Wednesday, February 13, 2008

কোন এক গাঁয়ের বধুর কথা তোমায় শোনাই শোনো...



টালির চৌচালা দাঁড়িয়ে আছে মাটির দেওয়ালে ভর করে। দেওয়ালের তিন দিন ঝকঝকে তকতকে গোবর নিকোনো আর একদিকের দেওয়াক জুড়ে আদিবাসী বধুর চিত্র পরিকল্পনা। তার টুকরো টুকরো সুখ, বছর জুড়ে ছেঁড়া কাপড়ের মত লেপ্টে থাকা সমস্ত দু:খকে একপাশে সরিয়ে রেখে মন-প্রাণ ঢেলে সে তার মেটে দেওয়ালখানিকে সাজিয়েছে মনের সমস্ত মাধুরী ঢেলে। হাতে তৈরি সব রং, হাড়ির তলার কালি, গাছের পাতার রসে সবুজ, পোড়ানো ইটের গুড়োয় তৈরি লাল আর আরও সব রং যা তার দরকার সব সে বানায় এই সব গাছ-পাতা- চুন-সুরকি আর ফুল-ফল দিয়ে।






বছরভরের অনাহার-অর্ধাহার সরিয়ে রেখে গায়ে জড়িয়েছে কড়কড়ে নতুন পাটাভাঙা লাল শাড়িখানি। একটি একটি পয়সা জমিয়ে যা সে কিনেছে মকরের এই সংক্রান্তির জন্যে। নবান্নের উৎসবের জন্যে। টুসু-র পুজার জন্যে। টুসু-ভাসানের মেলার জন্যে।


"টুসু মাকে ঘরে এনেছি ভাবনা কিসের আর,কাটা ধানের পালুই কৈরে ভৈরেছি খামার।
এক কুচুরি ভাজান, আর চার কুচুরি ভাত,এক কুচুরি রাইখ্যেছি বীজ, করব গো আবাদ।।"



নিকোনো উঠোনে যেন কেউ বিছিয়ে দিয়েছে সজনের ফুল উঠোনের কোণার সজনে গাছের পাতা দেখা যায় না, শুধু ফুল শুধু ফুল সরু সরু কচি সজনে ডাটা ঝুলছে ডাল জুড়ে উঠোনে সদর্পে ঘুরে বেড়ায় পোষা লড়াকু ষাঁড়াটি (মোরগ) বিকেলের মেলায় সে যাবে লড়াই করতে, জিতলে ঘরে আসবে আরেকটি লড়াকু মোরগ আর হেরে গেলে সে চলে যাবে লড়াইয়ে যে জিতেছে তার কাছে



লম্বা ঘোমটার ফাঁকে দেখা কালো মুখটি, নাকে রুপোর নোলক গলায় মোটা বালার মত হার কালো মুখ চকচক করে পুরোনো গয়নার ঝিলিকে কথা বলতে গিয়ে অকারণ লজ্জায় রাঙা হয় বউটি দেওয়ালচিত্রটি কার আঁকা জানতে চাইলে সলজ্জে সে জানায়, তারই আঁকা ঐ দেওয়াল জোড়া ছবি হাত দিয়ে ঘষে ঘষে মসৃণতর করে তোলে দেওয়ালকে আর তারপর দেওয়ালে সে আঁকে তার সমস্ত কল্পনা, মনের সবটুকু মাধুরী মিশিয়ে তার ভেতরকার শিল্পি ও‌ই মেটে দেওয়ালখানিকে রূপান্তরিত করে এক বিশাল চিত্রকর্মে প্রতি বছর মকরের মেলার আগে সে তার ঘরে দেওয়ালে নতুন মাটি লাগায়, মুছে দেয় আগের বছরের চিত্রকর্ম

উঠোনে হামাগুড়ি দেয় ন্যাংটো শিশু।

শুধু ও‌ই একটি বাড়ি বা একটি দেওয়াল নয়, পুরুলিয়ায় প্রত্যন্ত গ্রামে মকর সংক্রান্তির মেলা দেখতে গিয়ে দেখতে পেয়েছি এরকম অসংখ্য চিত্রকর্ম। প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনের দেওয়াল জুড়ে আঁকা অতি সুক্ষ, অসাধারণ সব শিল্প। মুখে গান। টুসু'র গান। নবান্নের গান।

"লবান্নের ধান ভাইনলাম দিনক্ষণ কৈরে,
তরে-ও কুড়া রাইখলাম টুসালুর তরে।
টুসালু গো-রাই, টুসালু-গো ভাই,
তুয়ার দৌলতে মোরা ছবড়ি পিঠা খাই।"




আদিবাসী এই সব গ্রামগুলিতে অভাব এঁদের নিত্যসঙ্গী। পাথুরে মাটিতে ফসল ফলে না। জঙ্গলে গাছ নেই, পশু নেই। সরকারী সুযোগ-সুবিধা এঁরা কতটুকু পান সে ওঁদের চোখ-মুখে লেখা। কাজ বলতে দূরের আসানসোল, রানীগঞ্জের কয়লাখনিতে কুলি-কামিনের কাজ। কোন অভিযোগও নেই ওঁদের। অভিযোগ থাকলেও কার কাছে করবেন সম্ভবত তাও জানেন না। গৃষ্মে নিদারুণ দাবদাহে পোড়ে মাটি,শরীর। শীতে থরথর কাঁপে বস্ত্রহীন গোটা আদিবাসী সমাজ। শিশুর ভাঙা পায়ে মন্ত্র পড়া চুল বেঁধে দিয়ে মা ভাবেন, এতেই ঠিক হয়ে যাবে ভাঙা পা। সবার জন্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বড় বড় বুলি নেতারা তবুও আউড়েই যান।

6 comments:

  1. lo lekho ki korey baloto ?sundor hoyechhe....ei ekhuni porey fellam.

    ReplyDelete
  2. Anonymous4:04 PM

    I downloaded the bangla fonts from the website whos link u provided. thanks sooooo much.

    tomar lekhata porlam....its just the pen-picture of the sights u had seen(i say this bcos u showed me the snaps...remember...at ur place..that day Bhuto-da and others had also come...and of course, how dare i omit ur biryani???......)


    ur keen sense of observation, as well as fecund imagination, along eith the ability to put things succinctly and in perspective..are really praiseworthy. i am proud to have a friend who writes so well!)


    Saurabh

    ReplyDelete
  3. লেখা পড়ে সত্যি বোঝা গেল না দেওয়ালের মধ্যে কাহগুলোর বিস্তার ঠিক কতটুকু ছিল, আরেকটু বিশদভাবে লেখ বিশেষ করে ম্যাজিকের জায়গাগুলো।

    যেমন- গাছের মত এক মানুষ দাঁড়িয়ে পাঁকের শরীরের পরে তার মাথা যেন এক মস্ত পদ্মফুল। এইগুলো একটু বিশদে ব্যাখ্যা কর, তার এই সামাজিক বাতাবরণের মধ্যে সে কী করে এই ধারণায় উপনীত হ্য, কিভাবে আসে তার আলো বাতাস। আর যদি তার স্নায়ুতন্ত্রধর্মী রেখাগুলো নিয়ে একটু বিশ্লেষণ কর, তাহলে ভালো লাগবে।

    আহা! ম্যাজিক তো কী অপূর্বভাবে আছে। মটিফতুত্বের কথা মাথায় রেখো। যেখানে মনুষ্যজীবন একটা ছোট্ট পাখির মত আর রূপ রসে ভরা প্রক্বতি এক মস্ত ফুল। তুমি দেখেছ কি?

    বড় করে না লিখলে ওই শিল্পের গুণমান যে কত বড় তা কি বোঝা সম্ভব?

    ReplyDelete
  4. সৌরভ,
    কি বলব তোকে আর।।

    থাক, কিছু বলছি না।

    ভাল থাকিস।

    ReplyDelete
  5. কারুবাসনা,
    ভাবব আর তারপরে আবার লিখব। ব্লগ বলেই শর্টকাট দেওয়াটা ঠিক নয়।

    ধন্যবাদ।

    ReplyDelete