Saturday, March 01, 2008

মেঘবালিকা'র বিয়ে

মেঘবালিকার নাম মেঘবালিকা নয়। একটা ডাকনাম আর আরও একটা পোষাকী নামও আছে মেঘবালিকার। একটা নাম সে নিজেও দিয়েছে তাকে। নিজেকে সে নিজের দেওয়া নামেই ডাকে। নিজের সাথে কথা বলে, নিজেকে চিঠি লেখে মেঘবালিকা। সেই সব চিঠিতে সে তার স্বপ্নের কথা লেখে। মেঘেদের কথা লেখে। দূরের কোন এক পাহাড়ের গায়ে মেঘেদের কোলে সে এক বাড়ির স্বপ্ন দেখে। নিজের জন্যে সে একটা জায়গাও ঠিক করেছে। যেখানে সে যেতে চায়, থাকতে চায়। পাহাড়ের কোলে মেঘেদের যেখানে নিত্য আনাগোনা। সে তার স্বপ্নের দেশ। মেঘেরা সেখানে উড়ে বেড়ায় পায়রার মতন।

কম কথা বলে, চুপচাপ থাকে বেশির ভাগ সময়ে। বাড়িতে তার উপস্থিতি খুব একটা টের পাওয়া যায় না সব সময়। গান শুনতে ভালোবাসে মেঘবালিকা, ভালোবাসে বই পড়তেও। প্রিয় একটি বই মেঘবালিকা উপহার দেয় তার সব বন্ধুদের, দিয়েছে আমাকেও।

সব সময় সে এমন চুপচাপ ছিল না। ছোটবেলায় বরং বেশ দুরন্তই ছিল। কোনদিনও সে মেয়েদের জামা পরত না। ফ্রকগুলো সব পড়ে থাকত আর সে পরে থাকত টিশার্ট আর প্যান্ট। মাথার চুল সে নিজেই কাঁচি চালিয়ে কুচকুচিয়ে কেটে ফেলত চুপিচুপি। এবড়ো-খেবড়ো চুলে সে ঘুরে বেরাত যেখানে খুশি সেখানে। নিজেকে মেয়ে বলে ভাবতেও চাইত না। কিন্তু না চাইলেই কী হয়! এক সময় মেঘবালিকাকেও স্বীকার করে নিতে হয় যে সে মেয়ে। আর তখন থেকেই শান্ত হয়ে যায় সে, গুটিয়ে নেয় নিজেকে। সবাই যখন একসাথে আড্ডা দেয়, হই-হুল্লোড় করে, মেঘবালিকা তখন কোথাও একটা নিরিবিলি কোণ খুঁজে নিয়ে চুপচাপ গান শোনে, হাতে থাকে প্রিয় গল্পের বই।

একটা সময়ে মাষ্টারি শুরু করে মেঘবালিকা। তার পড়ানোর ঘরটাও ছিল এক অদ্ভুত জায়গায়। গোয়ালঘরে। বাড়ির সখের সিন্ধি গরুটি থাকত যে ঘরে সেই ঘরের এককোণে একটি চৌকি পাতা ছিল গরুটির রাখালের জন্যে। সেই চৌকিটি হয়ে ওঠে তার পড়ানোর জায়গা আর গোয়ালটি হয় ইশকুল ঘর। আশে পাশের যত গরীব-গুর্বো লোকেদের ইশকুল পালানো ছেলে-মেয়েরা ছিল তার ছাত্র। পড়ন্ত দুপুরে সবাই যখন ঘুমোয় কিংবা ঝিমোয় মেঘবালিকা তখন গোয়ালে বসে ছাত্র পড়ায় হাতে লম্বা ছড়ি নিয়ে। মাঝে মাঝেই বাতাসে ছড়ি চালায়-সাঁই সাঁই। ভয়ে বাচ্চাগুলো জোরে জোরে পড়তে শুরু করে, অ-য়ে অজগর আসছে তেড়ে আ-য়ে আমটি আমি খাব পেড়ে।

রাখাল ছেলেটি ছিল ভারি বদ। মাঝে মাঝেই হাওয়া হয়ে যেত। পরপর কয়েকদিন তার দেখা নেই। প্রতিদিন দু-বেলায় সিন্ধি গরুটি দুধ দেয় ১০ থেকে ১২ সের। রাখাল যখন পালায় তখন মুশকিল হয় দুধ দোয়ানো নিয়ে। দুধ কে দুইবে? হাম্বা হাম্বা রবে বাড়িতে টেকা দায়। মুশকিল আসান করে মেঘবালিকা। বালতিটি নিয়ে গরুর পায়ের কাছটিতে বসে পড়ে সে, খানিক হাত বুলিয়ে দেয় গুরুটির গলায়। মুখে বলে, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক, একদম নড়বি না! গরুটি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, আদর খেয়ে আরামে চোখ বোজে আর বালতি ভরে দুধ দুয়ে নেয় মেঘবালিকা। দিনের পর দিন।

এক গল্পকার তাকে নিয়ে গল্প লেখেন, 'মেঘবালিকা ও রৌদ্রকাল'। গল্পকার অবশ্য তার গল্পের মেঘবালিকাকে আমাদের মেঘবালিকার মত করে রচনা করেননি। গল্প এগিয়েছে গল্পের মত। তবু তবু সেই মেঘবালিকা অনেকটাই যেন আমাদের এই মেঘবালিকারই মতন।

মেঘবালিকা বড় হয়। বিয়ের সম্মন্ধ আসে এদিক ওদিক থেকে। মেঘবালিকা নাকচ করে সব। আমরা ভাবিত হই, তবে কী তার নিজের পছন্দের কেউ আছে? না। তাও নেই। বলে মেঘবালিকা। নানাজনে নানা কথা বলে। সে-সব সে শুনেও শোনে না। মেঘবালিকা কী ঘর-সংসার করতে চায় না? আমি জানি না সে কথা। আমার সাথে এ নিয়ে কখনো তার কোন কথা হয়নি।

একদিন ডাক আসে সূর্যোদয়ের দেশ থেকে। মেঘবালিকা শোনে সে ডাক, সাড়া দেয়।

আজ থেকে আর ঠিক তিনদিন পরে মেঘবালিকা বসবে বিয়ের পিঁড়িতে।

মেঘবালিকা,
তোর স্বপ্ন পূরণ হোক। কোন এক পাহাড়ের কোলে তোর ছোট্ট এক ঘর হোক। পায়রার মতন মেঘেরা সেখানে উড়ে উড়ে আসুক। প্রিয় বইটি, প্রিয় গানটি থাকুক তোর সাথে সব সময়।

ভালো থাকিস মেঘবালিকা।
খুব খুব ভালো থাকিস।
সব সময়।
সারা জীবন।
--
বড়আপু

4 comments:

  1. Jano...SAM...moner gohin theke ber howa bhalobasar lekha gulo sorgio hoi....

    arekbar onubhob korlam

    ReplyDelete
  2. আজ আরেকবার পড়লাম। অনুভূতি আরো গভীরতর....

    -মাছরাঙ্গা

    ReplyDelete