বাবার ফোন আসে, কেমন আছ এমু? আজকে সবাই বাড়িতে এসেছে, তুমিই শুধু নেই, তোমার কথা খুব মনে পড়ছে। কিছু বলতে পারি না। চোখ ভিজে আসে। শোরগোলের শব্দ শুনতে পাই। ভাইয়ের বাচ্চাদের কলকাকলি ফোনের এপারেও শুনতে পাই। বাবা বলেন, তোমার মা রান্নাঘরে, কাবাব বানাচ্ছে আজ বড়বৌকে সাথে নিয়ে। মন চলে যায় পেছনে, অনেক পেছনে। একসময় মায়ের সাথে এই কাজগুলো আমি করতাম। নালিশ জানান বাবা, বলেন, তোমার জন্মদিনের কেক 'নুন' আমাকে খাওয়ায়নি! নুন, আমার ভাইয়া। বাবাকে বলি, ওকে বলে দেবেন, ওর খবর আমি এসে নেব। ওদিক থেকে ভাইয়া বলে, তুই এলে তবে কেক হবে, নইলে তোর কেক কে কাটবে! বাবা বলেন, পারলে তাড়াতাড়ি বাড়ি এসো! বুজে আসা গলায় বাবাকে জিজ্ঞেস করা হয় না, বাবা তুমি কেমন আছ? 
এবছর জন্মদিনে দুপুর অব্দি বাবা বা মায়ের ফোনে না আসাতে বাবাকে এসএমএস করি, যেমনটি গতবছর বাবা করেছিলেন তাঁর নিজের জন্মদিনে আমার ফোন না পেয়ে, নিড ওয়ান বার্থডে কেক, চানাচুর এন্ড আ পেয়ার অফ হিলশা ফিশ! খানিক বাদেই বাবার ফোন আসে, জানতে পারি ভাইয়ের সদ্যোজাত শিশুপুত্রটি নিমোনিয়ায় আক্রান্ত, হাসপাতালে আছে, অক্সিজেন চলছে, সকলেই হাসপাতালে। বাবা বলেন, ভুলেই গেছিলাম তোমার জন্মদিন! তোমার মা'কে বলছি, রাতে রান্না টান্না করতে। ভাইয়ার উপর হুকুম হয়, কেক নিয়ে আসতে। সেদিন ভাইয়াও ব্যস্ত থাকায় সন্ধেবেলায় কেক আসেনি আর বাবা সেটা ভোলেননি এখনও। নির্ঘুম রাতে বাবাকে খুব মনে পড়ে। 
কেন কে জানে আমি বাবাকেই বেশি ভালবাসি। স্মৃতিতে, ভাবনায় বাবাই বেশি থাকেন। মা'য়ের থেকে বাবা অনেক অনেক বেশি কাছের মানুষ আমার। সুখ-দু:খ-ক্ষোভ-অভিমান -আব্দার সবই বরাবর বাবার কাছে। ছেলেবেলার স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল, দুপুর বেলার সেই চড়ুই পাখির গল্প বলতে বলতে বাবার ঘুমিয়ে পড়া। বাবার সঙ্গে আমিও অফিস যাব বলে রোজকার সেই বায়না। ছুটির দিনে বাবার সাথে গাড়ি করে কখনও তামাবিল, কখনও জাফলং তো কখনও গ্রামের বাড়িতে বেড়ানোর সেই দৃশ্য আজও অমলিন। কত কত বছর পেরিয়ে গেছে কিন্তু এখনও দেখতে পাই ঈদের আগের রাতে বাবার সাথে গিয়ে কিনে আনা লাল -সাদা রঙের হিলজুতো আর ফ্রিল দেওয়া টকটকে লাল ফ্রক। লাল বাবার প্রিয় রং! প্রতিবছরই ঈদে লাল জামা কেনা হয় বলে মায়ের মৃদু অনুযোগ। ঈদ এলে আমি ভীষণ ভীষণ মিস করি আমার সেই লাল জামাগুলো আর হিলজুতোকে।

চাই নতুন ধর্ম
------------
এ'বছর রোযার আগে আমার পতিদেবের সঙ্গে একটু বাক্যবিনিময় হয় রোযা রাখা নিয়ে। রোযা কেন রাখব? আমার যুক্তি যাই হোক না কেন নিমেষেই তিনি সেটা খন্ডন করে দেন। আমার জ্ঞান-গম্যি বড় কম বলে আমি তার সাথে কখনও তর্কে যাই না বিশেষ করে তিনি যদি তরলে থাকেন। তিনিও জানেন, সারা বছর ধম্মো-কম্মের ধারে কাছে আমি না থাকলেও এই একটা মাস রোযা আমি করবই কাজেই তিনিও চুপ করে যান। কিছুদিন আগে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ধর্মে কি আছে? একটা নতুন ধর্ম বানাতে গেলে কী কী লাগে? আকবর একটা ধর্ম প্রচার করেছিলেন না? সেই ধর্মের মূল ফান্ডা কি ছিল? আমার উপরে ফরমান জারী হয়, গুগলাও, লোকজনেরে জিগাও আর আমাকে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও। প্রশ্নগুলো কাওকে করা হয়নি আর এনিয়ে সে'ও পরে আর কথা বাড়ায়নি।

মোকামের সালাম
--------------
খবরের কাগজে বিজ্ঞাপণ দেখে সন্ধেবেলায় কোনমতে রোযাটা খুলে দৌঁড়াই, জ্ঞান মঞ্চের দিকে, 'মোকাম'এর লাইভ প্রোগ্রাম দেখতে। প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার কথা সাড়ে ছ'টায়, দশ মিনিটে ইফতার-চা সেরে বেরুতে বেরুতেই আমার ছ'টা দশ বেজে যায়। হলে পৌঁছুই পৌণে সাতটায়। আগের দিন পয়তাল্লিশ পাউন্ডের বার্বেল নিয়ে ডেড লিফট করতে গিয়ে খট করে লাগে শিরদাঁড়ায়। ফোনে ডাক্তার ফতোয়া দেন, কমপ্লিট রেষ্টএর। গরম সেঁক, ব্যথার ওষুধ সমানে চলছে। আমি ব্যথাকে একরকম অগ্রাহ্য করেই গান শুনতে যাই। পিঠ সোজা করে চেয়ারে বসে থাকি। বেশ খানিকটা হতাশ হই মঞ্চে কালিকাপ্রসাদ'কে দেখতে না পেয়ে। পাশে বসে থাকা আমার ভদ্রলোকটিকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, কালিকাপ্রসাদ এখন আর মোকামে গান করেন না। মঞ্চে গান করে ময়ূখ, মৈনাক। নতুন পুরোনো গান মিলিয়ে বেশ অনেকগুলো গান শোনায় তারা। পুরনো গানগুলো খুব একটা ভাল লাগল না কাল। প্রধান গায়ক কালিকাপ্রসাদের জায়গায় দাঁড়িয়ে গান শোনায় ময়ূখ। জমে না। হাততালি পড়ে। একের পর এক গান গায় ওরা। ওদেরই এক সঙ্গী ভায়োলিন হাতে মাঝে মাঝেই মঞ্চের সামনের দিকে এগিয়ে আসছিলেন আর অসাধারণ ভায়োলিন বাজাচ্ছিলেন তিনি। গান, অন্যান্য বাজনা সব ফিকে লাগে তার ভায়োলিনের কাছে। 

অন্ধকারে হঠাৎ দেখতে পাই সামনের রোয়ের ফাঁকা চেয়ারে এসে এক ভদ্রলোক বসলেন একটি শিশুর হাত ধরে। চেনা চেনা লাগছে না? হ্যাঁ। চিনি তো! কিছুদিনে আগে ওনার গান শুনেছিলাম এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে। 

কালিকাপ্রসাদের সাথে সেদিন ইনি ছিলেন অন্যতম গায়ক। নামটাও মনে পড়ে গেল সাথে সাথে, শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার। মনে থাকার বিশেষ কারণ, ফেব্রুয়ারী মাসের সেই অনুষ্ঠানে উনি একুশে ফেব্রুয়ারী নিয়ে অনেক কিছু বলেছিলেন, তার বাংলাদেশ সফর, সিলেট, ঢাকার একুশে ফেব্রুয়ারীর নানা অনুষ্ঠান, গান নিয়ে সেদিন তিনি ও কালিকাপ্রসাদ অনেক কথা বলেছিলেন, অনেক গান শুনিয়েছিলেন। সেদিন তাঁর গান আর কথা শুনতে শুনতে আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল বারে বারে। আমার মনে হচ্ছিল আমি কলকাতায় নেই, আছি বাংলাদেশেই, ঢাকাতেই। হাজির আছি একুশে ফেব্রুয়ারীর এক অনুষ্ঠানে, শুনছি গান, কবিতা। সেদিন কালিকাপ্রসাদ আর শুভপ্রসাদ দু'জনে মিলে কলকাতার এক আর্ট গ্যালারীর এক ঘরোয়া গানের আসরে হাজির করেছিলেন বাংলাদেশকে। আমার দেশকে। গান শেষে আমি যেচে গিয়ে তাঁর সাথে আলাপ করেছিলাম। কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম ও‌ই অনুষ্ঠানের জন্যে। অন্ধকার হলঘরে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতে গিয়ে আমাকে দেখে চিনতে পারলেন। আমি কথা বললাম গানের বিরতিতে। এই মানুষটাকে আমি চিনি না, জানি না। শুধু একদিন তাঁর গান শুনেছিলাম। তিনি বাংলাদেশী নন তবু তাঁকে আমার দেশের মানুষ বলে মনে হয়েছিল। এক আত্মীয়তা অনুভব করেছিলাম । তাঁকে দেখে কালকে আমার মন ভরে গেল।
... ... ...

3 comments:

  1. অনেকদিন লেখাটেখা পাচ্ছিনা দিদি তোমার।
    সময় পেলে লেখা দিও। পড়তে মন চাইছা খুব।
    কেমন আছ ?
    ভাল থেকো সবসময়।

    ReplyDelete
  2. "তিনি বাংলাদেশী নন তবু তাঁকে আমার দেশের মানুষ বলে মনে হয়েছিল। এক আত্মীয়তা অনুভব করেছিলাম ।"

    — বাংলাদেশ, পূর্ব-পশ্চিম সহ বাংলা দেশ, বাংলা ভাষা, কোনটাকে আত্মীয় মনে করেন আপনি? এ তো বড়ই সরল সমীকরণ করে ফেললেন দেখছি!

    ReplyDelete
  3. toxoid_toxaemia ,
    একটু ব্যস্ত আছি, হাতের কাজটা শেষ হলেই আবার হাজির হব। একটা ছোট্ট লেখা, শুধু তোমার জন্যে ঃ-))

    ReplyDelete