ফ্রেজারগঞ্জ বিচ থেকে হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তায় আসতেই চোখে পড়ল একটা বাস আসছে, যাচ্ছে বকখালি৷ পেটে যদিও ক্ষিদে নেই, সকালের ঐ ছেঁড়া পরোটা আর আলু মটরের তরকারিতে পেট তখন অব্দি ঠান্ডাই আছে তবুও আগে বকখালি গিয়ে কিছু খেয়ে নেওয়াই সাব্যস্ত হল৷ ফ্রেজারগঞ্জে খাওয়ার জায়গা নেই সে তো দেখাই যাচ্ছে আর একটিমাত্র খাবার দোকানের কথা যা শুনলাম সেখানেও নাকি বসিয়ে রেখেই রান্না করে দেবে৷ বসে থাকাটা বাঞ্ছনীয় নয় মোটেই, চল রে মন বকখালি! তো আমরা হাত দেখানোর আগেই বাস থেমে পড়ল ঠিক সামনেটায় এসে! দুজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বাসে উঠে পড়লাম৷ বেশ মিষ্টি একটা আবহাওয়া৷ না গরম না ঠান্ডা৷ ফুরফুরে মনে চারপাশ দেখতে দেখতেই বাসের কন্ডাক্টর ভাই হাঁক দিলেন, বকখালি! ওমা! এত কাছে বকখালি! নেমে ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে চোখে পড়ল রাস্তার দুপাশে বেশ কিছু হোটেল শুধু৷ ও হ্যাঁ৷ বাসে থাকতেই চোখে পড়েছে, খানিক দূরে দূরে একটি করে হোটেল৷ বকখালি সম্পর্কে শোনা সব কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল৷ জোর করেই মনটাকে অন্য দিকে সরিয়ে দিলাম৷
কয়েক পা এগোতেই চোখে পড়ল ২-৪টে ভ্যান রিকশা এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর তাদের চালকেরা এক জায়গায় জটলা করছে কেউ দাঁড়িয়ে তো কেউ বালিতে বসে৷ আমাদের দেখেই এগিয়ে এলো, বাবু, সাইট সিইংএ যাবেন? চলুন না বাবু৷ এখানে কি দেখার আছে আর ওরা কোথায় কোথায় নিয়ে যাবে সেগুলো শুনে নিয়ে ঘুরে আসছি বলে সামনের দিকে এগোলাম খাওয়ার দোকানের সন্ধানে৷ বকখালিতে খাওয়ার ভালো জায়গা আছে হোটেল থেকেই শুনে এসেছিলাম কিন্তু আমি শুধু কিছু ঝাঁপতোলা দোকান ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলাম না৷ কোন দোকানে ঝুলছে ঝিনুক দিয়ে তৈরি নানা জিনিসপত্র আর কোনো দোকানের সামনে বোর্ড দাঁড়িয়ে আছে কাঠের ঠ্যাঙে ভর করে,কয়েকপরত মরচের নীচে যাতে ভাত ডাল মাছ সব্জির নাম লেখা৷ তেমনই এক দোকানে ঢুকে রাস্তার দিকে মুখ করে দুজনে বসে খাবারের অর্ডার দিলাম৷ ভাত ডাল আর সব্জিটা কমন, মাছের অপশন আছে, পমফ্রেট কিংবা ভেটকি৷ আমি পমফ্রেট বললাম৷ সবজির ভেতর আরেকটা জিনিস কমন, চিংড়িমাছ, সে পালংএর ঝোলই হোক বা লাউ-এর তরকারি, তখনও জানিনা এর দুটো ই আসবে আর সাথে একদম স্টাইলিশ ক্যাটারারের হাতফেরতা আলুর ঝুরি ভাজা৷
যে দোকানটিতে ঢুকে বসেছি তাতে চারখানা লাল, নীল প্লাষ্টিকের টেবল আর টেবলের একপাশে কাঠের একখানা করে বেঞ্চ অন্যপাশে দুখানা করে বাদামী রঙের প্লাষ্টিকের চেয়ার৷ দেওয়ালে দেখলাম কালো বোর্ডে সাদা খড়ি দিয়ে পুরো খাবারের লিষ্টি লেখা আছে সেখানে পাশে মূল্যতালিকা৷ যিনি খাবারের অর্ডার নিয়েছিলেন তিনি ভেতরে গিয়ে বলে এলেন আর তারপরে দোকানের মাঝখানে রাখা একটি টেবলের পাশের একমাত্র চেয়ারটিতে বসে গপ্প জুড়লেন অন্যপাশে বসে আহারে রত চারজনের এক দলের সাথে৷ ততক্ষণে আমাদেরও খাবার এসে গেছে৷ যিনি খাবার সার্ভ করলেন তিনি এই দোকানের মালকীন৷ ক্ষয়াটে চেহারা৷ কপালে লাল টিপ আর সিঁথিতে মোটা করে পরা সিঁদুর৷ ছাপা শাড়ি কুচিয়ে পরা গোড়ালির উপর থেকে৷ হাতে শাঁখা পলা লোহা ছাড়াও কয়েকগাছা করে কাঁচের চুড়ি৷ মুখে একটা হাসি লেগেই আছে যাতে করে তাঁকে দোকানমালিক কম বাড়ির গিন্নিই বেশি মনে হয়৷ পর্দার ওপাশে যে ঘরের আভাস পাচ্ছি ওখানে তাঁর গেরস্থালী৷ খাবারে মন দিলাম৷ মাঝারি আকারের একখানা পমফ্রেটকে দু টুকরো রান্না করেছেন ঐ গিন্নিটি৷ যে প্লেটে করে মাছ দিয়েছেন তাতে ঐ পমফ্রেট বেশ ভালমতন সাঁতার কাটছে৷ দেখে একেবারেই পছন্দ হয়নি বলাই বাহুল্য কিন্তু মাছের কোণা ভেঙে মুখে দেওয়া মাত্রই মত পাল্টাতে বাধ্য হলাম৷
রান্না ভাল কি মন্দ সে প্রশ্ন অবান্তর মনে হল৷ একদম তাজ মাছ, সকালেই সমুদ্র থেকে ধরা হয়েছে৷ এত সুস্বাদু পমফ্রেট আগে কখনও খাইনি সে ব্যপারে আমরা দুজনেই একমত হলাম৷ কথা বলছি, খাচ্ছি৷ মাঝে মাঝেই কান চলে যাচ্ছে ওদিকের কথা বার্তায়৷ এরই মধ্যে গিন্নিটি ভেতর থেকে নিয়ে এলেন একটি বোল, বেশ বড় সাইজের আর আমি একটু চোখ টেরিয়ে দেখতে পেলাম তাতে কাঁকড়া! খাওয়ায় ব্যস্ত তাঁকে দেখালাম ইশারায়, ঐ দ্যাখো, কাঁকড়া! সাথে সাথেই দোকানমালিকের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন গেল, ও দাদা, কাঁকড়া হবে নাকী! দাদাটি চটজলদি উত্তর দিলেন, নাগো দাদা, এতো অর্ডারি রান্না! শহর থেকে এঁরা সব বন্ধুরা এসেছে, এঁদের জন্যে স্পেশালি আনা হয়েছিল আজ, আর তো হবে না! ওদিকের টেবল থেকে তখন কাঁকড়ার স্বাদ সম্পর্কে আলোচনা কানে আসছে৷ মন : ক্ষুন্ন তিনি পমফ্রেটেই মন দিলেন আবার! দোকানি ভাইটি বললেন, রাতে যদি আপনারা আসবেন বলে যান, তবে বিকেলে দেখব কাঁকড়ার ব্যবস্থা করতে পারি কীনা! আর আপনারা যদি কোন মাছ খেতে চান তো কিনে এনে দিলে আমরা রেঁধেও দিতে পারি৷ এই সাথেই শোনালেন, ওপাশে যাঁরা বসে আছেন তাঁরা গতকাল সব মিলিয়ে সাড়ে চার কিলো মাছ কিনে এনেছিলেন আর চারজনে মিলে সেটা এক বসাতেই শেষ করেছেন! যাঁদের সম্পর্কে বলা হল তাঁদেরই একজন বললেন, ঐ ফ্রেজারগঞ্জ বন্দর থেকে কিনে এনেছিলাম, আপনারা যাবেন তো ওদিকে? মাছ নিয়ে আসতে পারেন, বৌদি রান্না করে দেবে! তাঁদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে দোকানি ভাইকে বলা হল, রাতে কাঁকড়া যদি হয় তো খুব ভাল হয়, রাতে আমরা আপনার এখানেই খাব! ও পাশ থেকে কাঁকড়া শেষ করার পর হুকুম উড়ে আসছে ভেটকি আর প্রমপ্লেটের, যা বাকি মাছ ছিল তা সব তাদের দিয়ে দোকানি ঝাঁপ বন্ধ করতে উদ্যোগী হলেন৷
ও হ্যা ঁবলতে ভুলে গেছি, খেতে বসেই আমার মনে হল, ফ্রেজারগঞ্জ বিচে শুটকি দেখে এলাম আর এখানেও দোকানে ঝিনুকের জিনিসপত্রের সাথেই প্যাকেটে রাখা লটে শুটকি চোখে পড়েছে তার মানে এঁরা শুটকি নিশ্চয়ই রান্না করেন! জানতে চাইলাম দোকানমালকীনের কাছে, এখানে শুটকি রান্না হয় বৌদি? তো বৌদি জানালেন, মাঝে সাঝে হয়৷ সকলে খায় না বলে রোজ হয় না আর খেতে চাইলে রাতে ইনি করে রাখবেন৷ কিন্তু রাতে শুটকি খাওয়া আমার পোষাবে না বলে আমি আর খাওয়ার বায়না করলাম না! খাবো না বলেই শুটকি আলোচনা থেমে থাকলো না, কচু এল, কাঁঠালের বিচি এল আরো কত্তসব এখন আর সব মনে নেই৷
খাওয়া সেরে বেরিয়ে আবার মন দিলাম চারপাশ দেখাতে৷ এত নীরব কেন এ জায়গাটা? এখানটায় বেশ দোকানপাট আছে দেখতে পাচ্ছি, রাস্তার দুধারে সারি সারি সব দোকান৷ যাঁরা আছেন তারা সবই দোকানি! কেনার মানুষ নেই একটিও! আরও একটা জিনিস খেয়াল হল, প্রতিটি দোকানেরই পেছনদিকে বসতবাড়ি৷ দোকানের ভেতর দিয়েই ভেতরবাড়িতে যাওয়ার ব্যবস্থা৷ প্রায় সব দোকানেই কর্তা গিন্নি দুজনেই আছেন৷ একটু খেয়াল করলে আশে পাশে ছানাদেরও দেখা যায়৷ কিন্তু এখানে লোক নেই কেন? লোকে বেড়াতে আসে না? চিন্তাটা সজোরেই করছিলাম তো জবাব পেলাম, দিনের বেলা কে আর বেরোয়? সবাই হোটেলের ভেতরে আছে! বিকেলে বিচে ভিড় হবে, বেশিরভাগই তো হোটেলেই সময় কাটাতে আসে! আবারও অস্বস্তিটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে লাগল৷
এক নীরব শুনশান রাস্তা দিয়ে আমরা দুজনে হেঁটে এগোতে লাগলাম সাগরের দিকে৷ পিচের রাস্তা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে একটা মাঠমত জায়গা৷ বালির মাঠ৷ গোড়ালি অব্দি ডুবে যায় বালিতে৷ বেশ গরম লাগতে শুরু করেছে ততক্ষণে৷ সুর্য একদম মাথার উপরে৷ আমি একটু ক্লান্ত বোধ করছি, একটু গড়াতে পারলে ভাল হয়৷ কিন্তু মাত্র একদিনের জন্যে এসেছি আর কত কী দেখার আছে বলে সমানে হেঁকে গেছে ঐ ভ্যান রিকশা চালকেরা যার কিছুই এখনও অব্দি দেখা হয়নি৷ ঘরবন্দী হয়ে একটুও সময় নষ্ট করবো না বলে ক্লান্তির কথা একবারটিও না বলে সামনে এগোলাম৷ বালির উপর দিয়ে পা টেনে টেনে হেঁটে এই মাঠ পেরিয়ে দেখি আবার একটা পিচরাস্তা শুরু৷ যার দুপাশে আবার সব দোকান৷ তবে এখানে দোকানের সংখ্যা বেশি নয়৷ ঐ তো সামনেই এই রাস্তা ঢালু হয়ে নেমে যাচ্ছে বিচে৷ এই রাস্তা গিয়ে শেষ হয়েছে একটা বাধানো চাতাল মত জায়গায়৷ যার ডানদিকে বেশ উঁচু করে বাঁধানো এক ফুটপাথ৷ হ্যাঁ৷ আমার এটাকে ফুটপাথই মনে হয়েছে৷ অনেকদূর চলে গেছে এই ফুটপাথ৷ যদ্দূর চোখ যায় শেষ দেখতে পাচ্ছি না৷ ফুটপাথে খানিক দূরে দূরে একটা করে লোহার বেঞ্চ৷ এই ফুটপাথের ডানধারে ঝাউবন আর বাঁদিকে বিস্তৃত বালুরাশির ওধারে সমুদ্র৷ ভাটার সমুদ্র এখন বহুদূরে৷ জলের শব্দ নেই৷ বাতাসের শনশনানি নেই৷ নিস্তব্ধ এক রোদেলা দুপুর৷
আমি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখছি এদিক ওদিক৷ যেদিকেই তাকাই , চোখ ফেরাতে পারি না৷ ফুটপাথে উপর দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছি বিচের দিকে৷ বাঁধানো চাতালের আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা আছে বেশ কিছু রঙিন চেয়ার৷ কোথাও বা ছোট্ট নাগরদোলা, রঙিন৷ অনেকটা যেন মেলার মত৷ কিন্তু জনশূণ্য, রঙিন কাঠের ঘোড়ারা সার বেঁধে যেন জল খেতে নেমে আসছে সাগরে৷ চাতাল যেখানে শুরু হয়েছে সেখানে এক বোর্ডে দেখলাম বড় বড় হরফে ইংরেজী ও বাংলায় লেখা আছে, বিচে গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ৷ ঠিক এই জায়গাটায় বেশ কিছু চায়ের দোকান দেখলাম৷ প্রতিটা দোকানের সামনেই বেশ কিছু চেয়ার পাতা৷ সবই লাল রঙের৷ এই দুপুরে কোন দোকানেই কোন খদ্দের নেই৷ মনে মনে আমি চায়ের দোকানই খুঁজছিলাম, খাওয়ার পরে চা না খেলে আমার চলে না ! একটি দোকানের দিকে এগিয়ে গিয়ে দোকানি মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, দিদি , এখন কি চা হবে? তিনি বললেন, হ্যা ঁহবে, আপনি বসুন৷ বছর পনের-ষোলর একটি ছেলে দোকানের ভেতর ঢুকে চা করতে গেল৷ আমি চেয়ারে বসে তাকালাম বিচের দিকে৷ বারে বারে একটা কথাই শুধু মনে হচ্ছে, এত সুন্দর মায়াময় বিচ অথচ কি ভীষণ নীরব! হোক না দুপুর, তাই বলে এত নীরব? দূরে ফ্রেজারগঞ্জ বিচের সেই তিন ব্লেডের বিশালাকার পাখা এখানে থেকেও আবছা নজরে আসছে৷
ফ্রেজারগঞ্জে বেনফিশের মত্স বন্দর দেখব বলে এগোলাম ভ্যানরিক্সার দিকে৷ এখান থেকে যেতে হলে ভ্যান ছাড়া গতি নেই৷ ভ্যানরিক্সার চালকেরা এক জায়গায় জটলা করছিল কেউ বসে কেউ বা দাঁড়িয়ে৷ দু-তিনজন এগিয়ে এল আমাদের দিকে৷ সাইটসিইং এ তারা কোথায় কোথায় নিয়ে যাবে সে শুনিয়ে রেখেছিল আগেই৷ দর দস্তুর করে একজনকে ঠিক করা হল৷ সাইটসিইং এর জন্যে নয়, সে শুধু আমাদের ঐ মত্সবন্দরে নিয়ে যাবে আর তারপর আবার এখানেই ফিরিয়ে নিয়ে আসবে৷ ভ্যানচালক মশায় বহু ভ্যানতারা করছিলেন, কি কি দেখার আছে এখানে, যা না দেখলে এই বকখালি আসার কোন মানেই হয় না কিন্তু আমার কত্তা তাঁর কোন কথাতেই কান দিলেন না, হুকুম দিলেন, তুমি আমাদের ঐ বন্দরে নিয়ে চল আর কিছু দেখাতে হবে না! অগত্যা ভ্যানচালক মন দিলেন ভ্যান চালানোতে৷ আমরা দুজনেই দেখতে শুনতে মাশ আল্লাহ তো ভ্যানচালকের পরামর্শ অনুযায়ী ভ্যানের দু মাথায় দুজনে বসলাম৷ তিনি সামনের দিকে মুখ করে আর আমি পেছনের দিকে৷ আমি দেখছি ফেলে আসা রাস্তা তো তিনি দেখছেন সামনের রাস্তা, বেশ রোমান্টিক যাত্রা৷ নীরব শুনশান রাজপথ৷ দুপাশে কোথাও বিস্তৃত ফসলের মাঠ তো কোথাও দূরে গ্রাম৷ জনপ্রাণী নেই কোথাও৷ পড়ন্ত দুপুরের নিষ্পাণ রোদ৷ কারও মুখে কথা নেই এমনকি ভ্যানচালকেরও নয়৷ ভ্যানরিক্সার চলার শব্দ শুধু৷
সাইটসিইংএর যে গল্পটা ওরা করছিল তাতে তাতে একটা খেজুরগাছের গল্প ছিল৷ চৌদ্দ না ষোল মাথার এক খেজুর গাছ নাকি আছে এখানে, যা দেখতে ট্যুরিষ্টেরা খুব ভিড় করে! তো আমি রিক্সাচালককে জানিয়ে রাখলাম ফেরার পথে ঐ খেজুরগাছ যেন দেখিয়ে দেয় আমাদের৷ রিক্সাচালক সম্মত হয়ে মন দিল রাস্তার দিকে৷ বড় রাস্তা ছেড়ে রিক্সা পড়ল এক সরু রাস্তায়৷ বড় ফলকে দেখলাম লেখা আছে 'বেনফিশ মত্স বন্দর'৷ ভ্যান থামল এক ইটপাতা এবড়ো খেবড়ো রাস্তার মুখে৷ এই পর্যন্তই ছিল ভ্যানের যাত্রা৷ সামনেই নদীর পাড়৷ ওটুকু হেঁটে যেতে হবে৷ ভ্যান চালক এখানেই অপেক্ষা করবে আমাদের জন্যে৷ আমরা ফিরলে বকখালি পৌঁছে দিয়ে তবে তার ছুটি৷ এখানে এক পেট্রল পাম্প দেখলাম যার তৈলাধার মাটির উপরে৷ বিশাল পেটমোটা ডিম্বাকৃতি এক তৈলাধার যার দুটি মাথাই কাটা৷ এই প্রথম এক পেট্রল পাম্প দেখলাম যার তৈলাধার মাটির উপরে৷ জিজ্ঞেস করে জানলাম, ইঞ্জিনের নৌকোরা সব এখান থেকেই তেল নিয়ে যায় আর যে সমস্ত যানবাহন আসে এখান থেকে মাছ নিয়ে যেতে তাদেরও তেলের যোগান এখান থেকেই যায়৷ উঁচু বাঁধানো পার ধরে আমরা এগোলাম নদীর দিকে৷ প্রথমেই যা চোখে পড়ল, সার সার র ংবেরঙের নৌকো দাঁড়িয়ে আছে মাটিতে৷ ভাটার নদী সরে গেছে বহুদূরে৷ সরু এক ফিতের মতো পড়ে আছে সামনে৷ আর বালুমাটিতে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে নৌকোরা সব৷ জোয়ারের অপেক্ষায়৷
একথাক বাঁধানো সিড়ি বেয়ে নেমে গেলাম এক লম্বা সিমেন্টের চাতালে৷ নদীর পারে খানিকটা জায়গা বাঁধিয়ে তৈরী হয়েছে এই বন্দর৷ বেনফিশের মত্স বন্দর৷ শেষ রাতের অন্ধকারে নৌকোরা সব এখান থেকে বেরিয়ে যায় সমুদ্রে ৷ মাছ নিয়ে আবার এখানেই ফেরে দুপুরের শেষভাগে৷ তিনটে বাজতেই ফেরা শুরু হয় নৌকোদের৷ একে একে নৌকোরা সব ফেরে৷ সবই ইঞ্জিনের নৌকো৷ যেখানটাই 'ছই' থাকার কথা সেখানে এই নৌকোগুলোতে আছে এক কাঠের কেবিন৷ কোন কোন নৌকোর কেবিন আবার দোতলা৷ রঙ্বাহারি সব কেবিন৷ প্রায় সব নৌকোরই কেবিনের উপর সরু দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা আছে সারসার লটে মাছ, শুকিয়ে শুটকি করা হচ্ছে৷ নৌকোরা যেসময় ফিরতে শুরু করে , সেই সময় ধরে ওখানে হাজির হয় মাছের খরিদ্দারেরা৷ দু চারজন বেড়াতে আসা মানুষ ছাড়া আর যারা এখানে আছে সবাই মাছের সাথেই যুক্ত৷ কেউ কিনতে আসে তো কেউ সমুদ্র থেকে মাছ ধরে বিক্রি করতে৷ খদ্দেরও মিশ্র, কিছু স্থানীয় মানুষও আসে একটু কম দামে ভাল মাছ কিনতে আর আসে সব পাইকার, এখান থেকে সস্তায় কিনে নিয়ে একটু বেশি দামে বাজারে বিক্রী করতে৷ এই বাঁধানো চাতাল থেকে একটু দূরে ঐ তৈলধারের পাশেই বসে এক নিলামের বাজার৷ নৌকো থেকে মাছ নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ঐ মাঠে৷ নিলাম হয় সব মাছ আর তারপরেই সব লাল, নীল, হলুদ আর সবুজ প্লাষ্টিকের প্যাকি ংবাক্সে উপরে নিচে বরফ বিছিয়ে দিয়ে বাক্সবন্দী হয় সব মাছে৷ অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা ছোট বড় মাঝারি সব ট্রাক আর লরী৷ মাছের বাক্স পিঠে চাপিয়ে এখুনি সব ছুটবে গঞ্জ-শহরের উদ্দেশ্যে৷
নদীর পারে বানানো এই চাতাল নদী থেকে প্রায় দু মানুষ সমান উঁচু৷ এই চাতাল ঠিক নদীর পারে নয় বলা চলে নদীর উপরেই বানানো হয়েছে৷ ভাটার নদী সরে যেখানে এসে দাঁড়ায় সেখানে এই বাঁধানো চাতাল৷ আমার বড় ইচ্ছে হচ্ছিল জোয়ারের নদী দেখার, জোয়ারে এই বন্দর কেমন দেখায় তা দেখার কিন্তু সে উপায় নেই৷ এখুনি ফিরতে হবে আর জোয়ার আসতে আসতে সেই সন্ধ্যে পার! চাতালের ডানপাশে নদীর শান্ত জল আর বাঁপাশে জল সরে যওঅ্যা নদীতট৷ যেখানে ইতস্তত : দাঁড়িয়ে র-ংবেরঙের সব নৌকো৷ আচ্ছা এই নৌকোগুলো কি জোয়ার এলে জালে ভাসে রোজ? কাকে জিজ্ঞেস করি? থাক! কি হবে জেনে ৷৷৷ নদীর ওপার কালচে সবুজে ছাওয়া৷ দৃষ্টি চলে না ঐ সবুজের ভেতর দিয়ে৷ যতদূর চোখ যায় এক কালচে গাঢ় সবুজ বিস্তৃত নদীতীর ধরে৷ ওখানে কি কোন গ্রাম আছে? আছে জনবসতি? আছে নিশ্চয়ই! কিন্তু এখান থেকে এই মত্সবন্দরে দাঁড়িয়ে তার আভাসটুকুও পাওয়া গেল না৷ চোখ গেল পশ্চিমে, যেখানে সূর্য ঢলে পড়েছে নদীর বুকে৷ নদীর জলে আরেকটা সূর্য দেখতে পেলাম৷ সূর্যের দিকে বেশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেও চোখে লাগল না৷ এতটা নিষ্পাণ সূর্য! সরু রোগাভোগা নিস্তরঙ্গ নদীর বুকে এক নিষ্পাণ সূর্য ঢলে পড়েছে৷ এক মরা আলো শুধু চিকচিক করছে জলের ভেতর!
দুপুরে খেতে বসে মাছের গল্প শুনে আর এখানে এসে এই নৌকো থেকে মাছ নামানো দেখে মনে হল, কিছু মাছ কিনে নিলে কেমন হয়! রান্না তো সেই দোকানি বৌদি করে দেবেই বলেছে৷ তো যেই ভাবা সেই কাজ৷ মাছ কেনার উদ্দেশ্যে এবার শুরু হল এই নৌকো ঐ নৌকোতে চোখ দিয়ে খোঁজার পালা৷ কোন নৌকো থেকে কি মাছ নামছে সে দেখে নিয়ে সেইমত কেনা হবে৷ দেখলাম আরও বেশ কিছু বেড়াতে আসা মানুষও এভাবেই মাছ কেনার জন্যেই দাঁড়িয়ে আছেন৷ এর মধ্যেই একটি নৌকো থেকে একজন জিগ্যেস করল, আপনারা কি জম্বুদ্বীপে যাবেন? চলুন না৷ বেড়িয়ে আসবেন! আমার তো নৌকোয় করে সাগরের উপর দিয়ে দ্বীপে বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছে ষোল আনা কিন্তু সময়! সময় কোথায়? এখন দ্বীপ দেখতে গেলে ফিরতেই তো সন্ধ্যে পার! তাহলে আর বকখালি বিচে বসা হবে না বিকেলে! দ্বীপে বেড়াতে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিলাম৷ একদিনে আর কতটুকুই বা দেখা যায়! একটি নৌকো এসে বন্দরে ভিড়ছে দেখে ওদিকে তাকালাম, ভেতরে লোকজন বসে আছে দেখে বুঝলাম, এই নৌকোটি সেই জম্বুদ্বীপ থেকে ফিরল! চাতালের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলাম বলে চোখে পড়ল, ভেতরে একজন মহিলা বসে আছেন৷ সাথে আরও কিছু লোকজন চোখে পড়ল কিন্তু সেদিকে মন গেল না৷ আবারও চোখ ফেরালাম মাছের নৌকোর দিকে৷
একটা কোলাহল কানে আসতে আবার চোখ গেল ঐ বেড়িয়ে ফেরা নৌকোটিতে, এক ভদ্রলোক চেঁচামেচি করছেন৷ কথা শুনে বোঝা গেল, তিনি বসে থাকা ভদ্রমহিলাটির স্বামী আর চেঁচামেচি করছেন নৌকোর ভেতরে বসে থাকা পাঁচ-ছটি ছেলের উদ্দেশ্যে৷ একটি ছেলে তার স্ত্রীর সাথে অসভ্যতা করার চেষ্টা করেছিল নৌকোর ভেতর৷ নৌকোটি জলে থাকা অবস্থায় তিনি কিছুই বলেননি, তীরে ভেড়া মাত্রই কান ধরে হিড়হিড় করে ছেলেটিকে টেনে নামিয়েছেন আর মুখে বলছেন ' কি করবি এবার কর, নৌকোতে বসে কি করতে চাইছিলি আমার বৌকে, এবার কর, এখানে কর'৷ ছেলেটি প্রতিবাদ করতে চাইছিল, সে কিছুই করেনি বলে আর তার সাথীরাও সেকথাই বলছিল, কিন্তু ততক্ষণে তার কানের দফারফা আর চড় চাপড়ও পড়ছিল মুষলধারে৷ আকাশনীল স্কার্ট আর ম্যাজেন্টা রঙের কুর্তি পরা তার সুন্দরী স্ত্রী বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে, সবাই একবার তাঁর দিকে তাকায় তো পরবর্তী মুহুর্তেই আবার তাকায় তার স্বামীর দিকে৷ যিনি একহাতে ছেলেটির কান ধরে রেখে সমানে মেরে যাচ্ছেন অন্যহাতে৷ দাঁড়িয়ে তামাশা দেখা লোকেরা এবার এগিয়ে গেল ছাড়ানোর চেষ্টায়, বেগতিক দেখে মার খেতে থাকা ছেলেটির বন্ধুরা এগিয়ে এসে এবার ক্ষমা চাইতে লাগল বন্ধুর হয়ে কিন্তু যার স্ত্রীর সাথে অশালীন ব্যবহার করা হয়েছে তিনি ছাড়তে নারাজ৷ শেষমেষ ছাড়তে রাজী হলেন কিন্তু ছেলেটিকে তাঁর স্ত্রীর পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে হবে এই শর্তে৷ এব ংশুধু বেয়াদবী করা ছেলেটিই নয়, তার বন্ধুদেরও ক্ষমা চাইতে হবে ঐ একই ভাবে, কারণ তারা এই অসভ্য ছেলেটির বন্ধু এব ংতার সাথে আছে৷ ছেলেটি মুক্তির রাস্তা পেয়ে সাথে সাথেই ভদ্রমহিলার পায়ের কাছে বসে পড়ে ক্ষমা চাইল এব ংজীবনে আর কারও সাথে এরকম করবে না সেই অঙ্গীকারও করল৷ তার সাথীদের একজন ক্ষমা চাইতে রাজী ছিল না যেহেতু সে অপরাধ করেনি তখন মার খাওয়া ছেলেটি তাকে বলল শিগগীর ক্ষমা চেয়ে নে আর এখান থেকে চল! একে একে ৬জনের দলটি ভদ্রমহিলার পায়ের কাছে বসে ক্ষমা চাইল আর ঝটপট এগিয়ে গেল ফেরার পথে! একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি লোক এতক্ষণে সামনে এগিয়ে এল যার হাতে এই বেড়াতে আসা দম্পতির জলের ক্যান, রুকস্যাক৷ এগিয়ে এসে বলল, বাবু, গাড়িতে যাই এবার? বাবু বললেন, যা, বস গিয়ে, আসছি৷ স্বামী স্ত্রী ধীরপায়ে এগোলেন ফেরার পথে, ভদ্রলোক তখনও গজগজ করে যাচ্ছেন আর তাঁর স্ত্রী তখনও চুপ, চেহারায় বিরক্তির ছাপ৷ আমার তিনি তখন বন্দরের আরেক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন ফোন কানে, এই কোলাহল থেকে দূরে৷
একভাবে নদীর বুকের এই বন্দরে জলের ধার ঘেঁষে অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে হঠাত্ মাথা ঘুরে উঠল! একেবারে যাকে বলে উপর থেকে নিচে আর নিচে থেকে উপরে ২-৩বার যেন পাক খেয়ে উঠল৷ রেলি ংধরে দাঁড়িয়েছিলাম বলে সামলে নিলাম কিন্তু আর দাঁড়াতে সাহস না পেয়ে জলের ধার ছেড়ে চাতালের অন্যদিকে এসে বসে পড়লাম একটু সিঁড়িমত জায়গায়৷ পেছনে শুকনো নদী আর সামনে মাছের বন্দর যেখানে এখন নৌক থেকে মাছ তুলে বেছে আলাদা করা হচ্ছে৷ এক একটি নৌকো থেকে এক এক রকমের মাছ৷ কোন নৌকো থেকে শুধুই পার্শে তো কোনটি থেকে পাঁচমেশালী৷ লটে দেখা গেল প্রায় সব নৌকো থেকেই নামছে৷ দেখলাম চকচকে রুপোলী ছুরি মাছ, সোনালী তোপসেরা সব শুয়ে আছে একের পরে এক ঢিবি হয়ে৷ হঠত্ চোখে পড়ল এক হাঁসের উপর! হাঁস! এখানে কোত্থেকে এল! বেশ বড় একটি বুনোহাঁস৷ মাছ নিয়ে ফেরা একটি নৌকো একে তুলে এনেছে জম্বুদ্বীপ থেকে৷ হাঁসটি উড়তে পারছে না, ডানায় নাকী বাত ভর করেছে, ফুলে আছে ডানা! আমি প্রথমে ভাবলাম এ বোধ হয় বিক্রী করার জন্যে ধরে এনেছে কিন্তু দেখলাম না, তা নয়৷ পাখিটাকে শুশ্রুষা করবে বলেই জেলেরা এটিকে ধরে নিয়ে এসেছে সাথে করে৷ কিছু কুচো মাছ রাখা আছে পাখিটার সামনে, কিন্তু তার খাওয়ার কোন ইচ্ছে দেখা যাচ্ছে না৷ সে এদিক ওদিক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে হয়ত, কোথায় এল! আগ্রহী মানুষদের আগ্রহ মিইয়ে গেল খানিক পরেই এই পাখিটিকে নিয়ে, সবাই সরে গেল যার যার জায়গায়, কাজে৷ ফাঁকা দেখে পাখিটা ধীর পায়ে, প্রায় গড়িয়ে গড়িয়ে জলের ধারে গিয়ে ঝাঁপ দিল জলে৷ খুব ধীরে অসুস্থ ডানায় সাঁতার কেটে এগোতে লাগল অন্যপারের দিকে, সেবা করতে চাওয়া মানুষগুলোকে ছেড়ে, এই বন্দরকে ছেড়ে সে এগিয়ে যেতে লাগল তার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে৷
ডাইরী ১৪
11 hours ago
.jpg)


1 comments:
[b][maroon]how i say?
Post a Comment