Saturday, February 02, 2008

নীল নির্জন পথে: কংসাবতী

ট্রেনের টিকিট কাটা ছিল ঝাড়খন্ডের ঘাটশিলার। কাজের ফাঁকে দু'দিনের ছুটি কাটানোর হঠাত্ প্ল্যান আর আগেরদিন সন্ধ্যেয় টিকিট কেটে পরদিন ভোর ভোর বেরিয়ে পড়া। শীতের সবে শুরু হলেও ঠান্ডা পড়েছে জাঁকিয়ে। ট্যাক্সিওয়ালার বেগড়বাইয়ে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভোরের ট্রেনের সময় পার। এবং তারপরেও প্রায় ডবল ভাড়া দিয়ে ষ্টেশনে যাওয়া, টিকিটের পয়সা যদি খানিকটা হলেও ফেরত পাওয়া যায়। আদ্ধেক পয়সা হাতে নিয়ে পরবর্তী ট্রেনের খোঁজ, নাহ! এখন আর কোন ট্রেন নেই সেই বেলা দুটোর আগে। আর থাকলেই বা কী, উইদাউট রিজার্ভেশন থুড়ি না যাওয়া যাবে কোথাও!

বস্তা আকারের জ্যাকেট গায়ে, পিঠে ঝোলানো স্যাক। আমরা হাঁটি বাসষ্টপের উদ্দেশ্যে। এবং সেখানে পছন্দসই কোন বাস না পেয়ে হাওড়া বাসগুমটি থেকে ধর্মতলা বাসগুমটি।পৃথিবীর তাবত্ ট্যাক্সিওয়ালা তখন আমার শত্রু। গন্তব্যের ঠিকানা নেই, বাড়ি থেকে যখন বেরিয়েছি কোথাও একটা তো যাবই। আর এভাবেই ৯ঘন্টা বাসে বসে বসে পৌঁছে যাই বাঁকুড়ার মুকুটমণিপুরে। সন্ধে হয় হয়। ছোট্ট পাহাড়ি জায়গাটায় সন্ধে নেমেই গেছে। সারাদিন বাসে বসে থেকে থেকে হাতে-পায়ে খিল। পাহাড়ি জায়গায় শীতের সন্ধে বড় তাড়াতাড়িই নেমে আসে, আর বিশেষ করে আমাদের যেখানে কোন ঠিকানা নেই। ভরসা তবু থাকে, মাথা গোঁজার ঠাঁই একটা ঠিক জুটেই যাবে। আর জুটেও যায়। পঞ্চায়েত সমিতির এই গোলবাড়িটাকে আমি হোটেল বলেই ভেবেছিলাম। আর পাহাড়ের ঠিক কোলের উপর চাঁদের মত গোল বাড়িটাকে দেখে শীতের সেই ভর সন্ধেয় ভালই লেগেছিল। ঘরের ভিতরে গিয়ে ক্ষণিকের সেই ভালোলাগা উবে যেতেও অবশ্য সময় লাগেনি। টিমটিমে আলোতে আলো যতটা আঁধার তার চাইতে অনেক বেশি। নড়বড়ে দরজা, খটর খটর চৌকি, লাল প্লাষ্টিকের সবেধন নীলমণি একখানি চেয়ার, যার উপরে স্যাক আর জিনিসপত্রের ঢিপি আর ছোট্ট খুপরি জানালা। আরও একটা জিনিস আছে, একটি ছোট্ট ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট টিভি। ছাদের উপরে দূর থেকেই ডিশটিভির অ্যান্টেনা দেখে আশ্বস্ত হয়ছিলাম, যাক, শাহরুখ খানের মত আমরাও বসে বসে ডিশ করব আর উইশ করব আজ! তো এই আমাদের রাত্রিআবাস! ভয়চকিত চোখে এদিক ওদিক তাকানো দেখে সাথী আমার অভয় জোগায়, ভয় কী, আমি তো আছি!

বাস থেকে নেমে হাত পা সোজা করার ফাঁকে রাস্তার ধারের অশোক হিন্দু হোটেলের চা খেয়ে একটু খোঁজ খবর নেওয়া গেল, রাতের খাওয়া কোথায় জুটবে সেটাও ভাবনা, সারাদিন তো বাসে বসে প্যাকেটের কেক,বিস্কুট খেয়েই কেটেছে কাজেই অশোক হিন্দু হোটেল দেখামাত্রই ভাতের ক্ষিদে পেয়ে গেছে। আমাদের গাইডও জুটে গেল বাস থেকে নামামাত্রই, ভ্যানচালক। সে আমাদের ব্যাগ-ব্যাগেজ ভ্যানের উপরে বসিয়ে দিয়েছে বাস থেকে নামামাত্রই, হোটেলের নাম-ঠিকানা, বেড়ানোর জায়গার সব খোঁজও দিয়ে দিল দু মিনিটের মধ্যেই। কাল সকালে এসে বেড়াতে নিয়ে যাবে সে ব্যবস্থাও পাকা ও‌ই দু মিনিটেই। হিন্দু হোটেলের পরিচালক জানিয়ে দিলেন, রাতে খেতে হলে অর্ডার দিয়ে যাবেন, রান্না করে রাখব। সোনাঝুরি পাহাড়ের উপরে সোনাঝুরি হোটেলের বিজ্ঞাপণ রাস্তার ধারে ধারে, আমার সেখানেই যাওয়ার ইচ্ছে হল পাহাড়ের উপরে হোটেল শুনে কিন্তু ভ্যানচালক শোনালেন, পাহাড়ের গায়ে থাক কাটা কাটা সিঁড়ি যেগুলো বেয়ে হোটেলে পৌঁছুতে হয়, শুনেই উৎসাহ গেল, এই অন্ধকারে জিনিসপত্র নিয়ে পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে চড়া সম্ভব নয় অগত্যা পাঞ্চায়েত সমিতির গোলবাড়ি লজ।

লজের ঘরে জিনিসপত্র নামিয়ে রেখে একটু হেঁটে আসার জন্যে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তার ধারে ধারে বেশ দূরে দূরে একটা করে ল্যাম্পপোষ্ট, মরাটে হলদে আলো খুব বেশিদূর যায় না যদিও। চড়াই বেয়ে খানিকটা হাঁটার পর একটা রাস্তা দেখলাম বাঁদিকে চলে গেছে, সে রাস্তা উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত আর দুধারে সারসার সব দোকান, ঠিক যেমনটা দেখা যায় সমুদ্রের ধারের যে কোন বেড়ানোর জায়গায়। তবে কী আমরা সমুদ্রের ধারে কোথাও এলাম? না । তা কী করে হবে! আমার কোন ধারণা নেই তখনও কোথায় এসেছি। বাসের টিকিট করা হয়েছিল মন্দির শহর বিষ্ণুপুরের জন্যে, পোড়ামাটির সব মন্দির নাকি আছে সেখানে, কিন্তু আমার কেন জানি বিষ্ণুপুরে নামতে ইচ্ছে করল না, তাই আবারও টিকিট কেটে চলে এসেছি মুকুটমণিপুর, কী আছে এখানে আমি অন্তত জানি না, বাসগুমটির দাদু অবশ্য বলেছিলেন, আপনারা মুকুটমণিপুর চলে যান, ভালো লাগবে। কেন ভালো লাগবে সেটি জিজ্ঞেসও করা হয়নি আর তিনিও বলেননি। আমার সবজান্তা সঙ্গী হয়তো জানেন কিন্তু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হল না। কোথাও একটা গেলেই তো হল। দু'দিন কাজ-কর্ম ছাড়া থাকা, প্রকৃতির কাছাকাছি কোথাও একটা থাকা, কাজেই কী আছে জেনে কী হবে... দেখা যাক... 

আশ-পাশটা একটু ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে জিনিসপত্র লজের কামরায় নামিয়ে রেখে ঝটপট বেরিয়ে পড়লাম, সূর্যাস্তের পরেও খানিকক্ষণ যে আলো-আঁধারি থাকে তাতে যেটুকু বা যা দেখা যায় আরকী ! সরু পীচরাস্তা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে বুঝতে পারলাম হালকা চড়াই বেয়ে উঠছি। দুপাশে তাকিয়ে দেখা গেল, রাস্তার দু ধারেরই জমি বেশ নিচু। গাছপালায় ঢাকা উঁচু-নিচু জমিকে এই আলো-আঁধারিতে জঙ্গল বলেই বোধ হয়। বেশ ভয় ভয় লাগে। ছোট ছোট সাইনবোর্ডের দেখা পাওয়া যায় ছোট্ট মোড়ের কাছে, যার বেশির ভাগই হোটেল-মোটেলের বিজ্ঞাপণ। সঙ্গী ভদ্রলোকের তৃষিত নয়ণ এদিক ওদিক খুঁজেই চলে প্রার্থিত একটি বিজ্ঞাপণের খোঁজে। মোড়ের মাথায় গাছের গায়ে লটকানো সেই বিজ্ঞাপণও চোখে পড়ে, 'বিদেশী মদ পাওয়া যায় এখানে' অ্যারো দিয়ে দিক নির্দেশনাও আছে আর দূরত্বের পরিমাপও আছে তাতে, ৩কিলোমিটার! আজ্ঞে হ্যাঁ, ভদ্রলোক মদের দোকানের খোঁজেই এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলেন তবে বেশ দমে গেলেন ও‌ই তিন কিলোমিটার দেখে।


রাস্তার দু'ধারে ছোট ছোট সব দোকান, নানারকমের পসরা তাতে। ঝিনুকের তৈরি নানা জিনিস, টেরকোটার অজস্র সৌখিন গৃহসজ্জার জিনিস থেকে নিয়ে নানা রকমের গয়না, বাঁকুড়ার বিখ্যাত পোড়ামাটির ঘোড়ারা সারসার দাঁড়িয়ে আছে প্রায় সব দোকানেরই সামনে। বেনারসি পানের দোকান থেকে নিয়ে মুড়ি-তেলেভাজার দোকানেরও কমতি নেই। সব দোকানেই জ্বলছে ঝলমলে বিজলি বাতি। আরেকটা জিনিস দেখলাম সব দোকানেই আছে, ক্যামেরার রোল। প্রতিটি দোকানেই ছোট্ট বোর্ডে লেখা আছে, এখানে সাদা-কালো ও রঙীন ক্যামেরার রোল পাওয়া যায়। অভাব নেই ঠান্ডা পানীয়েরও। মাইকে বাজছে হিন্দী গান। মাইকের খোঁজে এদিক-ওদিক তাকাতে চোখে পড়ল, রাস্তার ধারে ত্রিপল বিছিয়ে ঢেলে বিক্রি হচ্ছে সব সিডি-ক্যাসেট। মাইক বাজিয়ে শোনানো হচ্ছে লেটেষ্ট হিন্দী গান, যা ষ্টকে আছে দোকানীর।

দোকানের সারি পেরিয়ে খানিক দূরেই রাস্তা আটকে রেখেছে লাল-সাদা লোহার পোল, রেললাইনের লেভেল ক্রসিংএ যেমনটি থাকে। ঝকঝকে তকতকে ও‌ই রাস্তার দুই ধারে ল্যাম্পপোষ্টের সারি, যাতে ইতিমধ্যেই জ্বলতে শুরু করেছে সোডিয়াম বাতি। সন্ধ্যার অন্ধকার তখনো ঘনায়নি, আধো আধো আলো আঁধারির মাঝে জ্বলছে অনুজ্জ্বল মরাটে হলদে বাতি।

ডানদিকে চোখ পড়তেই দৃষ্টি আটকালো দিগন্তজোড়া জলে। এই ঘনায়মান সন্ধ্যায় জলের রঙ কালচে। দূরে দেখা যায় জলের মাঝে জ্বলছে টিমটিমে বাতির সারি। ধারণা করি, হয়তো ওদিকেও আছে এমনই কোন এক রাস্তা। মুগ্ধ, অভিভূত চোখে তাকিয়ে থাকি জলের দিকে। মৃদু-মন্দ ঢেউ বোঝা যায় এই আঁধারেও। প্রাকৃতিক কোন লেক হবে এটা।! দিগন্তবিস্তৃত ও‌ই জলের দিকে তাকিয়ে নিমেষেই কেটে যায় ক্লান্তি, উবে যায় ভোর থেকে নিয়ে সারাদিনের এই হ্যাপা আর ধকল।
বরাবরই জল আমার ভাল লাগে। পাহাড় না সমুদ্র কেউ জিজ্ঞেস করলে সাগরকে বেছে নিতে আমার একটুও সময় লাগে না। জলের কাছে এলে আমি সবকিছু ভুলে যাই মুহুর্তে। বিস্তৃত জলের সামনে নিজেকে বড় ক্ষুদ্র মনে হয়। অস্তিত্ব হারায় ছোট-বড় সমস্যারা সব। অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে পলকেই মন ভরে যায়। জলের ধারে চুপচাপ বসে থাকতে পারি ঘন্টার পর ঘন্টা। সে সাগর হোক বা নদী। কিংবা গাছে ঢাকা আমাদের গ্রামের ছায়া ছায়া শানবাঁধানো সেই পুকুর। কিচ্ছুটি না করে শুধু জলের দিকে তাকিয়ে থেকেই কাটিয়ে দিতে পারি গোটা একটা দিন।

আশে পাশে কেউ নেই যাকে জিজ্ঞেস করা যায় এটি লেক নাকি পাহাড়ী কোন নদী। হেঁটে যাই রাস্তা ধরে, অন্ধকার ঘন হয়, জলের উপর বিছিয়ে আছে কুয়াশা। নিস্তব্ধ চরাচর। জলের সরসর শব্দ ছাড়া অন্য কোন শব্দ নেই। এমনকি ডাকে না একটি পাখিও। যেন সকলেই চুপ করে দেখছে শান্ত এই প্রকৃতির রূপ। রাস্তার অন্যদিকে অনেক নিচুতে আবছা দেখা যায় খোলা মাঠ, দূরে পাহাড়ী গাঁয়ে জমাট বেঁধে আছে অন্ধকার। চাদর ভেদ করে ঠান্ডা কামড় বসায় গায়ে। ফেরার পথ ধরি, কাল সকালে এখানেই আবার ফিরব বলে...


No comments:

Post a Comment