Thursday, November 08, 2007

ছেলেবেলার ঈদ

ছেলেবেলার ঈদটাই আনন্দের ছিল ৷ এখন তো শুধু রকমারী রাঁধো-বাড়ো, খাওয়াও দাওয়াও আর সন্ধেবেলায় ক্লান্ত হয়ে ধপাস বিছানা পরে । ছেলেরা তবু ঈদগাহে-ময়দানে ঈদের নামাজে যায়৷ সেখানে চেনা অচেনা অনেকের সাথে দেখা হয়৷

তখন রোযার প্রথম দিন থেকেই শুরু হত ঈদের অপেক্ষা৷ খুব ছোট যখন ছিলাম ,রোযা রাখার মত বড় হইনি, তখনও বায়না করতাম রোযা রাখব বলে৷ দাদী শিখিয়ে দিয়েছিলেন, কল্সীতে হা দিয়ে তোমার রোযা কল্সীতে রেখে ঢাকা চাপা দাও, আর তারপরে তুমি খেয়ে নিয়ে কল্সীর মুখ থেকে নিজের রোযা আবার নিয়ে নাও৷ এই করে তোমার একদিনে তিনটে রোযা হয়ে যাবে! তো আমি প্রতিদিনই তিনটে করে রোযা রাখতাম৷ ঈদের কেনাকাটা শুরু হত রোযার প্রথম দিন থেকেই৷ আমাদের বিশাল যৌথ পরিবার৷ সক্কলের জন্যে জামা কাপড় কেনা হত, বাচ্চা থেকে বুড়ো৷ সবার জন্যে৷ আমাকে নিয়ে আব্বু যেতেন একেবারে চাঁদরাতে৷ আর প্রতিদিনই আব্বু ইফতারের জন্যে বাড়ি এলেই আমার ঘ্যানঘ্যানি শুরু হয়ে যেত: আব্বু, চল না! কবে জামা কেনা হবে? মার্কেটে তো সব শেষ হয়ে যাবে! কিছু কি আর থাকবে?

আর ঐ চাঁদরাত আসার আগেই আমার হয়ে যেত আট-দশখানা নতুন জামা৷ সাথে জুতো, ফিতে আর পুতুল৷ মামাবাড়ি থেকে আসতো, কাকারা দিতেন, ফুপরা দিতেন৷ আর সবার শেষে আব্বু৷ মা নিজের হাতে বানাতেন ফ্রক, নিজের হাতে ওতে কাজ করতেন৷
ঈদের আগে হাতে মেহেদি পরতাম৷ বাড়ির সব মেয়েরাই পরেন৷ এমনকি ছেলেরাও তবে তারা শুধু হাতের কড়ে আঙুলে রাতে মেহেদি পরে ঘুম দাও৷ যত বেশি সময় থাকবে তত লাল! বিছানায়, শরীরে সেই মেহেদি মাখামাখি ঘুমের মধ্যে৷


এখন যেমন কোণ দিয়ে লিকুইড মেহেদি পরা হয়, সেই মেহেদি তা ছিল না৷ গাছ থেকে মেহেদির পাতা তুলে শিলে মিহি বেটে নিয়ে সেই মেহেদি দিয়ে হাতে নানা ডিজাইন আঁকা হত৷ আমার দাদি হাতে মেহেদির ডিজাইন করতেন না৷ হাতের গোটা পাতায় মেহেদি লেপে দিতেন আঙুল সহ আর এদিকে হাত উল্টে নখগুলো ও মেহেদি দিয়ে ঢেকে দিতেন৷ তারপর দুই হাতের মাঝে একটা পানপাতা রেখে হাতদুটো একসাথে জোড় করে রাখতেন৷ সে এক দেখার মত জিনিস ছিল৷

আমরা রোযার পুরো একমাস ছুটি পেতাম৷ রোযা শুরু হওয়ার দু-চারদিন আগে স্কুল ছুটি হয়ে যেত, ঈদের ও আরও হপ্তা দশদিন পরে স্কুল খোলার একটা তারিখ দিয়ে৷ এই সোয়া মাস ছুটি মানে পড়াশোনা? একদমই নয়! সোয়া মাস ধরে উত্সব৷ আম্মার তাগিদে বই নিয়ে বসতে হলেও দাদি আম্মাকেই বকে দিত, সারা বছরই তো পড়ছে, এখন থাকতে দাও না কদিন শান্তিতে!! ভোর রাত্তির থেকেই শুরু হয়ে যেত হুল্লোড়৷ ভোর রাত্তির মানে সেই রাত তিনটে! আমার তো কল্সীতে হা দিয়ে রোযা, ভোরে উঠে সেহরী না খেলেও চলে কিন্তু আব্বু তুলবেই৷ আর দাদিও বলে, সেহরী খাওয়াও পুণ্যের কাজ! অতএব উঠে পড়ো রাত তিনটেয়! আম্মা এই ভোরবেলায় ডাকতে চাইতো না, কারন আমরা, এই পোলাপানেরা ভোরে আর ঘুমাতে চাইতাম না৷ সেহরী খেয়ে আম্মা যে একটু ঘুমুবে তার বারোটা বাজিয়ে দিতাম আমরা হই হুল্লোড় করে৷

আমার দাদু, দাদি দুজনেই দেশের বাড়িতে থাকতেন৷ আমরা তাই ঈদ করতে দেশের বাড়ি চলে যেতাম প্রায় প্রতি বছর৷ দেশের বাড়িতে যাওয়াটা এমনিতেই একটা উত্সব তায় আবার সে যদি হয় ঈদ তো সে এক বিরাট ব্যাপার৷

ঈদের কথা বলতে গেলেই মনে পড়ে যাকাতের কথা ৷ মোটামুটি রোযা হপ্তাখানেক হয়ে গেলেই শুরু হয়ে যেত এই যাকাত দেওয়া৷ আমার সেই ছেলেবেলায় যাকাত হিসেবে আমাদের বাড়ি থেকে কাপড় বিলি হত৷ বিশাল বড় বড় কাপড়ের গাট আসতো যাকাত দেওয়ার জন্যে৷ দু গাট শাড়ি হলে সম পরিমান লুঙ্গি-পাঞ্জাবি৷ দাদুর ঘরে রাখা থাকত সেই কাপড়ের গাটগুলো৷ দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতো সেই যাকাতের কাপড় নিতে৷ দাদু হয় তার বিছানায় নয় জানালার পাশে চেয়ারে বসে থাকতেন৷ চেনা-অচেনা নারী পুরুষেরা এসে জানালার পাশে দাঁড়ালেই দাদু উঠে এসে কাপড়ের গাট থেকে কাপড় বার করে জানালা দিয়ে বাড়িয়ে দিতেন৷ যে কাপড় নিতে এসেছে সে মহিলা হলে জিজ্ঞেস করতেন, ছাপা না চেক, নাকি সাদা নেবে? মানুষটি বুড়ো হলে সে চাইতো সাদা, অল্প বয়েসীরা চেয়ে নিত তার পছন্দের চেক কিংবা ছাপা শাড়িটি৷

যতদিন ঐ গাটগুলোতে কাপড় থাকতো তদ্দিন কোন সমস্যা হত না, সমস্যাটা হত কাপড় শেষ হয়ে গেলে৷ কাপড় শেষ হয়ে গেছে, এবছরের মত যাকাত দেওয়া শেষ বললেও কিছুতেই তারা মানতে চাইত না যে সত্যিই শেষ৷ দাঁড়িয়েই থাকতো৷ দাদি তখন নিজের আলমারি থেকে কাপড় বার করে দিয়ে দিতেন, বাড়ির মেয়েদের কাছ থেকে চেয়ে নিতেন পুরনো শাড়ি, দিয়ে দিতেন যাকাতের জন্যে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে৷ প্রতি বছরই দাদুর উপরে চেঁচাতেন, এই কাপড় বিলি না করে কেন টাকা দিয়ে দেওয়া হয় না তা নিয়ে৷ দাদুর যুক্তি ছিল, টাকা দিয়ে দিলে ঝামেলা কম হয় বটে তবে তা দিয়ে এই মানুষগুলো তো কাপড় কিনবে না, খরচ করবে অন্য কাজে, ঈদে এদের কারোরই নতুন কাপড় হবে না তাহলে৷

দাদু চলে যাওয়ার পর এই কাজটা দাদি করেছেন৷ জানালার পাশে চেয়ারে বসে থেকে কাপড় বিলি করার কাজটা৷ এখন আব্বু করে৷ আমার সেই ছেলেবেলায় কোন বছর হয়ত আমরা দেশে যেতাম না৷ রোযার প্রথম সপ্তায় আব্বু বাড়ি গিয়ে যাকাতের কাপড়ের ব্যবস্থা করে আসত কিন্তু পরে, দাদু চলে যাওয়ার পর প্রতিটি ঈদেই আব্বু দেশে যায় সবাইকে নিয়ে৷ দাদু, দাদির শূণ্যস্থান এতে পুরণ হয় না কিন্তু যে কাজটা ওরা করতেন সেটা থেমে যায়নি৷

ঈদের সকালে বাড়ির পুরুষেরা ঈদের নামাজের জন্যে জন্যে বেরিয়ে গেলে বাড়ির মেয়েরা ব্যস্ত হয়ে পড়ত দুপুরের রান্নার আয়োজনে আর দাদি যেতেন পুকুরে স্নান করতে৷ দাদি বরাবর পুকুরেই স্নান সারেন৷ দাদির স্নান করাটাও বেশ মজার ছিল৷ পুকুরে নেমেই সাঁতার দিয়ে সোজা মাঝপুকুরে, তারপর পাক খেয়ে ঘুরে আবার ফিরে আসা ঘাটে৷ সিড়িতে উঠে বসে সাবান মাখা গায়ে, বাঁধানো সিড়িতে পা ঘষা আর তারপর নেমে দাঁড়িয়ে তিনখানা ডুব৷ স্নান শেষ৷ উঠে পুকুরের পাশেই কাপড় পাল্টনোর জায়গায় গিয়ে কাপড় পাল্টে চলে যেতেন বাড়ির ভেতর৷ যেতে যেতে রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখে যাওয়া, কদ্দুর এগোলো কাজ৷ নামাজ থেকে সবাই ফিরলো বলে!

দাদি ঘরে এসে পরতেন তার ঈদের শাড়িটি৷ স্নানের জায়গায় দাঁড়িয়ে দাদি কখনও তার নতুন শাড়ি পরতেন না৷ পুরনো শাড়ি পরে ঘরে এসে তারপর নতুন শাড়ি পরা৷ আটপৌরে ভাবে পরা নতুন শাড়ির আঁচল আলতো করে মাথায় টানা, ফুলহাতা ব্লাউজে দাদি যেন শরত্চন্দ্রের নায়িকা৷ দু'হাত রাঙা মেহেদির গাড় লাল রঙে, চোখে গাঢ় করে টানা সুর্মা, নতুন চটি পায়ে দাদি এসে বসতেন বারান্দায় পেতে রাখা তার হাতলওয়ালা চেয়ারটিতে৷ দাদির ঘরে টেবিলে ততক্ষণে এসে গেছে বড় গামলায় করে সেমুইএর পায়েস আর পাশেই উপুড় করে রাখা আছে একথাক ছোটো বাটি৷ একটু পরেই পাড়ার সব ছেলে-মেয়েরা দল বেঁধে আসবে৷ আর আসবে অন্য সবাই নামাজ ফেরত দাদিকে সালাম করতে, ঈদ মুবারক জানাতে৷ দাদি সালাম নেবেন আর উঠে গিয়ে সবাইকে একবাটি করে দেবেন শির৷

ঈদের আগের দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় ঈদের খাওয়া দাওয়ার আয়োজন৷ বিভিন্ন রকম পিঠে তৈরী হয়৷ মিষ্টি, নোনতা৷ কোরানো নারকোল চিনি জিয়ে জ্বাল দিয়ে তৈরী হয় সমোসার পুর৷ ময়দার রুটি বেলে পছন্দমত আকারে কেটে নিয়ে তাতে নারকোলের পুর দিয়ে তৈরী হয় সমোসা৷ বিভিন্ন আকারের৷ কোনটা তেকোণা, কোনটা পুলির মত তো কোনটা আবার দোকানের সিঙাড়ার মত দেখতে৷ ভাজা হয়ে গেলে ঘন করে জ্বাল দেওয়া চিনির রসে ডুবিয়ে তুলে রেখে দাও বড় গামলায়৷ ঈদের দিনে শরবত আর সেমুইএর সাথে এই সমোসাও দেওয়া হবে মেহমানদের৷ সাথেই ভেজে রাখা আছে খাস্তা নিমকি৷ যে মিষ্টি সমোসা খাবে না , তার জন্যে!

ভোরের আজানের সাথেই উঠে পড়েন আম্মা, চাচি আর ফুফুরা৷ ফজরের নামাজ সেরে অন্ধকার থাকতেই তারা ঢুকে পড়েন রান্নাঘরে৷ পুরুষেরা মসজিদ থেকে ফজরের নামাজ সেরে এসে হাঁক-ডাক শুরু করেন, এই পোলাপান, এখনও ঘুমাইতেছস? শিগগির ওঠ! সকাল হইয়া গ্যাসে তো! গোসল কইরা রেডি হ সব, নামাজে যাবি না? মাঝরাত পার করে ঘুমুতে যাওয়া সব ছেলে-মেয়ে, আমরা, চোখমুখ কচলে সোজা পুকুরে৷ মুখ ধুয়ে ঘরে আসতে আসতে টেবিলে হাজির আগের দিনে তৈরী করে রাখা সব সমোসা, নিমকি আর এক্ষুনি রান্না করা সেমুই, সুজির হালুয়া৷ এই সুজির হালুয়াটা দাদুর ফেভারিট৷ ঘরে বানানো, কিনে আনা যত খাবারই থাকুক, দাদুর সুজির হালুয়া চাইই চাই৷ ফ্লাস্ক ভর্তি চা আর ট্রেতে রাখা সব কাপ ডিশ৷ আমরা পোলাপানেরা তখন চা পেতাম না৷ আমাদের জন্যে জাগে আছে গরম দুধ৷ দুধ আমি একদম পছন্দ করি না, আমি চা ই খেতে চাই, কিন্তু চাইলেও কি পাওয়া যায়? দাদি বলে, চা খেলে নাকি আমি আরও কালো হয়ে যাব! অগত্যা : দুধ!

ভেতরবাড়ির উঠোনে তখন কাকার তদারকিতে কসাই খাসির মাংস টুকরো করছে৷ ভোরেই জবাই হয়েছে খাসি৷ কাজের বুয়ারা ঘুরঘুর করছে আশে-পাশেই৷ খাসির কলিজা, দিল, মগজ এগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্যে৷ একটা ঝাল ঝাল কষা হবে লুচির সাথে খাওয়ার জন্যে৷সেটা আম্মা রাঁধবে৷ খাওয়ার ঘরে তিন-চারজন বসে বেলছে লুচি৷ মা মাঝে মাঝেই রান্নাঘর থেকে উঠে এসে দেখে যাচ্ছে লুচি বেলার কদ্দূর কি হল৷ কুলোতে খবরের কাগজ পেতে রাখা হচ্ছে বেলা লুচি, কুলো ভরে উঠলেই এক ছুট্টে আমি সেটা রান্নাঘরে নিয়ে যাচ্ছি ভাজার জন্যে, ( আমিও বসে লুচি বেলছি কি না! ) সেখানে চাচি লুচি ভাজছে৷ এই লুচিগুলো বেশ বড় বড়৷ আর ভাজাও হয় একটু কড়া করে৷ অত লোকের বাড়িতে সকলের নাশতার জন্যে ছোট ছোট লুচি বেলতে বেলতেই নাকি রাত হয়ে যাবে, তাই দাদির পরামর্শে লুচিগুলো আকারেও বড় আর ওজনেও ভারী!

চন্দ্রবত্সরের হিসেব অনুযায়ী প্রতি বছরই রোযা দশ দিন করে এগিয়ে আসে৷ ছেলেবেলায় রোযা হত পুরো গরমকালে৷ যদ্দূর মনে পড়ছে আগষ্ট -সেপ্টেম্বর মাস ছিল সেটা৷ কিংবা হয়ত আরেকটু আগের কথা বলছি৷ জুলাই-আগষ্ট৷ দিন তারিখগুলো বেশ ভালই গুলিয়েছে বুঝতে পারছি৷ তখন চাঁদ দেখা নিয়ে এত ঝামেলা ছিল না৷ সবাই আশা করতেন যে রোযা তিরিশ দিনেই শেষ হবে, আর বেশিরভাগ তাই হত৷ কোন বছর ২৯দিনেই চাঁদ দেখা যেত৷ মসজিদের ঘোষণার প্রয়োজন হত না আর চাঁদ দেখা কমিটিও তখন ছিল না৷ গরমকালের পরিস্কার আকাশে আমরা বারান্দা থেকেই দিব্যি চাঁদ দেখতে পেতাম৷ ছোট্ট একসুতো বাঁকা চাঁদ৷ আকাশের এক কোণে মুখ বাড়িয়েছে খানিকক্ষণের জন্যে৷ নিয়ে এসেছে খুশির ঈদের খবর৷ একমাসের সিয়াম সাধনা শেষ৷ কাল ঈদ৷ দাদি উঠে যেতেন ছাদে, চাঁদের দিকে তাকিয়ে দু হাত তুলে রেখেছেন বুকের কাছে প্রার্থনার জন্যে৷ এটা নাকি চাঁদ দেখার দোয়া৷ দাদির দেখাদেখি আমরাও হাত দু হাত বুকের কাছে তুলে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম৷ দাদি কি দোয়া পড়ছেন কিছুই জানি না, দাদির প্রার্থনা শেষ হলে হাত দুটো নিজের গোটা মুখে বুলিয়ে 'আমীন' বলে প্রার্থনা শেষ করেন, আমরাও তাই করি৷ নিচে তখন রেডিওতে বাজছে নজরুলের সেই অবিস্মরণীয় গান,
রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
আপনাকে তুই বিলিয়ে দে , শোন আসমানী তাগিদ৷
তোরা সোনা-দানা, বালাখানা সব রহে ইল্লিল্লাহ
দে যাকাত , মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ
ও মন রমযানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ৷
আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে
যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ৷
রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ৷
আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমণ, হত মেলাও হাতে,
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরীদ৷
রমযানের ঐ রোযার শেষে এলো খুশির ঈদ৷
যারা জীবন ভরে রাখছে রোযা, নিত্য উপবাসী
সেই গরীব ইয়াতীম মিসকিনে দে যা কিছু মুফিদ
রমযানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ৷
এলো খুশির ঈদ এলো, এলো খুশির ঈদ৷ এলো খুশির ঈদ,
ও মন রমযানের ঐ রোযার শেষে এলো খুশির ঈদ৷

বাংলাদেশের প্রাতিটি শহর, প্রতিটি গ্রামে ঈদগাহের মাঠ আছে, যেখানে ঈদের নামাজ পড়া হয়৷ বেশ বড় মাঠ দেওয়াল দিয়ে ঘিরে দেওয়া থাকে৷ যেখানটায় দাঁড়িয়ে ইমাম ঈদের নামাজ পড়ান, সেখানে বেশ কারুকাজও করা থাকে, যেমনটি মসজিদে থাকে৷ এই ঈদগাহের মাঠ আছে প্রায় প্রতি গ্রামে জেলা শহরে আর বড় শহরে৷ ঈদের নামাজ মানুষ বড় জমায়েতে পড়তে পছন্দ করেন বলে পাড়ার মসজিদে ছোটখাট জামাত হয় না৷ বড় বড় মসজিদগুলোতে ঈদের জামাত হয় কিন্তু গ্রামে সকলেই ঈদগাহে নামাজ পড়েন৷ দাদু, আব্বুরা ঈদগাহ থেকে ঈদের নামাজ সেরে ফেরার সময় চলে যান কবরস্থানে৷

যেখানে শুয়ে আছেন পূর্বপুরুষেরা সব৷ আত্মীয়-বন্ধু, পড়শী৷ কারও বা সন্তান৷ কবরস্থানে দাঁড়িয়ে সমবেত নীরব প্রার্থনা করেন ঈদগাহ ফেরত সব মানুষ৷ কবরবাসী মানুষগুলোর জন্যে৷ তাদের আত্মার শান্তির জন্যে৷ নতুন পাঞ্জাবী লুঙ্গি আর টুপি পরিহিত সব পুরুষেরা, বাচ্চা ছেলেরা৷ সুগন্ধী আতরের সুবাস ছড়িয়ে যায় গোটা কবরস্থানে৷ এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করে কবরস্থানে৷ কারও হয়ত সদ্য হারানো কোন প্রিয়জন শুয়ে আছে এই কবরস্থানে, তার গাল বেয়ে নামে জলের ধারা৷ নি : শব্দ সব মানুষ বাড়িমুখো হন কবরস্থানকে পিছনে ফেলে৷

ঈদ-উল-ফিত্র৷ 'ফিত্র' শব্দটার মানে আমি অনেক খুঁজেও পেলাম না মানে আমার কাছে যা বই-পত্তর আছে 'ফিত্র' বা ফিত্রা নিয়ে আর সবই লেখা আছে ( মানে নিয়ম-কাকুন আর কি ), নেই যা তা হচ্ছে, শব্দটার অর্থ৷ গুগলি করলে হয়ত পাওয়া যাবে, তবে আমি বেশ একটু অলস আছি৷ এখন এই মানে খুঁজতে আর ভাল্লাগছে না৷ মোদ্দা ব্যপারটা হল , ঈদের দিনে একটা ছোট্ট দান করতে হয়৷ সেই দানেরই নাম 'ফিত্র' আমাদের মুখে মুখে যা এখন হয়ে গেছে 'ফিত্রা' বা ফেত্রা৷ আর সেই থেকেই এই ঈদের নাম ঈদ-উল-ফিত্র৷ রোযার ঈদ আমরা বলি বটে, তবে এর পোষাকী নাম হল এই৷ ও হ্যাঁ ফিত্র শব্দটার মানে খুঁজতে গিয়ে আরেকটা ব্যাপার জানলাম, তা হচ্ছে, রমযানের সাথে ফিত্র'এর কোনও যোগাযোগ নেই৷ 'ফিত্র' বা ফিত্রা একটি সম্পূর্ণ আলাদা ইবাদত ( পড়ুন , দানরূপে প্রার্থনা) ( বেহেশতী জেওর, প্রথম পর্ব, পৃষ্ঠা-ন : ৩৪৪)৷

ফিত্রা দেওয়া সবার জন্যে প্রযোজ্য নয়৷ মানে যাদের কাছে ঠিকঠাক পয়সা কড়ি আছে তাদের উপরেই এই 'ইবাদত' ( পড়ুন দান ) বাধ্যতামুলক৷ যারা যাকাত নেয় তারা ফিত্রাও নিতে পারে৷ একদমই যারা নিম্নবিত্ত মূলত তারাই এই দান নেন৷ একটু বুঝিয়ে বলি, মাথা গুনে দান করতে হয়, সোয়া দু কিলো সোনালী গম বা যব'এর দাম যা হয় সেই পরিমান টাকা একজনের নামে ফিত্রা হিসেবে দেওয়া হয়৷ যেমন এবছর সেটা ছিল ২৭টাকা (প্রতি বছরই গমের দামানুসারে এই টাকাটা বাড়ে)৷ গম বা যবএর বদলে চাল, ছোলা বা যবএর ছাতু ও দেওয়া যায় ফিত্রা হিসেবে, আর এই জিনিসগুলোর মূল্য অনুসারে কোনটা কতখানি দিতে হবে তাও বলে দেওয়া আছে ঐ বইয়ে৷ বাংলাদেশে কিংবা এখানে, এই কোলকাতায়, সোয়া দু কিলো গমের মূল্যই দেওয়া হয় ফিত্রা হিসেবে৷ একজনের ফিত্রা একজনকেই দেওয়া হয়৷ ঈদের দিন 'সুবেহ সাদিক'এর পরে যে শিশু ভূমিষ্ট হয়েছে তার ফিত্রাও দিতে হয়৷ আর এই সুবেহ সাদিকের আগে যিনি মারা গেছেন তার ফিত্রা মাফ৷

রচনা লিখছি বলে মনে হচ্ছে নিজেরই! তো ঈদের নামাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথেই পুরুষেরা ফিত্রা দিয়ে আসেন৷ ঈদাগহের ময়দানে ইমাম ঘোষণা করে দেন, এবছর ফিত্রা কত ঠিক হয়েছে৷ সেইমত দান সেরে বাড়িতে ঢোকা৷ অর্থাত্ কীনা যাঁর বাড়িতে আজ পোলাও মাংস, সেমুই হবে না তাঁদের ব্যবস্থাও হয়ে গেল৷

ঈদের জন্যে যে এতগুলো জামা-জুতো হল তা একদিন মানে ঐ শুধু ঈদের দিনে পরে তো শেষ করা যায় না! আমরা, এই পোলাপানেরা তাই ঈদের দু দিন আগে থেকেই নতুন জামা পরতে শুরু করি! আর পরীটি হয়ে এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়াই৷ কার ক'টা নতুন জামা হল সেই খোঁজও নিই, কিন্তু কেউই সহজে বলতে চাইতো না যে তার ক'টা জামা হল আর কে কে দিলো! আমি নিজেও অবশ্য কাওকে বলতাম না! তখন বন্ধু-সমবয়েসীদের উপর খুব রাগ হত, আমি দেখাচ্ছি না সে ঠিক আছে, কিন্তু ওরা কেন দেখাবে না? আম্মাকে এসে বললে আম্মা উল্টে বকে দিত, বলত, তুই দেখিয়েছিস? অগত্যা আমি চুপ! সকালে ঈদগাহ থেকে নামাজীরা ফেরার আগেই সবর স্নান সারা হয়ে নতুন জামা-জুতো ফিতে চুড়ি পরা সারা৷ দাদি তার রূপোর সুর্মাদানী থেকে চোখে সুর্মা টেনে দিতেন৷ সুর্মাদানী হাতে নিয়েই দাদি তার চেয়ারে বসে থাকতেন, সব নাতি নাতনিদের চোখে সুর্মা পরিয়ে দেবেন বলে৷ আর পাশেই রাখা থাকত বেশ কয়েক রকম আতরের শিশি(দাদির ভাষায় এগুলো সব বিলিতী আতর!)৷ যেগুলো বেরিয়েছে তাঁর কাঠের সাজবাক্স থেকে৷ সব্বার গায়ে একটু করে আতর ছড়িয়ে দিতেন দাদি৷

দাদির এই সাজবাক্সটা এক অদ্ভুত সুন্দর আর মজার জিনিস৷ বেশ বড়, একটা ছোট স্যুটকেসের মাপের, ডালাটা পেছনে কব্জা দিয়ে লাগানো৷ এই বাক্সে কোন হাতল নেই আর কোন তালা চাবিরও ব্যবস্থা নেই৷ ভেতরে ছোট-বড় সব খোপ কাটা৷ ভেতরে একের উপরে এক দুটো ভাগ৷ খোপগুলোয় ধরে উপরের দিকে টানলে আরেকটা ডালা উঠে আসে আর তার নিচে আরও বেশ কিছু খোপ৷ এই দ্বিতীয় ডালাটি আলগা, পুরো উঠে হাতে চলে আসে৷ প্রথম ডালায় থাকে দাদির প্রসাধনী সামগ্রী, যেমন- রকমারী সুগন্ধী আতর, চন্দনের টুকরো, টুকরো সুর্মা, (যেগুলো দাদি হামানদিস্তায় গুড়ো করে সুর্মাদানীতে ভরে রাখে ) আর থাকত ছোট ছোট সব কৌটোয় ভরা ক্রীম৷ দাদির ভাষায় বিলিতি ক্রীম! আর ঐ যে নিচের ঐ গোপন চেম্বার, তাতে দাদির সব গয়না৷ গলার তক্তি, মাদুলিছড়া, মাথার সিতাপাটি ( টায়রা ) বিনুনিছড়া, খোঁপার কাটা আর আরও সব হাবিজাবি৷ ঈদের দিনে দাদি তার এই সাজের বাক্স খুলে বসত, আর এক এক ঈদে এক এক নাতনি সুজোগ পেত দাদির ঐ গয়না পরার৷ সে এক অদ্ভুত সুন্দর৷ বাচ্চা একটা মেয়ে, আধুনিক সব জামা-জুতোর সাথে পরে আছে তার দাদির যুবতী বয়েসের গয়না৷ মাথায় সিতাপাটি, হাতে বাজু, গলায় তক্তি আর পায়ে তোড়া৷ দাদির এই তোড়াটা শুধুই গয়না ছিলো, নুপুর ছিলো না কারণ এতে ঘুঙরু ছিল না৷ ছম ছম শব্দে বাড়ির বৌ ঘুরে বেড়াবে সেটা নাকি দাদির দাদি শাশুড়ির পছন্দ ছিল না, তাই ঘুঙরু ছাড়া তোড়া! এক বছর আমি পরলাম দাদির গয়না সব৷ আর মায়ের সে কি চিন্তা! কোথায় কোনটা আমি খুলে ফেলে দিয়ে আসব! আর আমি? সোনায়, রুপোয় নিজেকে জড়িয়ে ফোঁকলা দাঁত সব বের করে দাদির চেয়ারের পাশে আরেক চেয়ার পেতে দুপুর অব্দি বসা!

আমার মা আর চাচি? ঈদ তো তাদেরও ! যেখানে বাড়ির পুরুষেরা সক্কাল বেলাতেই দু প্রস্ত নাশতা সেরে ঈদগাহ থেকে ঘুরে চলে এলেন, আমরা , সব পোলাপানেরা স্নান সেরে জামা কাপড় পরে দাদির হাতে প্রসাধন সেরে পরীটি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, মা আর চাচি তখনও রান্নাঘরে৷ কাজের বুয়াদের সাথে নিয়ে কাঠের আগুনে রেঁধে চলেছেন একের পর এক সুস্বাদু সব খাবার৷ খাসির রেজালা, মুর্গীর রোষ্ট, শামি কাবাব আর পোলাও৷ একফাঁকে বেরিয়ে এসে যাঁর যাঁর ছানা-পোনাকে স্নানও করিয়ে দিয়ে গেছেন৷ দুপুর গড়িয়ে যায় মায়েদের স্নান সারতে৷ দাদি মাঝে মাঝেই এসে বলে যাচ্ছেন, তুমরা গোসলডা কইরা তারপরে বাকি কাম সারো না! মা আর চাচি বলে, এইতো আম্মা, হইয়া গেসে, যাইতেসি! কিন্তু তখনও বাকি কাবাব ভাজা, স্যালাড কাটা৷ স্নান সেরে নতুন শাড়ি পরে আবার রান্নাঘরে যাবেন? তাই একেবারে কাজ সেরে বেরুবেন সব!

ঈদের সকালের প্রতীক্ষায় রাত যেন আর ভোর হয় না! চোখ বন্ধ করতেও ভয় লাগে, ঘুমিয়ে পড়লে যদি সকল গড়িয়ে দুপুর হয়ে যায়? সকালবেলাতেই তো সব ঈদের সালামী দেবে৷ আব্বু, চাচু, দাদু, দাদি, চাচি৷ সবাই হাতের মুঠোয় টাকা লুকিয়ে রেখে দেয় আগে থেকেই৷ সালাম করলেই সালামী! সব্বাইকে পা ছুঁয়ে একটা করে সালাম আর তারপরেই কড়কড়ে দশ টাকার একটা করে নোট! যতগুলো সালাম ততগুলো নোট! মামা তো খামের মুখ বন্ধ করে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছে, জামা-কাপড়ের সাথে৷ মাকে চিঠি লিখে দিয়েছে প্রতিবারের মত এবারেও, মামার সালামটা আমি যেন মা'কে করি আর তারপরেই মা যেন আমাকে খামটা দেয়! টপাটপ আম্মাকে দু'বার সালাম আর তারপরেই খাম হাতে! ভেতরে একটা কার্ড, ঈদ মুবারক লেখা, একটা চিঠি আর একটা নতুন পঞ্চাশ টাকার নোট! আমি কার্ড চিঠি আর টাকা হাতে নিয়ে সারা বাড়ি একপাক ঘুরে আসি ছুট্টে, জনে জনে কার্ড চিঠি আর টাকা দেখিয়ে৷ মা বলে, চিঠিটা তো পড়! কিন্তু আমি তো জানি, মামা চিঠিতে কি লিখেছে! মামা যে প্রতিবছর একই কথা লেখে! মামা লিখেছে,মা আমার ,ঈদ মুবারক৷ লক্ষ্মী হয়ে থাকিস, একদম দুষ্টুমি করিস না!ইতি, বেটা৷মামা যে আমার বেটা ছিল আর আমি মামার 'মা'৷ আমি অপেক্ষায় থাকি, কালকের৷ মামা যে কাল আসবে৷

সালামী আম্মা আর চাচিও পায়৷ রান্নাঘরের পাট চুকিয়ে স্নান সেরে নতুন শাড়িতে দুজনে দাদুকে যখন সালাম করতে আসে তখন প্রায় দুপুর৷ দাদু তাঁর হাতবাক্স থেকে দুখানা একশ টাকার নোট বার করে দুজনকে দেয়৷ আমি বুঝতে পারি না, সালামী পেয়েও আম্মা কিংবা চাচি কেন সেটা নিতে চায় না, বারে বারেই বলে, থাক না আব্বা কি দরকার! একপাটি দাঁতহীন দাদু আমার হেসে বলেন, রাখ না সোনা ( দাদু আম্মাকে 'সোনা' বলে ডকতেন) , আমি যদ্দিন আছি, তদ্দিনই তো! এরপর তোমারে আর কে সালামী দেবে?


(আরও খানিকটা লেখার ছিল কিন্তু হয়ে ওঠেনি)

2 comments:

  1. eTa aage poRechhilam. bhison pochhonder lekha eTa.

    ReplyDelete
  2. এই লেখাটা একটু কাটা-ছেঁড়া করতে হবে। করবও কিন্তু জানি না কবেঃ-(

    ReplyDelete