Monday, May 12, 2008

জানো তো, নবনীতা না মাঙ্গলিক ...

'মাঙ্গলিক' শব্দটি এখন আর খুব একটা অচেনা নয় ঐশ্বর্য রাই বচ্চন, লাগে রহো মুন্নাভাই সিনেমার বদৌলতে। গ্রহ নক্ষত্রের ফেরে, পন্ডিত-পুরোহিতেরর কোষ্ঠিবিচারে কেউ কেউ মাঙ্গলিক হয়ে যায়। মাঙ্গলিক মেয়েটির নিজের তাতে কোন অসুবিধে বা বিপদ নেই কিন্তু সমূহ বিপদ তার হবু বরটির। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অকালমৃত্যু অনিবার্য (পুরোহিতের কোষ্টিবিচারে)। সমাধানও পুরোহিতই দিয়ে দেন। যেমন দিয়েছিলেন অমিতাভ বচ্চন আর জয়া বচ্চনকে যখন জানা গেল ঐশ্বর্য রাই মাঙ্গলিক। প্রথম বরের উপর দিয়েই সকল বিপদ যায় বিধায় পুরোহিত বিধান দেন কন্যেটির বিবাহ দেবতার সঙ্গে দিয়ে দেওয়া হোক। সকল বিপদাপদ দেবতা নিজবক্ষে ধারণ করে কন্যের দ্বিতীয় বরটিকে নিরাপদ করে দেন পার্বতীপতি শিব। কোন এক শুভদিনে শুভক্ষণে কন্যে মালা দেয় শিবের গলায়, শিবের পায়ে ফেলে রাখা সিঁদুর কন্যে নিজ মাথায় ধারণ করে আর মঙ্গলের যত দোষ সব কেটে যায়।। নিশ্চিন্ত মাতা-পিতা কন্যের বিয়ে দেন নির্বাচিত পাত্রের সাথে কিন্তু আমাদের আমিতাভ ও জয়া বচ্চন শুধু শিব বিবাহে নিশ্চিন্ত হননি। তারা ঐশ্বর্যর তিন তিনটি বিয়ে দিয়েছিলেন নিজপুত্র অভিষেককে নিরাপদ করার জন্যে। শিবঠাকুর তো আছেনই, ঐশ্বর্যের বর হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল বটবৃক্ষ ও কলাগাছেরও। খবরের কাগজের প্রথম পাতায় প্রতিদিন বড় বড় ছবি সহ সেই সব খবর স্থান পেয়েছে । হবু পু্ত্রবধুকে নিয়ে মন্দিরে মন্দিরে পুজো দেওয়ার ছবিও দেখা গেছে প্রায় নিত্যই। সমস্ত শিক্ষা-দীক্ষা, আধুনিকতার মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে মঙ্গলদোষ কাটিয়ে তবেই জয়া -অমিতাভ বধু হিসেবে বরণ করেন এককালীন বিশ্বসুন্দরী অ্যাশকে।
এমনই এক মাঙ্গলিক কন্যে আমাদের নবনীতা। আমার সাথে ওর আলাপ জিমন্যাশিয়ামে। নামি এক বেসরকারী হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তার নবনীতা একদিন এসে হাজির হয় আমাদের জিমে। ৯৭কেজি ওজন নিয়ে। নিজেকে নিয়ে ভীষণ বিব্রত থাকে, কথা বলে খুব কম। সামনে পড়লে শুধু একটু স্মাইল দিয়ে হাই-হ্যালো সারে।

  নবনীতাকে দেখে জিমনেশিয়ামেও ফিসফিস শুরু হয়ে যায় নিয়ম মেনে। হাউসকিপিংএর মেয়েরা পর্যন্ত ফিসফিস করে। নবনীতা জিমে আসার কিছুদিনের মধ্যে আমি জিম ছেড়ে দিই। বছর দুই পরে সেদিন হঠাৎ নবনীতার সাথে দেখা এক রাস্তার মোড়ে। আমি নবনীতাকে চিনতে পারিনি সেদিন দেখে। ছিপছিপে চেহারার হাসিমুখ এক মেয়ে আমাকে হ্যালো বলছে! কে রে বাবা, হাসিটি চেনা চেনা লাগছে যেন! নবনীতা! মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে যায় নবনীতার নাম। উজ্জ্বল হাসে নবনীতা ।
  
মধ্য তিরিশের নবনীতা তখনো অবিবাহিতা। কোন প্রেমপর্ব নেই, বিয়ের সম্মন্ধও খুব একটা আসে না। ওজন কমানোকে ধ্যান=জ্ঞান করে বছর খানেকের মধ্যে পঁচিশ কেজির মত ওজন ঝরিয়ে নবনীতা এখন বেশ ছিপছিপে। বিয়ের সম্মন্ধ আসে এদিক ওদিক থেকে। কিন্তু নবনীতার মায়ের ( যিনি এ শহরের এক নামী আইনজীবি) দুশ্চিন্তার কারণ অন্যত্র। কোষ্ঠি বিচারে নবনীতা যে মাঙ্গলিক!

এক শুভান্যুধায়ীর পরামর্শে নবনীতার মা বেনারসে গিয়ে এক গুরুদেবের সাথে দেখা করেন। গুরুদেবের পরামর্শে বেশ কিছু যাগ-যজ্ঞ করেন সেখানে, করান শতেক ব্রাহ্মণ ভোজন নবনীতার দোষ কাটানোর জন্যে। গুরুদেব সময় বলে দেন তিন মাস। এর মাঝে দোষ অনেকটাই কেটে যাবে, তখন দিন-ক্ষণ দেখে বিয়ের লগ্নে নবনীতার বিয়ে দেওয়া হবে শিবঠাকুরের সাথে। মাস তিনেক পরে নবনীতাকে সাথে করে বেনারস যেতে বলেন গুরুদেব।

তিন মাস পরে নবনীতা মায়ের সাথে বেনারসে যায়। বারে বারে কোষ্ঠি মেলান গুরুদেব, নবনীতার হাতও দেখেন। বলেন, খুব শিগগিরই নবনীতার বিয়ের যোগ। তবে তার আগে নবনীতার বিয়ে দেবতার সাথে দেওয়া আবশ্যক। যেমন কথা তেমন কাজ। নবনীতার সৌভাগ্যে তখন বিয়ের লগ্ন ছিল ঠিক দু'দিন পরেই। বিয়ে হয়ে যায়। লাল বেনারসি আর গয়নায় পুরোপুরি বৌ সাজে নবনীতা। ঠাকুরের পায়ের সিঁদুর আর বিয়ের জরির মালা গুরুদেব দিয়ে দেন নবনীতার মায়ের হাতে, বলে দেন, যত্ন করে রেখে দিতে। এই সিঁদুরেই যেন বিয়ে হয় নবনীতার আর এই মালাই যেন বরমালা হয়।

মা-মেয়ে কলকাতায় ফিরে আসে। কিছুদিনের মধ্যেই নবনীতার বিয়ের একটা সম্মন্ধ আসে অনাবাসী ভারতীয় এক ডাক্তারের জন্যে। নবনীতার মা যোগাযোগ করেন গুরুদেবের সাথে। গুরুদেব পাত্রের কোষ্ঠি চেয়ে পাঠান। ডাকযোগে সেটি পেয়ে সাথে সাথেই গুরুদেব জানান, যত শিগগির পার মেয়ের বিয়ে দিয়ে দাও এই ছেলের সাথে। এবং নবনীতার বিয়ে হয়ে যায় শিবঠাকুরের সাথে বিয়ে হওয়ার ঠিক দু'মাস পরে।

নবনীতার বর বিয়ের পরে ফেরত গেছে কাজের জায়গায় আর নবনীতা এখন তোড়-জোড় করছে এখানকার সব মিটিয়ে স্বামীর কাছে গিয়ে ঘর-সংসার করবার।

না। এতসব কথা নবনীতা আমাকে বলেনি। নবনীতার সেই শুভান্যুধায়ী বন্ধুটি কাকতালীয়ভাবে আমারও পরিচিত। পরিচয়সূত্রও জিমন্যাশিয়াম। বন্ধু না হলেও বন্ধুর মতই।। কখনো সে ফোন করে তো কখনো আমি। সেদিন নবনীতার সাথে দেখা হওয়ার কথা ওকে বলতেই ও বললো জানো না তো কত কান্ড করে ওর বিয়ে হয়েছে! কান্ডগুলো শোনায় আমার উৎসাহ ছিল না, নবনীতার হাসিমুখ আর রোগা ছিপছিপে চেহারা দেখে আমার ভীষণ ভাল লেগেছিল বলেই আমি নবনীতার কথা তুলেছিলাম। কিন্তু আমি শুনতে না চাইলেই বা সে ছাড়বে কেন। অ্যাত্তবড় উপকার করেছে আর কেউ জানবে না! জানো তো, নবনীতা না মাঙ্গলিক ...

No comments:

Post a Comment