Friday, July 11, 2008

সেদিনের কালবৈশাখী ঝড়ে উপড়ে পড়েছে কালো কালো ফলে ভরা জামগাছটি...

কলকাতা শহর থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে হলেও এই জায়গাটাকে কোনমতেই শহর বলা যাবে না। শহরতলী? তাও বোধ হয় না। একই উচ্চতার এই সব চারতলা নতুন ফ্ল্যাটবাড়িগুলোকে বাদ দিলে এ এক গ্রামই। অন্তত চারপাশের অসংখ্য গাছ, পুকুর আর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে ছড়িয়ে ছিল গ্রামেরই আবহ। মিনিট দশেক হেঁটে গেলে বাসষ্ট্যান্ড, যেখানে মিনিট পনের পরপর বাস আসে কলকাতা থেকে। যাত্রী নামিয়ে খানিকটা দাঁড়ায় ট্রাম কোম্পানীর বাস, একে একে কলকাতার যাত্রীরা সব বাসে ওঠার পরে বাস আবার বেরিয়ে যায় কলকাতার পথে। ট্যাক্সিষ্ট্যান্ডে সারসার দাঁড়িয়ে থাকে ট্যাক্সি, যদিও তারা আপনার পছন্দমত গন্ত্যব্যে যে যাবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। বিদ্যাসাগর সেতুর ফ্লাইওভার যেখানে শেষ হয়েছে বাস আর ট্যাক্সিষ্ট্যান্ডটা ঠিক সেখানেই। সেতু ধরে গঙ্গা পেরুলেই ওপারে প্রবল বেগে ছুঁটে চলা কলকাতা।অক্লান্ত।

পশ্চিমের জানলার ওধারে পাশাপাশি তিনখানি পুকুর। কবে কে কাটিয়েছিল কে জানে। অযত্নে পড়ে থাকা পুকুরের জল শ্যাওলায় সবুজ। জলে ভাসে পাশের ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে ছুঁড়ে ফেলা ময়লাভর্তি পলিব্যাগ, খালি মিনারেল ওয়াটারের বোতল আরও কত কি। কোনো পার বাঁধানো নয় এই সব পুকুরের। সহজে কেউ নামেও না ও‌ই সবুজ শ্যাওলা পড়া জলে। তবুও বস্তিবাসী কিছু দূরন্ত ছেলেপুলে দুপুরবেলায় এসে নামত ও‌ই জলে। দাঁপিয়ে স্নান করত পলি পড়া প্রায় মজা পুকুরের কোমরজলে। একটা পুকুরে বাস ছিল তিনটে পানকৌড়ির। মাঝে মাঝেই তারা উড়ে যেত এক পুকুর থেকে আরেক পুকুরে। কখনো বা পুকুরের গায়ে নুয়ে পড়া ছোট্ট এক জংলী গাছে বসে রোদ পোয়াত, ডানা ঝাপটে ঝাপটে গা থেকে ঝরিয়ে দিত জল। খানিক বসে থেকে দিক ঠিক করত, এবার কোন পুকুরে যাবে। তারপর উড়ে যেত সেদিকপানে আর ডুব দিত পুকুরের জলে। আসত কিছু হাঁসও। কোথা থেকে, কার বাড়ি থেকে আসত কে জানে। পুকুরে ভেসে বেড়াত তারা, জলকেলি করত। কখনো বা পারে উঠে বসে থাকত। মাঝে মাঝেই নিজেরা কথা বলত নিজেদের ভাষায়। আমি শুনতে পেতাম, কো্য্যাক কোয়্যাক। কি বলত? হয়তো নিজেরা বলবালি করত, এই পুকুরও আর কদ্দিন থাকবে কে জানে!

যেহেতু পুকুর, তা সে মজাই হোক আর ভরা, মাছ তো তাতে থাকবেই। কেউ ওখানে মাছের চাষ করুক বা নাই করুক। সেই মাছ ধরতে ছিপ হাতে বসে থাকত কিছু নাছোড়বান্দা টাইপ ছেলে। বলা বাহুল্য এরঅ বস্তিবাসী। ঠিক বস্তিবাসীও নয়। এদের বাস ফ্লাইওভারের তলায়, সরকারী জমির খানিকটা জায়গা পলিথিন দিয়ে ঘিরে নিয়ে এদের মা-বাবাদের সংসার। এদের মায়েরা কাজ করে ফ্ল্যাটবাড়িগুলোতে, ঠিকে ঝিয়ের কাজ। বাবারা কেউ রিকশা চালায় কেউ বা পুরনো কাগজ, ফেলে দেওয়া নানান জিনিসপত্র কুড়িয়ে বেড়ায়। হাতে লোটা আর সরু কঞ্চির ছিপ নিয়ে এরা বসে থাকে পুকুরধারে। কখনো বড়শীতে আটকায় ছোট্ট এক মাছ। হই হই করে ওঠে ছেলেটি। উল্লাস! এদিক ওদিক তাকিয়ে সাবধানী সতর্ক হাতে বের করে ছোট একটা বোতল, পাশে রাখা পলিব্যাগ থেকে। বেরোয় ছোট ছোট কাঁচের গেলাস। বোতল থেকে দেশী মদ গেলাসে ঢেলে এক চুমুকে খেয়ে নেয় মাছ ধরতে আসা ছোট্ট ছেলের দল, আবার মন দেয় জলে ভাসা ফাৎনার দিকে। খালি বোতলটি জায়গা পায় পাশের কচুবনে।

পুকুরের ধার ধরে গেছে সরু পীচরাস্তা, খানিকটা দূরে দূরে ল্যাম্পপোষ্ট, যাতে বিকেল থেকে জ্বলে টিমটিমে হলুদ মরা বাতি। সরকারী বাতি। রাস্তার উপর পরপর সব গেট। ফ্ল্যাটবাড়ির গেট। নতুন গজানো সব ফ্ল্যাটবাড়ি। আজকাল আর ব্যাঙের ছাতা গজায় না কোথাও। যেখানে ব্যাঙের ছাতারা গজাতো সেখানেই সব ফ্ল্যাটবাড়ি গজিয়েছে যে। যেখানে এসে বাসা বেঁধেছে ছিটকে পড়া মানুষেরা। পুরনো সব বাড়িতে একান্নবর্তী পরিবারে যারা একসাথে অভিন্ন হয়ে বাস করতো আর দশজনের সাথে। এখন সব নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। হাসব্যান্ড ওয়াইফ এন্ড দ্য ওনলি ওয়ান চাইল্ড। সেইসব ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে উড়ে আসা ময়লার ব্যাগেরা ভাসে শ্যাওলা ভর্তি পানাপুকুরে। মাঝে মাঝেই উড়ে এসে জলে পড়ে ববহৃত স্যানিটারি ন্যাপকিন দোতলা তিনতলার খুপরি জানলা থেকে। জলের রঙ খানিকটা বদলায়। তারপর আবার যে কে সেই। গাঢ় সবুজ।

সন্ধের পরে এখানে বড় একটা মানুষজন দেখা যায় না ও‌ই সরু রাস্তায়। নীরব নিস্তব্ধ হয়ে যায় রাত হতে না হতেই। ল্যাম্পপোষ্টের মরা আলোয় অন্ধকার যত না কাটে ছড়ায় তারচেয়ে বেশি। জংলা মাঠ, চেনা-অচেনা সব গাছে অন্ধকার ঘন হয়ে চেপে বসে থাকে। জোনাকপোকারা উড়ে বেড়ায় ঝিকিমিকি ঝিকিমিকি আলো জ্বালিয়ে। ঝিঁঝি পোকার একটানা ডেকে যাওয়ার শব্দ, গাছের পাতায় বাতাস বয়ে যায় সরসর সরসর। ফ্ল্যাটবাড়ির জানলায় জানলায় নানা রঙের আলো। নানা রকমের যান্ত্রিক আওয়াজ ভেসে আসে নীরব রাতে। কোথাও টেলিভিশনে খবর পড়া, কোথাও বা ধুম তারা রা রা নাচের ছমছম। এরই মাঝে রেডিওতে গান বাজে কার বাড়িতে যেন ... তোমায় গান শোনাবো...

তিনটে পুকুর ঠিক পাশাপাশি নয়। বাঁদিকে একটা পুকুর আর তারপরের দুটো পুকুর একটার পর একটা, লম্বালম্বি অবস্থানে। মাঝে খানিকটা করে খালি জায়গা। জঙ্গলমত। সরু লম্বা তালগাছ, নারকেল, সুপুরি আর খেজুর গাছ। আর আরও নানারকম গাছে ভার্তি ছিল জায়গাটা এই সেদিনও। জানলার ঠিক পাশেই ছিল বিশাল এক নাম না জানা গাছ। কমলা রঙের ফুল ফুটত তাতে। ফুলভর্তি কৃষ্ণচূড়া গাছের মতই লাগত সেটাকে। চেনা অচেনা কত পাখি যে আসত সেই গাছে। কিচির মিচির কিচির মিচির। দিনের বেলা ঘুমুনোর উপায় নেই! শুধু দিনের বেলা? মাঝরাত্তির থেকে শুরু হত তাদের কথোপকথন, আমি শুনতাম শুধু নানা রকমের কান ঝালাপালা করা কিচির মিচির। আর সেই কোকিল দুটো? তাদের কি সমস্যা ছিল কে জানে! একজন কুউ উ উ কুউ উ উ ডেকে চলত একটা নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে আর আরেকজন মাঝে মাঝে সাড়া দিত। শেষ জানুয়ারী থেকে নিয়ে একেবারে সেই জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত! আমার তো ওদের চেহারা পরিস্কার মনে আছে! কালো কুচকুচে চেহারায় ততধিক কালো গভীর দুটো চোখে কি যে মায়া! দক্ষিণের ও‌ই জামগাছটায় তাদের ডেরা ছিল এই মাসখানেক আগে পর্যন্ত। আর ওদের নজর থাকত পাশের তালগাছের কাকজুটির বাসার দিকে! চারতলার এই চিলে বারান্দার ঠিক পাশেই সমান উচ্চতার তালগাছটাতে ফলে থাকে অসংখ্য তাল। আর সেই তালের ছড়ার মাঝখানে কাঠি-কুটো যোগাড় করে প্রতিবছর বাসা বাঁধে কাক দম্পতি। যেন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যায় ডিমে বসে থাকা কাকিনীটিকে কিংবা একটা আলতো ছোঁয়া দিয়ে দেওয়া যায় ও‌ই নীলচে রঙের জোড়া ডিমে!

পুকুরের মাঝের খালি জায়গায় গজিয়ছিল কচুবন। ফ্ল্যাটবাড়িতে বসত করতে আসা ছোট্ট ছেলেটি টারই মত আরও কিছু ছেলেকে সাথে নিয়ে একদিন নেমে পড়ল ও‌ই কচুবনে। সে সেখানে ক্রীকেট খেলবে বন্ধুদের নিয়ে। তার যে খেলার জায়গা নেই, কোথায় সে মাঠ খুঁজতে যাবে? পরিস্কার হয়ে গেল কচুবন। নিজেরাই পরিস্কার করে দিল সব আগাছা। ছুটির দিনের সকাল বিকেল দু'বেলাই তারা ক্রীকেট খেলত নিজেদের বানানো এই ছোট্ট মাঠে। কিন্তু আজকের বাজারে এই চিলতে জমিটুকুরই বা দাম কম নাকি? খানিকটা করে দু'পাশের পুকুর বুজিয়ে দিলেই দিব্যি দাঁড়িয়ে যাবে একখানা চারতলা বিল্ডিং! লোক এল। লস্কর এল। এল মুটে মজুর। আর এল পুরোহিত। ঘটা করে ভূমিপুজো করে পাড়ার কেবলওয়ালা ওখানে খুঁটি পুঁতে দিয়ে গেল। ট্রাকে করে মাটি এল। বুজল আধখানা করে পুকুর। কাটা পড়ল কমলা ফুলে ঢেকে থাকা বিশাল সেই গাছ। ঘরছাড়া হল পাখিরা। ওরা বুঝতে পারছিল না কি হল। ওদের বাসার খোঁজে ওরা মাটিতে পরে থাকা গাছের আশে পাশেই ঘুরঘুর করল দিনকতক। কমলা রঙের ফুলগুলো সব ঝরে গেল গাছ থেকে। সবুজ পাতা প্রথমে হলুদ পরে বাদামী রঙের হয়ে এল। শুকিয়ে গিয়ে ঝরে পড়ল সব পাতারা গাছ থেকে। পানকৌড়িগুলো তখনও ছিল পুকুরে। ওরা মাঝে মাঝেই সেই পুকুরের গায়ে নুয়ে পড়া ছোট্ট গাছের ডালে উঠে গিয়ে বসে থাকত।

পশ্চিমের জানালাটা এখন আর খোলা যায় না। একের উপরের এক থাম দাঁড় করিয়ে চারতলা বিল্ডিং এখন আমার জানালার ওপাশে। এখন এখানে পাখির কলতান আর নেই। জানালা খুললে কোন গাছ কোন পুকুর আর দেখা যায় না। মিস্ত্রীদের ঠক ঠক ঠকাস শব্দ ছাড়া সারাদিন আর কোন শব্দ নেই। ঘরহারা পাখিরা, পুকুরের সেই পানকৌড়িগুলো কোথায় উড়ে গেছে কে জানে...এই বসন্তেও কোকিলেরা এসেছিল। দক্ষিণের জামগাছটিতে বাসাও বেঁধেছিল আর সেই একইভাবে কুউ উ উ, কুউ উ উ করে ডেকে ডেকে কানও ঝালাপালা করেছে তারা আমার। প্রতিদিন ভোররাতের সুখের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে ওরা এবারও বরাবরের মতই। পরের বছর থেকে ওরা আর এখানে আসবে না। সেদিনের কালবৈশাখী ঝড়ে উপড়ে পড়েছে কালো কালো ফলে ভরা জামগাছটি...

4 comments:

  1. তোমার এই লেখায় প্রথম মন্তব্য করার লোভ সামলাতে পারলাম না শ্যাজাদি। আজকে আমার ব্লগে গিয়েছিলে ! এখনো সেই ভাললাগার অনুভূতি মনে ভুরভুর করছে।
    সচলে একবার পড়েছি লেখাটি। ঢাকাতে বলো, কোলকাতা বলো সবখানেই এক অবস্থা। আমরা আমাদের বাসযোগ্য নগরীটার নানাভাবে বারোটা বাজানোর চিন্তায় বিভোর। সাথে তো অপরিকল্পিত নগরায়নের ভূত আছেই। কবে যে আমরা আসল মানুষ হতে পারব!!! একটু কম করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের কথা ভাবব !! নাকি এ শুধু কল্পনাতেই সম্ভব ?

    ReplyDelete
  2. অনেক ধন্যবাদ।

    তোমার ব্লগে গিয়েচিলাম, একটা কবিতাও পড়লাম। এবার থেকে নিয়মিত যাব।

    তুমি কি সচলে আছ? কি নামে?

    ReplyDelete
  3. সচলে যাই তোমাদের মতন জোস লেখকদের লেখা পড়বার জন্য। লিখতে তো তেমন পারিনা, তাই অতিথি হিসেবে মাঝে মাঝে মন্তব্য করি এইতো !

    ReplyDelete
  4. আপনার বর্ণনাশৈলীর গুণে আমি মুগ্ধ। সবকিছু যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। নাগরিক জীবনের এমন অনবদ্য বর্ণনা খুব কম পড়েছি। বাস্তবতা ও কল্পনার এমন মিশেল সকলের সাধ্য নয়।

    আপনাকে ধন্যবাদ।

    ReplyDelete