Saturday, May 05, 2007

একটি স্যুটকেস আর...

আমার তিনি দেশে ফিরেছেন আঠাশ তারিখে। আমি ও শ্বশুর মশাই দুজনেই চিন্তিত ছিলাম, সে তার জিনিসপত্র ঠিকঠাক নিয়ে ফিরবে কিনা। বিশেষ চিন্তা ছিল কাগজপত্র নিয়ে। বারে বারে ফোনে সেটাই বলে দিচ্ছিলাম, কাগজপত্র ঠিকঠাক গুছিয়ে নিও! প্যাকিং হয়েছে কী! শুনলাম প্যাকিং হয়েছে, জামা কাপড় সব ঢিল মেরে মেরে স্যুটকেসের ভেতরে ফেলে দেওয়া হয়েছে, স্যুটকেসে বন্ধ করতে গিয়ে ঝামেলা। কিছুতেই বন্ধ হয় না! তো, সেটারও সমাধান হয়েছে। সহকর্মী ভদ্রলোক স্যুটকেসের উপর বসে পড়েছেন আর ইনি সেটাকে টেনে টুনে কোনরকমে বন্ধ করেছেন! 


নেমেছেন এসে দিল্লি এয়ারপোর্টে। ভোরবেলায় কলকাতার ফ্লাইট। রাতের কয়েক ঘন্টা এয়ারপোর্টে পায়চারি করেই কাটিয়ে দিয়ে ভোরবেলায় প্লেনে উঠেই ঘুম। সকাল ন'টায় কলকাতায় প্লেন ল্যান্ড করার কথা, আমি সেইমত এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে। ন'টা বাজল, দশটা বাজল, এগারটাও বেজে গেল। এয়ারপোর্টের বাইরে রোদে দাঁড়িয়ে যখন মাথা ঘুরতে শুরু করেছে তখন মনিটরে দেখলাম প্লেন এসেছে। লোকজন বেরোতে শুরু করেছে সাড়ে এগারটা থেকে। একে একে প্রায় সবাই বেরিয়ে গেল, সে আর বেরোয় না। ওর স হকর্মী ভদ্রলোকও দেখলাম বেরিয়ে এলেন। একখান স্মাইল দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। এবার বেরিয়ে এল সহকর্মী দুটি মেয়ে, তাদের দেখে আমি নিজেই স্মাইল দিলাম। এরাও পাল্টা স্মাইল দিয়ে বেরিয়ে যাবেই ধরে নিয়ে। একটি মেয়ে এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে টানল, বলল, দিদি শোনো, একটা সমস্যা হয়েছে দাদাভাইয়ের, লাগেজটা আসেনি! তো দাদাভাইকে এখন অপেক্ষা করতে হবে লাগেজের খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত!


আমাকে চিন্তা করতে বারণ করে মেয়ে দুটি চিন্তিত মুখে এগিয়ে গেল যার যার বাড়ির পথে। চলমান দূরভাষে তিনি, জানালেন একটু ঝামেলা হয়েছে, বেরোতে দেরী হবে, আমি যেন অপেক্ষা করি। খোঁজ নিয়ে জানলাম টিকিট কেটে এয়ারপোর্টে ঢোকা যায়, ঢুকে পড়লাম। দূর থেকে দেখতে পেলাম, চিন্তিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সে এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে। এগিয়ে গিয়ে ঘটনা শুনলাম, লাগেজটা আসেইনি এই বিমানে, খোঁজ চলছে, ওটা কি দিল্লি এয়ারপোর্টেই আছে না বম্বে চলে গেছে! খোঁজ পাওয়া গেল, দিল্লিতেই আছেন স্যুটকেস মহাশয়, রাতের বিমানে কলকাতা চলে আসবে আশা করা যায়, উপযুক্ত প্রমাণাদি দেখিয়ে রাতে এসে স্যুটকেস নিয়ে যেতে হবে। এয়ারলাইন্সের কাউন্টয়ারের সুন্দরী মেয়েগুলি মিষ্টি হেসে স্যার স্যার করে জানিয়ে দিল এবার আপনারা বাড়ি যেতে পারেন! একটা ফোন নম্বরও দিল এই নম্বরে খোঁজ নিলেই জানতে পারা যাবে, কি স্ট্যাটাস! হাতে চামড়ার জ্যাকেট ঝুলিয়ে ঠা ঠা রোদে বেরিয়ে এসে ও জানতে চাইল, আমরা বাড়ি যাব কি করে?! 


পোচ্চুর লম্বা হয়ে যাচ্ছে গল্পটা। শেষ করি এবারে। সন্ধ্যের পরে ফোন করে জানা গেল, স্যুটকেস উঠেছে বিমানে, বিমান কতৃপক্ষ সেটিকে বাড়ি পাঠিয়ে দেবেন, কোন চিন্তা যেন না করা হয়! চিন্তা কতটুকু হচ্ছিল কে জানে তবে খানিক পরেই পরেই ও বলে উঠছিল কী অদ্ভুত না! স্যুটকেসটা একা একা বাড়ি ফিরছে! রাত এগারটায় চলমান দূরভাষে ঘন্টা বেজে ওঠে, স্যুটকেস বাড়ি পৌঁছে গেছে, নিচে গিয়ে সেটি যেন নিয়ে আসা হয়। সারাদিনের উদ্বেগের পরে বাড়ির দরজা থেকে ধন্যবাদ সহযোগে গৃহীত হয় হারিয়ে যাওয়া স্যুটকেস।

No comments:

Post a Comment