Saturday, January 05, 2008

চিত্রকর তুমি চিত্র আঁকো-৩

ধারাবাহিকে কিছু লেখাটা দেখছি সত্যিই খুব মুশকিলের কাজ। প্রথমটা লেখার পরেই মনে হয় ধ্যাত্... আর লিখে কী হবে! ২নম্বর লেখার পরে আর হাতই ওঠে না লেখার জন্যে, কী মুশকিল! ধারাবাহিকে লিখতে গিয়ে দেখেছি, এপর্যন্ত একটা লেখাও পুরো শেষ করতে পারিনি। সবই অসমাপ্ত! যাগ্গে.. আরেকটু চেষ্টা করা যাক, কদ্দূর এগুনো যায়...

যে বাড়িটির সামনে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালাম, গেট থেকেই নজরে পড়ে সাজানো বাগান। গেটের ভেতরে দু পা এগিয়েই অর্ধচন্দ্রাকৃতি তিন ধাপ সিঁড়ি, যার দুপাশেই বিশালাকারের পিতলের হাড়ি আকারের গামলা, জলে ভর্তি, গোলাপের পাপড়িরা বিছিয়ে আছে জলের উপরে, ভাসছে, সাথেই ভাসছে জ্বলন্ত কিছু প্রদীপ। ছোট ছোট। ভাল করে খেয়াল করতে বোঝা গেল, ওগুলো সব মোমবাতি, ফ্লোটিং ক্যান্ডেল। গৃহকর্তা-কর্তীর সৌন্দর্যবোধ কাবিলে তারিফ। সকলেরই মুগ্ধ নয়ণে এদিক সেদিক তাকিয়ে ভেতরে পা বাড়ালেন, আমিও। সবার শেষে ঘরে ঢুকলেন দীপালী, ড্রাইভার সহ, যার হাতে এক চটের ব্যাগ, বোতলের গায়ে গায়ে ঠোকা লাগার ঠুন ঠুন শব্দে বোঝা যায়, ভেতেরের বস্তু কী! শুনলাম, পার্টি শুভাবাবু দিচ্ছেন কিন্তু ড্রিংকসের দায়িত্ব জর্জদের। লাল আর কালো লেবেলের বোতলগুলি যে এয়ারপোর্টের ডিউটি ফ্রী শপ থেকে আনা, সে আর বলে দিতে হয় না!


শুভাপ্রসন্নবাবুর বাড়ি আর সেই বাড়ির সাজগোজের বর্ণনা দিতে অন্তত দু পাতা লেখা দরকার কিন্তু এখানে সে বর্ণনা নিস্প্রয়োজন বিধায় বিরত রইলাম ( বেঁচে গেলাম!)। আরো প্রচুর লোক সমাগম দেখে বোঝা গেল, অতিথি আরো অনেকেই আছেন। সকলের হাতেই পানপাত্র, কারো রঙীন, কারো সাদা। উর্দি পরা বেয়ারা ঘুরে বেড়াচ্ছে হাতে বিশালাকারের ডিশ নিয়ে, যার কোনটাতে চিকেনের কাবাব, কোনটিতে মাছের। খানিকক্ষণের মধ্যেই বিশাল হলঘর ভর্তি হয়ে লোকজন ছিটকে এদিক ওদিক যেতে শুরু করলেন, আমিও একসময় ছিটকে গিয়ে বাড়ির পেছনদিককার লনে গিয়ে চেয়ারস্থ হলাম। অতিথিদের মাঝে একটি নাম অবশ্যই উল্লেখযোগ্য, যোগেন চৌধুরী।

বারে বারে ফোনে চেষ্টা করার ফলে একসময় সুমেরুকে ফোনে ধরা গেল, সে তখন কলকাতায় ফিরছে। কথা বললেন মাহমুদুল হক, ওদের সকলকে বাড়িতে ডাকার কথা বলে সে ফোন ছেড়ে দেয়, তার ফোনের ব্যাটারি লো! লনেই বসে আছি, একে একে অনেকেই এসে বসলেন আশে পাশের চেয়ারগুলিতে। সামনে দুই বিদেশিনীকে এসে বসতে দেখলাম, যাঁদের একজনের মুখ আবার খুব চেনা চেনা! কানে এল, এঁরা তেহরান থেকে এসেছেন, ফিল্ম ডিরেক্টর। পরদিন থেকে শুরু হচ্ছে থার্ড উইমেন'স ফিল্ম ফেষ্টিভ্যাল, শুভাপ্রসন্নবাবু যার একজন পৃষ্ঠপোষক, সেই হিসেবে সেই ফেষ্টিভ্যালের আয়োজোক এবং অতিথিদেরও এই পার্টিতেই ডেকেছেন তিনি, নইলে পরে আবার আরেকটা পার্টি দিতেই হত ওদেরকে।


আমি আরেকটু ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম সেই মেয়েটির দিকে, যাকে চেনা চেনা লাগছিলো, জানতে চাই, তুমি কী সিনেমায় অভিনয় করো? সে বলে, আমি এখানে এসেছি একজন ডিরেক্টর হিসেবে,আমার সিনেমা দেখানো হবে এই ফেষ্টিভ্যালে কিন্তু অভিনয় তো আমি করিই। পরের প্রশ্ন নিজের অজ্ঞাতেই বেরিয়ে যায় মুখ থেকে, হাভানা ফাইলস, হিডেন হাফ-এ তুমিই কাজ করেছ তো? মেয়েটি ভীষণ অবাক হয়ে তাকায়, তুমি কী করে জানলে? তুমি দেখেছ? তার অবাক হওয়ার কারণ, হাভানা ফাইলস তার জানামতে বাইরে কোথাও দেখানোই হয়নি আর তার নিজের দেশে ওই সিনেমাটি চালানো নিয়েও বেশ ঝামেলা হয়েছে। বললাম, মাস দুয়েক আগে নন্দনে ইরানিয়ান সিনেমার একটা উৎসব হয়, যাতে উদ্ভোদনী সিনেমা ছিল হাভানা ফাইলস, আর হিডেন হাফ দেখেছি গতবছর কলকাতা ফিল্ম ফেষ্টিভ্যালে। ভীষণ অবাক আর খুশি নিকি, সে জানতই না যে এখানে ইরানিয়ান সিনেমার উৎসব হয় আলাদা করে। নিকি করিমি, অসাধারণ সুন্দরী মেয়েটি আধো আলো আধো অন্ধকার লনটিকে যেন আলো করে বসে আছে। ক্ষণিকের মধ্যেই আলোপোকাতে ভর্তি বাড়ির পেছনের ঐ লন। এদিক ওদিক থেকে সব চেয়ার টানার শব্দ, মূহুর্তেই নিকির চারপাশে ভিড়ে ভিড়াক্কার।

ঠিক উল্টোদিকের একটি চেয়ার বসে অপর বিদেশিনীর সাথে গল্প করছেন যোগেন চৌধুরী। তাহমিনে মিলানি। ইরানিয়ান চিত্র পরিচালক। মৃদু স্বরে কথা বলছে পাশে বসা শিল্পির সাথে কিন্তু উপভোগ করছে চারপাশের ভিড়ের এই মনযোগ, একহাতে পানপাত্র অন্যহাতে জ্বলন্ত সিগারেট। বেশ বয়েস হয়েছে, দুনিয়া সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল, অল্পক্ষণের মধ্যেই বোঝা গেল, আয়োজকদের সম্পর্কে সে ভালরকমের অখুশি। স্যুটেড বুটেড কিছু লোকজন দেখলাম ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাহমিনে আর নিকির চারপাশে, কিছু একটা ব্যপারে কনভিন্স করার আপ্রাণ চেষ্টায় রত কিন্তু ইরানিয়ান দুই মেয়ে ওদেরকে একদমই পাত্তা দিচ্ছে না, হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বারে বারেই সরিয়ে দিচ্ছে ওদের! এরই মধ্যে একজন দাড়িওয়ালা ফর্সা মতন লোক এসে আলাপ জুড়ল আমার সাথে, শুরু করেছিল ইংরেজিতে, খানিক বাদেই অবশ্য বাংলায় ফিরে এল। সুমিতাভ ঘোষাল। নিজের পরিচয় দিল একটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ও কবি বলে। তার কাঁধে ঝোলানো শান্তিনিকেতনি ঝোলা আর পরনের পোষাকেও সেই পরিচয়ই যেন লেখা আছে। কানের কাছে ফিসফিস, এ কে জানো? এ হচ্ছে তসলিমা নাসরিনের বয়ফ্রেন্ড! কে কথা বলছে না তাকিয়েই আমিও ফিসফিসিয়ে জানতে চাই, কে? আরে ওই যে সুমিতাভ! ওকে একদম পাত্তা দিও না, ------ একেবারে -------!! -- পরামর্শদাত্রী দীপালী!


বেশ মজাই লাগছিল, পার্টি জমে উঠেছে ভালমতন। একজন স্যুট বুট পরা ভদ্রলোক এগিয়ে এসে নিজের পরিচয় দিলেন, একটি টেলিভিশন চ্যানেল চালান ইনি, আমার নাম পরিচয় জানতে চাইলেন, নিজের ফোন নম্বর দিলেন, আর দিলেন পরবর্তী সাত দিনের জন্যে সিনেমা দেখার পাস! ইনিও উৎসবের একজন উদ্যোক্তা, অবশ্যই যেন সিনেমা দেখতে যাই বারে বারেই বলে দিলেন। ফোন নম্বর দিল সুমিতাভও। আমন্ত্রণ জানাল তাঁদের পত্রিকা অফিসে, একদিন বসে আড্ডা দেবার। ঘড়ির কাঁটা বলছে রাত হয়েছে, বেরো এবার! মাহমুদুল হক স্যারকে বললাম, উঠুন স্যার, বাড়ি যেতে হবে যে! বললনে, খাইয়া লও তাড়াতাড়ি! উনি আবার ভোরবেলাতেই বেরোবেন, ঢাকার ফ্লাইট ধরবেন, সন্ধেবেলায় আবার উড়বেন মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে, সেখানে তাঁর ছবির প্রদর্শনী। জিজ্ঞেস করে জানলাম, তাঁর সময় নেই বলে তিনি ঢাকা থেকেই ছবি এঁকে নিয়ে এসেছিলেন জর্জদের দেবেন বলে, তিনিই বললেন, বাধ্যতামূলক কিছু নয় কিন্তু দুটো করে ছবি এঁকে দেওয়ার কথা!


বাড়ি থেকে ফোন, আমার কত্তা বাড়ি ফিরেছেন। ঘড়ির কাঁটা মাঝরাত ছোঁয় ছোঁয়। একে একে সবাইকে হোটেলে, বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আমাকে নিয়ে গাড়ি ছুটেছে অন্ধকার মধ্যরাত চিরে।। ল্যাম্পপোষ্টের ম্লান হলুদ আলো, জনহীন রাজপথ আর গঙ্গার ঠান্ডা বাতাস বারে বারে বলে দেয়, তাড়াতাড়ি চল, বাড়িতে সে যে একলা আছে...