Saturday, November 10, 2007

কি লিখি আমি...

হামানদিস্তায় রশুন থেতো করতে গিয়ে হামানদিস্তার ঠুক ঠাক আওয়াজের মাঝে কানে আসে আব্বার গলা, বলছেন, আম্মা'র হামানদিস্তাটা কই আছে কে জানে, থাকলে ওটা দিয়ে পান ছেঁচে খেতে পারতাম। মাঝে মাঝে বড় ইচ্ছা করে!

-পান আপনি হামানদিস্তাতেই কেন ছেঁচে খাবেন? ইচ্ছা করলে এমনিই তো খেতে পারেন! দাদুর তো চাপার দাঁত ছিল না তাই ছেঁচে খেত, আপনি কেন ছেঁচতে যাবেন?
-নাহ.. এমনি খেতে ইচ্ছা করে না। আম্মা যেরকম হামানদিস্তায় ছেঁচে খেতো, ঐরকম খেতে ইচ্ছা করে।
-তাইলে একটা হামানদিস্তা কিনে আনলেই তো পারেন। 
-তা পারি কিন্তু ইচ্ছা করে না। তোমার দাদুর হামানদিস্তাটা কই আছে, কার কাছে আছে কে জানে!


আটষট্টি বছর বয়েসের আব্বা আমার এখনো আকুল হয় মায়ের হামানদিস্তার জন্য। সেটায় করে মায়েরই মতন করে পান ছেঁচে খাওয়ার জন্য। আমার গলা বুজে আসে। কথা সরে না। আব্বাকে বলি,পরেরবার আমি হামানদিস্তা নিয়ে আসব আপনার জন্য, আপনি সেটায় দাদুর মতন করে পান ছেঁচে খাবেন।


হাসি তবুও ম্লান। মনে মনে তখনও খোঁজ সেই হামানদিস্তার।


ঝটিতি ঘুরে আসা এবাড়ি, ওবাড়ি। টেবিলভর্তি খাবারে ইলিশ হাজির এবেলা ওবেলা। তবু কে জানে কেন লাগে শূন্য  শূন্য। মন পড়ে থাকে ভাপ ওড়া চিতই আর হাঁসের ভুনা গোশতে।

পতেঙ্গার সমুদ্রে আমি আমার কৈশোরকে খুঁজে পাই না। যদিও প্রতিবার চট্টগ্রামে গিয়ে আমি একবার পতেঙ্গায় অবশ্যই যাই। প্রতিবারই দেখি একটু একটু করে বদলে যাওয়া এই ছোট্ট সমুদ্রতট। জোয়ারে যার সৈকত বলে কিছু থাকে না। নোনা পানি এসে আছড়ায় বাধানো পারে, ফেলে রাখা বোল্ডারে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে হুটোপাটি করে তৈরী হয়ে চলে যাই পতেঙ্গায়। ভোরবেলাকার সূর্য ওঠা দেখি বোল্ডারের উপরে বসে থেকে। ভাটা থাকলে হাঁটি সৈকতের এমাথা ওমাথা। অনেকক্ষণ থাকি। বেলা মাথার উপরে ওঠা পর্যন্ত। এবারে অনেকদিন পরে বিকেলে পতেঙ্গা গেলাম। বহুবছর পরে। এই বিকেলবেলার পতেঙ্গা যে এত বদলেছে ধারণা ছিল না। সমুদ্রের ধার ধরে বোল্ডারের এপারে যেন বাজার বসেছে। অনেকটা মেলার মতন কিন্তু মেলা নয়। আবার ঠিক বাজারও নয়। ঠান্ডা পানীয় বিক্রেতা বালতিতে করে রকমারী সব বোতল নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই না বাজার না মেলাময়। রকমারী সব পানীয়ের নামের শেষে আসে বীয়ার এমনকি বাংলা মদেরও নাম। তবে এই নামগুলো এরা উচ্চারণ করে আস্তে। অন্য লোকের কান বাঁচিয়ে।

এই পতেঙ্গা আমার চেনা নয়। এর সাথে আমার আলাপ হয়নি কখনও। সারাদিনের টিপটিপ বর্ষণের পরে এই বিকেলে বৃষ্টি থামলেও আকাশে মেঘের ঘনঘটা। ভরা জোয়ারের সমুদ্র যেন ফুঁসছে। সোঁ সোঁ গর্জনে আছড়ে আছড়ে ঢেউ এসে ভাঙছে বোল্ডারে। কয়েকটি ছেলে হাত ধরাধরি করে বোল্ডারের উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই স্নানের চেষ্টায় মগ্ন। জোয়ারের সময় সৈকত বলে কিছু থাকে না এখানে কিন্তু তাই বলে কী স্নান হবে না! হাত ধরাধরি করে বোল্ডারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সমুদ্রস্নান করে ওরা। দুলে দুলে গান গায়। সাবধানী নজর রাখে ঢেউএর দিকে। জোরে ঢেউ এলেই শক্ত করে ধরে একে অন্যের হাত। সমুদ্র দেখতে আসা মানুষেরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে ওদের স্নান করা দেখে। উচ্ছাস বাড়ে ওদের। গান গায় দুলে দুলে। যদিও সমুদ্রের গর্জন ভেদ করে বেশিদূর যেতে পারে না ওদের আওয়াজ। মেঘলা আকাশের বুক চিরে সাঁ করে উড়ে যায় ফাইটার প্লেন। নিমেষেই হারায় দিগন্তে। ফাইটার প্লেনের ছেড়ে যাওয়া ধোঁয়াও মিলিয়ে যায় ধীরে ধীরে।

কর্ণফুলীকে তবু খানিকটা চেনা যায়। যদিও তার চেহারাও অনেক বদলেছে। একধারের পার বাধানো আগেও ছিল তবে এমন ঝা চকচকে ভাবটা ছিল না। এই জায়গাটা আমার বেশ লাগে। জলের ধারে গেলে এমনিতেও আমার কথা বলতে ভালো লাগে না। চুপ করে বসে থাকতেই বেশি পছন্দ করি। এই নদীর একটা গল্প আছে না? মনে করার চেষ্টা করি। পাহাড়ী রাজার মেয়ে কানফুল হারিয়েছিল এখানে, যার থেকে নদীর নাম কর্ণফুলী। এরকমই কিছু একটা গল্প শুনেছিলাম ছোটবেলায়। কি নাম ছিল সেই রাজার মেয়ের? রাজার নামই বা কি ছিল? মনে পড়ছে না। এখন এই নদীর ধারে দাঁড়িয়ে সেই গল্পটাও আর কিছুতেই মনে করতে পারছি না। কাওকে প্রশ্ন করে জেনে নেব ভেবেও হয়ে ওঠে না। খানিক পরেই ভুলে যাই। মনে মনে ঢেউ গুনি। এক, দুই, তিন। খানিক পরেই আর ঢেউ গোনার ইচ্ছেটাও থাকে না। বসে থাকি রেলিং এর পরে। ঘোলা জলে কোন রঙের ছায়া নেই। ঘন,  প্রসুতি মেঘে ঢাকা আকাশের কোথাও কোথাও উঁকি দেয় হালকা নীল। নদীর ওপারে যাওয়ার সুপ্ত ইচ্ছে মাথাচাড়া দেয়। কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে, বেলার দিকে তাকিয়ে জেগে ওঠা ইচ্ছে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

এবারে আমার আর গ্রামের বাড়ি যাওয়া হলো না। দেশে যাওয়া তাই অনেকটাই অপূর্ণ থেকে গেল। একটু ঘুরে তাকালেই দেখতে পাই বর্ষার জল থইথই করছে পুকুরের পার ধরে। ভোরবেলাতে মাছওয়ালাদের হেঁকে যাওয়া, কৃষকবধুর হাতে বিক্রী করতে নিয়ে আসা ডিমপাড়া মুর্গীটি। কান পাতলেই শুনতে পাই, পনিইইইইর নিবেন, অষ্টগ্রামের পনির। বাঁশের ঝাঁকায় লাল কাপড়ে মুড়ে রাখা ঘিয়ে রঙের পনির এসে হাজির হয় টক টক গন্ধ নিয়ে। জানলা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট এক মেয়ে একছুটে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল পনিরওয়ালার কাছে গিয়ে। চিতইয়ের মাঝে ভেঙে গুড়ো গুড়ো করে দেওয়া পনির যে তার খুব পছন্দ!


ঘুরে ঘুরে সিডি, ডিভিডি কিনি সারা দিনমান। এ দোকান ও দোকান। এই মার্কেট ঐ মার্কেট। পাগলের মত ঘুরে ঘুরে লিষ্ট মিলিয়ে ডিভিডি খুঁজতে খুঁজতে একসময় সব অর্থহীন হয়ে যায়। বসে থাকি চুপচাপ। দোকানীর দেওয়া মগভর্তি কফি খেতে থাকি যতক্ষণ পর্যন্ত সবটুকু কফি শেষ না হয়। বিস্বাদ লাগে তবুও খাই। ব্যস্ত হই ঘরে ফেরার তরে।


চলমান দূরভাষের ওধারে আম্মা। খানিক কথা বলে, অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। আমি বুঝতে পারি নীরব কান্নায় হাতের ফোন ভেজাচ্ছে আম্মা। আমার মা। থেমে থেমে কথা বলে, অনেকক্ষণ কথা বলে আবারও চুপ করে যায়। নাড়ী ছেঁড়ার তীব্র ব্যথায় নি:শব্দে কাঁদি আমি। একটুও শব্দ করি না। কোথাও যেতে দিই না কোন শব্দকে। বাইরে অঝোর বৃষ্টি । রক্তক্ষরণে ক্ষয়ে যেতে যেতে প্রবল শীতে আক্রান্ত হই আমি।

2 comments:

  1. আপনিতো চমৎকার লেখেন। খুঁজে খুঁজে বাংলা ব্লগ পড়ছি, আপনার লেখাটা দারুন লাগলো। আজ সময় নেই। আপনার সব লেখা পড়ার ইচ্ছা থাকলো।
    ‌‌‌‌‌‌‌‌‌---------------------
    দুর্বাশা তাপস
    http://www.durbashaa.blogspot.com/

    ReplyDelete
  2. ধন্যবাদ আপনাকে।
    পড়ে জানাবেন কেমন লাগলো...

    ReplyDelete