Sunday, March 02, 2008

মেয়েজন্মের পাঁচা৯

মেঘলা আকাশ। গভীর রাত। সে এখনও বাড়ি ফেরেনি। শেষ দুপুরে বেরিয়েছিল কিছু একটা মিটিং আছে বলে। মিটিং প্লেসটা অবশ্য আমার জানা, দৃক ইন্ডিয়ার অফিস। কিছু একটা সংক্ষিপ্ত সিনেমা বানানোর কাজ চলছে, এইডস রোগিদের নিয়ে। বিদেশী পয়সায় বিদেশীদের দেখানোর জন্যে এরকম অনেক কাজ এঁরা করে থাকেন, এই ফাঁকে নিজেডের কাজও হয়ে যায়। বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে এই কাজটি, ফাঁকে ফাঁকেই অন্য আরো সব কাজের প্ল্যানও ভাজা হয়। সন্ধ্যে ছ'টার পর অফিসটা মোটামুটি শুঁড়িখানা হয়ে যায় এটা ওখানকার লোকজনই বলে থাকেন। তো এহেন দৃকের অফিসে কাজ মানে মিটিং হলেই ফিরতে মাঝরাত পার। কালও তাই হবে ধরে নিয়ে বেরুনোর আগে জানতে চাই, ফিরতে মাঝরাত পার? না না! শুভ বেরিয়ে যাবে আটটায়, ওর কাজ আছে! আমি খানিকটা নিশ্চিন্ত হই। আমার একেবারেই পছন্দ নয় এই রাত করে বাড়ি ফেরা তবুও এ হরবখতই হয়ে থাকে, নতুন কিছু নয়। এই রাত করে বাড়ি ফেরা নিয়ে কিছু না ভাবলেই হয়। মাথা না ঘামালেই হয়। কিন্তু এই মাথাটাই সব গড়বড় করে দেয়। এলোমেলো ভাবনার কাঁধে চেপে ঔদাস্য এসে হাজির হয়। আমি বুঝতে পারি, আমার জ্বর বাড়ছে।


রাত দশটা বাজতে চলল দেখে ফোন করি, কোথায় আছ? প্রচন্ড শোরগোলই বলে দেয় যে সে অলিপাবে আছে, আর তিনিও তাই বলেন। কখন ফিরছ জানতে চাইলে জবাব আসে, এই উঠছি! বারোটা বাজছে দেখে আবার ফোন করি, আমার ফোন পৌঁছুতে পারে না সেখানে। তিনি নট রিচেবল। খানিক পরে আবার চেষ্টা করি। যান্ত্রিক কন্ঠস্বর একই কথা জানিয়ে দেয়। নট রিচেবল। নট রিচেবল।। ফোন যায় শুভর ফোনে, শুভ জানায়, ও বাড়ি পৌঁছুনোর পথে! বলে, সেও পৌঁছুচ্ছে হবে! আমি দু:শ্চিনতায় আকুল হই, এত রাতে গাড়ি পাবে তো?!

 

নীরব নীরব মধ্যরাত। দূরে টিমটিম করে জ্বলে হাওড়া সেতুর বাতি। আর কাছের বিদ্যাসাগর সেতুর সংযোগকারী সব উড়ালপুলের গোলাকার বিশাল উঁচু উঁচু ল্যাম্পপোষ্টে সাদা বাতি শুধু এক মৃত ঠান্ডা আলো ছড়িয়ে যায়। রাতজাগা কোন পাখিও রা কাড়ে না এমনকি ডাকে না একটি কুকুরও। আমার সিগারেটের প্যাকেট খালি হয় শুধু জানলার ধারে বসে বসে। ঐ আলো আঁধারির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে। মাঝে মাঝে উঠে এসে বসি কম্পিউটার স্ক্রীনের সামনে, দেখি পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের নানা বিষয়ের আলাপ-আলোচনা, ঝগড়া-বিতন্ডা। ভালো লাগে না। কিছু লিখতে ইচ্ছে করে না। আধখানা লিখে রাখা গল্পটা আদৌ শেষ হবে কিনা সে ভাবনাও আসে মাথায় কিন্তু নিয়ে বসতে ইচ্ছে করে না! এই গভীর নীরব নীরব মধ্যরাত শুধু চেপে বসতে থাকে বুকের পরে, মাথার ভিতরে। রাগ হয় না। কষ্ট হয় না। এক অদ্ভুত নিরাসক্তি এসে ভর করে।


আমার মাঝে মাঝেই এক অদ্ভুত রকমের জ্বর হয়। খুব বেশি ওঠে না আর সারাদিন থাকেও না। শীত শীত লাগতে থাকে, গায়ে হালকা উত্তাপ। পা দুটোতে যেন কিছুতে কামড়ায়। জ্বর এতটা ওঠে না যে আমি নিজেকে অসুস্থ ঘোষণা করে শয্যা নেব আবার সুস্থ যে নই তাও নিজেই বুঝি। এরকম আমার মাঝে মাঝেই হয়। আর একবার শুরু হলে টানা কিছুদিন চলে। সর্বোচ্চ তিন মাস চলেছিল একবার। আমি নিজেও হয়রান সাথে হয়রান আমার ডাক্তারও। এমন কোন অ্যান্টিবায়োটিক নেই যা সে আমায় খাওয়ায়নি আর হেন টেষ্ট নেই যা সে করায়নি। কোন রোগ ধরা পড়ে না, আমি শুধু ওষুধ খেয়ে যাই মাসের পর মাস। একসময় ক্লান্তি আসে, এক ডাক্তার বন্ধু বলে ওষুধ বন্ধ করে দিয়ে দেখো তো কি হয়। আমি ওষুধ বন্ধ করে দিই, দিন দশ তারপরেও জ্বর থাকে অবশেষে ছেড়ে যায়! বন্ধু বলে, কি এত ভাব যে গায়ে জ্বর চলে আসে?!



এখন আর তাই ডাক্তারের কাছে যাই না। জ্বর এলে চুপচাপ শুয়ে পড়ি আমার নকশীকাঁথা গায়ে দিয়ে, খেয়ে নেই একটা প্যারাসিটামল। এখন জ্বর এলে আর অমন তিন মাস থাকে না, মাসখানেকেই সেরে যায়। কখনও বা তারও কম। আমার আশে পাশের লোকজনও তাই এই জ্বর নিয়ে মাথা ঘামায় না, জানে, 'ভালুক জ্বর' এসেছে আবার চলেও যাবে! এবার এই ৪-৫ দিন হল শুরু হয়েছে, দেখা যাক ক'দিনে যায়! মুশকিলটা হয়, জিম যেতে পারি না। সারাদিন বাড়ির ভেতরে চারতলার এই ফ্ল্যাটে। মাঝে মাঝে দমবন্ধ লাগে, নি:শ্বাষ নিতে পারি না বলে মনে হয়। দূরে কোথাও যেতে ইচ্ছে করে, তাও পারি না। এমন সব সময়ে আমার এই মেয়েজন্ম নিয়ে আমি শোকে কাতর হই, সেই ছেলেবেলার মত। কেন মেয়ে হলাম -এই ভাবনাটা আসে অনিচ্ছা সত্বেও।


ভোররাতে ঘুম ভেঙে যায়। খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট এসে ভিজিয়ে দিয়েছে শরীর। উঠতে চেয়েও উঠি না, পারি না। মনে হয় থাক না, কী হবে! ঝুম বৃষ্টি বাইরে। আলো ফুটেছে কিন্তু কিছু দেখা যায় না ঘন ঘোর বর্ষণে। শীত শীত লাগে। সরে যাওয়া কাঁথা গায়ে ভালো করে গায়ে টেনে নিয়ে ওর বুকের মাঝখানে গিয়ে শুই, ঘুমিয়ে পড়ি।


-----



০৩-০৭-২০০৭

1 comment:

  1. ""ভোররাতে ঘুম ভেঙে যায়। খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট এসে ভিজিয়ে দিয়েছে শরীর। উঠতে চেয়েও উঠি না, পারি না। মনে হয় থাক না, কী হবে! ঝুম বৃষ্টি বাইরে। আলো ফুটেছে কিন্তু কিছু দেখা যায় না ঘন ঘোর বর্ষণে। শীত শীত লাগে। সরে যাওয়া কাঁথা গায়ে ভালো করে গায়ে টেনে নিয়ে ওর বুকের মাঝখানে গিয়ে শুই, ঘুমিয়ে পড়ি।""

    ঘুম ভাংগা এই সময়টা একটা অদ্ভূত অনুভূতি নিয়ে আসে............

    ভালো লাগছে....

    পরের অংশ কবে আসছে ???

    ReplyDelete