Saturday, March 22, 2008

তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা

তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা
--------------------


ঘুম ঘুম চোখে চলে অপেক্ষা। কে যেন পাশে শুয়ে আছে লম্বা হয়ে। চমকে উঠে কাউকে দেখতে পাই না। একছুটে ডাইনিং পেরিয়ে সামনের ঘর। দরজা খুলে তাকিয়ে দেখি অন্ধকার সিঁড়ি। কেউ কোথাও নেই। ভয় লাগে ভীষণ। দরজা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি দরজার গা ঘেঁষেই। বুকের ভেতর হৃদপিন্ড যেন ড্রাম বাজায়। দরজা ধরে দাঁড়িয়েই থাকি আমি। নিশুতি রাত। বাইরে বিলাপ করে বসন্ত বাতাস। জানালার পাশ দিয়ে উড়ে যায় এক নিশাচর পাখি, যেতে যেতে অদ্ভুত এক হাড়হিম করা স্বরে ডাক দিয়ে যায়। পর্দা টেনে দিই ভাল করে, এতটুকু ফাঁকও যেন না থাকে। পানি খাই আর নিজেকেই বলি, আমার ঘরে আর কেউ থাকে না আমি ছাড়া!


বসন্ত বাতাসে সই গো
-----------------


দিনের বেলা কাঠাফাটা রোদ্দুর কিন্তু বিকেল হলেই হাওয়া বইতে থাকে। উতল হাওয়া। বসন্ত বাতাস। কুউউউ শব্দে সে জানান দেয়, আবার এসেছে ফিরিয়া বসন্ত। ডালে ডালে রক্তলাল পলাশ। বাতাসে ওড়ে পর্দা। ন্যাড়া জামগাছে কচি সবুজ পাতা, মুকুলে ছেয়ে গেছে গাছ। পশ্চিমের গাছগুলো এই বসন্তে নেই। সেখানে এখন মিস্ত্রিদের যাতায়াত, ইট, কাঠ, লোহা আর সিমেন্ট। আধখানা পুকুর জুড়ে বাঁশের বেড়া, পড়বে মাটি, হবে বসত। পানকৌড়িদের তাই আর দেখা যায় না। কে জানে কোথায় আছে তারা।


দে দোল দে দোল
-----------


ফাগুন লেগেছে বনে বনে/ 
ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে মনে মনে।। 
এই ফাগুনে নানা রঙের মেলা। গাছে গাছে, ডালে ডালে আর সকলের মনে মনেও। আবির তাই আমার দরজায় এসে টোকা দেয়, রাঙিয়ে দেয় আমাকেও। না। এই উৎসবে লালপাড় হলুদ শাড়ি নেই, গাঁদা ফুলের মালা নেই, নাচ নেই, গান নেই। তাতে কী। ফাগুনের তাতে কীই বা এসে যায়! শান্তিনিকেতনে তুমি যাও বা না যাও ক্ষতি নেই, সে নিজেই এসে যাবে তোমার ঘরে, টেলিভিশনের দৌলতে। সারাদিন বসন্ত উৎসব। চ্যানেলে চ্যানেলে। লাইভ। জীবন্ত!
সকাল বেলায় ঋতু গুহ'র সাক্ষাত্কার একটা আসল পাওনা। তাঁর কথা, তাঁর চোখের জল। আদ্র হয় মন।


আরও কী সব যেন লিখব ভেবেছিলাম, ভুলে গেছি।


আজ থাক...

Sunday, March 02, 2008

মেয়েজন্মের পাঁচা৯

মেঘলা আকাশ। গভীর রাত। সে এখনও বাড়ি ফেরেনি। শেষ দুপুরে বেরিয়েছিল কিছু একটা মিটিং আছে বলে। মিটিং প্লেসটা অবশ্য আমার জানা, দৃক ইন্ডিয়ার অফিস। কিছু একটা সংক্ষিপ্ত সিনেমা বানানোর কাজ চলছে, এইডস রোগিদের নিয়ে। বিদেশী পয়সায় বিদেশীদের দেখানোর জন্যে এরকম অনেক কাজ এঁরা করে থাকেন, এই ফাঁকে নিজেডের কাজও হয়ে যায়। বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে এই কাজটি, ফাঁকে ফাঁকেই অন্য আরো সব কাজের প্ল্যানও ভাজা হয়। সন্ধ্যে ছ'টার পর অফিসটা মোটামুটি শুঁড়িখানা হয়ে যায় এটা ওখানকার লোকজনই বলে থাকেন। তো এহেন দৃকের অফিসে কাজ মানে মিটিং হলেই ফিরতে মাঝরাত পার। কালও তাই হবে ধরে নিয়ে বেরুনোর আগে জানতে চাই, ফিরতে মাঝরাত পার? না না! শুভ বেরিয়ে যাবে আটটায়, ওর কাজ আছে! আমি খানিকটা নিশ্চিন্ত হই। আমার একেবারেই পছন্দ নয় এই রাত করে বাড়ি ফেরা তবুও এ হরবখতই হয়ে থাকে, নতুন কিছু নয়। এই রাত করে বাড়ি ফেরা নিয়ে কিছু না ভাবলেই হয়। মাথা না ঘামালেই হয়। কিন্তু এই মাথাটাই সব গড়বড় করে দেয়। এলোমেলো ভাবনার কাঁধে চেপে ঔদাস্য এসে হাজির হয়। আমি বুঝতে পারি, আমার জ্বর বাড়ছে।


রাত দশটা বাজতে চলল দেখে ফোন করি, কোথায় আছ? প্রচন্ড শোরগোলই বলে দেয় যে সে অলিপাবে আছে, আর তিনিও তাই বলেন। কখন ফিরছ জানতে চাইলে জবাব আসে, এই উঠছি! বারোটা বাজছে দেখে আবার ফোন করি, আমার ফোন পৌঁছুতে পারে না সেখানে। তিনি নট রিচেবল। খানিক পরে আবার চেষ্টা করি। যান্ত্রিক কন্ঠস্বর একই কথা জানিয়ে দেয়। নট রিচেবল। নট রিচেবল।। ফোন যায় শুভর ফোনে, শুভ জানায়, ও বাড়ি পৌঁছুনোর পথে! বলে, সেও পৌঁছুচ্ছে হবে! আমি দু:শ্চিনতায় আকুল হই, এত রাতে গাড়ি পাবে তো?!

 

নীরব নীরব মধ্যরাত। দূরে টিমটিম করে জ্বলে হাওড়া সেতুর বাতি। আর কাছের বিদ্যাসাগর সেতুর সংযোগকারী সব উড়ালপুলের গোলাকার বিশাল উঁচু উঁচু ল্যাম্পপোষ্টে সাদা বাতি শুধু এক মৃত ঠান্ডা আলো ছড়িয়ে যায়। রাতজাগা কোন পাখিও রা কাড়ে না এমনকি ডাকে না একটি কুকুরও। আমার সিগারেটের প্যাকেট খালি হয় শুধু জানলার ধারে বসে বসে। ঐ আলো আঁধারির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে। মাঝে মাঝে উঠে এসে বসি কম্পিউটার স্ক্রীনের সামনে, দেখি পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের নানা বিষয়ের আলাপ-আলোচনা, ঝগড়া-বিতন্ডা। ভালো লাগে না। কিছু লিখতে ইচ্ছে করে না। আধখানা লিখে রাখা গল্পটা আদৌ শেষ হবে কিনা সে ভাবনাও আসে মাথায় কিন্তু নিয়ে বসতে ইচ্ছে করে না! এই গভীর নীরব নীরব মধ্যরাত শুধু চেপে বসতে থাকে বুকের পরে, মাথার ভিতরে। রাগ হয় না। কষ্ট হয় না। এক অদ্ভুত নিরাসক্তি এসে ভর করে।


আমার মাঝে মাঝেই এক অদ্ভুত রকমের জ্বর হয়। খুব বেশি ওঠে না আর সারাদিন থাকেও না। শীত শীত লাগতে থাকে, গায়ে হালকা উত্তাপ। পা দুটোতে যেন কিছুতে কামড়ায়। জ্বর এতটা ওঠে না যে আমি নিজেকে অসুস্থ ঘোষণা করে শয্যা নেব আবার সুস্থ যে নই তাও নিজেই বুঝি। এরকম আমার মাঝে মাঝেই হয়। আর একবার শুরু হলে টানা কিছুদিন চলে। সর্বোচ্চ তিন মাস চলেছিল একবার। আমি নিজেও হয়রান সাথে হয়রান আমার ডাক্তারও। এমন কোন অ্যান্টিবায়োটিক নেই যা সে আমায় খাওয়ায়নি আর হেন টেষ্ট নেই যা সে করায়নি। কোন রোগ ধরা পড়ে না, আমি শুধু ওষুধ খেয়ে যাই মাসের পর মাস। একসময় ক্লান্তি আসে, এক ডাক্তার বন্ধু বলে ওষুধ বন্ধ করে দিয়ে দেখো তো কি হয়। আমি ওষুধ বন্ধ করে দিই, দিন দশ তারপরেও জ্বর থাকে অবশেষে ছেড়ে যায়! বন্ধু বলে, কি এত ভাব যে গায়ে জ্বর চলে আসে?!



এখন আর তাই ডাক্তারের কাছে যাই না। জ্বর এলে চুপচাপ শুয়ে পড়ি আমার নকশীকাঁথা গায়ে দিয়ে, খেয়ে নেই একটা প্যারাসিটামল। এখন জ্বর এলে আর অমন তিন মাস থাকে না, মাসখানেকেই সেরে যায়। কখনও বা তারও কম। আমার আশে পাশের লোকজনও তাই এই জ্বর নিয়ে মাথা ঘামায় না, জানে, 'ভালুক জ্বর' এসেছে আবার চলেও যাবে! এবার এই ৪-৫ দিন হল শুরু হয়েছে, দেখা যাক ক'দিনে যায়! মুশকিলটা হয়, জিম যেতে পারি না। সারাদিন বাড়ির ভেতরে চারতলার এই ফ্ল্যাটে। মাঝে মাঝে দমবন্ধ লাগে, নি:শ্বাষ নিতে পারি না বলে মনে হয়। দূরে কোথাও যেতে ইচ্ছে করে, তাও পারি না। এমন সব সময়ে আমার এই মেয়েজন্ম নিয়ে আমি শোকে কাতর হই, সেই ছেলেবেলার মত। কেন মেয়ে হলাম -এই ভাবনাটা আসে অনিচ্ছা সত্বেও।


ভোররাতে ঘুম ভেঙে যায়। খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাট এসে ভিজিয়ে দিয়েছে শরীর। উঠতে চেয়েও উঠি না, পারি না। মনে হয় থাক না, কী হবে! ঝুম বৃষ্টি বাইরে। আলো ফুটেছে কিন্তু কিছু দেখা যায় না ঘন ঘোর বর্ষণে। শীত শীত লাগে। সরে যাওয়া কাঁথা গায়ে ভালো করে গায়ে টেনে নিয়ে ওর বুকের মাঝখানে গিয়ে শুই, ঘুমিয়ে পড়ি।


-----



০৩-০৭-২০০৭

Saturday, March 01, 2008

মেঘবালিকা'র বিয়ে

মেঘবালিকার নাম মেঘবালিকা নয়। একটা ডাকনাম আর আরও একটা পোষাকী নামও আছে মেঘবালিকার। একটা নাম সে নিজেও দিয়েছে তাকে। নিজেকে সে নিজের দেওয়া নামেই ডাকে। নিজের সাথে কথা বলে, নিজেকে চিঠি লেখে মেঘবালিকা। সেই সব চিঠিতে সে তার স্বপ্নের কথা লেখে। মেঘেদের কথা লেখে। দূরের কোন এক পাহাড়ের গায়ে মেঘেদের কোলে সে এক বাড়ির স্বপ্ন দেখে। নিজের জন্যে সে একটা জায়গাও ঠিক করেছে। যেখানে সে যেতে চায়, থাকতে চায়। পাহাড়ের কোলে মেঘেদের যেখানে নিত্য আনাগোনা। সে তার স্বপ্নের দেশ। মেঘেরা সেখানে উড়ে বেড়ায় পায়রার মতন।

কম কথা বলে, চুপচাপ থাকে বেশির ভাগ সময়ে। বাড়িতে তার উপস্থিতি খুব একটা টের পাওয়া যায় না সব সময়। গান শুনতে ভালোবাসে মেঘবালিকা, ভালোবাসে বই পড়তেও। প্রিয় একটি বই মেঘবালিকা উপহার দেয় তার সব বন্ধুদের, দিয়েছে আমাকেও।

সব সময় সে এমন চুপচাপ ছিল না। ছোটবেলায় বরং বেশ দুরন্তই ছিল। কোনদিনও সে মেয়েদের জামা পরত না। ফ্রকগুলো সব পড়ে থাকত আর সে পরে থাকত টিশার্ট আর প্যান্ট। মাথার চুল সে নিজেই কাঁচি চালিয়ে কুচকুচিয়ে কেটে ফেলত চুপিচুপি। এবড়ো-খেবড়ো চুলে সে ঘুরে বেরাত যেখানে খুশি সেখানে। নিজেকে মেয়ে বলে ভাবতেও চাইত না। কিন্তু না চাইলেই কী হয়! এক সময় মেঘবালিকাকেও স্বীকার করে নিতে হয় যে সে মেয়ে। আর তখন থেকেই শান্ত হয়ে যায় সে, গুটিয়ে নেয় নিজেকে। সবাই যখন একসাথে আড্ডা দেয়, হই-হুল্লোড় করে, মেঘবালিকা তখন কোথাও একটা নিরিবিলি কোণ খুঁজে নিয়ে চুপচাপ গান শোনে, হাতে থাকে প্রিয় গল্পের বই।

একটা সময়ে মাষ্টারি শুরু করে মেঘবালিকা। তার পড়ানোর ঘরটাও ছিল এক অদ্ভুত জায়গায়। গোয়ালঘরে। বাড়ির সখের সিন্ধি গরুটি থাকত যে ঘরে সেই ঘরের এককোণে একটি চৌকি পাতা ছিল গরুটির রাখালের জন্যে। সেই চৌকিটি হয়ে ওঠে তার পড়ানোর জায়গা আর গোয়ালটি হয় ইশকুল ঘর। আশে পাশের যত গরীব-গুর্বো লোকেদের ইশকুল পালানো ছেলে-মেয়েরা ছিল তার ছাত্র। পড়ন্ত দুপুরে সবাই যখন ঘুমোয় কিংবা ঝিমোয় মেঘবালিকা তখন গোয়ালে বসে ছাত্র পড়ায় হাতে লম্বা ছড়ি নিয়ে। মাঝে মাঝেই বাতাসে ছড়ি চালায়-সাঁই সাঁই। ভয়ে বাচ্চাগুলো জোরে জোরে পড়তে শুরু করে, অ-য়ে অজগর আসছে তেড়ে আ-য়ে আমটি আমি খাব পেড়ে।

রাখাল ছেলেটি ছিল ভারি বদ। মাঝে মাঝেই হাওয়া হয়ে যেত। পরপর কয়েকদিন তার দেখা নেই। প্রতিদিন দু-বেলায় সিন্ধি গরুটি দুধ দেয় ১০ থেকে ১২ সের। রাখাল যখন পালায় তখন মুশকিল হয় দুধ দোয়ানো নিয়ে। দুধ কে দুইবে? হাম্বা হাম্বা রবে বাড়িতে টেকা দায়। মুশকিল আসান করে মেঘবালিকা। বালতিটি নিয়ে গরুর পায়ের কাছটিতে বসে পড়ে সে, খানিক হাত বুলিয়ে দেয় গুরুটির গলায়। মুখে বলে, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক, একদম নড়বি না! গরুটি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, আদর খেয়ে আরামে চোখ বোজে আর বালতি ভরে দুধ দুয়ে নেয় মেঘবালিকা। দিনের পর দিন।

এক গল্পকার তাকে নিয়ে গল্প লেখেন, 'মেঘবালিকা ও রৌদ্রকাল'। গল্পকার অবশ্য তার গল্পের মেঘবালিকাকে আমাদের মেঘবালিকার মত করে রচনা করেননি। গল্প এগিয়েছে গল্পের মত। তবু তবু সেই মেঘবালিকা অনেকটাই যেন আমাদের এই মেঘবালিকারই মতন।

মেঘবালিকা বড় হয়। বিয়ের সম্মন্ধ আসে এদিক ওদিক থেকে। মেঘবালিকা নাকচ করে সব। আমরা ভাবিত হই, তবে কী তার নিজের পছন্দের কেউ আছে? না। তাও নেই। বলে মেঘবালিকা। নানাজনে নানা কথা বলে। সে-সব সে শুনেও শোনে না। মেঘবালিকা কী ঘর-সংসার করতে চায় না? আমি জানি না সে কথা। আমার সাথে এ নিয়ে কখনো তার কোন কথা হয়নি।

একদিন ডাক আসে সূর্যোদয়ের দেশ থেকে। মেঘবালিকা শোনে সে ডাক, সাড়া দেয়।

আজ থেকে আর ঠিক তিনদিন পরে মেঘবালিকা বসবে বিয়ের পিঁড়িতে।

মেঘবালিকা,
তোর স্বপ্ন পূরণ হোক। কোন এক পাহাড়ের কোলে তোর ছোট্ট এক ঘর হোক। পায়রার মতন মেঘেরা সেখানে উড়ে উড়ে আসুক। প্রিয় বইটি, প্রিয় গানটি থাকুক তোর সাথে সব সময়।

ভালো থাকিস মেঘবালিকা।
খুব খুব ভালো থাকিস।
সব সময়।
সারা জীবন।
--
বড়আপু