Sunday, December 23, 2007

চিত্রকর তুমি চিত্র আঁকো...



সেদিন বসেছিল এক তারার মেলা। না। শুধু সেদিন নয়, মেলা বসেই ছিল তিন দিন ধরে। ওল্ড কেনিলওয়ার্থ হোটেলের লনে সকাল থেকে সন্ধে অব্দি সেই মেলা চলেছিল তিনদিন ধরে। বাংলাদেশের চিত্রজগতের নামি-দামি সব চিত্রকর তারকারা ইংরেজ জমানার পুরনো ঐ হোটেলবাড়িটিকে আলোকিত করে রেখেছিলেন নিজেদের উপস্থিতি দিয়ে, অমূল্য সব শিল্পকর্ম তাঁরা সৃষ্টি করেছেন অযত্নে ফেলে রাখা বহুদিন না ছাটা ঘাসের ঐ লনে।



তারকাদের ঐ মেলায় আমার পৌঁছুনোর কোন কারণ ছিল না কিন্তু তবুও পৌঁছে গেলাম। বন্ধুবর রামস্বামী ফোন করে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের কিছু চিত্রকর আসছেন একটা আর্ট ক্যাম্পে, আমি যেন অবশ্যই যাই, আমার ভালো লাগবে আর হয়তো একটা ব্লগও লিখে ফেলতে পারবো ক্যাম্প ঘুরে এসে! শেষ লাইনটি উনি অবশ্য ঠাট্টা করেই বলেছিলেন। কে কে আসছেন জানতে চাইলে একটি পরিচিত নাম শুনতে পেলাম, শাকুর স্যারের নাম। আরো দুটি নাম বলতে পারলেন রামস্বামী, রোকেয়া সুলতানা ও নাসরিন বেগম। শেষোক্ত নাম দুটির সাথে আমি পরিচিত নই, আর প্রথম নামের সাথেই শুধু পরিচিত, মানুষটির সাথে নয়।


সুমেরু সেদিন নন্দীগ্রামে। মহাশ্বেতা দেবীর সাথে রিলিফ নিয়ে ওখানে গেছে আগের দিন। রবিবার ফেরার কথা বিকেল নাগাদ। বারে বারেই ফোন করি, ফোন থাকে নট রিচেবল। অবশেষে বিকেল প্রায় চারটে নাগাদ কুন্ঠিত পায়ে গিয়ে ঢুকি পুরনো কেনিলওয়ার্থ হোটেলের লনে। রামস্বামি দুটি নাম বলে দিয়েছিলেন, দীপালী আর জর্জ। যারা এই ক্যাম্পের উদ্যোক্তা। তাদের কাছে আমার কথা বলে এসেছিলেন, বিশিষ্ট এক বাংলাদেশী ব্লগার ও লেখক আসবেন, তাঁকে যেন খাতির করা হয় ও অতিথিদের সাথে আলাপ পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়! খাতির পাবো কিনা ভাবনা সেটা নয়, সম্পূর্ণ অচেনা এক জায়গায় অচেনা কিছু মানুষের সাথে আলাপ করতে যাচ্ছি যে কাজটিতে আমি খুব একটা স্বচ্ছন্দ নই। কিন্তু যাঁরা এসেছেন তাঁরা আমার দেশের মানুষ শুধু এই কথাটি মাথায় রেখে পায়ে পায়ে হাজির হই।


তখন শিল্পিরা সেদিনকার মতো কাজ সেরে নিজের নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকেছেন, খানিকটা জিরিয়ে নেবেন বলে। লনে শুধু একজন বয়স্ক মানুষ ক্যানভাসে তখনও দিয়ে যাচ্ছেন তুলির আঁচড়। দু-চারজন এদিক ওদিক ইত:স্তত ঘুরে বেড়ানো মানুষ দেখে বুঝতে পারি এরা হোটেলের লোক, জর্জের কথা জিজ্ঞেস করায় এক অবাঙালি মানুষের দিকে হাত ইশারায় দেখিয়ে দিলেন একজন। নিজের পরিচয় দিতে জর্জ বলে, ও ইয়েস! রামাস্বামি তোমার কথা বলেছে কিন্তু আজকের মত ওয়ার্কশপ তো শেষ! এখন এঁরা সব বেরিয়ে যাবেন, কেউ কেউ গেছেনও, তুমি বরং কাল এসো সকালে, সারাদিক থাকো, আমাদের সাথে লাঞ্চ করো। সবার সাথে আলাপ পরিচয়ও হয়ে যাবে! আমি লনের ওমাথায় ইশারা করে জানতে চাই, উনি? ও হাশেম খান আছেন এখনো! এসো আলাপ করিয়ে দেই। হাশেম খান! আমি চমকিত হই নামটি শুনেই। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাই কোমরে অ্যাপ্রন বাঁধা আঁকায় মগ্ন মানুষটির দিকে।


জর্জ আলাপ করিয়ে দেয় বাংলাদেশেরই মানুষ আর লেখক বলে। পাশেই প্লাষ্টিকের টেবলে রাখা তোয়ালেতে হাতের রং মুছে বললেন, এসো ঘরে গিয়ে বসবে, সেখানেই কথা বলা যাবে। লন পেরিয়ে তিনি এগুলেন হোটেলবাড়ির দিকে, একবার থেমে লনের কোণের টেবলে রাখা চায়ের সরঞ্জাম থেকে দুটি কাপ তুলে নিয়ে ফ্লাস্ক থেকে জল গরম জল নিয়ে দুধ চিনি মেশালেন আর তুলে নিলে চায়ের দুটি ব্যাগ। চায়ের একটা কাপ আমার হাতে দিয়ে এগুলেন ঘরের দিকে। হোটেলে ঢোকার মুখে তিনজন মহিলা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে এগুচ্ছিলেন বাইরের গেটের দিকে, খান সাহেব তাদের একজনের দিকে তাকিয়ে ডাক দিলেন, রোকেয়া, পরিচয় করো, ইনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেয়ে, আমার শ্বশুরের দেশের মানুষ! রোকেয়া একটি শুকনো হাসি দিয়ে বললেন, স্যার আমরা তো এখন বাইরে যাইতেছি, পরে কথা হবে! আন্দাজ করি, অপর দুজনের একজন বোধ হয় নাসরিন আর অন্যজন দীপালী। আমরা হোটেলের ঘরে গিয়ে ঢুকি। তিনতলার ঘরে যাওয়ার জন্যে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে খানিকটা হাঁপান শিল্পি। বলেন, পুরানো বাড়ি তো, এদের তিনতলা পাঁচতলার সমান!


একজন বয়স্ক মানুষ সেখানে আগে থেকেই ছিলেন। হাশেম খান আমার পরিচয় দিলেন নিজের শ্বশুরের দেশের লোক বলে, আর ওঁর পরিচয় দিলেন নবী স্যার বলে। তারপর আবার যোগ করলেন, রফিকুন্নবীর নাম শুনেছো তো? কার্টুন আঁকেন যে! র-ন-বী!! আমি সবে বসেইছিলাম সোফায়, এক লাফে দাঁড়িয়ে পড়ি। ইনি রনবী? মাই গুডনেস!! হাশেম খান হাসেন, তুমি তো চিনই তাইলে! আমি তাড়াতাড়ি বলি, চিনি বলতে উনার কার্টুন তো অনেক দেখেছি, ওঁকে আজকে দেখলাম! রনবী হাসেন। মানুষটির বয়স হয়েছে। গালে, চোখের নিচে কালচে ছোপ বলে দেয়, বয়েসের সাথে সাথে কিছু রোগও পুষছেন। আমি মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি আমার কল্পনার রনবীর সাথে সামনে বসে থাকা ঐ বয়স্ক মানুষটির সাথে। মেলাতে পারি না। মেলে না। মাথার অবশিষ্ট কয়েকগাছি পাঁকা চুল আর বেশ মোটা গোঁফের যে মানুষটি সামনে বসে আছেন তিনি প্রফেসর রফিকুন্নবী। সবাই যাঁকে নবী স্যার বলে ডাকে।


বিখ্যাত দুই শিল্পির সাথে খানিক গল্প করে রুমে বসেই আরেক কাপ চা খেয়ে নিচে নেমে আসি। গেটের মুখে একটি টাটা সুমো গাড়ি থেকে একজন মানুষ নামছেন, একনজর দেখে চেনা মনে হওয়াতে একটু থমকে দাঁড়াই, আর ততক্ষণে ঐ মানুষটিও আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, মনে করার চেষ্টা করছেন বোধ হয়, কোথায় দেখেছেন। আমি সামনে গিয়ে দাঁড়াই হাসিমুখে। মাহমুদুল হক স্যার। সুমেরুর সাথে চারুকলায় গিয়ে আলাপ হয়েছিল, গল্পও হয়েছিল। ঢাকা ক্লাবের নেমন্তন্ন রাখা হয়নি যদিও। উনি একনজরেই চিনতে পারলেন, বললেন, আরে তুমি! সুমেরু কই? গাড়ি থেমে নেমেছিল একটি মেয়েও, সেলফোনে কথা বলছিল অন্যদিকে তাকিয়ে, তার দিকে চোখ পড়তে আবার চমকাই, নার্গিস! নার্গিস সুমেরু বড়ভাইসম শিল্পি বন্ধু গৌতমদার স্ত্রী। বাংলাদেশের মেয়ে, ক্লাসিক্যাল মিউজিকে পিএচডি করছে রবীন্দ্রভারতী থেকে। গৌতমদার সাথে এখানেই আলাপ,প্রেম আর বিয়ে। মাহমুদুল হক স্যারের সাথে ওকে দেখে চমকাই তো বটেই। ততক্ষণে নার্গিসেরও চোখ পড়েছে আমার দিকে, ছুট্টে এসে জাপটে ধরে নার্গিস, স্যার জিজ্ঞেস করেন, আরে তোমরা একজনে আরেকজনরে চিন নাকি!









ক্রমশ--

2 comments:

  1. অনেকের সাথেই তো পরিচয় ঘটে গেলো

    ReplyDelete
  2. তা হলো।
    আমার সৌভাগ্য।

    ReplyDelete