Sunday, December 14, 2008

আজ ঈদ...

খিদিরপুরের কোরবানির পশুর বাজার এই প্রথম দেখলাম৷ বিদ্যাসাগর সেতুর যে উড়ালপুলটা হেষ্টিংসএ গিয়ে নেমেছে সেই উড়ালপুলের নিচে বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে বাজার৷ দিনেরবেলায় লোকজন খুব একটা থাকে না৷ ব্রীজের তলা আর দুপাশের মাঠমত জায়গাটি জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাজার৷ বেলা যত পড়তে থাকে বাজার তত জমতে থাকে৷ দিনের কাজ সেরে মানুষ আসে কোরবানির পশু কিনতে৷ ঈদের আগে গতকাল শেষ বাজার বলে কাল দুপুর থেকেই বাজারে বেশ ভীড়৷ বেশ কিছু নারীমুখও দেখলাম বাজারে৷ পরনের কাপড় আর পরার ধরন দেখে মনে হল বিহার বা ইউপির গ্রাম থেকে এসেছে৷ পশু আগলে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে মনে হল পশু বিক্রি করতেই আসা৷ কিংবা আরও দূরের কোন গ্রাম থেকে নিজের পোষা প্রাণীটি নিয়ে কলকাতার এই হাটে এসেছে ভাল মূল্য পাওয়া যাবে বলে৷ কোরবানির পশুর হাটে নারী বিক্রেতা৷ বেশ নতুন লাগল৷ হয়ত প্রতিবারেই আসে, আমার চোখে পড়েনি৷


রাস্তায় প্রায় জ্যাম লাগিয়ে দিয়ে কিনে আনা গরু নিয়ে লোকজন হেঁটে যাচ্ছে, এক একটি গরুর সাথে তিন-চারজন করে মানুষ৷ রাস্তার নিয়মকানুন জানে না বলে গরুগুলি মাঝে মাঝেই ধার ছেড়ে চলন্ত গাড়ির ফাঁক গলে রাস্তার মাঝে চলে যাচ্ছে দড়ি ধরে রাখা মানুষটির হাত ছাড়িয়ে৷ যার হাতে দড়ি সে কিছুতেই সামলাতে পারছে না তাগড়া গরুটিকে৷ গরুর পেছনে সেও ছুটছে রাস্তার মাঝ দিয়ে, চলন্ত গাড়ির ফাঁক গলে গলে৷ বাধ্য হয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ছে, চলন্ত বাস থেকে মানুষের খিস্তি উড়ে যাচ্ছে গরু আর রশি ধরে থেকে হঠাত্ হওয়া রাখালের উদ্দেশ্যে৷ ভিড়ে ঠাসা বাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে চিড়ে চ্যাপ্টা হতে হতে আমি দেখছিলাম গরু হাতে মানুষের শোভাযাত্রা৷ পেছনে গায়ের পরে যিনি গা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি সমানে কটুক্তি করে যাচ্ছিলেন গরুখোর মানুষগুলোর উদ্দেশ্যে, মুসলমানদের উদ্দেশ্যে৷ রাস্তার ধারে ধারে লাঠি হাতে দাঁড়ানো পুলিশ, সোমবারের ব্যস্ত রাস্তা আর পরবের আগের দিনকার শেষবেলার ব্যস্ততা সবই যেন বলছে, কাল ঈদ, কোরবানির ঈদ৷


আমি যেখানে থাকি সেখানে ঈদ বলে কিছু বোঝা যায় না৷ ভোরবেলা থেকেই রোজকার মত শুরু হয়েছে পাশের বাড়ির ঝগড়া৷ একতলা বাড়িটির ছাদে নাইটি পরা মেয়েটির মোবাইল কানে ঘুরে বেড়ানো, দোতলার সঞ্জীববাবুর স্ত্রী লেখার চিত্কার তার ছেলের উদ্দেশ্যে, বন্দোপাধ্যায়দের বাড়ির সদ্য জন্মানো শিশুকন্যাটির কান্নার শব্দ সবই আর পাঁচটা দিনের মত৷ ফ্ল্যাটের দরজায় দরজায় একের পর এক কলিংঅবেল, প্রথমে কাগজওয়ালা তারপর দুধওয়ালা তারপর স্যুইপার৷ চলতেই থাকে একের পর এক
... ভোরবেলাকার এই শব্দকল্পে কিছুদিন ধরে শুধু যোগ হয়েছে মিষ্টার বাসুর বাড়ির সিডিতে চলা উচ্চাঙ্গ সগীতের সুর৷ কিন্তু আজ ঈদ৷ সেটা জানান দিতে নতুন শব্দ যোগ হয়, এসএমএসের শব্দ৷ ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা পাঠান শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার৷ গান করেন৷ আমার সাথে আলাপ হয়েছিল দোহার-এর গান শুনতে গিয়ে, সেদিন তিনিও গান করেছিলেন কালিকাপ্রসাদের সাথে৷ ঈদে, বিজয়ায়, দীপাবলীতে একটি করে বার্তা আসে তাঁর কাছ থেকে৷ আজও এসেছে, খুব ভোরে৷ আমি যখন হাল্কা শীতে গুটিসুটি মেরে উঠি উঠি করছিলাম তখনই মেসেজটা আসে৷ এরপর একের পর এক মেসেজ আসে, কেউ এই কলকাতা থেকে আর কেউ বহু বহু দূর থেকে ঈদ মুবারক জানায়৷ না : উঠেই পড়ি৷ আজ ঈদ ...



[বেশ বড় করে কোরবানীর ঈদ নিয়ে লিখব বলে গুরুচন্ডালী-র টইপত্তর বিভাগে লেখাটি শুরু করেছিলাম কিন্তু খানিকটা লেখার পরেই উঠে পড়ে ব্যস্ত হয়ে যাই দৈনন্দিন কাজ-কর্মে। আপাতত অন্য একটা লেখায় ব্যস্ত আছি, সেটি শেষ হলে এর বাকিটুকু লেখার ইচ্ছে...]

Thursday, October 09, 2008

রোজনামচা -০২

লিখি না, লেখা হয় না
-------------------
রমযানের গোটা মাসটাই আমি ঝিমোই। পারতপক্ষে দিনের বেলায় বাইরে কোথাও যাই না। যেটুকু না করলেই নয় কাজও সেটুকুই করি। সন্ধেয় পরপর দু কাপ চা খেয়ে মনে হয়, নাহ, এবার একটু নড়াচড়া করা যাক! তো খানিকটা চাঙ্গা হয়ে নিয়ে আমি ব্যায়ামাগারে যাই। যদিও প্রতিদিনই সকাল থেকেই মনে মনে ঠিক করা থাকে, আজকে আমি কিছুতেই যাব না, কিন্তু সন্ধের পর মনে হয়, যাই, ঘুরেই আসি এবং আমি ঘুরে আসি। ক্লান্তির একটা ভোঁতা অনুভূতি ঘিরে রাখে আমাকে। মাথা কাজ করে না। এক মগ চা নিয়ে এসে টেলিভিশনে বিগ বস চালিয়ে দিয়ে বিছানায় এসে বসি। ধীরে ধীরে চা খাই। চোখ বুজে বুজে বিগ বস দেখি। লিখবো বলে সমস্ত ওয়েব পাতা থেকে নিজেকে ছুটি দিয়ে রেখেছি বেশ কিছুদিন হল কিন্তু লেখা কিছুতেই এগুচ্ছে না। এই এগুচ্ছে না বলাটা নিজের কাছেই বেশ একটা বাহানা বা বিলাসিতা বলে ঠেকে কিন্তু এগুচ্ছে যে না এটা ঘটনা। 
সকালবেলায় বেশ একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠি বলে রাতে ঘুম আসতে দেরী হয়। দেরী করে ঘুমুতে যাওয়াটা যদিও অভ্যেসে দাঁড়িয়েছে কিন্তু এখন রাত প্রায় ভোর হয়ে যায় ঘুম আসতেই। ভদ্রলোকটি বলেন, ঘুম আসছে না এ তো খুব আনন্দের কথা, ওঠো, বসে লেখো! আমি সেটাও পারি না। টেলিফোনের বিল, ইলেকট্রিকে বিলেরা আমার চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়। কবে যেন লাষ্ট ডেট? ওহ, কালকেই তো! মিক্সিটা সারাতে হবে, আদা বাটতে গিয়ে বিনা নোটিশে চুপ করে গেছে জিনিসটা। দরজার তালাটা এখনো ঠিক হল না। মিস্ত্রী ব্যাটা কবে যে আসবে কে জানে!
বাবা তুমি কেমন আছ?
-------------------
বাবার কথা খুব খুব মনে পড়ে। রমযানের পয়লা শুক্কুরবার দুপুরে বাবার ফোন আসে, কেমন আছ এমু? আজকে সবাই বাড়িতে এসেছে, তুমিই শুধু নেই, তোমার কথা খুব মনে পড়ছে। কিছু বলতে পারি না। চোখ ভিজে আসে। শোরগোলের শব্দ শুনতে পাই। ভাইয়ের বাচ্চাদের কলকাকলি ফোনের এপারেও শুনতে পাই। বাবা বলেন, তোমার মা রান্নাঘরে, কাবাব বানাচ্ছে আজ বড়বৌকে সাথে নিয়ে। মন চলে যায় পেছনে, অনেক পেছনে। একসময় মায়ের সাথে এই কাজগুলো আমি করতাম। নালিশ জানান বাবা, বলেন, তোমার জন্মদিনের কেক 'নুন' আমাকে খাওয়ায়নি! নুন, আমার ভাইয়া। বাবাকে বলি, ওকে বলে দেবেন, ওর খবর আমি এসে নেব। ওদিক থেকে ভাইয়া বলে, তুই এলে তবে কেক হবে, নইলে তোর কেক কে কাটবে! বাবা বলেন, পারলে তাড়াতাড়ি বাড়ি এসো! বুজে আসা গলায় বাবাকে জিজ্ঞেস করা হয় না, বাবা তুমি কেমন আছ? 
এবছর জন্মদিনে দুপুর অব্দি বাবা বা মায়ের ফোনে না আসাতে বাবাকে এসএমএস করি, যেমনটি গতবছর বাবা করেছিলেন তাঁর নিজের জন্মদিনে আমার ফোন না পেয়ে, নিড ওয়ান বার্থডে কেক, চানাচুর এন্ড আ পেয়ার অফ হিলশা ফিশ! খানিক বাদেই বাবার ফোন আসে, জানতে পারি ভাইয়ের সদ্যোজাত শিশুপুত্রটি নিমোনিয়ায় আক্রান্ত, হাসপাতালে আছে, অক্সিজেন চলছে, সকলেই হাসপাতালে। বাবা বলেন, ভুলেই গেছিলাম তোমার জন্মদিন! তোমার মা'কে বলছি, রাতে রান্না টান্না করতে। ভাইয়ার উপর হুকুম হয়, কেক নিয়ে আসতে। সেদিন ভাইয়াও ব্যস্ত থাকায় সন্ধেবেলায় কেক আসেনি আর বাবা সেটা ভোলেননি এখনও। নির্ঘুম রাতে বাবাকে খুব মনে পড়ে। 
কেন কে জানে আমি বাবাকেই বেশি ভালবাসি। স্মৃতিতে, ভাবনায় বাবাই বেশি থাকেন। মা'য়ের থেকে বাবা অনেক অনেক বেশি কাছের মানুষ আমার। সুখ-দু:খ-ক্ষোভ-অভিমান -আব্দার সবই বরাবর বাবার কাছে। ছেলেবেলার স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল, দুপুর বেলার সেই চড়ুই পাখির গল্প বলতে বলতে বাবার ঘুমিয়ে পড়া। বাবার সঙ্গে আমিও অফিস যাব বলে রোজকার সেই বায়না। ছুটির দিনে বাবার সাথে গাড়ি করে কখনও তামাবিল, কখনও জাফলং তো কখনও গ্রামের বাড়িতে বেড়ানোর সেই দৃশ্য আজও অমলিন। কত কত বছর পেরিয়ে গেছে কিন্তু এখনও দেখতে পাই ঈদের আগের রাতে বাবার সাথে গিয়ে কিনে আনা লাল -সাদা রঙের হিলজুতো আর ফ্রিল দেওয়া টকটকে লাল ফ্রক। লাল বাবার প্রিয় রং! প্রতিবছরই ঈদে লাল জামা কেনা হয় বলে মায়ের মৃদু অনুযোগ। ঈদ এলে আমি ভীষণ ভীষণ মিস করি আমার সেই লাল জামাগুলো আর হিলজুতোকে।

চাই নতুন ধর্ম
------------
এ'বছর রোযার আগে আমার পতিদেবের সঙ্গে একটু বাক্যবিনিময় হয় রোযা রাখা নিয়ে। রোযা কেন রাখব? আমার যুক্তি যাই হোক না কেন নিমেষেই তিনি সেটা খন্ডন করে দেন। আমার জ্ঞান-গম্যি বড় কম বলে আমি তার সাথে কখনও তর্কে যাই না বিশেষ করে তিনি যদি তরলে থাকেন। তিনিও জানেন, সারা বছর ধম্মো-কম্মের ধারে কাছে আমি না থাকলেও এই একটা মাস রোযা আমি করবই কাজেই তিনিও চুপ করে যান। কিছুদিন আগে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ধর্মে কি আছে? একটা নতুন ধর্ম বানাতে গেলে কী কী লাগে? আকবর একটা ধর্ম প্রচার করেছিলেন না? সেই ধর্মের মূল ফান্ডা কি ছিল? আমার উপরে ফরমান জারী হয়, গুগলাও, লোকজনেরে জিগাও আর আমাকে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও। প্রশ্নগুলো কাওকে করা হয়নি আর এনিয়ে সে'ও পরে আর কথা বাড়ায়নি।

মোকামের সালাম
--------------
খবরের কাগজে বিজ্ঞাপণ দেখে সন্ধেবেলায় কোনমতে রোযাটা খুলে দৌঁড়াই, জ্ঞান মঞ্চের দিকে, 'মোকাম'এর লাইভ প্রোগ্রাম দেখতে। প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার কথা সাড়ে ছ'টায়, দশ মিনিটে ইফতার-চা সেরে বেরুতে বেরুতেই আমার ছ'টা দশ বেজে যায়। হলে পৌঁছুই পৌণে সাতটায়। আগের দিন পয়তাল্লিশ পাউন্ডের বার্বেল নিয়ে ডেড লিফট করতে গিয়ে খট করে লাগে শিরদাঁড়ায়। ফোনে ডাক্তার ফতোয়া দেন, কমপ্লিট রেষ্টএর। গরম সেঁক, ব্যথার ওষুধ সমানে চলছে। আমি ব্যথাকে একরকম অগ্রাহ্য করেই গান শুনতে যাই। পিঠ সোজা করে চেয়ারে বসে থাকি। বেশ খানিকটা হতাশ হই মঞ্চে কালিকাপ্রসাদ'কে দেখতে না পেয়ে। পাশে বসে থাকা আমার ভদ্রলোকটিকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, কালিকাপ্রসাদ এখন আর মোকামে গান করেন না। মঞ্চে গান করে ময়ূখ, মৈনাক। নতুন পুরোনো গান মিলিয়ে বেশ অনেকগুলো গান শোনায় তারা। পুরনো গানগুলো খুব একটা ভাল লাগল না কাল। প্রধান গায়ক কালিকাপ্রসাদের জায়গায় দাঁড়িয়ে গান শোনায় ময়ূখ। জমে না। হাততালি পড়ে। একের পর এক গান গায় ওরা। ওদেরই এক সঙ্গী ভায়োলিন হাতে মাঝে মাঝেই মঞ্চের সামনের দিকে এগিয়ে আসছিলেন আর অসাধারণ ভায়োলিন বাজাচ্ছিলেন তিনি। গান, অন্যান্য বাজনা সব ফিকে লাগে তার ভায়োলিনের কাছে। 

অন্ধকারে হঠাৎ দেখতে পাই সামনের রোয়ের ফাঁকা চেয়ারে এসে এক ভদ্রলোক বসলেন একটি শিশুর হাত ধরে। চেনা চেনা লাগছে না? হ্যাঁ। চিনি তো! কিছুদিনে আগে ওনার গান শুনেছিলাম এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে। 

কালিকাপ্রসাদের সাথে সেদিন ইনি ছিলেন অন্যতম গায়ক। নামটাও মনে পড়ে গেল সাথে সাথে, শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার। মনে থাকার বিশেষ কারণ, ফেব্রুয়ারী মাসের সেই অনুষ্ঠানে উনি একুশে ফেব্রুয়ারী নিয়ে অনেক কিছু বলেছিলেন, তার বাংলাদেশ সফর, সিলেট, ঢাকার একুশে ফেব্রুয়ারীর নানা অনুষ্ঠান, গান নিয়ে সেদিন তিনি ও কালিকাপ্রসাদ অনেক কথা বলেছিলেন, অনেক গান শুনিয়েছিলেন। সেদিন তাঁর গান আর কথা শুনতে শুনতে আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল বারে বারে। আমার মনে হচ্ছিল আমি কলকাতায় নেই, আছি বাংলাদেশেই, ঢাকাতেই। হাজির আছি একুশে ফেব্রুয়ারীর এক অনুষ্ঠানে, শুনছি গান, কবিতা। সেদিন কালিকাপ্রসাদ আর শুভপ্রসাদ দু'জনে মিলে কলকাতার এক আর্ট গ্যালারীর এক ঘরোয়া গানের আসরে হাজির করেছিলেন বাংলাদেশকে। আমার দেশকে। গান শেষে আমি যেচে গিয়ে তাঁর সাথে আলাপ করেছিলাম। কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম ও‌ই অনুষ্ঠানের জন্যে। অন্ধকার হলঘরে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতে গিয়ে আমাকে দেখে চিনতে পারলেন। আমি কথা বললাম গানের বিরতিতে। এই মানুষটাকে আমি চিনি না, জানি না। শুধু একদিন তাঁর গান শুনেছিলাম। তিনি বাংলাদেশী নন তবু তাঁকে আমার দেশের মানুষ বলে মনে হয়েছিল। এক আত্মীয়তা অনুভব করেছিলাম । তাঁকে দেখে কালকে আমার মন ভরে গেল।
... ... ...

আপকো দেখকর তো যমীন ডর জায়েগী, আপ যমীন সে কিউ ডরতি হ্যায়


মাস দুই আগে থেকেই টিকিট কাটা ছিল শিলিগুড়ির। শুভজিতের বোনের বৌভাতে কনেযাত্রী হিসেবে নিমন্ত্রিতের তালিকায় নাম ছিল আমাদের জোড়ে। সেইমত শুভ টিকিট কেটে রেখেছিল আর টাইম টু টাইম রিমাইন্ডারও দিচ্ছিল। যাব বলে কথা দিয়েছিলাম দুজনেই। না যাওয়ার কোন কারণ নেই। দুজনেই বেড়াতে ভালবাসি, ফাঁক পেলেই এদিক ওদিক বেড়িয়ে পড়ি আর এ তো বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে বেড়াতে যাওয়া। উত্তরবঙ্গে আমার আগে যাওয়া হয়নি কাজেই ওটা একটা বাড়তি আকর্ষণ। দু'দিনের প্রোগ্রাম। কিন্তু আমি সুমেরুকে বলেই রেখেছিলাম, দু'দিন পরে আমি সকলের সাথে ফিরছি না! পাহাড়ে চলে যাবো, গ্যাংটক, ভুটান বা সিকিম। যে কয়টা জায়গা দেখা যায়, বেড়ানো যায়, বেড়িয়ে ফিরবো! দিন সাত/আটের আগে ফেরার প্রশ্ন নেই!

বিধি বাম। পিচ্চিদের নাচের প্রোগ্রাম -'নাচ, ধুম মাচা লে' নিয়ে সে এত ব্যস্ত হয়ে পড়লো যে একদিনের ছুটিও ম্যানেজ করা সম্ভব হল না। বিয়েতে সে রাত দশটায় গিয়ে শুধু মুখ দেখিয়ে চলে এসেছে আর বৌভাতে যেতেই পারছে না! আমিও যাব না ধরেই নিয়েছি। আঠেরো তারিখ সকালবেলায় শুভর ফোন, ব্যাগ গুছিয়ে রেডি থাকো, সন্ধে ছ'টায় ট্রেন! সে কী! আমি একলা যাবো কী করে? আমার একলা যাওয়ার কথা শুনে পরমাশ্চর্য শুভ। আরে, একলা কেন যাবে? আমরা যাচ্ছি তো আর সাথে এক ট্রেন ভর্তি লোকও যাবে! দোনোমনা করে ফোন রেখে ওকে বলি, কী করবো বলো তো? আবার ফোন। এবার শুক্লা। আরেক বন্ধু নীলায়ণের স্ত্রী শুক্লা। নীলায়্ণ- শুক্লাও নিমন্ত্রিত। আমাকে কোন কথা বলতে না দিয়ে হড়বড় করে সে জানান দিল ব্যাগ-ফ্যাগ গুছিয়ে রেডি থাকো, না যাওয়ার কোন সীন নেই। আর শোনো, তুমি যাবে না বললে আমি শুভকে বলে দিচ্ছি যে সামরান না গেলে আমিও যাচ্ছি না, এরপর শুভ সামলাবে! আমার কর্তামশাই এবার বললেন, চলেই যাও, অসুবিধেটা কোথায়?

অসুবিধে কিছু নেই শুধু রাতের বেলা ভয়ে ঘুম হবে না এছাড়া আর কোন সমস্যা নেই! সুমেরু সেটা ভাল করেই জানে বলেই জোর দিয়ে কিছু বলছিল না। যাই হোক, আমি জামা কাপড় গুছিয়ে রেডি হলাম তুন্নু'র বৌভাত খেতে শিলিগুড়ি যাওয়ার জন্যে। পরপর কয়েকবার ফোন করে শুভ নিশ্চিত হল আমি যাচ্ছি কিনা, আর জানিয়ে দিল ট্রেনের সময়। ক'টায় কোথায় পৌঁছুতে হবে তাও বিস্তারিত বুঝিয়ে দিল। বিকেল বিকেল রেডি হয়ে ষ্টেশনে পৌঁছে দেখা গেল শুভ তখনো পৌঁছোয়নি, রাস্তায় আছে, খাবার তুলে নিয়ে পৌঁছুচ্ছে। ষ্টেশনের মেন গেটে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই এল তথাগত। তথাও কমন ফ্রেন্ড। জোড়ে নেমন্তন্ন ছিল তারও কিন্তু তথার পুঁচকেকে নিয়ে কিছু একটা ঝামেলা বাধায় তথা একলাই যাত্রী। এখানে তথার একটু পরিচয় দিয়ে নেয়া ভাল। তথাগত পেশায় সাংবাদিক। হারবার্ট-কাঙাল মালসাট- ফ্যাতাড়ু'র স্রষ্টা নবারুণ ভট্টাচার্য-র সুপুত্র ও খ্যতনামা লেখিকা মহাশ্বেতা দেবীর পৌত্র। তুমুল আড্ডাবাজ তথা থাকা মানেই যেকোন আড্ডায় এক আলাদা মাত্রা যোগ হওয়া। ছোট হাফপ্যান্ট ও ও লাল টিশার্ট পরা তথা পিঠে স্যাক, হাতে জলের বোতল ঝুলিয়ে পৌঁছে গেল শুভজিতের আগেই। ছোটখাটো রোগাসোগা চেহারার দেখতে তথার মুখভর্তি দাড়ি আর ঘাড়ের নিচ অব্দি চুল সযতনে বেখেয়ালে বাড়ানো। আর তথা সারাক্ষণ দাড়িতে হাত বুলায়।

কুলি সাথে নিয়ে হাজির শুভ। কুলির মাথায় শুভর ট্রলি ব্যাগ আর হাতের বিশাল কাপড়ের ঝোলা ভর্তি খাবারের প্যাকেট দেখে রিতিমত ভয় পেলাম, অত খাবার, আমরা মানুষ কতজন? শুনলাম, শুভর আত্মীয়-স্বজনেরাও যাচ্ছেন এই ট্রেনেই আর এখানে সকলেরই রাতের খাবার। অচেনা সব মানুষের সাথে যাচ্ছি ভাবতেই একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। শুভ সেটা বুঝতে পারে, বলে, আরে, ওঁরা সব বয়স্ক মানুষ, পাশের কম্পার্টমেন্টে করে যাবেন, আমরা আমাদের মত করে যাব, কোন অসুবিধে হবে না। বয়স্ক আত্মীয়েরা সঙ্গে থাকলে অসুবিধেটা যে আমার থেকে বেশি ওরই হত সেটা বলাই বাহুল্য! শুভর কাঁধে ঝোলানো স্যাকে দেখলাম দু খানা জলের বোতল। আমি নিজে কোন জলের বোতল আনিনি ভেবে সংকোচ হচ্ছিল। কোচ নম্বর ধরে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছুতে দেখা হল শুভর আত্মীয়দের সাথে। কেউ কাকা, কেউ মামা তো কেউ শুভর বাবা'র বন্ধু। সকলেই ষাটের উপরে। ট্রেন আসার আগেই এল ঝড়। প্রচন্ড ঝড়। কালবৈশাখী। প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকা যাবতীয় খালি বোতল, কাগজপত্র তো উড়লই বাতাসের তোড়ে রোগা-পাতলা তথারও উড়ে যাওয়ার যোগাড়!
ইডেনে তখন আপ্রাণ লড়ে যাচ্ছে শাহরুখ খানের নাইট রাইডার্স। মরন-বাঁচন লড়াই। হয়তো জিতেও যেত নাইট রাইডার্স কিন্তু বাঁধ সাধল ও‌ই ঝড়। ওভার কমে গিয়ে রান রেটে হেরে গেল কলকাতা নাইট রাইডার্স। মুহুর্মুহু ফোনে খেলার খোঁজ নিতে থাকা আমরা ক্রমশই মুষড়ে পড়ছিলাম। অবশেষে তুমুল খিস্তি শুরু হল নাইটদের উদ্দেশ্য করে। সেই খিস্তির কাছে আরেকটু হলেই কালবৈশাখী হার মেনে যাচ্ছিল আর কী ! ঝড়-বাতাস সামলে টলমল টলমল করতে করতে নীলায়ণ আর শুক্লা এসে পৌঁছুলো সবার শেষে। শুভজিত আদর্শ মেজবানের মত সকলকে যার যার কম্পার্টমেন্টে-সীটে তুলে দিয়ে এল। ইতিমধ্যে শুভ দুই কার্টন মিনারেল ওয়াটার কিনছে দেখে জানতে চাইলাম, অত জল? তোমার ব্যাগেও তো দু বোতল দেখা যাচ্ছে! কোন জবাব না দিয়ে শুভ পয়সা মেটাল মিনারেল ওয়াটারের। আস্তে করে তথা জানান দিল ব্যাগে কি ওগুলো জল নাকি? ওগুলো তো রেডিমিক্স!

-২-
সে রাতের ট্রেনযাত্রা সত্যিই খুব মজার ছিল। আমি আমার তেনাকে খুব মিস করছিলাম, আর যাই হোক তাকে কলকাতাতেই রেখে দিয়ে আমি তারই বন্ধুদের সাথে বেড়াতে যাচ্ছি আর বেচারা এখানে সকাল থেকে রাত কখনো বা এক সকাল থেকে পরেরদিন রাত অব্দি কাজ করছে, অপরাধবোধ তো হবেই! আমারও হচ্ছিল, বারে বারেই এসএমএস করছিলাম। ফোনও করছিলাম খানিক পরে পরেই। আমার খারাপ লাগছে বুঝতে পেরেই বোধ হয় বলে, বেড়ানো এঞ্জয় কর!

শুক্লার আবার সেই প্রথম রাত্রিকালীন ট্রেনযাত্রা বিধায় সে প্রবল উৎসাহে জানালার বাইরে চোখ রেখে ঠায় বসে। রাতের অন্ধকারে ছোটো কোন খাল দেখা গেলেও ও‌ই দ্যাখ গঙ্গা দেখা যায় বলে মাঝে মাঝেই শুক্লাকে গঙ্গাদর্শন করাচ্ছিল শুভ!  শুক্লা বয়সে সকলের ছোট আর খুব হাসিখুশি এক মেয়ে। সবেতেই সে প্রবল মজা পায় আর মন খুলে হাসে হা হা করে। একবার তো সে বাইরের অন্ধকারে খালকেই গঙ্গা বিশ্বাসও করে ফেলল। শুভ, নীলু আর তথা তাদের রেডিমিক্স উপভোগ করছে, সাথে সিগারেট। ভর সন্ধেতে আলো জ্বলা ট্রেনের কামরায় ন'জনের এক ডিব্বাতে পাঁচজন মানুষের হুল্লোড় চলে ক্রমাগত। দ্রুত হাতবদল হয় সিগারেট এদিক ওদিক দেখে নিয়ে, টিটি আসছে কিনা, অন্য কোন যাত্রী টয়লেটে যাবে বলে এদিকে আসছে কিনা। কারও আসার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ামাত্রই সিগারেট সহ হাত জানালার বাইরে। কেন কে জানে সেদিনের অত হুল্লোড়েও অন্য কোন যাত্রী কোন আপত্তি করেনি বা কোন অভিযোগ করেনি। যা করাই খুব স্বাভাবিক ছিল।

পাশের কম্পার্টমেন্টে শুভর জ্যেঠুর ছেলে শুভ্র ছিল, সে মাঝে মাঝেই উঠে এসে এই কামরার আড্ডায় বসছিল। এই আড্ডা ফেলে কতক্ষণ আর বাবা-কাকাদের সাথে বসে থাকা যায়! রাতে শোওয়ার সময় শুক্লা আর আমাকে বলা হল আপার বার্থে গিয়ে শুতে, আমার সেটাই নিরাপদ বলে বোধ হলেও শুক্লা কিছুতেই উপরে চড়তে রাজী নয়, তার ভয়, সে ঘুমের মধ্যে ঠিক নিচে পড়ে যাবে উপরের বাঙ্ক থেকে! অগত্যা পুরুষেরা সব মিডল আর আপার বার্থে, প্রমীলাবাহিনী লোয়ার বার্থে। কারো সাথেই বিছানা বালিশের কোন বন্দোবস্ত নেই। টুকিটাকি জিনিসপত্র সহ পিঠে ঝোলানো স্যাক রাতের বেলা হয়ে যায় বালিশ। নিজের নিজের বার্থে সকলেই শুয়ে পড়ে সাড়ে বারোটা নাগাদ।

নীলু, শুভ খুব বেশিক্ষণ জেগে থাকার মত অবস্থাতেও ছিল না। ওদের দুজনারই প্রবল নাসিকা গর্জন আসতেও সময় লাগে না। জলতেষ্টা পায় আমার, কিন্তু খাব কী? মিনারেল ওয়াটারের সব কটা বোতল খালি! রেডিমিক্সের পরে আরো মিক্স রেডি করতে গিয়ে এক লিটারের একডজন মিনারেল ওয়াটার খাল্লাস! সীটের তলায় গড়াগড়ি খাচ্ছে সবকটি খালি বোতল। সীটের এক কোনায় বসে ঢুলতে থাকা তথাকে বলি, জলের ব্যবস্থা কর যেভাবেই হোক। কিন্তু তথা কোথা থেকে ব্যবস্থা করবে? জানলার পাশে এসে বসে তাকিয়ে থাকে বাইরের দিকে, অপেক্ষা, ষ্টেশন এলে নেমে গিয়ে খাওয়ার পানি কিনবে। শুক্লা সীটের উপরে উপুড় হয়ে শুয়ে কোলের কাছে জাপটে ধরে রাখে নীলুর ব্যাগ, বলা বাহল্য যে ওটি নীলুর ক্যামেরার ব্যাগ আর মাথা জানলার দিকে তুলে তাকিয়ে থাকে বাইরের দিকে। তথার বাক্যে; উটপাখির মত গলা বাড়িয়ে বাইরের অন্ধকার দেখে শুক্লা । কি দেখে কে জানে। বাইরে প্রবল বৃষ্টি ঝরে পড়তে থাকে অবিরত।

আমি ঘুমানোর চেষ্টা করি। ঘুম না আসায় এপাশ ওপাশ  করি, ওইটুকু সরু সিটে যেটুকু করা যার আরকি। চোখ লেগে আসে। চমকে চমকে উঠি খানিক পরপরই। অজনা ভয়ে চোখের পাতা এক হয় না। জেগে আছে শুক্লাও, জানালার বাইরে চোখ রেখে ঠায় মাথা উঁচিয়ে রেখে জেগে আছে শুক্লা। বলি, ঘাড় ব্যথা করে না তোর? ঘুমো না এবার! ঘুমচোখে হাসে শুক্লা, জানোতো, জীবনে প্রথমবার রাতের ট্রেনে কোথাও যাচ্ছি, দারুণ লাগছে, ঘুমুতে ইচ্ছে করছে না একটুও! অথচ এই শুক্লাই যে কোন জায়গায় যে কোন সময় বসে বসেই দিব্যি ঘুমিয়ে নেয় পাশে বসে থাকা মানুষটির কাঁধে মাথা রেখে। কখনো বা গুটিসুটি মেরে ঠিক একটুখানি শোওয়ার জায়গা বানিয়ে নিয়ে আর পাশে যেই বসে থাকুক না কেন,  তার কাঁধে মাথা রেখে বেখবর ঘুমোয়। পাশে বসে থাকা মানুষটি যে সব সময় নীলুই হয় তা নয়, কোন বন্ধু বা সহযাত্রী যে কেউ হতে পারে সে। আজ জেগে থাকে শুক্লা। জানালার কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে নেমে যেতেই থাকে অঝোর বৃষ্টির ধারা...

-৩-
এক ঘন্টা লেটে নিউ জলপাইগুড়ি ষ্টেশনে ট্রেন যখন পৌঁছুলো তখন বেলা আটটা। ইতিমধ্যে আমাদের মেজবানদের তরফ থেকে বার তিনেক ফোন এসে গেছে ট্রেনের দেরি দেখে। ওরা অপেক্ষা করছেন ষ্টেশনে, আমাদের জন্যে। ট্রেন থেকে নামতেই পরিচিত মুখ দেখলাম, সাড়ে চার ফুট উচ্চতার দীপ। গাঢ় কমলা রঙের টিশার্ট পরা দীপকে দেখে সকলেই একবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করে নিল! দীপ তুন্নু'র দেওর। বিয়েতে দেখা হয়েছিল। দীপের চেহারা মনে থাকার এবং ও‌ই মুখ দেখে একে অন্যের মুখ দেখার আরও কারণ আছে, সেটা পরে বলছি। ষ্টেশন থেকে সদলবলে বেরিয়ে এসে দেখা গেল, বেশ কয়েকখানি গাড়ি পরপর দাঁড়িয়ে আছে, আকারে সেগুলো বিশাল। আটজন লোক সেসব গাড়িতে এনিটাইম বসতে পারে আর সেও আরামসে!  দীপের সাথে আরও কয়েকজন ছিলেন, তারা ঝটপট আমাদের লাগেজপত্র প্রায় ছিনিয়েই নিলেন আমাদের হাত থেকে। এখানেও ট্রেনের মতই ঘটনা ঘটল, বড়রা সব ওদিককার দুটি গাড়িতে গিয়ে উঠলেন আর আমরা পাঁচজনে একটা গাড়িতে। ড্রাইভারের সাথে দীপও উঠল আমাদের গাড়িতে। পেছনে আরও দুটি গাড়ি প্রায় খালি, তাতে দীপের সঙ্গীরা একজন দু'জন করে মালপত্র নিয়ে পেছন পেছন এলো প্রায় একটা কনভয়ের মত করে।
নিউ জলপাইগুড়ি ছাড়িয়ে গাড়ি খানিক এগুতেই দূরে দেখা গেল পাহাড়শ্রেণী। শুভ দেখাল, ও‌ই দ্যাখো, ওখানেই দার্জিলিং, ও‌ই পাহাড়ের মাথায়! আমরা ট্রেনেই ঠিক করেছিলাম, পৌঁছেই গাড়ির বন্দোবস্ত করে বেড়াতে বেরুবো। যদিও বৌভাতে এসেছি কিন্তু সে তো রাতের বেলা। সন্ধের আগে আগে ফিরে এলেই হলো। শিলিগুড়ি এসে শুধুমাত্র বৌভাত খাওয়া আর তুন্নুর শ্বশুরবাড়ির আতিথেয়তা নেওয়ার কোন মানে হয় না। সকলেই একমত। গাড়ি এসে দাঁড়াল সেবক রোডের উপরে একটি হোটেলের সামনে। ধারণা ছিল কোন বাড়িতে উঠব তাই হোটেলের সামনে দাঁড়াতে একটু অবাক হলেও চুপ করেই থাকলাম। ব্যস্ত রাস্তা, দু'পাশে সারসার দোকান, হোটেল, শপিং কমপ্লেক্স। আমাদেরকে যে হোটেলের ভেতরে দীপ নিয়ে ঢুকল তার নাম হোটেল রাজেশ। দীপ বুদ্ধিমান ছেলে, আঙ্কেলদের সে এই হোটেলে রাখার ব্যবস্থাই করেনি, তাদের জন্যে পাশের গেষ্ট হাউস! তিনখানি ডবল বেড এসি রুম, শুভ বলল, রুম পছন্দ করে নাও, কে কোনটায় থাকবে। রুম নম্বর ৭০১, ৮০১ আর ৯০১। এক সারিতে তিনটি ঘর আর তাদের নম্বর এরকম! মাঝের রুমটি অর্থাৎ ৮০১এ আমি ঢুকলাম, ৯০১এ ঢুকল শুভ আর তথা আর ৭০১এ নীলু-শুক্লা। বেশ বড়সড় ঘর, ওয়াল টু ওয়াল পরিস্কার কার্পেট পাতা। রুমে ঢুকেই মনে হলো, আগে ঘুমুবো! সারারাত জেগে থাকার ক্লান্তি মাথা চেপে বসে আছে প্রবল যন্ত্রণার রূপ নিয়ে। ঘুম ছাড়া এখন আর কিচ্ছু চাই না।

রুমে ঢোকার আগেই দীপ বলল, গাড়ি রইল তোমাদের কাছে দুটো, তোমরা বেড়াতে চাইলে বেড়িয়ে আসতে পারো, সন্ধের আগে ফিরে এলেই হবে। এ যেন না গাছে না উঠেই এক কাঁদি! আরে আমরাও তো তাই চাইছিলাম! তথা বলল, ঝটপট ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে নাও সব্বাই, বেরুবো। দীপ হোটেলের ম্যানেজারকে ডেকে এনে ব্যবস্থা করে দিয়ে গেল, যার যখন যা চাই, সব যেন চাহিবামাত্রই হাজির হয়! শুক্লা বলল সেও ঘুমোতে চায় খানিক, ওকে সময় দেওয়া হল আধঘন্টা, বিশ্রাম নিয়ে রেডি হয়ে আসার জন্যে। শুভদের রুম ঠিক হল কমন প্লেস হিসেবে। ব্রেকফাষ্টের জন্যে ও‌ই ৯০১এই আসবে সবাই। দুপুরে লাঞ্চের ব্যবস্থাও দীপ করে রেখেছে, কয়েকটি হোটেলের নাম করে বলল, সব জায়গায় বলা আছে, লাঞ্চ থাকবে, শুধু গিয়ে খেয়ে আসবে আর যদি পাহাড়ে যাও তো সেখানেও ব্যবস্থা আছে। আমরা সত্যিই চমৎকৃত।

বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা ওয়েদার। এসি চালানোর কোন প্রয়োজনই নেই।ংহুমোনোর চিন্তা বাদ দিয়ে বাথরুমে গিজার আছে কাজেই গরম জলে স্নান করে রেডি হয়ে শুভদের রুমে গিয়ে দেখা গেল শুক্লা একটা বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছে। স্নান করে তার মাঝপিঠ পর্যন্ত লম্বা চুল খুলে দিয়েছে শুভ। নীলু তখনও তার নিজের রুমে আর তথা খবরের কাগজ টাগজ নিয়ে বাথরুমে ঢুকেছে। টিভির রিমোট শুক্লার হাতে, সে মন দিয়ে টম এন্ড জেরি দেখছে। বাইরে ততক্ষণে আবার ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কোনদিকে যাওয়া হবে সেটা তখনও ঠিক হয়নি যদিও তথা বলেছে মঙপঙ যাবে। টেলিফোনে সুমেরু আমাকে মঙপঙ শুনেই বলল, গরম কাপড় সাথে আছে কি? যদি না থাকে তবে যে বেডশিটটা আছে সেটা অবশ্যই সাথে নিয়ে নেবে, ওটাই চাদরের কাজ করবে! আগ্রহভরে শুধাই, ঠান্ডা হবে ওখানে? বলল, দিনের বেলা তো ও‌ই একটা চাদরেই হয়ে যাবে! ভাবি, ভাগ্যিস একটা বেডশিট ছিল সাথে।

দু'প্রস্থ রং চা সহযোগে ভরপেট ব্রেকফাষ্ট খেয়ে আমরা যখন বাইরের দিকে এগোই বেলা তখন দশটা পার। তথার হাতে দেখা গেল রঙীন ফুলছাপ ছাতা। গাড়িবারান্দায় গিয়ে দেখা গেল যাকে আমরা ঝিরঝিরে বৃষ্টি ভাবছিলাম সে মোটেই ঝিরখিরে বৃষ্টি নয়, বেশ তোড়েই পড়ছে সে। সকলেই জিনস আর টিশার্ট পরে আছে, তথা বলল, জিনসগুলোকে ভেজানোর কোন মানে হয় না, শর্টস পরে নেওয়া বেটার! শুক্লা তার জিনসটাকে মুড়ে নিয়ে থ্রী কোয়ার্টার করে নিল, আমি রুমে গিয়ে চেঞ্জ করে থ্রী কোয়ার্টার পরে এলাম আর নীলু, তথা আর শুভ সকলেই দেখলাম বেশ ফুলছাপ শর্টস পরে এল। সক্কলকে দেখে টেখে নিয়ে নীলু মন্তব্য করল, পাহাড়ে যাচ্ছি বলে তো মনে হচ্ছে না, বরং বীচে যাচ্ছি মনে হচ্ছে! হাওয়াই চটি পরা আমরা সকলে বৃষ্টি মাথায় করে দীপদের নিজস্ব গাড়ি স্করপিওতে গিয়ে উঠলাম।

-৪-
বৃষ্টি মাথায় করে আমরা রওয়ানা দিয়েছিলাম হিলকার্ট রোড ধরে, দার্জিলিংএর পথে। কোথায় যাওয়া হবে কোন ঠিক-ঠিকানা নেই যদিও, তবু ও‌ই রাস্তা ধরে এগুনো হচ্ছিল, কোথাও একটা তো যাওয়া হবেই! পাহাড়ের রাস্তায় খানিকটা উঠতেই দেখা গেল রাস্তার পাশের পাশের জঙ্গলের গাছ ভেঙে পড়েছে, রাস্তা বন্ধ, আর যাওয়া যাবে না। ঝিরঝিরে বৃষ্টি মাথায় করে নেমে পড়লাম সব রাস্তায়। খানিক হাঁটাই যাক! অন্য রাস্তা ধরে কার্শিয়াং যাওয়া সাব্যস্ত করে আমরা আবার গাড়িতে।

গাড়ি ঘুরিয়ে আমরা আবার অন্যপথে। সময় কম। বেলা প্রায় বারোটা বাজে, বিকেলের মধ্যেই ফিরতে হবে, এর মধ্যে যেটুকু দেখে নেওয়া যায়। বেরুনোর আগেই বলে নিয়েছিলাম মোমো খাব। অন্য কোন লাঞ্চ নয়। শুধু মোমো। নেপালীদের তৈরি, নেপালী ধাবায় বসে মোমো খাব। ড্রাইভার জানাল, পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে প্রচুর ধাবা পাওয়া যাবে, চিন্তার কিছু নেই। আমাদের গাড়ি চলল, কার্শিয়াংএর পথে। কিন্তু বিধি বাম। কার্শিয়াংএ একটা গন্ডগোল চলছিল সেদিন। অনেকদিন ধরেই চলছিল, কিন্তু সেদিন একটু বাড়াবাড়ি রকমেরই হয়েছিল বলে খবর।পাহাড়ে অবশ্য অনেক আগে থেকেই রাজনৈতীক ডামাডোল চলছে পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবীতে। কার্শিয়াং যখন অর্ধেক দূরত্বে, একটা মোড়ে ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে বলল, আর যাওয়া যাবে না, বাড়ি থেকে বারণ করে দিয়েছে কার্শিয়াং যেন না যায়! গেলে আটকে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল! আমরা তবুও ড্রাইভারকে অনুরোধ জানালাম, আমাদের প্রাণটি হাতে নিয়ে তুমি বাবা এই আট হাজার ফিট তুলে এনেছ, আর খানিকটাও নাহয় চল! কিন্তু সে মুখে কিছু না বলে গাড়ি থামিয়ে দিল এক ধাবার সামনে, বলল, আপনারা মোমো খেয়ে নিন!

পাহাড়ে চড়ার অভিজ্ঞতা যার নেই সে কল্পনাও করতে পারবে না সে যে কি জিনিস! চুলের কাঁটার মত বাঁক ঘুরে সরু রাস্তা দিয়ে গাড়ি চড়ে যায় উপরে, আরও উপরে। কখনও একপাশে তো কখনও দু পাশেই হাজার হাজার ফুট খাদ! গাড়ি যদি পড়ে তো মানুষ তো কোন ছার গাড়ির টুকরো টাকরাও খুঁজে পাওয়া যাবে না! ড্রাইভারের মুখে শুনলাম, এখানে যদি কোন গাড়ি খাদে পড়ে যায় তাহলে প্রথম যে গাড়ি বা মানুষের চোখে সেটি পড়ে তারা এসে রাস্তার ধারে লাগিয়ে রাখা কালো বোর্ডে গাড়ির নাম, নম্বর, ও গাড়ির আরোহীদের নাম লাল চক দিয়ে লিখে রেখে যায়।! সমতল ছেড়ে গাড়ি যখন পাহাড়ের দিকে এগুচ্ছে তখন দেখলাম ফলকে লেখা আছে, ইটস বেটার টু বি লেট নট টু বি মিষ্টার লেট! বুকের ধুকপুকুনি তখনই বেড়ে গেসল! শরীরের হাড়-মাংস-রক্ত ততক্ষণে অলরেডি জমে বরফ তায় এই সব গল্প! ড্রাইভারকে প্রায় চেঁচিয়েই বলি, মন দিয়ে গাড়ি চালাও, কথা বলতে হবে না! চোখ বন্ধ করে দুই হাতে শক্ত করে পাশে বসা মানুষটিকে ধরে শক্ত হয়ে বসে থেকে শুধু প্রভুর নাম জপ করি, এবারে বেঁচে ফিরে যেতে পারলে আর কখনও পাহাড়ে আসার নাম করব না! শুক্লা মাঝে মাঝেই চেঁচিয়ে উঠছিল ভয়ে আর সে নিয়ে প্রবল হাসাহাসি করছিল গাড়িতে বসা অন্যরা। চোখ বন্ধ করে রাখতেও ভয় পাই, জোর করে চোখ খুলে রাখি, গাড়ি যদি পড়ে তবে অন্তত যেন কলমাটা পড়তে পাই। চোখ মুদে থাকলে তো জানতেই পারব না যে গাড়ি পড়ছে! সবাই রাস্তার উপর হাঁটাহাটি করছে, রাস্তার ধারে গিয়ে খাদ দেখছে, আমি গাড়ির পাশে গাড়িকে শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে ধাতস্ত হওয়ার চেষ্টা করছি। পা দুটো থরথর কাঁপছে! শুভ, তথা এসে হাত ধরে টানাটানি করছে, খাদের পাশে দাঁড়িয়ে নিচের দৃশ্য দেখার জন্য। সে নাকি অপূর্ব! অনন্য সাধারণ! কিন্তু আমার পা কিছুতেই রাস্তার ধারে যায় না। চেষ্টা করেও যেতে পারি না। এমনিতেই আমার উচ্চতায় ভয়। চারতলা বাড়ির ছাদে থেকে আমি নিচের দিকে তাকাতে পারি না, মনে হয় পড়ে যাব! তথা বুঝতে পারে, বলে ছেড়ে দাও ওকে, ওর ভয় আছে হাইটে! শুভ তবুও মশকরা করে যায় সমানে। এমনকি শুক্লাকেও দেখা গেল ভয়-ফয় দূরে সরিয়ে রেখে রাস্তার ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে! রাস্তার একপাশে কিছু ষ্টোনচিপস জড় করা ছিল, আমি গিয়ে সেটার উপর বসি। ওরা ছবি তোলে। ছবি তোলার আমিও চেষ্টা করি কিন্তু সে রাস্তার এপাশ থেকে, পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাড়িয়ে। তাতে করে রাস্তার ধারের রেলিংএর ছবিই ওঠে। নিচের পাহাড়, উপত্যকা, গাছপালা, পাহাড়ের গায়ে গায়ে চায়ের বাগান আর খাদের ছবি ওঠে না।

ধাবায় ঢুকে নেপালী হাতে রান্না করা মোমো আর পাহাড়ী ছাগলের প্রায় আধসেদ্ধ ঝাল ঝাল মাংস ভরপেট খেয়ে ফেরার পথ। মোমোর সাথে ওরা এক অসাধারণ সস দেয় খেতে। সস বলতে, শুকনো লাল লংকা আধবাটা করে নিয়ে ভিনিগার দিয়ে হালকা করে শুধু আগুনের উপর বসিয়ে নিয়ে নেড়ে-চেড়ে নেওয়া। গোটা গোটা লংকার দানা আর টকটকে লাল রং দেখলেই জিভে জল এসে যায়। আর সে কী দুর্দান্ত ঝাল সেই সস! আমার সঙ্গীরা সব শুয়োরের মাংসের মোমো খেতে চাইছিলেন কিন্তু সে ফুরিয়ে গেছে শুনে আমি যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। অন্তত শুয়োরটা আমার পোষাবে না। খেলাম চিকেন মোমো। আহা! সে কি স্বর্গীয় স্বাদ! নামার সময় আর অতটা ভয় লাগল না। কেন কে জানে। সন্ধেবেলা বৌভাত আর তারপরে রাত ভোর হওয়া অবদি শুভ আর তথার অত্যাচার। কাউকে ঘুমোতে যেতে দেবে না। সবাইকে জেগে থেকে আড্ডা দিতে হবে আর তরল গিলতে হবে। গিলতেই হবে! শুক্লা কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়েই পড়ল। তিনটে অবদি আমিও কোনমতে বসে থকলাম। শেষে অনেক অনুরোধ উপরোধ করে ঘুমোতে যাব বলে রাজী করানো গেল। সকাল ছ'টায় গাড়ি আসবে, আমাদেরকে মিরিক নিয়ে যাওয়ার জন্যে।

মোবাইল ফোনের উপুর্যপোরি ঘন্টায় ঘুম যখন ভাঙল, বেলা তখন সাড়ে ন'টা। শুভজিতের নতুন বোন'জামাই অনির্বাণ এসে ডোরবেল বাজানোতে তার ঘুম ভেঙেছে আর সে সকলকে ফোন করে ঘুম ভাঙিয়েছে! ঘটনা হল, সাড়ে ছ'টায় গাড়ি নিয়ে ড্রাইভার এসে হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে শেষমেষ অনির্বাণকে গিয়ে ডেকে এনেছে ঘটনা কি দেখার জন্যে! সারা ঘরময় ছড়ানো বোতলেরা গড়াগড়ি করছে দেখে অনির্বাণ আর ঘরে ঢোকেনি, বাইরে থেকেই জানিয়ে দিল গাড়ি অপেক্ষা করছে, আপনারা রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ুন। সন্ধে সাতটায় ট্রেন, কাজেই পাঁচটার মধ্যে হোটেলে ফিরতে হবেই!

যে গাড়িটির সামনে এসে দাড়ালাম সেটিও একটি স্করপিও। তবে কালকের গাড়িটি নয়। ড্রাইভারও দেখলাম নতুন। এগিয়ে এসে সবাইকে নত হয়ে অভিবাদন জানিয়ে নিজের পরিচয় দিল মুহাম্মদ রফিক বলে। বলল, তাড়াতাড়ি চলুন, আপনারা এমনিতেই দেরি করে দিয়েছেন! হিন্দিতে কথা বলছিল, জিজ্ঞেস করে জানলাম, শিলিগুড়িতেই জন্ম, বড় হওয়া। তবে আদিপুরুষেরা ইউপি থেকে এসেছিলেন। সামনের সিটে তথা আর নীলু গিয়ে বসল, মাঝের সিটে প্রথমে শুভ, মাঝে আমি আর একপাশে শুক্লা। বলা বাহুল্য আমি ইচ্ছে করেই মাঝখানে গিয়ে বসলাম। শুভ বলল, গাড়ি যদি পড়ে তো তুমি কি মাঝখানে বসে বেঁচে যাবে নাকি? কান না দিয়ে চুপ করে বসি আর মনে মনে সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করি। টুকটাক কথা বলছে সবাই। বেশিরভাগই পাহাড়ের কথা। তথা দার্জিলিং সেন্ট পলসের ছাত্র। শুভ শিলিগুড়ি ডন বস্কো'র। কাজেই ওদের কাছে অফুরন্ত গল্প। আমাদের আজকের ড্রাইভারটি চুপচাপ বসে শুধু গাড়ি চালায় না কালকের ড্রাইভারের মত। সে বেশ কথা বলে সকলের সাথে। গাড়ি শিলিগুড়ি ছাড়ানোর আগে একটা ট্র্যাফিকে দাঁড়ানোতে আমি দেখলাম কয়েকজন হকার মাথার ঝাঁকায় করে লিচু বিক্রি করেছে। সবুজ লালে মেশানো লিচু। আমার তখনও এই মরশুমের লিচু খাওয়া হয়নি বিধায় বায়না ধরলাম লিচু খাব বলে! শুভ এক ধমক দিল, এই মেয়েটা খালি খাই খাই করে, কালও মোমো খাব মোমো খাব করে পাগলা বানিয়ে দিয়েছে! চুপ করে বস! খানিক বাদেই তো চুপ করে যাব আমি, বলে ব্যাজার মুখে চুপই করে গেলাম! ভাল ছেলে নীলু লিচুওয়ালাকে ডেকে লিচু কিনল আর আমি মন দিয়ে বসে লিচু খেতে লাগলাম।
গাড়ি আবার পাহাড়ের দিকে। আর আজকের রাস্তা কালকের থেকেও ভয়ংকর! আমাদের ড্রাইভারটি অদ্ভুত। সে বাঁকের মুখেও গাড়ির হর্ন বাজায় না। পাহাড়ের গায়ের ছায়া দেখে নাকি বুঝতে পারে, ওপর থেকে কোন গাড়ি নেমে আসছে কিনা! হাত পা ঠান্ডা হতে শুরু করেছিল ওর এই হর্ণ না বাজানো দেখেই। গাড়িও প্রচন্ড স্পীডে চালায়, বলে আমি রোজ এই রাস্তায় পাহাড়ে উঠি আর নামি, প্রাণের ভয় আমারও আছে, একটা ছেলে আছে আমার, মরতে আমিও চাই না। কাজেই আপনারা ভয় পাবেন না। শুক্লা একটু বেশিই চেঁচামেচি করছিল ভয়েতে তাই ও‌ই ভাষণ মুহাম্মদ রফিকের। খানিকটা ওঠার পরেই পুরুষেরা গাড়ি থামাতে বললেন, তারা ছোট প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে যাবেন! রফিক গাড়ি দাঁড় করাল একটা সাইড ধরে, পুরুষেরা আড়ালে চলে গেলেন। আমি আর শুক্লা গাড়িতে বসে পাশের খাদ আর দূরের তরাই দেখছি, পাহাড়ের গায়ে দূরে দূরে ছোট ছোট গ্রাম দেখা যায়। থাকে থাকে চায়ের গাছেরা উঠে গেছে পাহাড় বেয়ে। এখানে চা বাগানে কোন শেড ট্রি নেই। রফিক বলল, রোদ তো লাগে না খুব একটা। ঠান্ডা জায়গা, শেড ট্রি'র দরকারই নেই। সমতলের বাগানগুলোতে শেড ট্রি আছে, আসার পথে নিজেই দেখে এসেছি। মন দিয়ে দেখছিলাম আর শুক্লার সাথে কথা বলছিলাম। আমাদের দু'জনকেই চমকে দিয়ে মুহাম্মদ রফিক আমার দিকে তাকিয়ে বল; ওঠে, আপ মুসলিম হ্যায় না? আপনি মুসলিম না? শুক্লা সাথে সাথেই জানতে চায়, তুমি কি করে বুঝলে? রফিকের ত্বরিত জবাব, মুসলমানকা চেহরে পে এক আলগই হি রওনক হোতি হ্যায়! ইনার চেহারা দেখলেই বোঝা যায় যে উনি মুসলিম! আমি  কথা বাড়াই না আর। শুক্লাও চুপ করে গেছে। আমার পাশে বসা অনিন্দ্যসুন্দরী শুক্লাকে দেখার পরও কেউ আমার চেহারায় রওনক দেখতে পায় আর মুসলিম বলে শনাক্ত করে! চুপ তো হয়ে যাওয়ারই কথা।

গাড়ি এগোয়। এক অদ্ভুত নিয়ম পাহাড়ে। এখানে কেউ অকারণ হর্ণ বাজায় না। কেউ কাউকে ওভারটেক করার চেষ্টাও করে না। নেমে আসা গাড়িটিকে পাশ দেয় নিজে খাদের ধারে চলে গিয়ে। যে গাড়িটি উঠছে সে খাডের ধারে চলে যায় আর যে নামছে সে পাহাড়ের গা ঘেঁষে নামে। রফিক দুর্দান্ত গাড়ি চালায়। সে জানাল, গতকাল সে নাকি একটি হর্ণ নষ্ট গাড়ি নিয়ে পাহাড় থেকে নেমেছে। বলল, হর্ণ থাকলেই অসুবিধে। না থাকলে নিশ্চিন্তে গাড়ি চালানো যায়। আমি শক্ত হয়ে বসে থাকি সামনের সিটটিকে দুহাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। বাঁকের পর বাঁক পেরিয়ে সরু রাস্তা দিয়ে গাড়ি উপরে ওঠে। শুভ মাঝে মাঝে আমাকে বলে, সিটটা ছিঁড়ে যাবে যে! শুক্লা একবার চেঁচিয়ে উঠে ধমক খেয়েছে রফিকের কাছে, রফিক বলেছে, আপনারা এরকম করলে কিন্তু অ্যাক্সিডেন্ট হবেই! হাজার পাঁচেক ফিট উপরে ওঠার পরে থেকেই পাহাড়ী গ্রাম দেখা যেতে লাগল। ছোট ছোট গ্রাম। পাহাড়ের ঢালে ঢালে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা পাহাড়ী ছাগলের মত রাস্তা ছেঁড়ে পাহাড় বেয়ে উপরে উঠছে। স্কুলযাত্রী স্মেয়েরা সালোয়ার কামিজ আর ওড়নার ইউনিফর্মে দল বেঁধে পথ হাঁটছে। মহিলারা মাথায় কুড়িয়ে আনা ডালের আঁটি নিয়ে খাদের ধার দিয়ে পথ চলছেন। নেপালী চেহারা, নেপালী পোষাক। বাচ্চাগুলো খেলছে রাস্তার ধারে ধারে। রেলিংএ বসে গল্প করছে জোড়ায় জোড়ায় পাহাড়ী যুবক-যুবতী। কোথাও বা বয়স্ক কয়েকজন মানুষ বসে আড্ডা দিচ্ছেন রাস্তার ধারের একটুখানি শেডের তলায় বসে। ওদের দেখে, এতসব দেখেও আমি সাহস সঞ্চয় করতে পারলাম না, একটু রিল্যাক্সড হয়ে বসে দুপাশের দৃশ্য দেখার!


মিরিক যখন আর হাজার খানেক ফুট উপরে, তখন রফিক গাড়ি হঠাৎ করেই দাঁড় করালো একটা জায়গায়। দুম করে খাদের ধারে নিয়ে গিয়ে আচমকা ব্রেক।
মাগোওও বলে শুক্লার কান ফাটানো চীৎকারে রফিক ক্ষেপেই গেল এবার। কি হল? কি হল? আপনি চেঁচালেন কেন ওরকম করে? নীলু বোঝানোর চেষ্টা করে রফিককে, প্রথমবার পাহাড়ে চড়া তো, ভয় পেয়ে গেছে! শুক্লা ভেবেছিল রফিক বোধ হয় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে গাড়ির। সকলেই একে একে নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। রফিক জানাল, এটা একটা সানসেট পয়েন্ট। এখান থেকে সবচেয়ে ভাল দেখা যায় সূর্যাস্ত আর সূর্যোদয়। খানিক নেমে ঘুরে ফিরে দেখে নিন সবাই। যে বাঁকটি ঘুরে গাড়িটি এসে দাঁড়াল, সেখানে একটা জায়গা বানানো আছে। কয়েক থাক সিঁড়ি বেয়ে একটা খোলা হলমত জায়গা। মাথার উপর ছাদ, চারপাশ খোলা। সকলেই একে একে গিয়ে উঠে পড়লে সেখানে। আমি কিছুতেই খাদের ধারের ও‌ই পয়েন্টে যাব না। দাঁড়িয়ে থাকি গাড়ির গা ঘেঁষেই রাস্তার উল্টোদিকে গিয়ে ছবি তুলি, যেটুকু আসে আর কি পাহাড়ের ধার থেকে। চারপাশের দৃশ্য দেখে বাক্যহারা আমি। বর্ণনা করে বোঝাবো সে সাধ্য আমার নেই। রফিক এগিয়ে এসে বলে, এখানে এসেও আপনি দেখবেন না? চলুন, আমি নিয়ে যাচ্ছি, দেখুন, কিছু হবে না। হাত ধরে রফিক নিয়ে যায় সেই সানসেট পয়েন্টে। সিঁড়ি বেয়ে কাঁপা কাঁপা পায়ে উঠে যাই সেখানে। রফিক দেখায়, ও‌ই দেখুন, লোকে এর ছাদে উঠে বসে আছে! তথা আর শুভ'র কানে কানে শুক্লা ততক্ষণে সেই 'রওনক'এর কথা বলে দিয়েছে আর তারপর আমাকে হাত ধরে ওখেন নিয়ে যাওয়া দেখে সকলেই নতুন খোরাক পায়। আমি পাত্তা দিই না। যতদূর চোখ যায় কালচে সবুজে ঢাকা পাহাড়। দূরে দূরে পাহাড়ি গ্রাম সব পাহাড়ের ঢালে ঢালে। নাম না জানা সব লম্বা লম্বা গাছেরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কালচে সবুজ তাদের রং। বিশাল বিশাল সব চারপেয়ে খাম্বা বিছিয়ে আছে পাহাড়ের গায়ে গায়ে, বিদ্যুতের তার বেয়ে আধুনিকতার আলো এসেছে পাহাড়ে। কবে কে নিয়ে এসেছে এসব? কে এভাবে পাহাড় কেটে কেটে রাস্তা বানিয়েছে?

কত প্রাণ হয়তো গেছে এই রাস্তা বানাতে গিয়ে, পাহাড়ের গায়ে ও‌ই অতিকায় সব খাম্বা বসাতে গিয়ে। রাস্তার ধারে ধারে সব মিশনারী স্কুল। সাদা শার্ট আর রংবাহারী স্কার্ট পরা পাহাড়ি মেয়েরা কলকাকলি করে স্কুলের সামনে। তাদের মাখনের মত মসৃণ আর ফর্সা রঙে জেল্লা বাড়ায় রঙীন স্কার্ট। আমি অবাক বিস্ময়ে শুধু দেখি। কে কী বলে যায় কানে আসে না। মাঝে মাঝে কানে আছড়ে পড়ে সমবেত হাসির শব্দ।

রফিক বলে, চলুন এবার, দেরী হয়ে যাচ্ছে। এবার শুক্লা সামনে গিয়ে বসে নীলুর কাছে, তথা পেছনে আসে শুক্লার জায়গায় আর আমি আগের মতই মাঝখানে। ভয়টা যেন একটু একটু করে কমছে আমার। এখান থেকে রাস্তা মাঝে মাঝেই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে যাচ্ছে। আবার হঠাৎ করেই দেখা যায়, পাহাড়ের একেবারে গায়ে এক বাঁক, বাঁক ঘুরে রাস্তা আর এপাশে গভীর খাদ! রোদ নেই একেবারেই। ছায়া ছায়া এক সবুজ ঠান্ডা এখানে। এই দুপুরবেলাতে শীত না লাগলেও বোঝা যায়, খানিক বাদেই নামবে হিম ঠান্ডা। গাছেদের রং দেখে মনে হল, এখানে কখনো‌ই হয়তো রোদ আসে না! দেবদারু আর পাইনের মাথা উঁচু বনের মাঝখান দিয়ে রাস্তা। বুঝতে পারি, পৌঁছে গেছি মিরিক। গাড়ি যেন হঠাৎ করেই এক শহরে ঢুকে গেল, পাহাড়ী শহর। রঙীন সব ঘর-বাড়ি। রঙীন ঝলমলে পোষাক পরা সব পাহাড়ী মানুষ। সকলের পরনেই সোয়েটার! নানা রঙের, নানা ডিজাইনের। দোকান-পাটও দেখা গেল। শহুরে সব জিনিসের নাম লেখা সব সাইনবোর্ড লাগানো দোকানে দোকানে।

শুনেছিলাম, মিরিকে নাকি লেক আছে একটা। পাহাড়ের উপর প্রাকৃতিক লেক। শুনেই কেমন যেন উত্তজনা হয়। শুনলাম, সেখানেই যাব। রফিক বলল, ওখানে পার্ক হোটেল আছে, সেখানে আমাদের পান-ভোজনের কথা আগে থেকেই বলে রেখেছে শুভ'র ভগ্নিপতি অনির্বাণ। রফিকের উপর হুকুম, ওখানেই যেন আমাদের নিয়ে যায়। গাড়ি গিয়ে যেখানে থামল, সেখানে যেন কোন মেলা বসেছে। প্রচুর মানুষ দেখলাম, যাদেরকে দেখলেই বোঝা যায়, শহর থেকে এসেছে, বেড়াতে। সৌখিন সোয়েটার পরে সব ফুলবাবু-বিবিটি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে লেকের পাশের বিশাল জায়গা জুড়ে। পার্কিং খুঁজে নিয়ে রফিক পরে আসছে, আমাদেরকে বলল, এগোতে। আমি আর শুক্লা ছাড়া সকলেরই চেনা জায়গা কাজেই ওরা এগুলো, আমরাও পেছন পেছন। সত্যিকারের মেলাই বসেছে। তবে থাকে নাকি বছরভর। কারণ এখানে ট্যুরিষ্টের অভাব কখনোই হয় না। যাওয়ার পথে এক ঝলক দেখে আমার মনে হল, এ যেন ডিসেম্বরের ওয়েলিংটনের ভুটানীদের শীতবস্ত্রের অস্থায়ী সেই বাজার। আছে নানারকম গিফট আইটেমের দোকান, নানা রকম সফট টয় শোভা বাড়াচ্ছে এই বাজারের। ধীর পায়ে আমরা লেকের ধারে পৌঁছুনোর আগেই রফিক এসে ধরে ফেলে আমাদের। মেলা ছাড়িয়ে আমরা লেকের ধারে গিয়ে পৌঁছুই। গাঢ় সবুজ দেখায় জলকে লেকের পাশের কালচে সবুজ পাইনবনের জন্যে। তবে বাঙালী যেখানেই যায় তার চিহ্ন রেখে আসে -কথাটা সত্যি প্রমাণ করল লেকের জলে ভাসমান অজস্র মিনারেল ওয়াটারের খালি বো্তল, চিপসের খালি প্যাকেট ও আরও নানা রকম বর্জ্যে। লেকের একধারের জলে গাঢ় শ্যাওলা আর তাতে অজস্র নোংরা আবর্জনা ভেসে বেড়াচ্ছে। হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের উপর প্রাকৃতিক লেক দেখার সমস্ত উত্তেজনা শেষ! মিরিকের 'দ্য পার্ক'এর দিকে এগুলাম আমরা সকলে।

অসাধারণ রূপসী এক নেপালী মেয়ে দরজা থেকে এগিয়ে এল আমাদের দেখে। পরনে তার ছাপা সুতীর থ্রী কোয়ার্টার পা'জামা আর খাটো কুর্তার উপরে ফুলহাতা সোয়েটার। পায়ে সাধারণ একজোড়া চটি। তার মাখনরঙা ত্বক, কোমর ছাড়ানো একঢাল চকচকে কালো চুল আর মুখে ধরে রাখা হাসিটি দেখে সকলেরই যে নয়ণ তৃপ্ত হল সে'কথা বলার দরকার পড়ে না। মাঝারি আকারের একটা ঘরের একপাশে কাউন্টার, যাতে নানা রকম চকোলেট আর উপহার সামগ্রী সাজানো। গোটাকয়েক প্লাষ্টিকের চেয়ার টেবিল ঘর জুড়ে। আমরা ঘরের ভেতরে না বসে বারান্দায় বসলাম। একতলা সমান উঁচু এই বারান্দায় আছে কয়েকটা বিশালাকারের ছাতা, যার তলায় পেতে রাখা রঙীন প্লাষ্টিকের চেয়ার টেবল। মেয়েটি এসে মৃদু হেসে জানতে চাইল, কি খাবেন? এদের সকলের দূর্ভাগ্য, এখানেও শুয়োর নেই! অগত্যা সকলের জন্যেই চিকেন মোমো। সাথে যার যেমন পছন্দ তেমন পানীয়। রফিক শুধু নিল ভেজ মোমো আর চা। মেঘলা আকাশ হঠাৎ করেই ঝকমক করে উঠল আর খলখলিয়ে হেসে সূর্যদেব দেখা দিলেন মিরিকের আকাশে। মুহুর্তেই চারপাশের সমস্ত রং কেমন অদ্ভুতভাবে বদলে গেল! সোনা সোনা রোদে কেমন সোনালী হয়ে গেল সবকিছু। টেম্পারেচার কত হবে তখন? খুব জোর আট ডিগ্রি সেলসিয়াস! আগের দিনই আমরা কলকাতার চল্লিশ ডি্গ্রি থেকে প্রায় সেদ্ধ অবস্থায় বেরিয়েছিলাম! রোদের ওম গায়ে মেখে আয়েস করে খেতে খেতেই দেখলাম বিশালাকারের সব ঘোড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে, হোটেলের আশে পাশে। ঘোড়ার লাগাম হাতে সব নেপালী মুখ। বোঝা গেল, এরা ট্যুরিষ্টদেরকে ঘোড়সওয়ারী করায়। আমরাও বাঙালী আর আমরাও ট্যুরিষ্ট প্রমাণ করতে সকলেই ঘোড়ায় চাপতে চাইল। এবং আমরা ঘোড়ায় চাপলাম।
সে এক কেলেংকারী কান্ড। ছোটোখাটো চেহারার নেপালী লোকগুলো কম করেও সাড়ে চার-পাঁচ ফিট উঁচু তাগড়া এক একখানা ঘোড়া নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চাপব তো বলেছি কিন্তু ঘোড়ার পিঠে চড়ব কি করে? রফিক প্রায় চ্যাংদোলা করে সকলকে ঘোড়ায় তুলে দিল একে একে! ঘোড়ায় চড়ল না শুধু শুক্লা। সে রফিকের সাথে ঘোড়ার পেছন পেছন হেঁটে এল। ঘোড়ার মালিক আমাদেরকে লেকটা এক চক্কর ঘুরিয়ে মেলার শেষ মাথায় আমাদের গাড়ির কাছে নামিয়ে দিল। ফেরার সময় হয়ে এল! রাস্তার ধারের একটা দোকান থেকে বীয়ার তোলার জন্যে শুভ আর নীলু গেল। পেছন পেছন আমরাও। এবং গিয়ে সেই দোকানের একটা কাউন্টারে চকোলেটের যা কালেকশন দেখলাম সে যে কোন বড়সড় চকোলেটের দোকানকেও হার মানায়। আমরা চকোলেট কিনলাম। রফিকের বাচ্চার জন্যে কিনে দিলাম একটা খেলনা আর দু রকম চকোলেট। হুড়মুড় করে আমরা আবার গাড়িতে। ঠান্ডায় রীতিমত কাঁপুনি ধরছে। হঠাৎ করে কোথা থেকে উড়ে এসেছে ঘন কুয়াশা। আর দেখতেই দেখতে সব ঘোর অন্ধকার। বেলা চারটেতে রফিক হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। শুভকে জিজ্ঞেস করে রফিক, এই পাহাড়ের পিকে যাবেন স্যার? বৃটিশদের হেলিপ্যাড ছিল এক সময় ওখানে। মিরিক ছাড়িয়ে আমরা উঠে যাই আরও উপরে, ঘনঘোর কুয়াশায়! কিছুই দেখতে পাচ্ছি না চোখে, নিজের হাতের তালুও বোধ হয় মানুষের এতটা মুখস্ত থাকে না যতটা রফিক মুখস্ত করে রেখেছে সুবিশাল এই পাহাড়ের শরীরের শিরা-উপশিরাকে। মিনিট কয়েকের মধ্যেই একটা ফাঁকা জায়গায় গাড়ি এসে থামে। গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে রেখেছে রফিক। সেই আলোতে আমরা প্রত্যেকে যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। মিরিকের পিকে গাড়িতে চেপে পৌঁছে আমরা যেভাবে উচ্ছসিত হয়ে উঠলাম সে জাষ্ট অকল্পনীয়! সেখানে কেউ কারোর নয় আবার সকলেই সকলের ভীষণ আপন!

নীলু ছবি তোলে। আমরা পাগলের মত কুয়শাকে গায়ে মাখি। হাতে গলায় মুখে একে অন্যকে। মুঠো মুঠো কুয়াশা ছুঁড়ে দিই একে অন্যকে! হেডলাইটের আলোতে শুধু নিজেদের কেই দেখতে পাচ্ছি। ঘন কুয়াশায় কিচ্ছু, কিচ্ছুটি দেখা যায় না!

আমরা বাস্তবে ফিরি। গাড়িতে উঠে বসি। হেঁড়ে গলায় সকলে গান গায়। গলা মেলায় রফিকও। সারা রাস্তা রফিক তার প্রিয় কুমার শানু চালিয়ে আমাদেরকে মহা বোর করেছিল, এবার রফিক খানিক বোর হোক!

খানিকটা নিচে নামতেই কুয়াশা কেটে যেতে লাগল। নীলু বলে, আমরা জিরো ভিজিবিলিটি থেকে এখন ভিজিবিলিটিতে ঢুকছি! যেন ক্ষণিকের মধ্যেই কুয়াশা কেটে গেল আর আমি দেখলাম এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য! পাহাড় থেকে দুরে বহুদূরে নিচে খানিকটা যেন আলোর আভাস দেখা যায়। রফিক বলে, ও‌ই হল শিলিগুড়ি শহর! আর ও‌ই দেখুন ও‌ই যে তরাই দেখতে পাচ্ছেন ওটা হচ্ছে আমাদের ভারতের শেষ সীমানা, ওপাশে নেপাল! ও‌ই দেখা যায় হিমালয়! নিচেকার দৃশ্যকে আমার বাস্তব বলে মনে হয় না। যেন বিশাল, বিশাল ব-অ-ড় এক ক্যালেন্ডারের পাতা, যে ক্যালেন্ডারের আকারের কোন সীমা-পরিসীমা নেই!

রাস্তার ধারের চা বাগানে নামবে বলে আমি ছাড়া সকলেই বায়না ধরে। নিরাপদ জায়গা দেখে নিয়ে রফিক গাড়ি থামায়। একে একে সকলেই নেমে যায় চায়ের বাগানে। শতেক বছরের পুরোনো কোমর সমান চা গাছের ফাঁক দিয়ে ঢাল বেয়ে তরতর করে নেমে যায় সকলেই, এমনকি শুক্লাও! বেশ খানিকটা নেমে গিয়ে সকলেই আমাকে ডাকে নিচে নামতে। আমি কোনমতেই নামতে রাজী নই দেখ রফিক বলে, 'আপকো দেখকর তো যমীন ডর যায়েগী, আপ যমীন সে কিউ ডরতি হ্যায়?! হাত ধরে রফিক নমিয়ে নিয়ে যায় চায়ের বাগানে। সকলেরই বয়েস যেন দশ-পনের বছর করে কমে গেছে। ছেলেমানুষি আনন্দে চায়ের পাতা ছিঁড়ি। বুক ভরে টেনে নিই তাজা বিশুদ্ধ বাতাস। হিমালয়ের বাতাস!

গাড়ি দ্রুত নেমে যেতে থাকে সমতলের দিকে।জানলার ধারে বসা আমি শরীরের প্রায় অর্ধেকটা জানলা দিয়ে বের করে তাকিয়ে থাকি পেছনপানে। রাস্তার ধারের লোকজন হাত নাড়ে, বিদায় জানায়। সম্পূর্ন অচেনা, জীবনেও কোনদিন দেখা না হওয়া মানুষদের ওভাবে বিদায় জানানো দেখে বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকাতে থাকে যেন। দ্রুত সরে যেতে থাকে, বদলে যেতে থাকা দু'পাশের দৃশ্যাবলী। আমরা নেমে যেতে থাকি সমতলের দিকে। দ্রুত।

ট্রেনের সময় হয়ে এল বলে‌...

Sunday, August 03, 2008

রোজনামচা

অনেকদিন পরে গতকাল বিকেলে নন্দন চত্তরে ঢুকে পড়ি বিনা কারণে। কাজ-কর্ম কিছু নেই এমন নয় কিন্তু করতে ইচ্ছে করছে না। ভাল লাগছে না কিছুই। নন্দনে কি একটা সিনেমা চলছে, প্রচুর ভিড় হলে ঢোকার! কি সিনেমা? আবার বাইরে গিয়া পোষ্টার দেখবো? থাক! নন্দনের সামনেটা দিয়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াই চা-কফির ছোট ষ্টলটার সামনে। এক কাপ চা খেলে হয়। এখানেও লাইন! লাইনে দাঁড়িয়ে এ'দিক ও'দিক তাকাতে গিয়ে চোখ পড়ে একজনের ওপর।মুখটা চেনা। নন্দনে গেলেই দেখা পাওয়া যায় তার। স্যুটেড বুটেডই বলা যেত নেহাত কোটখানা গায়ে নেই। ইন করে পরা শার্ট, রোদচশমাখানি কপালের উপর তোলা। রেলিংএর ধারে গাছতলার বাঁধানো বেদীর উপরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে চলমান জনতার দিকে।

বেশ অনেকদিন আগের কথা। বছরখানেক হবে। নাটক দেখতে গিয়েছিলাম সেদিন যদ্দূর মনে পড়ছে। মনে পরেছে। সংসৃতি নামক নাট্যগোষ্ঠির কততম বর্ষপুর্তি যেন ছিল আর সেই উপলক্ষ্যে দু'দিনে পরপর চারখানা নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন তাঁরা। এক বন্ধুর আমন্ত্রণে আমি গিয়েছিলাম সেই নাটক দেখতে। বন্ধুটি তখনো এসে পৌঁছননি তাই আমি এদিক ওদিক করছিলাম। সেদিনও একটা চা নিয়ে রবীন্দসদনের লাগোয়া হাতখানেক উঁচু রেলিংএ বসে চা খাচ্ছিলাম আর ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হল কেউ একজন বারে বারেই সামনেটা দিয়ে যাচ্ছে আর আসছে। তাকাতে গিয়ে দেখলাম সে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। চেহারা সুরত দিব্যি। জামা-কাপড়ও দিব্যি। দেখতে তো ভদ্রলোকেদের মতই! হাতের চা শেষ। কিন্তু তার যাওয়া আর আসা থামছে না আর এবার তার হাঁটার গতিও ধীর। সুযোগ দেওয়ার কোন ইচ্ছে নেই তাই বসে না থেকে উঠে পড়লাম। নন্দন চত্তর পেরিয়ে চলে যাই অ্যাকাডেমীর সামনে। বন্ধুর টিকির দেখা নেই এখনও। বিরক্ত লাগে। কি মনে হতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি রোমিও এখানেও হাজির! আর এবার তার মুখে আগে থেকে ধরে রাখা একটা হাসি! আমি তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে আবার নন্দন চত্তরে ঢুকে পড়ি।

হাঁটতে হাঁটতে নন্দন পেরিয়ে শিশির মঞ্চ আর তারপরেই গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শনশালা। কিছু একটা প্রদর্শনী যেখানে হরবখতই চলে। ঢুকে পড়ি সেখানে। নানা শিল্পির আঁকা ছবি সব ঝুলছে দেওয়ালে দেওয়ালে। মন দিয়ে ছবি দেখি। আবারও কেমন কেমন লাগল। এবার আর ঘাড় ঘোরাতেও হল না কষ্টা করে, পাশেই বিগলিত হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে রোমিও, সেও ছবি দেখছে! লহমায় ঘুরে দাঁড়িয়ে সোজা আবার নন্দনের দিকে হাঁটা শুরু করি। এক্সকিউজ মি! কানের পাশে শব্দটি শুনে প্রথমে বুঝতে পারিনি যে আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলা হচ্ছে। তাকাই, রোমিও! এক্সকিউজ মি, আপনার সাথে কি দু মিনিট কথা বলতে পারি যদি কিছু মনে না করেন? তার সাথে কথা বলার বা তার কথা শোনার কোন ইচ্ছে নেই জানিয়ে দিয়ে সোজা আবার অ্যাকাডেমী, বন্ধুটি ফোনে জানিয়েছেন, তিনি অ্যাকাডেমীর সামনে পৌঁছেছেন!

চা হাতে নিয়ে আবার সেই পথে, নন্দন পেরিয়ে শিশির মঞ্চ আর আবার সেই প্রদর্শনশালা। বিশাল বড় পোষ্টার আগের দিনই চোখে পড়েছিল, রক্তরঙা বোর্ডে সাদা কালিতে লেখা- মাওবাদী, নৈরাজ্যের আরেক পর্ব। সিপিএম'এর মুখপত্র গণশক্তি-তে এযাবত মাওবাদী সম্পর্কিত ছাপা সব ছবি-খবরের বড় বড় সব ছবি। এক জায়গায় এ পর্যন্ত মাওবাদীদের হাতে নিহত সব মানুষের নাম, বয়েস। সে লিষ্ট অনেক বড়। বেশ কিছু মানুষ একের পর এক ছবির সামনে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে সব খবরের ছবি পড়ছেন। ঢোকার মুখে চেয়ারে কয়েকজন বসে আছেন, সামনে টেবিলে খোলা এক খাতা। কেউ কেউ সেখানে মতামত লিখে দিয়ে যাচ্ছেন। ছবিগুলো দেখি, খবরগুলো পড়ি। কিছু কিছু খবর তো কাগজে পড়া। কিছু ছবিও দেখা কিন্তু সে'সব ছবি খবরের কাগজে এত জীবন্ত কখনও লাগেনি। গা শিরশির করে। বমি পায়। ভারী ঠেকে বাতাস। বেরিয়ে আসি সেখান থেকে।
---
সন্ধেবেলায় মীনাক্ষী'র সাথে উইন্ডো শপিংএ যাই। প্যান্টালুনস, ওয়েষ্টাসইড, রিবক সেবেতে সেল চলছে। কোথাও ৪০% অফ তো কোথাও আপ টু ৫০%। পুজোর যদিও এখনও ঢের দেরী কিন্তু বাতাসে এখন থেকেই পুজো পুজো গন্ধ আর এই গন্ধটা খুব বেশি করে টের পাওয়া যায় এই সব সেল দেওয়া দোকানগুলোতে গেলে। কিছুই কেনার কোন প্ল্যান ছিল না তবুও ঘুরে ঘুরে মীনাক্ষী কেনে কুর্তা, টি-শার্ট, ব্যাগ। প্রায় নতুন একজোড়া স্নিকার্স থাকা সত্বেও রিবক থেকে কেনে স্নিকার্স, ব্যাগ। সবসময়েই প্রচুর কথা বলে আর প্রচুর হাসে মীনাক্ষী। রীতিমত বকবক বলা যায়। আমি হুঁ হ্যাঁ করি। বেশির ভাগ সময়েই চুপ করে থাকি। অ্যাই মেয়ে, এত কম কথা বল কেন! অনুযোগ মীনাক্ষীর। দু'জনে দুটো ঠান্ডা চা নিয়ে ক্যাফেতে বসি। আলো ঝলমল মল মানুষের আনাগোনায় সরগরম। ব্যস্ত সমস্ত মুখে ঝাপিয়ে পড়ে মানুষ কেনাকাটা করছে, যেন কালকেই ঈদ। কিংবা পুজোর শুরু!

মীনাক্ষীর কথা একটু বলি। অন্ধ্র প্রদেশের মেয়ে। মা বাঙালী। ব্যাঙ্গালোরে থাকে বাড়ির অন্যেরা, চাকরীসূত্রে মীনাক্ষী কলকাতায়। আমার সাথে আলাপ ব্যায়ামাগারে। ব্যায়াম করার ব্যাপারে ও কোনকিছুর সাথেই কোনরকম আপস করতে রাজী নয়। ছিমছাম চেহারার মীনাক্ষীকে দেখতে রীতিমত সুন্দরী। ঝরঝরিয়ে বাংলা বলে যদিও লিখতে পারে না। একসময় ফুটবল খেলত, একবার হাঁটু ভাঙার পর থেকে খেলা বন্ধ, এখন শুধু এক্সারসাইজেই খুশি। ট্রেডমিলে পাগলের মত দৌঁড়ায়, হেভি ওয়েট ট্রেনিং করে, এক ছটাক মেদও শরীরের কোথাও রাখতে রাজী নয় সে। মীনাক্ষী ভালবাসে এক তামিল ছেলেকে যে থাকে দিল্লিতে। ছেলেবেলার বন্ধু, একসাথে বড় হয়েছে। এটা ঠিক সরল সোজা প্রেমকাহিনী নয়। ওরা দু'জনে ভাল বন্ধু। এক সময় ছেলেটি অন্য এক মেয়ের প্রেমে পড়ে, বিয়ে করে আর বছরখানেকের মধ্যে তাদের ডিভোর্সও হয়ে যায়। ছেলেটি বিয়ে করে ফেললেও মীনাক্ষী বিয়ে করেনি। করবে না এমন কিছু ভাবেনি ব্যাস। বিয়েটা করেনি। ছেলেটির সাথে যোগাযোগ ছিল, সেই যোগাযোগ এখন গাঢ় হয়েছে। কয়েক মাস পরপরই ছুটি নিয়ে উড়ে দিল্লি চলে যায় দু-তিন দিনের জন্যে। এই সেদিনও গিয়েছিল। ফিরে এসে বলে, ইশশ, প্রতি মাসেই যদি ছুটি নেওয়া যেত! মাঝে মাঝেই বলে, তুমি আমার জন্যে একটু দোয়া কর না বাবা, আমার যেন বিয়েটা তাড়াতাড়ি হয়ে যায়। বুড়ি হয়ে গেলাম যে! কেন কে জানে ওর বিয়েটা হয়ে ওঠছে না আর কবে হবে সে বিষয়ে ওর নিজেরও কোন ধারণা নেই।
মল ছেড়ে বেরিয়ে আসি বাইরে। ভ্যাপসা একটা গরম। যদিও সারাদিনই যখন তখন বৃষ্টি নেমে পড়ছে কিন্তু তারপরও এই পচা গরম। মীনাক্ষী থাকে দক্ষিণে আর আমি তো নদী'র অন্য পারে। দুজন একেবারে দুই প্রান্তে। কাল আসছ তো যোগা করতে? শেষবারের মত জিজ্ঞেস করে এগিয়ে যায় নিজের পথে। আমিও এগোই ফেরার রাস্তায়। পেছনে পড়ে থাকে ঝলমলে মেগাসিটি - কলকাতা। 

বাড়ি গিয়ে আজ বিন্নির ভাত রাঁধব সাথে ভুনা ডিম। আহ ...

Tuesday, July 29, 2008

সে এক বৃষ্টিদিনের কথা


অনেক অনেক দিন পরে ভদ্রলোক একটু বাইরে গেলেন দিন চারেকের জন্যে। তিস্তা নামক কিছু একটা টেলি-প্রোগ্রামের টাইটেল শ্যুট করতে, নর্থ বেঙ্গল। নর্থ বেঙ্গল শুনলেই যদিও আমিও লাফিয়ে উঠছি আজকাল কিন্তু ইউনিটের সাথে যাওয়াটা পোষাবে না বলে কিছু না বলেই ব্যাগ-ফ্যাগ গুছিয়ে ভদ্রলোককে রওয়ানা করে দিই। এই বর্ষায় সাধারনত কোন পাগলেও নর্থ বেঙ্গল যায় না তাও আবার শ্যুটিংএর জন্যে কিন্তু এই লোকগুলো কখন যে কি করে তা এরা নিজেরাও বোধ হয় জানে না। আজ সারাদিন সে মালবাজারের একমাত্র হোটেলটিতে বন্দি, প্রচন্ড বৃষ্টিতে শ্যুট তো দূর অস্ত বাইরে বেরুনোর জো নেই। সেটা অবশ্য আমি ওকে যাওয়ার আগেই বলেছিলাম, কাজ কদ্দূর হবে না হবে জানি না, তবে তুমি বিশ্রাম পাবে কয়েকদিন!

ওর সাথে আমার প্রথম যেদিন দেখা হয়েছিল সেদিনও নাকি সে সকালবেলায় নর্থ বেঙ্গল থেকেই ফিরেছিল, আর সেও এই জুলাই মাসই ছিল! অবশ্য সেটা জুলাইয়ের প্রথম দিকের কথা। সেদিনও সারাদিন কলকাতায় অঝোর বৃষ্টি। কলকাতার হাঁটুজল ভেঙে আমি কোনমতে পৌঁছেছিলাম সল্টলেকে, সেখানে তখন কোমর জল। একটা আড্ডার আয়োজন ছিল, কিছু মজলিশী আড্ডাবাজের। এক বন্ধুর কল্যাণে আমিও নিমন্ত্রিত ছিলাম। আড্ডা তখন শেষের পথে, ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন ভিজে কাক হয়ে, হাতে একখানি ভাঁজ করা ছাতা, যার থেকে তখনও জল ঝরছে। তার চেহারা-সুরত দেখে দু-এক পিস ফিচেল তার নাম দিয়েছিল চেঙ্গিস খান। বলা বাহুল্য, আমিও সেই ফিচেলদের একজন। ব্যাঙ্গালোর থেকে আমাদের ছোট্ ভুত তাকে ফোন করে করে ঘুম থেকে তুলে পাঠিয়েছিল সেই আড্ডায়।

নামটা আমার পড়া ছিল মজলিশের পাতায়, লেখার মাথা-মুন্ডু কিছু খুঁজে পেতাম না বলে পড়ার চেষ্টাও করতাম না। আগ্রহভরে দেখছিলাম, দেখলাম, আমাদের মতই কথা বলে তো! কোন মানেবইএর দরকার নেই। দু এক কথার পরেই খেদ প্রকাশ করলেন, এইরকম বৃষ্টিদিনের আড্ডায় ইলিশ বিরিয়ানি নেই, সুরা নেই, এসব কী!! ফেরার পথে একটা ট্যাক্সিতে গাদাগাদি করে ছ'জন । একজন একজন করে নেমে যাবে রাস্তায়।

দিন পনের বাদে ঠিক ও‌ইরকমই ছোট করে একটা আড্ডার ব্যবস্থা আমার বাড়িতে, সে বোধ হয় মাঝ জুলাইয়ে। আমার কি মনে হল, তাকেও ডাকি , এলে আসবে! কিন্তু ফোন্নং নেই তো! ছোট ভুত আমার হয়ে তাকে দাওয়াৎ দিল, বলল, কাল আপুর বাড়িতে পৌঁছে যাও, আর এই নাও ফোন্নং! তো আগের দিন রাতেই ফোন এল। এই কয়েকদিন নাকি প্রবল খোঁজ চলেছে এই নম্বরের, কিন্তু কেউ দেয়নি!

পরদিন সকাল থেকেও বেশ কয়েক দফা ফোন এল। তিনি এলেন সকলের শেষে। তাকে দেখামাত্রই ফিচেলদের মুখ টিপে হাসাহাসি, গা টেপাটেপি। বুঝেছিল কিনা কে জানে তবে আমল যে দেয়নি সে ঠিক। সেদিনও আবার সেই একই অনুযোগ, সুরা নেই? ওফ!! তবে সুরাপানের নেমনতন্ন তার একটা ছিল সেদিন রাতেই তাই ভদ্রলোক খাওয়া একটু চেখে দেখলেন শুধু।

তারপর? তারপর আবার কি। তার আর পর নেই।

যাগ্গে...

আমি আজকে দুম করে এইসবই বা কেন লিখছি কে জানে!

আসলে মালবাজারের হোটেলঘর থেকে ফোন করে আজকে বেশ খানিকটা স্মৃতিচারণ হল। আমাদের সাধারনত যা হয় না।

Friday, July 18, 2008

যেদিন আমি স্বাধীন হলাম

কিছুদিন ধরে প্রতি রবিবার আনন্দবজার পত্রিকার রবিবাসরীয়তে একটা বিজ্ঞাপণ দিচ্ছে, "যেদিন আমি স্বাধীন হলাম" বিষয়ে লেখা আহ্বান করে। লাইনটা যখনই আমি দেখি, নিজেকেই প্রশ্ন করি, যেদিন আমি স্বাধীন হলাম? আসলেই কী কেউ কখনো স্বাধীন হতে পারে বা পেরেছে? কি জানি! আবার মনে হয়, কেন নয়? নিশ্চয়ই মানুষ স্বাধীন হতে পারে। স্বাধীন দেশের নাগরিক আমরা, আমরা তো স্বাধীনই। আর যে দেশে বাস করি সেও তো স্বাধীন। তবে? মাথার ভেতর পোকা কিলবিল করে। স্বাধীন? যেদিন আমি স্বাধীন হলাম?

আজ কোনমতেই রবিবার নয়। কিন্তু সকাল থেকেই ও‌ই লাইনটা কিছুতেই মাথা থেকে নামছে না। দিন তারিখ আমার কখনোই খেয়াল থাকে না। আজ ব্যাঙ্কে গিয়ে জমার স্লিপে তারিখ লিখতে গিয়ে সেলফোনে তারিখ দেখে নিয়ে কনফার্ম হয়ে লিখতে গিয়ে খচ করে উঠল ভেতরটা, ১৭ই জুলাই? আজ ১৭ই জুলাই! নাহ..ভালো লাগছে না।

খুঁচ খাচ কাজ মিটিয়ে আমি যোগাসনের ক্লাসে যাই। শতেক বছরেরও বেশি পুরনো বাড়িটার দোতলার খুপরি খুপরি ঘরে ট্রেনাররা আসন করান। আরেক খুপরি ঘরে স্যার বসেন। সামনের বড় হলঘরটায় মেডিটেশনের ক্লাশ হয়। স্যার নিজে সেই ক্লাশ নেন। তার আগে প্রত্যেকের সাথেই স্যারের খুপরি ঘরে বার্তালাপ হয়। শরীর কেমন? বিপি এত লো কেন? ঘাড়ের ব্যথাটা কমছে না? বালিশে শোবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার সাথে এইসব গতবাঁধা কথাবার্তা ছাড়াও স্যারের কথা হয়। পদ্মার ইলিশ, বাংলাদেশ, ইসলাম, লেখালেখি ও আরও নানা বিষয়ে। স্যারের অনেক প্রশ্ন থাকে। আমি যেটুকু পারি উত্তর দিই। না পারলে বলি স্যার, আপনি আমার ওজন কমার দিকে নজর দিন! আজকে আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করি, 'স্যার যেদিন আমি স্বাধীন হলাম' বিষয়ে দু-চার কথা বলেন তো! 'শ' উচ্চারণে আমার নাম উচ্চারন করেন বরাবর তিনি। জোরে হেসে উঠে বললেন, কেন বলুন তো শামরান? আজকে হঠাৎ স্বাধীনতার কথা কেন? তারপর বললেন, নিজেই ভেবে দেখুন না আপনি কতখানি স্বাধীন! ধেত্তেরি! মুখে কিছুই বলি না, নিচতলায় চলে আসি, যেখানে পাবলিক ডিমান্ডে তৈরি হয়েছে ছোটখাটো এক আধুনিক জিমন্যাশিয়াম।

যোগা সেন্টারের এই জিমে খুব কম লোকেই আসেন কারন বেশিরভাগ মানুষই এখানে বয়স্ক আর তাঁরা যোগাসনের পক্ষপাতি কাজেই তাঁরা সব দোতলার খুপরি ঘরে আসন করেন। অল্পবয়েসী কিছু ছেলেমেয়ে আর আমার মত কয়েকজনের নাছোড় চাহিদায় তিতিবিরক্ত হয়ে শেষপর্যন্ত স্যারকে একতলায় বসাতেই হয়েছে কিছু যন্ট্রপাতি। ট্রেডমিল, ক্রস ট্রেনার আর আর্ক ট্রেনার। আমি আজ সব ক'টাতেই প্রবল স্পীডে ছুটি। ভুলে যাই পায়ের ব্যথা। ভুলে যাই আমার কার্ডিও প্রোগ্রাম চল্লিশ মিনিটের বেশি নয়। ঝরঝর করে ঘাম ঝরে শরীর থেকে, মাথার চুল অব্দি চুপচুপে ভিজে। পা আর নিজের বশে নেই বুঝতে পেরে আমি মুখ হাত ধুয়ে আবার দোতলায়, মেডিটেশনের সময় হল। চোখ বন্ধ করে পদ্মাসনে বসে থাকি কিছুক্ষণ। সব ভাবনাগুলোকে সরিয়ে দিতে চাই মাথা থেকে। স্যার বলেন, নিজেকে ছেড়ে দিন, ছড়িয়ে দিন, মুক্ত করে দিন.. নীল আকাশ দেখতে পাচ্ছেন কী? আপনি এখন মুক্ত, স্বাধীন! দেখুন পাখিরা কেমন ঘুরে বেড়াচ্ছে স্বচ্ছ নীলাকাশে! ওরাও স্বাধীন, এই মুহুর্তে আপনি যেমন!
----
অনেককাল আগে শীতার্ত এক বিষন্ন সন্ধ্যায় নিতান্তই বালিকা এক মেয়ে পাশের এই বিদেশবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। নিজের বাড়ি, শহর এমনকি দেশও ছেড়েছিল সকলের ইচ্ছায়। বুকফাটা কান্না থমকে ছিল চোখের তারায়। খানিকটা বোধ হয় গড়িয়েও পড়েছিল। আমার ঠিক মনে নেই। নিজেকে সে আড়াল করতে চাইছিল পাশের মানুষটির থেকে, আশে পাশের সকল মানুষের থেকে। সেটুকু স্বাধীনতা কি সে পেয়েছিল সেদিন? কিছুটা আড়াল দিয়েছিল সোনালী জরিতে ঢাকা লাল কাশ্মিরী চাদরটি। আগের দিনেই তার কাকা তাকে এনে দিয়েছিল সেই চাদর। কাকা কি বুঝেছিল তার ছোট্ট সোনামনিটির খানিকটা আড়াল দরকার হবে? একটিও কথা না বলে কাকা শুধু চাদরটা গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিল। স্বজন ছাড়ার কষ্ট, বাড়ি, নিজের ঘর, নিজের দেশ ছাড়ার কষ্ট। টুকিটাকি কত না জিনিসপত্র সে ফেলে এসেছিল। সব সব জমাট বেঁধেছিল সেদিন ছোট্ট ও‌ই বুকে। খানিকটা কি বেজেছিল স্বাধীনতা হারানোর কষ্টও?

দিন যায় মাস যায় বছর যায়। স্বপ্নেরা সব কোথায় যেন দূরে উড়ে যায়, তুলোর মত। মেঘের মত। দূরে বহু দূরে।ধরা যায় না ছোঁয়া যায় না। এত দূরে। ছোট্ট একচিলতে ছাদে সে তার পৃথিবী সাজায়। ছোট্ট পুতুলটাকে নিয়ে সংসার সংসার খেলা করে সারা দিনমান। ছোট ছোট সব জিনিসপত্রে ঘর ভরে ওঠে। প্রতিদিন সূর্য ওঠে, ডোবে। রাত নামে। বারান্দার ওধারে নিমগাছটার ওপাশে মাঝে মাঝে চাঁদ দেখা যায়। নিমগাছের হাওয়া নাকি ভাল। কি ভাল আর কি মন্দ তা নিয়ে সে আর ভাবে না। চিন্তারাও কী পরাধীন হয়?

মাঝে মাঝে সে ময়দানে যায়। পড়শিনী বৌটিকে সঙ্গে নিয়ে। চুপচাপ বসে থাকে সবুজ ঘাসের উপর। ছোট্ট পুতুলটা খেলা করে পাশে। ছোট ছোট পায়ে টলমল টলমল করে ঘুরে বেড়ায়। নিস্পাপ প্রাণখোলা হাসিতে মুখ ভরে থাকে পুতুলের। মুক্ত বাতাস বুক ভরে নেয় বালিকা সেই মেয়েটি। এক টুকরো স্বাধীনতা ঘুরে বেড়ায় বালিকা সেই মেয়েটির আশে পাশে, ময়দানের পুরনো বটগাছে আর খোলা আকাশ জুড়ে। দূরে ছেলেরা সব ফুটবল খেলে মাঠ জুড়ে। স্বাধীন।
----
আমি অনেকদিন ময়দানে যাই না। যেখানে থাকি সেখান থেকে ময়দান বেশ দূরে। ইচ্ছে করলে যাওয়া যায় না এমন নয়। যেতেই পারি। কিন্তু ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝেই আমার এই শহরটা ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। বরাবরের জন্যে নয় বা বেশিদিনের জন্যেও নয়। বহুকাল এক জায়গায় বাস করতে করতে সেই জায়গাটার জন্যেও কেমন মায়া পড়ে যায় না? একদমই প্রতিবেশী এই দেশের এই শহরটাকে এখন আমার নিজের বলেই মনে হয়। তবুও মাঝে মাঝেই এখান থেকে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ইচ্ছে করলেই কী সব সময় যাওয়া যায়! কত রকমের বাধ্য বাধকতা নিজের মধ্যেই থাকে। পরাধীনতা যে কত রকমের!

কী এক টপিক দিয়েছে, 'যেদিন আমি স্বাধীন হলাম!' সারাটা জীবন ধরেই তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে টুকরো টুকরো স্বাধীনতা আর তার সাথেই একেবারেই গায়ে গায়ে লেগে থাকে পরাধীনতাও। এভাবে কী বলা যায়, কোনদিন আমি স্বাধীন হলাম?

Friday, July 11, 2008

সেদিনের কালবৈশাখী ঝড়ে উপড়ে পড়েছে কালো কালো ফলে ভরা জামগাছটি...

কলকাতা শহর থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে হলেও এই জায়গাটাকে কোনমতেই শহর বলা যাবে না। শহরতলী? তাও বোধ হয় না। একই উচ্চতার এই সব চারতলা নতুন ফ্ল্যাটবাড়িগুলোকে বাদ দিলে এ এক গ্রামই। অন্তত চারপাশের অসংখ্য গাছ, পুকুর আর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে ছড়িয়ে ছিল গ্রামেরই আবহ। মিনিট দশেক হেঁটে গেলে বাসষ্ট্যান্ড, যেখানে মিনিট পনের পরপর বাস আসে কলকাতা থেকে। যাত্রী নামিয়ে খানিকটা দাঁড়ায় ট্রাম কোম্পানীর বাস, একে একে কলকাতার যাত্রীরা সব বাসে ওঠার পরে বাস আবার বেরিয়ে যায় কলকাতার পথে। ট্যাক্সিষ্ট্যান্ডে সারসার দাঁড়িয়ে থাকে ট্যাক্সি, যদিও তারা আপনার পছন্দমত গন্ত্যব্যে যে যাবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। বিদ্যাসাগর সেতুর ফ্লাইওভার যেখানে শেষ হয়েছে বাস আর ট্যাক্সিষ্ট্যান্ডটা ঠিক সেখানেই। সেতু ধরে গঙ্গা পেরুলেই ওপারে প্রবল বেগে ছুঁটে চলা কলকাতা।অক্লান্ত।

পশ্চিমের জানলার ওধারে পাশাপাশি তিনখানি পুকুর। কবে কে কাটিয়েছিল কে জানে। অযত্নে পড়ে থাকা পুকুরের জল শ্যাওলায় সবুজ। জলে ভাসে পাশের ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে ছুঁড়ে ফেলা ময়লাভর্তি পলিব্যাগ, খালি মিনারেল ওয়াটারের বোতল আরও কত কি। কোনো পার বাঁধানো নয় এই সব পুকুরের। সহজে কেউ নামেও না ও‌ই সবুজ শ্যাওলা পড়া জলে। তবুও বস্তিবাসী কিছু দূরন্ত ছেলেপুলে দুপুরবেলায় এসে নামত ও‌ই জলে। দাঁপিয়ে স্নান করত পলি পড়া প্রায় মজা পুকুরের কোমরজলে। একটা পুকুরে বাস ছিল তিনটে পানকৌড়ির। মাঝে মাঝেই তারা উড়ে যেত এক পুকুর থেকে আরেক পুকুরে। কখনো বা পুকুরের গায়ে নুয়ে পড়া ছোট্ট এক জংলী গাছে বসে রোদ পোয়াত, ডানা ঝাপটে ঝাপটে গা থেকে ঝরিয়ে দিত জল। খানিক বসে থেকে দিক ঠিক করত, এবার কোন পুকুরে যাবে। তারপর উড়ে যেত সেদিকপানে আর ডুব দিত পুকুরের জলে। আসত কিছু হাঁসও। কোথা থেকে, কার বাড়ি থেকে আসত কে জানে। পুকুরে ভেসে বেড়াত তারা, জলকেলি করত। কখনো বা পারে উঠে বসে থাকত। মাঝে মাঝেই নিজেরা কথা বলত নিজেদের ভাষায়। আমি শুনতে পেতাম, কো্য্যাক কোয়্যাক। কি বলত? হয়তো নিজেরা বলবালি করত, এই পুকুরও আর কদ্দিন থাকবে কে জানে!

যেহেতু পুকুর, তা সে মজাই হোক আর ভরা, মাছ তো তাতে থাকবেই। কেউ ওখানে মাছের চাষ করুক বা নাই করুক। সেই মাছ ধরতে ছিপ হাতে বসে থাকত কিছু নাছোড়বান্দা টাইপ ছেলে। বলা বাহুল্য এরঅ বস্তিবাসী। ঠিক বস্তিবাসীও নয়। এদের বাস ফ্লাইওভারের তলায়, সরকারী জমির খানিকটা জায়গা পলিথিন দিয়ে ঘিরে নিয়ে এদের মা-বাবাদের সংসার। এদের মায়েরা কাজ করে ফ্ল্যাটবাড়িগুলোতে, ঠিকে ঝিয়ের কাজ। বাবারা কেউ রিকশা চালায় কেউ বা পুরনো কাগজ, ফেলে দেওয়া নানান জিনিসপত্র কুড়িয়ে বেড়ায়। হাতে লোটা আর সরু কঞ্চির ছিপ নিয়ে এরা বসে থাকে পুকুরধারে। কখনো বড়শীতে আটকায় ছোট্ট এক মাছ। হই হই করে ওঠে ছেলেটি। উল্লাস! এদিক ওদিক তাকিয়ে সাবধানী সতর্ক হাতে বের করে ছোট একটা বোতল, পাশে রাখা পলিব্যাগ থেকে। বেরোয় ছোট ছোট কাঁচের গেলাস। বোতল থেকে দেশী মদ গেলাসে ঢেলে এক চুমুকে খেয়ে নেয় মাছ ধরতে আসা ছোট্ট ছেলের দল, আবার মন দেয় জলে ভাসা ফাৎনার দিকে। খালি বোতলটি জায়গা পায় পাশের কচুবনে।

পুকুরের ধার ধরে গেছে সরু পীচরাস্তা, খানিকটা দূরে দূরে ল্যাম্পপোষ্ট, যাতে বিকেল থেকে জ্বলে টিমটিমে হলুদ মরা বাতি। সরকারী বাতি। রাস্তার উপর পরপর সব গেট। ফ্ল্যাটবাড়ির গেট। নতুন গজানো সব ফ্ল্যাটবাড়ি। আজকাল আর ব্যাঙের ছাতা গজায় না কোথাও। যেখানে ব্যাঙের ছাতারা গজাতো সেখানেই সব ফ্ল্যাটবাড়ি গজিয়েছে যে। যেখানে এসে বাসা বেঁধেছে ছিটকে পড়া মানুষেরা। পুরনো সব বাড়িতে একান্নবর্তী পরিবারে যারা একসাথে অভিন্ন হয়ে বাস করতো আর দশজনের সাথে। এখন সব নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। হাসব্যান্ড ওয়াইফ এন্ড দ্য ওনলি ওয়ান চাইল্ড। সেইসব ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে উড়ে আসা ময়লার ব্যাগেরা ভাসে শ্যাওলা ভর্তি পানাপুকুরে। মাঝে মাঝেই উড়ে এসে জলে পড়ে ববহৃত স্যানিটারি ন্যাপকিন দোতলা তিনতলার খুপরি জানলা থেকে। জলের রঙ খানিকটা বদলায়। তারপর আবার যে কে সেই। গাঢ় সবুজ।

সন্ধের পরে এখানে বড় একটা মানুষজন দেখা যায় না ও‌ই সরু রাস্তায়। নীরব নিস্তব্ধ হয়ে যায় রাত হতে না হতেই। ল্যাম্পপোষ্টের মরা আলোয় অন্ধকার যত না কাটে ছড়ায় তারচেয়ে বেশি। জংলা মাঠ, চেনা-অচেনা সব গাছে অন্ধকার ঘন হয়ে চেপে বসে থাকে। জোনাকপোকারা উড়ে বেড়ায় ঝিকিমিকি ঝিকিমিকি আলো জ্বালিয়ে। ঝিঁঝি পোকার একটানা ডেকে যাওয়ার শব্দ, গাছের পাতায় বাতাস বয়ে যায় সরসর সরসর। ফ্ল্যাটবাড়ির জানলায় জানলায় নানা রঙের আলো। নানা রকমের যান্ত্রিক আওয়াজ ভেসে আসে নীরব রাতে। কোথাও টেলিভিশনে খবর পড়া, কোথাও বা ধুম তারা রা রা নাচের ছমছম। এরই মাঝে রেডিওতে গান বাজে কার বাড়িতে যেন ... তোমায় গান শোনাবো...

তিনটে পুকুর ঠিক পাশাপাশি নয়। বাঁদিকে একটা পুকুর আর তারপরের দুটো পুকুর একটার পর একটা, লম্বালম্বি অবস্থানে। মাঝে খানিকটা করে খালি জায়গা। জঙ্গলমত। সরু লম্বা তালগাছ, নারকেল, সুপুরি আর খেজুর গাছ। আর আরও নানারকম গাছে ভার্তি ছিল জায়গাটা এই সেদিনও। জানলার ঠিক পাশেই ছিল বিশাল এক নাম না জানা গাছ। কমলা রঙের ফুল ফুটত তাতে। ফুলভর্তি কৃষ্ণচূড়া গাছের মতই লাগত সেটাকে। চেনা অচেনা কত পাখি যে আসত সেই গাছে। কিচির মিচির কিচির মিচির। দিনের বেলা ঘুমুনোর উপায় নেই! শুধু দিনের বেলা? মাঝরাত্তির থেকে শুরু হত তাদের কথোপকথন, আমি শুনতাম শুধু নানা রকমের কান ঝালাপালা করা কিচির মিচির। আর সেই কোকিল দুটো? তাদের কি সমস্যা ছিল কে জানে! একজন কুউ উ উ কুউ উ উ ডেকে চলত একটা নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে আর আরেকজন মাঝে মাঝে সাড়া দিত। শেষ জানুয়ারী থেকে নিয়ে একেবারে সেই জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত! আমার তো ওদের চেহারা পরিস্কার মনে আছে! কালো কুচকুচে চেহারায় ততধিক কালো গভীর দুটো চোখে কি যে মায়া! দক্ষিণের ও‌ই জামগাছটায় তাদের ডেরা ছিল এই মাসখানেক আগে পর্যন্ত। আর ওদের নজর থাকত পাশের তালগাছের কাকজুটির বাসার দিকে! চারতলার এই চিলে বারান্দার ঠিক পাশেই সমান উচ্চতার তালগাছটাতে ফলে থাকে অসংখ্য তাল। আর সেই তালের ছড়ার মাঝখানে কাঠি-কুটো যোগাড় করে প্রতিবছর বাসা বাঁধে কাক দম্পতি। যেন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যায় ডিমে বসে থাকা কাকিনীটিকে কিংবা একটা আলতো ছোঁয়া দিয়ে দেওয়া যায় ও‌ই নীলচে রঙের জোড়া ডিমে!

পুকুরের মাঝের খালি জায়গায় গজিয়ছিল কচুবন। ফ্ল্যাটবাড়িতে বসত করতে আসা ছোট্ট ছেলেটি টারই মত আরও কিছু ছেলেকে সাথে নিয়ে একদিন নেমে পড়ল ও‌ই কচুবনে। সে সেখানে ক্রীকেট খেলবে বন্ধুদের নিয়ে। তার যে খেলার জায়গা নেই, কোথায় সে মাঠ খুঁজতে যাবে? পরিস্কার হয়ে গেল কচুবন। নিজেরাই পরিস্কার করে দিল সব আগাছা। ছুটির দিনের সকাল বিকেল দু'বেলাই তারা ক্রীকেট খেলত নিজেদের বানানো এই ছোট্ট মাঠে। কিন্তু আজকের বাজারে এই চিলতে জমিটুকুরই বা দাম কম নাকি? খানিকটা করে দু'পাশের পুকুর বুজিয়ে দিলেই দিব্যি দাঁড়িয়ে যাবে একখানা চারতলা বিল্ডিং! লোক এল। লস্কর এল। এল মুটে মজুর। আর এল পুরোহিত। ঘটা করে ভূমিপুজো করে পাড়ার কেবলওয়ালা ওখানে খুঁটি পুঁতে দিয়ে গেল। ট্রাকে করে মাটি এল। বুজল আধখানা করে পুকুর। কাটা পড়ল কমলা ফুলে ঢেকে থাকা বিশাল সেই গাছ। ঘরছাড়া হল পাখিরা। ওরা বুঝতে পারছিল না কি হল। ওদের বাসার খোঁজে ওরা মাটিতে পরে থাকা গাছের আশে পাশেই ঘুরঘুর করল দিনকতক। কমলা রঙের ফুলগুলো সব ঝরে গেল গাছ থেকে। সবুজ পাতা প্রথমে হলুদ পরে বাদামী রঙের হয়ে এল। শুকিয়ে গিয়ে ঝরে পড়ল সব পাতারা গাছ থেকে। পানকৌড়িগুলো তখনও ছিল পুকুরে। ওরা মাঝে মাঝেই সেই পুকুরের গায়ে নুয়ে পড়া ছোট্ট গাছের ডালে উঠে গিয়ে বসে থাকত।

পশ্চিমের জানালাটা এখন আর খোলা যায় না। একের উপরের এক থাম দাঁড় করিয়ে চারতলা বিল্ডিং এখন আমার জানালার ওপাশে। এখন এখানে পাখির কলতান আর নেই। জানালা খুললে কোন গাছ কোন পুকুর আর দেখা যায় না। মিস্ত্রীদের ঠক ঠক ঠকাস শব্দ ছাড়া সারাদিন আর কোন শব্দ নেই। ঘরহারা পাখিরা, পুকুরের সেই পানকৌড়িগুলো কোথায় উড়ে গেছে কে জানে...এই বসন্তেও কোকিলেরা এসেছিল। দক্ষিণের জামগাছটিতে বাসাও বেঁধেছিল আর সেই একইভাবে কুউ উ উ, কুউ উ উ করে ডেকে ডেকে কানও ঝালাপালা করেছে তারা আমার। প্রতিদিন ভোররাতের সুখের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে ওরা এবারও বরাবরের মতই। পরের বছর থেকে ওরা আর এখানে আসবে না। সেদিনের কালবৈশাখী ঝড়ে উপড়ে পড়েছে কালো কালো ফলে ভরা জামগাছটি...

Saturday, May 17, 2008

মে মাসের ষোল তারিখ; আসে আর চলে যায় ..


মে মাসের ষোল তারিখটা আসে আর চলে যায়... আসার আগে, অনেক আগে থেকেই আমি অপেক্ষায় থাকি... অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হলেও কেটেই যায়। ষোল তারিখটাও তেমনি এসেই যায়... যে কারণে এই দিনটি বিশেষ একটা দিন, যার জন্যে এই দিনটা বিশেষ একটা দিন, তাকে ছাড়াই এই দিনটা আসে আর চলে যায়...

একটা একটা দিন গুনে শেষ পর্যন্ত আবার এসেছে ষোলই মে। একটু আগে ফোনে জানলাম আজকে নাকি নাইট শিফটেও কাজ হবে। রাগ হয়। রোজই তো এই চলছে। বোধ হয় টানা দু মাস.. দিন তারিখ আমার খুব একটা মনে থাকে না। আজকেও সারাদিনই ভেবেছি আজ শুক্রবার। সন্ধেবেলায় কার সাথে যেন কথা বলতে গিয়ে ভুলটা ভাঙল। আজ তো সারাদিনই বৃহষ্পতিবার ছিল! কম-বেশি দু'মাস ধরে ও'র একদিনও অফ নেই। মাঝে মাঝেই ডে-নাইট করে পরদিন সকালের রোদ মাথায় করে শরীরটাকে টেনে হিচড়ে সে এসে ঘরে ঢোকে আর দড়াম করে শুয়ে পড়ে ঘন্টা দুই পরের অ্যালার্ম সেলফোনে সেট করতে বলে। অ্যালার্ম বাজে... জোর করে নিজেকে টেনে তুলে সে বেরিয়ে যায়...

সকালবেলা বেরুনোর আগে অবশ্য বলেছিল এর মাঝে একদিন ডে-নাইট করতে হবে, শনি, রবি দু'দিনই টেলিকাষ্ট আছে। আমি শুনেছি কিন্তু মাথায় আরো কি কি যেন ঘুরছিল কাজেই ফাঁক গলে আজকের দুই শিফটের কাজের কথাটা বেরিয়ে যায়। দুপুরে বেরিয়ে গিয়ে অনেকটা সময় লাগিয়ে টুকটাক এটা সেটা কিনি। বিশেষ কিছু নয়। কিছু দরকারি জিনিস। সে নিজের জন্যে কোন দরকারি জিনিসও পারতপক্ষে কেনে না। এই দিনটায় আমি তাই সেই জিনিসগুলো‌ই কিনি। আজকেও কিনলাম। বাড়ি এসে একটা কেকও বানালাম।। আমার কেক বানানোর দোড় ও‌ই পর্যন্তই...
সাধারণ একটা চকোলেট কেক..

আমি যতই অপেক্ষা করে থাকি না কেন এই দিনে সে সারাদিন আমার কাছে থাকবে... আমরা কোথাও একটা বেড়াতে যাব... কোন একটা নাটক দেখব বা কোথাও একটা গান শুনতে যাব... কিন্তু হয়ে ওঠে না। ওর ঠিক কোথাও না কোথাও একটা কাজ পড়ে যায় আর তাও কলকাতার বাইরে... যেমন গতবছর এই দিনে ও ছিল হাজারীবাগে। আমার মন খারাপ হয়... ভাল লাগে না... চুপচাপ থাকি... দিনটা কেটে যায়...

এবছর সে এখানেই আছে কিন্তু প্রবল ব্যস্ত। সকালে উঠেই বেরিয়ে যাবে আর ফিরবে সেই মাঝরাত পার করে। রাত দুটো বা তিনটেয়...



যেভাবেই কাটুক আর যত ব্যস্তই থাকো জন্মদিনটা তোমার ভাল কাটুক কারুবাসনা...

Monday, May 12, 2008

জানো তো, নবনীতা না মাঙ্গলিক ...

'মাঙ্গলিক' শব্দটি এখন আর খুব একটা অচেনা নয় ঐশ্বর্য রাই বচ্চন, লাগে রহো মুন্নাভাই সিনেমার বদৌলতে। গ্রহ নক্ষত্রের ফেরে, পন্ডিত-পুরোহিতেরর কোষ্ঠিবিচারে কেউ কেউ মাঙ্গলিক হয়ে যায়। মাঙ্গলিক মেয়েটির নিজের তাতে কোন অসুবিধে বা বিপদ নেই কিন্তু সমূহ বিপদ তার হবু বরটির। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অকালমৃত্যু অনিবার্য (পুরোহিতের কোষ্টিবিচারে)। সমাধানও পুরোহিতই দিয়ে দেন। যেমন দিয়েছিলেন অমিতাভ বচ্চন আর জয়া বচ্চনকে যখন জানা গেল ঐশ্বর্য রাই মাঙ্গলিক। প্রথম বরের উপর দিয়েই সকল বিপদ যায় বিধায় পুরোহিত বিধান দেন কন্যেটির বিবাহ দেবতার সঙ্গে দিয়ে দেওয়া হোক। সকল বিপদাপদ দেবতা নিজবক্ষে ধারণ করে কন্যের দ্বিতীয় বরটিকে নিরাপদ করে দেন পার্বতীপতি শিব। কোন এক শুভদিনে শুভক্ষণে কন্যে মালা দেয় শিবের গলায়, শিবের পায়ে ফেলে রাখা সিঁদুর কন্যে নিজ মাথায় ধারণ করে আর মঙ্গলের যত দোষ সব কেটে যায়।। নিশ্চিন্ত মাতা-পিতা কন্যের বিয়ে দেন নির্বাচিত পাত্রের সাথে কিন্তু আমাদের আমিতাভ ও জয়া বচ্চন শুধু শিব বিবাহে নিশ্চিন্ত হননি। তারা ঐশ্বর্যর তিন তিনটি বিয়ে দিয়েছিলেন নিজপুত্র অভিষেককে নিরাপদ করার জন্যে। শিবঠাকুর তো আছেনই, ঐশ্বর্যের বর হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল বটবৃক্ষ ও কলাগাছেরও। খবরের কাগজের প্রথম পাতায় প্রতিদিন বড় বড় ছবি সহ সেই সব খবর স্থান পেয়েছে । হবু পু্ত্রবধুকে নিয়ে মন্দিরে মন্দিরে পুজো দেওয়ার ছবিও দেখা গেছে প্রায় নিত্যই। সমস্ত শিক্ষা-দীক্ষা, আধুনিকতার মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে মঙ্গলদোষ কাটিয়ে তবেই জয়া -অমিতাভ বধু হিসেবে বরণ করেন এককালীন বিশ্বসুন্দরী অ্যাশকে।
এমনই এক মাঙ্গলিক কন্যে আমাদের নবনীতা। আমার সাথে ওর আলাপ জিমন্যাশিয়ামে। নামি এক বেসরকারী হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তার নবনীতা একদিন এসে হাজির হয় আমাদের জিমে। ৯৭কেজি ওজন নিয়ে। নিজেকে নিয়ে ভীষণ বিব্রত থাকে, কথা বলে খুব কম। সামনে পড়লে শুধু একটু স্মাইল দিয়ে হাই-হ্যালো সারে।

  নবনীতাকে দেখে জিমনেশিয়ামেও ফিসফিস শুরু হয়ে যায় নিয়ম মেনে। হাউসকিপিংএর মেয়েরা পর্যন্ত ফিসফিস করে। নবনীতা জিমে আসার কিছুদিনের মধ্যে আমি জিম ছেড়ে দিই। বছর দুই পরে সেদিন হঠাৎ নবনীতার সাথে দেখা এক রাস্তার মোড়ে। আমি নবনীতাকে চিনতে পারিনি সেদিন দেখে। ছিপছিপে চেহারার হাসিমুখ এক মেয়ে আমাকে হ্যালো বলছে! কে রে বাবা, হাসিটি চেনা চেনা লাগছে যেন! নবনীতা! মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে যায় নবনীতার নাম। উজ্জ্বল হাসে নবনীতা ।
  
মধ্য তিরিশের নবনীতা তখনো অবিবাহিতা। কোন প্রেমপর্ব নেই, বিয়ের সম্মন্ধও খুব একটা আসে না। ওজন কমানোকে ধ্যান=জ্ঞান করে বছর খানেকের মধ্যে পঁচিশ কেজির মত ওজন ঝরিয়ে নবনীতা এখন বেশ ছিপছিপে। বিয়ের সম্মন্ধ আসে এদিক ওদিক থেকে। কিন্তু নবনীতার মায়ের ( যিনি এ শহরের এক নামী আইনজীবি) দুশ্চিন্তার কারণ অন্যত্র। কোষ্ঠি বিচারে নবনীতা যে মাঙ্গলিক!

এক শুভান্যুধায়ীর পরামর্শে নবনীতার মা বেনারসে গিয়ে এক গুরুদেবের সাথে দেখা করেন। গুরুদেবের পরামর্শে বেশ কিছু যাগ-যজ্ঞ করেন সেখানে, করান শতেক ব্রাহ্মণ ভোজন নবনীতার দোষ কাটানোর জন্যে। গুরুদেব সময় বলে দেন তিন মাস। এর মাঝে দোষ অনেকটাই কেটে যাবে, তখন দিন-ক্ষণ দেখে বিয়ের লগ্নে নবনীতার বিয়ে দেওয়া হবে শিবঠাকুরের সাথে। মাস তিনেক পরে নবনীতাকে সাথে করে বেনারস যেতে বলেন গুরুদেব।

তিন মাস পরে নবনীতা মায়ের সাথে বেনারসে যায়। বারে বারে কোষ্ঠি মেলান গুরুদেব, নবনীতার হাতও দেখেন। বলেন, খুব শিগগিরই নবনীতার বিয়ের যোগ। তবে তার আগে নবনীতার বিয়ে দেবতার সাথে দেওয়া আবশ্যক। যেমন কথা তেমন কাজ। নবনীতার সৌভাগ্যে তখন বিয়ের লগ্ন ছিল ঠিক দু'দিন পরেই। বিয়ে হয়ে যায়। লাল বেনারসি আর গয়নায় পুরোপুরি বৌ সাজে নবনীতা। ঠাকুরের পায়ের সিঁদুর আর বিয়ের জরির মালা গুরুদেব দিয়ে দেন নবনীতার মায়ের হাতে, বলে দেন, যত্ন করে রেখে দিতে। এই সিঁদুরেই যেন বিয়ে হয় নবনীতার আর এই মালাই যেন বরমালা হয়।

মা-মেয়ে কলকাতায় ফিরে আসে। কিছুদিনের মধ্যেই নবনীতার বিয়ের একটা সম্মন্ধ আসে অনাবাসী ভারতীয় এক ডাক্তারের জন্যে। নবনীতার মা যোগাযোগ করেন গুরুদেবের সাথে। গুরুদেব পাত্রের কোষ্ঠি চেয়ে পাঠান। ডাকযোগে সেটি পেয়ে সাথে সাথেই গুরুদেব জানান, যত শিগগির পার মেয়ের বিয়ে দিয়ে দাও এই ছেলের সাথে। এবং নবনীতার বিয়ে হয়ে যায় শিবঠাকুরের সাথে বিয়ে হওয়ার ঠিক দু'মাস পরে।

নবনীতার বর বিয়ের পরে ফেরত গেছে কাজের জায়গায় আর নবনীতা এখন তোড়-জোড় করছে এখানকার সব মিটিয়ে স্বামীর কাছে গিয়ে ঘর-সংসার করবার।

না। এতসব কথা নবনীতা আমাকে বলেনি। নবনীতার সেই শুভান্যুধায়ী বন্ধুটি কাকতালীয়ভাবে আমারও পরিচিত। পরিচয়সূত্রও জিমন্যাশিয়াম। বন্ধু না হলেও বন্ধুর মতই।। কখনো সে ফোন করে তো কখনো আমি। সেদিন নবনীতার সাথে দেখা হওয়ার কথা ওকে বলতেই ও বললো জানো না তো কত কান্ড করে ওর বিয়ে হয়েছে! কান্ডগুলো শোনায় আমার উৎসাহ ছিল না, নবনীতার হাসিমুখ আর রোগা ছিপছিপে চেহারা দেখে আমার ভীষণ ভাল লেগেছিল বলেই আমি নবনীতার কথা তুলেছিলাম। কিন্তু আমি শুনতে না চাইলেই বা সে ছাড়বে কেন। অ্যাত্তবড় উপকার করেছে আর কেউ জানবে না! জানো তো, নবনীতা না মাঙ্গলিক ...

Sunday, April 27, 2008

নীলু ও পলুর কথা

গতকাল একটি ন্যাংটো শিশু মাদুরে শুয়ে চীৎকার করে কাঁদছে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম নন্দনের সামনের ফুটপাথে। আশে পাশে কেউ নেই। বড়জোর মাস তিনেক বয়েস হবে শিশুটির। দাঁড়িয়ে পড়ে ইতিউতি তাকাই, শিশুটির মায়ের খোঁজে।চোখে পড়ে, খানিক দূরে ফুটপাথেই দাঁড়িয়ে রোগা একটি মেয়ে এক পেয়ারাওয়ালার সাথে খেজুর করছে । ছেঁরা শাড়িতে শরীর যতটুকু ঢাকা খোলা তার চাইতে বেশি। মাঝে মাঝেই সে এদিকপানে তাকিয়ে দেখছে, নজর শিশুটির প্রতি। কেন যেন মনে হল, ও‌'ই শিশুটির মা। নাদুস নুদুস শিশুটি একটি মেয়েশিশু। গায়ে জড়ানো কাঁথা সরে গিয়েছে। শুধু মাদুরের উপর শুয়ে শিশুটি চিল চীৎকারে কাঁদছে আর নিজের হাত মুখে পুরে খাওয়ার খোঁজার চেষ্টা করছে। আমি দাঁড়িয়েই আছি দেখে পেয়ারাওয়ালার সাথে গল্প করা বাদ দিয়ে ফুটপাথবাসীনী মেয়েটি এগিয়ে আসে তার শিশুকন্যার দিকে। আমি ধীরপায়ে এগিয়ে যাই ওদেরকে পেছনে ফেলে। বারে বারেই তবু নিজের অজান্তেই যেন ঘাড় ঘুরে যায় ফেলে আসা পথে, শিশুটির দিকে। মায়ের ছেঁড়া আঁচলের আড়ালে শান্ত হয়েছে ছোট্ট মেয়েটি। দেখতে পাই, কটমিটিয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে ওর মা। আমি শিশুটিকে মাথা থেকে নামিয়ে পা চালাই তাড়াতাড়ি।


দু'দিন ধরে ও‌ই ফুটপাথবাসী মা ও মেয়েটি আমার মাথায় নড়ে চড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে অবিরত। আজ সকালেও জানলার ধারে বসে আধখানা বোজানো পুকুরে হারিয়ে যাওয়া পানকৌড়ি দুটিকে খোঁজার চেষ্টা করছিলাম মনে মনে। মন চলে যায় পেছনদিকে। বেশ অনেকটা পেছনে।

নাটোরের মেয়ে নীলুর সাথে আমার আলাপ হয় এই কলকাতাতেই। আমার পুরনো বাড়িতে একদিন আমাদের পরিচিত এক লোকের সাথে নীলু এসেছিল একটি সাহায্যের আবেদন নিয়ে। না। টাকা-পয়সার সাহায্য নয়, নীলু এক জজসাহেবের স্ত্রী। টাকা পয়সার তার অভাব নেই। সমস্যাটি কি সেটিও নীলু নিজমুখে বলতে পারছিল না। সাথে করে নিয়ে আসা চেনা মানুষটি আমাকে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে গল্পটি শোনালেন।

নীলু কলকাতায় এসেছে একটি শিশু সন্তানের জন্যে। নিজে সন্তান ধারণে অক্ষম নীলু শুনেছে কলকাতায় নাকি যেখানে সেখানে ফেলে যাওয়া, পরিত্যাক্ত শিশু পাওয়া যায়। সেই রকমই একটি শিশু নিজের জন্যে চায় নীলু। মা হতে চায় নীলু। বেশ কয়েকদিন ধরে কলকাতায় একটি হোটেলে নীলু ছিল তার স্বামীর সাথে, ছুটি শেষ বলে স্বামী তার ফিরে যাবে দেশে, নীলু থেকে যেতে চায় কলকাতাতেই, যতদিন না একটি শিশু খুঁজে পাওয়া যায়, যাকে নীলু মানুষ করবে নিজের সন্তান বলে। একা মহিলা হোটেলে কি করে থাকবে অনির্দিষ্ট কাল, তাই তার স্বামীর কোর্টের এককালীন মুহুরী সুশীলবাবুর দ্বারস্থ হয় নীলু, সুশীলবাবু তাকে আমার কাছে নিয়ে আসে, কিছুদিন যদি আমি থাকতে দিই আমার বাড়িতে!

খানিক বাকরুদ্ধ অবস্থায় থেকে ঘরের ভেতরে যাই নীলুর কাছে। নীলুকে বলি, থাকুন আপনি আমাদের কাছে, আপনার যতদিন প্রয়োজন। নীলু উঠে এসে আমার হাত দুটি নিজের হাতে নিয়ে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলে। বলে, আপনাদের কষ্ট হবে জানি কিন্তু আমি নিরূপায়!

গড়পরতা বাঙালীর তুলনায় একটু বেশিই লম্বা বলে মনে মনে আমার বেশ একটা অকারণ অহংকার ছিল কিন্তু নীলুর সামনে নিজেকে আমার বেঁটে বলে মনে হল। কম করেও পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি লম্বা ( পরে জেনেছি নীলুর উচ্চতা পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি) নীলু আর তেমনি দশাসই চেহারা। গায়ের চকচকে কালো রঙে আলো যেন ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। মাথায় তেমনি কুচকুচে কালো কোঁকড়া চুল ঘাড়ের উপরে ছোট করে কাটা। বাঙালী বলে ভাবা শক্ত নীলুকে। ধবধবে সাদা মুক্তোর মত দাঁতে নীলুর হাসিটি ভারী মিষ্টি। তবে নীলুর মুখে হাসি আমি কমই দেখেছি।

সুশীলবাবুর সাথে নীলু তখনকার মত বেরিয়ে যায়, ওর স্বামী চলে গেলে জামা কাপড় নিয়ে আমার এখানে নীলু থাকতে আসবে পরদিন সকালে। নীলুর স্বামী তখন নীলুর সাথে আসেননি, শুনলাম তার মত নেই নীলুকে এভাবে এখানে রেখে যাওয়ার, একে বিদেশ তায় অচেনা লোকের বাড়িতে এভাবে জোর করে অতিথি হওয়া। আমার কেন জানি মনে হল, যেটুকু শুনলাম গল্প বোধ হয় শুধু এটুকুই নয়। কিন্তু প্রায় অপরিচিত একজন মানুষের কাছে তার ব্যাক্তিগত কোন কথা জানতে চাওয়াটা শোভন নয় বলে মুখে হাসি ধরে রেখে নীলুকে বিদায় দিই, কাল সকালে নীলু আসবে থাকতে।

বিকেলে আবার ডোরবেল। নীলু। স্বামীকে সাথে করে নিয়ে এসেছে আলাপ করিয়ে দিতে, কোথায় থাকবে কাদের কাছে থাকবে সেটাও ভদ্রলোক দেখে যাবেন! ইনি পলু! নীলু আলাপ করিয়ে দিল। জজসাহেবকে আগে কখনো না দেখলেও তার আসল নামটি আমার অজানা বা অচেনা নয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কোর্টের তখনকার সাবজজ ইনি। জমি-জমা সংক্রান্ত একটি মামলার জেরে আব্বা কোর্টে গেছিলেন একবার, তখন এই জজসাহেবের নাম শুনেছি আব্বার মুখে। ধপধপে ফর্সা গায়ের রং। মাঝারি উচ্চতার পলুকে ভীষণ ভালো দেখতে। ভীষণ মিষ্টি এক হাসি পলুর মুখে। ধন্যবাদ জানাতে এসেছে পলু। নীলুকে যেন একটু দেখি এই আবেদন পলুর চোখে মুখে ।

পরদিন নীলু আসে স্যুটকেস সহ। সুশীলবাবুও আসেন সাথে। ইনি সারাদিন ঘুরে বেড়ান নীলুকে সাথে নিয়ে। বস্তিতে, হাসপাতালে অনাথ আশ্রমে। একটি অনাথ বা পরিত্যাক্ত শিশুর খোঁজে। সকালে বেরিয়ে নীলু রাতে ফেরে। মুখ হাত ধুয়ে আমার কাছে বসে গল্প করে, সারাদিনে কোথায় কোথায় গেল, কী কী দেখল। বাচ্চা বোধ হয় এবার একটা পাওয়া যাবে! আরো নানান কথা। নীলুর নিজের কথা। ধীরে ধীরে জানতে পারি নীলুর গল্প।

নাটোরের এক বিশাল বড়লোকের একমাত্র মেয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে প্রেমে পড়ে কুষ্টিয়া থেকে পড়তে আসা এক নিম্নবিত্ত ছেলে রাশেদ ( সঙ্গত কারণে আসল নামটি দিলাম না)। কিভাবে কখন দুজনে কাছে আসে, প্রেমে পড়ে সে নীলু নিজেও জানে না। ইউনিভার্সিটিতে নীলুকে ছেলে-মেয়েরা কম ক্ষেপায় না কালো কুচ্ছিত বলে। নিগ্রো বলে লোকে প্রকাশ্যেই আওয়াজ ডেয় নীলুকে। ছেলেবেলা থেকেই শুনে শুনে এসব নীলুর গা সওয়া। কান দেয় না সে এই সব কথা বা আওয়াজে। রাশেদ একমাত্র ব্যাতিক্রম যে কোনদিন নীলুকে তার চেহারা নিয়ে কিছু বলেনি। নীলু নিজেও জানে যে রাশেদের সঙ্গে ওকে মানায় না। কিন্তু প্রেম! সে যে মানে না মানা।।

বাড়িতেও এক সময় জানাজানি হয়ে যায়। প্রবল শাসন হয় দু' তরফ থেকেই। নীলু আর রাশেদ লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলে পড়াশোনা শেষ না করেই। নীলুর বাবা মেয়েকে বলে দেন, সে যেন আর মুখ না দেখায় বাবাকে। রাশেদের বাবা বলেন, তার স্বপ্ন ছিল ছেলে তার হাকিম হবে। কোথায় হাকিম কোথায় কি, ছেলে কোথা থেকে এই অলম্বুস ঘরে নিয়ে এসেছে! রাশেদের বাবা যদিও তাড়িয়ে দেন না বাড়ি থেকে কিন্তু কিছু শর্ত আরোপ করেন। খেতে পরতে দেবেন তিনি ঠিকই ছেলে-বৌকে কিন্তু রাশেদের পড়াশোনার খরচ তিনি আর দেবেন না। রাশেদ মেনে নেয় সব শর্ত। নীলুর কানে সবই আসে। মাথা নত করে চুপ করে থাকে নীলু।

চারদিকে তখন ইংরেজি মাধ্যম স্কুল সবে মাথা গজিয়ে উঠতে শুরু করেছে। সেই রকমই একটা স্কুলে চাকরী নেয় নীলু। রাশেদকে পড়া শেষ করার জন্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত পাঠায় সে। ভাত কাপড় তো শ্বশুরই দেন, নীলুর চাকরীর পয়সায় পড়াশোনা চলে রাশেদের। ততদিনে সে নতুন নাম পেয়েছে নীলুর কাছ থেকে। পলু। ঢাকায় বেড়াতে গেছিল ওরা একবার। সেখানে চিড়িয়াখানা দেখতে গিয়ে কী এক অদ্ভুত পাখি দেখেছিল ওরা, পলু পাখি। সেই থেকে রাশেদ হয়ে যায় পলু।

নীলু যখন জানতে পারে সন্তান ধারণে তার সমস্যা আছে ততদিনে তার বিয়ের বয়স দশ বছর পার। বিয়ের প্রথম কয়েক বছর সে নিজেও সন্তান চায়নি, পলুর পড়াশোনা, তার নিজের চাকরী, বাপের বাড়িতে সমস্যা, শ্বশুর বাড়িতে সমস্যা সব মিলিয়ে নীলু আর পলু ঠিক করেছিল যখন সব ঠিক হয়ে যাবে, পলুর চাকরী হয়ে যাবে, নীলু নিজের পড়াশোনা শেষ করবে তারপরেই তাদের বাচ্চাকে তারা আনবে পৃথিবীতে। জীবনের সব হিসেব যেমন মেলে না নীলু আর পলুর এই হিসেবও মেলেনি।

পলু হাকিম হয়েছে, নীলুর বাবা মেয়ের বিয়ে মেনে নিয়ে সব ঝামেলা মিটিয়ে নিয়েছেন। মা মরা একমাত্র মেয়েকে কতকাল আড় নিজের থেকে দূরে রাখবেন তিনি। শ্বশুরমশাইয়ের স্বপ্নও পূরণ হয়েছে, ছেলে তার হাকিম হয়েছে। ঢাকায় নীলু থাকে একটা ভাড়াটে বাড়িতেপলুর পোষ্টিং নারায়ণগঞ্জে। স্কুলের চাকরী করাকালীন নীলু আরেকটা কাজ করত, গার্মেন্টস ফ্যাকট্রিতে একটা পার্ট টাইম চাকরী। তো পলু যখন চাকরী পেয়ে গেল, নীলু তার চাকরী-বাকরি ছেড়ে দিয়ে ইউনিভার্সিটিতে ফেরত গেল। মাষ্টার্স কম্পলিট করে নীলু ঢাকায় এসে একটা ছোট কারখানা দিল, সুতোর। যে সুতো গার্মেন্টস ফ্যকট্রিতে লাগে। বিদেশ থেকে বান্ডিল বান্ডিল সুতো আসে, নীলুর ছোট্ট কারখানায় সেই সুতো ছোট ছোট রীলে ঢুকে বাক্সবন্দী অবস্থায় বাজারে যায়। ছোট হলেও ব্যবসা মন্দ না। নীলুর সময়ও কেটে যায়। কোন সপ্তাহান্তে নীলু যায় নারায়ণগঞ্জে তো কোন সপ্তাহান্তে পলু আসে ঢাকায়। নীলুর শ্বশুর, দেওর থাকে নীলুর কাছে। মাঝে মাঝে বাবাও আসেন। জীবনের গতি বেশ মসৃণ।

সব যখন স্থিত হয়ে আসে নীলু তখন মা হতে চায়। কিন্তু চাইলেই কী সব হয়! নীলুর মা হওয়া হয় না। ডাক্তার -বদ্যি -কবিরাজ -হোমিওপ্যাথি-টোটকা- তাবিজ সব হয়ে যায়। কিছুতেই কিছু হয় না। নীলুর শরীরে এমন কিছু অসুবিধে আছে যার জন্যে সে মা হতেই পারবে না। আত্মীয়-স্বজনরা পরামর্শ দিলেন, কলকাতা যাও, ওখানে বড় বড় সব ডাক্তার আছে, কিছু একটা হবেই ওখানে গেলে। দরকার হলে টেষ্ট টিউব বেবি নিয়ে নাও। নীলু পলু দুজনেই কলকাতায় আসে, যায় ডাক্তার বৈদ্যনাথ চক্রবর্তীর কাছে। চীকিৎসায় সাড়া দেয় নীলু, সন্তান সম্ভাবনা হয় তার। নিশ্চিন্ত, খুশি মনে দেশে ফিরে যায় নীলু। কিন্তু নীলুর জীবনে আরো অনেক ঘটনা ঘটার ছিল। ৩ মাসের সময় গর্ভপাত হয় নীলুর। সেই ধাক্কা সামলে নিয়ে নীলু আবার কলকাতায় আসে। কিন্তু নীলুর আর গর্ভ সঞ্চার হয় না। পাগলের মত নীলু দৌড়ে বেড়ায় ঢাকা-কলকাতা আর ঢাকায়। বুড়ো বাবাকে নিয়ে মাসের পর মাস পরে থাকে কলকাতায়। কিছুতেই কিছু হয় না।

সেবার নীলু দু'মাস কলকাতায় থেকে ঢাকা ফিরে যায়। ঢাকায় পৌঁছোয় সে ভোরবেলা, যাওয়ার খবর না দিয়েই নীলু ফিরে গিয়েছিল ঢাকায়, নিজের বাড়িতে। ডোরবেল বাজাতে পলু এসে দরজা খুলে দেয় আর নীলুকে দেখে চমকে ওঠে। পলুর চমকানো খেয়াল না করে নীলু ঘরে ঢুকে যায় ততক্ষণে নীলুর বেডরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে নাইটগাউন পরা অল্প বয়েসী একটি মেয়ে। নীলুকে দেখেই যে ষ্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে দরজায়। নীলু চিনতে পারে মেয়েটিকে, নারায়ণগঞ্জে পলুর কোয়ার্টারের পাশের কোয়ার্টারেই থাকে মেয়েটি, ম্যাজিষ্ট্রেটের বউ।

ভাল করে তাকিয়ে দেখে নীলু পলুর দিকে, খালি গায়ের পলুর পরনে শুধু একটি লুঙ্গি। মেয়েটি সাত-আট মাসের অন্ত:সত্বা। পলকেই হাজরটা ভাবনা আসে নীলুর মাথায় কিন্তু তবুও নীলু যেন কিছুই বুঝতে পারে না। স্যুটকেস হাত থেকে নামিয়ে রেখে পাশেই বসে পরে নীলু। পলু ততক্ষণে খানিকটা সামলে নিয়েছে নিজেকে, বলে, নীলু, তুমি ওঠো, ভেতরে চলো, আমি তোমাকে বলছি সব। মেয়েটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েই থাকে। কাউকে কিছু না বলে নীলু উঠে নিজের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়, তাকায় ভেতরে, বিছানার পাশেই অগোছালো হয়ে পড়ে আছে খুলে রাখা শাড়ি, ব্লাউজ। পলুর শার্ট প্যান্ট। পেছন ফিরে নীলু জানতে চায় শ্বশুরের কথা, আব্বা কোথায়? পলু জবাব দেয়, আব্বা বাড়িতে গেছেন।

নীলু নিজের স্যুটকেস নিয়ে উল্টোপায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় পলুর শত ডাক অগ্রাহ্য করে। নীলু গিয়ে ওঠে তারই এক খালাতো বোনের বাসায়, যিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন অধ্যাপিকা, স্ত্রীরোগ বিষয়ের। তার কাছ থেকে নীলু জানতে পারে, ও‌ই মেয়েটিকে পলু লুকিয়ে বিয়ে করেছে অনেকদিন। প্রেম চলছিল তারও অনেক আগে থেকেই, একদিন অশালীন অবস্থায় তাদের দুজনকে দেখতে পেয়ে মেয়েটির স্বামী তালাক দেয় মেয়েটিকে। তারপর থেকে সে পলুর কাছেই থাক, পলুর কোয়ার্টারে। সেই ম্যাজিষ্ট্রেট ট্রান্সফার নিয়ে চলে গেছে অন্য কোথাও। নীলু ঢাকায় না থাকলেই মেয়েটিকে পলু তার বাড়িতে নিয়ে আসে, দুজনে থাকে নীলুরই ঘরে, তারই বেডরুমে। আত্মীয় স্বজনেরা এতদিনে মোটামুটি সবাই জেনেই গেছে পলুর দ্বিতীয়বার দ্বার পরিগ্রহের কথা। জানত না শুধু নীলু। বাচ্চা বাচ্চা করে নানান জায়গায় ছোটাছুটি, মাসের পর মাস কলকাতায় এসে থাকা, ডাক্তার দেখানো, চীকিৎসা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত নীলু জানতেই পারেনি কখন তার বাসরে চোর ঢুকেছে আর চুরি করে নিয়ে গেছে তার জন্মের ধন, তার সবচাইতে মূল্যবান পলুপাখি।

মাস তিনেক নীলু থাকে তার বোনের বাড়িতে। একবার ঘুমের ওষুধ বেশি পরিমাণে খেয়ে মরেও যেতে চায় কিন্তু কত কী যে দেখার বাকি! মরে গেলে দেখবে কে? নীলু শুনতে পায়, রীমা এখন নীলুর বাড়িতেই থাকে। শ্বশুর গ্রাম থেকে ফিরে এসে নীলুর সাথে দেখা করেন, নীলুকে বলেন, যা হওয়ার তা তো হয়েই গিয়েছে, তুমি এবার বাড়ি চল। আত্মীয়-বন্ধুদের প্রায় সকলেই আসে নীলুর সাথে দেখা করতে। নানা জনের নানান পরামর্শ। কেউ বলেন কেস ঠুকে দে তো কেউ বলেন, মেয়েদের কপালটাই এরকম হয়, মেনে নাও আড় কীই বা করবে! নীলু কোনটাই করে না। ডিভোর্সের নোটিশ পাঠায় পলুকে।

ইতিমধ্যে পলু প্রায় প্রতিদিনই ফোন করে কথা বলার চেষ্টা করেছে নীলুর সাথে, নীলু কথা বলেনি। নিজে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা চুপচাপ বসে থেকেছে ড্রইং রুমে, নীলু দেখা করেনি, কোন কথা শোনেনি, বলেনি।

খবর আসে, পলুর ছেলে হয়েছে। নোটিশ ততদিনে পৌঁছে গেছে পলুর কাছে। পলু নাটোর যায় নীলুর বাবার কাছে, সাথে করে ঢাকায় নিয়ে আসে নীলুকে বোঝানোর জন্যে। কেউ যদি নীলুকে বোঝাতে পারে তো সে একমাত্র নীলুর বাবা। পলু সেটা জানত। অনেক চোখের জল, অনেক মান-অভিমান আর অনেক ক্ষমা-প্রতিশ্রুতির পালা। নীলু ফিরতে রাজী হয়, তবে ও‌ই ফ্ল্যাটে নয়। যে ফ্ল্যাটে পলু মেয়েছেলে নিয়ে এসে তুলেছে সেখানে নীলু যাবে না। পলু তাতেই রাজী। ও‌ই বাড়িরই দোতলার ফ্ল্যাটে নীলু এসে ওঠে। তিনতলার ফ্ল্যাটের কোন জিনিসপত্র নীলু ছুঁয়েও দেখতে আর রাজী নয়, সব নতুন করে আসে আবার। এবার নীলু আর সংসার গোছায় না।। একা থাকে নীলু। নিজগৃহেই নীলু থাকে মেহমানের মত। শ্বশুর, দেওর কাউকেই নিজের কাছে নিয়ে আসে না

পলুর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে আসে ধীরে ধীরে, সময়ের সাথে সাথে। সময় নাকি সব ক্ষতকেই সারিয়ে দেয়। নীলর ক্ষত সারে না। পলুর ছেলেটি দেখতে ভারী মিষ্টি। বাপের মতই দেখতে হয়েছে অনেকটা। যখন তখন সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে নিচে, মা'য়ের কাছে। পলু ছেলেকে শিখিয়েছে নীলুকে মা বলে ডাকতে। নীলু ভুলতে চেষ্টা করে সব ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে। ভোলা যায় না কিছুই। ক্ষত আরও তাজা হয়ে ওঠে রীমার ব্যবহারে। রীমা এক পারফেক্ট সপত্নী । পলু যতই বলুক, বাবুটা নীলুর কিন্তু নীলু জানে, ও পলু আর রীমার বাবু। তার নয়।

নীলু আবার কলকাতায় আসে, এবার সাথে পলু। ডাক্তার জবাব দেয়, নীলুর পক্ষে মা হওয়া সম্ভব হবে না কোন কালেই। নীলু দেশে ফিরে যেতে রাজী হয় না।। নীলু শুনেছে, এখানে পথে ঘাটে মানুষের বাচ্চা পড়ে থাকে। একটা বাচ্চা নিজের জন্যে পেয়ে গেলেই ও দেশে ফিরে যাবে। নীলুকে একা ছাড়তে পলরু কিন্তু কিন্তু দেখে সুশীলবাবুকে সঙ্গে নিয়ে নীলু এসে হাজির হয় আমার বাড়িতে। পরামর্শটি ছিল সুশীলবাবুরই। একটা বাচ্চা দ্ত্তক নেওয়ার পরিকল্পনা করে থেকে যেতে চায় কলকাতাতেই।

শুরু হয় নীলুর খোঁজার পালা। কলকাতার হেন হাসপাতাল, এতিমখানা, হোম নেই যেখানে নীলু যায়নি একটি সদ্যোজাত শিশুর জন্যে। সঙ্গী কখনো সুশীলবাবু তো কখনো আমি। নীলুর মনোবাঞ্ছা পূরণ হয় না। সারাদিন ঘুরে ঘুরে সন্ধেবেলায় ক্লান্ত নীলু বাড়ি ফিরে চুপটি করে শুয়ে থাকে। কখনো গল্প করে, পুরনো দিনের।। পলুর কথা বলে। পলুর প্রতি এখন তার আর কোন রাগ-বিরাগ নেই। একটা অদ্ভুত নিরাসক্তি বোধ করে সে পলুর প্রতি। কোন অনুভূতিই আর যেন অবশিষ্ট নেই। এই অবস্থায় তুমি আছো কেন পলুর সাথে? প্রশ্ন করে জবাব পেয়েছিলাম, কে জানে, কেন যে আছি নিজেও জানি না!

সুশীলবাবু একদিন খবর নিয়ে আসে, কলকাতার অদূরে বাটা'য় একটি অবিবাহিত মেয়ে সন্তানসম্ভবা। অতি নিম্নবিত্ত ঘরের মেয়েটীকে তার প্রেমিক বিয়ের প্রাতিশ্রুতি দিয়েছিল, বিশ্বাস করে সে নিজেকে সণনপে দিয়েছিল প্রেমিকের বাহুতে, বিছানায়। সমস্ত পর্তিশ্রুতি সঙ্গে নিয়ে প্রেমিকপ্রবর হাওয়া সন্তান সম্ভাবনার খবর শোনামাত্রই। হাসপাতালে নিয়ে যায় মেয়েটির বাবা, ডাক্তার রাজী হয় না অ্যাবর্শন করাতে, মেয়েটির জীবনহানির আশঙ্কায়। উপায়হীন বাবা প্রায় একঘরে অবস্থায় অপেক্ষায় আছে, কবে বাচ্চাটি জন্মাবে, আর সে নিয়ে গিয়ে কোন হোমে দিয়ে আসবে। নীলু পৌঁছে যায় সেখানে, অনাগত সন্তানটি সে নিতে চায়, নিজের সন্তান পরিচয়ে মানুষ করবে সে। তারা রাজী হয়। বাচ্চা তো তারা কাউকে না কাউকে দিয়েই দেবে, ভালই হল। নীলু বাটাস সাঁতরে সেদিন বাড়ি ফিরে আসে।। নাহয় আরও মাস দুই সই! মাস দুই আরও অপেক্ষা করতে হবে, তা হোক! এতকাল তো নীলু অপেক্ষাই করে আছে।

প্রায় প্রতিদিনই সকাল সকাল নীলু রেডি হয়ে বেরিয়ে যায় হাওড়া ষ্টেশনের উদ্দেশ্যে, সুশিলবাবুকে সঙ্গী করে সে পৌঁছে যায় মেয়েটির বাড়িতে। হাতে করে নিয়ে যায় নানারকম ফল, খাবার, জামা-কাপড়। স্থানীয় হাসপাতালে নীলু নিজে নিয়ে যায় মেয়েটির চেকআপ করাতে। সারাদিন কাটিয়ে সন্ধেবলায় বাড়ি ফেরে ক্লান্তমুখে উজ্জ্বল এক হাসি নিয়ে। নীলুর এই হাসি দীর্ঘস্তায়ী হয় না। পালিয়ে যাওয়া প্রেমিকপ্রবর ফিরে আসে, দায়িত্ব নিতে চায় তার পিতৃত্বের। খুশির ঢল নামে বাটা'র এক টালির চালের এক কামরার ভ্যানচালকের বাড়িতে। বাড়ির সামনের মন্দিরে পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা রাতারাতি মালাবদল করিয়ে দেয়, ছেলেটি তার সিদ্ধান্ত পাল্টানোর আগেই।

একদিন সকালবেলা সুশীলবাবুই খবরটা নিয়ে আসে। নীলুর সে কি বুকফাটা কান্না। বিছানায় উপুড় হয়ে হাত চাপড়ে চাপড়ে কান্না মুখে আহাজারি। নীলুকে এমনকি সান্তনা দেওয়ার জন্যেও আমার মুখে কোন কথা যোগায়নি। ফোনে সুশীলবাবুই খবর দেয় পলুকে, নীলু এখানে প্রচন্ড আপসেট আর বাচ্চা পাওয়ার আশাও না এর বরাবরই। পলু পত্রপাঠ নীলুকে দেশে ফিরে যেতে বলে।
সর্বশেষ আশাটুকু বিসর্জন দিয়ে নীলু ফিরে যায় খালি হাতেই।

কিছুকাল নীলুর সাথে যোগাযোগ ছিল। মাঝে মাঝে চিঠি লিখত নীলু। চিঠিতে নানান কথা-গল্প করত নীলু কিন্তু নিজের কোন কথা লিখত না। আমি ঢাকায় গেলে নীলুকে দেখে আসতাম। সেই একই বাড়ির দোতলা- তিনতলায় নীলু আর রীমা থাকে যে যার মত। পারতপক্ষে কেউ কারোর মুখদর্শন না করলেও অতিথি অভ্যাগত এলে রীমা নেমে আসে নিচে, নীলুর ঘরে, ড্রয়িংরুমে বসে থেকে অতিথি আপ্যায়ণ করে। ছেলেটিই শুধু যখন তখন সব নিয়মভঙ্গ করে ঢুকে পড়ে নীলুর ঘরে মা মা বলে। পলু আর রীমার আরেকটি ছেলে হয়েছে শেষবার দেখে এসেছিলাম।



Saturday, March 22, 2008

তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা

তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা
--------------------


ঘুম ঘুম চোখে চলে অপেক্ষা। কে যেন পাশে শুয়ে আছে লম্বা হয়ে। চমকে উঠে কাউকে দেখতে পাই না। একছুটে ডাইনিং পেরিয়ে সামনের ঘর। দরজা খুলে তাকিয়ে দেখি অন্ধকার সিঁড়ি। কেউ কোথাও নেই। ভয় লাগে ভীষণ। দরজা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি দরজার গা ঘেঁষেই। বুকের ভেতর হৃদপিন্ড যেন ড্রাম বাজায়। দরজা ধরে দাঁড়িয়েই থাকি আমি। নিশুতি রাত। বাইরে বিলাপ করে বসন্ত বাতাস। জানালার পাশ দিয়ে উড়ে যায় এক নিশাচর পাখি, যেতে যেতে অদ্ভুত এক হাড়হিম করা স্বরে ডাক দিয়ে যায়। পর্দা টেনে দিই ভাল করে, এতটুকু ফাঁকও যেন না থাকে। পানি খাই আর নিজেকেই বলি, আমার ঘরে আর কেউ থাকে না আমি ছাড়া!


বসন্ত বাতাসে সই গো
-----------------


দিনের বেলা কাঠাফাটা রোদ্দুর কিন্তু বিকেল হলেই হাওয়া বইতে থাকে। উতল হাওয়া। বসন্ত বাতাস। কুউউউ শব্দে সে জানান দেয়, আবার এসেছে ফিরিয়া বসন্ত। ডালে ডালে রক্তলাল পলাশ। বাতাসে ওড়ে পর্দা। ন্যাড়া জামগাছে কচি সবুজ পাতা, মুকুলে ছেয়ে গেছে গাছ। পশ্চিমের গাছগুলো এই বসন্তে নেই। সেখানে এখন মিস্ত্রিদের যাতায়াত, ইট, কাঠ, লোহা আর সিমেন্ট। আধখানা পুকুর জুড়ে বাঁশের বেড়া, পড়বে মাটি, হবে বসত। পানকৌড়িদের তাই আর দেখা যায় না। কে জানে কোথায় আছে তারা।


দে দোল দে দোল
-----------


ফাগুন লেগেছে বনে বনে/ 
ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে মনে মনে।। 
এই ফাগুনে নানা রঙের মেলা। গাছে গাছে, ডালে ডালে আর সকলের মনে মনেও। আবির তাই আমার দরজায় এসে টোকা দেয়, রাঙিয়ে দেয় আমাকেও। না। এই উৎসবে লালপাড় হলুদ শাড়ি নেই, গাঁদা ফুলের মালা নেই, নাচ নেই, গান নেই। তাতে কী। ফাগুনের তাতে কীই বা এসে যায়! শান্তিনিকেতনে তুমি যাও বা না যাও ক্ষতি নেই, সে নিজেই এসে যাবে তোমার ঘরে, টেলিভিশনের দৌলতে। সারাদিন বসন্ত উৎসব। চ্যানেলে চ্যানেলে। লাইভ। জীবন্ত!
সকাল বেলায় ঋতু গুহ'র সাক্ষাত্কার একটা আসল পাওনা। তাঁর কথা, তাঁর চোখের জল। আদ্র হয় মন।


আরও কী সব যেন লিখব ভেবেছিলাম, ভুলে গেছি।


আজ থাক...