Friday, July 18, 2008

যেদিন আমি স্বাধীন হলাম

কিছুদিন ধরে প্রতি রবিবার আনন্দবজার পত্রিকার রবিবাসরীয়তে একটা বিজ্ঞাপণ দিচ্ছে, "যেদিন আমি স্বাধীন হলাম" বিষয়ে লেখা আহ্বান করে। লাইনটা যখনই আমি দেখি, নিজেকেই প্রশ্ন করি, যেদিন আমি স্বাধীন হলাম? আসলেই কী কেউ কখনো স্বাধীন হতে পারে বা পেরেছে? কি জানি! আবার মনে হয়, কেন নয়? নিশ্চয়ই মানুষ স্বাধীন হতে পারে। স্বাধীন দেশের নাগরিক আমরা, আমরা তো স্বাধীনই। আর যে দেশে বাস করি সেও তো স্বাধীন। তবে? মাথার ভেতর পোকা কিলবিল করে। স্বাধীন? যেদিন আমি স্বাধীন হলাম?

আজ কোনমতেই রবিবার নয়। কিন্তু সকাল থেকেই ও‌ই লাইনটা কিছুতেই মাথা থেকে নামছে না। দিন তারিখ আমার কখনোই খেয়াল থাকে না। আজ ব্যাঙ্কে গিয়ে জমার স্লিপে তারিখ লিখতে গিয়ে সেলফোনে তারিখ দেখে নিয়ে কনফার্ম হয়ে লিখতে গিয়ে খচ করে উঠল ভেতরটা, ১৭ই জুলাই? আজ ১৭ই জুলাই! নাহ..ভালো লাগছে না।

খুঁচ খাচ কাজ মিটিয়ে আমি যোগাসনের ক্লাসে যাই। শতেক বছরেরও বেশি পুরনো বাড়িটার দোতলার খুপরি খুপরি ঘরে ট্রেনাররা আসন করান। আরেক খুপরি ঘরে স্যার বসেন। সামনের বড় হলঘরটায় মেডিটেশনের ক্লাশ হয়। স্যার নিজে সেই ক্লাশ নেন। তার আগে প্রত্যেকের সাথেই স্যারের খুপরি ঘরে বার্তালাপ হয়। শরীর কেমন? বিপি এত লো কেন? ঘাড়ের ব্যথাটা কমছে না? বালিশে শোবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার সাথে এইসব গতবাঁধা কথাবার্তা ছাড়াও স্যারের কথা হয়। পদ্মার ইলিশ, বাংলাদেশ, ইসলাম, লেখালেখি ও আরও নানা বিষয়ে। স্যারের অনেক প্রশ্ন থাকে। আমি যেটুকু পারি উত্তর দিই। না পারলে বলি স্যার, আপনি আমার ওজন কমার দিকে নজর দিন! আজকে আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করি, 'স্যার যেদিন আমি স্বাধীন হলাম' বিষয়ে দু-চার কথা বলেন তো! 'শ' উচ্চারণে আমার নাম উচ্চারন করেন বরাবর তিনি। জোরে হেসে উঠে বললেন, কেন বলুন তো শামরান? আজকে হঠাৎ স্বাধীনতার কথা কেন? তারপর বললেন, নিজেই ভেবে দেখুন না আপনি কতখানি স্বাধীন! ধেত্তেরি! মুখে কিছুই বলি না, নিচতলায় চলে আসি, যেখানে পাবলিক ডিমান্ডে তৈরি হয়েছে ছোটখাটো এক আধুনিক জিমন্যাশিয়াম।

যোগা সেন্টারের এই জিমে খুব কম লোকেই আসেন কারন বেশিরভাগ মানুষই এখানে বয়স্ক আর তাঁরা যোগাসনের পক্ষপাতি কাজেই তাঁরা সব দোতলার খুপরি ঘরে আসন করেন। অল্পবয়েসী কিছু ছেলেমেয়ে আর আমার মত কয়েকজনের নাছোড় চাহিদায় তিতিবিরক্ত হয়ে শেষপর্যন্ত স্যারকে একতলায় বসাতেই হয়েছে কিছু যন্ট্রপাতি। ট্রেডমিল, ক্রস ট্রেনার আর আর্ক ট্রেনার। আমি আজ সব ক'টাতেই প্রবল স্পীডে ছুটি। ভুলে যাই পায়ের ব্যথা। ভুলে যাই আমার কার্ডিও প্রোগ্রাম চল্লিশ মিনিটের বেশি নয়। ঝরঝর করে ঘাম ঝরে শরীর থেকে, মাথার চুল অব্দি চুপচুপে ভিজে। পা আর নিজের বশে নেই বুঝতে পেরে আমি মুখ হাত ধুয়ে আবার দোতলায়, মেডিটেশনের সময় হল। চোখ বন্ধ করে পদ্মাসনে বসে থাকি কিছুক্ষণ। সব ভাবনাগুলোকে সরিয়ে দিতে চাই মাথা থেকে। স্যার বলেন, নিজেকে ছেড়ে দিন, ছড়িয়ে দিন, মুক্ত করে দিন.. নীল আকাশ দেখতে পাচ্ছেন কী? আপনি এখন মুক্ত, স্বাধীন! দেখুন পাখিরা কেমন ঘুরে বেড়াচ্ছে স্বচ্ছ নীলাকাশে! ওরাও স্বাধীন, এই মুহুর্তে আপনি যেমন!
----
অনেককাল আগে শীতার্ত এক বিষন্ন সন্ধ্যায় নিতান্তই বালিকা এক মেয়ে পাশের এই বিদেশবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। নিজের বাড়ি, শহর এমনকি দেশও ছেড়েছিল সকলের ইচ্ছায়। বুকফাটা কান্না থমকে ছিল চোখের তারায়। খানিকটা বোধ হয় গড়িয়েও পড়েছিল। আমার ঠিক মনে নেই। নিজেকে সে আড়াল করতে চাইছিল পাশের মানুষটির থেকে, আশে পাশের সকল মানুষের থেকে। সেটুকু স্বাধীনতা কি সে পেয়েছিল সেদিন? কিছুটা আড়াল দিয়েছিল সোনালী জরিতে ঢাকা লাল কাশ্মিরী চাদরটি। আগের দিনেই তার কাকা তাকে এনে দিয়েছিল সেই চাদর। কাকা কি বুঝেছিল তার ছোট্ট সোনামনিটির খানিকটা আড়াল দরকার হবে? একটিও কথা না বলে কাকা শুধু চাদরটা গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিল। স্বজন ছাড়ার কষ্ট, বাড়ি, নিজের ঘর, নিজের দেশ ছাড়ার কষ্ট। টুকিটাকি কত না জিনিসপত্র সে ফেলে এসেছিল। সব সব জমাট বেঁধেছিল সেদিন ছোট্ট ও‌ই বুকে। খানিকটা কি বেজেছিল স্বাধীনতা হারানোর কষ্টও?

দিন যায় মাস যায় বছর যায়। স্বপ্নেরা সব কোথায় যেন দূরে উড়ে যায়, তুলোর মত। মেঘের মত। দূরে বহু দূরে।ধরা যায় না ছোঁয়া যায় না। এত দূরে। ছোট্ট একচিলতে ছাদে সে তার পৃথিবী সাজায়। ছোট্ট পুতুলটাকে নিয়ে সংসার সংসার খেলা করে সারা দিনমান। ছোট ছোট সব জিনিসপত্রে ঘর ভরে ওঠে। প্রতিদিন সূর্য ওঠে, ডোবে। রাত নামে। বারান্দার ওধারে নিমগাছটার ওপাশে মাঝে মাঝে চাঁদ দেখা যায়। নিমগাছের হাওয়া নাকি ভাল। কি ভাল আর কি মন্দ তা নিয়ে সে আর ভাবে না। চিন্তারাও কী পরাধীন হয়?

মাঝে মাঝে সে ময়দানে যায়। পড়শিনী বৌটিকে সঙ্গে নিয়ে। চুপচাপ বসে থাকে সবুজ ঘাসের উপর। ছোট্ট পুতুলটা খেলা করে পাশে। ছোট ছোট পায়ে টলমল টলমল করে ঘুরে বেড়ায়। নিস্পাপ প্রাণখোলা হাসিতে মুখ ভরে থাকে পুতুলের। মুক্ত বাতাস বুক ভরে নেয় বালিকা সেই মেয়েটি। এক টুকরো স্বাধীনতা ঘুরে বেড়ায় বালিকা সেই মেয়েটির আশে পাশে, ময়দানের পুরনো বটগাছে আর খোলা আকাশ জুড়ে। দূরে ছেলেরা সব ফুটবল খেলে মাঠ জুড়ে। স্বাধীন।
----
আমি অনেকদিন ময়দানে যাই না। যেখানে থাকি সেখান থেকে ময়দান বেশ দূরে। ইচ্ছে করলে যাওয়া যায় না এমন নয়। যেতেই পারি। কিন্তু ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝেই আমার এই শহরটা ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। বরাবরের জন্যে নয় বা বেশিদিনের জন্যেও নয়। বহুকাল এক জায়গায় বাস করতে করতে সেই জায়গাটার জন্যেও কেমন মায়া পড়ে যায় না? একদমই প্রতিবেশী এই দেশের এই শহরটাকে এখন আমার নিজের বলেই মনে হয়। তবুও মাঝে মাঝেই এখান থেকে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ইচ্ছে করলেই কী সব সময় যাওয়া যায়! কত রকমের বাধ্য বাধকতা নিজের মধ্যেই থাকে। পরাধীনতা যে কত রকমের!

কী এক টপিক দিয়েছে, 'যেদিন আমি স্বাধীন হলাম!' সারাটা জীবন ধরেই তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে টুকরো টুকরো স্বাধীনতা আর তার সাথেই একেবারেই গায়ে গায়ে লেগে থাকে পরাধীনতাও। এভাবে কী বলা যায়, কোনদিন আমি স্বাধীন হলাম?

5 comments:

  1. আপনি ঠিকই বলেছেন- "সারাটা জীবন ধরেই তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে টুকরো টুকরো স্বাধীনতা আর তার সাথেই একেবারেই গায়ে গায়ে লেগে থাকে পরাধীনতাও।"
    সারাজীবন ধরে কুড়িয়ে পাওয়া এই স্বাধীনতাগুলো আসলে হঠাৎ করে পাওয়া। আর পরাধীনতাগুলোও কিন্তু বেশিরভাগ আমাদের নিজেদের তৈরি। আমরা নিজেরাই আসলে স্বাধীনতা ততটা পছন্দ করি না। কবি বলেছেন -"স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়"। কথাটা আমরা আসলে পছন্দ করি না। নিজেরাই নানা প্রয়োজনে বশ্যতা স্বীকার করি। বিকিয়ে দেই নিজের স্বাধীনতা।

    সুচিন্তিত পোস্টের জন্য ধন্যবাদ।

    ReplyDelete
  2. গল্পটা আবার পড়লাম।
    তবে এবার কিন্তু গল্পের মেয়ের সাথে তোমাকে গুলিয়ে ফেলিনি।
    আবারো ভাল লাগল তোমার প্রাণবন্ত লেখাটি।

    ReplyDelete
  3. toxoid_toxaemia ,
    এবার আর গল্পের মেয়েটার সাথে আমাকে গুলিয়ে ফেলোনি তো? গুড!

    নিজের নামটা বল ভাই, এই খটমট আংরেজী নাম বলতে গেলে দাঁত ভেঙ্গে যাওয়ার যগাড়!!

    ReplyDelete
  4. ধন্যবাদ অগ্নি।

    ReplyDelete
  5. Anonymous8:45 PM

    বন্দি চায় মুক্তি। মুক্ত চায় বন্ধন। পর+অধীন আর স্ব+অধীন, দুটোই অধীনতা। সপ্নরা ঊড়ে গেলে সপ্নরা ঊড়ে এসে জুড়ে বসে। বুদ্ধুরামের সব চাই। টক জ়াল মিষ্টি তিতা; জীবন নামক আচারটা ---

    ReplyDelete