Friday, June 29, 2007

আমি মেলা থেকে কোন বাঁশি কিনে আনিনি


এ'বছর মকর সংক্রান্তিতে পুরুলিয়ায় গেছিলাম। মেলা দেখতে। প্রচুর মেলা বসে সেখানে। মূলত সাঁওতালদের। একদিনে দুটো মেলাই দেখা সম্ভব হয়েছিল। মাঠাবূরু'র মেলা আর জয়দেব'এর মেলা। পশ্চিমবঙ্গ আর ঝাড়খন্ডের সীমানায় জয়দেবের মন্দির। পাহাড়ের উপর মন্দির, নিচে মোটামুটি সমভূমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই মেলা।


জয়দেবের মেলায় সকাল সকাল পোঁছে গেছিলাম, মেলা তখন সবে জমছে। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে উঁচু নিচু রাস্তা একে বেকে চলে গেছে পাহাড়ের দিকে। সুবর্ণরেখা নদীও ঢুকে পড়েছে পাহাড়ের বুক চিরে স্বচ্ছ ঠান্ডা জল নিয়ে, খানিকটা যেন ঝর্ণার মত দেখতে। জানুয়ারীর শীতে নদী বেশ শীর্ণ, রোগা ভোগা। দূরে দেখা যায় রাঁচি জামশেদপুর মহাসড়ক।


মেলায় ঢুকতেই চোখে পড়ে কলসী নিয়ে খানিক দূরে দূরে বসে আছে কয়েকজন। কারও কলসীতে তাড়ি তো কারও কলসীতে খেজুরের রস। এক গ্লাস খেজুরের রস নিয়ে খেতে পারলাম না, প্রচন্ড ঝাঁজ। রোদের আঁচে খেজুরের রসও তাড়ি হয়ে গেছে। রঙবেরঙএর জামা কাপড় পরা মানুষজন সব উত্তসবের মেজাজে আসছে, দলে দলে। মানুষগুলোকে দেখলেই বোঝা যায়, এরা প্রকৃতির সন্তান। কালো মুখগুলো আনন্দে ঝলোমলো। বাইরের লোককে এরা খুব একটা পাত্তা দেয় না। কোন অভিব্যাক্তিও ফোটে না মুখে। নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে তাকায় আবার সাথে সাথেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে মন দেয় নিজেদের দিকে।


কেউ কেউ স্নান করছে সুবর্ণরেখায়। গতরাতে স্নানের যোগ ছিল। মকরের স্নান। রাতে যারা ডুব দেয়নি, এই দিনের বেলাতেই খানিকটা হলেও পূণ্যার্জনের আশায় এই ডুব। পরনের কাপড়খানি জলে দাঁড়িয়েই পাল্টে নেওয়া আর পাথরের উপর বিছিয়ে শুকিয়ে নেওয়া। ছানা পোনাদের ধরে ধরে ঠান্ডা জলে ডুব দেওয়ানো। সে এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য।


নদীর তীর ধরে দূরে দেখা যায় রঙচঙে নাগরদোলা, আরও কিছু শহুরে খেলা ধুলোর আয়োজন। কয়েকটা অস্থায়ী ফটো ষ্টুডিওও বসেছে মেলায়। পরপর তিনখানি ষ্টুডিও। কাঠবোর্ডের দেওয়ালে রঙীন দৃশ্য আঁকা। যদিও কাওকে ছবি তোলাতে দেখিনি। টিনের কৌটোয় এক অদ্ভুত রঙ নিয়ে বসে থাকতে দেখলাম কয়েকজনকে। সাথে কাঠের ব্লক। নানা ডিজাইনের। ( যেগুলো দিয়ে কাপড়ে ডিজাইন করা হয়)। ব্লক বিক্রি করছে করছে ভেবে মূল্য জানতে চাইলে বুড়ো মানুষটা আমার হাতটি ধরে বসে দিলেন সামনে, আর টিনের কৌটোয় রাখা রংএ ব্লগুলো চুবিয়ে চুবিয়ে হাটে ছাপ দিতে লাগলেন, ছোটো বড় নানা ব্লক, নানা ডিজাইনের। হাতে ফুটে উঠল মেহেন্দির নকশা! আমি অন্য হাতটিও বাড়িয়ে দিলাম, আর হাতের উল্টো পিঠেও ছাপিয়ে নিলাম ঐ নকশা। বুড়ো লোকটি একটিও কথা না বলে মন দিয়ে নিজের শেষ করে মুখ তুলে তাকালেন আর বললেন, "দশ ট্যাকা দে।"


অদ্ভুত কায়দার সব জুয়ার আসর চোখে পড়ল। টাকার পরিমান কোথাও দশ টাকার বেশি নয়। ১টাকা, দু টাকা, পাঁচ টাকা আর সর্বোচ্চ দশ টাকা। এই দুপুরবেলায় খুব একটা ভিড় নেই কোন পসারির কাছেই। শহুরে কায়দায় জায়গা ঘিরে নিয়ে ফুচকা চটপটিওয়ালাদের বরং বিক্রি বেশি। হেথায়, হোথায় দাঁড়িয়ে আছে বেলুনওয়ালা আর বাঁশিওয়ালা। রঙীন সব বাঁশি। বাঁশের বাঁশি। আমার খুব মন চাইছিল একটা বাঁশি কিনি, কিন্তু কিনলাম না! রুদ্রাক্ষের এক মালা কিনব ভেবে হাতে নিয়েও রেখে দিলাম! কেন কে জানে কিছুই কিনতে ইচ্ছে করল না...


বিশাল এলাকা জুড়ে মেলা। মেলায় খাবার বলতে , ছোলা ভাজা, মটরভাজা, চটপটি, ফুচকা আর সিঙাড়া। কোথাও বা মিষ্টি। খাজা, গজা। এই মিষ্টিগুলো আসলে ভোগ। পাহাড়ের উপর জয়দেবের মন্দিরে যারা পুজো দিতে যান, এই বিশালাকারের খাজাগুলো কিনে নিয়ে যান। একএকখানা খাজার সাইজ মাঝারি আকারের ভাতের থালার মত। দুখানি খাজা ওঠে এক কিলোতে। শালপাতায় করে নিয়ে গিয়ে পুজো দিয়ে আসা আর তারপর সেই প্রসাদী খাজা বাড়ি নিয়ে যাওয়া। চড়াই উত্তরাই ভেঙে পাহাড় অব্দি পৌঁছানোর দেখা গেল চওড়া একধাপ সিঁড়ি, সোজা উঠে গেছে মন্দিরে। আমাদের গন্তব্য মন্দির ছিল না , সিঁড়ি অবদি গিয়েই ফেরার পথ ধরলাম।


ফেরার পথে খানিক বসা সুবর্ণরেখার ধারে, পাথরে। বরফঠান্ডা জলে মুখ হাত ধোওয়া। গরম গরম বাদামভাজা কিনে খাওয়া। স্বপ্নের মত সেই পাহাড়ি রাস্তা, লালমাটির উঁচু নিচু রাস্তা দিয়ে প্রকৃতির কোল ছেড়ে ফিরে আসা তথাকথিত সভ্যতার দিকে।

No comments:

Post a Comment