Wednesday, February 27, 2008

জেগে আছে বাংলাদেশ


রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
চমকিয়া জাগে ঘুমন্ত বনভূমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
দুরন্ত অরণ্যা গিরি নির্ঝরিনী
রঙ্গে সঙ্গে লয় বনের হরিণী
শাখায় শাখায় ঘুম ভাঙায়
ভীরু মুকুলের কপোল চুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি

প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় টুটুকে দেখি ৷ দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায় ৷ কখনো বারান্দার থামে হেলান দিয়ে তো কখনও বা রেলিংএ ভর দিয়ে ৷ এটা ওর রোজকার নিয়ম, যখন থেকে ও এখানে এসেছে, তখন থেকেই দেখছি ওকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে ৷ না ৷ টুটু সারাদিন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে না, আমি স্কুলে চলে গেলেই ও বাড়িরে ভেতরে চলে যাবে৷ নিজে কলেজে যাওয়ার জন্যে রেডি হয়ে বারান্দার নিচেই হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হিরো সাইকেলটা নিয়ে চলে যাবে কলেজে৷ আমি যখন স্কুল থেকে ফিরি তখনও আবার দেখি, ও এসে দাঁড়িয়েছে ৷ কখন বাড়ি ফেরে কলেজ থেকে জানি না তবে আমি বাড়ি ফেরার আগেই ও ফিরে আসে আর এসে দাঁড়ায় বারান্দায় ৷ এই দৃশ্যের সাথে এখন মোটমুটি সকলেই পরিচিত ৷ সবাই জানে, টুটু কখন, কোন সময়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবে ৷ এই নিয়ে বেশ হেনস্থাও হয়েছে ওর, আম্মুই সেটা করেছে ৷ ওদের বাড়ি গিয়ে বহুবার নালিশ করে এসেছে ওর খালার কাছে, কেন ও এভাবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে আমার স্কুলে যাওয়া-আসার সময়, আর বিকেলে খেলার সময় ৷ 


নালিশ করার পর দু-একদিন বন্ধ থেকেছে ওর বারান্দায় এসে দাঁড়ানো, তারপর আবার যে কে সেই ৷ মুর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের বারান্দার দিকে চোখ রেখে ৷ এছাড়া আর কোন উত্পাত নেই ৷ মোড়ের মাথায় আমি রিকশা থেকে নামার আগেই চোখ যায় ওদের বারান্দার দিকে৷ জানি ও দাঁড়িয়েই থাকবে তবু একবার তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া৷ হুঁ, ও আছে, আমি এগিয়ে যাই বাড়ির দিকে, স্কুলব্যাগ কাঁধে ঝোলানো, চশমাটা একবার শুধু-মুদুই খুলে আবার চোখে পরি, বুকের ওপরে পড়ে থাকা দুই বিনুনীর একটাকে হালকা ঝটকায় পাঠিয়ে দিই পেছনে, পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই বাড়ির দিকে ওর পানে একবারও না তাকিয়ে ৷ অনুভব করতে পারি ওর নিষ্পলক চাউনি অনুসরণ করছে আমায়, হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ও সোজা হয়ে দাঁড়লো, না তাকিয়েও টের পাই ৷ সামনে তাকিয়ে দেখি আম্মু দাঁড়িয়ে আছে জানালায়, রোজ যেমন থাকে৷ দরজাটা খোলা, রোজ যেমন থাকে৷ বাতাসে পর্দাটা উড়ছে৷ ছোট্ট কাঠের গেট পেরিয়ে আমি ঢুকে যাই ভেতরে৷ আম্মু এগিয়ে এসে হাত বাড়ায় কাঁধের ব্যাগ নেবে বলে, রোজ যেমন নেয় ৷

বিকেলে এখন আর খেলতে মাঠে যাই না ৷ আম্মুর অনেক বকাঝকা আর শাসনেও যা হয়নি ইদানিং নিজে থেকেই সেটা হয়েছে ৷ এখন আর খেলতে যেতে ইচ্ছে করে না ৷ বই নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে থাকাটা বরং অনেক বেশি ভাল লাগে আজকাল৷ তবে বারান্দায় গিয়ে খুব যে একটা বসতে পারি তা নয়৷ পাশের বাড়ির টুটুর জন্যে, ঐ ছেলেটির জন্য আমি বারান্দায় বসতে পাই না, বারান্দাটা যেন আমার নয়, ওর ৷ ও আমায় বিরক্ত করে না একদমই ৷ কোন উটকো মন্তব্য তো ও আজ অব্দি করেনি আর সেই একবার এক চিঠি লেখা ছাড়া আর কোন চিঠিও লেখেনি ৷ আম্মু সবই জানে, তবুও ঘুরে ফিরেই বারান্দায় আসবে নিজের ঘুম নষ্ট করে ৷ আমি তাই সামনের এই বসার ঘরের সোফায় আধশোয়া হই, সাথে বই ৷ মাঝে মাঝেই চোখ যায় সামনের বাড়ির বারান্দার দিকে, টুটু কী আছে? না! ওর এখন পড়াতে যাওয়ার সময়, এমন ভাবেই আমি জেনে যাই, সারাদিনে সে কি করে৷ বিকেলে দুটো টিউশনি করে টুটু ৷ আমাদের এই হাউজিং এষ্টেটেরই দু'নম্বর রোডের কোথাও একটা পড়াতে যায় ও, সপ্তায় পাঁচদিন ৷ আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে এলেই ও বেরিয়ে যায় সাইকেলে চেপে, টিউশনিতে ৷ আমি ওবাড়ির খালাম্মার কাছ থেকেই গল্প শুনেছি ৷ 


টুটু তার বড় আপার ছেলে ৷ টুটুর মা, বাবা গ্রামে থাকেন ৷ যেখানে কোন কলেজ নেই ৷ টুটু তার গ্রামের স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে খালার বাসায় এসেছে কলেজে পড়বে বলে ৷ সে বেশ কয়েক বছর আগের কথা ৷ বছর তিন তো হবেই! টুটু আসার আগে আমি প্রায় রোজই যেতাম খালাম্মার কাছে, স্কুল থেকে ফিরে, ছুটির দিনে যখন তখন ৷ টুটু আসার পরেও যেতাম ৷ টুটু কখনই আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেনি ৷ আমি প্রথম টুটুকে দেখে বেশ মজা পেয়েছিলাম৷ ফর্সা ভ্যাদভ্যাদে গায়ের রং, মাথার কোকড়ানো চুল তেল চুপচুপে, ছোট্ট একটা গোঁপও আছে ৷ টুটুর অত ফর্সা গায়ের রং দেখে কী আমার হিংসে হয়েছিল! আমাকে যদিও কেউ কালো বলে না কিন্তু ফর্সাও কেউ কোনমতেই বলতে পারে না, বলে উজ্জ্বল শ্যাম! উজ্জ্বল শ্যাম না ছাই, আমি জানি, আমি কালো, খুব বেশি হলে শ্যামলা বলা যায় আমাকে ৷ ঢ্যাঙা টুটু শার্টের সাথে লুঙ্গি পরে থাকে বাড়িতে, গোড়ালির উপরে সেই লুঙ্গির ঝুল৷ টুটু এত ঢ্যাঙা যে লুঙ্গি ওর নিচে আর নামে না৷ খালার বাসায় থাকতে আসার এক মাসের মধ্যেই টুটু আমায় চিঠি লেখে৷
" রুকু,
আমি তোমাকে ভালোবাসি৷ তুমি আমার মন চুরি করেছ৷ আমি কি তোমার মন চুরি করতে পেরেছি?
যদি আমিও তোমার মনকে চুরি করতে পেরে থাকি তো আমার এই চিঠির উত্তর তুমি আমার বইয়ের ভেতরে রেখে যেও৷
তোমার চিঠির অপেক্ষায় রইলাম৷
তোমার,
জাহিদ ৷'


আমি সেই প্রথম জানতে পারলাম যে ওর ভাল নাম জাহিদ ৷ না ৷ টুটুর চিঠির উত্তর আমি বইয়ের ভেতর রেখে আসিনি ৷ উত্তর দেব এমনটাও ভাবিনি৷ চিঠিটা রেখে দিয়েছিলাম পড়ার টেবিলে৷ গল্পের বই পড়ছি কী না চেক করতে এসে সেই চিঠি বাজেয়াপ্ত করে আম্মু ৷ ভাল মন্দ কোন কথা জিজ্ঞেস না করেই বিনুনী ধরে এক হ্যাচকা টান আর সপাট চড় দু'গালে ৷ কোন দোষ না করেই আমি মার খেলাম সেদিন, টুটু আমাকে চিঠি লিখেছিল বলে৷ এক ছুটে আমি টুটুর খালার বাসায়, উলের গোলা কোলে নিয়ে সোয়েটার বুনছিলেন খালাম্মা, সারাদিনই তিনি বোনেন ৷ ফোঁপাতে ফোঁপাতে ঘটনার বর্ণনা দিলাম আমি ৷ খালাম্মা উঠে গিয়ে দরজার ওপাশ থেকে কান ধরে ঘরে নিয়ে এলেন টুটুকে ৷ আমাকে আসতে দেখে নি:শব্দে দরজার ওপাশে এসে দাঁড়িয়েছিল টুটু, খালাম্মা বললেন, দ্যাখ, কি করেছিস! প্রচন্ড রাগে আমি মুখ ফিরিয়ে ছিলাম টুটুর দিক থেকে , খালাম্মা আবার বললেন, তুই কাঁদছিস কেন, মার তো খেয়েছে রুকু ৷ আমি জানলাম, আমি মার খেলে টুটুও কাঁদে ৷ টুটু বলল, আর হবে না আম্মি ৷ জানলাম, টুটু তার খালাকে আম্মি বলে ডাকে ৷ দরজার ওপাশে আম্মুর গলা পেলাম, রুকু, উঠে এসো! তাকিয়ে দেখলাম গম্ভীর মুখে আম্মু দাঁড়িয়ে আছে দরজায় ৷ 

খালাম্মা বললেন, আপা, আপনি রুকুকে কেন মারলেন? ও কি দোষ করেছে? আম্মু কোন কথার জবাব না দিয়ে হাত ধরে আমাকে বাড়ির দিকে এগোল৷ বেরুনোর সময় আমি তাকালাম টুটুর দিকে, গভীর কালো দুটো চোখ নিষ্পলক তাকিয়ে আমার দিকে, যেন বলছে,' রুকু, আর হবে না!' ঘরে ফিরে আম্মু আমার বিনুনী খুলে দিল, ভিজে তোয়ালেতে মুখ মুছিয়ে দিল আর বলল, তুই ওকে চিঠি লিখিসনি তো? ঘাড় নেড়ে জানালাম, না, আমি লিখিনি ৷ আম্মু তখন খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে আমাকে সামনে বসিয়ে তেলের বাটি আর চিরুণী হাতে নিয়ে আমার চুলে তেল দিতে বসল রোজকার মত আর আমাকে পাঠ দিল ছেলেদের সম্পর্কে, সেই আমি প্রথম জানলাম, ছেলেগুলো এরকমই হয় ৷ মেয়েদের চিঠি লেখে, ফুসলায় আর তারপরে নষ্ট করে দেয়!

আমার সেদিনের মার খাওয়া আমি ভুলে গেলেও টুটু ভোলেনি ৷ টুটু আর কোনদিন আমায় চিঠি লেখেনি ৷ রুনা আপু বলে, টুটু নাকি সত্যি আমায় ভালবাসে ৷ আমি রুনা আপুর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসি ৷ রুনা আপু খালাম্মার মেয়ে ৷ টুটুর খালাতো বোন ৷ পড়ে আমার থেকে এক ক্লাস উপরে, একই স্কুলে পড়ি আমরা ৷ জিন্দাবাজার সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ৷ এ'বছর রুনা আপু ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবে ৷ টেষ্ট পরীক্ষার আগে অব্দি আমি আর রুনা আপু একসাথেই স্কুলে যেতাম ৷ এখন ওর স্টাডি লীভ চলছে বলে রুনা আপু বাড়িতেই থাকে বেশির ভাগ সময়, বেশির ভাগ সময় নয়, রুনা আপু বাড়িতেই থাকে সব সময় ৷ পরীক্ষার আর সবে দু মাস৷ আগে রুনা আপু বিকেলে চলে আসতো আমাদের বাড়ি ৷ গল্প করার জন্যে ওকেই আসতে হতো কারণ আমার তো ওবাড়িতে যাওয়া বারণ টুটুর জন্যে ৷ বারণ বলতে আম্মু কখনই মুখে বারণ করেনি কিন্তু সারাক্ষণ যেভাবে চোখে চোখে রাখে আমাকে, আমি ওবাড়িতে গেলে খানিক পরেই আম্মুও ঠিক এসে হাজির হয়, রুকু, পড়া আছে না? বাড়ি চল! আমি বুঝে নিয়েছি আমার ওবাড়িতে যাওয়া চলবে না ৷ 

আমার মাঝে মাঝে খুব রাগ হয় আম্মুর পরে৷ আম্মু এত অবুঝ কেন? আব্বুকে কিছু বলতে এখন আমার সংকোচ হয় ৷ বিশেষ করে টুটুর ঐ চিঠি লেখার পর থেকে ৷ তবুও আব্বু বরং অনেক বেশি বোঝে আমাকে, আম্মুর থেকে অন্তত বেশি বোঝে, আব্বু বলে, কেন রুকু বারান্দায় যাবে না? কেন রুনাদের বাড়ি যাবে না? আর তুমি খেলতেই বা যাবে না কেন? ইচ্ছে হলেই যাবে রুনাদের বাড়ি, গল্প করবে, সামনের মাঠে গিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলবে! কিন্তু আমার যাওয়া হয় না ৷ ঐ টুটুর জন্যেই যাওয়া হয় না ৷ আমি ওবাড়ি গেলে টুটু টিউশনি পড়াতে যায় না ৷ এমনকি কোন কারণে আমি স্কুলে না গেলে টুটুও কলেজে যায় না ৷ কাজেই আমার চলা ফেরার গন্ডিটা অনেক ছোট হয়ে যায় ধীরে ধীরে ৷ টুটুর জন্যে ৷

টুটুর খালাম্মা উল বোনেন, অলমোষ্ট বারো মাস বোনেন, শুধু যখন প্রচন্ড গরম পড়ে, হাতের ঘামে উলে ফেঁসে ফেঁসে যায়, তখন কিছুদিন বন্ধ থাকে এই উলবোনা ৷ প্রতিবছর খালাম্মা সোয়েটারগুলোকে খোলে, যেগুলোকে আগের বছর বানিয়েছিল, টুটুর জন্যে, খালুজীর জন্যে আর রুনা আপুর জন্যে ৷ হাতের লম্বা লম্বা টানে উল ছাড়িয়ে নিতে থাকে সোয়েটার থেকে,এক অদ্ভুত কায়দায় ছাড়িয়ে নেওয়া উলের গোলা বানায় হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, ডিমের মত আকারে, বড় বড় সব গোলা, লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি, সাদা আর সবুজ৷ ডিম্বাকৃতি সব গোলা ৷ দুটো তিনটে গোলা একসাথে নিয়ে খালাম্মা বোনে, দু ঘর লাল, মাঝের চার ঘর সাদা কিংবা সবুজ, আবার দু ঘর লাল ৷ ফুটে ওঠে বকুল ফুল খালাম্মার সোয়েটারে ৷ 

তেকোণা ষ্টোলে খালাম্মা ফুটিয়ে তোলে বড় বড় কদমের ফুল ৷ যার গা থেকে ঝুলছে গোল গোল কদম, গলার দিকটায় গোল একটা বড় ফুটো, যাতে মাথা গলিয়ে সেই ষ্টোল গায়ে দেয় রুনা আপু ৷ আমি বসে খালাম্মার বোনা দেখি, কখনও বা নিজেও একটু হাত লাগাই, চেষ্টা করি খালাম্মারই মত তাড়াতাড়ি হাত চলাতে উলের কাঁটায়, কিন্তু হয় না ৷ গত বছর আমিও বুনেছি একটা সোয়েটার, ভাইয়ার জন্যে ৷ প্যাচানো সাপ উঠে গেছে সেই সোয়েটারের ঝুল থেকে গলা অব্দি, নিচে চার ইঞ্চি চওড়া বর্ডার, হাতের বর্ডার দু ইঞ্চি, তেকোণা গলার বর্ডার দেড় ইঞ্চি ৷ গাঢ় কচুয়া  রঙের জমিতে সাপগুলো হলুদ ৷ বোনার সময় আটকালেই এক ছুটে খালাম্মার কাছে, বুনতে গিয়ে মাঝে মাঝেই একটা ঘর ছেড়ে দিতাম, সাথে সাথে বুঝতে পারতাম না যে একটা ঘর ছেড়ে দিয়েছি বোনার সময়, বেশ কয়েক লাইন বোনা হয়ে গেলে যখন বুঝতে পারতাম, তখন ছুট খালাম্মার কাছে, খালাম্মা সেপটিপিন দিয়ে সেই ঘর এক লাইন এক লাইন করে তুলে আবার কাঁটায় তুলে দিয়ে শুধরে দিত বোনার ভুল ৷


-০২-


বড়ো বেদনার মত বেজেছ হে তুমি আমার প্রাণে,
মন যে কেমন করে মনে মনে তাহা মনই জনে৷৷
তোমারে হদৃয়ে করে আছি নিশিদিন ধরে,
চেয়ে থকি আঁখি ভরে মুখের পানে৷৷
বড়ো আশা, বড়ো তৃষা, বড়ো আকিঞ্চন তোমারি লাগি৷
বড়ো সুখে, বড়ো দুখে, বড়ো অনুরাগে রয়েছি জগি৷
এ জন্মের মতো আর হয়ে গেছে যা হবার,
ভেসে গেছে মন প্রাণ মরণ-টানে৷৷


আমি বড় একলা হয়ে গেছি যখন থেকে ভাইয়া ক্যাডেট কলেজে পড়তে গেছে৷ ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ৷ চট্টগ্রামের কাছে৷ সেই কতদূর! বছরে দু বার মাত্র ওদের ছুটি৷ তাও রোজার ঈদে পনের দিন আর কোরবানীর ঈদে মাত্র এক সপ্তাহ৷ ভাইয়ার ছুটির আগেই আব্বু চট্টগ্রাম চলে যায় আর দু'দিন পর ভাইয়াকে সাথে নিয়ে ফেরে৷ কি বিশাল এক লোহার ট্রাঙ্ক ভাইয়ার, তাতে বড় বড় করে সাদা রং দিয়ে লেখা , কায়সার আহমেদ৷ একাদশ শ্রেণী৷ ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ, চট্টগ্রাম৷ একপাশে ইংরেজী আর একপাশে বাংলায় লেখা ৷ প্রতিবার ভাইয়া বাড়ি ফেরার সময় এই ট্রাঙ্ক নিয়ে ফেরে আবার এটা সাথে করে নিয়ে যায় ৷ আমি ভাইয়াকে কয়েকবার বলেছিও, হ্যাঁরে ভাইয়া, তুই এত্ত বড় একটা ট্রাঙ্ক প্রতিবার নিয়ে আসিস আর নিয়ে যাস? ছোট একটা স্যুটকেসে করে জামাকাপড় নিয়ে এলে কি হয়? ভাইয়া বলে, ওর ওখানে রেখে আসার সিষ্টেম নেই৷ 

সব ছাত্রেরই একটা করে এরকম ট্রাঙ্ক আছে আর প্রত্যেকেই সেটা বাড়ি নিয়ে যায় আর নিয়ে আসে আর প্রত্যেকের ট্রাঙ্কেই নাকি সাদা বা কালো কালিতে নাম লেখা থাকে ৷ সেই ট্রাঙ্কে ভাইয়ার যাবতীয় জিনিসপত্র ৷ বই খাতা, জামা কাপড় এমনকি খেলার সরামও ৷ ভাইয়া ক্রিকেট খেলে৷ তার ব্যাট, বল, স্ট্যাম্প, প্যাড, গ্লাভস সব থাকে এই ট্রাঙ্কের ভেতর ৷ ভাইয়া যখন বাড়ি ফেরে তখন সবচাইতে বেশি আনন্দ হয় আমার৷ এই পনের আর সাত মোট বাইশ দিন আমার কোথাও যেতে নেই মানা ৷ দুই ঈদের সময় আমার স্কুলও ছুটি থাকে কাজেই পড়ার টেনশনও থাকে না ৷ ভাইয়া আসার আগেই আমি ছুটির পড়া করে রাখি, ভাইয়া এলে যেন বই নিয়ে বসতে না হয় ৷ আমার ছুটি অবশ্য শুরুও হয়ে যায় অনেক আগে থেকেই, ভাইয়া আসারও আরও পনের দিন আগে থাকতে ৷ প্রায় দিনই সকাল সকাল খাওয়া দাওয়া সেরে আমি আর ভাইয়া বেরিয়ে পড়ি ৷ কোনদিন কাছের লাক্করতলা চা বাগানে, কোনদিন বা আরেকটু দূরে, বাগান ছাড়িয়ে পাহাড়ের দিকে ৷ ছোট ছোট টিলাগুলোই আমাদের পাহাড় ৷ 

শহর থেকে একটু দূরের দিকে গেলেই মণিপুরীদের দেখা পাওয়া যায় ৷ প্রতিটা পাহাড়ের গায়েই থাক কেটে কেটে লাগানো আনারসের বাগান, ওদের বাগান ৷ ছোট ছোট টিলার উপর ওদের ঘর বাড়ি ৷ পায়ে চলা সরু পথ বেয়ে একটু উঠে গেলেই চোখে পড়ে নিকোনো ঊঠোন, খড়ের চালের মাটির বাড়ি ৷ নাক বোঁচা ফর্সা ন্যাংটো শিশুরা ঘুরে বেড়ায় উঠোনে, আমাদের দেখলেই এক ছুটে ঘরে ঢুকে যায় আর তারপর উঁকি দেয় দরজার আড়াল থেকে ৷ প্রায় প্রতিটা উঠোনেই চারপেয়ে চৌকির মত একটা জিনিস থাকে, যাতে ওরা, মনিপুরী মেয়েরা সুতো বেঁধে বোনার কাজ করে ৷ সেই চৌকির কাঠামোর চারপাশে ছোট ছোট পেরেক গাঁথা থাকে ৷ সুতোর লাছি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আটকে দেয় সেই পেরেকগুলোতে ৷ তারপর ওর মধ্যেই ফুটিয়ে তোলে, গাছ, লতা, পাতা, পাখী আর পাহাড় ৷ আনারসের বাগান ৷ সরু সুতোয় বোনা গুলো হয় গায়ের চাদর, মোটা সুতোয় বোনাগুলো বিছানার চাদর, আরেকটু মোটাগুলো হয় কম্বল৷ যেগুলো ওরা কাঁধের ঝোলায় পুরে শহরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে, বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে ৷

আমাদের বাড়িতে এমনিতে টুটুর আসার কোন চান্স নেই, কিন্তু ভাইয়া এলে মাঝে মাঝে টুটু চলে আসে৷ নিজে থেকে আসে না অবশ্য, ভাইয়াই ধরে নিয়ে আসে তবে সেও খুব কম ৷ আম্মুর মুখ ভার হয়ে যায় টুটু এলেই যদিও মুখে কিছু বলে না , ভাইয়া আম্মুকে খুব একটা ঘাঁটাতে চায়ও না ৷ তাই বেশির ভাগ দিনেই ভাইয়া টুটুর ঘরে গিয়েই আড্ডা জমায় সন্ধ্যের পর ৷ টুটুর ঘরটা এক মজার জায়গা ৷ বারান্দার এক মাথায় ছোট্ট এক রুম, ভেতরবাড়ির সাথে যার কোন সংযোগ নেই৷ যতক্ষণ খালাম্মাদের বসার ঘরের দরজা খোলা থাকে ততক্ষণই ঐ ঘরের সাথে যোগাযোগ নইলে এ এক বিচ্ছিন্ন ঘর৷ রুনা আপু একদমই টুটুর ঘর মাড়ায় না, কেন কে জানে ৷ আমি নিজে কখনও টুটুর ঘরে যাইনি ৷ আমাদের বাড়ির পরের বাড়িটাই টুটুদের, মাঝে একটা হাফ দেওয়াল৷ বারান্দা থেকে টুটুর ঘরের সবটুকুই দেখা যায় যদি ওর জানালা খোলা থাকে ৷ এমনিতে এই জানালা খুব একটা খোলে না টুটু কিন্তু ভাইয়া যদ্দিন বাড়ি থাকে টুটুর ঘরের এই জানালা সারাক্ষণই খোলা ৷ আমি জানতাম না যে টুটু ছবি আঁকে ৷ 

না ৷রং তুলি দিয়ে ক্যানভাসে ছবি আঁকে না টুটু, ওর আঁকা আঁকি সব খাতার পাতায়, ঘরের সাদা দেওয়ালে পেন্সিল দিয়ে ৷ আমি কখনও দেখিনি টুটুর আঁকা ছবি ৷ ভাইয়া বলে, টুটু শুধুই স্কেচ বানায়, পেন্সিলের আঁচড়ে আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলে নানা ছবি, সাদা পাতায় কালো পেন্সিলের দাগে ৷ অন্য কোন রং নেই ৷ জ্যামিতিক সব নকশা আঁকে টুটু, ঐ নকশায় কী ফুটিয়ে তোলে টুটু, ছবির মধ্যে দিয়ে কী বলতে চায়, সে শুধু টুটুই জানে ৷ এই জ্যামিতিক ছবি ছাড়া আর যা আঁকে টুটু সেগুলো মানুষের মুখ ৷ একটা মেয়ের মুখ ৷ লম্বা চুলে দুই বিনুনী করা এক মেয়ের মুখ ৷ একটাই মুখ, বিভিন্ন ভঙ্গীর ৷ প্রতিটা ছবিতেই নাকি সেই মুখ খানিকটা করে বদলে যায়, সে নিজেই স্বীকার করে, এই যে মুখটা একটু করে বদলে যায়, এ নাকি তার আঁকার দোষ, যেদিন সে ঠিকঠাক আঁকতে পারবে সেদিন থেকে এই মুখ আর একটুও বদলে যাবে না ৷ 

ভাইয়া বলে, টুটু নাকি পড়াশোনাতেও খুব ভাল ৷ একথা অবশ্য খালাম্মাও বলে, রুনা আপুও বলে ৷ রুনা আপু নিজেই তো টুটুর কাছে পড়ে ৷ আগে অবশ্য রুনা আপুর একজন টিউটর ছিল কিন্তু রুনা আপু সেই টিউটরের কাছে এখন আর পড়ে না ৷ টুটু নাকি অংকে খুব ভালো ৷ এই কথাটা অবশ্য ভাইয়াও বলে ৷ ভাইয়া ছুটিতে এসেও অংকের বই খাতা নিয়ে টুটুর কাছে যায় ৷ ভাইয়া যে ক'দিন থাকে সে ক'দিন টুটুরও যে বেশ আনন্দ সে আমি বেশ বুঝতে পারি ৷ ইচ্ছে হলে ও আমাদের বাড়ি আসতে পারে, ওর ঘরের জানালা সারাদিন খুলে রাখতে পারে যা এমনিতে একেবারেই সম্ভব নয় ৷ ভাইয়াটা বেশ পাজি ৷ আমাকে মাঝে মাঝেই বলে, কী রে, টুটুভাইকে তোর পছন্দ? ও কিন্তু তোকে খুব ভালবাসে! আমি অবাক হই, টুটু তাহলে ভাইয়াকে এসব বলে! রাগ হয় বেশ৷ মুখ গোমড়া করে ভাইয়াকে বলি, যাও, তোমার আর ফোঁপরদালালী করতে হবে না টুটুর জন্যে ৷

আমি টুটুকে ভাই কিংবা ভাইয়া কিছুই বলি না ৷ আজ অব্দি তো কথাই বলিনি ওর সাথে! টুটু না কী ভাইয়াকে বলেছে, তোর বোনের খুব অহংকার! ইশশ! আবার অহংকার বলা হচ্ছে! না, না, আমার একটুও অহংকার নেই ৷ কেন হবে? টুটুটা সত্যিই কী বোকা৷ আমি টুটুকে পছন্দ অপছন্দ কিছুই করি না ৷ ভালবাসা? না ৷ সে আমি বুঝতেই পারি না, ভালবাসা বস্তুটা কী ৷ তবে যেটুকু বুঝি, টুটু যদি সকালে, বিকেলে আর আমি যতক্ষণ বাড়ি থাকি ততক্ষণ ঐ বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে না থাকে তবে আমার ভাল লাগবে না, লাগে না ৷ কোনদিন এরকম হয় না যে আমি স্কুলে যাচ্ছি, স্কুল থেকে ফিরছি অথচ টুটু বারান্দায় দাঁড়িয়ে নেই৷ 

বছরে একবার টুটু বাড়ি যায় ৷ ওর কলেজ তখন বেশ কিছুদিনের ছুটি থাকে ৷ কিসের ছুটি অতশত আমি জানি না ৷ কিন্তু ও যায় ৷ এবারেও গেছে৷ কিন্তু এখন কী কলেজের ছুটিতে গেছে? ছুটিতে তো এই কিছুদিন আগেই একবার ঘুরে এল, আর এখন তো সবার পরীক্ষা সামনে! তবে? এই কয়েকদিন আমার খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগে ৷ সকাল ঘুম থেকে উঠে স্কুল যাওয়া অব্দি বারে বারেই ঘুরে ফিরে বারান্দায় আসি, ওখানে কেউ দাঁড়িয়ে নেই জেনেও৷ বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার সময় তিন নম্বর রোডের মুখ থেকেই টুটুদের বারান্দায় চোখ যায়, টুটু নেই৷ কবে আসবে? কে জানে! কাউকে জিজ্ঞেস করব সেই উপায়ও নেই৷ রুনা আপুকে জিজ্ঞেস করতেই পারি কিন্তু রুনা আপু এমন হই হই করে উঠবে যে সে এক কান্ড হবে ৷ বরং খালাম্মার উলের বোনাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলে খালাম্মাই রাজ্যের গল্প করবে আর সেই গল্পের ফাঁক দিয়ে টুটুর কথাও আসবেই, কিচ্ছুটি জিজ্ঞেস করার দরকারই পড়বে না ৷

আমি নিজের ঘরের ভেতর বসেই সোয়েটার বুনি ভাইয়ার জন্যে, বারে বারে ঘর পড়ে যায়, ডিজাইনে ভুল হয় ৷ জানি খালাম্মার কাছে গেলে উনি সুন্দর করে দেখিয়ে দেবেন ৷ কিন্তু আমি যাই না ৷ কী হবে গিয়ে? এর আগেও আমি দুটো সোয়েটার বুনেছি ভাইয়ার জন্যে ৷ কিন্তু সেগুলো নাকি ছোট সব ৷ ভাইয়া প্রতিবার বাড়ি ফিরলে টের পাই সে দু-তিন ইঞ্চি বেড়েছে , কিন্তু তাই বলে ছোট? রুনা আপু বলে শহরের ফ্যাশান না কি আলাদা তাই ভাইয়া নেয় না! এগুলো সব পুরোনো ডিজাইন ৷ খালাম্মা কেন পুরানো ডিজাইন বোনে? টুটুকে বললেই তো সে নতুন ডিজাইন এঁকে দেয়, তার এমন হাত! ভাইয়া অবশ্য ফ্যাশনের কথা স্বীকার করে না, বলে শহরে নাকি শীতই পড়ে না, তুই অন্য কারো জন্যে বোন ৷ আমি আর কার জন্যে বুনতে পারি? প্রতিবারই ভাবি আর বুনব না , তবু বুনি ভাইয়ার জন্যে ৷ আগের উল খুলে নতুন ডিজাইন তুলি খালাম্মার কাছে ৷ কিন্তু ঘরে ফিরলেই সেই গোলমাল৷

আমি কিন্ত টুটুর কথা জানার জন্যে আমি খালাম্মার কাছে গিয়ে বসি না, রুনা আপুর ঘরে গিয়ে তার বিছানায় বসে থাকি ৷ রুনা আপু মন দিয়ে পড়ছে পরীক্ষার পড়া ৷ পড়া না ছাই! কানে ওয়াকম্যান লাগিয়ে নজরুলগীতি শুনছে , আজকাল যে রুনা আপু সন্ধ্যাবেলায় হারমনিয়াম বাজিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায় না,

বড়ো বেদনার মত বেজেছ হে তুমি আমার প্রাণে,
মন যে কেমন করে মনে মনে তাহা মনই জনে ৷৷
বা

ভেঙেছ দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময়, তোমারি হউক জয় ৷
সেটা অবশ্য পরীক্ষার জন্যে নয়৷ আম্মুই গিয়ে খালাম্মাকে বলে তার গানে অন্য ঈশ্বরের কথা আছে, সেই গান গাওয়া ঠিক নয় ৷ খালাম্মা হাসি মুখে মেনে নিয়েছেন, আগের মাষ্টার ছাড়িয়ে দিয়েছেন ৷ পরীক্ষার পর নতুন মাষ্টার আসবেন নজরুলগীতি শেখাতে ৷ একমাত্র টুটুই প্রতিবাদ করেছিল কিন্তু ধোপে টেকেনি ৷ রবীন্দ্রসঙ্গীতের সমস্ত ক্যাসেট জলে ফেলে দিয়ে নজরুলগীতির ক্যাসেট কিনে আনা হয়েছে ৷ পরীক্ষার পড়ার ফাঁকে ফাঁকে এখন সেগুলোই শোনে রুনা আপা ৷

হেথায় নিমেষে স্বপন ফুরায়,
রাতের কুসুম প্রাতে ঝ'রে যায়,
ভালো না বাসিতে হদৃয় শুকায়,
বিষ-জ্বালা-ভরা হেথা অমিয় ৷৷

আর মুখের সামনে ধরে রেখেছে খোলা একটা খাতা ৷ উঁকি দিয়ে দেখলাম সেও পড়ার খাতা কিছু নয়, রুনা আপুর লেখার খাতা ৷ রুনা আপু কবিতা লেখে ৷ কবিতা ছাড়া আর যা লেখে সে ঠিক গল্পও নয় আবার কবিতাও নয় ৷ তবে রুনা আপুর লেখা কবিতার চাইতে তার এই না কবিতাগুলোই আমার বেশি ভাল লাগে ৷ কান থেকে থেকে ওয়াকম্যান নামিয়ে রেখে রুনা আপু বলে, কীরে, মন খারাপ? টুটুভাইয়ের জন্যে? বলে নিজেই হেসে গড়িয়ে পড়ে ৷ আমার মন আরও খারাপ হয়ে যায় ৷ এর মধ্যে এত হাসার কী হল! খানিক হেসে টেসে নিয়ে রুনা আপু ধীরে সুস্থে বলল, দেশে খালাম্মার শরীর খুব খারাপ, ঢাকায় নিয়ে গেছে অপারেশনের জন্যে, গলব্লাডার স্টোন ৷ অনেকদিন ধরেই ভুগছে এবার বাড়াবাড়ি হওয়াতে অপারেশনের জন্যে ঢাকায় নিয়ে গেছে ৷ খালুজীর সরকারী চাকরী, বেশিদিন ছুটি নেওয়ার উপায় নেই, তাই টুটু পড়াশোনা, টিউশনি আর বারান্দায় হাজিরা দেওয়া সব বন্ধ করে ঢাকায় গেছে মায়ের চীকিৎসা করাতে ৷

টুটুর এই বারান্দায় হাজিরা দেওয়াটা এখন এত বেশি স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে এখন ওকে কেউ ওখানে দেখতে না পেলেই ভবে, আরে, টুটু কোথায়? শরীর খারাপ নয় তো ছেলেটার! সেদিন যেমন আব্বু জিজ্ঞেস করছিল আম্মুকে ৷ আম্মু বেশ নিরাপদ আর নিশ্চিন্ত বোধ করে টুটু না থাকলে ৷ সেই টুটু কেন নেই, ওর ভাল-মন্দ নিয়ে আব্বুর উদ্বেগ শুনে আম্মু বেশ রেগে গেল, বলল, নেই তো কী হয়েছে, শান্তি, যদ্দিন না থাকে! এঘর থেকে আমার খুব নিষ্ঠুর মনে হল আম্মুকে৷ আম্মু কেন এভাবে কথা বলে? এত নিষ্ঠুর তো আম্মু নয়৷ তবে টুটুর বেলাতেই কেন আম্মু এমন অবুঝ আর নিষ্ঠুর হয়ে যায় আমি ভেবে পাই না ৷ সেই একবার এক চিঠি লেখা ছাড়া আর তো কখনও টুটু কোন চিঠি লেখেনি, আমাদের বাড়িতেও তো আসে না টুটু এমনকি আমার সাথে কখনও কোন কথা বলারও চেষ্টা করে না ৷ তবে কেন আম্মুর এত রাগ টুটুর পরে ৷ আম্মুর রাগের কারণ খুঁজে না পেয়ে আমি মন দিই পড়ার বইয়ে ৷ 

পরীক্ষার আর বেশিদিন নেই ৷ এ বছর রুনা আপুদের স্কুল ফাইন্যাল তার পরের বছর আমাদের ৷ আব্বু বলে, এখন থেকেই পুরোদস্তুর পড়াশোনা করতে হবে স্কুল ফাইন্যালের জন্যে, নইলে রেজাল্ট ভাল হবে না, ভাইয়ার মত ৷ কিন্তু আব্বু জানে না, আমি ভাইয়ার মত ভাল রেজাল্ট করতেও চাই না ৷ আমার ভাল লাগে না সারাক্ষণ শুধু পড়া পড়া আর পড়া করতে ৷ ভাইয়াটা কেন হষ্টেলে চলে গেল? আমার খুব মন খারাপ হয় ভাইয়ার জন্য ৷ গুণে গুণে হিসেব করে দেখলাম অবার, এই নিয়ে পাঁচ বছর হয়ে গেল, ভাইয়া গেছে৷ এবছর ওর উচ্চ মাধ্যমিক, তারপর অবশ্য ভাইয়া কিছুদিনের জন্যে বাড়ি আসবে৷ যদ্দিন না রেজাল্ট বের হয় আর তারপর আবার কোথাও ভর্তি না হয় ৷ পরীক্ষার পরে বাড়ি এসে যে ভাইয়া শুধু ছুটি কাটাবে তা নয়, আব্বু এখন থেকেই সব লিষ্ট বানিয়ে রেখেছে,সব ইনিয়ারিং কলেজের, যেখানে যেখানে ভাইয়া ভর্তি পরীক্ষা দেবে ৷ 

আরেকটা অপশন অবশ্য আছে আছে, আর্মিতে ঢুকে যাওয়া ৷ ভাইয়ার সেটাই ইচ্ছে কিন্তু গম্ভীর মুখে আব্বু জানিয়ে দিয়েছে ভাইয়াকে, ওসব আর্মিতে যাওয়ার চিন্তা ভাবনা ছাড়ো, পরীক্ষা শেষ হলে ফিরে এসো, এর পরে কি করবে সে অনেক আগেই ভেবে রেখেছি! আব্বু সবকিছুই অনেক আগে থেকেই ভেবে রাখে, আমাদের সব ভাবনাই আব্বু ভাবে ৷ ভাইয়া চিঠিতে আমাকে লিখেছে, পরীক্ষার পর ফিরে এসে ও সিলেটেই থাকবে, সিলেটেরই কোন কলেজে ভর্তি হবে, আব্বু যতই লিষ্ট বানাক না কেন আর যতই ভাবুক না কেন! ভাইয়া এখানেই থাকবে ভেবে আমি নিশচিন্ত বোধ করি৷

-০৩-


পরজনমে দেখা হবে প্রিয়!
ভুলিও মোরে হেথা ভুলিও৷৷
এ জনমে যাহা বলা হ'ল না,
আমি বলিব না, তুমিও ব'লো না!
জানাইলে প্রেম করিও ছলনা,
যদি আসি ফিরে, বেদনা দিও৷৷


হাউজিং এষ্টেটের আমাদের এই বাড়িটার সামনে পেছনে দুটো বারান্দা ৷ সামনের বারান্দার গ্রীলএর হাফ রেলিং পেরিয়েই ছোট্ট একটুখানি লন, তাতে ছোট্ট একটু বাগান ৷ কিছু গাছ বাগানের মাটিতে আর কিছু গাছ টবে৷ এই বাগানটা ভাইয়ার, গাছগুলোও ওরই লাগানো ৷ বাগানের শেষে যেখানে আমাদের বাড়ির সীমানা সেখানে ইটের হাফ দেওয়াল, ছোট্ট কাঠের গেট৷ গেট ছাড়িয়ে সামনে দিয়ে রাস্তা, হাউজিং এষ্টেটের তিন নম্বর রোড, পাশাপাশি এরকম চারখানি রাস্তা সমান্তরালভাবে গেছে, এক, দুই, তিন, চার৷ প্রতিটা রাস্তাই ডানদিক দিয়ে গিয়ে পড়েছে বড় রাস্তায় আর বাঁদিক দিয়ে শেষ হয়েছে ছোট এক টিলার গায়ে, আমরা যাকে পাহাড় বলি ৷ হাউজিং এর এই শেষ মাথায়, পাহাড়ের নিচে আমাদের খেলার মাঠ৷ এই হাউজিং এর প্রায় সব ছেলে মেয়েরাই এখানে খেলতে আসে ৷ দিনের বেলা কচি কাঁচারা খেলে, সন্ধ্যের পরে বড়রা বাতি জ্বালিয়ে শীতকালে ব্যাডমিন্টন খেলেন আর গরমকালে চেয়ার পেতে বসে শুধুই আড্ডা দেন৷ 

হাউজিং এর এই রাস্তাগুলো যেখানে শেষ হয়ে বড় রাস্তায় পড়েছে সেখানে একটু ছোট্ট বাজার মত আছে সব কটি রাস্তাতেই৷ হাউজিংএর লোকজন ওখান থেকেই দরকারী ছোটখাট জিনিসপত্র কিনে আনেন৷ রাস্তার দুধারে বাড়ি, কোনটা একতলা কোনটা দোতলা৷ প্রতিটা বাড়ির সামনেই ছোট্ট এক টুকরো বাগান, ঠিক যেমনটি আমাদের বাড়ির সামনে আছে৷ এই তিন নম্বর রোডের পেছন দিয়ে সমান্তরালভাবে গেছে এক সরু ঝর্ণা, আমরা সিলেটিরা যাকে "ছড়া' বলি৷ আমাদের বাড়ির ঠিক পেছন দিয়েই গেছে এই ছড়া, এমনিতে খুবই সরু, শুধুই তিরতিরে এক জলরেখা৷ ওদিকের পাহাড় থেকে নেমে এসেছে , এই হাউজিং এষ্টেটের বুকের উপর দিয়ে বয়ে গিয়ে এগিয়ে গেছে অনেকদূর, কোথাও খুব সরু তো কোথাও বা খানিকটা চওড়া হয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে একেবারে শেষ হয়েছে সুর্মায় ৷ আম্মু বলে, রিকাবী বাজারের যে বাড়িটাতে আমার জন্ম হয়েছিল, সেও নাকি এই ছড়ার পারেই ছিল! ছোট্ট আমার কাঁথা কাপড় ঐ ছড়া থেকেই ধুয়ে আনত জামশিদা বুবু ৷ ছড়ার পারের সেই বাড়িতে আম্মুরা তখন ভাড়া থাকত, আমার জন্মের কিছুদিন পরেই এবাড়িতে উঠে আসা হয়, সব চাইতে মজার ব্যপার, এখানেও বাড়িটি সেই ছড়ার পারেই ৷ পেছনের বারান্দায়ও হাফ রেলিং, গ্রীলের, আর তারপরেই খানিকটা দূর থেকেই শুরু হয়েছে ঢাল, নেমে গেছে ছড়ায়৷ 

যখন খুব বর্ষা হয়, তখন ছড়ার জল উঠে আসে বাড়ির একেবারে পেছন অব্দি৷ ঘোলা, ময়লা জল৷ আম্মু বলে, পাহাড় ধুয়ে নেমে আসে এই পানি, ময়লা তো হবেই ৷ ছড়ার ওপাশে যতদূর চোখ যায় ঘন জঙ্গল ৷ অচেনা সব গাছ, ছোট বড়, অন্ধকার হয়ে থাকে দিনের বেলাতেও ৷ পেছনের এই বারান্দা, তিরতির করে বয়ে যাওয়া ঐ ছড়া আর ওপাশের ঘন জঙ্গল, সবই আমার খুব প্রিয় ৷ আমার যখন খুব মন খারাপ হয়, আমি এসে এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকি, রেলিংএ হেলান দিয়ে ৷ পাশের বাড়িতে গানের মাষ্টার একই গান তুলিয়ে যায় রুনা আপুকে৷ " আমারে চোখ-ইশারায় ডাক দিলে হায় কে গো দরদী,/ খুলে দাও রংমহলার তিমির-দুয়ার ডাকিলে যদি ৷৷' আমাদের বাড়িতে গান বাজনার চল নেই, তাই আমি বারান্দার এসে শুনি ৷ কত তো গান আছে সেগুলো কেন শেখায় না মাষ্টার? একঘেয়ে লাগে, আমি চুপ করে ঘরে এসে বসে থাকি আজকাল আমার খুব ঘন ঘন মন খারাপ হয় ৷ নি:শব্দে কেটে যায় প্রহর৷

ভাইয়া ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে গিয়ে ভর্তি হয়েছে বুয়েটে, ঢাকায় ৷ আবার হষ্টেল ৷ ভাইয়ার সেই ট্রাঙ্কের গায়ে এবারে ক্যাডেট কলেজের বদলে বুয়েটের নাম ঠিকানা লেখা ৷ কায়সার আহমেদ ৷ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ ইনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি ৷ নজরুল ইসলাম হল৷ ঢাকা ৷ ক্যাডেট কলেজ থেকে পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পরে রিতিমত বাকযুদ্ধ হয়েছে আব্বুর সাথে ভাইয়ার এবং ভাইয়াকে সব কটা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষা দিতে হয়েছে, আব্বুর খুব ইচ্ছে ছিল ভাইয়া যেন বুয়েটে পড়ে, তাই হয়েছে, ভাইয়া বুয়েটেই ভর্তি হয়েছে৷ তবে ভাইয়া একটুও মন খারাপ করে বসে থাকে না, বলে, দাঁড়া, ক'দিন লাগবে পাশ করে বেরুতে, তারপর আমি এখানেই ফিরছি, সিলেটে ৷ ভাইয়া কবে ফিরবে, আদৌ ফিরবে কী না? আমি আর এ নিয়ে ভাবি না ৷ হয়ত দেখা গেল, ভাইয়া যখন ফিরে আসবে পাশ করে, তার আগেই আব্বু অন্য কিছু প্ল্যান করে ফেলেছে ভাইয়ার জন্য ৷ 

ওবাড়ির রুনা আপুর বিয়ে হয়েছে লন্ডননিবাসী সাদেক ভাইয়ার সাথে ৷ রুনা আপু নিজেও এখন লন্ডননিবাসিনী৷ কলেজে পড়তে গিয়ে রুনা আপুর দেখা হয় শিরিনের সাথে, বন্ধুত্ব হয়, শিরিন সাদেক ভাইয়ার ছোট বোন, একই ক্লাসে পড়ত রুনা আপুর সাথে৷ তখন সাদেক ভাইয়া মাঝে মাঝেই কলেজে আসে ছোটবোনকে পৌঁছে দিতে অথবা কলেজ থেকে বাড়ি নিয়ে যেতে ৷ কলেজেই দেখা হয় রুনা আপুর সাথে সাদেক ভাইয়ার, মন জানাজানি হতেও সময় লাগেনি ৷ সাদেক ভাইয়ার বাড়ির লোকেদেরও অপছন্দ হয় না রুনা আপুকে ৷ বড়দের মারফত বিয়ের প্রস্তাব আসে রুনা আপুদের বাড়িতে, খালাম্মা খালুজীরও অপছন্দের কারণ ছিল না, লন্ডননিবাসী হোটেলমালিক সাদেক ভাইয়ার সাথে রুনা আপুর বিয়ে হয়ে যায় ৷ আমিও গেছিলাম খালাম্মা আর খালুজীর সাথে সিলেট এয়ারপোর্টে, রুনা আপুকে প্লেনে তুলে দিতে৷ সিলেট থেকে রুনা আপু যাচ্ছে ঢাকায়, ওদের লন্ডনের ফ্লাইট রাতে, বিকেলটা ওরা ঢাকা এয়ারপোর্টেই থাকবে৷ 

সাদেক ভাইয়া খালাম্মা আর খালুজী দুজনকেই বলেছিল ওদের সাথে ঢাকায় যেতে, পরদিনের ফ্লাইটে আবার ওঁরা সিলেটে ফিরে আসবেন কিন্তু ওঁরা কেউই যেতে চাননি ঢাকায়, এখান থেকেই মেয়ে জামাইকে বিদায় জানিয়ে বাড়ি ফিরবেন ৷ জরির কাজ করা লাল জর্জেট শাড়ি আর ঝকঝকে সোনার গয়নায় সুন্দরী রুনা আপু কখনও লন্ডন যাওয়ার আনন্দে হাসিতে উচ্ছ্বল তো কখনও কেঁদে আকুল খালাম্মা-খালুজী আর সবাইকে ছেড়ে যাচ্ছে বলে ৷ কানে কানে আমাকে বলে গেল যাওয়ার আগে, রুকুরে, টুটুভাই তোকে সত্যিই খুব ভালবাসে, একটু ভেবে দেখিস ৷ আমি জড়িয়ে ধরি রুনা আপুকে, চোখের জল চাপার চেষ্টা করেও পারি না, নি:শব্দে কাঁদতে থাকি রুনা আপু আর আমি৷ আমি দেখতে পাই আমার নজরুলগীতিরা ঐ চলে যাচ্ছে, আমাকে ছেড়ে ৷

না ৷ আমার ভেবে দেখার কিছু ছিল না ৷ সব ভাবনা আব্বু ভেবে রেখেছে, আমাদের সব ভাবনা আব্বুই ভাবে ৷ জিন্দা বাজার সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ছেড়ে আমি এখন সিলেট সরকারী মহিলা মহাবিদ্যালয়ে যাই ৷ সাদা সালোয়ার কামিজ আর ভাঁজ করা সাদা ওড়না সেপটিপিন দিয়ে কাঁধের দু পাশে আটকানো, ঝোলানো ব্যাগে বই খাতা, কলমটা আমি গুঁজে রাখি আমার কামিজের গলায় ৷ না ৷ এখন আর ও দাঁড়িয়ে থাকে না রুনা আপুদের বারান্দায় ৷ আমার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় ঐ বারান্দায় এখন আর কেউ দাঁড়ায় না ৷ রিকশা থেকে নামার আগে অভ্যেসবশত চোখ চলে যায় ঐ বারান্দায়, ওখানে কেউ নেই, থাকবে না জেনেও৷ ঝোলানো দুই বিনুনী বেখেয়ালে পড়ে থাকে বুকের পরে, ক্লান্ত পায়ে আমি এগিয়ে যাই বাড়ির দিকে ৷ 

ওবাড়ির খালাম্মা এখনও সোয়েটার বুনে চলে বছরভর৷ কার জন্যে কে জানে? আমিও বুনি, জানি না কার জন্যে, তবে এখন আর আমি সোয়েটার বুনতে গিয়ে ভুল করে ঘর ছেড়ে দিই না ৷ তবুও খালাম্মার কাছে গিয়ে বসি, নতুন কিছু ডিজাইন তুলে আনব বলে, বহুবার শোনা গল্প আবার শুনি খালাম্মার কাছে, টুটু এখন নোয়াপাড়ায় থাকে, চাকরী করে কোন এক টেক্সটাইল মিলে, ডিজাইন আঁকে টুটু, শাড়িতে, শার্টের পিসে আর বেডশিটে ৷ আমি মনে মনে দেখতে পাই সার সার জ্যামিতির নকশা তার পাল্টে পাল্টে যাওয়া বিনুনি করা সব মেয়ের মুখ ৷

আম্মুর সাথে যখন শাড়ি কিনতে দোকানে যাই বোঝার চেস্টা করি কোনটা টুটুর করা ৷ কোন শাড়ির কোন ডিজাইনে আমি কোন মেয়ের মুখ দেখতে পাই না ৷ বিনুনি পরা, একটু একটু করে পাল্টে যাওয়া সব মুখ ৷ এখনও সে ঐ চাকরিই করে ? কে জানে ৷ ওদের বাড়ির অর্থনৈতীক অবস্থা ভাল নয়, টুটুকে তাই বি এ পাস করেই চাকরীতে ঢুকতে হয়েছে, ইচ্ছা থকলেও আর্ট কলেজে যেতে পারেনি ৷ টুটুর সরকারী চাকুরে বাবা এখন রিটায়ার করে বাড়িতেই আছেন ৷ অসুস্থ মা আরও বেশি অসুস্থ হয়েছেন ৷ ইতিমধ্যে তাঁর আরও দু বার শক্ত শক্ত অপারেশন হয়েছে, আর টাকা জোগাড় করতে দিনরাত কাজ করে টুটু, রোজই ওভারটাইম৷ আমার কী? 

তবু আমার ভাল লাগে না খালাম্মার কথা শুনতে ৷ আমি উঠে যাই রুনা আপুর ঘরে, একটু বসি রুনা আপুর পরিত্যক্ত বিছানায়, কান না পেতেই শুনতে পাই রুনা আপু ফিসফিস করে বলছে, রুকু রে, টুটুভাই তোকে সত্যিই খুব ভালবাসে, একটু ভেবে দেখিস! চারপাশে তাকিয়ে দেখি, সব তেমনি আছে, যেমনটি ছিল রুনা আপু থাকার সময় ৷ তবে এখন রুনা আপুর বিছানা পরিপাটি গোছানো, কোন বই এলোমেলো কোথাও পড়ে নেই, বালিশের কাছে রাখা রুনা আপুর ওয়াকম্যানটা দেখে শুধু চোখ ভিজে আসে৷ মাথার কাছে ক্যাসেটের তাকে সার দিয়ে সাজানো সব ক্যাসেট, বেশির ভাগই নজরুল গীতির ৷ রোজই খালাম্মা একবার করে এসে এঘরের ধুলো ময়লা ঝেড়ে যায়, গোছানো বিছানা আবার গোছায়৷ আমি ইচ্ছা করলে ওয়াকম্যানে ক্যাসেট ভরে শুনতে পারি আমার প্রিয় নজরুল গীতি৷
 
হেথা হিয়া ওঠে বিরহে বিকুলি',
মিলনে হারাই দু'-দিনেতে ভুলি,
হদৃয়ে যথায় প্রেম না শুকায়
সে অমরায় মরে স্মরিও৷৷

কিন্তু আমার এখন গানেও উৎসাহ নেই ৷ ঘরে ফিরে আসি, তেলের বাটি চিরুণী হাতে আম্মু আসে, বিনুনী খুলে চুলে তেল দিয়ে চুল আঁচড়ে দেয় আম্মু, রোজকার মত ৷ আর তার কথা মানে সব আমার বিয়ের ভাবনা, কেমন হবে সে আয়োজন ৷ আব্বু আমার জন্যেও ভেবে রেখেছে আর সেই ভাবনা বাস্তবায়নের জন্যে আব্বু গুটিগুটি পায়ে সেদিকে এগুচ্ছেও ৷ প্রায় সন্ধ্যেতেই আব্বুর বন্ধু সৈয়দ কাকু এসে বসে আব্বুর কাছে, নতুন নতুন পাত্রের খোঁজ নিয়ে আসে কাকু, সাথে পাত্রের ছবি সহ বায়োডাটা৷ যেগুলো আব্বুর পছন্দ হয় সেগুলো এক পাশে রেখে বাদবাকিগুলো আব্বু ফেরত দেয় ৷ পরে ভাবনা চিন্তা করে যোগাযোগ করবে সৈয়দ কাকুর সাথে ৷ 

আমার সত্যিই কিছু ভেবে দেখার কিছু ছিল না ৷ সব ভাবনা আব্বু ভেবে রেখেছে, আমাদের সব ভাবনাই আব্বুই ভাবে৷ আমি তবু আম্মুর সাথে দোকানে যেতে পারি, জ্যামিতির নকশা দেওয়া কাপড় পছন্দ করে কিনে আনতে পারি ৷ অমন জ্যামিতির নকশার মধ্যে আমি দেখতে পাই তিরতির করে করে জল ঝরা ছড়া ৷ ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া পাহাড় ৷ গাছ, লতা, পাতা, পাখী আর পাহাড় ৷ আর মাঝে মাঝে আনারসের বন ৷ এ সব ভাবতে আমার কোন বাধা নেই ৷ জ্যামিতির ছাপ ছবির শড়িগুলি যেন বেদনার রঙে আঁকা ৷ শাড়িগুলি যেন আমার হারিয়ে যাওয়া কিশোরীবেলা ৷ আমার হারিয়ে যাওয়া গানেরা, হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ ৷


কুহু কুহু কুহরে পাহাড়ী কুহু
কুহু কুহু কুহরে পাহাড়ী কুহু
পিয়াল ডালে পল্লব বীণা বাজায়
ঝিরিঝিরি সমীরন তালে তালে তালে,তালে তালে
সেই জল ছলছল শুনে ডাকিয়া
সাড়া দেয় মনপারে সাড়া দেয় , বাঁশি রাখালিরা
পল্লীর প্রান্তর উঠে শিহরি
বলে, চঞ্চলা কে গো তুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি


-:-


এই লেখায় ব্যবহৃত বড়ো বেদনার মত বেজেছ হে তুমি আমার প্রাণে ও ভেঙেছ দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময় গানদুটি ব্যতীত অন্য গানগুলি নজরুলগীতি৷


[গল্পটা কিছুদিন ধরেই মাথায় ঘুরছিল। এক কিশোরী মেয়ের কথা। আত্মকথন রূপে বলা একটি গল্প। তার ভাল লাগা-মন্দ লাগা, তার দিনযাপণ আর বুকের বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা তার গোপন প্রেমের কথা, যে প্রেমের কথা সে স্বীকার করে না এমনকি নিজের কাছেও। সবটুকুই তারই জবানীতে। লেখাটি ভালোবেসে রোহণ ছাপে তার www.sristi.co.in পত্রিকায়। লিংক সংক্রান্ত অসুবিধের কারণে ওয়েবসাইটের লিংকের বদলে লেখাটিই তুলে রাখলাম ব্লগে]

Wednesday, February 20, 2008

তিতাস কোনো নদীর নাম নয়

[বন্ধুবর অরিন্দম চক্রবর্তীর অনুরোধে স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ওয়েবপত্রিকা মৈত্রেয়ী-র শারদসংখ্যার জন্যে লিখতে বসে লিখে ফেলি এই গল্পটি। প্লটটি মাথায় ছিলই। বহুদিন ধরে ওই গল্পের মধ্যেই বাস করছিলাম যেন। যেটুকু দেখতে পাচ্ছিলাম তার সবটুকু লিখতে পারিনি, সে আমার অপারগতা। মৈত্রেয়ীর কোন আর্কাইভ না থাকায় গল্পটি এখন আর ওয়েবে নেই। ব্লগে তুলে রাখলাম লেখাটি।]


ঘুমের মতন নীরবে নদী
যায়, বয়ে যায়৷৷
দু'কূলে তার বৃক্ষেরা সব
জেগে আছে;
গৃহস্তের ঘর-বাড়ি
ঘুমিয়ে গেছে,-
শুধু পরান মাঝি বসে আছে
শেষ খেয়ার আশায়৷
যায়, বয়ে যায়৷৷
কে জানে কবে কে নাম রেখেছে
তিতাস তোমার;
যে নামেই ডাকি তোমায়
তুমি কন্যা মেঘনার৷
মোষের মতন কালো সাঁঝ
নামে তীরে;
আবহমান উলুধ্বনি
বাজে ঘরে ঘরে,-
পোহালে রাত ফর্সা ভোর
আসে নদীর নামায়৷
যায়, বয়ে যায়৷৷ ( যে নদীর নাম তিতাস/ উত্সর্গ পত্র- ঋত্বিকমঙ্গল, বাংলা একাডেমী ঢাকা,2001)


খুব একটা বড় নয় পাড়াটা, পনেরো কুড়ি ঘর মানুষের বাস ৷ গ্রামের ভেতরে ছোট্ট আরেক গ্রাম ৷ এই গ্রামে আমার পূর্ব পুরুষের বাস ৷ আমরা থাকি এ'পাড়ায়, গ্রামের ভিতরের আরেক ছোট্ট গ্রামে ৷ গ্রামের ভিতরের সেই গাঁও এ ঢুকতে প্রথম বাড়িটাই আমাদের ৷ হাতের ডানদিকে এর পরে নজরুল ইসলামেরা থাকে৷ নজরুল ইসলামের বুড়ো মা, বাপ ছোট ভাই তাজুল ইসলাম বোন সেলিনা, চায় না ৷ চার ভিটায় চারটে ঘর৷ নজরুল ইসলাম বিয়ে করে বউ এনেছে চর থেকে, তিতাসের চর৷ বৌ সব সময় এক হাত ঘোমটা টেনে রাখে৷ দুই হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি আর কোমরে বিছা৷ সে শাড়ি পরে গোড়ালির বেশ খানিকটা উপরে ৷ সারাদিন এই ঘর ঐ ঘর করে, একচালায় বসে রাঁধে আর যখন কাজ থাকে না তখন বসে বসে কাঁথায় ফুল তোলে৷ নকশী কাঁথা বানায় বৌ ৷ তার ঐ এক হাত লম্বা মাথার কাপড় তখন কপাল পর্যন্ত উঠে৷ দেখা যায় বৌএর নাকে নোলক গলায় তক্তিছড়া৷ নজরুল ইসলামের এই বৌ আমায় আম্মা বলে ডাকে৷ আমার খুব মজা লাগে৷ আমারে আম্মা ডাকো ক্যান জিজ্ঞেস করলে বৌ মিষ্টি হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলে, আফনেরে আম্মাই তো কমু, আফনে যে আমাগো সাব বাড়ির মাইয়া! শামসুল নজরুল ইসলাম চাচার ছেলে, ছোট্ট ছেলেটা অসম্ভব দুষ্টু৷ দু দন্ড সে মায়ের কাছে থাকে না, সারাক্ষণই ছুটে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক৷ ন্যাংটো ছেলের কোমরে কালো সুতোয় বাঁধা একটা ছোট্ট রূপোর ঘন্টা৷ পুঁচকে শামসুল কোথয় যায় না যায় মা যেন সর্বক্ষণ সেটা জানতে পারে তাই সে ছেলের কোমরে ঘন্টা বেঁধে দিয়েছে৷ ছেলে যেদিকেই যায় ঝুম ঝুম শব্দ হয় সেই ঘন্টা থেকে৷ তাদের বাড়ির ডানপাশ দিয়ে গেছে ছোট্ট খাল৷ সুদিনে সেই খালে জল থাকে না কিন্তু বর্ষার নিথর জল উঠে আসে বাড়ির উঠোন অব্দি৷ বউ ছেলেকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকে সে ঐ খালের দিকে যায় কি না৷ তার সজাগ কান সর্বদাই ছেলের কোমরের ঐ ঘন্টায়৷


নজরুল ইসলাম আমাদের বাড়িতে বছর বান্ধা মুনিষের কাজ করে৷ সারাদিনে তিন চার বার ঘুরে ঘুরে নজরুল ইসলামদের বাড়িতে যাই, নজরুল ইসলামদের বাড়ির দাদা মুসা লস্কর , সবাই যাকে মুসা পাগলা বলে ডাকে৷ কেন যে সবাই দাদাকে পাগলা বলে! দাদা তো কাওকে বকে না, কারোর সাথে ঝগড়া করে না দাদা সারাদিনই শুয়ে বসে গান করে,

বাড়ি বাড়ি কর তোমরা
এই বাড়ি তো বাড়ি নয়
আসল বাড়ি গোরস্থানে
একবার যেন স্মরণ হয়৷

দাদি সারাদিনই তার ঘরের ভিতরেই থাকে৷ সারাদিন হাতে একটা সেলাই নিয়া থাকে, কোন সময় একটা কাঁথা তো কোন সময় ছেঁড়া কোন জামা ৷ আমি গেলে সসম্মানে পিড়া এগিয়ে দেয় বসার জন্যে ৷ আমি চুপ করে বসে থাকি দাদিদের ঘরে ৷ ওদের ঘরে কোন খাট-পালঙ নাই, ঘরের চারপাশে দড়ি টানানো আছে তাতে জামা কাপড় ঝোলে আর ঘরের কোনায় গুটিয়ে রাখা থাকে মাদুর, আর কিছু কাঁথা বালিশ ৷ কিছু কাঠের পিড়ি আছে নিজেও ওতেই বসে অর কেউ গেলে তাকেও পিড়ি পেতে দেয় বসার জন্যে ৷ দাদির ঘরের কোনায় ভাঙা কলসিতে খড়ের উপর বসে আছে এক মুর্গী ৷ যে ডিমে তা দিচ্ছে, দাদি বলেছে দুই সপ্তা হইয়া গ্যাসে আর এক সপ্তা গেলেই বাচ্চা লইয়া উঠব এই খুপাওয়ালা লাল মুর্গী ৷ তেরখানা ডিম নিয়ে বসেছে এবার এই লাল মুর্গী, দাদি খুব চিন্তায় আছে, কোন ডিম নষ্ট হয়ে যায় কি না সেই দুশ্চিন্তা ৷ প্রতিবারই নাকি দু-একটা ডিম নষ্ট হয়, ডিম ফুটে যখন বাচ্চা বেরোতে থাকে তখনও মুর্গী ডিমের উপরেই বসে থাকে, একটা একটা করে বাচ্চা সারাদিন ধরে বেরোয় ৷ কখনো লাফিয়ে লাফিয়ে এক আধটা কলসির বাইরে নিচে পড়ে গেলে দাদি গিয়ে তাকে আবার কলসিতে তুলে দেয় ৷ অর ঐ খোঁপাওয়ালা লাল মুর্গী তখন গরর গরর করতে থাকে, দাদি মুর্গিকেই বকে দ্যায়, ঐ চুপ কর! আন্ডা লইয়া তো বইয়া রইসস, ছানা যে নিচে পইড়া গ্যাসে খবর আসে নি? ওম না পাইয়া যদি মইরা যায় ছানা?? বকুনি খেয়েও মুর্গী চুপ করে না৷ গরর গরর করতেই থাকে৷ খানিক পর পরই দাদি এসে মুর্গীর ডানা ধরে তুলে দেখে, ক'টা ছানা বেরুলো ৷ সবকটা ডিম না ফোটা অব্দি দাদির শান্তি নেই ৷ দাদির ঘরে কোনায় এরকম আরও তিনখানা ভাঙা মাটির কলসি রাখা আছে, তাতে মুর্গীরা এসে ডিম পেড়ে রেখে যায় ৷ দাদি ঐ ডিম কাওকে খেতে দেয় না আর বিক্রীও করে না ৷ সে বাচ্চা ফোটাবে ঐ ডিম দিয়ে৷ ডিমে সে নিজেও হাত দেয় না আর অন্য কাওকেও ছুঁতেও দেয় না, ডিমে হাত দিলে কিংবা ছুঁলে 'ওম' ভেঙে যায়, তখন সেই ডিমে আর বাচ্চা ফুটবে না৷ ৷ ঐ ভাঙা কলসিগুলো সে ঢেকে রাখে কুলো দিয়ে ,মুর্গীর আসার সময় হলে কুলো সরিয়ে দেয় অর নিজে দোর আগলে বসে থাক কোন সময় দাদি কিসসা শোনায়৷ লস্কর বাড়ির কিসসা ৷ এই পাড়ার কিসসা ৷ গাঁওয়ের ভিতরের ছোড আরেক গাঁওয়ের কিসসা ৷


নজরুল ইসলামদের বাড়ির তিন চারটে বাড়ি পরেই কবরস্থান৷ জয়গাটাকে সবাই "দখিন পাড়' বলে৷ এসামুদ্দিন মিঞার পুকুরের দক্ষিণ পারে ঐ কবরস্থান৷ বেশ চওড়া এক জায়গা সেটা ৷ বাঁশের ঝাড়ে ছেয়ে আছে গোটা কবরস্থান ৷ দিনের বেলায়ও গা ছমছম করে সেদিকে যেতে ৷ এসামুদ্দিন মিঞা মাষ্টার ছিলেন গ্রামের হাইস্কুলের ৷ বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে তিনি নাকি ছাত্র যোগাড় করতেন ৷ কেউ একদিন স্কুলে না গেলে সন্ধ্যেবেলায় তিনি তার বাড়ি পৌঁছে যেতেন, কেন সে স্কুলে গেল না খোঁজ নিতে ৷ এই পাড়ায় মেয়েদের নাকি স্কুলে পাঠানোর রেওয়াজ ছিল না, বলেন এসামুদ্দিন মাষ্টারের স্ত্রী, আমি যাকে বড়মা বলি ৷ তিনি বলেন,এই পাড়ায় আজ মেয়েরা স্কুলে যায়, স্কুল পাশ কইরা টাউনের কলেজে যায়, কেউ কেউ আবার গ্রামেরই স্কুলের মাষ্টারনি হয় সব তোর বড়বাপের লাইগা ৷ তোর বড় বাপে যদি মাইয়াগো স্কুলে পাঠানোর লাইগা চেষ্টা না করত, নিজে বাড়ি বাড়ি ঘুইরা মাইয়াগোরে ধইরা ধইরা ইশকুলে না পাঠাইতো তয় আইজও এই পাড়ার সব মাইয়া অশিক্ষিত মুর্খ থাকতো!


আমি এসামুদ্দিন মাষ্টারকে কোনদিন চোখে দেখিনি, তিনি মারা গেছেন বহু বছর আগে, কত বছর সেটাও বলতে পারেন না বড়মা ৷ ভুলে ভুলে যান৷ সাদা শাড়ি গিট দিয়ে কোমরে বেঁধে পরে থাকেন৷ গায়ে ব্লাউজও নেই৷ গেটে বাতে কাবু হয়ে বেশির ভাগ সময়েই মাটির মেঝেতে খড়ের উপর পাতা বিছানায় শুয়ে শুয়ে পুরনো দিনের গল্প করেন৷ ব্যাথা কম থাকলে ঢেকিতে ধান বানেন ৷ শোলার বেড়ার বাইরে থেকেই শোনা যায় ধেকিতে ধান বানার শব্দ ৷ আমি বুঝতে পারি বড়মার আজকে ব্যাথাটা কম ৷ এপাড়ায় চালকল নেই, ধান ভাঙাতে হলে নিয়ে যেতে হবে বাজারে ৷ আর বাজার বেশ দূরে, তার উপরে কখন সেই চালকলে কারেন্ট থাকবে সে কেউ জানে না ৷ রহিম আলি তাই ধান নিয়ে যেতে চায় না বাজারে ৷ বলে এই কয়ডা চাল তো ভাঙাইবেন, তার লেইগ্যা অত দূরে যামু আর ফিরত আমু কারেন্ট না থাকলে তার থেইক্যা বরং ঢেকিত কয়ডা পাড় দিয়া বাইন্যা ফেলাইন ধানডা! আমি দিয়া দিমু নে ঢেকিত পাড়৷ কিন্তু ঢেকিতে পাড় দেওয়ার জন্যে রহিম আলিকে খুঁজে পাওয়া যায় না ৷ তাই বড়মা ঠুক ঠুক ধান বানেন (ধান ভেঙে চাল করা) সকাল থেকে ৷ ধান বানা হলে সেই চালে ভাত রাঁধবে নুরুন্নাহার ৷ নুরুন্নাহার বড়মার মেয়ে ৷ একবার সে পাগল হয়ে গিয়েছিল তাই তাকে আর শ্বশুরবাড়িতে নেয় না ৷ নুরুন্নাহার ফুফু তাই বাপের বাড়িতেই থাকে ৷ বড়মা বলে নুরুন্নাহার ফুফু এখন নাকি আর পাগল নয় শুধু মাঝে মাঝে একটু মাথার গন্ডগোল হয় ৷ তখন সে কাওকে চিনতে পারে না, নিজের মাকেও নয়, সারাদিন শুধু লাভলি লাভলি বলে চীত্কার করে কাঁদে ৷ লাভলি নুরুন্নাহার ফুফুর মেয়ে ৷ শ্বশুর বাড়ির লোকেরা পাগল বলে বৌকে বাপের বাড়ি ফেরত পাঠিয়েছে কিন্তু ছোট্ট লাভলিকে তারা দেয়নি ৷ বড়মা বলে, মেয়ে কাছে থাকলে নাকি নুরুন্নাহার ফুফুর মাথাও খারাপ হত না৷ লাভলিকে তোমরা লইয়া আসো না ক্যান বড়মা? বড়মা বলে, তারা দিব কিয়ের লাইগ্যা? আমার পুড়া কপাল, মাইয়াডার মাথায় দোষ পড়লো, নইলে সোনার সংসার আসিল নুরুন্নাহারের ৷ সোনার সংসার কাকে বলে ভেবে না পেয়ে আমি চুপ করে থাকি ৷


বড়মার দুই ছেলেই শহরে থাকে৷ রফিক কাকা ওষুধের কোম্পানিতে চাকরী করে আর শফিক কাকা কলেজে পড়ে ৷ আমি বড়মাকে বলি, তুমি শহরে চইলা যাও না ক্যান কাকাগো কাছে? বড়মা বলে, রফিকের বেতন যে বড় কম, শফিকের কলেজের পড়া, বাসা খরচ এর পরে আমরা যদি যাই তো সংসার ক্যামনে চলব? বাড়িত থাকলে তো রহিম আলিরে দিয়া ক্ষেতের কাম করাই তো বছর ভরা চাল কিনা লাগে না খালি আনাজ-তরকারি কিনা, তাও বেদনা কম থাকলে আমি নিজে মাচা বাইন্ধ্যা শিম, লাউ, কুমড়ার গাছ তুইলা দেই ৷ বেশির ভাগ দিনেই মাচার লাউ, কুমড়ো রান্না করে নুরুন্নাহার ফুফু ৷ মাঝে মাঝে নুরুন্নাহার ফুফু পুকুর থেকে তুলে আনে কলমি শাক, কোনদিন বা পুকুরের ঢাল থেকে বেছে বেছে তুলে হাইসা শাক ৷ যেদিন তার মাথা গরম হয় সেদিন সে সারাদিন কাঁদে মেয়ের জন্যে ৷ সেদিন আর রান্না হয় না বড়মার ৷


পুকুরের ঠিক দক্ষিণপারে কবরস্থানের গায়ে গায়ে সখিনাদের বাড়ি ৷ সখিনা মইজুদ্দিন লস্করের মেয়ে৷ মাইজুদ্দিন মেয়েকে বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠায়নি, পাকা চুল আর মুখভর্তি পাকা দাড়ির হাসন আলিকে ঘরজামাই করে বাড়িতে এনে রেখেছে৷ হাসন আলি জন খাটে ৷ ফসল বোনার সময় সে রোজ কাজ পায়, আবার ধান কাটার সময়েও তার কাজ থকে, কিন্তু বছরের বেশ অনেকটা সময় হাসন আলি বেকার থাকে ৷ তখন সে বাড়ির উঠোনে বসে ফুড়ুত্ ফুড়ুত্ হুকো টানে৷ মইজুদ্দিন বুড়ো সারাদিন উঠোনে বসে বাঁশ চেঁচে চেঁচে বেত বানায়৷ সখিনা সেই বেতে চাটাই বোনে, গোলা বানায় ৷ ধানের গোলা ৷ সখিনা যাকে বলে 'টাইল'৷ সখিনার বানানো এই টাইল বেশি বড় নয়, মাঝারি আকারের সব টাইল৷ হাসন আলি সেই চাটাই, টাইল নিয়ে সপ্তায় দু'দিন দূরের হাটে যায়৷ একদিন চান্দুরা তো আরেকদিন জলসত্বর ৷ সি এন্ড বি'র বড় সড়ক ধরে গেলে গ্রামের ডানদিকে জলসত্বর আর বাঁদিকে চান্দুরা ৷ সপ্তাহে দু দিন করে ওখানে বড় হাট বসে, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে, কেউ বিক্রী কিরতে তো কেউ কিনতে ৷ বুড়ো হাসন আলি বাঁশের ভারার দুদিকে সখিনার বোনা ধানের গোলা, চাটাই বিক্রী কিরতে নিয়ে যায় ৷ সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ে সেদিন সে, কারন তাকে তো হাটে হেঁটেই পৌছুতে হবে, ঐ গোলা সমেত কোন গাড়ি তাকে তুলবে না, কাঁধে ঝোলানো ধানের গোলা নিয়ে দুলতে দুলতে হাঁটে বুড়ো হাসন আলি ৷ সখিনাদের বাড়িতে কোন বেড়া বা আড়াল নেই ৷ বাড়ির পেছনে কবরস্থানের বাঁশের ঝাড় শুরু হয়েছে সখিনার ঘরের ঠিক পেছন থেকে৷ দু'খানা খড়ের ঘর, একটাতে থাকে বুড়ো মইজুদ্দিন আর অন্যটাতে সখিনা ৷ মইজুদ্দিনকে ভয় পায় না এমন ছেলে-পুলে এপাড়ায় অন্তত নেই ৷ কবরস্থানের ওপারের পূবপাড়ায় যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা মইজুদ্দিনের উঠোনের উপর দিয়েই৷ উত্তরগাঁওয়ের প্রাথমিক স্কুল কবরস্থান পেরিয়ে পূবহাটিতে ৷ এই পাড়ার সব ছেলে-মেয়েরাই স্কুলে যায় সখিনাদের বাড়ির উপর দিয়ে ৷ মইজুদ্দিন বেশির ভাগ সময়েই চুপ করে থাকে কিন্তু যখনই কোন ছেলে-মেয়ে তার তোলা বেতের উপরে পা রাখে তখনই সে তাদের হাতের ঐ কাটারি নিয়েই তাড়া করে, ঘরের ভিতর থেকে সখিনা চেঁচায়, বাপজান ও বাপজান, এইবার ক্ষ্যামা দ্যাও না! আর কত চেল্লাই বা ঐ পুলাপানেগো লগে? মইজুদ্দিন গজগজ করতে করতে আবার বাঁশ চেঁচে বেত তুলতে বসে৷ আমি ভেবে পাই না, যে মইজুদ্দিনের সাথে কেউ কথা পর্যন্ত বলে না ভয়ে, সেই মইজুদ্দিননকে সখিনা কি রকম বকুনি দেয় আর মইজুদ্দিনও মেয়ের বকুনি খেয়ে চুপ করে যায়, শান্ত হয়ে বসে কাজ করতে ৷


সখিনা ছাগল পোষে ৷ ছোট দুটো বাচ্চা সহ একটা ছাগল৷ সখিনা যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ঐ ছাগল তিনটে বাঁধা থাকে তার একচালা রান্নাঘরের পাশে৷ আর সুযোগ পেলেই সে তার ছাগল এনে আমাদের পুকুর পারে ছেড়ে দিয়ে যায়৷ ছাগলগুলো ইচ্ছে মতন ছোট গাছগুলোকে মুড়িয়ে দেয়, বড়কাকা কতবার রাগ করেছে সখিনার পরে৷ বারণ করেছে ছাগল যেন পুকুরপারে না ছাড়ে, সখিনা চুপ করে শোনে আর ছাগল নিয়ে চলে যায় কিন্তু পরদিনই আবার ছাগল ছেড়ে দিয়ে যায় পুকুরপারে৷ বড়কাকা বলে রেখেছে এবারে যেন ছাগল এনে বাড়িতে বেঁধে রাখা হয় অর সখিনা ছাগল চাইতে এলে যেন না দেওয়া হয় ৷ আমি মনের আনন্দে পরদিন ছাগল ধরে এনে উঠোনের ছোট আমগাছে বেঁধে রাখলাম ৷ কিন্ত কাকা বাড়ি আসার আগেই কখন যে সখিনা এসে ছাগল ছাড়িয়ে নিয়ে চলে গেছে টেরটিও পাই নি ৷



-২-



আমাদের বাড়ির সামনে যে ছোট খাল আছে সেটাই গড়িয়ে গড়িয়ে গ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে বয়ে গিয়ে পড়েছে তিতাসে৷ তিতাস অব্দি যেতে যেতে কোথাও সেই খাল খুবই সরু হয়েছে কোথাও বা হয়েছে বেশ চওড়া ৷ বড় মৌলভি পাড়া যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে শুরু হয়েছে ফসলের মাঠ৷ এই মাঠ বহুদূরে গিয়ে শেষ হয়েছে মেদীর হাওরে৷ "মেদী' এক বিশাল হাওর৷ শুকনো মরশুমে সেটা আদিগন্ত এক ফসলের মাঠ কিন্তু বর্ষায় কোথাও মাটির চিহ্নটুকুও থাকে না৷ শুধু জল অর জল৷ সেখানে কোন গ্রাম নেই, কোন মানুষের বাস নেই৷ শীতকালে সেখানে প্রচুর পাখি আসে, নানা জাতের হাঁস আর পাখি৷ কোথাও হাঁটু তো কোথাও কোমর কোথাও বা বুক অব্দি জলে থাকে প্রচুর মাছ৷ হাঁসেরা সেই জলে ভেসে বেড়ায়, আকাশ থেকে গোত্তা খেয়ে জলে নেমে আসে ধবল বক, মাছের সন্ধানে৷ ঐ সময়টায় আশে পাশের গ্রাম থেকে লোকজন আসে সেই হাঁস,পাখি শিকার করতে৷ নিশুতি রাত কেঁপে ওঠে গুলির শব্দে৷ ছপ ছপ শব্দ হয় জলের উপর বৈঠার৷ নৌকো এগোয় সেদিকে, গুলি খেয়ে যেখানে ধনেশ কিংবা বালিহাঁসটা পড়ল৷ হাওর অব্দি যেতে যেতে পড়ে ছোট ছোট গ্রাম, কুসনি, বুড্ডা, মলাইশ৷ আর পড়ে ছোট ছোট বাথান৷ বর্ষায় এই গোটা মাঠ ডুবে যায়৷ সামনের ঐ ছোট খাল তখন এক ছোট নদী হয়ে যায়৷ মাটির সড়ক থেকে খাল পেরিয়ে এই পাড়ায় আসতে নৌকো লাগে তখন৷ ছোট ছোট কোষা নৌকো দাঁড়িয়ে থাকে লম্বা বাঁশে দড়ি বেঁধে৷ পশ্চিমের ঐ মোড়াহাটিতে যেতেও নৌকাই ভরসা৷ সেই কবে থেকে শুনছি পুল হবে৷সি এন্ড বি ধারে দিঘীর পাড়ে যেতে যেরকম পুল আছে আমাদের এখানেও হবে সেরকম পুল৷ ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান এর ইলেকশনের জন্যে ভোট চাইতে এসে দখিনগাঁওএর খালেদ ও বলে গেছে আর ইউনুস জোতদারেও বলে গেছে, এবারের ইলেকশনে পাশ করে সবার আগে নাকি আমাদের এই পুল বানিয়ে দেবে৷ আমাদের এই খালেও হবে আর মোড়াহাটির সামনেও হবে৷ দাদাজিকে তাঁরা দুজনেই আলাদা আলাদা সময়ে দলবলসহ এসে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে গেছে আর বলে গেছে দাদাজি যেন এপাড়ার মানুষকে বলে দেন তাদের ভোটটা তাঁকেই দিতে! দাদাজি বলেছেন, যাও মিঞা, কাম কর গিয়া, দ্যাশের মানুষের লাইগা কাম করলে হেরা নিজেরাই তোমারে ভোট দিব, আমার কইয়া দেওন লাগত না কাওরে! দুজনকেই একই কথা বলে বিদায় করেছেন৷


আমাদের পাড়ার সামনের এই সরু খাল মোড়াহাটির সামনে গিয়ে বেশ চওড়া হয়ে চলে গেছে মাঠের পাশ দিয়ে কুসনির দিকে৷ মোড়াহাটির লোকেরা বাঁশের সাঁকো বানিয়ে রেখেছে ঐ খালের উপর৷ লম্বা একটা বাঁশ নিচে থাকে আর একটা থাকে কোমরসমান উচ্চতায়, দুপাশে আড়া আড়ি বাধা থাকে আরও দুটো করে বাঁশ যাতে করে সাঁকোর ব্যালেন্স ঠিক থাকে, নিচের বাঁশে পা রেখে কোমরের কাছের বাঁশে হাত দিয়ে ধরে ব্যালেন্স করে করে পেরিয়ে যাওয়া৷ খাল যেখানে বেশি চওড়া সেখানে একটার গায়ে আরেকটা বাঁশ বেধে সাঁকো লম্বা করা হয়৷ ছেলেপুলেরা ঐ সাঁকো দিয়েই খাল পার করে কিন্তু বুড়োরা তা পারে না৷ তাদের জন্যে নৌকৈ সম্বল৷ কিন্তু পারের কড়ি খুব বেশি না হলেও কম নয় আর ওদের অনেকের জন্যেই ঐ সামান্য পারের কড়ি দেওয়াতাও সম্ভব হয় না৷ এপারে দাঁড়িয়ে মাঝিকে অনুরোধ করে, ও বাপজান, দ্যাও না আমারে পার কইরা, তোমারে আল্লায় দিব! কেউ পার করে আল্লায় দেবে এটা মেনে নিয়ে, কেউ আবার ঠাট্টা তামাশাও করে, বলে, যাও যাও, গিয়া আল্লারে কও, পরে না দিয়া অহনই দিতে! বুড়ো মানুষটি তখন পরের নৌকার মাঝির কাছে গিয়ে একই অনুরোধ জানায় আর পারের কড়ি উপরওয়ালা পরে কখনও দিয়ে দেবেন এই আশ্বাস দেয়৷


মোড়াহাটির এই সাঁকোটা একটা মজার জিনিস৷ আমাদের এপাড়া, পাশের নেতুলহাটি, ওপাশের মুন্সিবাড়ি আর সামনের মোড়াহাটির সমস্ত ছেলে-মেয়েরা ঐ বাঁশের সাঁকো থেকে জলে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ে, স্নান করে দাঁপাদাঁপি করে৷ ঘন্টার পর ঘন্টা তারা ঐ খালের জলে স্নান করে, ডুব সাঁতার দেয়, জলের খেলা খেলে, ছোঁয়া ছুঁয়ি৷ সাঁতরে গিয়ে একজনকে ছুঁয়ে দিলে সে চোর৷ আর সেই চোরের হাত থেকে বাঁচার জন্যে সবাই ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে৷ চোর আসছে দেখলে সে ডুবসাঁতার দেয় ছড়া কেটে,

এগুলো কি? মলাই!
পানির তলে পলাই!

চোর বেচারা কখনো সাঁতরে গিয়ে ছোঁয়ার চেষ্টা করে কখনও বা ডুব সাঁতার দিয়ে৷ যাকে ছুঁয়ে দিল সে আবার চোর৷ আমরা, এই মৌলভি বাড়িরে পোলা-পানেরা ওখানে যেতে পারি না৷ আমাদের দৌড় এই বাঁধানো পুকুর অব্দি, এখানেই আমাদের স্নান, সাঁতার, ডুবসাঁতার আর ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা৷৷৷
এগুলো কি? মলাই
পানির তলে পলাই!

কিন্তু পুকুরের জলে স্নান করে কি মন ভরে? সামনের ঐ ডুবে যাওয়া মাঠ আর নদী হয়ে ওঠা খাল যে ডাকে হাতছানি দিয়ে, আয়৷৷ আয়৷৷ কিন্তু যেতে পারি না৷ দাদি কিংবা বড়কাকা দেখে ফেললে হয়ে যাবে৷ কাকা তো শাসিয়ে রেখেছে, যদি ঐ খালের জলে পা ও ডুবিয়েছি তো পুকুরে স্নান করাও বন্ধ! আচ্ছা বড়কাকাটা কোথাও চলে যায় না কেন? কিন্তু বড়কাকা কোথাও যায় না আর ঠিক স্নানের সময়টাতেই তার পুকুরের চারধার ঘুরে ঘুরে দেখার প্রয়োজন পড়ে, খালের পানি কতটা বাড়ল?? পুকুরের পাড় ভাঙছে কি?? কাঁঠালগাছটার গোড়ায় কি পানি চলে আসছে?? সেবার তো তেঁতুলগাছটা মরেই গেল!

এই গ্রামের যত ছেলে আছে তারা বিকেল হলেই তিতাসের ব্রীজে গিয়ে আড্ডা দেয়৷ বাজার থেকে বাদামভাজা, ছোলাভাজা ঠোঙায় করে নিয়ে যায় আর রেলিংএ বসে খায়৷ কেউ কেউ যায় গুরুজনেদের লুকিয়ে বিড়ি ফুঁকতে৷ আমার খুব ইচ্ছে করে ঐ ব্রীজে যেতে, অমনি করে ঐ রেলিংএ বসে বাদামভাজা ছোলাভাজা খেতে৷ কিন্তু আমি যে মেয়ে! আমার তাই ব্রীজে যাওয়া বারন৷ আর তিতাস ও তো গ্রামের ঠিক বাইরে দিয়েই গেছে৷ কেন রে তিতাস! তুই কি আরেকটু ভেতর দিয়ে যেতে পারতিস না? তাহলে তো আমি চুপটি করেই ঘুরে আসতে পারতাম কাওকে কিচ্ছুটি না বলে! কিন্তু গ্রাম পেরিয়ে ওখানে গিয়ে আবার ফিরে আসতে যে সময় লাগবে তাতে তো পাড়াসুদ্ধু হই চই ফেলে দেবে দাদি আর বড়কাকা মিলে! যেন আমি হারিয়েই গেছি! এখানে কি ছেলেধরা আছে যে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে? কিন্তু দাদি আর বড়কাকাকে কে বোঝাবে? মাঝে মাঝে শোনা যায় বটে যে গ্রামে ছেলেধরা এসেছে, কখনও অমুকদের বাড়ির ছেলে হারিয়েছে তো কখনও তমুকদের বাড়ির, কিন্তু সেসব মেলার সময় হয়৷ আর কাকিমা বলে, ছেলেধরা ফরা কিসসু নয়, মেলায় যাœআদলের সাথে ছেলে নিজেই পালিয়েছে৷ যাত্রাদলের সাথে পালালে ইশকুলেও যেতে হয় না আর ক্ষেতের কাজও করতে হয় না৷ দাদি বলে, এও একধরনের ছেলেধরাই তো৷ গ্রামের ছেলেদের যাত্রার পার্ট করতে দেওয়ার নাম করে তাদেরকে ভুলিয়ে নিয়ে যাওয়া, আর যে ছেলেটি যাছ্ছ্হে সে যে বাড়ি থেকে পলইয়ে যাচ্ছে এও তো যাত্রাদলের লোকেদের জানা৷ এবারে যেমন আহাদালির মা বুবুর ছোটছেলে পালাল বাড়ি থেকে৷ মেলা শেষ হওয়া অব্দি সে রোজ মেলায় যেত, যাত্রার একই পালা সে রোজ দেখত আর বাড়ি এলেই তার মায়ের সাথে রোজ ঝগড়া হত, ক্ষেতের কাজে না গিয়ে ছেলে সারাদিন মেলায় পড়ে থাকে বলে৷ মেলা যেদিন শেষ সেদিন ছেলে আর বাড়ি ফিরল না৷ আহাদালির মা বুবু সারাদিন ছোটাছুটি করে সারা গাঁ খুঁজল, সন্ধ্যেবেলায় আমাদের বাংলা উঠোনের মাটিতে পড়ে বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগল এই বলে, আমার পোলারে আইন্যা দ্যাও, আমার পোলারে আইন্যা দ্যাও৷


আমাদের এই গ্রামের নাম শাহবাজপুর ৷ এক ফকিরের নামে গ্রামের নাম৷ ফকির শাহবাজ শাহ নাকি আটশ বছর আগে এই গ্রামে এসে আস্তানা গেড়েছিলেন ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে ৷ তার আস্তানা ছিল তিতাসের পারে, সেই ফকির শাহবাজ শাহর নামে এই গ্রামের নাম শাহবাজপুর৷ আমাদের পাড়ার নাম বড় মৌলভিপাড়া ৷ বড় মৌলভি সাহেব নামেই সবাই চিনতো তাকে, তার নামেই এই পাড়ার নাম বড় মৌলভি পাড়া ৷ এই পাড়ার নাম লস্কর পাড়াও হতে পারতো কারন মৌলভি বাড়ির চারপাশে যারা আছেন বেশির ভাগই সব লস্কর আর লস্কর বাড়ির লোক ৷ দু-চার ঘর আছে যারা খেটে খায়, পুরুষেরা অন্যের ক্ষেতে আর মহিলারা বাড়িতে ৷ যখন মৌলভি সাহেব এখানে আসেন তখন লস্কর বাড়ির নাকি খুব জমজমাট অবস্থা ছিল৷ সে দুশো বছর আগের কথা৷ ঢাকার ফরিদবাগ থেকে এসেছিলেন তিনি৷ ঘুরতে ঘুরতে শাহবাজপুরে এসে স্থির করেন যে এখানেই থেকে যাবেন৷ যে জায়গাটি তিনি পছন্দ করেন থাকবেন বলে সেটি গ্রামের উত্তর ভাগ৷ উত্তর গাঁও নামেই পরিচিতি৷ খালপাড়ের জায়গাটি তিনি কিনে নেন লস্করদের কাছ থেকে৷ জায়্গাটা খালি পড়েই ছিল ঝোপ-ঝাড় আর গাছ পালাতে জঙ্গল হয়েছিল৷ লস্করেরা জমিটি মৌলভি সাহেবকে দান করতেই চেয়েছিল পূণ্যও হবে আর এই জঙ্গল আবাদও হবে মানুষের উপস্থিতিতে এই ভেবে৷ মৌলভি সাহেব জমিটি দান না নিয়ে কিনে নেন আর সেখানে জঙ্গল সাফ করে বসত শুরু করেন৷ বসত শুরু করার কিছুদিন পরে তিনি লস্কর বাড়িরই মেয়েকে বিয়ে করেন৷ এই মৌলভি সাহেব আমার দাদাজীর দাদাজী৷



-৩-

সুখ কি এখন শুকপাখি যে
পালিয়ে যাবে শিকল ছিঁড়ে?

বুকের খাঁচায় সুখের বাসা
সামনে সবুজ স্বপ্ন হয়ে ক্ষেতের ফসল
অন্ধকারের সঙ্গে এখন পাআ কষে আলো জ্বালা

অশ্রু নদীর পারে যেন
স্বপ্ন দেখার নৌকো বাঁধা ৷ ( শক্তি চট্টোপাধ্যায় )


তিতাসের চরে বসেছে জলবিদ্যুত্এর কারখানা৷ ওয়াব্দা ৷ কি সুন্দর সব টাওয়ার বানিয়েছে অর কি সুন্দর ঐ লাল ইটের বাড়ি ৷ যার ভিতরে বসেছে সব মেশিন, সব না কি বিদেশ থেকে আনা৷ এখান থেকে নাকি বিদ্যুত্ বানাবে আর গ্রামের ঘরে ঘরে জ্বলবে বিজলী বাতি৷ কিন্তু কবে?? এখানে তো বিকেল হলেই ঘরে ঘরে হ্যারিকেন সাফ করে মেয়ে বউরা৷ ন্যাতা দিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করে কাঁচের চিমনি, তেল ভরে লন্ঠনে৷ হাত দিয়ে ছিঁড়ে নেয় জ্বলে যাওয়া সলতের মুখ৷ কবে ঐ ওয়াব্দাতে বিজলী বানানো শুরু হবে আর কবে আমাদের এই গ্রামে আলো জ্বলবে কে জানে! কাকাও কিছু বলতে পারে না, বলে, কাম তো হইত্যাসে, দেখা যাক কবে বাত্তি জ্বলে এই শাহবাজপুরে৷ তিতাসের পার ঘেষে সব ইটখোলা বসেছে ৷ তিতাসের মাটির ইট নাক খুব ভালো হয়, দাদাজি বলেছে৷ ব্রীজের উপর বসে ছেলে ছোকরারা সব ইটখোলর দিকে তাকিয়ে থাকে ৷ ওয়াব্দার দিকে তাকিয়ে থাকে৷ বাদামের খোলা ভেঙে ভেঙে ফ্যালে তিতাসের জলে৷ আমি বেশির ভাগ সময়েই আসা যাওয়ার পথে তিতাসকে দেখি, গাড়ির ভিতর থেকে৷ কখনও ঐ ব্রীজের উপরে দাঁড়াইনি, ওখানে দাঁড়িয়ে বাদামভাজা খাই নি৷ ওয়াব্দাকেও আমি দেখি এই ব্রীজের উপর থেকে, চলন্ত গাড়ির ভিতর থেকে৷ আমার বড় ইচ্ছা করে, নৌকায় চড়ে তিতাসের ঐ চরে গিয়ে ওয়াব্দার ভিতরে যেতে, ঐ টাওয়ারের মাথায় চড়তে৷ যেখানে দাঁড়িয়ে মিস্ত্রীরা সব কাজ করে ৷ কিন্তু আমি যে মেয়ে! আমার তাই তিতাসের পারে যাওয়ার অনুমতি নেই৷ ওয়াব্দাতে যাওয়ার অনুমতি নেই৷ এই তো কিছুদিন আগেই ওয়াব্দাতে সিনেমার শ্যুটিং হয়েছে ৷ পুরো গ্রামের লোক সব শ্যুটিং দেখতে গেছে ওয়াব্দাতে ৷ ব্রীজের উপরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাদামভাজা খেতে খেতে শ্যুটিং দেখেছে গ্রামের সব ছেলে ছোকরারা৷ দল বেঁধে মেয়ে বউরাও সব গেছে শ্যুটি ংদেখতে৷ কিন্তু আমি যেতে পারিনি৷ আমি যে বড় মৌলভি বাড়ির মেয়ে! আমার যে মানায় না রাস্তায় দঁড়িয়ে শ্যুটিং দেখার, ব্রীজের রেলিংএ বসে বাদামভাজা খাওয়া৷


দখিণগাঁও এর সাজ্জাদ চাচাদের বাড়িতে এবছর সব সিনেমার নায়ক নায়িকারা এসে উঠেছে৷ ববিতা, রোজি সামাদ, আনোয়ার হোসেন৷ পুরো গ্রামে ঘুরে ঘুরে ওরা শ্যুটি ংকরছে৷ যেখানে কাজ হচ্ছে সেখানেই নাকি সকাল থেকে সন্ধ্যে অব্দি৷ পুরো গা ঁভেঙে পড়ে সেই শ্যুটিং দেখতে৷ এই যে বড় কাকিমা, যাকে কি না আমি অ্যাত্তো ভালবাসি, সে কি না আমার সাথে অ্যাত্তো বড় বিশ্বাসঘাতকটা করলো? রাতের খাবার টেবিলে দিয়ে ছুপ করে মা, কাকিমা আর বড়কাকা তিনজনে মিলে সাজ্জাদ চাচাদের বাড়ি গিয়ে ববিতা,রোজি সামাদদেরকে দেখে এসেছে! আর আমাকে একটি বারও বলেনি!! শুনে অব্দি আমার কান্না আর থামে না৷ কাকিমা বলে, কাঁদিস না, কাকাকে দিয়ে পাঠাবো তোকে আজ৷ কিন্তু ঠিক সেদিনকেই কাকা কি একটা কাজে চলে গেল শহরে! রোজ বিকেলের রান্না রাঁধতে এসে আহাদ আলির মা বুবু গল্প করে, সে দুপুরে কাজ সেরে গিয়ে শ্যুটি ংদেখে এসেছে৷ আমি বলি, অ বুবু, আমারে লইয়া যাও না! আহাদ আঅলির মা বুবু বলে, মাইয়ো গো! আফনেরে লাইয়া গেলে আমারে আর এই বাড়িত ঢুকতে দিব নি? থাক আম্মা, আফনের যাওন লাগব না, হেরা তো শুনসি আফনেগো পুস্কুনি তে আইয়া সিনেমা বানাইব! ওমা! সত্যি তো! পরদিন সক্কাল থেকে আমাদের পুকুর লোকে লোকারণ্য৷ লাইন দিয়ে কতগুলো গাড়ি এসে দাঁড়ালো খালপাড়ে আর তার থেকে একে একে লোকজন নেমে শুকনো খাল হেঁটে পেরিয়ে সব এসে থামলো আমাদেরই পুকুরপাড়ে! আর ঐ পুতুল পুতুল দেখতে মেয়ে দুটো! ওমা! এ যে ববিতা! ছোট ফুফু গিয়ে তাদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে এল৷ ববিতা তো কথাই বলে না! রাঙানো ঠোঁটে শুধু একটুখানি হাসে৷ সারাদিন ধরে পুকুরে শ্যুটি ংহল৷ ববিতা স্নান করছে পুকুরে, তারই ফোটো তুলল ইয়া বড় এক ক্যামেরা দিয়ে৷ আর ববিতা, যে কি না সাঁতারও জানে না৷ সে এইটুকু জলে বারবার গিয়ে এমন ভাব করছে যেন সাঁতার কাটছে! ঐ নাকি শ্যুটিং! ধ্যাত্৷ সারাটা দিনই মাটি হল আমার৷


- ছাওয়ালের বাপ কোন হানে আছে দিদি?
- জানি না ৷
- বলি মইরা তো যায় নাই?
- জানি না ৷
- আমি কই বিয়া তো একডা হইছিল দিদি?
- জানি না ৷
- পোড়া কপাল কই এই ছাওয়লডা আইছে একটা বিয়া অইয়াতো?
- জানি না ৷
- খালি জানি না জানি না জানি না৷ তুমি দিদি কিছুই জান না ৷
( তিতাস একটি নদীর নাম/ চিত্রনাট্য- ঋত্বিক কুমার ঘটক)


আমাদের বাড়িতে সখিনাকে ঢুকতে বারন করে দিল দাদি৷ সন্ধ্যেবেলায় আহাদালির মা বুবু রাঁধতে এসে গল্প করলো, সখিনার প্যাট হইসে গো আম্মা৷ হের লাইগাই তো আফনের দাদি সখিনারে আফনেগো বাড়িত আইতে মানা করসে৷ আমি জিজ্ঞেস করি আহাদালির মা বুবু কে, পেট হইলে কি হয় বুবু? বুবু বলে, আস্তে কন আম্মা, আফনের দাদি হুনলে আমারেও আর বাড়িত ঢুকতে দিব না৷ সখিনায় কুকাম করসে, হের লাইগা সখিনার পেট হইসে৷ অহন সখিনারে একঘইরা কইরা দিব হগ্গলে মিল্যা৷ হাইন্জা বেলায় বিচার হইব সখিনার, পঞ্চায়েত বইব৷ বুবু আরও বলল, সখিনা পিরীত করে পুবহাটির কাশেমের লগে, আইজকা নতুন না, বহুতদিনের পিরীত, হাসন আলি, মইজুদ্দিন হগ্গলে হগ্গলতা ( সবাই সবকিছু) জানে, কিন্তু কেউ কিসু কয় না, কইলেই কি সখিনায় হুনব, যে দজ্জাল মাইয়া ৷ আগের তিনডা পোলাপানও ঐ কাশেইম্যার ৷ সব জাইন্যাও হাসন আলি চুপ কইরা থাহে, হের তো যাওনের জায়গা নাই ৷ কই যাইব? বাড়ি ঘর নাই দেইখাই তো ঘরজামাই হইয়া আইসিল, তয় এইবার হাতে নাতে ধরা পড়সে সখিনা, হের বাপ আর মরদে কিসু না কইলেও পাড়ার মাইনসে ছাড়ত না৷ আমি রাতে পেরে কাকিমাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, অ কাকিআম্মা, সখিনারে বলে একঘইরা কইরা দিব? একঘইরা কি জিনিস গো? কাকিমা খুব রেগে গিয়ে বলল, কেডায় কইসে তোরে এইগুলি? আমি বললাম, আহাদালির মা বুবু কইতেসিলো তো রাঁধতে আইসিল যখন, সখিনায় বলে কুকাম করসে হের লাইগা হেরে একঘইরা কইরা দিব হগ্গলে মিল্যা, কাকিমা আরও রেগে গিয়ে বললো,আহদালির মায় অত কথা তোর কাছে কিয়ের লাইগ্যা যে কয় আল্লায় জানে,কাইল সকালে আইলে জিগামু হেরে, পুলাপানের লগে অত কতা অত কেচ্ছা কিয়ের! তারপর আমাকে দিল বকুনি,তুই ঘুমা এখন, অত কথায় কান দেওনের দরকারটা কি তোর? এবার কাকার পালা ৷ কাকাকে বললো, তোমার ঐ পঞ্চায়েতে যাওন লাগতো না ৷ খাইয়া লইয়া ঘুমাও গিয়া!


মুন্সিবাড়ির লিয়াকতের মায়ের একটা ফলের বাগান আছে৷ সেই বাগানে ন্যাশপাতি, কমলা, জাম্বুরা ( বাতাবী লেবু ), কামরাঙা , তুতফল আর পেয়ারার গাছ গোটা বাগান জুড়ে৷ লিয়াকতের মা দাদি এক অদ্ভুত বাংলায় কথা বলে, দাদি কলিকাতার মেয়ে৷ মুসা লস্কর এই দাদিকে বিয়ে করে কলিকাতা থেকে নিয়ে গেসল৷ তো দাদি কলিকাতার শুদ্ধ বাংলা আর আমাদের দেশের ভাষা মিলিয়ে এক অদ্ভুত ভাষায় কথা বলে৷ আমরা, পোলাপানেরা বহু চেষ্টা করেও দাদিকে নকল করতে পারি না, দাদি হেসে কুটিপাটি হয় আমাদের সেই চেষ্টা দেখে৷ নিজের ছেলে-পুলে নাই৷ দেওরের ছেলেকে নিজের ছেলে বলে মানুষ করেছে ৷ সেই ছেলে শহরে থেকে কলেজে পড়ে৷ বাড়ি আগলে থাকে দুই বুড়ো-বুড়ি৷ দাদি নানা রকম আচার বানায় আর সেগুলো কাঁচের বৈয়ামে ভরে প্রায় দিনই উঠোনে শুকোতে দেয়৷ জলপাইয়ের আচার, বড়ই ( কুল) এর আচার, তেঁতুল এর আচার, আমের আচার৷ আমার সবচাইতে ভাল লাগে দাদির কুলের আচার৷ বৈয়ামভর্তি তেলের মধ্যে লাল লাল কুল৷ বড়ই এর ফাঁকে ফাঁকে রশুনের কোয়া আর শুকনো লংকা ও দেখা যায়৷ দাদির কাছে যাওয়ার প্রধান আকর্ষণ অবশ্যই তার গাছের ঐ ডাঁসা ডাঁসা পেয়ারা কিন্তু আচার আর কামরাঙাও কম লোভনীয় নয়৷ যখন পেয়ারা বা কামরাঙা থাকে না তখন মহানন্দে সেই আচার খাই৷ মুসা দাদা বিভিন্ন জায়গা থেকে ঘুরে ঘুরে গাছের চারা যোগাড় করে আর দিনের অর্ধেক সময় ঐ বাগানেই কাটায়৷ আমি আর চায়না দুপুরবেলাতে গিয়ে হাজির হই যখন দাদি পানের বাটা নিয়ে শীতল পাটিতে বসে পান খায় আর হাতপাখা ঘোরায়৷ আমাকে দেখেই মুসা দাদা বলে ওঠে, আইসো বুবু? আইয়ো! তোমার দাদির কাছে বইয়া একটু পাঙ্খার বাতাস খাও৷ আমি খানিকক্ষণ বসে দাদাকে বলি, দাদা বাগানে যাই? দাদা বলে শবরি ( পেয়ারা) খাইবা তো? যাও! দাদার এই পেয়েরা গাছগুলো বাগানের ধার ধরে লাগানো, গাছগুলো খুব একটা উঁচু নয় আর বেশ ডাল পালা ছড়ানো৷ তাতে ফলে আছে আমার মুঠিতে আঁটে না এমন সব পেয়ারা৷ কিছু একদম কাঁচা, কিছু ডাঁসা আর কিছু পাকা ৷ আমি ভালবাসি ডাঁসাগুলো আর চায়নার আবার কাঁচা পছন্দ ৷ দাদার আবার শর্ত আছে, গাছে বসে পেয়ারা খাওয়া চলবে না, তাতে করে নাকি পেয়ারাতে পোকা হয়, কাজেই গাছ থেকে যত খুশি পেয়ারা পাড়ো আপত্তি নেই কিন্তু খেতে হবে নেমে এসে৷ ফ্রকের কোঁচড়ে পেয়ারা নিয়ে হজইর হই দাদির কাছে, কোঁচড়ের সাইজ দেখে দাদি আন্দাজ করে কত পেয়ারা পাড়া হল, বলে অ বুবু, তোমার তো প্যাডে (পেটে )বেদনা হইব অ্যাত্তো শবরি খাইবা তো! আমি দাদিকে আশ্বাস দি, কিসসু হইবো না দাদি, আমি তো রোজ খাই!


ফেরার পথে উঁকি দিই জামশেদ পাগলার বাড়িতে৷ জামশেদ ইসমাইল লস্করের ছেলে, ছোটবেলা থেকেই পাগল হয়ে বাড়ি থেকে চলে যায়, চম্পা বলে এখন নাকি সে হাইকোর্টের মাজারে ভিক্ষা করে৷ চম্পা জামশেদ পাগলার ছোট বোন৷ আমাদের বাড়ির সাথে ঝগড়া ওদের বাড়ির, জমি নিয়ে৷ ওরা আমাদের বসতবাড়ির বেশ খানিকটা জমি দখল করে রেখেছে রাতারাতি সেখানে টিনের ঘর তুলে নিয়ে৷ বড়কাকার সাথে ঝগড়া হওয়াতে বড়কাকা মাধবপুর থানায় গিয়ে মামলা করে দিয়েছে ইসমাইল লস্করের নামে৷ সেই থেকে ওদের বাড়ির কেউ আমাদের বাড়ি আসে না৷ দাওয়াত্ দিলেও আসে না৷ কিন্তু চম্পা আমার বন্ধু ৷ মুন্সিবাড়িতে ঘুরতে গেলে ওর সাথেই তো যাই , মুন্সিবাড়ির পুকুরে স্নান করার ইচ্ছে হলেও চম্পাই সঙ্গী হয়৷ চম্পার বড় বোন রওশন আরা ছোট ফুফুর বন্ধু, দুজনে লুকিয়ে গল্প করে, গল্পের বই আদান প্রদান করে, শরত্চন্দ্র, নীহারন গুপ্ত ফাল্গুনি মুখোপাধ্যায়ের বই৷ সেগুলো আবার আমিই দিয়ে আসি কিংবা নিয়ে আসি৷ রওশন ফ্ফুর কাছে আছে রিক্শাওয়ালা, মইষাল বন্ধু, অমর প্রেম জাতীয় বই ৷ সেগুলো সে আমার হাতে দেয় না, নিজেই ছোটফুফুকে দেয় বিকেলবেলা যখন ছোটফুফু পাশের আহমদ দাদাদের বাড়িতে আসে কিংবা পুকুরপাড়ে যায়৷ একবার দুজনে লুকিয়ে একটা বই পড়ছিলো যে বইটা রওশন ফুফু তার শাড়ির আঁচলের তলায় করে নিয়ে এসেছিলো ৷ সেদিন আমিও ছোটফুফুর সাথে বসেছিলাম আহমদ দাদাদের উঠোনে, রওশন ফুফু এসে বললো, এই সামি, যা চম্পার চম্পা লগে ঘুইরা আয় গিয়া! রওশন ফুফুর হাব ভাবে বুঝতে পেরেছিলাম কিছু একটা গোপন ব্যপার আছে যা সে আমার সামনে বলতে চায় না৷ আমি বললাম না, আমি আইজকা তোমাগো লগে থাকুম! ছোটফুফু তখন বললো আচ্ছা থাক তবে ওদিক ফিরে বোস আমি তোর মাথার উকুন বেছে দিই! আমার মাথায় যদিও উকুন আছে কিন্তু ছোটফুফু কক্ষণো সেটা বেছে দেয় না! আমি চুপ করে ওদিক ঘুরে বসে পড়লাম ছোটফুফুর কথামত৷ রওশন ফুফু ফিসফিস করে বলল এই দ্যাখ! আঁচলের তলা থেকে একটা বই বার করে নিজেই পাতা উল্টে উল্টে দেখাতে লাগলো! সাথে সাথেই ছোটফুফু বললো, রোশনি, আমি যাই বাড়িত, আইজকা আর বইতাম না! আমাকে নিয়ে ছোটফুফু উঠে চলে এল ওখান থেকে৷ কি হয়েছে, ওখান থেকে উঠে পালিয়ে এল কেন, বারবার ছোটফুফুকে জিজ্ঞেস করলেও সে কিছুই বললো না আমাকে৷


চম্পা খুব ভয় করে ওর আব্বাকে, ইসমাইল লস্কর যদিও আমাকে দেখলে কিছু বলে না কিন্তু তবু চম্পা বেশ ভয়ে ভয়ে থাকে বাড়ি থেকে বেরুনোর সময়৷ এই চম্পাদের বাড়িতে একটা তালগাহ আছে বেশ উঁচু গাছ ৷

তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে
সব গাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে ৷

এই গাছের তাল কেউ খায় না খুব তেতো বলে, ধপাস করে তাল পড়েছে শুনেও কেউ দৌড়ায় না তাল কুড়োবে বলে৷ মাঝে মাঝে গাছ থেকে ডাল ছেঁটে নিচে ফেলে রতন,চম্পার বড় ভাই৷ সেই ডাল থেকে অনেকেই পাতা কেটে নিয়ে যায় পাখা বুনবে বলে৷ রওশন ফুফু খুব ভাল পাখা বোনে ওদের গাছের শুকনো পাতা দিয়ে৷ পাতা থেকে বেত তুলে নিয়ে ( সরু বেতের আকারে কেটে নেওয়া পাতা) বিভিন্ন রঙে চুবিয়ে নানা ডিজাইন বানায় সে পাঁখায়৷ ফুল, লতা,পাতা মাছের ছবি৷ বেশ অনেক কটা পাঁখা বোনা হয়ে গেলে পাশের বাড়ির আহমদ দাদা সেই পাঁখাকে গোল করে কেটে সরু বাঁশের বেত দিয়ে বাঁধিয়ে দেয় পাঁখা আর ডাঁটি লাগিয়ে দেয়, যাকে আহমদ দাদা বলে 'চাকানো'৷ সেই পাখা লোকে বাড়ি এসে কিনে নিয়ে যায় একসঙ্গে ছ'টা আট'টা ৷ এই হাতে বোনা পাখাগুলো বাজারে পাওয়া যায় না৷ এই পাড়ায়, গ্রামে কে কে পাখা বোনে সেটা ব্যপারীরা জানে৷ তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে পাখা সংগ্রহ করে আর তারপর কাছে, দূরের সব বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে সেই পাখা বিক্রী করে ৷ রওশন আরার হাতের বোনা পাখার বেশ চাহিদা ব্যাপারীদের কাছে৷ রওশন ফুফু বিভিন্ন রঙীন কাপড়ের ঝালর কুচি দিয়ে দিয়ে লাগায় বাধানো পাখার বাইরের দিকে৷ পাখার ভেতরে আঁকে ফুল, লতা-পাতা পাখি ৷ বড় বড় ফোঁড়ে রঙিন সুতোয় নিজের নাম লিখে একটা পাখা সে উপহার দিয়েছে ছোটফুফুকে ৷

একদিন সকালবেলা হঠাত্ ঘুম থেকে উঠে দেখা গেল মুসা পাগলার বাড়ির সামনে রাজমিস্ত্রী এসেছে৷ মুসা পাগলার ছোটছেলে কালা রাতে স্বপ্ন দেখেছে ওদের বাড়িতে এক পীর'এর কবর আছে আর সেই পীর স্বপ্নে কালাকে আদেশ দিয়েছেন তার কবর যেন বাঁধিয়ে দেওয়া হয়! আমরা সবাই দেখলাম আমাদের বাড়ির বাংলা উঠোনে ( বার বাড়ির উঠোন) যেভাবে বড় মৌলভি সাহেব আর তাঁর বিবিসাহেবের কবর বাঁধানো আছে ঠিক তেমনি করেই ওদের বাড়িতেও কবর বাঁধানো হচ্ছে খেজুর গাছ কেটে দিয়ে ৷ খেজুর গাছ নাকি কবরের উপরে ছিল, স্বপ্নে কালা এরকমই দেখেছে কাজেই সক্কাল সক্কাল উঠেই কেটে ফেলল সে নিজেই ঐ খেজুরের গাছ আর তারপর মিস্ত্রী নিয়ে এসে ইট গেঁথে দাঁড় করিয়ে দিল বাঁধানো কবরের ধাঁচে৷ ওদিকে তার বাবা মুসা পাগলা সমানে ছেলে উপরে চেঁচামেচি করে যাচ্ছে, ছেলেকে অভিসম্পাত করছে এই বলে, তুই রাইতে গাআ খাইয়া ঘুমাইসত আর সক্কাল সক্কাল উইঠ্যাই ফলন্ত খেজুর গাছ কাইট্যা বাড়ির ভিতরে মাজার বানাইত্যাসত৷ অত মিছা কতা আল্লায় সইত না রে কাইল্যা৷ করিস না বাপ আমার, ছাইড়া দে ৷৷ এই বাড়িত কোন কবর নাই, কোন মাজার নাই, কি কারণে তুই এমুন করতাসত? কিন্তু তার ছেলে কোন কথা শুনছে না সে একমনে তার কাজ করেই যাচ্ছে, মাঝে মাঝে শুধু চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে নিচ্ছে এবাড়ির কবরের মত হচ্ছে কি না৷ আমাদের বাড়ির সবাই চুপ করে দেখছিল, দাদাজি সবাইকে ধমকে দিল, কেন এরকম কাজ কম্মো ফেলে দিয়ে সবাই তামাশা দেখছে? সবাই যার যার কাজে চলে গেল৷ দাঁড়িয়ে গেল চায়নাদের বাড়িতে মাজার ৷ প্রায় রাতেই সেখানে সাধু সন্ন্যাসী পীর ফকির আসে আর গাঁজা ভাং খেয়ে সবাই মুর্শিদি গান গায় ৷

কাছে নেও না দেখা দেও না
আর কতকাল থাকি দূরে ৷৷
মুর্শিদ ধন হে, কেমনে চিনিব তোমারে ৷৷
ময়াজালে বন্দী হয়ে আর কতকাল থাকিব ৷৷
মনে ভাবি সব ছাড়িয়া তোমারে খুঁজে নিব
আশা করি আলো পাব ডুবে যাই অন্ধকারে
কেমনে চিনিব তোমারে, মুর্শিদ ধন হে
কেমনে চিনিব তোমারে ৷৷


আমাদের আটচালা টিনের বাংলা ঘরের বারন্দায় দাঁড়িয়ে যখন জায়গির মুন্সি আজান দেয় নামাজের তখন সামনের মুসা পাগলার বাড়িতে তার ছোটছেলে কালা দলবল নিয়ে মুর্শিদি গান করে ৷

শুনলে কথা মনের ব্যথা
দূর হইয়া যায় চিরতরে
মুর্শিদ রূপে জানো তারে ৷৷
এইবার নিরাকারে আপনে আহা
আকারে মানুষ করে কাবা ৷
স্বরূপেতে রূপ মিশাইয়া
জীবের মূর্তি ধারণ করে ৷
মুর্শিদ রূপে জানো তারে ৷৷

মুসা দাদার বড় ছেলে নজরুল ইসলাম আমাদের বাড়িতে বছর বান্ধা মুনিষের কাম করে৷ সে দাদাজির সাথে সাথে থাকে, দাদাজি বাজারে গেলে সাথে বাজারে যায়, দাদাজিকে সাথে করে ক্ষেত দেখাতে নিয়ে যায় ৷ কোন ক্ষেতে কত ধান হইলো, এখনই কি কাটা হবে না আরও দুই দিন লাগবে? দাদাজি বলে একটু যেমুন কাঁচা কাঁচা লাগেও নজরুল ইসলাম৷ কাইলকার দিনডা যাউক পরশু সকালে আল্লার নাম লইয়া ধান কাডা শুরু কর৷ নজু চাচা দাদাজির সাথে জামাতে ( একসাথে) নামাজ পড়ে৷ দাদাজির খুব ইচ্ছা বাড়িতে একখান মসজিদ দিবেন৷ এই পাড়ায় ও আশে পাশের নেতুলহাটি, মোড়াহাটি পূবপার মুন্সিবাড়ি কোথাও কোন মসজিদ নাই৷ মসজিদ আছে সেই মাইঝগাঁওয়ে৷ যেখানে দাদাজি শুধু শুক্রবারে জুম্মার নামাজ পড়তে যান৷ বর্ষাকালে তাও যেতে পারেন না৷ আর প্রতিদিন পাঁচ বেলার নামাজ দাদাজি এই বাংলা ঘরে পড়েন৷ অল্প কয়েকজন নামাজি আসেন, কখনো জায়গির মুন্সি জসিম নামাজ পড়ায় কখনও দাদাজি নিজেই ইমামতি করে নামাজ পড়ান৷ সামনের বাড়ির মুসা দাদা আর নজু চাচা এই নিয়মিত নামাজিদের দু'জন৷ সকালে নাশতার পর আর বিকেলে দুই বেলা দাদাজি বাংলাঘরের বারন্দায় পাতা কাঠের হাতলওয়ালা চেয়ারে বসে থাকেন৷আশে পাশের বাড়ির , মহিদ লস্কর, জাহেদ লস্কর, মুসা পাগলা, আসাদ আলি'রা সব এসে বসেন তখন দুপাশে পেতে রাখা কাঠের বেঞ্চে৷ মাঝে মাঝে আমি গিয়ে দাদাজির কোল ঘেষে দাঁড়িয়ে পড়ি৷ দাদজি একহাতে তার লাঠি ধরে রাখেন অন্য হাতে আমাকে৷ আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাদাজির ছোট করে ছাঁটা পাকা চুলে বিলি কেটে দিই৷দাদাজি আমাকে বলেন বুবু, তোমার ঘোড়ার ল্যাজডা আমারে দিবা? আমার চুলগুলো উঁচু করে ফিতে দিয়ে ঝুটি বাঁধা থাকে বলে দাদাজি আমার চুলকে ঘোড়ার লেজ বলেন! সকলে নিজেদের সুখ দু:খের কথা বলে, কখনও সুখা নিয়ে তো কখনও বন্যা নিয়ে আবার কখনও বা মসজিদ নিয়ে৷ দাদাজি নিজের ইচ্ছের কথা বলেন, একখান মসজিদ বানাতে চান তিনি,যাতে পাঁচবেলা মাইকে আজান হবে, মসজিদের পাকা দালান হবে, আর মসজিদ ভরে সবাই নামাজ পড়তে আসবে৷ মুসা দাদা বসে আপশোস করে নিজের ছেলে কালাকে নিয়ে৷ বলে, পোলাডা গাআ খাইয়া আর জুয়া খেইল্যা অমানুষ হইয়া গ্যাসেগা ভাইসাব৷ নাইলে এই মোলি বাড়ির ( মৌলভি বাড়ি) লগে পাল্লা দিয়া হ্যায় বাড়িত মাজার বানাইয়া ফ্যালাইসে! আমি বাঁইচা থাকতেই এই অবস্থা মইরা গেলে হেরা কি করবো! দাদাজি বলেন মুসা, আল্লার কাছে কও, আল্লায়ই পারেন হেরে সুমতি দিতে৷ জসিম হুজুর এসে জানতে চায়, চাচা, আজানের ওয়াক্ত হইসে, আজান দিয়া দেই? দাদাজি বলেন দ্যাও, আমি ওজু কইরা আসি৷ আমি ছুট্টে বাড়ির ভিতরে গিয়ে দাদাজির ওজুর বদনা নিয়ে আসি আর সামনের টিউবওয়েল থেকে জল এনে দেই৷


জলেখা বিবির 'বাগ'এ প্রতিবার মেলা বসে শীতকালে৷ বিশাল এক ফলের বাগান, সকলে যারে বাগ বলে৷ মেলায় আসে নাগরদোলা, সাপের খেলা,বাঁদরনাচ আরও নানারকমের খেলা৷ দূর দূর থেকে লোকজন তাদের পসরা নিয়ে আসে৷ থাকে পোড়া মাটির সরা, কলসি, হাঁড়ি আর নানা রকমের পুতুল, বিভিন্ন রকমের খেলনা, রঙিন কাগজ দিয়ে বানানো কুমির হাঙর আর রবারের সাপ৷ থাকে নানা রকমের খাবারের দোকান আর থাকে জুয়া৷ সারাদিন মেলায় সব খেলনা পোড়ামাটির জিনিসপত্র বিক্রী হয়, ছেলের দল স্কুল ফিরতি মেলা থেকে কাগজের হাঙর কুমির আর বাতাসা কিনে বাড়ি ফেরে৷ সন্ধ্যা ঘনালে সেখানে বসে জুয়ার আসর আর সাথে তাড়ি, গাঁজা৷ বিকেল বিকেল দাদি আহাদালির মা বুবুকে পয়সা দিয়ে মেলায় পাঠায় মাটির কলসি,সরা আর খোলা কিনে আনার জন্যে৷ এই খোলাগুলো দেখতে হাঁড়ির মত হলেও হাঁড়ি নয় ৷ এর মুখটা একদম খোলা থাকে অনেকটা কড়াইএর মত৷ যাতে চিতই পিঠে বানানো হয়৷ আহাদালির মা বুবুরা এই খোলাতেই রুঁটি সেঁকে৷ সারা বছরের মাটির মাটির জিনিসপত্র দাদি এই মেলা থেকেই কিনিয়ে রাখে ৷ এই মেলার মাটির কলসি, সরা , খোলা নাকি খুব ভাল হয়, দাদি বলে৷ আমি মেলায় যাই পুতুল কিনতে৷ মাটির পুতুল, নানা আকারের নানা ডিজাইনের৷ মা পুতুল, মেয়ে পুতুল, ছেলে পুতুল আর বাবা পুতুল ৷ আর ছোট্ট ছোট্ট সব হাড়ি-কুড়ি,বাসন-পত্র আর থাকে ছোট উনুন ৷ দুমুখো তিন মুখো পোড়া মাটির উনুন ৷ আহাদালির মা বুবু আমাকে নিয়ে গোটা মেলাটা এক চক্কর ঘুরে চলে আসে মাটির হাড়ি কলসিওয়ালাদের কাছে৷ সে কেনে তার দরকারি জিনিসপত্র আর সবার শেষে আমার জন্যে আমার পুতুল বাসনপত্র আর দুমুখো উনুন ৷ সি এন্ড বি সড়কের ধারে যে বাজার বসে তাতেও এই মাটির পুতুল পাওয়া যায়, কিন্তু সেখানে আর আমাকে কে নিয়ে যাচ্ছে! মেলার একধারে একটা জায়গা একদম ফাঁকা পড়ে আছে, কিছু জিনিসপত্র ইতস্তত: ছড়ানো, ভাঙা বোতল, গেলাস আর রঙ বেরঙের ছবি আকা কিছু কাগজ, যাতে রাজা রাণীর ছবি আঁকা৷ হাতে নিয়ে দেখতে গেলে বুবু বারন করে, বলে, ওতে হত দিয়েন না আম্মা, সারা রাইত হারামিরা এইখানে জুয়া খেলসে আর গাঞ্জা তাড়ি খাইসে! জিজ্ঞেস করে জানতে পারি এই রাজা রাণীর ছবি আঁকা কাগজগুলোকে বলে 'তাস' এগুলো দিয়ে জুয়া খেলে৷ কি করে খেলে তা অবশ্য বুবু বলতে পারলো না তবে গাঞ্জা আর তাড়িটা কি জিনিস সেটা বুবু জানে৷ তার ছেলে আহাদালিও নাকি রাতে এখানে বসে তাড়ি খেয়ে নেশা করে আর সারাদিন বাড়িতে পড়ে পড়ে ঘুমায়! খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে যেমন গুড় হয় তেমনি তালের রস জ্বাল দিয়ে তাড়ি হয়, যা খেলে লোকের নেশা হয়৷ নেশাটা কেমন জিনিস সেটা অবশ্য বুবু ঠিকঠাক বোঝাতে পারলো না৷ গাঁজাও নাকি সেরকমই নেশার বস্তু, তামাক যেরকম হুকোর মধ্যে দিয়ে খায় এও সেইরকমই ছিলিমের মধ্যে দিয়ে খায়৷ পড়ে থাকা গাঁজার ছিলিমও দেখা যায় মেলার মধ্যে৷


জসিম হুজুর আমাদের বাড়িতে থেকে বড় মাদ্রাসায় পড়ে৷ আর একবছর পর সে মৌলভি হয়ে যাবে, এখনও সে ছাত্র৷ দাদি সব সময়েই এরকম একজন ছাত্র বাড়িতে রাখেন, যে আমাদের বাড়িতে থাকে খায় আর পড়াশোনা করে ৷ কোন ছেলে অনেক দূরের কোন গ্রাম থেকে আসে৷ একটু বড় বয়েসে এলে সে বেশিদিন থাকে না৷ কয়েক বছরে তার পড়া শেষ হলে সে চলে যায় আর তার জায়গায় আসে অন্য আরেকজন৷ জসিম হুজুরকে আমি দেখছি অনেকদিন ধরেই৷ দাদি বলেন সামনের বছর জসিম চলে যাবে আর তার জায়গায় আরেকজন আসবে৷ পাঁচবেলা আজান দেওয়ার সাথে সাথে জসিম হুজুর আরেকটা কাজ করে, ভোরবেলা আমাদের বাংলা ঘরে এই পাড়া সহ আশে পাশের পাড়া থেকেও ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা আসে আরবি পড়তে, জসিম হুজুর এদের সবাইকে আরবি পড়ায়৷ সকালের এই এক ঘন্টা পড়ানোর জন্যে দাদাজি জসিম হুজুরকে মাইনে দেন৷ সব ছেলে মেয়েরা সুর কউ কোরাঅন শরীফ পড়ে তো কেউ আমপারা৷ যারা আমপারা পড়ে তারা সেটা শেষ হলেই কোরাঅন শরীফ পড়া শুরু করবে৷ অত বড় ঘরখানায় দু সারি করে ছেলে মেয়েরা সব বসে৷ জসিম হুজুর প্রথমেই সুরা ফাতেহা দিয়ে শুরু করে, 'আলহামদুলিল্লাহ হিরাব্বিল আ'লামিন৷ আর রাহমানির রাহিম৷ মালিকি ইয়াওমিদ্দিন৷ ইয়্যাকা না'বুদু অ ইয়্যাকা নাশতায়িন৷ ইহদিনাস সিরাতাল মুশতাকিন৷ সিরাতাল্লাযীনা আন আমতু আলাইকুম ৷ গাইরুল মাঘ্দু বিআলাইকুম৷ অলাŸউউয়াল্লীন৷ আমীন৷' পড়িয়ে তারপর যার যার পড়া শুরু করতে বলে আর পড়ার শেষে সকলে একসাথে দরুদ পড়ে , "আল্লাহুম্মা সালিয়ালা সায়্যিদিনা ও নাবীয়ানা ও শাফিয়ানা ও মাওলানা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহে সাল্লাল্লাহু ওয়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম৷' দুই হাত তুলে দোয়া করে পড়া শেষ করে৷ পড়ার মাঝখানে সে হাতে একখানা বেত নিয়ে শুধু চারপাশে ঘোরে, কেউ চুপ করে থাকলে তাকে বেত উঁচু করে ধমকে বলে, অ্যাই, পড়স না ক্যান? আওয়াজ কই গলার? অমনি সে পড়া শুরু করে!


-৪-


আকাশ আজো ঢেউয়ের মুখোমুখি,
নদীর উজান ভেজায় ক'টি তারা৷
অন্ধকারে স্রোতের কশাঘাতে
হটাত্ বুঝি বুকের মাঝে নেই,
আমার পাশে চলার ছিল যারা৷ ( নির্মলেন্দু গুণ )



একে একে অনেকগুলো অঘটন ঘটে গেল এই পাড়ায়৷ সখিনার স্বামী বুড়ো হাসন আলি হঠাত্ করে মরে গেল ৷ বিকেলবেলা উঠোনে বসেছিল হঠাত্ অসুস্থ বোধ করে ৷ খানিকক্ষণের মধ্যেই মাটিতে গড়াগড়ি ৷ তার কি কষ্ট হচ্ছে সেটুকুও সে বলতে পারে নি ৷ ধড়ফড় করতে করতে শেষ ৷ উঠোনে হাত পা ছড়িয়ে বুক চাপড়ে কাঁদছিল সখিনা, তার ছেলে মেয়ে তিনটে এক কোণে বসে আছে বুড়ো মইজুদ্দিনের কাছে৷ মইজুদ্দিন চুপ করে বাচ্চা তিনটেকে আগলে বসে আছে ৷ আশে পাশের বাড়ির মেয়েরা এসে সখিনাকে উঠোন থেকে তুলে ঘরের ভিতরে নিয়ে চলে গেল৷ সখিনার স্বামীর এখন দাফন কাফন হবে, পাড়ার পুরুষেরা এসে সে বন্দোবস্ত করতে লাগল৷ ঘরের ভেতর থেকে শুধু সখিনার হেঁচকির আওয়াজ ভেসে আসছে৷ আহাদালির মা বুবু আমার হাত ধরে বলল চলেন আম্মা, ঘরে যাই, আফনের দাদি আবার খুঁজতে আরম্ভ করব ৷


ওপাড়ার মুসা লস্করের ছেলে লিয়াকত চাচা মরে গেল সাপের কামড় খেয়ে৷ পাশের বেতঝাড়ে বেত কাটতে গিয়েছিল সে৷ বিষাক্ত সাপে ছোঁবল দেয় তাকে৷ কিচ্ছু করা যায়নি লিয়াকত চাচার জন্যে ৷

ক্বালা আলক্বিহা ইয়া মূসা ৷৷
ফাআলক্বাহা ফাইযা হিয়া হাইয়্যাতুন তাস্আ ৷৷
ক্বালা খুয্হা ওয়ালা তাখাফ্ সানুয়ীদুহা সীরারাহাল ঊলা ৷৷ ( সূরা তা-হা, 19-21 আয়াত)

[ আল্লাহ বলেছেন, হে মুসা, তুমি লাঠি নিক্ষেপ কর৷ তিনি তা নিক্ষেপ করলেন, তখন তা অজগর সর্প হয়ে বিচরণ করতে লাগল৷ আল্লাহ বলেছেন, তুমি এটাকে ধর ভয় পেয়োনা; আমি প্রথম বার একে লাঠিতে পরিণত করে দিচ্ছি ]

ওঝা এসে অনেক চেষ্টা করেছে বিষ নামানোর, কিছুই করতে পারেনি সে৷ গোটা শরীর ক্রমশ নীল হয়ে গেছে লিয়াকত চাচার, মুখ দিয়ে গ্যাজলা উঠছে আর চোখ দুটো উল্টে যাচ্ছে খুব দ্রুত৷ চার হাত পা মাটিতে দাঁপিয়ে দাঁপিয়ে ধীরে ধীরে শান্ত হয়েছে সে৷ এদিকে যতখানি দাঁপিয়েছে লিয়াকত চাচা তার চাইতে বেশি বুক চাপড়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদেছে তার মা,বাবা৷ বড় কাকা খবর পেয়ে সাইকেল নিয়ে বাজারের হাসপাতাল থেকে ডাক্তার নিয়ে এসেছে কিন্তু তখন আর কিছু করার ছিল না কারও ৷

ছেলের শোকে পাগল হয়ে গেল বুড়ি মা ৷ আর শোকে শোকে কয়েক মাসের ভেতর মরে গেল মুসা লস্কর৷ পাশের বাড়ির সুজন তার বউ বাচ্চা নিয়ে এসে দখল নিল তার চাচার বাড়ি বাগান আর পুকুরের৷ জমি-জমার দখল আগেই নিয়েছিল সে৷ মুসা দাদার অত সাধের বাগান শুকিয়ে যেতে লাগল অযত্নে ৷ বুড়ি দাদি সারাদিন ঘুরে বেড়ায় এ বাড়ি ও বাড়ি, যেখানে সন্ধ্যে হয় সেখানেই আঁচল বিছিয়ে শুয়ে পড়ে ৷ সুজনের বউ সাফিনা সরাদিন বাড়িতে পাড়ার মেয়েদের নিয়ে আড্ডা দেয় পান খায় আর মোড়লি করে৷ মুসা লস্করের বাগানে বসে পাড়ার ছেলে ছোকরাদের নিয়ে জুয়া খেলে সুজন৷


ইসমাইল লস্করের মেয়ে রওশন আরা পালিয়ে গেল বাড়ি থেকে ৷ একদিন সকাল বেলায় তাকে আর কেউ খুঁজে পেল না ৷ মেয়েদের গলার কান্নার আওয়াজে ওবাড়িতে গিয়ে দেখা গেল চম্পা চুপ করে বসে আছে চৌকির উপরে আর তার মা বিলাপ করে কাঁদছে আর বলছে মেয়ে এভাবে চুনকালি দিল সবার মুখে! ইসমাইল লস্কর ঝগড়া ভুলে এসে আমাদের বাংলা ঘরের বারান্দার বেঞ্চে এসে বসে রইল৷ দাদাজি তাকে বললেন, কি করবা মিঞা অহন আর? খোঁজ কর মাইয়া কই গ্যাসে, শাদি বিয়া হইসে না কি এমনিই আছে, খোঁজ পাইলে আইন্যা মান সম্মানের সাথে বিয়া দিয়া বিদায় কর৷ আর কিসু করনের নাই অহন ৷


সখিনার আবার ছেলে হল৷ হাসন আলি মরে যাওয়ার কিছুদিন পরেই সখিনা আবার বিয়ে করে৷ পূবপাড়ার কাশেমকে৷ যার সাথে সখিনার বহু বছরের 'পিরীত' ৷ এবারেও সে শ্বশুর বাড়ি যায় না ৷ তবে এবার আর তার স্বামী ঘর জামাই হয় না ৷ সে তার নিজের বাড়ি আর মইজুদ্দিনের বাড়ি দু বাড়িতেই থাকে ৷ তার নিজের বাড়িতেও তার একটা বউ আছে৷ মইজুদ্দিন এখন আর উঠোনে বসে বাঁশ চেঁছে বেত তোলে না ৷ বেশির ভাগ সময়েই নিজের ঘরের সামনে হুকো হাতে ঝুম মেরে বসে থাকে৷ সখিনা ঠেলে তুললে উঠে গিয়ে স্নান করে, খায় আবার এসে ঝুম মেরে বসে৷ কারও সাথে কথা বলে না ৷ এখন আর ওদের উঠোনের উপর দিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় ছেলের দল ভয় পায় না, মইজুদ্দিন যে ওদের আর হাঁক দেয় না ৷


আমাদের বাড়িতে বিয়ে ৷ ছোটফুফুর৷ দাদাজি হজ্বে যাবেন তার আগেই ছোটফুফুর বিয়ে সেরে রেখে যেতে চান৷ দাদি গাছ কাটিয়ে লাকড়ি করাচ্ছেন নজু চাচাকে দিয়ে৷ পাড়ার মেয়ে বৌ রা ঢেকিতে মশলা গুড়ো করছে সারাদিন ধরে৷ গামলা ভর্তি ধনে,জিরে পুকুরের জলে ধুয়ে এনে রোদে শুকানো হয়েছে পাটি পেতে, ঝাল ঝাল লাল লংকা রোদে শুকিয়ে মুচমুচে করা হয়েছে যাতে করে গুড়ো ভাল হয়, মিহি হয়৷ ঢেকিতে লংকা গুড়ো করার সময় নাকে মুখে কাপড় বেঁধে নেয় যারা গুড়ো করে তা সত্বেও হ্যাচ্চো হ্যাচ্চো চলতেই থাকে৷ বড় ফুফু মেজ ফুফুরা সব তাদের শ্বশুর বাড়ি থেকে এসেছে৷ ছোটফুফু সারাদিন উত্তরের ঘরে মাথায় ঘোমটা টেনে বসে থাকে, ঘরে কেউ এলে মাথার ঘোমটা আরও টেনে দেয়৷ কাকিমা এসে বলে, কি গো, তুমি যে অ্যাত্তো বড় ঘোমটা বাপের বাড়িতেই দিসো তো জামাইর বাড়ি গিয়া কি করবা? অহন বহুত সময় আছে, ঘাড় ব্যাঁকা হইয়া যাইব ঘোমটা দিয়া বইয়া থাকতে থাকতে! অহন সোজা হও আর এট্টু ঘুইরা ফিরা বেড়াও! ছোট ফুফু আরও ঝুঁকে বসে৷ রাতে ছোটফুফু আমাকে জিজ্ঞেস করে, তুই দেখছস তারে? আমি বলি, হ, দেখছি, সুন্দর না! ছোটফুফু আর কিছু বলে না৷


সতীর শীতল শব বহুদিন কোলে লয়ে যেন অকপট
উমার প্রেমের গল্প পেয়েছে সে; চন্দ্রশেখরের মত তার জট
উজ্জ্বল হতেছে তাই সপ্তমীর চাঁদে আজ পুনরাগমনে; ( জীবনানন্দ দাশ)



লাল নীল সবুজ হলুদ কাগজের ফুল কেটে কেটে সব দেওয়ালে লাগানো হল, দরজায় জানালায় ঝুলছে ঐ একই কাগজের কাটা ঝালর, রঙীন কাগজের শেকল বানিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হল সারা বাড়িতে৷ সবকটা ঘরের মেঝেতে আল্পনা আঁকল কাকিমা৷ আজকে ছোটফুফুর গায়ে হলুদ৷ সারা বাড়ি ভর্তি আত্মীয়-স্বজন৷ কাকিমা বসে হলুদ বাটছে শিলে, এই হলুদ ছোটফুফুকে মাখানো হবে৷ পাশেই গোল হয়ে
বসে মেয়েরা সব বিয়ের গীত গাইছে ৷
তুমি পান বাটো, হলদি বাটো তুমি ক্ষীরা বাটো রে ৷৷
মেথি বাটো মেন্দী বাটো তুমি শুন্দা বাটো রে ৷৷
হাঁটু পানিত নাইম্যা কইন্যায় হাঁটু মান করে রে ৷৷
পূর্ণিমার চাঁন নামলো পানিত, দেখো নয়ন মেইল্যা রে ৷৷
কোমর পানিত নাইম্যা কইন্যায় কোমর মান করে রে ৷৷
পূর্ণিমার চাঁন নামলো পানিত দেখো নয়ন মেইল্যারে ৷৷
তুমি পান বাটো, হলদি বাটো তুমি ক্ষীরা বাটো রে ৷৷

ওদের মধ্যে আছে মেজফুফু৷ এক হাতে নিজের বা ঁকান চেপে রেখেছে আর ডাঁন হাত দিয়ে ধরে রেখেছে পাশে বসে গীত গাইতে থাকা জমজম ফুফুর গলা৷ একই ভাবে জমজম ফুফুও নিজের বা ঁহাতে কান চেপে রেখে ডাঁন হাতে জড়িয়ে রেখেছে তার পাশের জনের গলা৷ উঠোনে কলাগাছ কেটে এনে বিয়ের গোসলের 'মাওরা' সাজানো হয়েছে৷ চারকোনায় চারটে কলাগাছ পুঁতে ঘিরে দেওয়া হয়েছে রঙীন কাপড়ে, কলাগাছে জড়ানো হয়েছে লাল নীল সবুজ কাগজের শেকল আর ছোট ছোট তেকোনা করে কাটা কাগজ৷ সেই মাওরার ভেতরে আছে ছোট্ট চৌকি, সেটাও কাগজ আর আল্পনায় সাজানো৷ সেখানে বসিয়ে ছোটফুফুর গায়ে হলুদ মাখানো হবে আর তারপরে বিয়ের গোসল৷ লালপাড় হলুদ শাড়ি বুকের উপরে গিঁট দিয়ে পেঁচিয়ে পরা৷ হাতে৷ গলায়৷৷ কানে মাথায় হলুদ গাঁদা আর লাল গোলাপ দিয়ে বানানো গয়না পরা ছোটফুফুকে ছোটকাকা কোলে করে সেই মাওরার ভেতরে নিয়ে বসিয়ে দিল সাজানো চৌকির উপরে৷ প্রথমে দাদি তারপরে মা, কাকিমা আর তারপরে ফুফুরা সব একে একে ছোটফুফুর মুখে হাতে পায়ে খানিকটা করে হলুদ মাখিয়ে দিল, হাতে হলুদ নিয়ে প্রথমে সেই হলুদ নিজের কপালে ছুঁইয়ে তারপরে সেই হলুদ কনের মুখে হাতে পায়ে মাখিয়ে দিল সবাই৷ আমিও এক খাবলা হলুদ নিয়ে আগে নিজের কপালে ছুঁইয়ে নিলাম যেমন করে দাদি আর অন্য সকলে করেছে, আর তারপরে ছোটফুফুকে মাখিয়ে দিলাম সেই হলুদ ৷ মাওরার বাইরে গোল হয়ে বসে পাড়ার মেয়ে বউরা তখনো গাইছে বিয়ের গীত৷ সাথে আছে মেজফুফু আর তার সই জমজম ফুফু ৷
তোল তোল পালকি তোল রে, আমি যামু তোমার দেশে ৷৷
তোমার দেশে গেলে রে আমি পানি কোথায় পাব রে??
আমার বাপের আছে জোড়াদীঘি হে আমি পানি সেথায় পাব ৷৷
তোল তোল পালকী তোল রে আমি যাব তোমার দেশে রে ৷৷
তোমার দেশে গেলে আমি খানা কোথায় পাব রে??
আমার বাপের আছে জোড়া হোটেল আমি খানা সেথায় খাব রে ৷৷
তোল তোল পালকী তোল রে আমি যাব তোমার দেশে রে ৷৷


-৫-


তাঁকে ডেকে এনে এখন এই শীতের শেষ রাতে
হাল্কা অন্ধকারের পোষকে মুখোমুখি বসিয়ে রেখে
আমার সবিনয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটাতে ইচ্ছা করছে৷
আচ্ছা বলুন তো: আপনার কাছ থেকে জীবন বেশি
গ্রহণ করেছে, না আপনি? কনফিউজ করে থাকলে
আমি ব্যাপারটা স্পষ্ট করছি- এই ধরুন আপনি সারা
জীবন আত্মা খরচ করে, দৈহিক শ্রম দিয়ে যে বাসনা
নির্মাণ করে পেছনে ফেলে ছলে গিয়েছিলেন- তার কতটুকু
আপনি ফেরত্ পেয়েছেন, আদৌ পেয়েছেন কি?
আপনি নতুন বাড়ির কতটুকু কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন?
( ঋত্বিক ঘটক শ্রদ্ধাস্পদেষু/ফিউরি খন্দকার; চিত্রালী 20 ফেব্রুয়ারী, 1976)


দাদাজি হজ্বে চলে গেলেন ৷ আমরা সবাই ঢাকায় গেলাম দাদাজিকে প্লেনে তুলে দিতে৷ চল্লিশ দিনের জন্যে দাদাজি যাচ্ছেন তাই আত্মীয় স্বজন যে যেখানে আছে সবাই এসে দেখা করে গেল দাদাজির সাথে৷ ঢাকায় যাওয়ার আগের দিন সবাইকে দাওয়াত্ করে খাওয়ানো হল৷ আমাদের পাড়ার সবাই এসেছিলো সেই দাওয়াত্এ৷ বাংলা উঠানে শামিয়ানা টাঙিয়ে পুরুষদের বসার ব্যবস্থা আর ভিতর বাড়ির উঠানে মেয়েদের৷ পাড়ার লোক ছাড়াও এল গ্রামের লোক, প্রতি বাড়ি থেকে দুজনকে আসতে বলে এসেছিল বড়কাকা৷ আর ছিল গরীব ভিখিরিরা৷ বাড়ি থেকে বেরুনোর আগে দাদাজি বড় মৌলভি সাহেবের ক্কবরের সামনে দাঁড়িয়ে নীরব প্রার্থনা করে গেলেন, আমাদের বাড়ির সব পুরুষেরা আর যারা এসেছিল বিদায় দিতে তাঁরাও যোগ দিলেন সেই প্রার্থনায়৷ বাড়ির সব মেয়েদের সাথে আমিও জানলায় দাঁড়িয়ে দেখলাম সেই প্রার্থনা৷ আর তারপর সবাই মিলে খাল পার করে গাড়িতে তুলে দিয়ে এল দাদাজিকে৷ দাদাজি এখন এক সপ্তাহ থাকবেন ঢাকার হাজী ক্যাম্পে, তারপরে প্লেন ধরে যাবেন হজ্বে ৷ এই ক্যাম্পে সারা দেশ থেকে হজ্জ্বযাত্রীরা এসে জমায়েত হন, নিজেদের মধ্যে আলাপ পরিচয় করেন ৷


ঘুমের মতন নীরবে নদী
যায়, বয়ে যায়৷ ৷


এবাড়িতে প্রতিবছর মহররমে খিচুড়ি রাঁধা হয় বড় বড় সব হাড়িতে৷ রান্নাঘরে প্রচন্ড দ্রুততায় কাজ করে চলেছে আহাদালির মা বুবু, হাসিনার মা বুবু ও তার মেয়ে হাসিনা৷ তিনমুখো চুলোয় রান্না হচ্ছে একসাথে তিন হাড়ি খিচুড়ি, কাকিমা ঘুরে গেল রান্নাঘর৷ বাইরে সে মুর্গী কাটার তদারকি করছে৷ এবছর মহররমে স্পেশাল থাকছে খিচুড়ির সাথে ভুনা মুর্গীর গোশত৷ আজ আমাদের বাংলা উঠোনের শেষ মাথায় পুকুরের পুবপার ঘেঁষে স্থাপন করা হবে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর ৷ দাদাজি বলেন, "নেও' গাড়া হবে৷ রেজিষ্টি অফিসে গিয়ে দাদাজি বাংলা উঠোনের আর্ধেকটা ওয়াকফ করে দিয়েছেন৷ এই উঠোনে আর কারো কোন অধিকার থাকল না৷ এখানে মসজিদ হবে, আজ সেই মসজিদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হবে ৷ বাড়িভর্তি লোকজন ৷ মসজিদের "নেও' গাড়া হবে বলে দাওয়াত্ পেয়ে সবাই এসেছে ৷ আমিও এসেছি শ্বশুরবাড়ি থেকে ৷ বড়কাকা গিয়ে বলে এসেছিলেন আমার শ্বশুরবাড়িতে, শাশুড়ি আসতে পারেননি, আমি আর আমার স্বামী এসেছি৷ প্রতি বছরই এবাড়িতে মহররমের দিনে খিচুড়ি রান্না হয় বড় বড় সব হাড়িতে, সেদিন বাড়িতে সবার অবারিত দ্বার৷ পাড়া-পড়শী, ফকির-মিসকিন,বাড়ির লোক, সবাই একই খাবার খায়,খিচুড়ি৷ ছোলার ডাল, আলু আর ক্ষেতের আলোচাল দিয়ে রান্না খিচুড়ি৷ দাদি উপর থেকে নামান তুলে রাখা ডজন ডজন মেলামাইনের বাসন৷ নজুচাচা সেগুলো বড় প্লাষ্টিকের গামলায় করে নিয়ে যায় পুকুরে৷ ধুয়ে নিয়ে চলে যাবে সোজা বাংলা উঠোনে৷ সেখানেই খাওয়ানো হবে ফকির মিসকিন আর অতিথিদের৷ একই রকম সব থালায় একই খাবার খাবে সবাই আজকের দিনে৷ আজ স্পেশাল মেনু হিসেবে মুর্গী আছে৷ দাদাজী সাদা কাজ করা পাআবী আর ছোট ছোট চেকের লুঙ্গি পরে বসে আছেন বাংলা ঘরের বারান্দায় তার হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারটিতে৷ সামনে ওঠোনে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে, সেখানে আছে বাজারের ডেকরেটারের দোকান থেকে আনা কয়েক ডজন প্লাষ্টিকের চেয়ার৷ অতিথিরা আসছেন, দাদাজীর সাথে এসে কথা বলে গিয়ে বসছেন সামনে পেতে রাখা সব চেয়ারে৷ আমি মাঝে মাঝেই দাদির ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বাংলা উঠোনের দিকে দেখছি৷ চোখে পড়ছে বসে থাকা অতিথিরা নিজেদের মধ্যেই কথা বলছেন, নজু চাচা ব্যস-সমস্ত হয়ে একবার বাংলা উঠোন তো আরেকবার ভেতর বাড়ি করছে৷ দাদাজী মুখে এক উজ্জ্বল হাসি নিয়ে তার পুরনো কাঠের হাতলওয়ালা চেয়ারটিতে বসে বসেই তদারক করছেন সবকিছু৷ রাজমিস্ত্রী বুড়ো করিম আর আলি হোসেন৷ খানিক পরেই জুম্মার নামাজ আর তারপরে দাদাজী নিজের হাতে রাখবেন মসজিদের প্রথম ইটটি৷ দেবেন একমুঠো বালি আর এক হাতা মাখানো সিমেন্ট৷ দাদাজী তার স্বপ্নের মসজিদের আজ "নেউ' গাড়বেন ৷


দু'কূলে তার বৃক্ষেরা সব
জেগে আছে;
গৃহস্তের ঘর-বাড়ি
ঘুমিয়ে গেছে,-
শুধু পরান মাঝি বসে আছে
শেষ খেয়ার আশায় ৷
যায়, বয়ে যায়৷৷


জলেখাবিবির বাগে এখন আর মেলা বসে না৷ জলেখা বিবির মৃত্যুর পর তার ছেলে মেয়েরা সম্পত্তি ভাগাভাগি করার সময় এই বাগ নিয়ে সমস্যা হয়, কে পাবে এই বাগ৷ কেউই দাবী ছাড়তে রাজী না হওয়াতে বাগ বিক্রী কিরে দেওয়াই সাব্যস্ত হয় ৷ সেই বাগ কিনে নিয়ে সেখানে এক নতুন মাদ্রাসা শুরু করে বাবা ও বড়কাকা৷ অল্প খানিকটা জায়গায় একখানা টিনের ঘর তুলে এবছরই সেখানে চালু হয় এক লোয়ার মাদ্রাসা ৷ প্রথম বছরে তাতে ছাত্র হয়েছে বত্রিশজন, এদের প্রয়োজনীয় খাতা পেন্সিল বই দেওয়া হয় মাদ্রাসার তরফ থেকে৷ সামনের বছর এরা যখন পাশ করে দ্বিতীয় শ্রেনীতে যাবে ততদিনে তোলা হবে আরেকটি ঘর আর ভর্তি নেওয়া হবে নতুন ছাত্র প্রথম শ্রেনীতে৷ সেই মাদ্রাসার শিক্ষক এসেছেন চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে ৷ তিনি এবাড়িতেই থাকেন, খান আর মাদ্রাসায় পড়ান ৷ মাঝেই মাঝেই বড়কাকা ঐ বাচ্চাগুলোর জন্যে চকোলেট নিয়ে হাজি হন মাদ্রাসায়, ঘুরে ফিরে কথা বলেন ছোট ছোট ছেলেগুলির সাথে ৷ কেউ বা নালিশ জানায়, হুজুরে খালি মারে, বেত দিয়া! কাকা মাদ্রাসার শিক্ষককে, নিষেধ করেন ওদের বেত দিয়ে না মারতে ৷


কে জানে কবে কে নাম রেখেছে
তিতাস তোমার;
যে নামেই ডাকি তোমায়
তুমি কন্যা মেঘনার৷

বিজলীবাতি এসেছে শাহবাজপুরে ৷ তবে আমাদের তিতাসের জলবিদ্যুত্ কারখানা "ওয়াব্দা'র বিজলী নয়৷ বিজলী এসেছে দূরের শাহজীরবাজার পল্লী বিদ্যুত্ কারখানা থেকে৷ সেটি নাকি অনেক বড় আর সেই পল্লীবিদ্যুত্ কারখানার বিজলী পৌঁছে গেছে আশে পাশের সমস্ত গ্রামে এমনকি সেই মেদীর হাওর পর্যন্ত যত গ্রাম আছে তার সবকটিতেই৷ ফলে আমাদের তিতাসের এই জলবিদ্যুত্ কারখানা ওয়াব্দা এখন আর কোন কাজে লাগছে না ৷ কিছু লোক এখনও আছে সেখানে, যারা দেখাশোনা করে এই এলাকার বিদ্যুত্ পরিষেবা ৷ গ্রামের কোথায় ঝড়ে খুঁটি ওল্টালো, কোথায় তার ছিঁড়ল৷ মাঝে মাঝে লোকজন দূর থেকে গাড়ি করে আসে ওয়াব্দায় পিকনিক করতে৷ তিতাসের পুরনো ব্রীজ ভেঙে নতুন ব্রীজ হয়েছে ৷ এ ব্রীজ আরও বড়, আরও চওড়া৷ নতুন ব্রীজের উপর থেকে এখন ওয়াব্দাকে দেখলে মনে হয় যেন ছাড়া (পোড়ো) বাড়ি৷ সেই বাগান নেই,ঝা চকচকে সেই বিল্ডি ংপুরনো হয়ে হয়েছে জরাজীর্ন, দেখাশোনার অভাবে ৷

ঘুমের মতন নীরবে নদী
যায়, বয়ে যায়৷৷


একতলা পাকাবাড়ির ছাদের উপর দাঁড়িয়ে আছে এক গোলাকার থাম৷ বেশ উঁচু সেই থামের মাথায় জালি দিয়ে ঘেরা দুখানা মাইক৷ মসজিদের মাইক৷ পাঁচবেলা আজান দেয় শামসুল, নজুচাচার ছেলে৷ উত্তরগাঁওয়ের নতুন প্রাইমারী স্কুলে সে পড়ায়৷ নিয়ম করে মসজিদে এসে পাঁচবেলা আজান দেয় শামসুল৷ সুমধুর সেই আজানের ধ্বনি সেই মাইকের ভেতর দিয়ে চলে যায় অনেকটা দূর অব্দি৷ মসজিদের একপাশে ছোট্ট এক ঘর, যাতে থাকেন মসজিদের ইমাম, জসিম হুজুর৷ পাশ করে মাদ্রাসা থেকে বেরুনোর পরেও জসিম হুজুর এবাড়ি থেকে চলে যায়নি৷ মসজিদের ইমাম হিসেবে তাকে চাকরী দিয়ে এবাড়িতেই রেখে দিয়েছেন দাদাজী৷ আছে অরেকটি ছেলে, রফিক৷ যে এবাড়িতে থেকে বাজারের হাই মাদ্রাসায় পড়ে, তার তিনবেলা খাওয়া দাওয়া এবাড়িতেই৷ জসিম হুজুর সকাল বেলায় মসজিদের গ্রীল দিয়ে ঘেরা বারান্দায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আরবী পড়ায়৷ এর জন্যে জসিম হুজুর আলাদা মাইনে পান৷ জসিম হুজুর মাঝে মাঝে ছুটিতে বাড়ি গেলে তখন রফিক মুন্সি নামাজ পড়ায়৷


মোষের মতন কালো সাঁঝ
নামে তীরে;
আবহমান উলুধ্বনি
বাজে ঘরে ঘরে,-
পোহালে রাত ফর্সা ভোর
আসে নদীর নামায়৷
যায়, বয়ে যায়৷৷


আমাদের বাড়িতে মসজিদ হওয়ার পর থেকে বিয়ে শাদীতে কিংবা কোন অনুষ্ঠানে জোরে গান বাজনা করতে দেন না দাদাজী, মসজিদ থেকে শোনা যায় বলে৷ বাড়ির মেয়েরা তবু দাদিকে পটিয়ে গীতের আসর বসায়, দাদি বলে, বেশি জোরে সুর তুলিস না, মসজিদ থেইক্যা যেমুন না হুনা যায়! গোল হয়ে বসে এখনও গীত গায় মেয়ে বউরা, কিন্তু সে যেন বড় ভয়ে ভয়ে৷ বড় মৌলভী সাহেবের এই বাড়িতে একটা ধর্মীয় আবহ বরাবরই ছিল কিন্তু এখন যেন সেটা বড় বেশি বেশি চেপে বসছে মানুষের উপরে৷ সামনের বাড়ির নজরুল ইসলামের ছোট ভাই কালা বিয়ে করে সংসারী হয়েছে ৷ করাত কলে চাকরী নিয়ে সে চলে গেছে শহরে৷ তার বাবা মুসা পাগলার ভাঙা বেড়ার ঘর ফেলে দিয়ে সেখানে দেওয়ালের উপর টিনের চাল দিয়ে তোলা নতুন ঘরে থাকে তার বৌ৷ সপ্তাহান্তের ছুটির দিনে বাড়ি এলেও এখন সে বাড়িতে আর মুর্শিদি গান হয় না৷ আমাদের খালের উপর পাকা পুলে ছেলে ছোকরাদের আড্ডা বসে বিকেলে ৷ ছোট্ট পুলের রেলিংএ বসে ছেলের দল মোড়ের দোকান থেকে কিনে আনা ছোলাভাজা, বাদামভাজা খায় ৷ কেউ কেউ এদিক ওদিক তাকিয়ে চট করে ধরায় একটা ক্যাপষ্টেন, তরপর সেটা হাতে হাতে ঘোরে৷ কেউ দেখে ফেলার আগেই উড়ে যায় ধোঁয়া৷ বড় পুল হয়েছে মোড়াহাটির সামনে ৷ এখন আর কোন বুড়ো মানুষকে অপেক্ষা করতে হয় না, কখন কোন দয়ালু মাঝি পার করে দেবে এই খালটুকু৷ মোড়ে, যেখানে এই বড় মৌলভি পাড়ার রাস্তা আর মোড়াহাটির রাস্তা এসে এক জায়গায় মিশেছে সেখানে হয়েছে এক ছোট্ট বাজার, মৌলবীবাজার৷ মোস্তাক ডাক্তারের চেম্বার কাম ডিসপেন্সারি সহ এই বাজারে পাওয়া যায় প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী৷ আর হয়েছে এক চালকল৷ এখন আর উত্তরগাঁওয়ের কাওকে সি এন্ড বি বাজারে যেতে হয় না ধান ভাঙাতে৷ দৃশ্যত এই বড় মৌলভীবাড়ির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি শুধু বড় মৌলভী সাহেবের ঐ বাঁধানো কবরের সামনের নতুন দুটি কবর ছাড়া ৷ বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা কবরদুটি আমার দাদাজী আর দাদির ৷






-শেষ-

Wednesday, February 13, 2008

কোন এক গাঁয়ের বধুর কথা তোমায় শোনাই শোনো...



টালির চৌচালা দাঁড়িয়ে আছে মাটির দেওয়ালে ভর করে। দেওয়ালের তিন দিন ঝকঝকে তকতকে গোবর নিকোনো আর একদিকের দেওয়াক জুড়ে আদিবাসী বধুর চিত্র পরিকল্পনা। তার টুকরো টুকরো সুখ, বছর জুড়ে ছেঁড়া কাপড়ের মত লেপ্টে থাকা সমস্ত দু:খকে একপাশে সরিয়ে রেখে মন-প্রাণ ঢেলে সে তার মেটে দেওয়ালখানিকে সাজিয়েছে মনের সমস্ত মাধুরী ঢেলে। হাতে তৈরি সব রং, হাড়ির তলার কালি, গাছের পাতার রসে সবুজ, পোড়ানো ইটের গুড়োয় তৈরি লাল আর আরও সব রং যা তার দরকার সব সে বানায় এই সব গাছ-পাতা- চুন-সুরকি আর ফুল-ফল দিয়ে।






বছরভরের অনাহার-অর্ধাহার সরিয়ে রেখে গায়ে জড়িয়েছে কড়কড়ে নতুন পাটাভাঙা লাল শাড়িখানি। একটি একটি পয়সা জমিয়ে যা সে কিনেছে মকরের এই সংক্রান্তির জন্যে। নবান্নের উৎসবের জন্যে। টুসু-র পুজার জন্যে। টুসু-ভাসানের মেলার জন্যে।


"টুসু মাকে ঘরে এনেছি ভাবনা কিসের আর,কাটা ধানের পালুই কৈরে ভৈরেছি খামার।
এক কুচুরি ভাজান, আর চার কুচুরি ভাত,এক কুচুরি রাইখ্যেছি বীজ, করব গো আবাদ।।"



নিকোনো উঠোনে যেন কেউ বিছিয়ে দিয়েছে সজনের ফুল উঠোনের কোণার সজনে গাছের পাতা দেখা যায় না, শুধু ফুল শুধু ফুল সরু সরু কচি সজনে ডাটা ঝুলছে ডাল জুড়ে উঠোনে সদর্পে ঘুরে বেড়ায় পোষা লড়াকু ষাঁড়াটি (মোরগ) বিকেলের মেলায় সে যাবে লড়াই করতে, জিতলে ঘরে আসবে আরেকটি লড়াকু মোরগ আর হেরে গেলে সে চলে যাবে লড়াইয়ে যে জিতেছে তার কাছে



লম্বা ঘোমটার ফাঁকে দেখা কালো মুখটি, নাকে রুপোর নোলক গলায় মোটা বালার মত হার কালো মুখ চকচক করে পুরোনো গয়নার ঝিলিকে কথা বলতে গিয়ে অকারণ লজ্জায় রাঙা হয় বউটি দেওয়ালচিত্রটি কার আঁকা জানতে চাইলে সলজ্জে সে জানায়, তারই আঁকা ঐ দেওয়াল জোড়া ছবি হাত দিয়ে ঘষে ঘষে মসৃণতর করে তোলে দেওয়ালকে আর তারপর দেওয়ালে সে আঁকে তার সমস্ত কল্পনা, মনের সবটুকু মাধুরী মিশিয়ে তার ভেতরকার শিল্পি ও‌ই মেটে দেওয়ালখানিকে রূপান্তরিত করে এক বিশাল চিত্রকর্মে প্রতি বছর মকরের মেলার আগে সে তার ঘরে দেওয়ালে নতুন মাটি লাগায়, মুছে দেয় আগের বছরের চিত্রকর্ম

উঠোনে হামাগুড়ি দেয় ন্যাংটো শিশু।

শুধু ও‌ই একটি বাড়ি বা একটি দেওয়াল নয়, পুরুলিয়ায় প্রত্যন্ত গ্রামে মকর সংক্রান্তির মেলা দেখতে গিয়ে দেখতে পেয়েছি এরকম অসংখ্য চিত্রকর্ম। প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনের দেওয়াল জুড়ে আঁকা অতি সুক্ষ, অসাধারণ সব শিল্প। মুখে গান। টুসু'র গান। নবান্নের গান।

"লবান্নের ধান ভাইনলাম দিনক্ষণ কৈরে,
তরে-ও কুড়া রাইখলাম টুসালুর তরে।
টুসালু গো-রাই, টুসালু-গো ভাই,
তুয়ার দৌলতে মোরা ছবড়ি পিঠা খাই।"




আদিবাসী এই সব গ্রামগুলিতে অভাব এঁদের নিত্যসঙ্গী। পাথুরে মাটিতে ফসল ফলে না। জঙ্গলে গাছ নেই, পশু নেই। সরকারী সুযোগ-সুবিধা এঁরা কতটুকু পান সে ওঁদের চোখ-মুখে লেখা। কাজ বলতে দূরের আসানসোল, রানীগঞ্জের কয়লাখনিতে কুলি-কামিনের কাজ। কোন অভিযোগও নেই ওঁদের। অভিযোগ থাকলেও কার কাছে করবেন সম্ভবত তাও জানেন না। গৃষ্মে নিদারুণ দাবদাহে পোড়ে মাটি,শরীর। শীতে থরথর কাঁপে বস্ত্রহীন গোটা আদিবাসী সমাজ। শিশুর ভাঙা পায়ে মন্ত্র পড়া চুল বেঁধে দিয়ে মা ভাবেন, এতেই ঠিক হয়ে যাবে ভাঙা পা। সবার জন্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বড় বড় বুলি নেতারা তবুও আউড়েই যান।

Sunday, February 10, 2008

এ আমার লাইব্রেরী!

প্রবাসে থাকা এক বন্ধু ছুটি কাটাতে বাড়ি এসেছিলেন বইমেলার সময় ধরে। বইমেলা না হওয়াতে এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে দেখা করে, টুকটাক কাজকর্ম করে সময় কাটাচ্ছেন। আজকে আমার সাথে দেখা করতে এসে আমাকে দিয়ে গেলেন তিনখানা বই। আশাপূর্ণা দেবীর ট্রিলজি- প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণলতা আর বকুলকথা। বইগুলো দেখেই একমুখ হাসি আমার। সুবর্ণলতা বইটি আমার আছে, সেটা পড়ে বকুল কথা পড়ার সাধও হয়েছিল কিন্তু পরে আর কেনা হয়নি কাজেই পড়াও হয়নি। আজ অনেকদিন পরে যেন একটি ইচ্ছেপূরণ হল...


ইদানিং বেশ বই উপহার পাচ্ছি। হাশেম খান নিজের লেখা বই দিয়ে গেলেন, ঢাকায় গিয়ে পেলাম ইমরুল হাসানের বই। সদ্য পরিচিত কাজল শাহনেওয়াজ দিলেন তাঁর গল্প সংকলন, আর কবিতার বইও। ছোটবোন দিল সৈয়দ মুজতবা আলি'র শবনম।


সেই কোন ছেলেবেলায় কেউ একজন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আমি তোকে একটা বিশাল লাইব্রেরি বানিয়ে দেব! অনেক অনেক বই থাকবে সেখানে, সব তোর! আমি তখন ভাবতেও পারতাম না, গোটা একটা লাইব্রেরি আমার? সত্যি! তখন যে আমার গল্পের বই পড়বার অনুমতি ছিল না, লুকিয়ে বই পড়তাম আর ধরা পড়লেই বকুনি। মনখারাপ করে বসে থাকলেই আকছারই পেতাম ও‌ই প্রতিশ্রুতি, তোকে আমি একটা গোটা লাইব্রেরি দেব! আমি বিভোর হয়ে যেতাম সেই লাইব্রেরি র স্বপ্নে...


ছেলেবেলা কখন যেন চুপটি করে চলে গেছে না জানিয়েই। সে একা যায়নি, সাথে করে নিয়ে গেছে অনেক কিছুই। অজান্তেই কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সেই মানুষটাও। হারিয়েছে দশ বছরের এক মেয়েকে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতিও। স্মৃতিতে ধুলোর চাদর বিছিয়েছে সময় আর একসময় পুরোপুরি ঢাকাও পড়েছে কবে যেন। আজ আবার মনে পড়ে গেল...


কলেজ ষ্ট্রিট খুব একটা দূরে না হলেও যাওয়া হয়ে ওঠে না বই কেনার জন্যে। বইমেলা ঘুরে ঘুরে লিষ্টি মিলিয়ে মিলিয়ে তাই বই কিনি। দুই হাত নুয়ে আসে ভারে, প্লাষ্টিক কেটে কেটে বসে হাতে। ভিড়ের বাসে ঠেলে ঠুলে জায়গা করি নিজের, বইয়ের। ক'দিন শুধুই বই ঘেঁটে দিন কাটানো। পড়া হয় না তারপরেও সব বই। ভিড় বাড়ে বইয়ের তাকে। এক সারিকে পিছনে ফেলে সামনে বাড়ে আরেক সারি। এখন আমার ছেলেবেলা হলে বলতাম, এ আমার লাইব্রেরী!


বই দিয়েছে সুমেরুও। হারিয়ে যাওয়া নকশী কাঁথার মাঠ আবার খুঁজে বের করেছে সে, এনে দিয়েছে আমায়। আমি সেই নকশী কাঁথায় হাত বুলাই শুধু... মন ভরে যায়, উদাসও হই... মন কেমন করে ওঠে... আবার তাকে রেখে দেই আমার নকশী কাঁথার মাঠকে... ওর আলমারী ভরা সব বইও এখন আমার কাছে... আকারে বড় হয়েছে আমার লাইব্রেরী। ছেলেবেলা এখন আর নেই তাই পড়া হয়ে ওঠে না সব বই। দিন গুলি কখন যেন ছোট হয়ে গেছে আর সময় টুক করে ঢুকে পড়েছে কম্পিউটারে। আমি তারে খুঁজে বেড়াই স্ক্রিনে, ধুলো জমে আমার লাইব্রেরিতে...

Sunday, February 03, 2008

ভোগে গেল কলকাতা বইমেলা ২০০৮

ভেস্তে গেল কলকাতা বইমেলা। আপাতত। হ্যাঁ। আপাতত শব্দটাই ব্যবহার করলাম কারণ শুনছি বইমেলা নাকি হবে। ১লা মার্চ থেকে ১০ই মার্চ পর্যন্ত। কিন্তু এগুলো সবই শোনা কথা। আলোচনা চলছে। চেষ্টাও চলছে প্রকাশক, বই বিক্রেতা ও বইপাগল জনতাকে সন্তুষ্ট করার জন্যে একটা মেলা করার।


প্রধান আসামী হাইকোর্ট। দ্বিতীয় আসামি সেনাবাহিনী, তৃতীয় আসামী পরিবেশ রক্ষায় আগ্রহী জনতার একাংশ। এবং লাষ্ট বাট নট দ্য লিষ্ট 'গিল্ড'। কলকাতা বইমেলা এত বছর ধরে হয়ে আসছিল ময়দানে। অন্য নামে অনেকে যাকে গড়ের মাঠও বলে থাকেন। সমস্যা দেখা দেয় সেনাবাহিনী বাগড়া দেওয়ায়। ময়দান সেনা'র সম্পত্তি। সেখানে যাই কিছু হোক না কেন সেনা-সম্মতি ছাড়া হওয়া সম্ভব নয় (এত বছর কী করে যত রাজ্যের মেলা হয়ে আসছিল কে জানে!)। প্রথম প্রথম মেলা যখন শুরু হয় তখন সে আকার ও আয়তনে খুবই ছোট ছিল, আর সে শুধুই বইমেলা ছিল। পার্ক ষ্ট্রিটের কোণ ঘেঁষে ময়দানের প্রায় অর্ধেক জুড়ে বইমেলা প্রতিবছরই তার আয়তন বাড়াচ্ছিল। সেখানে যোগ হচ্ছিল নানা রকমের খাবারের ষ্টল, ব্যাঙ্ক, সমস্ত সাজ পোষাক নিয়ে মিডিয়া, আই টি ও আরো সাত সতেরো রঙবাহারী সব ষ্টল। পরিবেশবিদদের হঠাত্ মনে হল, ময়দানে জুড়ে এই যজ্ঞের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, মাপা হল দুষণ, যাতে দেখা গেল ভয়ানক রকম বেড়ে যাচ্ছে দুষণের মাত্রা। ঠুকে দেওয়া হল জনস্বার্থ মামলা। বইমেলার জন্যে বাঁশ-ফাঁস পুঁতে মেলা যখন প্রায় তৈরি তখন হাইকোর্ট রায় দিল ময়দানে মেলা করা চলবে না। এবং দেখা গেল, বুক সেলার্স এন্ড পাবলিশার্স গিল্ড অনুমতির নামে যা কাগজপত্র দেখিয়েছে সবই প্রায় ভুয়া! ময়দানে বইমেলা সহ সমস্ত মেলা নিষিদ্ধ হওয়ায় শেষ মুহুর্তে নমো নমো করে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে উদ্ভোদন করা হল বইমেলার, মেলা যদিও শুরু হয় তারও দিন পাঁচেক পর। এগুলো গেলবারের ঘটনা। তখনও বইমেলার হর্তা-কর্তারা যদিও আস্ফালন দিচ্ছিলেন, বইমেলা এরপরে কলকাতাতেই হবে আর সেটা ময়দানেই হবে!


কার্যত যা করা গেল না। সেনা নাছোড়, তারা ময়দান দেবেই না বইমেলার জন্যে। গিল্ডও সল্টলেক যাবে না। কিন্তু তাহলে মেলা কোথায় হবে? পার্ক সার্কাস ময়দান অগত্যা পছন্দ হল গিল্ডের, যদিও মেলা আকারে অনেক ছোট হয়ে যাবে, ছোট অনেক পুস্তক বিক্রেতা -প্রকাশকদের জায়গা দেওয়াই সম্ভব হবে না তবুও গিল্ড রেডি হল বইমেলার জন্যে। এবং এবং এবারেও বাগড়া দিল জনতা জনার্ধন। পার্ক সার্কাস এলাকাবাসী জনস্বার্থের মামলা ঠুকে দিল হাইকোর্টে। সাত রাস্তার মোড়, দু দুটি বড় বড় স্কুল দু দুটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেখানে আছে সেখানে কী করে বইমেলার মত এক বিশালাকারের মেলার অনুমতি দেয় পুরসভা! ব্যাস। এবারেও দেখা গেল, অনুমতি পত্রের নামে যা আছে তার বেশির ভাগই ভুয়া কাগজপত্র এবং মেলা চলাকালীন ঐ দশদিন এলাকাবাসীর দুর্গতির কথা চিন্তা না করেই এই মেলার অনুমতি দিয়েছে পুরসভা। মেলা বাবদ ভাড়া যা পাবে তাও নামমাত্র। লক্ষ লক্ষ মানুষের পদচারণায় ধুলো যা উড়বে সে তো ভাবা হয়নি একবারের জন্যেও এমনকি উপেক্ষা করা হয়েছে জানজটের ব্যাপারটিও। এবং এবারেও হইকোর্ট রায় দিল পার্ক সার্কাসে বইমেলা করা যাবে না। বইমেলা নিয়ে গিল্ড চলে যাক, যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বা বাইপাসের মেলা প্রাঙ্গনে, যেখানে ১২মাসই নানারকমের মেলা হয়। নাছোড় গিল্ড, বইমেলার ঐতিহ্য নেই? মেলার মানহানি হয় সল্ট লেক বা বাইপাসে গেলে। তাদের যুক্তি, সল্টলেকে মেলায় লোক হয় না, জায়গা ছোট, এতবড় মেলাকে জায়গা দেওয়ার মত জায়গাই নেই সল্টলেক ষ্টেডিয়ামে। পার্ক সার্কাস ময়দানে উদ্ভোদনের আগের দিন ভেস্তে গেল কলকাতা বইমেলা২০০৮।


সরব হলেন সুশীল সমাজ। এক প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় লেখক বিবৃতি দিলেন, এই দশদিনের কষ্ট ও দু:খ-দুর্দশা মেনে নেওয়া উচিত ঐ এলাকাবাসীর, বইমেলার মত এক সুমহান ঐতিহ্যশালী মেলার জন্যে। গলা মেলালেন নামি ও সুমহান লেখকেরা, দু্র্গাপুজোয় লোক হয় না? তখন যানজট হয় না? তাঁরা ভুলে গেলেন যে পুজোর সময়ে স্কুল-কলেজ-অফিস-আদালত সবই ছুটি থাকে, আর হাসপাতালেও ইমার্জেন্সি ছাড়া সর্বত্রই ছুটির আমেজ থাকে। এবং তাঁরা ময়দানে বাঁশ পুঁতে মঞ্চ বানিয়ে প্রতীকি বইমেলা শুরু করে দিলেন। এই প্রতীকি বইমেলা অবশ্য গতবছরও তাঁরা করেছিলেন ময়দানেই। গিল্ড নিজের ঐতিহ্য ও মর্যাদাবোধ ধরে রেখে ঘোষণা করল, কলকাতা বইমেলা ২০০৮ হবে না। মাথায় হাত ছোট-বড় সব প্রকাশকদের। লক্ষ লক্ষ টাকা টাকা তাঁরা লগ্নি করে বসে রয়েছেন মেলার জন্যে। অনেকেই ধার-দেনা করেছেন, সেসবের কী হবে?



ত্রাতা ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্কোত্তি। বইমেলা হবে আর ২০০৮এই হবে। আলাপ-আলোচনা আর পরামর্শ এখনও জারি আছে। গিল্ড জানিয়ে দিয়েছে, তারা নেই। নেই তো নেই। তাদের ছাড়াই মেলা হবে। দিন ঘোষণা হয়েছে, ১লা মার্চ থেকে ১০ই মার্চ যুবভারতীতে বইমেলা হবে। চাপান-উতোর চলছেই, চলছে বিবৃতি আর পাল্টা বিবৃতি আর সাথে সাথেই চলছে রাজনীতিও।