Wednesday, February 27, 2008

জেগে আছে বাংলাদেশ


রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
চমকিয়া জাগে ঘুমন্ত বনভূমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
দুরন্ত অরণ্যা গিরি নির্ঝরিনী
রঙ্গে সঙ্গে লয় বনের হরিণী
শাখায় শাখায় ঘুম ভাঙায়
ভীরু মুকুলের কপোল চুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি

প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় টুটুকে দেখি ৷ দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায় ৷ কখনো বারান্দার থামে হেলান দিয়ে তো কখনও বা রেলিংএ ভর দিয়ে ৷ এটা ওর রোজকার নিয়ম, যখন থেকে ও এখানে এসেছে, তখন থেকেই দেখছি ওকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে ৷ না ৷ টুটু সারাদিন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে না, আমি স্কুলে চলে গেলেই ও বাড়িরে ভেতরে চলে যাবে৷ নিজে কলেজে যাওয়ার জন্যে রেডি হয়ে বারান্দার নিচেই হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হিরো সাইকেলটা নিয়ে চলে যাবে কলেজে৷ আমি যখন স্কুল থেকে ফিরি তখনও আবার দেখি, ও এসে দাঁড়িয়েছে ৷ কখন বাড়ি ফেরে কলেজ থেকে জানি না তবে আমি বাড়ি ফেরার আগেই ও ফিরে আসে আর এসে দাঁড়ায় বারান্দায় ৷ এই দৃশ্যের সাথে এখন মোটমুটি সকলেই পরিচিত ৷ সবাই জানে, টুটু কখন, কোন সময়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবে ৷ এই নিয়ে বেশ হেনস্থাও হয়েছে ওর, আম্মুই সেটা করেছে ৷ ওদের বাড়ি গিয়ে বহুবার নালিশ করে এসেছে ওর খালার কাছে, কেন ও এভাবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে আমার স্কুলে যাওয়া-আসার সময়, আর বিকেলে খেলার সময় ৷ 


নালিশ করার পর দু-একদিন বন্ধ থেকেছে ওর বারান্দায় এসে দাঁড়ানো, তারপর আবার যে কে সেই ৷ মুর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের বারান্দার দিকে চোখ রেখে ৷ এছাড়া আর কোন উত্পাত নেই ৷ মোড়ের মাথায় আমি রিকশা থেকে নামার আগেই চোখ যায় ওদের বারান্দার দিকে৷ জানি ও দাঁড়িয়েই থাকবে তবু একবার তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া৷ হুঁ, ও আছে, আমি এগিয়ে যাই বাড়ির দিকে, স্কুলব্যাগ কাঁধে ঝোলানো, চশমাটা একবার শুধু-মুদুই খুলে আবার চোখে পরি, বুকের ওপরে পড়ে থাকা দুই বিনুনীর একটাকে হালকা ঝটকায় পাঠিয়ে দিই পেছনে, পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই বাড়ির দিকে ওর পানে একবারও না তাকিয়ে ৷ অনুভব করতে পারি ওর নিষ্পলক চাউনি অনুসরণ করছে আমায়, হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ও সোজা হয়ে দাঁড়লো, না তাকিয়েও টের পাই ৷ সামনে তাকিয়ে দেখি আম্মু দাঁড়িয়ে আছে জানালায়, রোজ যেমন থাকে৷ দরজাটা খোলা, রোজ যেমন থাকে৷ বাতাসে পর্দাটা উড়ছে৷ ছোট্ট কাঠের গেট পেরিয়ে আমি ঢুকে যাই ভেতরে৷ আম্মু এগিয়ে এসে হাত বাড়ায় কাঁধের ব্যাগ নেবে বলে, রোজ যেমন নেয় ৷

বিকেলে এখন আর খেলতে মাঠে যাই না ৷ আম্মুর অনেক বকাঝকা আর শাসনেও যা হয়নি ইদানিং নিজে থেকেই সেটা হয়েছে ৷ এখন আর খেলতে যেতে ইচ্ছে করে না ৷ বই নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে থাকাটা বরং অনেক বেশি ভাল লাগে আজকাল৷ তবে বারান্দায় গিয়ে খুব যে একটা বসতে পারি তা নয়৷ পাশের বাড়ির টুটুর জন্যে, ঐ ছেলেটির জন্য আমি বারান্দায় বসতে পাই না, বারান্দাটা যেন আমার নয়, ওর ৷ ও আমায় বিরক্ত করে না একদমই ৷ কোন উটকো মন্তব্য তো ও আজ অব্দি করেনি আর সেই একবার এক চিঠি লেখা ছাড়া আর কোন চিঠিও লেখেনি ৷ আম্মু সবই জানে, তবুও ঘুরে ফিরেই বারান্দায় আসবে নিজের ঘুম নষ্ট করে ৷ আমি তাই সামনের এই বসার ঘরের সোফায় আধশোয়া হই, সাথে বই ৷ মাঝে মাঝেই চোখ যায় সামনের বাড়ির বারান্দার দিকে, টুটু কী আছে? না! ওর এখন পড়াতে যাওয়ার সময়, এমন ভাবেই আমি জেনে যাই, সারাদিনে সে কি করে৷ বিকেলে দুটো টিউশনি করে টুটু ৷ আমাদের এই হাউজিং এষ্টেটেরই দু'নম্বর রোডের কোথাও একটা পড়াতে যায় ও, সপ্তায় পাঁচদিন ৷ আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে এলেই ও বেরিয়ে যায় সাইকেলে চেপে, টিউশনিতে ৷ আমি ওবাড়ির খালাম্মার কাছ থেকেই গল্প শুনেছি ৷ 


টুটু তার বড় আপার ছেলে ৷ টুটুর মা, বাবা গ্রামে থাকেন ৷ যেখানে কোন কলেজ নেই ৷ টুটু তার গ্রামের স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে খালার বাসায় এসেছে কলেজে পড়বে বলে ৷ সে বেশ কয়েক বছর আগের কথা ৷ বছর তিন তো হবেই! টুটু আসার আগে আমি প্রায় রোজই যেতাম খালাম্মার কাছে, স্কুল থেকে ফিরে, ছুটির দিনে যখন তখন ৷ টুটু আসার পরেও যেতাম ৷ টুটু কখনই আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেনি ৷ আমি প্রথম টুটুকে দেখে বেশ মজা পেয়েছিলাম৷ ফর্সা ভ্যাদভ্যাদে গায়ের রং, মাথার কোকড়ানো চুল তেল চুপচুপে, ছোট্ট একটা গোঁপও আছে ৷ টুটুর অত ফর্সা গায়ের রং দেখে কী আমার হিংসে হয়েছিল! আমাকে যদিও কেউ কালো বলে না কিন্তু ফর্সাও কেউ কোনমতেই বলতে পারে না, বলে উজ্জ্বল শ্যাম! উজ্জ্বল শ্যাম না ছাই, আমি জানি, আমি কালো, খুব বেশি হলে শ্যামলা বলা যায় আমাকে ৷ ঢ্যাঙা টুটু শার্টের সাথে লুঙ্গি পরে থাকে বাড়িতে, গোড়ালির উপরে সেই লুঙ্গির ঝুল৷ টুটু এত ঢ্যাঙা যে লুঙ্গি ওর নিচে আর নামে না৷ খালার বাসায় থাকতে আসার এক মাসের মধ্যেই টুটু আমায় চিঠি লেখে৷
" রুকু,
আমি তোমাকে ভালোবাসি৷ তুমি আমার মন চুরি করেছ৷ আমি কি তোমার মন চুরি করতে পেরেছি?
যদি আমিও তোমার মনকে চুরি করতে পেরে থাকি তো আমার এই চিঠির উত্তর তুমি আমার বইয়ের ভেতরে রেখে যেও৷
তোমার চিঠির অপেক্ষায় রইলাম৷
তোমার,
জাহিদ ৷'


আমি সেই প্রথম জানতে পারলাম যে ওর ভাল নাম জাহিদ ৷ না ৷ টুটুর চিঠির উত্তর আমি বইয়ের ভেতর রেখে আসিনি ৷ উত্তর দেব এমনটাও ভাবিনি৷ চিঠিটা রেখে দিয়েছিলাম পড়ার টেবিলে৷ গল্পের বই পড়ছি কী না চেক করতে এসে সেই চিঠি বাজেয়াপ্ত করে আম্মু ৷ ভাল মন্দ কোন কথা জিজ্ঞেস না করেই বিনুনী ধরে এক হ্যাচকা টান আর সপাট চড় দু'গালে ৷ কোন দোষ না করেই আমি মার খেলাম সেদিন, টুটু আমাকে চিঠি লিখেছিল বলে৷ এক ছুটে আমি টুটুর খালার বাসায়, উলের গোলা কোলে নিয়ে সোয়েটার বুনছিলেন খালাম্মা, সারাদিনই তিনি বোনেন ৷ ফোঁপাতে ফোঁপাতে ঘটনার বর্ণনা দিলাম আমি ৷ খালাম্মা উঠে গিয়ে দরজার ওপাশ থেকে কান ধরে ঘরে নিয়ে এলেন টুটুকে ৷ আমাকে আসতে দেখে নি:শব্দে দরজার ওপাশে এসে দাঁড়িয়েছিল টুটু, খালাম্মা বললেন, দ্যাখ, কি করেছিস! প্রচন্ড রাগে আমি মুখ ফিরিয়ে ছিলাম টুটুর দিক থেকে , খালাম্মা আবার বললেন, তুই কাঁদছিস কেন, মার তো খেয়েছে রুকু ৷ আমি জানলাম, আমি মার খেলে টুটুও কাঁদে ৷ টুটু বলল, আর হবে না আম্মি ৷ জানলাম, টুটু তার খালাকে আম্মি বলে ডাকে ৷ দরজার ওপাশে আম্মুর গলা পেলাম, রুকু, উঠে এসো! তাকিয়ে দেখলাম গম্ভীর মুখে আম্মু দাঁড়িয়ে আছে দরজায় ৷ 

খালাম্মা বললেন, আপা, আপনি রুকুকে কেন মারলেন? ও কি দোষ করেছে? আম্মু কোন কথার জবাব না দিয়ে হাত ধরে আমাকে বাড়ির দিকে এগোল৷ বেরুনোর সময় আমি তাকালাম টুটুর দিকে, গভীর কালো দুটো চোখ নিষ্পলক তাকিয়ে আমার দিকে, যেন বলছে,' রুকু, আর হবে না!' ঘরে ফিরে আম্মু আমার বিনুনী খুলে দিল, ভিজে তোয়ালেতে মুখ মুছিয়ে দিল আর বলল, তুই ওকে চিঠি লিখিসনি তো? ঘাড় নেড়ে জানালাম, না, আমি লিখিনি ৷ আম্মু তখন খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে আমাকে সামনে বসিয়ে তেলের বাটি আর চিরুণী হাতে নিয়ে আমার চুলে তেল দিতে বসল রোজকার মত আর আমাকে পাঠ দিল ছেলেদের সম্পর্কে, সেই আমি প্রথম জানলাম, ছেলেগুলো এরকমই হয় ৷ মেয়েদের চিঠি লেখে, ফুসলায় আর তারপরে নষ্ট করে দেয়!

আমার সেদিনের মার খাওয়া আমি ভুলে গেলেও টুটু ভোলেনি ৷ টুটু আর কোনদিন আমায় চিঠি লেখেনি ৷ রুনা আপু বলে, টুটু নাকি সত্যি আমায় ভালবাসে ৷ আমি রুনা আপুর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসি ৷ রুনা আপু খালাম্মার মেয়ে ৷ টুটুর খালাতো বোন ৷ পড়ে আমার থেকে এক ক্লাস উপরে, একই স্কুলে পড়ি আমরা ৷ জিন্দাবাজার সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ৷ এ'বছর রুনা আপু ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবে ৷ টেষ্ট পরীক্ষার আগে অব্দি আমি আর রুনা আপু একসাথেই স্কুলে যেতাম ৷ এখন ওর স্টাডি লীভ চলছে বলে রুনা আপু বাড়িতেই থাকে বেশির ভাগ সময়, বেশির ভাগ সময় নয়, রুনা আপু বাড়িতেই থাকে সব সময় ৷ পরীক্ষার আর সবে দু মাস৷ আগে রুনা আপু বিকেলে চলে আসতো আমাদের বাড়ি ৷ গল্প করার জন্যে ওকেই আসতে হতো কারণ আমার তো ওবাড়িতে যাওয়া বারণ টুটুর জন্যে ৷ বারণ বলতে আম্মু কখনই মুখে বারণ করেনি কিন্তু সারাক্ষণ যেভাবে চোখে চোখে রাখে আমাকে, আমি ওবাড়িতে গেলে খানিক পরেই আম্মুও ঠিক এসে হাজির হয়, রুকু, পড়া আছে না? বাড়ি চল! আমি বুঝে নিয়েছি আমার ওবাড়িতে যাওয়া চলবে না ৷ 

আমার মাঝে মাঝে খুব রাগ হয় আম্মুর পরে৷ আম্মু এত অবুঝ কেন? আব্বুকে কিছু বলতে এখন আমার সংকোচ হয় ৷ বিশেষ করে টুটুর ঐ চিঠি লেখার পর থেকে ৷ তবুও আব্বু বরং অনেক বেশি বোঝে আমাকে, আম্মুর থেকে অন্তত বেশি বোঝে, আব্বু বলে, কেন রুকু বারান্দায় যাবে না? কেন রুনাদের বাড়ি যাবে না? আর তুমি খেলতেই বা যাবে না কেন? ইচ্ছে হলেই যাবে রুনাদের বাড়ি, গল্প করবে, সামনের মাঠে গিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলবে! কিন্তু আমার যাওয়া হয় না ৷ ঐ টুটুর জন্যেই যাওয়া হয় না ৷ আমি ওবাড়ি গেলে টুটু টিউশনি পড়াতে যায় না ৷ এমনকি কোন কারণে আমি স্কুলে না গেলে টুটুও কলেজে যায় না ৷ কাজেই আমার চলা ফেরার গন্ডিটা অনেক ছোট হয়ে যায় ধীরে ধীরে ৷ টুটুর জন্যে ৷

টুটুর খালাম্মা উল বোনেন, অলমোষ্ট বারো মাস বোনেন, শুধু যখন প্রচন্ড গরম পড়ে, হাতের ঘামে উলে ফেঁসে ফেঁসে যায়, তখন কিছুদিন বন্ধ থাকে এই উলবোনা ৷ প্রতিবছর খালাম্মা সোয়েটারগুলোকে খোলে, যেগুলোকে আগের বছর বানিয়েছিল, টুটুর জন্যে, খালুজীর জন্যে আর রুনা আপুর জন্যে ৷ হাতের লম্বা লম্বা টানে উল ছাড়িয়ে নিতে থাকে সোয়েটার থেকে,এক অদ্ভুত কায়দায় ছাড়িয়ে নেওয়া উলের গোলা বানায় হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, ডিমের মত আকারে, বড় বড় সব গোলা, লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি, সাদা আর সবুজ৷ ডিম্বাকৃতি সব গোলা ৷ দুটো তিনটে গোলা একসাথে নিয়ে খালাম্মা বোনে, দু ঘর লাল, মাঝের চার ঘর সাদা কিংবা সবুজ, আবার দু ঘর লাল ৷ ফুটে ওঠে বকুল ফুল খালাম্মার সোয়েটারে ৷ 

তেকোণা ষ্টোলে খালাম্মা ফুটিয়ে তোলে বড় বড় কদমের ফুল ৷ যার গা থেকে ঝুলছে গোল গোল কদম, গলার দিকটায় গোল একটা বড় ফুটো, যাতে মাথা গলিয়ে সেই ষ্টোল গায়ে দেয় রুনা আপু ৷ আমি বসে খালাম্মার বোনা দেখি, কখনও বা নিজেও একটু হাত লাগাই, চেষ্টা করি খালাম্মারই মত তাড়াতাড়ি হাত চলাতে উলের কাঁটায়, কিন্তু হয় না ৷ গত বছর আমিও বুনেছি একটা সোয়েটার, ভাইয়ার জন্যে ৷ প্যাচানো সাপ উঠে গেছে সেই সোয়েটারের ঝুল থেকে গলা অব্দি, নিচে চার ইঞ্চি চওড়া বর্ডার, হাতের বর্ডার দু ইঞ্চি, তেকোণা গলার বর্ডার দেড় ইঞ্চি ৷ গাঢ় কচুয়া  রঙের জমিতে সাপগুলো হলুদ ৷ বোনার সময় আটকালেই এক ছুটে খালাম্মার কাছে, বুনতে গিয়ে মাঝে মাঝেই একটা ঘর ছেড়ে দিতাম, সাথে সাথে বুঝতে পারতাম না যে একটা ঘর ছেড়ে দিয়েছি বোনার সময়, বেশ কয়েক লাইন বোনা হয়ে গেলে যখন বুঝতে পারতাম, তখন ছুট খালাম্মার কাছে, খালাম্মা সেপটিপিন দিয়ে সেই ঘর এক লাইন এক লাইন করে তুলে আবার কাঁটায় তুলে দিয়ে শুধরে দিত বোনার ভুল ৷


-০২-


বড়ো বেদনার মত বেজেছ হে তুমি আমার প্রাণে,
মন যে কেমন করে মনে মনে তাহা মনই জনে৷৷
তোমারে হদৃয়ে করে আছি নিশিদিন ধরে,
চেয়ে থকি আঁখি ভরে মুখের পানে৷৷
বড়ো আশা, বড়ো তৃষা, বড়ো আকিঞ্চন তোমারি লাগি৷
বড়ো সুখে, বড়ো দুখে, বড়ো অনুরাগে রয়েছি জগি৷
এ জন্মের মতো আর হয়ে গেছে যা হবার,
ভেসে গেছে মন প্রাণ মরণ-টানে৷৷


আমি বড় একলা হয়ে গেছি যখন থেকে ভাইয়া ক্যাডেট কলেজে পড়তে গেছে৷ ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ৷ চট্টগ্রামের কাছে৷ সেই কতদূর! বছরে দু বার মাত্র ওদের ছুটি৷ তাও রোজার ঈদে পনের দিন আর কোরবানীর ঈদে মাত্র এক সপ্তাহ৷ ভাইয়ার ছুটির আগেই আব্বু চট্টগ্রাম চলে যায় আর দু'দিন পর ভাইয়াকে সাথে নিয়ে ফেরে৷ কি বিশাল এক লোহার ট্রাঙ্ক ভাইয়ার, তাতে বড় বড় করে সাদা রং দিয়ে লেখা , কায়সার আহমেদ৷ একাদশ শ্রেণী৷ ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ, চট্টগ্রাম৷ একপাশে ইংরেজী আর একপাশে বাংলায় লেখা ৷ প্রতিবার ভাইয়া বাড়ি ফেরার সময় এই ট্রাঙ্ক নিয়ে ফেরে আবার এটা সাথে করে নিয়ে যায় ৷ আমি ভাইয়াকে কয়েকবার বলেছিও, হ্যাঁরে ভাইয়া, তুই এত্ত বড় একটা ট্রাঙ্ক প্রতিবার নিয়ে আসিস আর নিয়ে যাস? ছোট একটা স্যুটকেসে করে জামাকাপড় নিয়ে এলে কি হয়? ভাইয়া বলে, ওর ওখানে রেখে আসার সিষ্টেম নেই৷ 

সব ছাত্রেরই একটা করে এরকম ট্রাঙ্ক আছে আর প্রত্যেকেই সেটা বাড়ি নিয়ে যায় আর নিয়ে আসে আর প্রত্যেকের ট্রাঙ্কেই নাকি সাদা বা কালো কালিতে নাম লেখা থাকে ৷ সেই ট্রাঙ্কে ভাইয়ার যাবতীয় জিনিসপত্র ৷ বই খাতা, জামা কাপড় এমনকি খেলার সরামও ৷ ভাইয়া ক্রিকেট খেলে৷ তার ব্যাট, বল, স্ট্যাম্প, প্যাড, গ্লাভস সব থাকে এই ট্রাঙ্কের ভেতর ৷ ভাইয়া যখন বাড়ি ফেরে তখন সবচাইতে বেশি আনন্দ হয় আমার৷ এই পনের আর সাত মোট বাইশ দিন আমার কোথাও যেতে নেই মানা ৷ দুই ঈদের সময় আমার স্কুলও ছুটি থাকে কাজেই পড়ার টেনশনও থাকে না ৷ ভাইয়া আসার আগেই আমি ছুটির পড়া করে রাখি, ভাইয়া এলে যেন বই নিয়ে বসতে না হয় ৷ আমার ছুটি অবশ্য শুরুও হয়ে যায় অনেক আগে থেকেই, ভাইয়া আসারও আরও পনের দিন আগে থাকতে ৷ প্রায় দিনই সকাল সকাল খাওয়া দাওয়া সেরে আমি আর ভাইয়া বেরিয়ে পড়ি ৷ কোনদিন কাছের লাক্করতলা চা বাগানে, কোনদিন বা আরেকটু দূরে, বাগান ছাড়িয়ে পাহাড়ের দিকে ৷ ছোট ছোট টিলাগুলোই আমাদের পাহাড় ৷ 

শহর থেকে একটু দূরের দিকে গেলেই মণিপুরীদের দেখা পাওয়া যায় ৷ প্রতিটা পাহাড়ের গায়েই থাক কেটে কেটে লাগানো আনারসের বাগান, ওদের বাগান ৷ ছোট ছোট টিলার উপর ওদের ঘর বাড়ি ৷ পায়ে চলা সরু পথ বেয়ে একটু উঠে গেলেই চোখে পড়ে নিকোনো ঊঠোন, খড়ের চালের মাটির বাড়ি ৷ নাক বোঁচা ফর্সা ন্যাংটো শিশুরা ঘুরে বেড়ায় উঠোনে, আমাদের দেখলেই এক ছুটে ঘরে ঢুকে যায় আর তারপর উঁকি দেয় দরজার আড়াল থেকে ৷ প্রায় প্রতিটা উঠোনেই চারপেয়ে চৌকির মত একটা জিনিস থাকে, যাতে ওরা, মনিপুরী মেয়েরা সুতো বেঁধে বোনার কাজ করে ৷ সেই চৌকির কাঠামোর চারপাশে ছোট ছোট পেরেক গাঁথা থাকে ৷ সুতোর লাছি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আটকে দেয় সেই পেরেকগুলোতে ৷ তারপর ওর মধ্যেই ফুটিয়ে তোলে, গাছ, লতা, পাতা, পাখী আর পাহাড় ৷ আনারসের বাগান ৷ সরু সুতোয় বোনা গুলো হয় গায়ের চাদর, মোটা সুতোয় বোনাগুলো বিছানার চাদর, আরেকটু মোটাগুলো হয় কম্বল৷ যেগুলো ওরা কাঁধের ঝোলায় পুরে শহরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে, বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে ৷

আমাদের বাড়িতে এমনিতে টুটুর আসার কোন চান্স নেই, কিন্তু ভাইয়া এলে মাঝে মাঝে টুটু চলে আসে৷ নিজে থেকে আসে না অবশ্য, ভাইয়াই ধরে নিয়ে আসে তবে সেও খুব কম ৷ আম্মুর মুখ ভার হয়ে যায় টুটু এলেই যদিও মুখে কিছু বলে না , ভাইয়া আম্মুকে খুব একটা ঘাঁটাতে চায়ও না ৷ তাই বেশির ভাগ দিনেই ভাইয়া টুটুর ঘরে গিয়েই আড্ডা জমায় সন্ধ্যের পর ৷ টুটুর ঘরটা এক মজার জায়গা ৷ বারান্দার এক মাথায় ছোট্ট এক রুম, ভেতরবাড়ির সাথে যার কোন সংযোগ নেই৷ যতক্ষণ খালাম্মাদের বসার ঘরের দরজা খোলা থাকে ততক্ষণই ঐ ঘরের সাথে যোগাযোগ নইলে এ এক বিচ্ছিন্ন ঘর৷ রুনা আপু একদমই টুটুর ঘর মাড়ায় না, কেন কে জানে ৷ আমি নিজে কখনও টুটুর ঘরে যাইনি ৷ আমাদের বাড়ির পরের বাড়িটাই টুটুদের, মাঝে একটা হাফ দেওয়াল৷ বারান্দা থেকে টুটুর ঘরের সবটুকুই দেখা যায় যদি ওর জানালা খোলা থাকে ৷ এমনিতে এই জানালা খুব একটা খোলে না টুটু কিন্তু ভাইয়া যদ্দিন বাড়ি থাকে টুটুর ঘরের এই জানালা সারাক্ষণই খোলা ৷ আমি জানতাম না যে টুটু ছবি আঁকে ৷ 

না ৷রং তুলি দিয়ে ক্যানভাসে ছবি আঁকে না টুটু, ওর আঁকা আঁকি সব খাতার পাতায়, ঘরের সাদা দেওয়ালে পেন্সিল দিয়ে ৷ আমি কখনও দেখিনি টুটুর আঁকা ছবি ৷ ভাইয়া বলে, টুটু শুধুই স্কেচ বানায়, পেন্সিলের আঁচড়ে আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলে নানা ছবি, সাদা পাতায় কালো পেন্সিলের দাগে ৷ অন্য কোন রং নেই ৷ জ্যামিতিক সব নকশা আঁকে টুটু, ঐ নকশায় কী ফুটিয়ে তোলে টুটু, ছবির মধ্যে দিয়ে কী বলতে চায়, সে শুধু টুটুই জানে ৷ এই জ্যামিতিক ছবি ছাড়া আর যা আঁকে টুটু সেগুলো মানুষের মুখ ৷ একটা মেয়ের মুখ ৷ লম্বা চুলে দুই বিনুনী করা এক মেয়ের মুখ ৷ একটাই মুখ, বিভিন্ন ভঙ্গীর ৷ প্রতিটা ছবিতেই নাকি সেই মুখ খানিকটা করে বদলে যায়, সে নিজেই স্বীকার করে, এই যে মুখটা একটু করে বদলে যায়, এ নাকি তার আঁকার দোষ, যেদিন সে ঠিকঠাক আঁকতে পারবে সেদিন থেকে এই মুখ আর একটুও বদলে যাবে না ৷ 

ভাইয়া বলে, টুটু নাকি পড়াশোনাতেও খুব ভাল ৷ একথা অবশ্য খালাম্মাও বলে, রুনা আপুও বলে ৷ রুনা আপু নিজেই তো টুটুর কাছে পড়ে ৷ আগে অবশ্য রুনা আপুর একজন টিউটর ছিল কিন্তু রুনা আপু সেই টিউটরের কাছে এখন আর পড়ে না ৷ টুটু নাকি অংকে খুব ভালো ৷ এই কথাটা অবশ্য ভাইয়াও বলে ৷ ভাইয়া ছুটিতে এসেও অংকের বই খাতা নিয়ে টুটুর কাছে যায় ৷ ভাইয়া যে ক'দিন থাকে সে ক'দিন টুটুরও যে বেশ আনন্দ সে আমি বেশ বুঝতে পারি ৷ ইচ্ছে হলে ও আমাদের বাড়ি আসতে পারে, ওর ঘরের জানালা সারাদিন খুলে রাখতে পারে যা এমনিতে একেবারেই সম্ভব নয় ৷ ভাইয়াটা বেশ পাজি ৷ আমাকে মাঝে মাঝেই বলে, কী রে, টুটুভাইকে তোর পছন্দ? ও কিন্তু তোকে খুব ভালবাসে! আমি অবাক হই, টুটু তাহলে ভাইয়াকে এসব বলে! রাগ হয় বেশ৷ মুখ গোমড়া করে ভাইয়াকে বলি, যাও, তোমার আর ফোঁপরদালালী করতে হবে না টুটুর জন্যে ৷

আমি টুটুকে ভাই কিংবা ভাইয়া কিছুই বলি না ৷ আজ অব্দি তো কথাই বলিনি ওর সাথে! টুটু না কী ভাইয়াকে বলেছে, তোর বোনের খুব অহংকার! ইশশ! আবার অহংকার বলা হচ্ছে! না, না, আমার একটুও অহংকার নেই ৷ কেন হবে? টুটুটা সত্যিই কী বোকা৷ আমি টুটুকে পছন্দ অপছন্দ কিছুই করি না ৷ ভালবাসা? না ৷ সে আমি বুঝতেই পারি না, ভালবাসা বস্তুটা কী ৷ তবে যেটুকু বুঝি, টুটু যদি সকালে, বিকেলে আর আমি যতক্ষণ বাড়ি থাকি ততক্ষণ ঐ বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে না থাকে তবে আমার ভাল লাগবে না, লাগে না ৷ কোনদিন এরকম হয় না যে আমি স্কুলে যাচ্ছি, স্কুল থেকে ফিরছি অথচ টুটু বারান্দায় দাঁড়িয়ে নেই৷ 

বছরে একবার টুটু বাড়ি যায় ৷ ওর কলেজ তখন বেশ কিছুদিনের ছুটি থাকে ৷ কিসের ছুটি অতশত আমি জানি না ৷ কিন্তু ও যায় ৷ এবারেও গেছে৷ কিন্তু এখন কী কলেজের ছুটিতে গেছে? ছুটিতে তো এই কিছুদিন আগেই একবার ঘুরে এল, আর এখন তো সবার পরীক্ষা সামনে! তবে? এই কয়েকদিন আমার খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগে ৷ সকাল ঘুম থেকে উঠে স্কুল যাওয়া অব্দি বারে বারেই ঘুরে ফিরে বারান্দায় আসি, ওখানে কেউ দাঁড়িয়ে নেই জেনেও৷ বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার সময় তিন নম্বর রোডের মুখ থেকেই টুটুদের বারান্দায় চোখ যায়, টুটু নেই৷ কবে আসবে? কে জানে! কাউকে জিজ্ঞেস করব সেই উপায়ও নেই৷ রুনা আপুকে জিজ্ঞেস করতেই পারি কিন্তু রুনা আপু এমন হই হই করে উঠবে যে সে এক কান্ড হবে ৷ বরং খালাম্মার উলের বোনাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলে খালাম্মাই রাজ্যের গল্প করবে আর সেই গল্পের ফাঁক দিয়ে টুটুর কথাও আসবেই, কিচ্ছুটি জিজ্ঞেস করার দরকারই পড়বে না ৷

আমি নিজের ঘরের ভেতর বসেই সোয়েটার বুনি ভাইয়ার জন্যে, বারে বারে ঘর পড়ে যায়, ডিজাইনে ভুল হয় ৷ জানি খালাম্মার কাছে গেলে উনি সুন্দর করে দেখিয়ে দেবেন ৷ কিন্তু আমি যাই না ৷ কী হবে গিয়ে? এর আগেও আমি দুটো সোয়েটার বুনেছি ভাইয়ার জন্যে ৷ কিন্তু সেগুলো নাকি ছোট সব ৷ ভাইয়া প্রতিবার বাড়ি ফিরলে টের পাই সে দু-তিন ইঞ্চি বেড়েছে , কিন্তু তাই বলে ছোট? রুনা আপু বলে শহরের ফ্যাশান না কি আলাদা তাই ভাইয়া নেয় না! এগুলো সব পুরোনো ডিজাইন ৷ খালাম্মা কেন পুরানো ডিজাইন বোনে? টুটুকে বললেই তো সে নতুন ডিজাইন এঁকে দেয়, তার এমন হাত! ভাইয়া অবশ্য ফ্যাশনের কথা স্বীকার করে না, বলে শহরে নাকি শীতই পড়ে না, তুই অন্য কারো জন্যে বোন ৷ আমি আর কার জন্যে বুনতে পারি? প্রতিবারই ভাবি আর বুনব না , তবু বুনি ভাইয়ার জন্যে ৷ আগের উল খুলে নতুন ডিজাইন তুলি খালাম্মার কাছে ৷ কিন্তু ঘরে ফিরলেই সেই গোলমাল৷

আমি কিন্ত টুটুর কথা জানার জন্যে আমি খালাম্মার কাছে গিয়ে বসি না, রুনা আপুর ঘরে গিয়ে তার বিছানায় বসে থাকি ৷ রুনা আপু মন দিয়ে পড়ছে পরীক্ষার পড়া ৷ পড়া না ছাই! কানে ওয়াকম্যান লাগিয়ে নজরুলগীতি শুনছে , আজকাল যে রুনা আপু সন্ধ্যাবেলায় হারমনিয়াম বাজিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায় না,

বড়ো বেদনার মত বেজেছ হে তুমি আমার প্রাণে,
মন যে কেমন করে মনে মনে তাহা মনই জনে ৷৷
বা

ভেঙেছ দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময়, তোমারি হউক জয় ৷
সেটা অবশ্য পরীক্ষার জন্যে নয়৷ আম্মুই গিয়ে খালাম্মাকে বলে তার গানে অন্য ঈশ্বরের কথা আছে, সেই গান গাওয়া ঠিক নয় ৷ খালাম্মা হাসি মুখে মেনে নিয়েছেন, আগের মাষ্টার ছাড়িয়ে দিয়েছেন ৷ পরীক্ষার পর নতুন মাষ্টার আসবেন নজরুলগীতি শেখাতে ৷ একমাত্র টুটুই প্রতিবাদ করেছিল কিন্তু ধোপে টেকেনি ৷ রবীন্দ্রসঙ্গীতের সমস্ত ক্যাসেট জলে ফেলে দিয়ে নজরুলগীতির ক্যাসেট কিনে আনা হয়েছে ৷ পরীক্ষার পড়ার ফাঁকে ফাঁকে এখন সেগুলোই শোনে রুনা আপা ৷

হেথায় নিমেষে স্বপন ফুরায়,
রাতের কুসুম প্রাতে ঝ'রে যায়,
ভালো না বাসিতে হদৃয় শুকায়,
বিষ-জ্বালা-ভরা হেথা অমিয় ৷৷

আর মুখের সামনে ধরে রেখেছে খোলা একটা খাতা ৷ উঁকি দিয়ে দেখলাম সেও পড়ার খাতা কিছু নয়, রুনা আপুর লেখার খাতা ৷ রুনা আপু কবিতা লেখে ৷ কবিতা ছাড়া আর যা লেখে সে ঠিক গল্পও নয় আবার কবিতাও নয় ৷ তবে রুনা আপুর লেখা কবিতার চাইতে তার এই না কবিতাগুলোই আমার বেশি ভাল লাগে ৷ কান থেকে থেকে ওয়াকম্যান নামিয়ে রেখে রুনা আপু বলে, কীরে, মন খারাপ? টুটুভাইয়ের জন্যে? বলে নিজেই হেসে গড়িয়ে পড়ে ৷ আমার মন আরও খারাপ হয়ে যায় ৷ এর মধ্যে এত হাসার কী হল! খানিক হেসে টেসে নিয়ে রুনা আপু ধীরে সুস্থে বলল, দেশে খালাম্মার শরীর খুব খারাপ, ঢাকায় নিয়ে গেছে অপারেশনের জন্যে, গলব্লাডার স্টোন ৷ অনেকদিন ধরেই ভুগছে এবার বাড়াবাড়ি হওয়াতে অপারেশনের জন্যে ঢাকায় নিয়ে গেছে ৷ খালুজীর সরকারী চাকরী, বেশিদিন ছুটি নেওয়ার উপায় নেই, তাই টুটু পড়াশোনা, টিউশনি আর বারান্দায় হাজিরা দেওয়া সব বন্ধ করে ঢাকায় গেছে মায়ের চীকিৎসা করাতে ৷

টুটুর এই বারান্দায় হাজিরা দেওয়াটা এখন এত বেশি স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে এখন ওকে কেউ ওখানে দেখতে না পেলেই ভবে, আরে, টুটু কোথায়? শরীর খারাপ নয় তো ছেলেটার! সেদিন যেমন আব্বু জিজ্ঞেস করছিল আম্মুকে ৷ আম্মু বেশ নিরাপদ আর নিশ্চিন্ত বোধ করে টুটু না থাকলে ৷ সেই টুটু কেন নেই, ওর ভাল-মন্দ নিয়ে আব্বুর উদ্বেগ শুনে আম্মু বেশ রেগে গেল, বলল, নেই তো কী হয়েছে, শান্তি, যদ্দিন না থাকে! এঘর থেকে আমার খুব নিষ্ঠুর মনে হল আম্মুকে৷ আম্মু কেন এভাবে কথা বলে? এত নিষ্ঠুর তো আম্মু নয়৷ তবে টুটুর বেলাতেই কেন আম্মু এমন অবুঝ আর নিষ্ঠুর হয়ে যায় আমি ভেবে পাই না ৷ সেই একবার এক চিঠি লেখা ছাড়া আর তো কখনও টুটু কোন চিঠি লেখেনি, আমাদের বাড়িতেও তো আসে না টুটু এমনকি আমার সাথে কখনও কোন কথা বলারও চেষ্টা করে না ৷ তবে কেন আম্মুর এত রাগ টুটুর পরে ৷ আম্মুর রাগের কারণ খুঁজে না পেয়ে আমি মন দিই পড়ার বইয়ে ৷ 

পরীক্ষার আর বেশিদিন নেই ৷ এ বছর রুনা আপুদের স্কুল ফাইন্যাল তার পরের বছর আমাদের ৷ আব্বু বলে, এখন থেকেই পুরোদস্তুর পড়াশোনা করতে হবে স্কুল ফাইন্যালের জন্যে, নইলে রেজাল্ট ভাল হবে না, ভাইয়ার মত ৷ কিন্তু আব্বু জানে না, আমি ভাইয়ার মত ভাল রেজাল্ট করতেও চাই না ৷ আমার ভাল লাগে না সারাক্ষণ শুধু পড়া পড়া আর পড়া করতে ৷ ভাইয়াটা কেন হষ্টেলে চলে গেল? আমার খুব মন খারাপ হয় ভাইয়ার জন্য ৷ গুণে গুণে হিসেব করে দেখলাম অবার, এই নিয়ে পাঁচ বছর হয়ে গেল, ভাইয়া গেছে৷ এবছর ওর উচ্চ মাধ্যমিক, তারপর অবশ্য ভাইয়া কিছুদিনের জন্যে বাড়ি আসবে৷ যদ্দিন না রেজাল্ট বের হয় আর তারপর আবার কোথাও ভর্তি না হয় ৷ পরীক্ষার পরে বাড়ি এসে যে ভাইয়া শুধু ছুটি কাটাবে তা নয়, আব্বু এখন থেকেই সব লিষ্ট বানিয়ে রেখেছে,সব ইনিয়ারিং কলেজের, যেখানে যেখানে ভাইয়া ভর্তি পরীক্ষা দেবে ৷ 

আরেকটা অপশন অবশ্য আছে আছে, আর্মিতে ঢুকে যাওয়া ৷ ভাইয়ার সেটাই ইচ্ছে কিন্তু গম্ভীর মুখে আব্বু জানিয়ে দিয়েছে ভাইয়াকে, ওসব আর্মিতে যাওয়ার চিন্তা ভাবনা ছাড়ো, পরীক্ষা শেষ হলে ফিরে এসো, এর পরে কি করবে সে অনেক আগেই ভেবে রেখেছি! আব্বু সবকিছুই অনেক আগে থেকেই ভেবে রাখে, আমাদের সব ভাবনাই আব্বু ভাবে ৷ ভাইয়া চিঠিতে আমাকে লিখেছে, পরীক্ষার পর ফিরে এসে ও সিলেটেই থাকবে, সিলেটেরই কোন কলেজে ভর্তি হবে, আব্বু যতই লিষ্ট বানাক না কেন আর যতই ভাবুক না কেন! ভাইয়া এখানেই থাকবে ভেবে আমি নিশচিন্ত বোধ করি৷

-০৩-


পরজনমে দেখা হবে প্রিয়!
ভুলিও মোরে হেথা ভুলিও৷৷
এ জনমে যাহা বলা হ'ল না,
আমি বলিব না, তুমিও ব'লো না!
জানাইলে প্রেম করিও ছলনা,
যদি আসি ফিরে, বেদনা দিও৷৷


হাউজিং এষ্টেটের আমাদের এই বাড়িটার সামনে পেছনে দুটো বারান্দা ৷ সামনের বারান্দার গ্রীলএর হাফ রেলিং পেরিয়েই ছোট্ট একটুখানি লন, তাতে ছোট্ট একটু বাগান ৷ কিছু গাছ বাগানের মাটিতে আর কিছু গাছ টবে৷ এই বাগানটা ভাইয়ার, গাছগুলোও ওরই লাগানো ৷ বাগানের শেষে যেখানে আমাদের বাড়ির সীমানা সেখানে ইটের হাফ দেওয়াল, ছোট্ট কাঠের গেট৷ গেট ছাড়িয়ে সামনে দিয়ে রাস্তা, হাউজিং এষ্টেটের তিন নম্বর রোড, পাশাপাশি এরকম চারখানি রাস্তা সমান্তরালভাবে গেছে, এক, দুই, তিন, চার৷ প্রতিটা রাস্তাই ডানদিক দিয়ে গিয়ে পড়েছে বড় রাস্তায় আর বাঁদিক দিয়ে শেষ হয়েছে ছোট এক টিলার গায়ে, আমরা যাকে পাহাড় বলি ৷ হাউজিং এর এই শেষ মাথায়, পাহাড়ের নিচে আমাদের খেলার মাঠ৷ এই হাউজিং এর প্রায় সব ছেলে মেয়েরাই এখানে খেলতে আসে ৷ দিনের বেলা কচি কাঁচারা খেলে, সন্ধ্যের পরে বড়রা বাতি জ্বালিয়ে শীতকালে ব্যাডমিন্টন খেলেন আর গরমকালে চেয়ার পেতে বসে শুধুই আড্ডা দেন৷ 

হাউজিং এর এই রাস্তাগুলো যেখানে শেষ হয়ে বড় রাস্তায় পড়েছে সেখানে একটু ছোট্ট বাজার মত আছে সব কটি রাস্তাতেই৷ হাউজিংএর লোকজন ওখান থেকেই দরকারী ছোটখাট জিনিসপত্র কিনে আনেন৷ রাস্তার দুধারে বাড়ি, কোনটা একতলা কোনটা দোতলা৷ প্রতিটা বাড়ির সামনেই ছোট্ট এক টুকরো বাগান, ঠিক যেমনটি আমাদের বাড়ির সামনে আছে৷ এই তিন নম্বর রোডের পেছন দিয়ে সমান্তরালভাবে গেছে এক সরু ঝর্ণা, আমরা সিলেটিরা যাকে "ছড়া' বলি৷ আমাদের বাড়ির ঠিক পেছন দিয়েই গেছে এই ছড়া, এমনিতে খুবই সরু, শুধুই তিরতিরে এক জলরেখা৷ ওদিকের পাহাড় থেকে নেমে এসেছে , এই হাউজিং এষ্টেটের বুকের উপর দিয়ে বয়ে গিয়ে এগিয়ে গেছে অনেকদূর, কোথাও খুব সরু তো কোথাও বা খানিকটা চওড়া হয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে একেবারে শেষ হয়েছে সুর্মায় ৷ আম্মু বলে, রিকাবী বাজারের যে বাড়িটাতে আমার জন্ম হয়েছিল, সেও নাকি এই ছড়ার পারেই ছিল! ছোট্ট আমার কাঁথা কাপড় ঐ ছড়া থেকেই ধুয়ে আনত জামশিদা বুবু ৷ ছড়ার পারের সেই বাড়িতে আম্মুরা তখন ভাড়া থাকত, আমার জন্মের কিছুদিন পরেই এবাড়িতে উঠে আসা হয়, সব চাইতে মজার ব্যপার, এখানেও বাড়িটি সেই ছড়ার পারেই ৷ পেছনের বারান্দায়ও হাফ রেলিং, গ্রীলের, আর তারপরেই খানিকটা দূর থেকেই শুরু হয়েছে ঢাল, নেমে গেছে ছড়ায়৷ 

যখন খুব বর্ষা হয়, তখন ছড়ার জল উঠে আসে বাড়ির একেবারে পেছন অব্দি৷ ঘোলা, ময়লা জল৷ আম্মু বলে, পাহাড় ধুয়ে নেমে আসে এই পানি, ময়লা তো হবেই ৷ ছড়ার ওপাশে যতদূর চোখ যায় ঘন জঙ্গল ৷ অচেনা সব গাছ, ছোট বড়, অন্ধকার হয়ে থাকে দিনের বেলাতেও ৷ পেছনের এই বারান্দা, তিরতির করে বয়ে যাওয়া ঐ ছড়া আর ওপাশের ঘন জঙ্গল, সবই আমার খুব প্রিয় ৷ আমার যখন খুব মন খারাপ হয়, আমি এসে এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকি, রেলিংএ হেলান দিয়ে ৷ পাশের বাড়িতে গানের মাষ্টার একই গান তুলিয়ে যায় রুনা আপুকে৷ " আমারে চোখ-ইশারায় ডাক দিলে হায় কে গো দরদী,/ খুলে দাও রংমহলার তিমির-দুয়ার ডাকিলে যদি ৷৷' আমাদের বাড়িতে গান বাজনার চল নেই, তাই আমি বারান্দার এসে শুনি ৷ কত তো গান আছে সেগুলো কেন শেখায় না মাষ্টার? একঘেয়ে লাগে, আমি চুপ করে ঘরে এসে বসে থাকি আজকাল আমার খুব ঘন ঘন মন খারাপ হয় ৷ নি:শব্দে কেটে যায় প্রহর৷

ভাইয়া ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে গিয়ে ভর্তি হয়েছে বুয়েটে, ঢাকায় ৷ আবার হষ্টেল ৷ ভাইয়ার সেই ট্রাঙ্কের গায়ে এবারে ক্যাডেট কলেজের বদলে বুয়েটের নাম ঠিকানা লেখা ৷ কায়সার আহমেদ ৷ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ ইনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি ৷ নজরুল ইসলাম হল৷ ঢাকা ৷ ক্যাডেট কলেজ থেকে পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পরে রিতিমত বাকযুদ্ধ হয়েছে আব্বুর সাথে ভাইয়ার এবং ভাইয়াকে সব কটা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষা দিতে হয়েছে, আব্বুর খুব ইচ্ছে ছিল ভাইয়া যেন বুয়েটে পড়ে, তাই হয়েছে, ভাইয়া বুয়েটেই ভর্তি হয়েছে৷ তবে ভাইয়া একটুও মন খারাপ করে বসে থাকে না, বলে, দাঁড়া, ক'দিন লাগবে পাশ করে বেরুতে, তারপর আমি এখানেই ফিরছি, সিলেটে ৷ ভাইয়া কবে ফিরবে, আদৌ ফিরবে কী না? আমি আর এ নিয়ে ভাবি না ৷ হয়ত দেখা গেল, ভাইয়া যখন ফিরে আসবে পাশ করে, তার আগেই আব্বু অন্য কিছু প্ল্যান করে ফেলেছে ভাইয়ার জন্য ৷ 

ওবাড়ির রুনা আপুর বিয়ে হয়েছে লন্ডননিবাসী সাদেক ভাইয়ার সাথে ৷ রুনা আপু নিজেও এখন লন্ডননিবাসিনী৷ কলেজে পড়তে গিয়ে রুনা আপুর দেখা হয় শিরিনের সাথে, বন্ধুত্ব হয়, শিরিন সাদেক ভাইয়ার ছোট বোন, একই ক্লাসে পড়ত রুনা আপুর সাথে৷ তখন সাদেক ভাইয়া মাঝে মাঝেই কলেজে আসে ছোটবোনকে পৌঁছে দিতে অথবা কলেজ থেকে বাড়ি নিয়ে যেতে ৷ কলেজেই দেখা হয় রুনা আপুর সাথে সাদেক ভাইয়ার, মন জানাজানি হতেও সময় লাগেনি ৷ সাদেক ভাইয়ার বাড়ির লোকেদেরও অপছন্দ হয় না রুনা আপুকে ৷ বড়দের মারফত বিয়ের প্রস্তাব আসে রুনা আপুদের বাড়িতে, খালাম্মা খালুজীরও অপছন্দের কারণ ছিল না, লন্ডননিবাসী হোটেলমালিক সাদেক ভাইয়ার সাথে রুনা আপুর বিয়ে হয়ে যায় ৷ আমিও গেছিলাম খালাম্মা আর খালুজীর সাথে সিলেট এয়ারপোর্টে, রুনা আপুকে প্লেনে তুলে দিতে৷ সিলেট থেকে রুনা আপু যাচ্ছে ঢাকায়, ওদের লন্ডনের ফ্লাইট রাতে, বিকেলটা ওরা ঢাকা এয়ারপোর্টেই থাকবে৷ 

সাদেক ভাইয়া খালাম্মা আর খালুজী দুজনকেই বলেছিল ওদের সাথে ঢাকায় যেতে, পরদিনের ফ্লাইটে আবার ওঁরা সিলেটে ফিরে আসবেন কিন্তু ওঁরা কেউই যেতে চাননি ঢাকায়, এখান থেকেই মেয়ে জামাইকে বিদায় জানিয়ে বাড়ি ফিরবেন ৷ জরির কাজ করা লাল জর্জেট শাড়ি আর ঝকঝকে সোনার গয়নায় সুন্দরী রুনা আপু কখনও লন্ডন যাওয়ার আনন্দে হাসিতে উচ্ছ্বল তো কখনও কেঁদে আকুল খালাম্মা-খালুজী আর সবাইকে ছেড়ে যাচ্ছে বলে ৷ কানে কানে আমাকে বলে গেল যাওয়ার আগে, রুকুরে, টুটুভাই তোকে সত্যিই খুব ভালবাসে, একটু ভেবে দেখিস ৷ আমি জড়িয়ে ধরি রুনা আপুকে, চোখের জল চাপার চেষ্টা করেও পারি না, নি:শব্দে কাঁদতে থাকি রুনা আপু আর আমি৷ আমি দেখতে পাই আমার নজরুলগীতিরা ঐ চলে যাচ্ছে, আমাকে ছেড়ে ৷

না ৷ আমার ভেবে দেখার কিছু ছিল না ৷ সব ভাবনা আব্বু ভেবে রেখেছে, আমাদের সব ভাবনা আব্বুই ভাবে ৷ জিন্দা বাজার সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ছেড়ে আমি এখন সিলেট সরকারী মহিলা মহাবিদ্যালয়ে যাই ৷ সাদা সালোয়ার কামিজ আর ভাঁজ করা সাদা ওড়না সেপটিপিন দিয়ে কাঁধের দু পাশে আটকানো, ঝোলানো ব্যাগে বই খাতা, কলমটা আমি গুঁজে রাখি আমার কামিজের গলায় ৷ না ৷ এখন আর ও দাঁড়িয়ে থাকে না রুনা আপুদের বারান্দায় ৷ আমার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় ঐ বারান্দায় এখন আর কেউ দাঁড়ায় না ৷ রিকশা থেকে নামার আগে অভ্যেসবশত চোখ চলে যায় ঐ বারান্দায়, ওখানে কেউ নেই, থাকবে না জেনেও৷ ঝোলানো দুই বিনুনী বেখেয়ালে পড়ে থাকে বুকের পরে, ক্লান্ত পায়ে আমি এগিয়ে যাই বাড়ির দিকে ৷ 

ওবাড়ির খালাম্মা এখনও সোয়েটার বুনে চলে বছরভর৷ কার জন্যে কে জানে? আমিও বুনি, জানি না কার জন্যে, তবে এখন আর আমি সোয়েটার বুনতে গিয়ে ভুল করে ঘর ছেড়ে দিই না ৷ তবুও খালাম্মার কাছে গিয়ে বসি, নতুন কিছু ডিজাইন তুলে আনব বলে, বহুবার শোনা গল্প আবার শুনি খালাম্মার কাছে, টুটু এখন নোয়াপাড়ায় থাকে, চাকরী করে কোন এক টেক্সটাইল মিলে, ডিজাইন আঁকে টুটু, শাড়িতে, শার্টের পিসে আর বেডশিটে ৷ আমি মনে মনে দেখতে পাই সার সার জ্যামিতির নকশা তার পাল্টে পাল্টে যাওয়া বিনুনি করা সব মেয়ের মুখ ৷

আম্মুর সাথে যখন শাড়ি কিনতে দোকানে যাই বোঝার চেস্টা করি কোনটা টুটুর করা ৷ কোন শাড়ির কোন ডিজাইনে আমি কোন মেয়ের মুখ দেখতে পাই না ৷ বিনুনি পরা, একটু একটু করে পাল্টে যাওয়া সব মুখ ৷ এখনও সে ঐ চাকরিই করে ? কে জানে ৷ ওদের বাড়ির অর্থনৈতীক অবস্থা ভাল নয়, টুটুকে তাই বি এ পাস করেই চাকরীতে ঢুকতে হয়েছে, ইচ্ছা থকলেও আর্ট কলেজে যেতে পারেনি ৷ টুটুর সরকারী চাকুরে বাবা এখন রিটায়ার করে বাড়িতেই আছেন ৷ অসুস্থ মা আরও বেশি অসুস্থ হয়েছেন ৷ ইতিমধ্যে তাঁর আরও দু বার শক্ত শক্ত অপারেশন হয়েছে, আর টাকা জোগাড় করতে দিনরাত কাজ করে টুটু, রোজই ওভারটাইম৷ আমার কী? 

তবু আমার ভাল লাগে না খালাম্মার কথা শুনতে ৷ আমি উঠে যাই রুনা আপুর ঘরে, একটু বসি রুনা আপুর পরিত্যক্ত বিছানায়, কান না পেতেই শুনতে পাই রুনা আপু ফিসফিস করে বলছে, রুকু রে, টুটুভাই তোকে সত্যিই খুব ভালবাসে, একটু ভেবে দেখিস! চারপাশে তাকিয়ে দেখি, সব তেমনি আছে, যেমনটি ছিল রুনা আপু থাকার সময় ৷ তবে এখন রুনা আপুর বিছানা পরিপাটি গোছানো, কোন বই এলোমেলো কোথাও পড়ে নেই, বালিশের কাছে রাখা রুনা আপুর ওয়াকম্যানটা দেখে শুধু চোখ ভিজে আসে৷ মাথার কাছে ক্যাসেটের তাকে সার দিয়ে সাজানো সব ক্যাসেট, বেশির ভাগই নজরুল গীতির ৷ রোজই খালাম্মা একবার করে এসে এঘরের ধুলো ময়লা ঝেড়ে যায়, গোছানো বিছানা আবার গোছায়৷ আমি ইচ্ছা করলে ওয়াকম্যানে ক্যাসেট ভরে শুনতে পারি আমার প্রিয় নজরুল গীতি৷
 
হেথা হিয়া ওঠে বিরহে বিকুলি',
মিলনে হারাই দু'-দিনেতে ভুলি,
হদৃয়ে যথায় প্রেম না শুকায়
সে অমরায় মরে স্মরিও৷৷

কিন্তু আমার এখন গানেও উৎসাহ নেই ৷ ঘরে ফিরে আসি, তেলের বাটি চিরুণী হাতে আম্মু আসে, বিনুনী খুলে চুলে তেল দিয়ে চুল আঁচড়ে দেয় আম্মু, রোজকার মত ৷ আর তার কথা মানে সব আমার বিয়ের ভাবনা, কেমন হবে সে আয়োজন ৷ আব্বু আমার জন্যেও ভেবে রেখেছে আর সেই ভাবনা বাস্তবায়নের জন্যে আব্বু গুটিগুটি পায়ে সেদিকে এগুচ্ছেও ৷ প্রায় সন্ধ্যেতেই আব্বুর বন্ধু সৈয়দ কাকু এসে বসে আব্বুর কাছে, নতুন নতুন পাত্রের খোঁজ নিয়ে আসে কাকু, সাথে পাত্রের ছবি সহ বায়োডাটা৷ যেগুলো আব্বুর পছন্দ হয় সেগুলো এক পাশে রেখে বাদবাকিগুলো আব্বু ফেরত দেয় ৷ পরে ভাবনা চিন্তা করে যোগাযোগ করবে সৈয়দ কাকুর সাথে ৷ 

আমার সত্যিই কিছু ভেবে দেখার কিছু ছিল না ৷ সব ভাবনা আব্বু ভেবে রেখেছে, আমাদের সব ভাবনাই আব্বুই ভাবে৷ আমি তবু আম্মুর সাথে দোকানে যেতে পারি, জ্যামিতির নকশা দেওয়া কাপড় পছন্দ করে কিনে আনতে পারি ৷ অমন জ্যামিতির নকশার মধ্যে আমি দেখতে পাই তিরতির করে করে জল ঝরা ছড়া ৷ ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া পাহাড় ৷ গাছ, লতা, পাতা, পাখী আর পাহাড় ৷ আর মাঝে মাঝে আনারসের বন ৷ এ সব ভাবতে আমার কোন বাধা নেই ৷ জ্যামিতির ছাপ ছবির শড়িগুলি যেন বেদনার রঙে আঁকা ৷ শাড়িগুলি যেন আমার হারিয়ে যাওয়া কিশোরীবেলা ৷ আমার হারিয়ে যাওয়া গানেরা, হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ ৷


কুহু কুহু কুহরে পাহাড়ী কুহু
কুহু কুহু কুহরে পাহাড়ী কুহু
পিয়াল ডালে পল্লব বীণা বাজায়
ঝিরিঝিরি সমীরন তালে তালে তালে,তালে তালে
সেই জল ছলছল শুনে ডাকিয়া
সাড়া দেয় মনপারে সাড়া দেয় , বাঁশি রাখালিরা
পল্লীর প্রান্তর উঠে শিহরি
বলে, চঞ্চলা কে গো তুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি


-:-


এই লেখায় ব্যবহৃত বড়ো বেদনার মত বেজেছ হে তুমি আমার প্রাণে ও ভেঙেছ দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময় গানদুটি ব্যতীত অন্য গানগুলি নজরুলগীতি৷


[গল্পটা কিছুদিন ধরেই মাথায় ঘুরছিল। এক কিশোরী মেয়ের কথা। আত্মকথন রূপে বলা একটি গল্প। তার ভাল লাগা-মন্দ লাগা, তার দিনযাপণ আর বুকের বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা তার গোপন প্রেমের কথা, যে প্রেমের কথা সে স্বীকার করে না এমনকি নিজের কাছেও। সবটুকুই তারই জবানীতে। লেখাটি ভালোবেসে রোহণ ছাপে তার www.sristi.co.in পত্রিকায়। লিংক সংক্রান্ত অসুবিধের কারণে ওয়েবসাইটের লিংকের বদলে লেখাটিই তুলে রাখলাম ব্লগে]

3 comments:

  1. khub khub bhalo lekha hoyechhe ....likhte thako erakom...haal chherona
    bhalo theko anek

    ReplyDelete
  2. অনেক ধন্যবাদ শ্রী..


    হাল তো ছাড়তে চাই না কিন্তু মাঝে মাঝেই হাল যেন বে-হাল হয়ে যায়- যেতে চায়.. তবুও চেষ্টা করি ধরে থাকার..

    ReplyDelete
  3. অনেক অনেক ভাল হয়েছে!

    ReplyDelete