Tuesday, July 29, 2008

সে এক বৃষ্টিদিনের কথা


অনেক অনেক দিন পরে ভদ্রলোক একটু বাইরে গেলেন দিন চারেকের জন্যে। তিস্তা নামক কিছু একটা টেলি-প্রোগ্রামের টাইটেল শ্যুট করতে, নর্থ বেঙ্গল। নর্থ বেঙ্গল শুনলেই যদিও আমিও লাফিয়ে উঠছি আজকাল কিন্তু ইউনিটের সাথে যাওয়াটা পোষাবে না বলে কিছু না বলেই ব্যাগ-ফ্যাগ গুছিয়ে ভদ্রলোককে রওয়ানা করে দিই। এই বর্ষায় সাধারনত কোন পাগলেও নর্থ বেঙ্গল যায় না তাও আবার শ্যুটিংএর জন্যে কিন্তু এই লোকগুলো কখন যে কি করে তা এরা নিজেরাও বোধ হয় জানে না। আজ সারাদিন সে মালবাজারের একমাত্র হোটেলটিতে বন্দি, প্রচন্ড বৃষ্টিতে শ্যুট তো দূর অস্ত বাইরে বেরুনোর জো নেই। সেটা অবশ্য আমি ওকে যাওয়ার আগেই বলেছিলাম, কাজ কদ্দূর হবে না হবে জানি না, তবে তুমি বিশ্রাম পাবে কয়েকদিন!

ওর সাথে আমার প্রথম যেদিন দেখা হয়েছিল সেদিনও নাকি সে সকালবেলায় নর্থ বেঙ্গল থেকেই ফিরেছিল, আর সেও এই জুলাই মাসই ছিল! অবশ্য সেটা জুলাইয়ের প্রথম দিকের কথা। সেদিনও সারাদিন কলকাতায় অঝোর বৃষ্টি। কলকাতার হাঁটুজল ভেঙে আমি কোনমতে পৌঁছেছিলাম সল্টলেকে, সেখানে তখন কোমর জল। একটা আড্ডার আয়োজন ছিল, কিছু মজলিশী আড্ডাবাজের। এক বন্ধুর কল্যাণে আমিও নিমন্ত্রিত ছিলাম। আড্ডা তখন শেষের পথে, ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন ভিজে কাক হয়ে, হাতে একখানি ভাঁজ করা ছাতা, যার থেকে তখনও জল ঝরছে। তার চেহারা-সুরত দেখে দু-এক পিস ফিচেল তার নাম দিয়েছিল চেঙ্গিস খান। বলা বাহুল্য, আমিও সেই ফিচেলদের একজন। ব্যাঙ্গালোর থেকে আমাদের ছোট্ ভুত তাকে ফোন করে করে ঘুম থেকে তুলে পাঠিয়েছিল সেই আড্ডায়।

নামটা আমার পড়া ছিল মজলিশের পাতায়, লেখার মাথা-মুন্ডু কিছু খুঁজে পেতাম না বলে পড়ার চেষ্টাও করতাম না। আগ্রহভরে দেখছিলাম, দেখলাম, আমাদের মতই কথা বলে তো! কোন মানেবইএর দরকার নেই। দু এক কথার পরেই খেদ প্রকাশ করলেন, এইরকম বৃষ্টিদিনের আড্ডায় ইলিশ বিরিয়ানি নেই, সুরা নেই, এসব কী!! ফেরার পথে একটা ট্যাক্সিতে গাদাগাদি করে ছ'জন । একজন একজন করে নেমে যাবে রাস্তায়।

দিন পনের বাদে ঠিক ও‌ইরকমই ছোট করে একটা আড্ডার ব্যবস্থা আমার বাড়িতে, সে বোধ হয় মাঝ জুলাইয়ে। আমার কি মনে হল, তাকেও ডাকি , এলে আসবে! কিন্তু ফোন্নং নেই তো! ছোট ভুত আমার হয়ে তাকে দাওয়াৎ দিল, বলল, কাল আপুর বাড়িতে পৌঁছে যাও, আর এই নাও ফোন্নং! তো আগের দিন রাতেই ফোন এল। এই কয়েকদিন নাকি প্রবল খোঁজ চলেছে এই নম্বরের, কিন্তু কেউ দেয়নি!

পরদিন সকাল থেকেও বেশ কয়েক দফা ফোন এল। তিনি এলেন সকলের শেষে। তাকে দেখামাত্রই ফিচেলদের মুখ টিপে হাসাহাসি, গা টেপাটেপি। বুঝেছিল কিনা কে জানে তবে আমল যে দেয়নি সে ঠিক। সেদিনও আবার সেই একই অনুযোগ, সুরা নেই? ওফ!! তবে সুরাপানের নেমনতন্ন তার একটা ছিল সেদিন রাতেই তাই ভদ্রলোক খাওয়া একটু চেখে দেখলেন শুধু।

তারপর? তারপর আবার কি। তার আর পর নেই।

যাগ্গে...

আমি আজকে দুম করে এইসবই বা কেন লিখছি কে জানে!

আসলে মালবাজারের হোটেলঘর থেকে ফোন করে আজকে বেশ খানিকটা স্মৃতিচারণ হল। আমাদের সাধারনত যা হয় না।

Friday, July 18, 2008

যেদিন আমি স্বাধীন হলাম

কিছুদিন ধরে প্রতি রবিবার আনন্দবজার পত্রিকার রবিবাসরীয়তে একটা বিজ্ঞাপণ দিচ্ছে, "যেদিন আমি স্বাধীন হলাম" বিষয়ে লেখা আহ্বান করে। লাইনটা যখনই আমি দেখি, নিজেকেই প্রশ্ন করি, যেদিন আমি স্বাধীন হলাম? আসলেই কী কেউ কখনো স্বাধীন হতে পারে বা পেরেছে? কি জানি! আবার মনে হয়, কেন নয়? নিশ্চয়ই মানুষ স্বাধীন হতে পারে। স্বাধীন দেশের নাগরিক আমরা, আমরা তো স্বাধীনই। আর যে দেশে বাস করি সেও তো স্বাধীন। তবে? মাথার ভেতর পোকা কিলবিল করে। স্বাধীন? যেদিন আমি স্বাধীন হলাম?

আজ কোনমতেই রবিবার নয়। কিন্তু সকাল থেকেই ও‌ই লাইনটা কিছুতেই মাথা থেকে নামছে না। দিন তারিখ আমার কখনোই খেয়াল থাকে না। আজ ব্যাঙ্কে গিয়ে জমার স্লিপে তারিখ লিখতে গিয়ে সেলফোনে তারিখ দেখে নিয়ে কনফার্ম হয়ে লিখতে গিয়ে খচ করে উঠল ভেতরটা, ১৭ই জুলাই? আজ ১৭ই জুলাই! নাহ..ভালো লাগছে না।

খুঁচ খাচ কাজ মিটিয়ে আমি যোগাসনের ক্লাসে যাই। শতেক বছরেরও বেশি পুরনো বাড়িটার দোতলার খুপরি খুপরি ঘরে ট্রেনাররা আসন করান। আরেক খুপরি ঘরে স্যার বসেন। সামনের বড় হলঘরটায় মেডিটেশনের ক্লাশ হয়। স্যার নিজে সেই ক্লাশ নেন। তার আগে প্রত্যেকের সাথেই স্যারের খুপরি ঘরে বার্তালাপ হয়। শরীর কেমন? বিপি এত লো কেন? ঘাড়ের ব্যথাটা কমছে না? বালিশে শোবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার সাথে এইসব গতবাঁধা কথাবার্তা ছাড়াও স্যারের কথা হয়। পদ্মার ইলিশ, বাংলাদেশ, ইসলাম, লেখালেখি ও আরও নানা বিষয়ে। স্যারের অনেক প্রশ্ন থাকে। আমি যেটুকু পারি উত্তর দিই। না পারলে বলি স্যার, আপনি আমার ওজন কমার দিকে নজর দিন! আজকে আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করি, 'স্যার যেদিন আমি স্বাধীন হলাম' বিষয়ে দু-চার কথা বলেন তো! 'শ' উচ্চারণে আমার নাম উচ্চারন করেন বরাবর তিনি। জোরে হেসে উঠে বললেন, কেন বলুন তো শামরান? আজকে হঠাৎ স্বাধীনতার কথা কেন? তারপর বললেন, নিজেই ভেবে দেখুন না আপনি কতখানি স্বাধীন! ধেত্তেরি! মুখে কিছুই বলি না, নিচতলায় চলে আসি, যেখানে পাবলিক ডিমান্ডে তৈরি হয়েছে ছোটখাটো এক আধুনিক জিমন্যাশিয়াম।

যোগা সেন্টারের এই জিমে খুব কম লোকেই আসেন কারন বেশিরভাগ মানুষই এখানে বয়স্ক আর তাঁরা যোগাসনের পক্ষপাতি কাজেই তাঁরা সব দোতলার খুপরি ঘরে আসন করেন। অল্পবয়েসী কিছু ছেলেমেয়ে আর আমার মত কয়েকজনের নাছোড় চাহিদায় তিতিবিরক্ত হয়ে শেষপর্যন্ত স্যারকে একতলায় বসাতেই হয়েছে কিছু যন্ট্রপাতি। ট্রেডমিল, ক্রস ট্রেনার আর আর্ক ট্রেনার। আমি আজ সব ক'টাতেই প্রবল স্পীডে ছুটি। ভুলে যাই পায়ের ব্যথা। ভুলে যাই আমার কার্ডিও প্রোগ্রাম চল্লিশ মিনিটের বেশি নয়। ঝরঝর করে ঘাম ঝরে শরীর থেকে, মাথার চুল অব্দি চুপচুপে ভিজে। পা আর নিজের বশে নেই বুঝতে পেরে আমি মুখ হাত ধুয়ে আবার দোতলায়, মেডিটেশনের সময় হল। চোখ বন্ধ করে পদ্মাসনে বসে থাকি কিছুক্ষণ। সব ভাবনাগুলোকে সরিয়ে দিতে চাই মাথা থেকে। স্যার বলেন, নিজেকে ছেড়ে দিন, ছড়িয়ে দিন, মুক্ত করে দিন.. নীল আকাশ দেখতে পাচ্ছেন কী? আপনি এখন মুক্ত, স্বাধীন! দেখুন পাখিরা কেমন ঘুরে বেড়াচ্ছে স্বচ্ছ নীলাকাশে! ওরাও স্বাধীন, এই মুহুর্তে আপনি যেমন!
----
অনেককাল আগে শীতার্ত এক বিষন্ন সন্ধ্যায় নিতান্তই বালিকা এক মেয়ে পাশের এই বিদেশবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। নিজের বাড়ি, শহর এমনকি দেশও ছেড়েছিল সকলের ইচ্ছায়। বুকফাটা কান্না থমকে ছিল চোখের তারায়। খানিকটা বোধ হয় গড়িয়েও পড়েছিল। আমার ঠিক মনে নেই। নিজেকে সে আড়াল করতে চাইছিল পাশের মানুষটির থেকে, আশে পাশের সকল মানুষের থেকে। সেটুকু স্বাধীনতা কি সে পেয়েছিল সেদিন? কিছুটা আড়াল দিয়েছিল সোনালী জরিতে ঢাকা লাল কাশ্মিরী চাদরটি। আগের দিনেই তার কাকা তাকে এনে দিয়েছিল সেই চাদর। কাকা কি বুঝেছিল তার ছোট্ট সোনামনিটির খানিকটা আড়াল দরকার হবে? একটিও কথা না বলে কাকা শুধু চাদরটা গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিল। স্বজন ছাড়ার কষ্ট, বাড়ি, নিজের ঘর, নিজের দেশ ছাড়ার কষ্ট। টুকিটাকি কত না জিনিসপত্র সে ফেলে এসেছিল। সব সব জমাট বেঁধেছিল সেদিন ছোট্ট ও‌ই বুকে। খানিকটা কি বেজেছিল স্বাধীনতা হারানোর কষ্টও?

দিন যায় মাস যায় বছর যায়। স্বপ্নেরা সব কোথায় যেন দূরে উড়ে যায়, তুলোর মত। মেঘের মত। দূরে বহু দূরে।ধরা যায় না ছোঁয়া যায় না। এত দূরে। ছোট্ট একচিলতে ছাদে সে তার পৃথিবী সাজায়। ছোট্ট পুতুলটাকে নিয়ে সংসার সংসার খেলা করে সারা দিনমান। ছোট ছোট সব জিনিসপত্রে ঘর ভরে ওঠে। প্রতিদিন সূর্য ওঠে, ডোবে। রাত নামে। বারান্দার ওধারে নিমগাছটার ওপাশে মাঝে মাঝে চাঁদ দেখা যায়। নিমগাছের হাওয়া নাকি ভাল। কি ভাল আর কি মন্দ তা নিয়ে সে আর ভাবে না। চিন্তারাও কী পরাধীন হয়?

মাঝে মাঝে সে ময়দানে যায়। পড়শিনী বৌটিকে সঙ্গে নিয়ে। চুপচাপ বসে থাকে সবুজ ঘাসের উপর। ছোট্ট পুতুলটা খেলা করে পাশে। ছোট ছোট পায়ে টলমল টলমল করে ঘুরে বেড়ায়। নিস্পাপ প্রাণখোলা হাসিতে মুখ ভরে থাকে পুতুলের। মুক্ত বাতাস বুক ভরে নেয় বালিকা সেই মেয়েটি। এক টুকরো স্বাধীনতা ঘুরে বেড়ায় বালিকা সেই মেয়েটির আশে পাশে, ময়দানের পুরনো বটগাছে আর খোলা আকাশ জুড়ে। দূরে ছেলেরা সব ফুটবল খেলে মাঠ জুড়ে। স্বাধীন।
----
আমি অনেকদিন ময়দানে যাই না। যেখানে থাকি সেখান থেকে ময়দান বেশ দূরে। ইচ্ছে করলে যাওয়া যায় না এমন নয়। যেতেই পারি। কিন্তু ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝেই আমার এই শহরটা ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। বরাবরের জন্যে নয় বা বেশিদিনের জন্যেও নয়। বহুকাল এক জায়গায় বাস করতে করতে সেই জায়গাটার জন্যেও কেমন মায়া পড়ে যায় না? একদমই প্রতিবেশী এই দেশের এই শহরটাকে এখন আমার নিজের বলেই মনে হয়। তবুও মাঝে মাঝেই এখান থেকে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ইচ্ছে করলেই কী সব সময় যাওয়া যায়! কত রকমের বাধ্য বাধকতা নিজের মধ্যেই থাকে। পরাধীনতা যে কত রকমের!

কী এক টপিক দিয়েছে, 'যেদিন আমি স্বাধীন হলাম!' সারাটা জীবন ধরেই তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে টুকরো টুকরো স্বাধীনতা আর তার সাথেই একেবারেই গায়ে গায়ে লেগে থাকে পরাধীনতাও। এভাবে কী বলা যায়, কোনদিন আমি স্বাধীন হলাম?

Friday, July 11, 2008

সেদিনের কালবৈশাখী ঝড়ে উপড়ে পড়েছে কালো কালো ফলে ভরা জামগাছটি...

কলকাতা শহর থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে হলেও এই জায়গাটাকে কোনমতেই শহর বলা যাবে না। শহরতলী? তাও বোধ হয় না। একই উচ্চতার এই সব চারতলা নতুন ফ্ল্যাটবাড়িগুলোকে বাদ দিলে এ এক গ্রামই। অন্তত চারপাশের অসংখ্য গাছ, পুকুর আর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে ছড়িয়ে ছিল গ্রামেরই আবহ। মিনিট দশেক হেঁটে গেলে বাসষ্ট্যান্ড, যেখানে মিনিট পনের পরপর বাস আসে কলকাতা থেকে। যাত্রী নামিয়ে খানিকটা দাঁড়ায় ট্রাম কোম্পানীর বাস, একে একে কলকাতার যাত্রীরা সব বাসে ওঠার পরে বাস আবার বেরিয়ে যায় কলকাতার পথে। ট্যাক্সিষ্ট্যান্ডে সারসার দাঁড়িয়ে থাকে ট্যাক্সি, যদিও তারা আপনার পছন্দমত গন্ত্যব্যে যে যাবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। বিদ্যাসাগর সেতুর ফ্লাইওভার যেখানে শেষ হয়েছে বাস আর ট্যাক্সিষ্ট্যান্ডটা ঠিক সেখানেই। সেতু ধরে গঙ্গা পেরুলেই ওপারে প্রবল বেগে ছুঁটে চলা কলকাতা।অক্লান্ত।

পশ্চিমের জানলার ওধারে পাশাপাশি তিনখানি পুকুর। কবে কে কাটিয়েছিল কে জানে। অযত্নে পড়ে থাকা পুকুরের জল শ্যাওলায় সবুজ। জলে ভাসে পাশের ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে ছুঁড়ে ফেলা ময়লাভর্তি পলিব্যাগ, খালি মিনারেল ওয়াটারের বোতল আরও কত কি। কোনো পার বাঁধানো নয় এই সব পুকুরের। সহজে কেউ নামেও না ও‌ই সবুজ শ্যাওলা পড়া জলে। তবুও বস্তিবাসী কিছু দূরন্ত ছেলেপুলে দুপুরবেলায় এসে নামত ও‌ই জলে। দাঁপিয়ে স্নান করত পলি পড়া প্রায় মজা পুকুরের কোমরজলে। একটা পুকুরে বাস ছিল তিনটে পানকৌড়ির। মাঝে মাঝেই তারা উড়ে যেত এক পুকুর থেকে আরেক পুকুরে। কখনো বা পুকুরের গায়ে নুয়ে পড়া ছোট্ট এক জংলী গাছে বসে রোদ পোয়াত, ডানা ঝাপটে ঝাপটে গা থেকে ঝরিয়ে দিত জল। খানিক বসে থেকে দিক ঠিক করত, এবার কোন পুকুরে যাবে। তারপর উড়ে যেত সেদিকপানে আর ডুব দিত পুকুরের জলে। আসত কিছু হাঁসও। কোথা থেকে, কার বাড়ি থেকে আসত কে জানে। পুকুরে ভেসে বেড়াত তারা, জলকেলি করত। কখনো বা পারে উঠে বসে থাকত। মাঝে মাঝেই নিজেরা কথা বলত নিজেদের ভাষায়। আমি শুনতে পেতাম, কো্য্যাক কোয়্যাক। কি বলত? হয়তো নিজেরা বলবালি করত, এই পুকুরও আর কদ্দিন থাকবে কে জানে!

যেহেতু পুকুর, তা সে মজাই হোক আর ভরা, মাছ তো তাতে থাকবেই। কেউ ওখানে মাছের চাষ করুক বা নাই করুক। সেই মাছ ধরতে ছিপ হাতে বসে থাকত কিছু নাছোড়বান্দা টাইপ ছেলে। বলা বাহুল্য এরঅ বস্তিবাসী। ঠিক বস্তিবাসীও নয়। এদের বাস ফ্লাইওভারের তলায়, সরকারী জমির খানিকটা জায়গা পলিথিন দিয়ে ঘিরে নিয়ে এদের মা-বাবাদের সংসার। এদের মায়েরা কাজ করে ফ্ল্যাটবাড়িগুলোতে, ঠিকে ঝিয়ের কাজ। বাবারা কেউ রিকশা চালায় কেউ বা পুরনো কাগজ, ফেলে দেওয়া নানান জিনিসপত্র কুড়িয়ে বেড়ায়। হাতে লোটা আর সরু কঞ্চির ছিপ নিয়ে এরা বসে থাকে পুকুরধারে। কখনো বড়শীতে আটকায় ছোট্ট এক মাছ। হই হই করে ওঠে ছেলেটি। উল্লাস! এদিক ওদিক তাকিয়ে সাবধানী সতর্ক হাতে বের করে ছোট একটা বোতল, পাশে রাখা পলিব্যাগ থেকে। বেরোয় ছোট ছোট কাঁচের গেলাস। বোতল থেকে দেশী মদ গেলাসে ঢেলে এক চুমুকে খেয়ে নেয় মাছ ধরতে আসা ছোট্ট ছেলের দল, আবার মন দেয় জলে ভাসা ফাৎনার দিকে। খালি বোতলটি জায়গা পায় পাশের কচুবনে।

পুকুরের ধার ধরে গেছে সরু পীচরাস্তা, খানিকটা দূরে দূরে ল্যাম্পপোষ্ট, যাতে বিকেল থেকে জ্বলে টিমটিমে হলুদ মরা বাতি। সরকারী বাতি। রাস্তার উপর পরপর সব গেট। ফ্ল্যাটবাড়ির গেট। নতুন গজানো সব ফ্ল্যাটবাড়ি। আজকাল আর ব্যাঙের ছাতা গজায় না কোথাও। যেখানে ব্যাঙের ছাতারা গজাতো সেখানেই সব ফ্ল্যাটবাড়ি গজিয়েছে যে। যেখানে এসে বাসা বেঁধেছে ছিটকে পড়া মানুষেরা। পুরনো সব বাড়িতে একান্নবর্তী পরিবারে যারা একসাথে অভিন্ন হয়ে বাস করতো আর দশজনের সাথে। এখন সব নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। হাসব্যান্ড ওয়াইফ এন্ড দ্য ওনলি ওয়ান চাইল্ড। সেইসব ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে উড়ে আসা ময়লার ব্যাগেরা ভাসে শ্যাওলা ভর্তি পানাপুকুরে। মাঝে মাঝেই উড়ে এসে জলে পড়ে ববহৃত স্যানিটারি ন্যাপকিন দোতলা তিনতলার খুপরি জানলা থেকে। জলের রঙ খানিকটা বদলায়। তারপর আবার যে কে সেই। গাঢ় সবুজ।

সন্ধের পরে এখানে বড় একটা মানুষজন দেখা যায় না ও‌ই সরু রাস্তায়। নীরব নিস্তব্ধ হয়ে যায় রাত হতে না হতেই। ল্যাম্পপোষ্টের মরা আলোয় অন্ধকার যত না কাটে ছড়ায় তারচেয়ে বেশি। জংলা মাঠ, চেনা-অচেনা সব গাছে অন্ধকার ঘন হয়ে চেপে বসে থাকে। জোনাকপোকারা উড়ে বেড়ায় ঝিকিমিকি ঝিকিমিকি আলো জ্বালিয়ে। ঝিঁঝি পোকার একটানা ডেকে যাওয়ার শব্দ, গাছের পাতায় বাতাস বয়ে যায় সরসর সরসর। ফ্ল্যাটবাড়ির জানলায় জানলায় নানা রঙের আলো। নানা রকমের যান্ত্রিক আওয়াজ ভেসে আসে নীরব রাতে। কোথাও টেলিভিশনে খবর পড়া, কোথাও বা ধুম তারা রা রা নাচের ছমছম। এরই মাঝে রেডিওতে গান বাজে কার বাড়িতে যেন ... তোমায় গান শোনাবো...

তিনটে পুকুর ঠিক পাশাপাশি নয়। বাঁদিকে একটা পুকুর আর তারপরের দুটো পুকুর একটার পর একটা, লম্বালম্বি অবস্থানে। মাঝে খানিকটা করে খালি জায়গা। জঙ্গলমত। সরু লম্বা তালগাছ, নারকেল, সুপুরি আর খেজুর গাছ। আর আরও নানারকম গাছে ভার্তি ছিল জায়গাটা এই সেদিনও। জানলার ঠিক পাশেই ছিল বিশাল এক নাম না জানা গাছ। কমলা রঙের ফুল ফুটত তাতে। ফুলভর্তি কৃষ্ণচূড়া গাছের মতই লাগত সেটাকে। চেনা অচেনা কত পাখি যে আসত সেই গাছে। কিচির মিচির কিচির মিচির। দিনের বেলা ঘুমুনোর উপায় নেই! শুধু দিনের বেলা? মাঝরাত্তির থেকে শুরু হত তাদের কথোপকথন, আমি শুনতাম শুধু নানা রকমের কান ঝালাপালা করা কিচির মিচির। আর সেই কোকিল দুটো? তাদের কি সমস্যা ছিল কে জানে! একজন কুউ উ উ কুউ উ উ ডেকে চলত একটা নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে আর আরেকজন মাঝে মাঝে সাড়া দিত। শেষ জানুয়ারী থেকে নিয়ে একেবারে সেই জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত! আমার তো ওদের চেহারা পরিস্কার মনে আছে! কালো কুচকুচে চেহারায় ততধিক কালো গভীর দুটো চোখে কি যে মায়া! দক্ষিণের ও‌ই জামগাছটায় তাদের ডেরা ছিল এই মাসখানেক আগে পর্যন্ত। আর ওদের নজর থাকত পাশের তালগাছের কাকজুটির বাসার দিকে! চারতলার এই চিলে বারান্দার ঠিক পাশেই সমান উচ্চতার তালগাছটাতে ফলে থাকে অসংখ্য তাল। আর সেই তালের ছড়ার মাঝখানে কাঠি-কুটো যোগাড় করে প্রতিবছর বাসা বাঁধে কাক দম্পতি। যেন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যায় ডিমে বসে থাকা কাকিনীটিকে কিংবা একটা আলতো ছোঁয়া দিয়ে দেওয়া যায় ও‌ই নীলচে রঙের জোড়া ডিমে!

পুকুরের মাঝের খালি জায়গায় গজিয়ছিল কচুবন। ফ্ল্যাটবাড়িতে বসত করতে আসা ছোট্ট ছেলেটি টারই মত আরও কিছু ছেলেকে সাথে নিয়ে একদিন নেমে পড়ল ও‌ই কচুবনে। সে সেখানে ক্রীকেট খেলবে বন্ধুদের নিয়ে। তার যে খেলার জায়গা নেই, কোথায় সে মাঠ খুঁজতে যাবে? পরিস্কার হয়ে গেল কচুবন। নিজেরাই পরিস্কার করে দিল সব আগাছা। ছুটির দিনের সকাল বিকেল দু'বেলাই তারা ক্রীকেট খেলত নিজেদের বানানো এই ছোট্ট মাঠে। কিন্তু আজকের বাজারে এই চিলতে জমিটুকুরই বা দাম কম নাকি? খানিকটা করে দু'পাশের পুকুর বুজিয়ে দিলেই দিব্যি দাঁড়িয়ে যাবে একখানা চারতলা বিল্ডিং! লোক এল। লস্কর এল। এল মুটে মজুর। আর এল পুরোহিত। ঘটা করে ভূমিপুজো করে পাড়ার কেবলওয়ালা ওখানে খুঁটি পুঁতে দিয়ে গেল। ট্রাকে করে মাটি এল। বুজল আধখানা করে পুকুর। কাটা পড়ল কমলা ফুলে ঢেকে থাকা বিশাল সেই গাছ। ঘরছাড়া হল পাখিরা। ওরা বুঝতে পারছিল না কি হল। ওদের বাসার খোঁজে ওরা মাটিতে পরে থাকা গাছের আশে পাশেই ঘুরঘুর করল দিনকতক। কমলা রঙের ফুলগুলো সব ঝরে গেল গাছ থেকে। সবুজ পাতা প্রথমে হলুদ পরে বাদামী রঙের হয়ে এল। শুকিয়ে গিয়ে ঝরে পড়ল সব পাতারা গাছ থেকে। পানকৌড়িগুলো তখনও ছিল পুকুরে। ওরা মাঝে মাঝেই সেই পুকুরের গায়ে নুয়ে পড়া ছোট্ট গাছের ডালে উঠে গিয়ে বসে থাকত।

পশ্চিমের জানালাটা এখন আর খোলা যায় না। একের উপরের এক থাম দাঁড় করিয়ে চারতলা বিল্ডিং এখন আমার জানালার ওপাশে। এখন এখানে পাখির কলতান আর নেই। জানালা খুললে কোন গাছ কোন পুকুর আর দেখা যায় না। মিস্ত্রীদের ঠক ঠক ঠকাস শব্দ ছাড়া সারাদিন আর কোন শব্দ নেই। ঘরহারা পাখিরা, পুকুরের সেই পানকৌড়িগুলো কোথায় উড়ে গেছে কে জানে...এই বসন্তেও কোকিলেরা এসেছিল। দক্ষিণের জামগাছটিতে বাসাও বেঁধেছিল আর সেই একইভাবে কুউ উ উ, কুউ উ উ করে ডেকে ডেকে কানও ঝালাপালা করেছে তারা আমার। প্রতিদিন ভোররাতের সুখের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে ওরা এবারও বরাবরের মতই। পরের বছর থেকে ওরা আর এখানে আসবে না। সেদিনের কালবৈশাখী ঝড়ে উপড়ে পড়েছে কালো কালো ফলে ভরা জামগাছটি...