Sunday, April 27, 2008

নীলু ও পলুর কথা

গতকাল একটি ন্যাংটো শিশু মাদুরে শুয়ে চীৎকার করে কাঁদছে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম নন্দনের সামনের ফুটপাথে। আশে পাশে কেউ নেই। বড়জোর মাস তিনেক বয়েস হবে শিশুটির। দাঁড়িয়ে পড়ে ইতিউতি তাকাই, শিশুটির মায়ের খোঁজে।চোখে পড়ে, খানিক দূরে ফুটপাথেই দাঁড়িয়ে রোগা একটি মেয়ে এক পেয়ারাওয়ালার সাথে খেজুর করছে । ছেঁরা শাড়িতে শরীর যতটুকু ঢাকা খোলা তার চাইতে বেশি। মাঝে মাঝেই সে এদিকপানে তাকিয়ে দেখছে, নজর শিশুটির প্রতি। কেন যেন মনে হল, ও‌'ই শিশুটির মা। নাদুস নুদুস শিশুটি একটি মেয়েশিশু। গায়ে জড়ানো কাঁথা সরে গিয়েছে। শুধু মাদুরের উপর শুয়ে শিশুটি চিল চীৎকারে কাঁদছে আর নিজের হাত মুখে পুরে খাওয়ার খোঁজার চেষ্টা করছে। আমি দাঁড়িয়েই আছি দেখে পেয়ারাওয়ালার সাথে গল্প করা বাদ দিয়ে ফুটপাথবাসীনী মেয়েটি এগিয়ে আসে তার শিশুকন্যার দিকে। আমি ধীরপায়ে এগিয়ে যাই ওদেরকে পেছনে ফেলে। বারে বারেই তবু নিজের অজান্তেই যেন ঘাড় ঘুরে যায় ফেলে আসা পথে, শিশুটির দিকে। মায়ের ছেঁড়া আঁচলের আড়ালে শান্ত হয়েছে ছোট্ট মেয়েটি। দেখতে পাই, কটমিটিয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে ওর মা। আমি শিশুটিকে মাথা থেকে নামিয়ে পা চালাই তাড়াতাড়ি।


দু'দিন ধরে ও‌ই ফুটপাথবাসী মা ও মেয়েটি আমার মাথায় নড়ে চড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে অবিরত। আজ সকালেও জানলার ধারে বসে আধখানা বোজানো পুকুরে হারিয়ে যাওয়া পানকৌড়ি দুটিকে খোঁজার চেষ্টা করছিলাম মনে মনে। মন চলে যায় পেছনদিকে। বেশ অনেকটা পেছনে।

নাটোরের মেয়ে নীলুর সাথে আমার আলাপ হয় এই কলকাতাতেই। আমার পুরনো বাড়িতে একদিন আমাদের পরিচিত এক লোকের সাথে নীলু এসেছিল একটি সাহায্যের আবেদন নিয়ে। না। টাকা-পয়সার সাহায্য নয়, নীলু এক জজসাহেবের স্ত্রী। টাকা পয়সার তার অভাব নেই। সমস্যাটি কি সেটিও নীলু নিজমুখে বলতে পারছিল না। সাথে করে নিয়ে আসা চেনা মানুষটি আমাকে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে গল্পটি শোনালেন।

নীলু কলকাতায় এসেছে একটি শিশু সন্তানের জন্যে। নিজে সন্তান ধারণে অক্ষম নীলু শুনেছে কলকাতায় নাকি যেখানে সেখানে ফেলে যাওয়া, পরিত্যাক্ত শিশু পাওয়া যায়। সেই রকমই একটি শিশু নিজের জন্যে চায় নীলু। মা হতে চায় নীলু। বেশ কয়েকদিন ধরে কলকাতায় একটি হোটেলে নীলু ছিল তার স্বামীর সাথে, ছুটি শেষ বলে স্বামী তার ফিরে যাবে দেশে, নীলু থেকে যেতে চায় কলকাতাতেই, যতদিন না একটি শিশু খুঁজে পাওয়া যায়, যাকে নীলু মানুষ করবে নিজের সন্তান বলে। একা মহিলা হোটেলে কি করে থাকবে অনির্দিষ্ট কাল, তাই তার স্বামীর কোর্টের এককালীন মুহুরী সুশীলবাবুর দ্বারস্থ হয় নীলু, সুশীলবাবু তাকে আমার কাছে নিয়ে আসে, কিছুদিন যদি আমি থাকতে দিই আমার বাড়িতে!

খানিক বাকরুদ্ধ অবস্থায় থেকে ঘরের ভেতরে যাই নীলুর কাছে। নীলুকে বলি, থাকুন আপনি আমাদের কাছে, আপনার যতদিন প্রয়োজন। নীলু উঠে এসে আমার হাত দুটি নিজের হাতে নিয়ে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলে। বলে, আপনাদের কষ্ট হবে জানি কিন্তু আমি নিরূপায়!

গড়পরতা বাঙালীর তুলনায় একটু বেশিই লম্বা বলে মনে মনে আমার বেশ একটা অকারণ অহংকার ছিল কিন্তু নীলুর সামনে নিজেকে আমার বেঁটে বলে মনে হল। কম করেও পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি লম্বা ( পরে জেনেছি নীলুর উচ্চতা পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি) নীলু আর তেমনি দশাসই চেহারা। গায়ের চকচকে কালো রঙে আলো যেন ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। মাথায় তেমনি কুচকুচে কালো কোঁকড়া চুল ঘাড়ের উপরে ছোট করে কাটা। বাঙালী বলে ভাবা শক্ত নীলুকে। ধবধবে সাদা মুক্তোর মত দাঁতে নীলুর হাসিটি ভারী মিষ্টি। তবে নীলুর মুখে হাসি আমি কমই দেখেছি।

সুশীলবাবুর সাথে নীলু তখনকার মত বেরিয়ে যায়, ওর স্বামী চলে গেলে জামা কাপড় নিয়ে আমার এখানে নীলু থাকতে আসবে পরদিন সকালে। নীলুর স্বামী তখন নীলুর সাথে আসেননি, শুনলাম তার মত নেই নীলুকে এভাবে এখানে রেখে যাওয়ার, একে বিদেশ তায় অচেনা লোকের বাড়িতে এভাবে জোর করে অতিথি হওয়া। আমার কেন জানি মনে হল, যেটুকু শুনলাম গল্প বোধ হয় শুধু এটুকুই নয়। কিন্তু প্রায় অপরিচিত একজন মানুষের কাছে তার ব্যাক্তিগত কোন কথা জানতে চাওয়াটা শোভন নয় বলে মুখে হাসি ধরে রেখে নীলুকে বিদায় দিই, কাল সকালে নীলু আসবে থাকতে।

বিকেলে আবার ডোরবেল। নীলু। স্বামীকে সাথে করে নিয়ে এসেছে আলাপ করিয়ে দিতে, কোথায় থাকবে কাদের কাছে থাকবে সেটাও ভদ্রলোক দেখে যাবেন! ইনি পলু! নীলু আলাপ করিয়ে দিল। জজসাহেবকে আগে কখনো না দেখলেও তার আসল নামটি আমার অজানা বা অচেনা নয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কোর্টের তখনকার সাবজজ ইনি। জমি-জমা সংক্রান্ত একটি মামলার জেরে আব্বা কোর্টে গেছিলেন একবার, তখন এই জজসাহেবের নাম শুনেছি আব্বার মুখে। ধপধপে ফর্সা গায়ের রং। মাঝারি উচ্চতার পলুকে ভীষণ ভালো দেখতে। ভীষণ মিষ্টি এক হাসি পলুর মুখে। ধন্যবাদ জানাতে এসেছে পলু। নীলুকে যেন একটু দেখি এই আবেদন পলুর চোখে মুখে ।

পরদিন নীলু আসে স্যুটকেস সহ। সুশীলবাবুও আসেন সাথে। ইনি সারাদিন ঘুরে বেড়ান নীলুকে সাথে নিয়ে। বস্তিতে, হাসপাতালে অনাথ আশ্রমে। একটি অনাথ বা পরিত্যাক্ত শিশুর খোঁজে। সকালে বেরিয়ে নীলু রাতে ফেরে। মুখ হাত ধুয়ে আমার কাছে বসে গল্প করে, সারাদিনে কোথায় কোথায় গেল, কী কী দেখল। বাচ্চা বোধ হয় এবার একটা পাওয়া যাবে! আরো নানান কথা। নীলুর নিজের কথা। ধীরে ধীরে জানতে পারি নীলুর গল্প।

নাটোরের এক বিশাল বড়লোকের একমাত্র মেয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে প্রেমে পড়ে কুষ্টিয়া থেকে পড়তে আসা এক নিম্নবিত্ত ছেলে রাশেদ ( সঙ্গত কারণে আসল নামটি দিলাম না)। কিভাবে কখন দুজনে কাছে আসে, প্রেমে পড়ে সে নীলু নিজেও জানে না। ইউনিভার্সিটিতে নীলুকে ছেলে-মেয়েরা কম ক্ষেপায় না কালো কুচ্ছিত বলে। নিগ্রো বলে লোকে প্রকাশ্যেই আওয়াজ ডেয় নীলুকে। ছেলেবেলা থেকেই শুনে শুনে এসব নীলুর গা সওয়া। কান দেয় না সে এই সব কথা বা আওয়াজে। রাশেদ একমাত্র ব্যাতিক্রম যে কোনদিন নীলুকে তার চেহারা নিয়ে কিছু বলেনি। নীলু নিজেও জানে যে রাশেদের সঙ্গে ওকে মানায় না। কিন্তু প্রেম! সে যে মানে না মানা।।

বাড়িতেও এক সময় জানাজানি হয়ে যায়। প্রবল শাসন হয় দু' তরফ থেকেই। নীলু আর রাশেদ লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলে পড়াশোনা শেষ না করেই। নীলুর বাবা মেয়েকে বলে দেন, সে যেন আর মুখ না দেখায় বাবাকে। রাশেদের বাবা বলেন, তার স্বপ্ন ছিল ছেলে তার হাকিম হবে। কোথায় হাকিম কোথায় কি, ছেলে কোথা থেকে এই অলম্বুস ঘরে নিয়ে এসেছে! রাশেদের বাবা যদিও তাড়িয়ে দেন না বাড়ি থেকে কিন্তু কিছু শর্ত আরোপ করেন। খেতে পরতে দেবেন তিনি ঠিকই ছেলে-বৌকে কিন্তু রাশেদের পড়াশোনার খরচ তিনি আর দেবেন না। রাশেদ মেনে নেয় সব শর্ত। নীলুর কানে সবই আসে। মাথা নত করে চুপ করে থাকে নীলু।

চারদিকে তখন ইংরেজি মাধ্যম স্কুল সবে মাথা গজিয়ে উঠতে শুরু করেছে। সেই রকমই একটা স্কুলে চাকরী নেয় নীলু। রাশেদকে পড়া শেষ করার জন্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত পাঠায় সে। ভাত কাপড় তো শ্বশুরই দেন, নীলুর চাকরীর পয়সায় পড়াশোনা চলে রাশেদের। ততদিনে সে নতুন নাম পেয়েছে নীলুর কাছ থেকে। পলু। ঢাকায় বেড়াতে গেছিল ওরা একবার। সেখানে চিড়িয়াখানা দেখতে গিয়ে কী এক অদ্ভুত পাখি দেখেছিল ওরা, পলু পাখি। সেই থেকে রাশেদ হয়ে যায় পলু।

নীলু যখন জানতে পারে সন্তান ধারণে তার সমস্যা আছে ততদিনে তার বিয়ের বয়স দশ বছর পার। বিয়ের প্রথম কয়েক বছর সে নিজেও সন্তান চায়নি, পলুর পড়াশোনা, তার নিজের চাকরী, বাপের বাড়িতে সমস্যা, শ্বশুর বাড়িতে সমস্যা সব মিলিয়ে নীলু আর পলু ঠিক করেছিল যখন সব ঠিক হয়ে যাবে, পলুর চাকরী হয়ে যাবে, নীলু নিজের পড়াশোনা শেষ করবে তারপরেই তাদের বাচ্চাকে তারা আনবে পৃথিবীতে। জীবনের সব হিসেব যেমন মেলে না নীলু আর পলুর এই হিসেবও মেলেনি।

পলু হাকিম হয়েছে, নীলুর বাবা মেয়ের বিয়ে মেনে নিয়ে সব ঝামেলা মিটিয়ে নিয়েছেন। মা মরা একমাত্র মেয়েকে কতকাল আড় নিজের থেকে দূরে রাখবেন তিনি। শ্বশুরমশাইয়ের স্বপ্নও পূরণ হয়েছে, ছেলে তার হাকিম হয়েছে। ঢাকায় নীলু থাকে একটা ভাড়াটে বাড়িতেপলুর পোষ্টিং নারায়ণগঞ্জে। স্কুলের চাকরী করাকালীন নীলু আরেকটা কাজ করত, গার্মেন্টস ফ্যাকট্রিতে একটা পার্ট টাইম চাকরী। তো পলু যখন চাকরী পেয়ে গেল, নীলু তার চাকরী-বাকরি ছেড়ে দিয়ে ইউনিভার্সিটিতে ফেরত গেল। মাষ্টার্স কম্পলিট করে নীলু ঢাকায় এসে একটা ছোট কারখানা দিল, সুতোর। যে সুতো গার্মেন্টস ফ্যকট্রিতে লাগে। বিদেশ থেকে বান্ডিল বান্ডিল সুতো আসে, নীলুর ছোট্ট কারখানায় সেই সুতো ছোট ছোট রীলে ঢুকে বাক্সবন্দী অবস্থায় বাজারে যায়। ছোট হলেও ব্যবসা মন্দ না। নীলুর সময়ও কেটে যায়। কোন সপ্তাহান্তে নীলু যায় নারায়ণগঞ্জে তো কোন সপ্তাহান্তে পলু আসে ঢাকায়। নীলুর শ্বশুর, দেওর থাকে নীলুর কাছে। মাঝে মাঝে বাবাও আসেন। জীবনের গতি বেশ মসৃণ।

সব যখন স্থিত হয়ে আসে নীলু তখন মা হতে চায়। কিন্তু চাইলেই কী সব হয়! নীলুর মা হওয়া হয় না। ডাক্তার -বদ্যি -কবিরাজ -হোমিওপ্যাথি-টোটকা- তাবিজ সব হয়ে যায়। কিছুতেই কিছু হয় না। নীলুর শরীরে এমন কিছু অসুবিধে আছে যার জন্যে সে মা হতেই পারবে না। আত্মীয়-স্বজনরা পরামর্শ দিলেন, কলকাতা যাও, ওখানে বড় বড় সব ডাক্তার আছে, কিছু একটা হবেই ওখানে গেলে। দরকার হলে টেষ্ট টিউব বেবি নিয়ে নাও। নীলু পলু দুজনেই কলকাতায় আসে, যায় ডাক্তার বৈদ্যনাথ চক্রবর্তীর কাছে। চীকিৎসায় সাড়া দেয় নীলু, সন্তান সম্ভাবনা হয় তার। নিশ্চিন্ত, খুশি মনে দেশে ফিরে যায় নীলু। কিন্তু নীলুর জীবনে আরো অনেক ঘটনা ঘটার ছিল। ৩ মাসের সময় গর্ভপাত হয় নীলুর। সেই ধাক্কা সামলে নিয়ে নীলু আবার কলকাতায় আসে। কিন্তু নীলুর আর গর্ভ সঞ্চার হয় না। পাগলের মত নীলু দৌড়ে বেড়ায় ঢাকা-কলকাতা আর ঢাকায়। বুড়ো বাবাকে নিয়ে মাসের পর মাস পরে থাকে কলকাতায়। কিছুতেই কিছু হয় না।

সেবার নীলু দু'মাস কলকাতায় থেকে ঢাকা ফিরে যায়। ঢাকায় পৌঁছোয় সে ভোরবেলা, যাওয়ার খবর না দিয়েই নীলু ফিরে গিয়েছিল ঢাকায়, নিজের বাড়িতে। ডোরবেল বাজাতে পলু এসে দরজা খুলে দেয় আর নীলুকে দেখে চমকে ওঠে। পলুর চমকানো খেয়াল না করে নীলু ঘরে ঢুকে যায় ততক্ষণে নীলুর বেডরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে নাইটগাউন পরা অল্প বয়েসী একটি মেয়ে। নীলুকে দেখেই যে ষ্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে দরজায়। নীলু চিনতে পারে মেয়েটিকে, নারায়ণগঞ্জে পলুর কোয়ার্টারের পাশের কোয়ার্টারেই থাকে মেয়েটি, ম্যাজিষ্ট্রেটের বউ।

ভাল করে তাকিয়ে দেখে নীলু পলুর দিকে, খালি গায়ের পলুর পরনে শুধু একটি লুঙ্গি। মেয়েটি সাত-আট মাসের অন্ত:সত্বা। পলকেই হাজরটা ভাবনা আসে নীলুর মাথায় কিন্তু তবুও নীলু যেন কিছুই বুঝতে পারে না। স্যুটকেস হাত থেকে নামিয়ে রেখে পাশেই বসে পরে নীলু। পলু ততক্ষণে খানিকটা সামলে নিয়েছে নিজেকে, বলে, নীলু, তুমি ওঠো, ভেতরে চলো, আমি তোমাকে বলছি সব। মেয়েটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েই থাকে। কাউকে কিছু না বলে নীলু উঠে নিজের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়, তাকায় ভেতরে, বিছানার পাশেই অগোছালো হয়ে পড়ে আছে খুলে রাখা শাড়ি, ব্লাউজ। পলুর শার্ট প্যান্ট। পেছন ফিরে নীলু জানতে চায় শ্বশুরের কথা, আব্বা কোথায়? পলু জবাব দেয়, আব্বা বাড়িতে গেছেন।

নীলু নিজের স্যুটকেস নিয়ে উল্টোপায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় পলুর শত ডাক অগ্রাহ্য করে। নীলু গিয়ে ওঠে তারই এক খালাতো বোনের বাসায়, যিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন অধ্যাপিকা, স্ত্রীরোগ বিষয়ের। তার কাছ থেকে নীলু জানতে পারে, ও‌ই মেয়েটিকে পলু লুকিয়ে বিয়ে করেছে অনেকদিন। প্রেম চলছিল তারও অনেক আগে থেকেই, একদিন অশালীন অবস্থায় তাদের দুজনকে দেখতে পেয়ে মেয়েটির স্বামী তালাক দেয় মেয়েটিকে। তারপর থেকে সে পলুর কাছেই থাক, পলুর কোয়ার্টারে। সেই ম্যাজিষ্ট্রেট ট্রান্সফার নিয়ে চলে গেছে অন্য কোথাও। নীলু ঢাকায় না থাকলেই মেয়েটিকে পলু তার বাড়িতে নিয়ে আসে, দুজনে থাকে নীলুরই ঘরে, তারই বেডরুমে। আত্মীয় স্বজনেরা এতদিনে মোটামুটি সবাই জেনেই গেছে পলুর দ্বিতীয়বার দ্বার পরিগ্রহের কথা। জানত না শুধু নীলু। বাচ্চা বাচ্চা করে নানান জায়গায় ছোটাছুটি, মাসের পর মাস কলকাতায় এসে থাকা, ডাক্তার দেখানো, চীকিৎসা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত নীলু জানতেই পারেনি কখন তার বাসরে চোর ঢুকেছে আর চুরি করে নিয়ে গেছে তার জন্মের ধন, তার সবচাইতে মূল্যবান পলুপাখি।

মাস তিনেক নীলু থাকে তার বোনের বাড়িতে। একবার ঘুমের ওষুধ বেশি পরিমাণে খেয়ে মরেও যেতে চায় কিন্তু কত কী যে দেখার বাকি! মরে গেলে দেখবে কে? নীলু শুনতে পায়, রীমা এখন নীলুর বাড়িতেই থাকে। শ্বশুর গ্রাম থেকে ফিরে এসে নীলুর সাথে দেখা করেন, নীলুকে বলেন, যা হওয়ার তা তো হয়েই গিয়েছে, তুমি এবার বাড়ি চল। আত্মীয়-বন্ধুদের প্রায় সকলেই আসে নীলুর সাথে দেখা করতে। নানা জনের নানান পরামর্শ। কেউ বলেন কেস ঠুকে দে তো কেউ বলেন, মেয়েদের কপালটাই এরকম হয়, মেনে নাও আড় কীই বা করবে! নীলু কোনটাই করে না। ডিভোর্সের নোটিশ পাঠায় পলুকে।

ইতিমধ্যে পলু প্রায় প্রতিদিনই ফোন করে কথা বলার চেষ্টা করেছে নীলুর সাথে, নীলু কথা বলেনি। নিজে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা চুপচাপ বসে থেকেছে ড্রইং রুমে, নীলু দেখা করেনি, কোন কথা শোনেনি, বলেনি।

খবর আসে, পলুর ছেলে হয়েছে। নোটিশ ততদিনে পৌঁছে গেছে পলুর কাছে। পলু নাটোর যায় নীলুর বাবার কাছে, সাথে করে ঢাকায় নিয়ে আসে নীলুকে বোঝানোর জন্যে। কেউ যদি নীলুকে বোঝাতে পারে তো সে একমাত্র নীলুর বাবা। পলু সেটা জানত। অনেক চোখের জল, অনেক মান-অভিমান আর অনেক ক্ষমা-প্রতিশ্রুতির পালা। নীলু ফিরতে রাজী হয়, তবে ও‌ই ফ্ল্যাটে নয়। যে ফ্ল্যাটে পলু মেয়েছেলে নিয়ে এসে তুলেছে সেখানে নীলু যাবে না। পলু তাতেই রাজী। ও‌ই বাড়িরই দোতলার ফ্ল্যাটে নীলু এসে ওঠে। তিনতলার ফ্ল্যাটের কোন জিনিসপত্র নীলু ছুঁয়েও দেখতে আর রাজী নয়, সব নতুন করে আসে আবার। এবার নীলু আর সংসার গোছায় না।। একা থাকে নীলু। নিজগৃহেই নীলু থাকে মেহমানের মত। শ্বশুর, দেওর কাউকেই নিজের কাছে নিয়ে আসে না

পলুর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে আসে ধীরে ধীরে, সময়ের সাথে সাথে। সময় নাকি সব ক্ষতকেই সারিয়ে দেয়। নীলর ক্ষত সারে না। পলুর ছেলেটি দেখতে ভারী মিষ্টি। বাপের মতই দেখতে হয়েছে অনেকটা। যখন তখন সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে নিচে, মা'য়ের কাছে। পলু ছেলেকে শিখিয়েছে নীলুকে মা বলে ডাকতে। নীলু ভুলতে চেষ্টা করে সব ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে। ভোলা যায় না কিছুই। ক্ষত আরও তাজা হয়ে ওঠে রীমার ব্যবহারে। রীমা এক পারফেক্ট সপত্নী । পলু যতই বলুক, বাবুটা নীলুর কিন্তু নীলু জানে, ও পলু আর রীমার বাবু। তার নয়।

নীলু আবার কলকাতায় আসে, এবার সাথে পলু। ডাক্তার জবাব দেয়, নীলুর পক্ষে মা হওয়া সম্ভব হবে না কোন কালেই। নীলু দেশে ফিরে যেতে রাজী হয় না।। নীলু শুনেছে, এখানে পথে ঘাটে মানুষের বাচ্চা পড়ে থাকে। একটা বাচ্চা নিজের জন্যে পেয়ে গেলেই ও দেশে ফিরে যাবে। নীলুকে একা ছাড়তে পলরু কিন্তু কিন্তু দেখে সুশীলবাবুকে সঙ্গে নিয়ে নীলু এসে হাজির হয় আমার বাড়িতে। পরামর্শটি ছিল সুশীলবাবুরই। একটা বাচ্চা দ্ত্তক নেওয়ার পরিকল্পনা করে থেকে যেতে চায় কলকাতাতেই।

শুরু হয় নীলুর খোঁজার পালা। কলকাতার হেন হাসপাতাল, এতিমখানা, হোম নেই যেখানে নীলু যায়নি একটি সদ্যোজাত শিশুর জন্যে। সঙ্গী কখনো সুশীলবাবু তো কখনো আমি। নীলুর মনোবাঞ্ছা পূরণ হয় না। সারাদিন ঘুরে ঘুরে সন্ধেবেলায় ক্লান্ত নীলু বাড়ি ফিরে চুপটি করে শুয়ে থাকে। কখনো গল্প করে, পুরনো দিনের।। পলুর কথা বলে। পলুর প্রতি এখন তার আর কোন রাগ-বিরাগ নেই। একটা অদ্ভুত নিরাসক্তি বোধ করে সে পলুর প্রতি। কোন অনুভূতিই আর যেন অবশিষ্ট নেই। এই অবস্থায় তুমি আছো কেন পলুর সাথে? প্রশ্ন করে জবাব পেয়েছিলাম, কে জানে, কেন যে আছি নিজেও জানি না!

সুশীলবাবু একদিন খবর নিয়ে আসে, কলকাতার অদূরে বাটা'য় একটি অবিবাহিত মেয়ে সন্তানসম্ভবা। অতি নিম্নবিত্ত ঘরের মেয়েটীকে তার প্রেমিক বিয়ের প্রাতিশ্রুতি দিয়েছিল, বিশ্বাস করে সে নিজেকে সণনপে দিয়েছিল প্রেমিকের বাহুতে, বিছানায়। সমস্ত পর্তিশ্রুতি সঙ্গে নিয়ে প্রেমিকপ্রবর হাওয়া সন্তান সম্ভাবনার খবর শোনামাত্রই। হাসপাতালে নিয়ে যায় মেয়েটির বাবা, ডাক্তার রাজী হয় না অ্যাবর্শন করাতে, মেয়েটির জীবনহানির আশঙ্কায়। উপায়হীন বাবা প্রায় একঘরে অবস্থায় অপেক্ষায় আছে, কবে বাচ্চাটি জন্মাবে, আর সে নিয়ে গিয়ে কোন হোমে দিয়ে আসবে। নীলু পৌঁছে যায় সেখানে, অনাগত সন্তানটি সে নিতে চায়, নিজের সন্তান পরিচয়ে মানুষ করবে সে। তারা রাজী হয়। বাচ্চা তো তারা কাউকে না কাউকে দিয়েই দেবে, ভালই হল। নীলু বাটাস সাঁতরে সেদিন বাড়ি ফিরে আসে।। নাহয় আরও মাস দুই সই! মাস দুই আরও অপেক্ষা করতে হবে, তা হোক! এতকাল তো নীলু অপেক্ষাই করে আছে।

প্রায় প্রতিদিনই সকাল সকাল নীলু রেডি হয়ে বেরিয়ে যায় হাওড়া ষ্টেশনের উদ্দেশ্যে, সুশিলবাবুকে সঙ্গী করে সে পৌঁছে যায় মেয়েটির বাড়িতে। হাতে করে নিয়ে যায় নানারকম ফল, খাবার, জামা-কাপড়। স্থানীয় হাসপাতালে নীলু নিজে নিয়ে যায় মেয়েটির চেকআপ করাতে। সারাদিন কাটিয়ে সন্ধেবলায় বাড়ি ফেরে ক্লান্তমুখে উজ্জ্বল এক হাসি নিয়ে। নীলুর এই হাসি দীর্ঘস্তায়ী হয় না। পালিয়ে যাওয়া প্রেমিকপ্রবর ফিরে আসে, দায়িত্ব নিতে চায় তার পিতৃত্বের। খুশির ঢল নামে বাটা'র এক টালির চালের এক কামরার ভ্যানচালকের বাড়িতে। বাড়ির সামনের মন্দিরে পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা রাতারাতি মালাবদল করিয়ে দেয়, ছেলেটি তার সিদ্ধান্ত পাল্টানোর আগেই।

একদিন সকালবেলা সুশীলবাবুই খবরটা নিয়ে আসে। নীলুর সে কি বুকফাটা কান্না। বিছানায় উপুড় হয়ে হাত চাপড়ে চাপড়ে কান্না মুখে আহাজারি। নীলুকে এমনকি সান্তনা দেওয়ার জন্যেও আমার মুখে কোন কথা যোগায়নি। ফোনে সুশীলবাবুই খবর দেয় পলুকে, নীলু এখানে প্রচন্ড আপসেট আর বাচ্চা পাওয়ার আশাও না এর বরাবরই। পলু পত্রপাঠ নীলুকে দেশে ফিরে যেতে বলে।
সর্বশেষ আশাটুকু বিসর্জন দিয়ে নীলু ফিরে যায় খালি হাতেই।

কিছুকাল নীলুর সাথে যোগাযোগ ছিল। মাঝে মাঝে চিঠি লিখত নীলু। চিঠিতে নানান কথা-গল্প করত নীলু কিন্তু নিজের কোন কথা লিখত না। আমি ঢাকায় গেলে নীলুকে দেখে আসতাম। সেই একই বাড়ির দোতলা- তিনতলায় নীলু আর রীমা থাকে যে যার মত। পারতপক্ষে কেউ কারোর মুখদর্শন না করলেও অতিথি অভ্যাগত এলে রীমা নেমে আসে নিচে, নীলুর ঘরে, ড্রয়িংরুমে বসে থেকে অতিথি আপ্যায়ণ করে। ছেলেটিই শুধু যখন তখন সব নিয়মভঙ্গ করে ঢুকে পড়ে নীলুর ঘরে মা মা বলে। পলু আর রীমার আরেকটি ছেলে হয়েছে শেষবার দেখে এসেছিলাম।