Sunday, February 03, 2008

ভোগে গেল কলকাতা বইমেলা ২০০৮

ভেস্তে গেল কলকাতা বইমেলা। আপাতত। হ্যাঁ। আপাতত শব্দটাই ব্যবহার করলাম কারণ শুনছি বইমেলা নাকি হবে। ১লা মার্চ থেকে ১০ই মার্চ পর্যন্ত। কিন্তু এগুলো সবই শোনা কথা। আলোচনা চলছে। চেষ্টাও চলছে প্রকাশক, বই বিক্রেতা ও বইপাগল জনতাকে সন্তুষ্ট করার জন্যে একটা মেলা করার।


প্রধান আসামী হাইকোর্ট। দ্বিতীয় আসামি সেনাবাহিনী, তৃতীয় আসামী পরিবেশ রক্ষায় আগ্রহী জনতার একাংশ। এবং লাষ্ট বাট নট দ্য লিষ্ট 'গিল্ড'। কলকাতা বইমেলা এত বছর ধরে হয়ে আসছিল ময়দানে। অন্য নামে অনেকে যাকে গড়ের মাঠও বলে থাকেন। সমস্যা দেখা দেয় সেনাবাহিনী বাগড়া দেওয়ায়। ময়দান সেনা'র সম্পত্তি। সেখানে যাই কিছু হোক না কেন সেনা-সম্মতি ছাড়া হওয়া সম্ভব নয় (এত বছর কী করে যত রাজ্যের মেলা হয়ে আসছিল কে জানে!)। প্রথম প্রথম মেলা যখন শুরু হয় তখন সে আকার ও আয়তনে খুবই ছোট ছিল, আর সে শুধুই বইমেলা ছিল। পার্ক ষ্ট্রিটের কোণ ঘেঁষে ময়দানের প্রায় অর্ধেক জুড়ে বইমেলা প্রতিবছরই তার আয়তন বাড়াচ্ছিল। সেখানে যোগ হচ্ছিল নানা রকমের খাবারের ষ্টল, ব্যাঙ্ক, সমস্ত সাজ পোষাক নিয়ে মিডিয়া, আই টি ও আরো সাত সতেরো রঙবাহারী সব ষ্টল। পরিবেশবিদদের হঠাত্ মনে হল, ময়দানে জুড়ে এই যজ্ঞের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, মাপা হল দুষণ, যাতে দেখা গেল ভয়ানক রকম বেড়ে যাচ্ছে দুষণের মাত্রা। ঠুকে দেওয়া হল জনস্বার্থ মামলা। বইমেলার জন্যে বাঁশ-ফাঁস পুঁতে মেলা যখন প্রায় তৈরি তখন হাইকোর্ট রায় দিল ময়দানে মেলা করা চলবে না। এবং দেখা গেল, বুক সেলার্স এন্ড পাবলিশার্স গিল্ড অনুমতির নামে যা কাগজপত্র দেখিয়েছে সবই প্রায় ভুয়া! ময়দানে বইমেলা সহ সমস্ত মেলা নিষিদ্ধ হওয়ায় শেষ মুহুর্তে নমো নমো করে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে উদ্ভোদন করা হল বইমেলার, মেলা যদিও শুরু হয় তারও দিন পাঁচেক পর। এগুলো গেলবারের ঘটনা। তখনও বইমেলার হর্তা-কর্তারা যদিও আস্ফালন দিচ্ছিলেন, বইমেলা এরপরে কলকাতাতেই হবে আর সেটা ময়দানেই হবে!


কার্যত যা করা গেল না। সেনা নাছোড়, তারা ময়দান দেবেই না বইমেলার জন্যে। গিল্ডও সল্টলেক যাবে না। কিন্তু তাহলে মেলা কোথায় হবে? পার্ক সার্কাস ময়দান অগত্যা পছন্দ হল গিল্ডের, যদিও মেলা আকারে অনেক ছোট হয়ে যাবে, ছোট অনেক পুস্তক বিক্রেতা -প্রকাশকদের জায়গা দেওয়াই সম্ভব হবে না তবুও গিল্ড রেডি হল বইমেলার জন্যে। এবং এবং এবারেও বাগড়া দিল জনতা জনার্ধন। পার্ক সার্কাস এলাকাবাসী জনস্বার্থের মামলা ঠুকে দিল হাইকোর্টে। সাত রাস্তার মোড়, দু দুটি বড় বড় স্কুল দু দুটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেখানে আছে সেখানে কী করে বইমেলার মত এক বিশালাকারের মেলার অনুমতি দেয় পুরসভা! ব্যাস। এবারেও দেখা গেল, অনুমতি পত্রের নামে যা আছে তার বেশির ভাগই ভুয়া কাগজপত্র এবং মেলা চলাকালীন ঐ দশদিন এলাকাবাসীর দুর্গতির কথা চিন্তা না করেই এই মেলার অনুমতি দিয়েছে পুরসভা। মেলা বাবদ ভাড়া যা পাবে তাও নামমাত্র। লক্ষ লক্ষ মানুষের পদচারণায় ধুলো যা উড়বে সে তো ভাবা হয়নি একবারের জন্যেও এমনকি উপেক্ষা করা হয়েছে জানজটের ব্যাপারটিও। এবং এবারেও হইকোর্ট রায় দিল পার্ক সার্কাসে বইমেলা করা যাবে না। বইমেলা নিয়ে গিল্ড চলে যাক, যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বা বাইপাসের মেলা প্রাঙ্গনে, যেখানে ১২মাসই নানারকমের মেলা হয়। নাছোড় গিল্ড, বইমেলার ঐতিহ্য নেই? মেলার মানহানি হয় সল্ট লেক বা বাইপাসে গেলে। তাদের যুক্তি, সল্টলেকে মেলায় লোক হয় না, জায়গা ছোট, এতবড় মেলাকে জায়গা দেওয়ার মত জায়গাই নেই সল্টলেক ষ্টেডিয়ামে। পার্ক সার্কাস ময়দানে উদ্ভোদনের আগের দিন ভেস্তে গেল কলকাতা বইমেলা২০০৮।


সরব হলেন সুশীল সমাজ। এক প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় লেখক বিবৃতি দিলেন, এই দশদিনের কষ্ট ও দু:খ-দুর্দশা মেনে নেওয়া উচিত ঐ এলাকাবাসীর, বইমেলার মত এক সুমহান ঐতিহ্যশালী মেলার জন্যে। গলা মেলালেন নামি ও সুমহান লেখকেরা, দু্র্গাপুজোয় লোক হয় না? তখন যানজট হয় না? তাঁরা ভুলে গেলেন যে পুজোর সময়ে স্কুল-কলেজ-অফিস-আদালত সবই ছুটি থাকে, আর হাসপাতালেও ইমার্জেন্সি ছাড়া সর্বত্রই ছুটির আমেজ থাকে। এবং তাঁরা ময়দানে বাঁশ পুঁতে মঞ্চ বানিয়ে প্রতীকি বইমেলা শুরু করে দিলেন। এই প্রতীকি বইমেলা অবশ্য গতবছরও তাঁরা করেছিলেন ময়দানেই। গিল্ড নিজের ঐতিহ্য ও মর্যাদাবোধ ধরে রেখে ঘোষণা করল, কলকাতা বইমেলা ২০০৮ হবে না। মাথায় হাত ছোট-বড় সব প্রকাশকদের। লক্ষ লক্ষ টাকা টাকা তাঁরা লগ্নি করে বসে রয়েছেন মেলার জন্যে। অনেকেই ধার-দেনা করেছেন, সেসবের কী হবে?



ত্রাতা ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্কোত্তি। বইমেলা হবে আর ২০০৮এই হবে। আলাপ-আলোচনা আর পরামর্শ এখনও জারি আছে। গিল্ড জানিয়ে দিয়েছে, তারা নেই। নেই তো নেই। তাদের ছাড়াই মেলা হবে। দিন ঘোষণা হয়েছে, ১লা মার্চ থেকে ১০ই মার্চ যুবভারতীতে বইমেলা হবে। চাপান-উতোর চলছেই, চলছে বিবৃতি আর পাল্টা বিবৃতি আর সাথে সাথেই চলছে রাজনীতিও।

1 comment:

  1. Anonymous6:14 AM

    সত্যি কি গো, কোল্কাতায় বই মেলার দরকার আছে? কয়কটা বই বাজার হলে ভাল হয়। একটা তৈরি সুরু হয়ছে ব্যবসা ভাল হলে ব্যবসাইরা হামলে পড়ে আরো বানাবে। কয়কটা পুরানো বই এর হাট হলে মন্দ হয় না। বই মেলা হোক গ্রামে। সহরের থেকে ঘন্টা খানেক বা দেড় দূরে স্টেশনের কাছে ফাঁকা ধান জমি পেলেই ভাড়া করে মেলা বসে যাক। লালু বাবুকে হাতে পায় ধরে দিনে তিনটে স্পেশাল লোকাল দিলেই লোক জমে যাবে। বর্ধমান শিলিগুড়ি সবাই ঘুরে ঘুরে একটা মেলা পাবে। অতি ঊৎসাহী ক্যালকাটান বই প্রেমী ঠিক পৌঁছে যাবে। ‘কলিকাতা বই মেলা’ নামে কি আসে যায়? আমরা কলিকাতা মুক্ত মেলা তো রাখতে পারি নি। বুদ্ধুরাম তো, একই কথা বার বার বলে।

    ReplyDelete